📄 মুসলিম-বিরোধিতার ধারাপ্রবাহ
আমেরিকান জনহিতৈষী ও ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্ক
CAIR-এর গবেষণা অনুসারে আশ্চর্যজনকভাবে ২৯টি ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্ক ১০৯৬ টি দাতব্য সংস্থাকে অর্থায়ন করতে দেখা গেছে ২০১৪-১৬ এর মধ্যে। এই সংস্থাগুলো বিস্তৃত পরিসরে বিভিন্ন ভাগে দান করে। ২০ ডলার থেকে শুরু করে ৩২.৪ মিলিয়ন ডলার! এসব অরগানাইজেশনকে তিনটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা যায়-
১. দাতা পরামর্শ তহবিল
* ভ্যানগার্ড চ্যারিটেবল- ৩.৭ মিলিয়ন ডলার
* ডোনার ট্রাস্ট ইনকরপোরেশন- ১.৮ মিলিয়ন ডলার
* ডোনার ক্যাপিটাল ফান্ড ইনকরপোরেশন- ৪.৪ মিলিয়ন ডলার
* ফিডালিটি চ্যারিটেবল- ৮.৭ মিলিয়ন ডলার
* স্কুয়াব চ্যারিটেবল- ৫.৭ মিলিয়ন ডলার
২. বিশ্বাসভিত্তিক দাতা পরামর্শ তহবিল
ন্যাশনাল খ্রিস্টিয়ান ফাউন্ডেশন- ১৫.৭ মিলিয়ন ডলার
জুইস কমিউনাল ফান্ড- ৩.২ মিলিয়ন ডলার
৩. পারিবারিক বৃত্তি
এডেলসন ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন- ৬.১ মিলিয়ন ডলার
দ্য এবসট্রাক্ট ফান্ড- ৩.১ মিলিয়ন ডলার
স্টিফেন হ্যারল্ড স্কিমেল ফাউন্ডেশন ইনকরপোরেশন- ১ মিলিয়ন ডলার
এমজেড ফাউন্ডেশন- ১.৫ মিলিয়ন ডলার
মিরোসকি ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন ইনকরপোরেশন- ১.২ মিলিয়ন ডলার
ইজিন এন্ড ইমিলি গ্রান্ট ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন- ১.৪ মিলিয়ন ডলার
ডিয়ানা ডেভিস স্পিনসার ফাউন্ডেশন- ১.২ মিলিয়ন ডলার
নিউটন এন্ড রিচেল বেকার চ্যারিটেবল ট্রাস্ট- ১.১ মিলিয়ন ডলার
খ্রিশ্চিয়ান অ্যাডভোকেট সার্ভিং ইভেনজেলিজম ইনকরপোরেশন- ৩২.৪ মিলিয়ন ডলার
হেভেনলি ফাদার্স ফাউন্ডেশন- ১.২ মিলিয়ন ডলার
উল্লেখিত সংস্থা সমাজে মুসলিম-বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নে ইসলামোফোবিয়া ট্যাক্সমুক্ত ডোনেশন সংগ্রহ করে। মুসলিম-বিরোধী এ নেটওয়ার্কে ফলে সামাজিক প্রভাব- সম্প্রদায়গুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা
আইনি পদ্ধতির অপব্যবহার
ভুল তথ্য সম্প্রসারণ
মূলধারার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিভ্রান্তি ও কুয়াশার জালে আবদ্ধ করে রাখা
বিশেষ আগ্রহের ক্ষেত্রে উৎকোচ প্রদানের মাধ্যমে অনৈতিকতার জন্ম দেয়া
ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্ক: ১.৫ বিলিয়ন মার্কেটপ্লেস
