📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ইসলামোফোবিয়ার দায়ভার বনাম অপবাদের রাজনীতি

📄 ইসলামোফোবিয়ার দায়ভার বনাম অপবাদের রাজনীতি


তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে জেনারেল মঞ্চে উঠে এলেন। মিসরীয় প্রেসিডেন্টের বিশেষ ভাষণের দিন। ২৭ রমজানে সাধারণত প্রেসিডেন্টরা মিসরীয় জাতির উদ্দেশে বিশেষ ভাষণ দেন। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের রমজানে মঞ্চে এলেন প্রেসিডেন্ট আব্দুল ফাত্তাহ সিসি। প্রেসিডেন্ট সিসি শুরুতেই ইসলামোফোবিয়ার কারণ, অনুঘটক ও বিস্তারিত বয়ান দিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রেসিডেন্টের আলোচনার মূল ভাবই হলো ইসলামোফোবিয়ার মৌলিক কারণ, কিছু মুসলিমের কিছু কর্মকাণ্ড। যদিও এবারই প্রথম নয়, বরং ইতোপূর্বে তিনি এমন বলেছেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আল আজহারের ইমাম শায়খ তায়্যিব এর তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। আরও হতাশার বিষয় হলো- আরব গণমাধ্যম ও বিভিন্ন প্লাটফর্মে অনেক আলোচক ও মুহাদ্দিস ইসলামোফোবিয়ার দায় মুসলিমদের ওপরই দিচ্ছেন! কেউ তো এটার খুবই সরলীকরণ করেছেন। সন্দেহ নেই, কিছু ব্যক্তি তুচ্ছ ব্যক্তিস্বার্থে এমনটা করছেন।
ইসলামোফোবিয়া-সংশ্লিষ্ট পরিভাষার পক্ষ-বিপক্ষের আলোচনা করব না আমি। মুসলিম, মুসলিম সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিরুদ্ধে কতটা গভীর ঘৃণা ও - বিদ্বেষ সমাজ, রাজনীতি ও গণমাধ্যমে নির্বিচারে প্রচারিত হচ্ছে তার কিছুটা তুলে ধরবো আমি। এটা একদমই অসমর্থনযোগ্য ঘৃণা ও বিদ্বেষ। আরব ও ইসলামি দুনিয়ায় ইসলামোফোবিয়াকে যতটা আত্ম-সমালোচনা ও সরলীকরণ হিসেবে দেখা হয়, ততটা নয়। বরং শেকড় আরও বহু গভীর ও বহু শাখাপ্রশাখাসমৃদ্ধ।
মুসলিমদের আচরণ দ্বারা ইসলামোফোবিয়ার ব্যাখ্যা করা
কেউ কেউ সদিচ্ছা আবার কেউ হয়তো কুমতলবে মুসলিমদের কথিত আচরণের মাধ্যমে ইসলামোফোবিয়ার ব্যাখ্যায় আগ্রহী হন। তারা মুসলিমের আচরণকে ইসলামোফোবিয়ার মূল কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু এই তত্ত্বের ব্যাখ্যাদাতারা যে বড়ো ধরনের ভুলের শিকার হয়েছেন, তা তারা বুঝতে পারছেন না। তাদের নিকট মুসলমানের শুধু নেতিবাচক ও নিন্দনীয় অবস্থায়ই সামনে আসে। একটি সমাজের ব্যাপকভিত্তিক ইতিবাচক আচরণকে উপেক্ষা করে শুধু নেতিবাচক দিক দ্বারা পুরা সমাজের ওপর বিধান আরওপ করা খুবই অন্যায়। একটি অবকাঠামোর এক-পঞ্চমাংশের অসুস্থতা কি পূর্ণ কাঠামোর অসুস্থতাকে অনিবার্য করে তোলে?
ভিকটিমকে দায় দেয়ার তত্ত্ব মেনে নেয়ার দ্বারা নাৎসি ও ফ্যাসিস্টদের হাতে সাদা চেক হস্তান্তর করার নামান্তর। অন্যদিকে এদের কুৎসিত চেহারা ফুটে ওঠে যখন আমরা দেখি, ভিকটিমকে দোষারোপ করার নীতি সকল স্থানে প্রয়োগ করে না। বরং সমাজের সংখ্যালঘু প্র্যাক্টিসিং মুসলিমসহ ধর্মীয় ব্যক্তিদের দেয়া হয়। কিছু সরল ও বিভ্রান্ত ব্যাখ্যা অনুমিত হয়, আমাদের জগতের সমস্যা শুধু মুসলিমদের মধ্যে। অন্যরা কোনো ভুলই করে না। কিংবা তাদের ভুল ক্ষমাযোগ্য। যেন তারা বর্ণবাদ مسلمانوں দেখেই শিখেছে এবং প্রয়োগ করেছে।
ভিকটিমের আচরণের মাধ্যমে ঘৃণা ও বর্ণবাদী প্রবণতার ব্যাখ্যা করাটা পরিপূর্ণ অন্যায়। এই ব্যাখ্যায় ভুক্তভোগীর নিন্দা করা হয় এবং অপরাধীকে সহযোগিতা করা হয়। বর্ণবাদের মূল উৎস অনুধাবনে কিন্তু এই কর্মপন্থা কোনোভাবে সহায়ক হয় না। একই সাথে এ ধরনের কার্যপদ্ধতি সমস্যার সমাধানের নামে বিভ্রান্তিকর বিকল্প তৈরি করে। ভুক্তভোগীর নিন্দাকে শুধু তার প্রতি লাল কার্ড প্রদর্শনেই ক্ষান্ত হয় না। বরং বিশ্বজুড়ে ঢেকে যাওয়া বর্ণবাদের দায় ইসলামের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। বর্ণবাদী প্রবণতা এবং আত্মসমালোচনার মধ্যে পার্থক্য না করে এসব তাত্ত্বিকরা-বিদ্বেষ ছড়ানো এবং মূল্যবোধ লঙ্ঘন করতে থাকেন।
বাস্তবতা উপেক্ষা করে ভুক্তভোগীর নিন্দা করা
মুসলমান এবং তাদের আচরণের সাথে ইসলামোফোবিয়ার সম্পর্ক জুড়ে দেয়ার অর্থ হলো, বিশ্বের নিকট গ্রহণযোগ্য হতে হলে মুসলমানদের পরিবর্তন করতে হবে। আর তাদের নিকট বিশ্ব বলতে পাশ্চাত্যই। এটা আসলে তাদের কিছু পরিকল্পিত আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য মগজ ধোলাইয়ের একটি মাধ্যম। এসব বক্তারা কখনো পশ্চাৎপদতা ও চরমপন্থার পেছনের মূল বিষয় তুলে ধরার প্রয়োজন অনুভব করে না। যদি মেনে নেয়া হয় যে, 'আমাদের মধ্যকার সমস্যার মূল কারণ আমরাই'। যার দাবি হলো 'আমরা পরিবর্তন হই, যাতে বিশ্ব আমাদের গ্রহণ করে'। এটি তো বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মতো। বৌদ্ধিক ব্যক্তিরা মস্তিস্ক সচেতন রেখে নিজেদের মূলনীতি ও মূল্যবোধকে সংরক্ষণ করবে। যাতে দেশের ভিতরে ও বাইরে তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়।
কিন্তু এই তাত্ত্বিকরা কখনো মানবাধিকার, মানবমর্যাদা ও মজলুমের অধিকার সচেতন হতে সাহস করে না। জনগণের মধ্যে অর্থবৈষম্য, সম্পদের অসম বন্টন ও ধনী-গরিবের বিশাল ফারাক নিয়ে কথা বলাটা যতোটা কঠিন, তাদের নিকট ঠিক ধর্মের মূলপাঠ পূনর্বিবেচনার আহ্বান করাটা ততটাই সহজ। এদের বৈপরিত্য খুব সহজেই প্রকাশ পায়, যখন তারা মুসলমানদের অন্যদের সাথে সহাবস্থান বজায় রাখার জন্য কুরআন-সুন্নাহের দলিল দেয়। কিন্তু তারাই আবার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ইসলামোফোবিয়ার দায় পুরা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে আর তারা কুরআনের আয়াত খুঁজে পায় না।
কিছু মানুষ বুঝতে চায় না, কীভাবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বর্ণবাদ প্রকাশ পাচ্ছে। যুগে যুগে কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করেছে এই বর্ণবাদ। مسلمانوں নিন্দা করতে বয়ান-বিবৃতিতে বর্ণবাদ ব্যবহার করে বিশ্বের নিকট গ্রহণযোগ্য হতে পরিবর্তনের কথা বলে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য। অথচ এরাই জনগণের অধিকার ও প্রাপ্য না দিয়ে জনগণের থেকে লঙ্ঘিত সেসব মূল্যবোধের নিন্দায় সরব থাকে, যে মূল্যবোধ একই সাথে পাশ্চাত্য বিশ্ব ও ইসলামের নিকট সমান গ্রহণযোগ্য।
তাদের বক্তব্য কি এটাই দাবি করছে, মুসলিমরা অন্যদের মতো মানুষ নয়। অন্যদের মতো তাদের থেকে কোনো দোষত্রুটি প্রকাশিত হতে পারবে না। মানুষ তো কখনো ভালো করে, কখনো মন্দ করে। কখনো তো কোনো সমাজের একজন সদস্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাপে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারে। এ জন্য দেড় বিলিয়নের বেশি জনগোষ্ঠীর মূল দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশ কাটিয়ে বিচ্ছিন্নতাকে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করার কোনো অর্থ হয় না। বিশ্বের জাতিগোষ্ঠীর উত্থান-পতনের জটিল সমীকরণ অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।
অনেকে অবচেতনভাবে ভুক্তভোগীর ওপর দায় চাপিয়ে দেন, যদিও তারা এটা অনুভব করেন না। সমাজের অপরিণত গোষ্ঠীর বক্তব্য এবং মানব সমাজের অমোঘ নিয়ম সম্পর্কে অনবগতিই এর উল্লেখ্যযোগ্য কারণ। ইতোপূর্বেও এমন দেখা গেছে। সমাজের নির্দিষ্ট অঙ্ক আরও পরিষ্কার করে বললে ইহুদিদের একটি গোষ্ঠীর অপরিণত কর্মকাণ্ডের কারণে তারা গণহত্যার শিকার হয়েছে। এবং এই অসদাচরণকে তাদের ওপর নির্যাতন করার পক্ষে কারণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে তৎকালীন জাতীয়তাবাদীরা। নাৎসিদের বর্ণবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ কিন্তু আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের ওপর বিশ্বাস করতো না। এই জাতীয়তাবাদের বলি শুধু ইহুদিরা নয়। বরং অন্যান্য জনগোষ্ঠীও এর শিকার হয়েছে। আর এখন ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে উগ্র ডানপন্থি নব্য নাৎসিদের প্রধান শিকার হচ্ছে মুসলিমরা।
চরমপন্থা ও ইসলামোফোবিয়া
বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে থাকা কিছু ব্যক্তি মুসলিমদের আচরণকেই ইসলামোফোবিয়ার দায় হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই সমস্যা মোকাবিলায় 'চরমপন্থার মোকাবিলা' শীর্ষক আলোচনার শিরোনামেই বড় ধরনের গলদ রয়েছে। এতে তাদের পূর্ব কল্পিত চিন্তাপ্রবণতার স্পষ্ট ছাপ থাকে। কিছু মানুষ তো চরমপন্থার মোকাবিলায় আবার নিজেরাই চরমপন্থা অবলম্বন করেন। এমনকি মানবীয় মহান মূল্যবোধ ধারণ করার আহ্বান করে তারাই আবার তা নিজ পায়ে পদদলিত করেন। সমাজের কোনো অনুষ্ঠানে চোরকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে একজন নির্দিষ্ট মুসলিমদের পরিচয় করিয়ে দেয়া এবং অন্য ধর্মাবলম্বী তথা হিন্দু, খ্রিস্টান, ইহুদি ও নাস্তিককে এড়িয়ে যাওয়াকে অবশ্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলতে হবে।
ইসলামোফোবিয়া রোধে ভাবমর্যাদা উন্নয়ন
কিছু কিছু মুসলিম তাদের সামাজিক পরিমণ্ডলে ভাবমর্যাদা উন্নয়নের লক্ষ্যে খুব প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। প্রতিবেশী মুসলিমের প্রতি সদাচার সকল মুসলিমের ওপর নিঃসন্দেহে প্রভাবক নয়। হয়তো সর্বোচ্চ বলা হবে, সে একজন ভালো প্রতিবেশী। তাকে কখনো বলা হবে না 'সে আদর্শিক মুসলিম'। হ্যাঁ, বলবে, সে আমাদের অনেকটা কাছাকাছি।
বর্ণবাদ ও ঘৃণাচর্চার এই আদর্শ কোনো বিশেষ যৌক্তিক ভিত্তির ওপর স্থাপিত নয়। বরং এই বর্ণবাদ বেছে বেছে তার চিত্র প্রকাশ করে শুধু মুসলমানের সামনে। কিছু আরব ও মুসলিম দেশ তাদের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল করার স্বার্থে প্রশাসনে নারীদের নিয়োগ দেয়। বৈদেশিক প্রচারণায় বিভিন্ন ডেলিগেট হিসেবে তাদের অগ্রাধিকার প্রদান করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতৃপ্ত পাশ্চাত্যের বক্তব্য হলো- 'পাশ্চাত্যের অনসরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে তোমাদের'। এক্ষেত্রে যে আরব কিংবা মুসলিমদের মৌলিক চারিত্রিক উৎকর্ষতা ও পরিচয়ের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য অবশিষ্ট থাকে না, তা এখানে বলা বাহুল্য! তবে ভাবমর্যাদা উন্নয়নের কী অর্থ হলো?