আমেরিকান কালচার এবং রাজনৈতিক আলাপাঙ্গনে ইসলামোফোবিয়ার ক্ষতিকর প্রভাব মূলধারার মিডিয়া ও বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা অঙ্গনের আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। David Horowitz Freedom Center Ges Center for Security Policy-এর মতো সুপ্রতিষ্ঠিত মুসলিম-বিরোধী সংঘগুলো জাতীয় সুরক্ষা, ইসরায়েল প্রতিরক্ষা ও দেশি কালচার রক্ষার ছদ্মবেশে মুসলিম-বিদ্বেষী ধর্মান্ধতার বিষবাষ্প ছড়াতে ব্যস্ত। আরও অনেক মাল্টি-মিলিয়ন সংস্থার সাথে এ সংস্থাগুলোও অনলাইন ম্যাগাজিন, রেডিও শো, ডিজিটাল মিডিয়া, স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ বা ছোটোখাটো নীতি-নির্ধারক প্রতিষ্ঠান এর ঢাল হিসেবে ব্যবহার হয়। যখন কিছু সংস্থা প্রাথমিকভাবে ইসলাম-বিরুদ্ধ কর্মকাণ্ডে নিবেদিত আর অন্যরা সুদুরপ্রসারী রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ইসলামোফোবিয়া এজেন্ডাকে কাজে লাগাচ্ছে। ২০১৪-১৬ সময়কালে ৩৯টি মুসলিম-বিরুদ্ধ সংস্থা তাদের সামষ্টিক সাংগঠনিক অর্থায়নে কমপক্ষে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের অনুদান লাভ করেছে। ব্যক্তিগত অনুদান, মেম্বারশিপ ফি, বিনিয়োগকৃত যানবাহনসহ নানা খাত থেকে এই সামষ্টিক অর্থ ওঠানো হয়।
২০১৪-১৬ সময়কালে তাদের বিভিন্ন সংগঠনের আয় বা আয়ক্ষমতা এবং ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কের সার্বিক আর্থিক ধারণশক্তির বিশ্লেষিত তথ্য এখানে প্রদান করা হবে। সাথে প্রদত্ত হবে জাতীয় পলিসিতে প্রভাব খাটাতে এবং ব্যক্তিক লাভের মুখ দেখতে সংস্থাগুলোর সে অর্থ ব্যয়ের নজিরবিহীন ফিরিস্তি।
এই সংস্থাগুলোর একত্রিত সন্নিবেশই ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্ক নামে খ্যাত, একটি শক্তিশালী বিকেন্দ্রিক ইনফরমাল কর্মযজ্ঞ যা স্থানীয় নির্বাচন, রাষ্ট্রীয় আইন ও ফেডারেল পলিসিতে সফলভাবে প্রভাব ফেলে।
প্রকল্পে নিয়েজিত অর্থ : রাজনীতি, মিডিয়া, আইন প্রয়োগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, লবিয়িং গ্রুপ এবং অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে আমেরিকায় ইসলাম ও মুসলিম-বিরোধী মনোভাব চাঙা করতেই এই ১.৫ বিলিয়ন ডলার অকাতরে বিলিয়ে দেয়া হয়।
নিম্নে আলোচিত মুসলিম-বিদ্বেষী চারটি সংস্থার প্রোফাইল তাদের ইসলামোফোবিয়া প্রচারের উল্লিখিত নানা পন্থা চিত্রিত করেছে। প্রতিটি প্রোফাইলেই ১৮টি মুসলিম-বিদ্বেষী সংস্থা ও বিশেষভাবে ইসলামোফোবিক প্রোগ্রাম, পলিসি ও কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত সংস্থা থেকে লব্ধ অর্থপ্রবাহের ধারা প্রদর্শিত হয়েছে।
American Center for Law and Justice (ACLJ): ৮ ৪,০০০,০০০
মিডিয়ায় খৃস্টধর্ম প্রচারকদের অন্যতম প্যাট রবার্টসন এবং আইনজ্ঞ জে সেকুলা প্রতিষ্ঠিত এসিএলজে একটি মুসলিম-বিরোধী আইনি সাংবিধানিক সংস্থা। ACLJ এই লব্ধ অর্থ দুটি ক্ষেত্রে ব্যয় করে।
১. টেনেসি ও জর্জিয়ার পাবলিক স্কুলে ২০১৫ সালে ইসলাম-বিরোধী যুদ্ধপ্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল। সেখানে ইসলাম, খ্রিস্ট, ইহুদি- এ তিন ধর্ম বিশ্বাসীগণ একই সত্তার উপাসনা করাকে তারা আপত্তিকর হিসেবে শিক্ষা দেয়।
২. এসিজেএল ২০১৭ সালে বৈষম্যমূলক মুসলিম বহিষ্কৃতকরণের পক্ষালম্বন করে পুরোদমে। বিচারসংক্রান্ত বিভিন্ন ধাপে পূর্ণ সহায়তা প্রদানে নিষিদ্ধকরণে কোর্টের রায় বাস্তবায়ন করতে এসিজেএল বহুমাত্রিক প্রচেষ্টা চালায়।
Gatestone Institute: ৮ ২,২০০,০০০
গেটস্টোন ইনস্টিটিউট একটি ক্ষুদ্রকায় তথ্য বিনির্মাণ ও প্রচারণা সংস্থা। ইসলাম, মুসলিম এবং জাতীয় নিরাপত্তা সুদূরপ্রসারী গুঞ্জনের দ্বারা ধ্বংসযজ্ঞ হিসেবে এ প্রতিষ্ঠান কাজ করে। ইসলামকে পশ্চিমা সমাজের জন্য বিপদজনক হিসেবে ফুটিয়ে তুলতে নানা তোড়জোর চালায়; তাতে তাদের অর্থ ব্যয় করে। তাদের অর্থ বিনিয়োগের খাত ও কর্মতৎপরতা-
১. ২০১৮ সালে গেটস্টোন একটি গল্প দাঁড় করায়। যাতে ফুটিয়ে তোলা হয়, সিংহভাগ মুসলিম যুবক আফ্রিকা, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে উদ্ভূত। জার্মানির অভিবাসী ধর্ষণ সমস্যা, যা মুসলিম ধর্ষক দল দ্বারা, আর যুক্তরাজ্য রূপায়িত হচ্ছিল এক ইসলামি কলোনি হিসেবে। (এসব তারা তাদের কল্পিত গল্পে ফুটিয়ে তোলে।)
২. ইউরোপাঞ্চল জিহাদিদের (মুসলিমদের বোঝানো হয়) পুনর্দখল হলে শ্বেতাঙ্গদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হবে, এ মর্মে পূর্বাভাস দেয় ২০১৭ সালে।
৩. ২০১৬ সাল। গেটস্টোন টরেন্টোভিত্তিক অনলাইন মিডিয়া দ্য রেবেল-এর যোগসাজশে ১২টি ইসলাম-বিরোধী ভিডিও তৈরি করে, the anti-Muslim hate group, Middle East Forum-এর কর্ণধার ড্যানিয়েল পাইপ-এর মতো অন্যতম মুসলিম-বিরোধী একটিভিস্টদের দ্বারা রচিত। ভিডিওর বিষয়বস্তু হিসেবে স্থান পেয়েছে 'পাশ্চাত্যকে ইসলামিকরণের ভীতিকর দিক এবং ইউরোপ কি ইসলামিকরণের সামনে আত্মসমর্পণ করবে? না কি নিজেদের মান রক্ষার্থে মৌলবাদী ইসলামের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বে?' এ জাতীয় উস্কানিমূলক মিথ্যা গল্পগুলো গেটস্টোনের মিডিয়া ব্রেইটবার্ট নিউজসহ সহযোগিদের সহায়তায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এ মিথ্যার দৌরাত্ম্য মার্কিন মূলধারার রাজনীতিতে পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে।
৪. গেটস্টোন প্রচারিত মিথ্যাগুলোর অন্যতম হচ্ছে ইউরোপের 'no-go zones' সম্পর্কে। তারা রব তোলে এটা এমন একটা জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে মুসলিম অভিবাসীরা একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তুলেছে। যাতে স্থানীয় পুলিশ তাদের রাষ্ট্রীয় আইন ততটা খাটাতে পারেনি। এসব মিথ্যার দৌরাত্ম্য ২০১৬-তেই টেক্সাসের প্রাথমিক রিপাবলিকান সিনেটে পৌঁছে গেছে, টেড ক্রজবিরোধী দলীয় হিসেবে তা সম্পাদকীয় পাতায় উল্লেখ করেছে, পরে সরকার দলীয় হয়ে, ববি জিন্দাল উল্লেখ করেছে লন্ডনে প্রদত্ত বক্তব্যে, আর ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বক্তব্যে এর পুনরাবৃত্তি করে। ২০১৬-এর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সমগ্র আবহই ইসলাম ও মুসলমানদের ভয়, আস্থাহীনতা, আর ঘৃণায় পূর্ণ ছিল এহেন মিথ্যাচারের ডামাডোল পেটানোর ফলে।