কিছু মানুষ আবার চরিত্র ও আচরণ সংশোধন এবং বর্ণবাদ ও ঘৃণাপ্রকাশ বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। তাদের বক্তব্য মুসলিমকে সংশোধন হতে হবে। তাদের দাবি অনুসারে বলতে হয়, কোনো মুসলিম-কর্তৃক কৃত নির্দিষ্ট বিব্রতকর আচরণ কি সকল মুসলমানকে দোষীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে? মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম হোক! ব্যক্তির আচরণ দ্বারা কি গোষ্ঠীকে অভিযুক্ত করা ন্যায়সঙ্গত?
অনেকে পাশ্চাত্য মুসলিমদের ভাবমর্যাদার বৃদ্ধির অংশ হিসেবে মুসলমানদের শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। পাশ্চাত্য তো তাদের বাইরের গোষ্ঠী, সমাজ ও রাষ্ট্রকে জগতই জ্ঞান করে না, বরং তৃতীয় বিশ্ব ইত্যাদি নাম দ্বারা অভিহিত করে মানসিকভাবে নিপীড়ন করে। অথচ আমার মতে, কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের শক্তিশালী হওয়ার অর্থই পাশ্চাত্যের সাথে কৌশলগত লড়াই-সংঘাতের রাস্তা প্রশস্ত হওয়া। শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা থাকা সত্ত্বেও ইসলামোফোবিয়াকে এটা আরও উস্কে দেবে।
পাশ্চাত্যে মুসলিমদের অর্জনকে উপেক্ষা করা
অনেকের ধারণা 'মুসলমানদের ভাবমর্যাদার উন্নয়ন হলে পাশ্চাত্য তাদের ইজ্জত দেবে। এই অর্জন ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি ঘৃণার মাত্রা হ্রাস করবে।' যদি এটা বলি তবে নিশ্চিত বাড়িয়ে বলা হবে না যে, ইউরোপের অধিকাংশ দেশের হাসপাতাল থেকে যদি বিশেষজ্ঞ মুসলিম ডাক্তার প্রত্যাহার করা হয়, তবে সব হাসপাতাল অচল হয়ে পড়বে। আরব ও ইসলামি বিশ্বের অনেক মেধা শরণার্থীর ঢলের সাথে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। হ্যাঁ, এটা সত্য! ইউরোপ আশ্রয় দিয়েছে কিন্তু তাদের যে জীবনের সব মহাঅর্জন তারা বিতরণ করেছে, অভিজ্ঞতা দিয়েছে' তা কিন্তু কম নয়।
সবসময় কিছু আওয়াজ তো বৈচিত্র্যময় অর্জনের কথা বলতে থাকে। ভাবমর্যাদা উজ্জ্বলের কথা বলে। অন্যরা নাকি এতে আমাদের স্বীকৃতি দেবে। ইউরোপের মাঠকাঁপানো তারকা মুহাম্মাদ সালাহ, মাসউদ ওজিল, যায়নুদ্দিন যায়দান ও সামী খাদিরাহের মতো ব্যক্তিদের অর্জন কিন্তু তেমন পরিবর্তন আনেনি। বরং তা আরও বর্ণবাদের তাপকে বাড়িয়েছে।
জীবিত ব্যক্তিদের অবদানে যদি কারো সন্তুষ্টি না আসে, তবে মাটির ভেতর সন্ধান করতে পারেন। গত দুটি বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের হয়ে যেসব মুসলিম জীবনদান করেছে, তাদের দিকে দেখুন। সেসব কবরস্থান দেখুন! একটি জাতির জন্য রক্তদানের থেকে বড়ো কোনো দান হতে পারে না। ফ্রান্স, ব্রিটেন ও অস্ট্রিয়াসহ আরও অনেক ইউরোপীয় শক্তির পক্ষ হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্র শক্তির পক্ষে প্রায় পঁচিশ লাখের বেশি মুসলিম সৈন্য লড়াই করেছে। হতে পারে সেসব যুদ্ধ ছিল অনৈতিক ও অবৈধ। এসব সৈন্যদের মরদেহ বিভিন্ন গ্যারিসন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ইসলামোফোবিয়ার এসব ব্যাখ্যাদাতারা কিন্তু ফ্রান্সের, ইংল্যান্ডের, বেলজিয়াম, ইতালি, কিংবা অস্ট্রিয়ার গ্যারিসনের গোরস্তানে অনুসন্ধানের সুযোগ পায়নি।
যারা সফলতা ও অর্জনের খবর জানতে চান, তারা তো জানতে পারবেন। কিন্তু যে বিষয় সম্পর্কে সতর্ক থাকার কথা বলি তা হলো, ভাবমর্যাদা বাড়াতে নতুন নতুন সফলতা ও অর্জনে উৎসাহিত করার মধ্যে কোনো মানবাধিকার তো থাকে না। কারণ, যারা কোনো উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জনে সক্ষম নয়, তাদের সাথে কি তবে বর্ণবাদী ও ঘৃণামূলক আচরণ করার সুযোগ রয়েই যাচ্ছে! এটা তো দেখা যাচ্ছে, অর্জনহীন মানুষকে মূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই, তাকে নিদেনপক্ষে মানবিক সম্মানও দেয়া যায় না!
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা
পাশ্চাত্য ও ইউরোপীয় গণমাধ্যমের স্বাভাবিক ট্রেন্ড হলো- কোনো হামলার ঘটনায় হামলাকারীর পারসোনাল লাইফকে পৃথক রাখা। প্রায়ই 'হামলাকারী মুসলিম' শুধু এই তথ্যের আলোকেই ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিভিন্ন তথ্য তুলে আনতে থাকে। কোন জনবহুল মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে সে থাকে, কোন মসজিদে নামাজ আদায় করতো এবং তারপর ঐ মসজিদের ইমামকেও কোনোভাবে সন্দেহের তালিকায় আনার চেষ্টা করা। গণমাধ্যম কর্তৃক এই প্রতিবেদন আসার সাথে সাথে এলাকাটির মুসলিমরা, তাদের বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান অপরাধের সাথে তাদের ধর্ম ও ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার কথা নাকচ করে দিয়ে বিবৃতি দিতে থাকেন।
তাছাড়া আরও একটি দৃশ্যমান অজুহাত খুবই সচারচার দেখা যায়, কোনো মুসলিম কর্তৃক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পর গণমাধ্যমগুলো একটি বিষয় চেপে যায়; হামলাকারী মানসিক বৈকল্যতায় ভুগছিলেন কি না? অথচ অমুসলিম কেনো ব্যক্তি যদি এমন হামলার সাথে জড়িত হতো, সেক্ষেত্রে গণমাধ্যমে ব্যাপক আকারে প্রচারিত হয়, হামলাকারী বন্ধুর বিচ্ছেদে কিংবা অর্থনৈতিক সংকটে মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। প্রতিটি হামলার পর এ ধরনের কর্মপন্থা খুবই স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়। অন্যদিকে ইন্টারনেটের সার্চ ইঞ্জিনগুলোতে সন্ত্রাস ও সহিংসতা শব্দ সার্চ করলেই তার সাথে ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে সম্পর্কিত কোনো কী ওয়ার্ড চলে আসে।
পাশ্চাত্যের ইসলামোফোবিয়া
পাশ্চাত্যের ইসলামোফোবিয়া আজকের নয়। নাৎসি জার্মানির জাতীয়তাবাদী চিন্তার প্রধান অনুঘটক বর্ণবাদ এবং এন্টিসেমেটিজম। ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা এই ইসলাম-বিদ্বেষ থেকে ইউরোপ এখনো মুক্ত হতে পারেনি। বরং শরণার্থী ও ভিনদেশিদের প্রতি বর্ণবাদী আক্রমণ সত্তর ও আশির দশকে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তারপর নব্বই এর দশকে এটার তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পেতে পেতে উপস্থিত হয় ২০০১ সালের এগার সেপ্টেম্বর। এই তারিখের পর থেকে শরণার্থী, বহিরাগত ও বিদেশি বিশেষত মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতা বহুমাত্রিকতা পায়। ইউরোপজুড়ে মুসলিমদের ওপর হামলা শুরু হয়। এরপর থেকে পশ্চিম গোলার্ধের এই অঞ্চলটি ইসলামবিরোধী একটি বিশেষ পরিমণ্ডলে রূপ নেয়। গত কয়েক বছর থেকে রাজনীতিবিদরা বিশেষত চরম ডানপন্থিরা তাদের নির্বাচনি প্রচারণায় ইসলামোফোবিয়াকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করছে। যেমন- ফ্রান্সের জাতীয়তাবাদী দল, অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টি, বেলজিয়ামের ফালামিস পার্টি ও সুইডেনের সুইডিশ পার্টিসহ আরও অনেক দেশের অনেক দল রয়েছে। তাছাড়া গত পনেরো বছরে খোদ মধ্যপন্থি দলগুলোও ইসলামোফোবিয়ার বিভিন্ন বক্তব্যকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কোথাও তো ইসলামবিরোধী আইন কার্যকর করেছে মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ইসলাম-বিরোধী আইনের কারণে মিনার নির্মাণে নিষেধাজ্ঞাসহ মসজিদ বন্ধ করা হয়েছে। মুসলিম নারীদের হিজাবের প্রতি নিষেধাজ্ঞা প্রদানের পাশাপাশি মুসলিম কমিউনিটিকে পর্যবেক্ষণে বিশেষ আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে। অপরদিকে অস্ট্রিয়ার ইসলামবিরোধী আইনের মতো বিভিন্ন বর্ণবাদী আইনেরও স্বীকৃতি দিচ্ছে বিভিন্ন দেশ। এসবকিছুই একজন মুসলিমকে পাশ্চাত্য সমাজ ও সভ্যতার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করছে।
এখানে বর্ণবাদ-পাঠে একটি গভীর দৃষ্টিভঙ্গি দৃষ্টিগোচর হয়। বর্ণবাদ কখনো বর্ণবাদের শিকার ব্যক্তিদের সামনে আনে না। বরং তারা সবসময় সামনে আনে বর্ণবাদীকে। বর্ণবাদী শুধু তার বক্তব্যই বলে যায়। কিন্তু বর্ণবাদের শিকার ব্যক্তি কিন্তু তার কোনোকিছু বলার সুযোগ পায় না। উদাহরণস্বরূপ- সবসময় মানুষের মনে একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়, সুইডেনে মিনার নির্মাণ- বিরোধীদের কথাই গণমাধ্যমে আসে। 'এখানে বলতে গেলে মুসলিম নেই বা খুবই অল্প। এ অঞ্চলে মসজিদের প্রয়োজন নেই।' এভাবে ব্যক্তি-স্বার্থ হাসিলের জন্য রাজনীতিবিদরা ইসলামোফোবিয়াকে ব্যবহার করে। ২০১৫ সালে অস্ট্রিয়ার সাধারণ নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টি তাদের নির্বাচনি প্রচারণায় 'শরণার্থী ও ইসলামায়নের বিশৃঙ্খলা কিছুতেই চলতে দেয়া হবে না'- এই শিরোনাম ব্যবহার করে।
বর্তমানে তো ইসলামোফোবিয়া একটি নতুন আদর্শ খুঁজে পেয়েছে। ইসলামোফোবিয়ার সমর্থকরা নিখাঁদ খ্রিস্ট রাজ্য নির্মাণের ইচ্ছা পোষণ করছে। কিছুদিন আগে এস্তোনিয়ার রক্ষণশীল সমাজকল্যাণমন্ত্রী খ্রিস্টান শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর যৌক্তিকতায় একপর্যায়ে দাবি করেন, 'যাই হোক আমরা খ্রিস্ট সভ্যতার সাথে সংশ্লিষ্ট একটি দেশে আছি।'
পোল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইফা কোপাকজ তার দেশকে খ্রিস্টান রাষ্ট্র বলে অভিহিত করেন। খ্রিস্টান জনগণকে সাহায্য করা পোল্যান্ডের দায়িত্ব বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রকৃতপক্ষে এটা কোনো বিচ্ছিন্ন দাবি নয়। বরং এর গভীর কারণও রয়েছে।
পোল্যান্ডের অভিবাসন এজেন্সি জানায়, 'শরণার্থীদের আবেদন গ্রহণে ধর্মীয় ব্যাকগ্রাউণ্ড যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে। হাঙ্গেরিতে বিশালসংখ্যক শরণার্থী মানুষ রয়েছে। দেয়ালহীন ইউরোপের ঐক্যের প্রতীক বহুজাতিক তত্ত্ব আজ হুমকির মুখে।'
হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ফিকো জানান, 'যারা দেশে ঢুকছে, এরা অন্য ধর্মের অনুসারী। তারা পুরোপুরি ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। এদের অধিকাংশ খ্রিস্টান নয়, এরা মুসলিম' এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- ইউরোপ এবং ইউরোপের পরিচিতি কি খ্রিস্টধর্মের প্রচার-প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ? উল্লিখিত বক্তব্যগুলোর ভেতর স্পষ্টভাবেই মুসলিম শরণার্থীকে আলাদা রাখা হয়েছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, 'আমরা তাদের প্রবেশ করতে দেবো না। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের দেশে এত সংখ্যক মুসলিম শরণার্থী না নেয়ার সিদ্ধান্তে পূর্ণ অধিকার আমাদের আছে।' ৭৮

টিকাঃ
[*] ইংরেজি প্রবন্ধ অবলম্বনে

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ফোবিয়ার চ্যালেঞ্জে ইসলাম

📄 ফোবিয়ার চ্যালেঞ্জে ইসলাম


ক্রুসেড যুদ্ধেকে নিরূপদ্রব চালিয়ে যাওয়ার জন্য জর্জ বুশের চেতনাদীপ্ত বাণীই হোক অথবা নবি আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর কঠোরতর প্রশিক্ষণের কালিমালেপন কিংবা জিহাদকে হিংস্রতা বলে ব্যক্ত করার কার্যত কৌশল- এই সবকিছুর পেছনে একটা উদ্দেশ্যই নিয়ামক। ইসলামকে একটি বর্বর ধর্মাদর্শ সাব্যস্ত করে বিশ্বব্যাপী তার গ্রহণযোগ্যতাকে বাধাগ্রস্ত করা।
এতদসত্ত্বেও যে ইসলাম একটি শান্তি, শৃঙ্খলা, মধ্যমপন্থি এবং সহজতর মাযহাব। কঠোরতা, বিশৃঙ্খলা, স্বেচ্ছাচারিতা, গোঁড়ামি হুলুস্থুল যতো কর্মযজ্ঞের সাথে ইসলামের সম্পর্ক তেমনই; যেমন সম্পর্ক আঁধারের সাথে আলোর। দিনের সাথে রাতের এবং সত্যের সাথে মিথ্যার। ফিরে দেখা ইতিহাসে পশ্চিম এবং ইসলামের এই অন্তর্দ্বন্দ্ব তো যথেষ্ট প্রাচীন ও সেকেলে।
ইসলামের বিস্তৃতির পর থেকেই খ্রিস্টানবিশ্ব মুসলমানদের ওপর ক্রুসেডের নামে; এক-দুটি নয়, সাত-সাতটি ক্রুসেড যুদ্ধ চাপিয়েছে।
পরবর্তীতে সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ূবীর বিজয়ের মাধ্যমে সেই ধারার সমাপ্তি ঘটে। সেসময় সম্রাট নবম লুই مسلمانوں হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভের পর পশ্চিমাদের উপদেশ প্রদান করেছিলেন যে, 'যদি তোমরা مسلمانوں ওপর বিজয় লাভ করতে চাও; তবে তোমরা যোদ্ধা বাহিনী তৈরির পরিবর্তে তাদের আক্বিদার ওপর আঘাত করো। যাতে করে مسلمانوں ভবিষ্যৎ বংশধররা পাকা ফলের মতো তোমাদের ঝুড়িতে এসে পড়ে।' সম্রাট ফ্রান্সিসের ওই উপদেশের ওপর ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের থেকে orientalist এবং ঈসায়ী মুবাল্লিগরাই বেশি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। রোমের পোপের; ইসালাম এবং পয়গম্বরে ইসলাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর আরোপিত ভিত্তিহীন অভিযোগ, এরই ধারাবাহিকতার অংশ।
বিশেষত তার এই আপত্তি যে, 'পৃথিবীতে ইসলাম তরবারির জোরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।' এই প্রচারণারই একটা অংশ; যা পশ্চিমারা ইসলামের বিরুদ্ধাচরণের জন্য তুলে রেখেছে। চিন্তা ও কাজের দিক থেকে যার উদ্দেশ্য ইসলামের মোকাবিলায় পিছ পা হওয়ার পর; পৃথিবীকে তার ব্যাপারে পথভ্রষ্ট করা। অতীতে এমনতরো অপবাদের দালিলিক জবাব উলামা, ফুকাহারা দিয়েছেন। হিন্দুস্থানে আল্লামা শিবলী নু'মানী 'সিরাতুন্নাবী' লিখে পয়গম্বরে ইসলাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মানবিক বৈশিষ্ট্য এবং চিন্তার ব্যাপকতা সাব্যস্ত করেছিলেন। স্যার সৈয়দ রহ. ও যুগের বদনাম এবং উইলিয়াম ম্যুরের সিরাতুন্নাবীর ওপর করা কতক আপত্তির জবাব দিয়েছেন। অন্যান্য মুফাক্কিরে ইসলামরাও ইসলামের ওপর আরওপিত বিশেষত 'ইসলাম তরবারির জোরে পৃথিবীতে বিস্তৃত হয়েছে' অভিযোগের প্রশান্ত জবাব দিয়ে একথা স্পষ্ট করেছেন যে, ইসলাম তার প্রকাশকাল থেকেই শান্তির মাযহাব ছিল।
পৃথিবী অবগত আছে যে, মক্কা মুকাররমা যেখান থেকে ইসলামের রবি প্রথম বিকিরিত হয়েছে, সেখানে তরবারি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে নয়; বরং তাকে অমান্যকারীদের কজায়ই ছিল। নবিয়ে পাক সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যেই প্যানেল যুদ্ধবাজের তকমা লাগায়; তারা ওই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে যে, হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৫৩ বছর বয়স অব্দি যুদ্ধ তো দূরের কথা; তরবারিই হাতে নেননি। এমনকি তখন আরব সংস্কৃতিতে যুদ্ধ-বিগ্রহ ব্যাপক ছিল। প্রত্যেকেই অল্প বয়সে সৈনিক হিসেবে গড়ে ওঠতো। জীবনের শেষ লগ্নে এসে; মদিনায় অবস্থানকালে হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সেসব রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়েছে; তারা তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধের ময়দানে আগমণ করেন। তখন তিনি যুদ্ধকে ইবাদত বানিয়ে দেন। আদেশ জারি হয় যে, মহিলা, বাচ্চা, বৃদ্ধা-বৃদ্ধ, অসুস্থ এবং ইবাদতখানায় আশ্রিত কারো ওপর যেন হাত ওঠানো না হয়! ঐশ্বরিক ফরমান ছিল, শুধু তাদের সাথেই যুদ্ধ কর; যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধে উদগ্রীব। তাকিদ করেছেন যে, যদি প্রতিপক্ষ সন্ধি করতে চায় তবে তাদের সন্ধি-প্রস্তাব কবুল করে নাও।
নবিয়ে রহমত সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যাখ্যা করেন যে, যুদ্ধের উদ্দেশ্য বুঝে নাও। এটা না গণিমতের সম্পদ লাভের জন্য; আর না সক্ষমতা অর্জনের। কুরআনে জিহাদের উদ্দেশ্য এমন করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, যদি আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে একদলকে অপর দলের মাধ্যমে দমন না করতেন; তাহলে পাদ্রীদের খানকা, ইহুদি এবং নাসারাদের উপাসনালয় এবং मुसलमानों মসজিদ; যাতে অধিক পরিমাণে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয়, সবই ধ্বংস হয়ে যেতো। এজন্যই জোর গলায় এই দাবি উত্থাপন করা যায় যে, মুসলমানরা যেখানেই তরবারি উত্তোলন করুক না কেন; তাদের উদ্দেশ্য কেবলই নিজেদের এবং মজলুমদের তরফ থেকে প্রতিরোধই ছিল। অমুসলিমদের জোরপূর্বক ইসলামে দিক্ষিত করা মোটেই নয়। পাশাপাশি এমন একটি পরিবেশ গড়ার ইচ্ছে ছিল। যেখানে সমূহ মতবাদের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকবে। এবং সেসব ধর্মানুসারীরা কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই নিজেদের ধর্মীয় বিধান নির্বিঘ্নে পালন করতে পারবে।
রাসূল সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গোটা জীবনই বিশ্ববাসীর সামনে রয়েছে। যেখান থেকে এমন একটা উদাহরণও দেয়া যাবে না যে, কাউকে ইমান আনতে জবরদস্তি করা হয়েছে। কারণ এটাই, مسلمانوں অনেক নিকটাত্মীয়দের মৃত্যুও কুফর অবস্থাতেই হয়েছে। মক্কার কাফেরই হোক বা ইহুদি সম্প্রদায়; তারা ইসলামের মতো শান্তি আর ভাতৃত্বের ধর্ম এবং তাদের নীতি-নির্ধারকদের বিরোধিতা এজন্যই করেছেন যে, তারা বুঝতেন যে, মানবিক সমতা ও ভারসাম্যতার এই আন্দোলন; শতবর্ষ ধরে চলমান। এবং এই আন্দোলনই তাদের কর্মযজ্ঞ নিষ্ফল করে দেবে। ফলে মদিনায় যে উচ্চতর উসূলের উপর ইসলামি রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাকে বিচারকের আসনে বসার পূর্বেই নিষিদ্ধ করে দেয়া হবে। এই লক্ষ্যেই যুদ্ধের সিলসিলা শুরু হয়। ব্রিটিশ লেখক লর্ড রেডলে উল্লেখিত যুদ্ধের খুঁটিনাটি টেনে লিখেছেন যে, সেসব যুদ্ধে আহত ব্যক্তিকে আর কেই-বা আহত ব্যক্তির মোকাবিলা করছিল; যুদ্ধের সিলসিলার সূচনাতে তাকালেই সেটা জানা যায়।
বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয় একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধ। মদিনা থেকে যার দূরত্ব ২৩ মাইল। মদিনা থেকে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে মক্কার কাফেররা সেখানে পৌঁছেছিল। দ্বিতীয় যুদ্ধ, উহুদ। উহুদ প্রান্তরে সংঘটিত হয়। যেটা মদিনা থেকে ১২ মাইল দূরত্বে অবস্থিত। সেই যুদ্ধের আক্রমণ সূচনা মক্কার কাফেররাই করেছিল। তৃতীয় যুদ্ধ, গাজওয়ায়ে আহযাব। যেই যুদ্ধে ইসলামের সব দুশমনরা বিশেষত ইহুদিরা মদিনা অবরোধ করে রেখেছিল। এই তিনটি যুদ্ধে একটি বিষয়ই সাব্যস্ত হয় যে, আক্রমণকারীরা মুসলমান ছিলনা। তাদের প্রতিপক্ষ ছিল। আর প্রতিরক্ষার দায়িত্বই কেবল মুসলমানরা পালন করেছিল। এটাও চিন্তার বিষয় যে, মুসলমানরা শক্তি অর্জনের পর; প্রথমবারেই যুদ্ধের জন্য নয়; বরং হজ্জ আদায়ের জন্য মক্কায় যাওয়ার ইচ্ছা করেছিল। অথচ তারা তাদের বাহুর শক্তিবলেই চাইলে সেখানে পৌঁছতে পারতো! তবুও মক্কাবাসীরা তাদের তখনই প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। বরং একবছর পরের শর্তজুড়ে দেয়। হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য; মক্কাবাসীদের সমস্ত শর্ত মেনে নেন।
হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শৃঙ্খলাপ্রীতির এরচেয়েও বড়ো দৃষ্টান্ত হলো সে সময়ের; যখন হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম مسلمانوں বিরাট সৈন্যবাহিনীর সাথে বিজয়ীর বেশে নিজের পুরনো ভূমি মক্কায় প্রবেশ করেন। তো, যারা তাকে মক্কা থেকে বের করেছিল। তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন। যুদ্ধ এবং রক্তপাত তো দূরের কথা; ইসলামের কোনো শত্রুরই গায়ে একটা আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি। তাদের জীবন এবং ধন- সম্পদ নিরাপদ থাকে। এর থেকে বেশি ইসলামের নিরাপত্তাপ্রীতি এবং নবি সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মানবিক সম্মাননা প্রদানের দলিল, আর কিই-বা হতে পারে! বর্তমান ইসলামি বিশ্বের মানচিত্রে যদি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যায়; তাইলেই জানা যাবে যে, সেখানকার কিছু অঞ্চল এমন রয়েছে যে, যেখানে কখনোই মুসলমানরা যুদ্ধের জন্য সৈন্য প্রস্তুত করেনি।
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ এবং আফ্রিকার অনেক ভূখণ্ডেই আরব বণিক এবং উলামায়ে কেরামদের মাধ্যমে ইসলামের আলো পৌঁছে। হিন্দুস্তানের দিকে এমন অনেক অঞ্চল রয়েছে; যেখানে সর্বপ্রথম সুফিরাই তাদের তাঁবু স্থাপন করেন। এবং চারিত্রিক তেজস্বীতায় মানুষের দিল জয় করে নেন। হযরত খাজা মঈন উদ্দীন চিশতী, খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী এবং মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরীদের হাতে লাখো মানুষ ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন। এই অন্তরজয়ী কাফেলা মানুষদের মুহাব্বতকারী তরবারি দিয়ে কাবু করার বিদ্যে জানতেন।
আজকাল আমেরিকা, ইউরোপে ইসলাম গ্রহণের যে প্রবাহ চলমান; তার নেপথ্যে কোন্ শক্তি এবং জুলুম ক্রিয়াশীল আছে? এটি ইসলামের সাধারণত নীতিশ্রদ্ধা এবং চিন্তাশক্তিরই নিছক একটি ঝলক। সেখানে এই ধর্মমতের প্রতি চৈন্তিকদের আগ্রহের প্রবাহ ক্রমশই বাড়ছে। ইসলামোফোবিয়ায় আকণ্ঠ ডুবে থাকা পশ্চিমা সম্প্রদায়ও আলোচিত বাস্তবত্ সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিবহাল। কিন্তু ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা তাদের এ বিষয়ের ওপর অপারগ করছে যে, তারা ইসলামের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ইমেজের প্রকাশ ঘটাবে! তাদের নিকট পৃথিবীতে কমিউনিজমের পরাজয়ের পর ইসলামই সবচে বড়ো হুমকির কারণ। বর্তমানে আমেরিকা এবং ইউরোপে হাজার হাজার লোক ইসলাম গ্রহণ করছে। বিগত কয়েক বছরে মাজারেরও অধিক আমেরিকান সৈন্য ইসলাম গ্রহণে ধন্য হয়েছেন। এটা কোনো ধরনের জুলুম বা উদ্বুদ্ধের ফলাফল নয়। বরং ইসলামি শিষ্টাচার, দৃষ্টিভঙ্গি এবং উত্তম নীতিরই প্রভাব। ইসলামের সৌন্দর্য যতোটুকুই উদ্ভাসিত হচ্ছে; মানুষও ঠিক তেমনই ইসলামের দিকে ঝুঁকছে। মিথ্যা, অপবাদ এবং প্রোপাগান্ডীয় এজেন্ডার কার্যত কোনো স্থায়িত্ব নেই। সবশেষে তাদের সত্যের সামনেই মাথা পেতে নিতে হয়। ইসলামের গুরুত্ব ফিলহাল এজন্য বাড়ছে যে, পশ্চিমা এবং তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি দীর্ঘকাল ধরেই মানবজীবনের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা এটাই প্রথম এবং একমাত্র সভ্যতা; যা কার্যত বর্ণবাদী। এবং প্রান্তিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই অধুনিক সভ্যতা মানুষদের অগণিত মাসআলার শিকারে পরিণত করে। বঙ্কবৃদ্ধি, পারস্পরিক সম্মানবোধের অভাব, সত্তাগত কুপথ-গমন এবং পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে সামগ্রিক এবং ব্যক্তিগত শোষণ বা নির্যাতনই তার ফলাফল। এই সভ্যতাকে ঠিক ঈসায়ী সভ্যতাও বলা যায় না। কেননা ওটা আধুনিক ভাবাদর্শের জনক। এবং যতোক্ষণ পর্যন্ত না ওখানে ঐশ্বরিক শক্তিকে জায়গা দেয়া যাচ্ছে; এই সভ্যতা এমনিভাবে পরাজিত হয়েই থাকবে।
ইসলামোফোবিয়ার চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার জন্য যেখানে উল্লিখিত বাস্তবতার প্রসিদ্ধি এবং প্রচার জরুরি; সেখানে ইসলামের সৌন্দর্য এবং বরকতের ব্যাপারে পশ্চিমাদের পরিচিত করানোও উপকারী হবে। কেননা অভিজ্ঞতাবলেই এ বিষয়টি পরিস্ফুট হয়েছে যে, যারা ইসলামের শিক্ষায় প্রভাবিত হয়ে এর চর্চা শুরু করে দেয়; তারা খুব দ্রুতই সেটাকে গ্রহণ করে নেয়। এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা পেরেশানই থেকে যায় যে, পশ্চিমাদের মুক্তচিন্তা, মানুষ নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছাকে ছেড়ে একটা ধর্মাদর্শের অনুসরণকে কেন আপন করে নিচ্ছে! পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা; এই মগজ-গ্রথিত বিষয়-সমাধানে এজন্য ব্যর্থ হয়েছেন যে, তারা প্রথমত. ইসলামকে কঠোরতার নজরে দেখতো। দ্বিতীয়ত. জেহেনকে আপন কব্জায় রেখে ইসলামের চর্চা করতো। সামগ্রিক অবস্থায় ইসলামের দাওয়াত অথবা তার ইতিবাচক পরিচিতিই সেই মাধ্যম, যেটা 'ইসলামোফোবিয়া'র ভিত্তিকে দুর্বল করে পতন ঘটাতে সক্ষম।