Center for Security Policy (CSP) : $১,৯০০,০০০
সেন্টার ফর সিকিউরিটি পলিসি মৌলিকভাবেই একটি মুসলিম-বিরোধী লবিয়িং এবং প্রোপাগান্ডায় জড়িত। তাদের কর্মতৎপরতা ও অর্থায়ন-
১. ২০১৫ সালেই এ সংস্থা চারটি সুরক্ষাকর্ম শীর্ষক সম্মেলন আয়োজন করে, নেভাডা, সাউথ ক্যারোলিনা, নিউ হ্যাম্পশায়ার এবং লোয়ায়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ইসলামোফোবিয়া ও জেনোফোবিয়া (বিদেশি বা অজ্ঞাত কল্প ব্যক্তিদের প্রতি এক প্রকার ভয় লালন করা) আনয়ন ও বাস্তবায়নে এগুলো হলো প্রাথমিক হাতিয়ার রাষ্ট্র। ডোনাল্ড ট্রাম্প, টেড ক্রুজ, রিক স্যান্টোরিম এবং বেন কারসন তৎকালীন আবাসন ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রীসহ উল্লেখযোগ্য মুসলিম-বিরোধী রিপাবলিকান প্রার্থীদের অংশগ্রহণে মুখরিত ছিল সম্মেলনগুলো।
২. ২০১৫-এর সেপ্টেম্বরে অধিকন্তু রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীদের সাথে সম্পর্ক বন্ধন জোরদার করে। সিএসপি যৌথভাবে ইরানবিরোধী মিছিলের আয়োজন করে, যাতে ক্রুজ ও ট্রাম্প বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত ছিল। সিএসপি র্যালিতে Act for America সংগঠনের সভাপতি ব্রিজিট গ্যাব্রিয়েলকে আমন্ত্রণ জানায়। সে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে স্টেজকে মাতিয়ে রাখে। এর পর ডিসেম্বরে আমেরিকা প্রবেশে মুসলমানদের পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ও অবরুদ্ধকরণের পক্ষে সিএসপি গঠিত পোলকে ট্রাম্প অকস্মাৎ ন্যায়সঙ্গত বলে আখ্যা দেয়। কেলিয়ান কনওয়ে, যে বর্তমানে ট্রাম্পে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োজিত। পরিচালিত জরিপ সংস্থাকে সিএসপি সে বছরের জুনে উল্লিখিত জরিপটির জন্য নিয়েজিত করে।
৩. উপরন্তু মুসলিম-বিরোধী অবস্থান ও নীতি প্রণয়নে রিপাবলিকান প্রার্থী ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তারা আদাপানি খেয়ে নেমেছে। সিএসপি মুসলিম-বিরোধী আইন প্রয়োগ প্রশিক্ষণেও আত্মনিয়োগ করেছে। ২০১৫-এর জুলাই মাস, সিএসপি প্রাক্তন এফবিআই এজেন্ট জন গোয়ান্ডোলোর (আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় মুসলিম- বিরোধী ব্যক্তি) সাথে এরিজোনা আইন প্রয়োগ-এর জন্য ম্যারিকোপা অঞ্চলের প্রশিক্ষণ সুবিধাসম্বলিত শেরিফের অফিসে ৭ ঘণ্টার ব্রিফিং দেয়ার কাজ করেছে। জন গোয়ান্ডালো আমেরিকার আইন বাস্তবায়নে ইসলাম-বিরোধী নির্দেশনা প্রদানকারী প্রশিক্ষণ দলের প্রতিষ্ঠাতা ও ভীতি অনুধাবন করাতে বদ্ধপরিকর। 'আমেরিকা ইসলামের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত'- এ ঘৃণ্য বক্তব্যের প্রবক্তা সে।