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 কাভারিং ইসলাম: ইসলামোফোবিয়ার পাঠ্য

📄 কাভারিং ইসলাম: ইসলামোফোবিয়ার পাঠ্য


ইসলাম একটি আদর্শিক জীবব্যবস্থা, যার শক্তিশালী সংস্কৃতি রয়েছে। এটি অদ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যযুক্ত একটি বিশ্বাস। প্রাগতৈহাসিক কাল থেকে সভ্যতার অগ্রযাত্রায় ইসলামের ভূমিকা অত্যুজ্জ্বল। সাহিত্য, আইন, রাজনীতি, ইতিহাস ও শিল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে ইসলামের রয়েছে অসামান্য অবদান। ইসলাম তার আবেদন নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী। এককথায় এটি মন এক জীবনবিধান যা, ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক সীমানা মাড়িয়ে বিস্তৃতি লাভ করেছে আফ্রিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এমনকি পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকায়ও। ফলত সব মানচিত্রে ছড়িয়ে পড়েছে এর অনুপম প্রাণশক্তি। কিন্তু বিশ্বব্যাপী পশ্চিমের অনুদার ও সংকীর্ণ প্রচারণার অনিবার্য ফলস্বরূপ ইসলাম ও এই বিশ্বাসের অনুসারীদের যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তার নগদ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে 'ইসলামোফোবিয়া'। গোয়েবলসের এর 'প্রোপ্যাগান্ডা' তত্ত্বমতে একটি মিথ্যাকে বারবার প্রচার করা হলে সেটিই সবার কাছে সত্য বলে গ্রহণীয় হয়। আর দর্শকদের এই মহাজধোলাইকে সহজ করে দেয় কিছু বায়াজড মিডিয়া।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভত্তিক কিছু গণমাধ্যমের ইসলাম ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদের একটি বিশ্লেষণে দেখা যায় তারা ৯৪.১২ শতাংশ সংবাদ করে থাকে "এন্টি-ইসলামিক সেন্টিমেন্ট” উসকে দেওয়ার জন্য। এসব সংবাদ দেখে দর্শকরা ইসলামকে সন্ত্রাসের ধর্ম মনে করবে সেটাই স্বাভাবিক। ইসলামোফোবিয়া হল ইসলামের বিপরীতে ভীতি সৃষ্টি করে যুদ্ধ, লুটপাট ও গণহত্যার সমর্থন আদায় করার একটি সহজ পদ্ধতি। মুসলমানদের বর্বর-সন্ত্রাসী হিসাবে পরিচয়ের কারণেই ইসলাম ধর্মের অনুসারী মৃত্যুবরণ করলে অথবা বৈষয়িক ক্ষয়-ক্ষতির শিকার হলে অনেকেই আনন্দিত হয়, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলে অনেকেই তাতে সমর্থন দেয়। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব মিডিয়ায় উপস্থাপিত ইসলাম নিয়ে। এই আলোচনার বিষয়বস্তুকে সামনে রেখে আমরা এক নজর বুলিয়ে আসব এডওয়ার্ড সাঈদের 'কাভারিং ইসলাম' বইয়ে।
এডওয়ার্ড সাঈদ ১ নভেম্বর ১৯৩৫ সালে ফিলিস্তিনের জেরুসালেমে জন্মগ্রহণ করেন। ৭৯ বিশ্বাসগত দিক থেকে তিনি ছিলেন পোটাস্ট্যান্ট ধর্মের অনুসারী।
শ্বেতবর্ণের এই লোকটি পেশায় ছিলেন একজন শিক্ষক, দার্শনিক। সত্যউচ্চারণে নির্ভীক সাঈদ ছিলেন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। সাঈদকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। সাঈদ একজন বাস্তববাদী অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তি। সত্যিকারের একজন জানা মানুষের দায়িত্ব তিনি সমগ্রজীবন পালন করেছেন। তার অবস্থান ছিল ন্যায় ও ন্যায্যতার পক্ষে। তার সবচেয়ে বিখ্যাত কর্ম হচ্ছে, ওরিয়েন্টালিজম। চিন্তার জগতে বিপ্লব সৃষ্টিকারী এই গ্রন্থটি রচিত হয় ১৯৭৮ সালে। প্রাচ্যকে নিয়ে পাশ্চাত্যের সুদূরপ্রসারী ও সুগভীর কলাকৌশলগুলো তিনি চিত্রিত করেছেন এই বইয়ের পৃষ্ঠাজুড়ে। ওরিয়েন্টালিজম সারাদুনিয়ার বুদ্ধিজীবী মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওরিয়েন্টালিজমের মাধ্যমে সাঈদ প্রাচ্যতন্ত্রের স্বরূপ উদঘাটন করে এ বিষয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তার আরেকটি বিখ্যাত বই হচ্ছে, 'কাভারিং ইসলাম: হাউ দ্য মিডিয়া এন্ড দ্য এক্সপার্টস ডিটারমাইন হাউ উই সি দ্য রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড'।
কাভারিং ইসলাম বইয়ে তিনি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেন, পশ্চিমের কর্পোরেশনগুলো কীভাবে তাদের মিডিয়াকে ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। তার গভীর অনুসন্ধান পাশ্চাত্যে ইসলাম ও مسلمانوں সম্পর্কে পূর্ব থেকে চলে আসা অনৈতিক অথচ জোরালো প্রচারণার স্বরূপ তুলে ধরেছে। বিশেষত ইউএসএ মিডিয়ার সংকীর্ণ অভিব্যক্তির বাদানুবাদ করে সাঈদ শক্তিশালীভাবে ইসলামের অবস্থান তুলে ধরেছেন। সাঈদ দেখিয়েছেন, পশ্চিমের তাঁবেদার গোষ্ঠী যাদের মাঝে আবার অনেক ইসলামিস্টও রয়েছেন, মূলত তারা ওরিয়েন্টালিস্ট [প্রাচ্যবিদ] বলেই খ্যাত, এরা ভিন্নধারার ইসলামিক দৈত্যের উপকথা হাজির করেন।
সাঈদ এখানে তুলে ধরেন কেন পাশ্চাত্য জগতে ইসলাম এবং আরব বিশ্বকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেমনটা তারা নয়! কেন পাশ্চাত্য মিডিয়াতে ইসলাম ও আরব বিশ্বের লোকদের নামে প্রোপাগান্ডা করা হয়! ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সাথে পাশ্চাত্য দুনিয়ার এমন কি সমস্যা ছিল যার জন্য খোমেইনীর বিপ্লবকে পাশ্চাত্যে ভালোভাবে দেখা হয়নি! কেন ইহুদী এবং খ্রিস্ট ধর্মের কাছাকাছি ধর্ম সত্ত্বেও ইসলামকে অতিরঞ্জিত প্রদর্শনীর মাধ্যমে দানবীয় এবং সন্ত্রাসী ধর্মে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়!
এই গ্রন্থটিতে সাঈদ দাবি করেছেন, পাশ্চাত্য জগতে ইসলামের প্রদর্শনী কোন নতুন বিষয় নয়। সাঈদ তার ওরিয়েন্টালিজমের উদ্ধৃতি টেনে এই গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কীভাবে ইতালির বিখ্যাত মহাকাব্যিক দান্তে তার “ডিভাইন কমেডিতে” রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে 'নরকে' পাঠিয়েছিলেন, যেখানে দান্তের কমেডিতে সাম্রাজ্যবাদী রোমান সম্রাট ট্রজানের অবস্থান ছিল স্বর্গে।
এছাড়াও সাঈদ বর্ণনা করেছেন, কীভাবে রাজনৈতিক প্রয়োজনকে বৈধতা দিতে পোপ দ্বিতীয় আরবান ধর্মের নামে খ্রিস্টান্দের ইসলামের বিরুদ্ধে ক্রুসেডে পাঠিয়েছিলেন। তিনি জানান দিয়েছেন, এরকমটা ভাবার কোন কারণ নেই যে, ধর্ম হিসেবে পাশ্চাত্য জগতের সাথে ইসলামের কিংবা নবি মোহাম্মদের সাথে পাশ্চাত্যের কোন সমস্যা আছে। পাশ্চাত্যের প্রধাণ সমস্যা হল, ইসলামের অনুপম আদর্শের সাথে।
সাঈদ দেখিয়েছেন কীভাবে উত্তর-আধুনিক যুগে পাশ্চাত্য বিশ্বের তেলের চাহিদা পূরণের জন্য ইসলামের বিরুদ্ধে প্রোপাগাণ্ডা লিপ্ত তারা। উদাহরণস্বরূপ তিনি উল্লেখ করেছেন, পাশ্চাত্য বিশ্বের দুই তৈলশিকারী ডব্লিউ টাকার এবং ডি পি মইনিহানের প্রতিবেদনের কথা। যারা তাদেরে রচনাতে প্রমাণ করতে চেয়েছেন মুসলিম রাষ্ট্রগুলো তেলের দাম বৃদ্ধি করে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে তেল আমদানি ও রপ্তানিতে বাঁধার সৃষ্টি করছে। এজন্য তারা সুপারিশ করেছে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে যেন সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সাঈদ বিশ্বাস করতেন, “মানবজাতি সে বিষয়ের প্রতি সবচেয়ে বেশী সচেতন হয়, যা তারা বাস্তব অভিজ্ঞতার দ্বারা উপলব্ধি করে, এবং তাদের এই অভিজ্ঞতা হয় পরোক্ষ, যা তারা অন্যদের থেকে পায়।"- এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সাঈদের দাবি, পাশ্চাত্য মিডিয়ার কল্যাণে লোকে ইসলাম সম্বন্ধে অসত্য এবং বানোয়াট ধারণা গ্রহণ করে। এই মিডিয়ার উপকরণগুলো হল, টেলিভিশন, রেডিও, দৈনিক সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, চলচ্চিত্র, প্রতিবেদন, প্রবন্ধ, গ্রন্থ ইত্যাদির মাধ্যমে।
সাঈদ এই গ্রন্থটিতে আরও ব্যাখ্যা করেন, ইরানের ইসলামি বিপ্লব না ছিল সমাজতান্ত্রিক, না পুঁজিবাদী, তবুও পাশ্চাত্য মাধ্যম এই বিপ্লবের সাথে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল, কারণ খোমেইনীর পূর্ববর্তী শাহ শাসকেরা আমেরিকার পুতুল হয়ে থাকার শপথ করেছিল, যা খোমেইনী মেনে নেননি। যার দরুন পাশ্চাত্য মিডিয়া ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে সনাতন প্রোপাগান্ডা শুরু করেছিল, এবং বলেছিল, নবি মোহাম্মদ ভন্ড নবী (আল্লাহ আমাদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন), আয়াতুল্লাহ বিংশ শতাব্দীতে আল্লাহ্ ছায়া। আমেরিকার টিভি চ্যানেল এবিসি এসময় পর্দা, মোল্লাহ, শিয়া, সুন্নী ইত্যাদি ব্যাপারগুলোকে খুবই বাজেভাবে উপস্থাপন করে।