Middle East Forum (MEF) : ৮১,৫০০,০০০
ডানিয়েল পাইপ গঠিত মিডেল ইস্ট ফোরাম একটি চরমপন্থি নীতি নির্ধারণী সংস্থা। এটি ইসলাম ও মুসলিম-বিরোধী অসংখ্য উদ্যেগের অগ্রনায়ক। আমেরিকান মুসলিম সমাজে নানা বাধা-নিষেধ আরওপে ফোরামের সক্রিয় লবিয়িং সর্বান্তঃকরণে অনিষ্টকর। মিডেল ইস্ট ফোরামের কর্মচক্র ও অর্থায়নের ক্ষেত্রবিশেষ-
১. মিডেল ইস্ট ফোরাম তিনটি বিল এডভান্স করেছিল-
ক. মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী আখ্যা প্রদান- আইন
খ. অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইস্যুতে শত্রুর অভিধা দেয়া- আইন
গ. ধর্মীয় অগ্নি- আইন
এসব এমন ভয়ংকর অধিকরণ পন্থা যাতে মুসলিম সম্পৃক্ত সম্ভাব্য যেকোনো কিছুই বা মুসলিম জনজীবন ও রাজনৈতিক অধিকারের সাথে আংশিক সম্পর্কযুক্ত যেকোনো চর্চা ও কাজই অপরাধের তালিকায় যুক্ত হয়ে যায়। এসব কমিউনিটি সেন্টার, ত্রাণদাতা, মসজিদ এবং মুসলিম নাগরিক কার্যক্রমে যুক্ত সদস্যদের পর্যন্ত আক্রান্ত করতে পারে, তারাও এর আওতাভুক্ত হতে পারে। এ কারণে মুসলিমরা কট্টর ডানপন্থি নব্য-নাজি জনগোষ্ঠীর হাতের খেলনায় পরিণত হবে। যারা প্রত্যাশা করে, সকল মুসলিমকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিতে। এরা কোনো প্রকার পরোক্ষ বা ইঙ্গিতের মাধ্যমে মুসলিমদের সন্ত্রাসী আখ্যা দেয় না; বরং রাখঢাক ও দ্বিধা-ভয়হীনভাবেই মুসলিমদের সন্ত্রাসী নামে ডাকে।
২. ইসলামিক রিলিফ, দ্য ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা, দ্য ইসলামিক সোসাইটি অব নর্থ আমেরিকা, মুসলিম এলায়েন্স অব নর্থ আমেরিকা, মুসলিম আমেরিকান সোসাইটি, মুসলিম পাবলিক এফেয়ার্স কাউনসিল, মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, মুসলিম ইয়ুথ অব নর্থ আমেরিকা এবং ইয়ং মুসলিমস-এর মতো আমেরিকান মুসলিম সংগঠনগুলোর প্রতি চড়াও হতে এমইএফ মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে। আমেরিকান মুসলিম নাগরিকদের আইনপ্রণেতা, মিডিয়া, সম্প্রদায় ও কর্পোরেট লেভেলের প্রতিষ্ঠাতাদের সাথে সম্পৃক্ততা নিয়ে অলীক নিন্দিত তথ্যের বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছে এমইএফ।
৩. প্রাত্যহিক মুসলিম জনজীবনকে তিক্ততায় পর্যবসিত করতে কংগ্রেসকে লবিয়িংয়ের মাধ্যমে তীব্রতর পরীক্ষাব্যবস্থার প্রচলন করতে তারা বিভিন্ন নীতির প্রয়োগ করেছে। অত্যাবশ্যকীয়ভাবে মুসলিম-বিরোধী প্রশিক্ষণ তারা আরওপ করে, যে প্রশিক্ষণের প্রধান উপজীব্য হয়ে দাঁড়ায়, আমেরিকানদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে মুসলিমদের ফুটিয়ে তোলা। অধিকন্তু তারা হোয়াইট হাউসে ইসলাম-বিরোধী কমিশন প্রণয়ন কল্পে বিস্তারিত প্রস্তাবনা প্রবর্তন করেছে।
ঘৃণার মাধ্যমে প্রোফাইলিং
কতিপয় মুসলিম-বিরোধী ধর্মান্ধ কুসংস্কার ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। মুসলিম-বিরোধী দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে লাখ লাখ ডলার হাতিয়ে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে।
এখানে গ্যাব্রিয়েলের আয়কৃত সম্পদের পরিমাণ প্রথমে বেশি থাকলেও পরবর্তীতে জরিপ সংস্থার মাধ্যমে কম দেখানো হয়।
মুসলিম-বিরোধী সংস্থাসমূহের বিবরণী
ACT for America: অ্যাক্ট ফর আমেরিকা আমেরিকার সবচেয়ে বড় মুসলিম-বিদ্বেষী সংস্থা। অ্যাক্ট মুসলিম-বিরোধী নীতি ও নীতিকারদের সমর্থন করে চলে। মুসলিম-বিরোধী আয়োজন ও ষড়যন্ত্রনীতি উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
American Center for Law and Justice : খ্রিস্টধর্ম-প্রচারক প্যাট রবার্টসন এবং জে সেকুলা প্রতিষ্ঠিত এসিএলজে একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন সাংবিধানিক আইনি সংস্থা। মুসলিম-বিরোধী নীতি ও আইনপ্রণয়নে সমর্থন জোগায় এবং মুসলিম-বিরোধী প্রোপাগান্ডায় আত্মনিয়োগ করে।
American Civil Rights Union : একটি আইনি সংস্থা যা এসিএলইউ-এর বিকল্প রক্ষণশীল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মুসলিম-বিরোধী স্টেটমেন্ট, ব্রিফিং আর মামলা এগিয়ে নিতে তারা আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে।
American Freedom Law Center : ডেভিড ইয়েরোশালমি বিনির্মিত মুসলিম-বিরোধী আইনি সংস্থা আমেরিকান ফ্রিডম ল' সেন্টার। ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কের আইনি পরামর্শক হিসেবে মুসলিম-বিরোধী আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণ তাদের কর্মতৎপরতার অংশ।
American Future Fund : আমেরিকান ফিউচার ফান্ড একটি ডানপন্থি অলাভজনক সংস্থা যারা রাজনৈতিক প্রজ্ঞাপন, স্পষ্টত ইসলাম-বিরোধী কর্মকাণ্ড, ফেডারেল প্রার্থীদের নির্বাচনে পরাজয় ত্বরান্বিত করা নিয়েই তাদের তৎপরতা।
American Islamic Forum for Democracy : জুহদী যেসার প্রতিষ্ঠিত আমেরিকান ইসলামিক ফোরাম ফর ডেমোক্রেসি একটি মুসলিম-বিরোধী লবিয়িং গ্রুপ। তারা 'ইসলামো-ফ্যাসিবাদ' যুদ্ধের আওয়াজ তোলে।
American Family Association : একটি লবিয়িং গ্রুপ যা ইসলামোফোবিক আদর্শ লালনকারী স্থানীয়দের যোগসাজশে মুসলিম-বিরোধী পলিসিতে সমর্থন জোগায়।
American Freedom Alliance : মুসলিম-বিরোধী এবং জলবায়ু পরিবর্তনবিরোধী প্রচার-প্রচারণা তেজোদীপ্ত করতে ভূমিকা রাখা একটি লবিয়িং সংস্থার নাম আমেরিকান ফ্রিডম অ্যালায়েন্স।