সাঈদ তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে সেসকল ঘটনাবলির সর্বোৎকৃষ্ট ইলাস্ট্রেশন করেছেন, যেখানে দেখানো হয়েছে বিপ্লব পূর্ব ইরানের সাথে আমেরিকার মধুর সম্পর্ক এবং একই সাথে সাম্প্রতিক সময়ে ইরান সংকট পাশ্চাত্যমিডিয়ায় কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষত ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, যার উদ্যেক্তা মূলত পশ্চিমা দুনিয়া। নিউইয়র্ক পোস্ট-এর বরাত দিয়ে তিনি জানান, নিউইয়র্ক পোস্টের সিনিয়র রিপোর্টার জর্জ কারপুজি। কারপুজি নিজস্ব যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে খোমেনির ইসলামি সরকার বই প্রসঙ্গে দাবি করেন, খোমেনি ও হিটলার প্রায় সমকক্ষ। মানে, সেই যুগের এডলফ হিটলারের মতো আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনিও একজন অত্যাচারী, স্বেচ্ছাচারী ও শান্তি বিঘ্নকারী শাসক। মেইন ক্যাম্পের-এর লেখক আর ইসলামি সরকার-এর লেখকের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে, একজন নাস্তিক, অন্যজন নিজেকে আল্লাহরমানুষ বলার ভান করেন।
সাঈদের মতে, ১৯৮৩ থেকেই দেখা যায় মুসলিম সন্ত্রাসীরা পাশ্চাত্য মাধ্যমের সর্বত্র বিবৃতি দিয়ে বেড়াচ্ছে ইসলামের প্রতি তাদের আস্থা ও বিশ্বাস সম্বন্ধে, যেমনটা আগে লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু বাস্তবতা ছিল এই যে এদের মদতদাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই ছিল পাশ্চাত্য গণমাধ্যমের কার্যাদির দিকনির্দেশক। যে নির্দেশকের পরামর্শে পাশ্চাত্য মিডিয়ার বিশেষ কৃপায় লোকে জানতে পেরেছিল, ১৯৯৫-এ ওকলহামা সিটিতে মুসলিম সন্ত্রাসীরা বোমা বিস্ফোরন করেছে; যদিও এই কর্ম অন্য সন্ত্রাসী গ্রুপ দ্বারা সাধণ হয়েছিল।৮০
সাঈদ তার কর্মে উল্লেখ করেছেন ১৯৮০ এর দশক থেকে হলিউডের চলচ্চিত্রগুলোতে, যেমন “প্রিন্সেস এপিসড”, “ডেল্টা ফোর্স”, “ট্র লাইস”, “জিহাদ ইন আমেরিকা” আরব বিশ্বের লোকেদের জীবনধরণ ও সংস্কৃতি নিয়ে কীভাবে ভ্রান্ত প্রদর্শনী শুরু হয়েছিল। এসমস্ত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে গোটা দুনিয়া জেনেছিল আরবরা নিষ্ঠুর, কট্টরপন্থী, কুৎসিত, সন্ত্রাসী, আত্মঘাতী বোমাবিস্ফোরণকারী।
পশ্চিমা মিডিয়া আমাদেরকে একথা বিশ্বাস করাতে চায়, তৃতীয় বিশ্বের প্রতিবাদী ও সচেতন আন্দোলনগুলো, বিশেষ করে ধর্মীয় পরিচয় বহনকারী আন্দোলনগুলো মূলত ইসলামি জঙ্গিবাদী আন্দোলন। ব্রিটিশ বা ফরাসি প্রচারমাধ্যম থেকে মার্কিন প্রচারমাধ্যম একটু ভিন্নধর্মী। পশ্চিমা সমাজ, ভোক্তা গোষ্ঠী, সংগঠন ও তাদের স্বার্থও ভিন্নধরনের। প্রত্যেক মার্কিন সাংবাদিকের মাথায় একটা কথা সবসময় উপস্থিত থাকে, তার দেশ পৃথিবীর একমাত্র পরাশক্তি, যার নির্দিষ্ট স্বার্থ রয়েছে এবং সেই স্বার্থ হাসিলের দায়িত্ব তার আছে; অন্য দেশের লোকদের-সাংবাদিকদের মাথায় এসব চিন্তা থাকে না। প্রত্যেক মার্কিন সাংবাদিক বিশ্ব সম্পর্কে প্রতিবেদন তৈরি করার সময় এ ব্যাপারে সচেতন থাকেন, তার চাকরিদাতা কর্পোরেশনটিও মার্কিন ক্ষমতার অংশীদার।
স্নায়ুযুদ্ধোত্তর যুগে পাশ্চাত্য বিশ্বের বুদ্ধিজীবীরা ভবিষ্যতবাণী করতে শুরু করে যে ইসলাম হবে ভবিষ্যতের জন্য আতংক। এদের মধ্যে বার্নার্ড লুইস, স্যামুয়েল হান্টিংটন, ড্যানিয়েল পাইপ ছিল সর্বাধিক অগ্রগামী। তারা দাবী করে, “আমাদের (আমেরিকার) পৃথিবী হল ইসরায়েল এবং পাশ্চাত্যের, আর তাদের পৃথিবী হল ইসলাম এবং অবশিষ্টদের, সামরিক ইসলাম হল পৃথিবীর জন্য আতংক এবং আমাদের সভ্যতার প্রধাণ শত্রু, এবং ভবিষ্যত সভ্যতার সংঘাত হবে পাশ্চাত্য ও ইসলামের মধ্যে, রাজনৈতিক ইসলাম হল সাম্যবাদ আর ফ্যাসীবাদের মত অযৌক্তিক এবং অসন্তোষজনক।” এ ধরণের অযৌক্তিক দাবীর জবাবে সাঈদ আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্যের উদ্ধৃতি দেন, যেখানে বলা হয়েছিল, “অপকর্মের দিক থেকে বিচার করলে আরব বিশ্বের সন্ত্রাসীদের অবস্থান পৃথিবীতে ষষ্ঠ পর্যায়ে রয়েছে।” এমনকি ২০০৮ সালের ইউরোেপলের রিপোর্টেও বলা হয়েছে ইসলামি সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসবাদের পরিমাণ .০৪শতাংশ, তবে ৯৯.৯৬শতাংশ সন্ত্রাসী অন্য ধর্মের হওয়া সত্ত্বেও তাদের ধর্মকে ধুয়া তুলশী পাতা বানিয়ে কেন কেবলমাত্র ইসলামকেই সন্ত্রাসীদের ধর্ম হিসেবে মিডিয়াতে প্রচার করা হয়?
পরিশেষে সাঈদ দাবী করেন, যেভাবে পাশ্চাত্য জগতে ইসলামকে প্রচার করা হয়, আসলে ইসলাম তা নয়। ইসলাম কি এটা বুঝা পাশ্চাত্য দুনিয়ার পক্ষে দুঃসাধ্য, যতক্ষণ না তারা ইসলামের বিষয়ে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করবে। ইসলামকে শয়তানের ধর্মে পরিণত করার জন্য আজকের পাশ্চাত্য মিডিয়া প্রকৃত ইসলামকে পর্দার অন্তরালে লুকিয়ে তাকে বহুরূপে বিভক্ত করেছে। যেমন, কট্টরপন্থী ইসলাম, গোঁড়া ইসলাম, সন্ত্রাসী ইসলাম, সহিংস ইসলাম, সামরিক ইসলাম, রাজনৈতিক ইসলাম এবং পরিবর্তিত ইসলাম। ইসলামের এই প্রতিটি রূপের আবর্তন হয় পাশ্চাত্যশক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুসারে যে কাজটি তদারকির দায়িত্ব পালন করে পাশ্চাত্য মিডিয়া। পাশ্চাত্য মিডিয়া নিজেদের প্রয়োজনে ইসলামের বিরুদ্ধে পৌরাণিক গল্প তৈরী করে এবং জনগণের মাঝে তা বিতরণ করে, যাতে লোকেরা জানে, আরবরা কল্পনার জগতে বাস করে, সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করে, ফতুয়ার চর্চা করে, ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করে, নারীর অধিকারকে স্বীকৃতি দেয় না, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল থাকে না ইত্যাদি।
সমগ্র বইটি জুড়ে সাঈদ আলোচনা করেছেন কেন পশ্চিমা মিডিয়া ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। সাঈদ বইটিতে কোন ধরণের অতিরঞ্জিত তথ্য দেননি, এবং নিজের কর্মকে প্রসিদ্ধ করার জন্য কোন ধরণের ছলনার আশ্রয় নেননি। তিনি দ্যর্থকন্ঠে দাবী করেছিলেন, কেউ জানে না, এটি হল পশ্চিমা মিডিয়া, যা ইহুদী-খ্রিষ্টানদের ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে, ইসলামকে শয়তানের ধর্মে পরিণত করার অপচেষ্টা চালায়, ইসলামকে সন্ত্রাসীদের ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করে, যার বদৌলতে লোকে জানতে ব্যর্থ হয় যে ইসলাম শান্তির উৎস; দাবী করে ইসলাম মধ্যযুগীয় ভাবধারা নিয়ে চলে, যদিও আধুনিকতার সূচনা করেছিল ইসলাম; বলে ইসলামে নারীর অধিকার নেই, যদিও এরিষ্টটলীয় দর্শনে যা বলা হত- (অপবিত্র এবং কুলষিত আত্মা থেকে যে সন্তানের জন্ম হয়, তা হল নারী) তা থেকে নারীর অবস্থার উন্নয়নের জন্য ইসলামই প্রথম নারীকে অধিকার দিয়েছিল। সাঈদ এই বইটিতে যা উপস্থাপন করেছিলেন ইসলামি দুনিয়ার প্রতি তাই ছিল পাশ্চাত্য জগতের প্রকৃত মনোভাব।
সর্ব সমেত সাঈদ সহজবোধ্য ভাষায় মন্তব্য টানেন, জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনাপ্রবাহের, যেগুলো পশ্চিমের ইসলাম সম্পর্কিত অভিজ্ঞতায় প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে। তিনি প্রাঞ্জল ভাষায় সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন মিডিয়ার রসালো সেসকল উপাদান সম্পর্কে, যা ইসলাম ও প্রাচ্য বিষয়ে পশ্চিমাদের অবস্থান নির্ধারণ করে। পরবর্তীতে ষোল বছর পর ১৯৯৭ সালে সাঈদ যখন ভিন্টেজ প্রকাশনী থেকে এই গ্রন্থটির পুনঃমুদ্রণ করেন, তখনও সাঈদ দাবী করেন, এত বছরেও মুসলিম বিশ্বের প্রতি পাশ্চাত্যের ব্যবহারের কোন পরিবর্তন আসেনি।
সাঈদ বলতে চান, মধ্যপ্রাচ্যের অমীমাংসিত বিষয়াবলি নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা দ্বিমুখী বক্তব্য, পশ্চিমের নেতিবাচক ও অবজ্ঞাসূচক দৃষ্টিভঙ্গি। অথচ এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে ইসলামের শক্তিশালী অবস্থান ও মানবিক মূল্যবোধ, যা পশ্চিমারা কখনো বলে না। তাঁর রচনাবলি পাঠ করে গভীর মননশীল ব্যক্তি মাত্র উপলব্ধি করতে পারবেন এ সময়ের নানা রাজনৈতিক ও সামরিক মেরুকরণ, ৯/১১ উত্তর পাল্টে যাওয়া বিশ্ব পরিস্থিতি ও পশ্চিমী করপোরেট সাংবাদিকতা ও প্রাচ্য তন্ত্রের স্বরূপ। নিম্মে সাঈদের একটি মতামত সংযুক্ত করা হলো। লেখাটি প্রকাশের ৪০ বছর পরও তার কথাগুলো মিলে যায় সংবাদপত্রের প্রতিটি পাতার সাথে।

টিকাঃ
[৭৯] ক্যান্সারে আক্রান্ত সাঈদ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৩ সালে পরলোকগমন করেন। লেবাননের পোটাস্ট্যান্ট সমাধিক্ষেত্রে তাকে সমাহিত করা হয়।
[৮০] 'মিডিয়া কন্ট্রোল' ও '৯/১১'-নোয়াম চমস্কি এবং 'আমেরিকাস ওয়ার অন টেররিজম'- কসডোভস্কির

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 সাঈদের দৃষ্টিভঙ্গি: মার্কিন সাম্রাজ্যে আরব ও মুসলিমদের দৃশ্যায়ন

📄 সাঈদের দৃষ্টিভঙ্গি: মার্কিন সাম্রাজ্যে আরব ও মুসলিমদের দৃশ্যায়ন


এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রতিজন মুসলিম অথবা আরব নাগরিক নিজেকে শত্রু শিবিরের সদস্য জ্ঞান করে। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, দেশটিতে মুসলমানরা পরিকল্পিত বিদ্বেষের শিকার হচ্ছে। তাদের সঙ্গে শত্রুতামূলক আচরণ করা হচ্ছে। সরকারি বিবৃতিতে বলা হচ্ছে, 'ইসলাম ও মুসলিমরা যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু নয়'; তবে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন কথাই বলছে। শত শত আরব তরুণকে আটক করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ও পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। মুসলিম অথবা আরবীয় নাম হলে রক্ষা নেই। এমন নামের মানুষ বিমানবন্দরে উপস্থিত হলেই তার প্রতি সন্দিগ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করা হয় এবং তাকে তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে জামা-কাপড় খুলেও পরীক্ষা করা হয়। মহিলাদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। আরবদের প্রতি বৈষম্যের এমন ভুরি ভুরি ঘটনা রয়েছে। কেউ আরবিতে কথা বললে অথবা আরবিতে লেখা কোন কাগজপত্র পাঠ করলে তার প্রতি কটাক্ষ করা হয়।
প্রচার মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ, ইসলাম ও আরবদের ব্যাপারে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার জন্য বহু বিশেষজ্ঞ ও 'ভাষ্যকার নিয়োগ করা হয়েছে। এদের উচ্চারিত প্রতিটি ছত্রই ইসলামের প্রতি বৈরিতায় পরিপূর্ণ। শুধু তাই নয়, তারা আরবের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ভুল ধারণা দিচ্ছে। প্রচার মাধ্যম আফগানিস্তানে তথাকথিত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এবং ইরাকে সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারেও তারা একই ভূমিকা পালন করছে। সোমালিয়া ও ফিলিপাইনসহ বেশ কয়েকটি দেশে মার্কিন বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করেছে। ইরাকের বিরুদ্ধে সমরসজ্জা গড়ে তোলা হচ্ছে। ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনী মুসলমানদের হত্যা করছে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি রয়েছে। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড ও অন্যরা যা বলছেন আমেরিকা ঠিক তা নয়। প্রেসিডেন্ট বুশ ও তার উপদেষ্টারা বলছেন যে, তারা একটি 'ন্যায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন এবং তারা এ যুদ্ধকে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াই হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
আমাকে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসীদের উপদেশ দেয়া হচ্ছে যে, আমাদের অবশ্যই এ যুদ্ধের যৌক্তিকতা মেনে নিতে হবে এবং এ ব্যাপারে আমাদের কোন ভূমিকা থাকতে পারে না। আরও বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করার অনুমতি পাওয়ায় আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা হচ্ছে ভিন্ন। আমেরিকা বরাবরই একটি অভিবাসীদের দেশ। এদেশে ঈশ্বর নয়, জনগণই আইন তৈরী করে। আমেরিকায় আজকে যারা বসবাস করছে তাদের প্রায় সবাই অভিবাসী এমনকি প্রেসিডেন্ট বুশ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীও। এ দেশের সত্যিকার বাসিন্দা হচ্ছে রেড ইভিয়ানরা। যুক্তরাষ্ট্রে একেকজন ব্যক্তি অথবা গােষ্ঠীর জন্য সংবিধান আলাদা নয়। কিন্তু আমেরিকানরা তাই মনে করছে। মার্কিন সন্ত্রাসীরা অন্যের বাক-স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। মিঃ বুশ আমেরিকায় ধর্মের গুরুত্বের উপর জোর দিচ্ছেন। তিনি চীন এবং অন্যান্য দেশে গিয়ে ঈশ্বরের মাহাত্ম প্রচার করছেন। কিন্তু তিনি তার মতামত নাগরিকদের উপর চাপিয়ে দিতে পারেন না অথবা তার সুরে কথা বলতে বাধ্য করতে পারেন না। মার্কিন সংবিধান রাষ্ট্র ও সংবিধানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টেনেছে। গত নভেম্বরে প্যাট্রিয়ট এ্যাক্ট নামে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনে প্রথম, চতুর্থ, পঞ্চম ও অষ্টম সংশধোনীর পুরো ধারা হয় বাদ দেয়া হয়েছে নয়তো উপেক্ষা করা হয়েছে। নতুন আইনে ঘটনার শিকার ব্যক্তি আইনজীবী নিয়োগ সমস্যায় পড়বে এবং সে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে। এ আইনে গোপনে বিচার, আড়িপাতা ও অনির্দিষ্টকাল আটক রাখার জন্য সরকারকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এটি মার্কিন সরকারকে 'যুদ্ধবন্দীদের অস্ত্রহরণ' তাদেরকে অনির্দিষ্টকাল আটক এবং জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘন করার ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে। এ আইন পাস হওয়ার জন্যই গুয়ানতানামো ঘাঁটিতে বিদেশি বন্দীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা এবং তাদেরকে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী প্রাপ্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরদানকারী একটি দেশ।
স্বাক্ষরদানকারী কোন দেশ তাই এই আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করতে পারে না। তবু এদেশে তাই ঘটেছে। এ ব্যাপারে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিবাদ উথিত হচ্ছে। ওহাইও'র ডেমোক্রেট দলীয় কংগ্রেস সদস্য ডেনিস কুচিনিচ গত ১৭ ফেব্রুয়ারী এক জ্বালাময়ী ভাষণে বলেছেন যে, সীমা-পরিসীমা ও যুক্তি ছাড়া সারা পৃথিবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ (অপারেশন এনডিউরি ফ্রীডম) ঘোষণার, প্রতিবছর ৪০ হাজার কোটি ডলারের বেশী সামরিক বাজেট বৃদ্ধি এবং বিল অব রাইটস বাতিল করার ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট অথবা সরকারের নেই। এ ধরনের ক্ষমতা তাদেরকে কেউ দেয়নি। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে আরও বলেন, আমরা চাইনি যে, ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলায় নিহত নিরীহ মানুষের রক্তের বদলা নেয়ার জন্য আফগানিস্তানের নিরীহ গ্রামবাসীদের হত্যা করা হোক। কংগ্রেসম্যান কুচিনিচই মার্কিন সরকারের আগ্রাসী নীতির প্রতিবাদকারী সর্বোচ্চ মার্কিন কর্মকর্তা। আমার মতে, তার বক্তব্যে আমেরিকার নীতি ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটেছে। এজন্য আমি চাই যে, তার ভাষণটি আরবিতে পুরোপুরি প্রকাশিত হোক, যাতে আরবিভাষী মানুষ জানতে পারে যে, বুশ ও ডিক চেনিই যুক্তরাষ্ট্রের সবকিছু নয়।
বর্তমান মার্কিন নীতির সমালোচনা চলছে এবং নানা কথা হচ্ছে। কিন্তু সরকার এগুলো চাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও নজিরবিহীন ক্ষমতাকে কিভাবে মোকাবেলা করা যায় সেটাই আজকের বিশ্বের সমস্যা।
বুশের আশপাশে যে ক'জন মুষ্টিমেয় লোক রয়েছে তারা বিশ্বাস করে যে, মার্কিন স্বার্থ ক্ষুন্ন হলে ওয়াশিংটন যা খুশী তাই করতে পারে। এ ব্যাপারে অন্যান্য দেশের সমর্থন অথবা তাদের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষারও কোন প্রয়োজন নেই। যুক্তরাষ্ট্রের এ মনােভাব এখন আর গোপন নেই। ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে মার্কিন নীতিতে ইসরায়েলীকরণ ঘটেছে। জর্জ বুশের মনয়োগ কেবলমাত্র সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে। অন্য কিছু নিয়ে ভাবার তার সময় অথবা প্রয়োজন কোনটাই নেই। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন বুঝতে পেরেছেন যে, ফিলিস্তিনীদের হত্যার এটাই সুযোগ, তাই তিনি ফিলিস্তিনী জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।
কথা হচ্ছে যে, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র নয়, আবার যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল নয়। কিন্তু এ বাস্তবতা সত্ত্বেও ইসরায়েল প্রেসিডেন্ট বুশের সমর্থন পাচ্ছে। ইসরাইল একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র যার ভৌগোলিক অবস্থান হচ্ছে মুসলিম আরব রাষ্ট্রগুলোর ভেতরে। তাকে টিকে থাকতে হবে ঐ এলাকার পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে, মার্কিন সমর্থন অথবা আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে নয়। এই সত্তা অধিকাংশ ইসরায়েলিও অনুধাবন করতে পারছে। তাই তারা শ্যারনের আগ্রাসী নীতিকে আত্মঘাতী বলে আখ্যায়িত করছে। ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে আগ্রাসী অভিযানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের রিজার্ভ সৈন্যরাও প্রতিবাদ করছে। রিজার্ভ সৈন্যদের সঙ্গে কোন কোন ইসরায়েলিও কণ্ঠ মিলাচ্ছে। এদের সংখ্যা দিন দিনই ভারি হয়ে উঠছে। খোদ ইসরায়েলিীদের মধ্যে পরিবর্তনের সূচনা হলেও মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন আসছে না। যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক কাল্পনিক ভীতির পেছনে ছুটছে এবং নিজেকে সংঘর্ষে জড়িয়ে ফেলছে। প্রেসিডেন্ট বুশ ও তার পরিষদবর্গও মনে করছেন যে, তারা সঠিক পথে রয়েছেন। বিগত সপ্তাহগুলোর পত্র-পত্রিকা যারা পাঠ করেছেন তারা একথা বুঝতে পেরেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জনগণ মার্কিন নীতির অস্পষ্টতায় বিস্মিত ও হতবুদ্ধি হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে যে, যে কোন দেশকে টার্গেট করার অধিকার তাদের রয়েছে। এ ধরনের মনোভাব থেকে সে বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন শত্রু সৃষ্টি করছে এবং এসব শত্রুর সঙ্গে লড়াই করছে। লক্ষ্য অর্জন এবং যুদ্ধের পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই সে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। দুই সন্ত্রাসবাদ দমন বলতে যুক্তরাষ্ট্র কি বুঝাতে চায়? সে তার বিরুদ্ধাচরণকারী প্রত্যেককে উৎখাত অথবা তার ইচ্ছামত বিশ্বের মানচিত্র বদলাতে পারে না। আমরা যাদেরকে সুবোধ ব্যক্তি অথবা সাদ্দাম হোসেনের মত যাদেরকে ‘দুর্বত্ত’ বলে আখ্যায়িত করি, তাদের কাউকে সে উৎখাত করতে পারে না। ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে দেখতে চান এবং এ লক্ষ্যে তারা একটি দূরবর্তী টার্গেট হিসেবে বিশ্বকে বেছে নিয়েছেন। তাদের চিন্তাধারা হচ্ছে বাস্তবতাবর্জিত। কারণ, তারা বসে থাকেন পেন্টাগনের ডেস্কে। তাদের কাছ থেকে যে কোন দুবৃত্ত রাষ্ট্রের দূরত্ব অন্তত ১০ হাজার মাইল। তবু এসব রাষ্ট্রকে যুক্তরাষ্ট্র হুমকি হিসেবে গণ্য করছে। হাজার হাজার জঙ্গী বিমান, ১৯টি বিমানবাহী জাহাজ, কয়েক ডজন সাবমেরিন, প্রায় ১৫ লাখ সৈন্য ও হাজার হাজার পারমাণবিক অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বুশ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কনভোলিসা রাইস স্বস্তি পাচ্ছে না।
ইতোমধ্যেই প্রতিরক্ষা খাতে হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে, তারপরেও প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বুশ দেশকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এদেশের প্রায় সকল বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিক তাকেই সমর্থন করছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তারা এড়িয়ে যাচ্ছেন। তারা এটা বুঝতে চান না যে, যে বিশ্বে আমরা বসবাস করছি সে বিশ্ব গতিশীল এবং বিশ্বকে বুঝতে হলে বিশ্ব রাজনীতিকে বুঝতে হবে। মার্কিনীদের মধ্যে এ এমন একটা ধারণা কাজ করে যে, আমেরিকা বরাবরই ন্যায়ের পক্ষে এবং তার শত্রুরা অন্যায়ের পক্ষে। টমাস ফ্রিডম্যান অক্লান্তভাবে বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছেন এবং এসব বক্তৃতা বিবৃতিতে তিনি আরবদেরকে আত্মসমালোচনাকারী হওয়ার জন্য বারবার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু তার মত অন্য মার্কিনীদেরও যে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে তা তিনি মানতে নারাজ।
১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার জন্য তিনি চোখের পানি ফেলছেন এবং এ হামলায় নিহতদের জন্য রোদন করছেন। তার মনোভাব এরকম যে, যুক্তরাষ্ট্রেই কেবল এ ধরনের ভয়ংকর হামলা হয়েছে এবং মার্কিনীরাই কেবল সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশে ১১ সেপ্টেম্বরের চেয়েও ভয়াবহ ঘটনায় যারা নিহত হয়েছে এবং হচ্ছে তাদের প্রতি তার কোন অনুভূতি নেই এবং অন্যান্য দেশে সংঘটিত ঘটনাগুলো তার বিচারে কোন ঘটনাই নয়। ইসরায়েলি বুদ্ধিজীবীদের অবস্থাও মার্কিন বুদ্ধিজীবীদের অনুরূপ। ইসরায়েলি বুদ্ধিজীবীরা শুধু নিজেদের লোকজনের মৃত্যুই দেখতে পায়। পায়; কিন্তুইসরায়েলি ট্যাংক, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতি মুহূর্তে যে অগণিত ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছে সেদিকে তাদের চোখ যায় না। এজন্য তাদের কোন দুঃখবােধ নেই। জুলুমের প্রতি সহনশীল হওয়া অথবা দেখেও না দেখার ভান করা আজকের বিশ্বে একটি স্বভাবে পরিণত হয়েছে।
বুদ্ধিজীবীদের পক্ষে চক্রান্তের অংশীদার হওয়া অথবা ফাদে পা দেয়া শোভনীয় নয়। এ ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তাদেরকেই উদ্যেগী হতে হবে। সকল মানুষের দুর্ভোগ সমান, একথা মুখে উচ্চারণ করে পরবর্তী মুহূর্তে শুধু নিজেদের লোকজনের জন্য বিলাপ করাই যথেষ্ট নয়। বিরোধে জড়িত শক্তিশালী পক্ষ কী করছে তা দেখতে হবে এবং শক্তিশালী পক্ষের কার্যকলাপ সমর্থন করার পরিবর্তে এগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে হবে। বৃহৎ শক্তিকে সমালােচনা করা এবং এ শক্তির বিরোধিতা করাই বুদ্ধিজীবীদের কাছে বিবেকের দাবি। বুদ্ধিজীবীরা বিবেকের এ দাবি পূরণ করছেন না বলেই ভিকটিমকে উল্টো দোষারোপ করা হচ্ছে এবং অত্যাচারীরা উৎসাহিত হচ্ছে।
৬০ জন মার্কিন বুদ্ধিজীবী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াইকে সমর্থন দিয়ে একটি বিবৃতি দেন। এ বিবৃতি ফ্রান্স, ইতালী, জার্মানী ও ইউরােপের বড় বড় কাগজে প্রকাশিত হলেও ইন্টারনেট ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে কোন পত্রিকায় ছাপা হয়নি। এক সপ্তাহ আগে এক ইউরোপীয় বন্ধু এ বিবৃতি সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি বিস্মিত হই। এ বিবৃতিতে স্বাক্ষর দেন স্যামুয়েল হান্টিংটন, ফ্রান্সিস ফুকয়ামা, ড্যানিয়েল প্যাট্রিক ময়নিহাস প্রমুখ।
রক্ষণশীল নারীবাদী বুদ্ধিজীবী জীন থেকি এসটেইন বিবৃতিটি তৈরী করেছিলেন। অধ্যাপক মিশেল ওয়ালজারের উৎসাহে তিনি এ বিবৃতি তৈরি করেন। অধ্যাপক ওয়ালজার ইসরায়েলি লবির লোক হিসেবে পরিচিত। এ লোকের দৃষ্টিতে ইসরায়েলের কোন ভুল ধরা পড়ে না। বরং ইসরায়েল যা কিছু করে সবকিছুই তার কাছে ন্যায় ও যুক্তিসঙ্গত বলে বিবেচিত। অধ্যাপক ওয়ালজার একজন মেকি সমাজতন্ত্রী। সমাজতন্ত্রীর খোলস গায়ে দিয়ে তিনি ইসরায়েলের পক্ষে ওকালতি করেন। তবে এ বিবৃতি তৈরীতে উৎসাহ যোগানোর সময় তিনি তার সমাজতন্ত্রী খোলস খুলে ফেলেন। তিনি তার বর্তমান ভূমিকার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমেরিকাকে সন্ত্রাস ও শয়তানের বিরুদ্ধে একটি আদর্শ যোদ্ধা হিসেবে আখ্যা দেন। এবং বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হচ্ছে এমন দু'টি দেশ যাদের লক্ষ্য হচ্ছে অভিন্ন। অধ্যাপক ওয়ালজারের উক্তি সত্যের অপলাপ ছাড়া আর কিছু নয়। ইসরায়েল হচ্ছে এমন এক রাষ্ট্র যেখানে ইহুদি ছাড়া আর কেউ নাগরিক নয়। পক্ষান্তরে যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে সকল নাগরিকের দেশ।
ওয়ালিজারের একথা বলার সাহস কখনোহবে না যে, তিনি ইসরায়েলকে সমর্থন করতে গিয়ে বরং ইসরায়েলের ইহুদীবাদি নীতিকেই সমর্থন দিচ্ছেন। ঘটনাক্রমে যুক্তরাষ্ট্রকে শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হলে তিনি নিশ্চিতভাবে বিরোধিতা করবেন। বিবৃতির পেছনে অধ্যাপক ওয়ালজারের ভূমিকা যেমন গোপন রাখা হয়েছে তেমনি মুসলমানদের ধোকা দেয়ার ইচ্ছাও গোপন রাখা হয়েছে।
বিবৃতিতে মুসলমানদের লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, ইসলাম ও مسلمانوں বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এ লড়াই নয়, বরং যারা সকল ধরনের ন্যায়-নীতির বিরোধিতা করে তাদের বিরুদ্ধে এ লড়াই। সকল মানুষ সমান। ধর্মের নামে নরহত্যা পাপ, বিবেকের স্বাধীনতা সবার উপরে, মানুষই হচ্ছে সমাজের মূল শক্তি এবং মানুষের মৌলিক বিকাশের শর্তগুলো লালন এবং রক্ষা করাই হচ্ছে সরকারের কাজ।
বিবৃতিতে এসব নীতিকথা উল্লেখ করে বলা হয় যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত। এজন্য কোথাও কোথাও ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটছে। ধর্ম, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতা সম্পর্কে নীতিবাক্য আউড়ে বিবৃতির শেষাংশে একটি ফিরিস্তি দেয়া হয়। এ ফিরিস্তিতে ১৯৮৩ সালে বৈরুতে বোমা বিস্ফোরনে মার্কিন সৈন্যদের হতাহত হওয়ার ঘটনাসহ কোন আরব ও মুসলিম দেশে এবং অন্যান্য ঘটনায় কতজন মার্কিন সৈন্য নিহত হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়। তবে ইরাকে মার্কিন মদদে জাতিসংঘ অবরোধে কতজন নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ফিলিস্তিনে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরী ইসরায়েলি বিমান হামলায় এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক অপারেশনে নিহতদের সম্পর্কে বিবৃতিতে একটি লাইনও নেই।৮২

টিকাঃ
[৮১] ইনকিলাব, ২৫ মে ২, ভাষান্তর- শাহাদাত হোসাইন খান
[৮২] ইনকিলাব, ২৫ মে ২, ভাষান্তর- শাহাদাত হোসাইন খান

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00