American Freedom Defense Initiative : মুসলিম-বিরোধী এক্টিভিস্ট পামেলা গেলার পরিচালিত বিদ্বেষ প্রচারকারী সংস্থা আমেরিকান ফ্রিডম ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভ। বর্ণবাদী ও ঘৃণাসম্বলিত বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য তারা সুপরিচিত। নিউইয়র্ক পার্ক ৫১ মসজিদ বিতর্ক নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী সংস্থা।
Americans for America : একটি কলোরাডোভিত্তিক লবিয়িং- ভুল তথ্য প্রদর্শনকারী সংস্থা যারা দেশজুড়ে মুসলিম-বিরোধী আইন প্রয়োগ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করে।
Americans for Peace and Tolerance : এটি বুস্টনভিত্তিক লবিয়িং গ্রুপ। যার প্রধান কার্যাবলি হচ্ছে আমেরিকায় ইসলাম ও মুসলিম সম্পর্কে ষড়যন্ত্রমূলক তথ্যের প্রচারণা।
America's Survival : মুসলিম-বিরোধীতায় ইন্ধন জোগাতে অলীক তথ্য উপস্থাপনকারী সংস্থা আমেরিকা'স সারভাইভাল। প্রাথমিকভাবে তাদের ওয়েবসাইট ষড়যন্ত্রমূলক তথ্যাবলি প্রচারে নিয়োজিত।
Ayaan Hirsi Ali Foundation : ইসলামোফোবিয়া প্রচারে নানা বক্রোক্তি ও চিরচেনা পদ্ধতিতে এরা কাজ করে। এটি আয়ান হিরসি আলী প্রতিষ্ঠিত স্বঘোষিত মানবাধিকার সংস্থা- আয়ান হিরসি আলি ফাউন্ডেশন। (আয়ান হিরসি আলী সোমালী বংশোদ্ভূত ডাচ আমেরিকান, ইসলামের বিরুদ্ধে লিখিত তার অনেকগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে।)
Center for Security Policy: ফ্রাঙ্কগেফনেই প্রতিষ্ঠিত একটি মুসলিম-বিরোধী প্রোপাগান্ডা গ্রুপ। মুসলিম-বিরোধী উদ্দীপনাকে উজ্জীবিত, উন্নত ও সমর্থিত করা যাদের অন্যতম কাজ।
Christian Action Network: এ দলের মূল কাজ হচ্ছে সরাসরি মেইল প্রেরণ, মুভি নির্মাণ, ইন্টারভিউ, প্রিন্ট মিডিয়াসহ নানাভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে অবান্তর তথ্যসন্ত্রাস চালানো।
Clarion Project: একটি মুসলিম-বিরোধী প্রচারণা দল যারা ইসলাম-বিরোধী প্রোপাগান্ডা বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে মুভি নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করে। যেমন- Obsession: Radical Islam's War Against the West Ges The Third Jihad : Radical Islam's Vision for America
Committee for Accuracy in Middle East Reporting : ৬১৫,০০০ ডলারেরও বেশি তাদের প্রাপ্ত আয়। এটি একটি লবিয়িং ও মিডিয়া মনিটরিং সংস্থা। যা অসত্য তথ্য উপস্থাপন, মূলধারার আমেরিকান মুসলিম ও মুসলিম সংস্থাসমূহের সম্মানহানি করা ও ইসলাম-বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর।
Concerned Women for America : একটি জননীতি নির্ধারণী নারী সংস্থা। যারা ফ্লোরিডা ও নর্থ ক্যারোলিনায় মুসলিম-বিরোধী নীতি নির্ধারণে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকে। সিডাব্লিউএ বিভিন্ন আয়োজনে মুসলিম-বিরোধী বক্তাদের জোগান দেয়।
Christian Broadcasting Network : খ্রিস্টধর্ম প্রচারক প্যাট রবার্টসন প্রতিষ্ঠিত প্রধানতম মিডিয়া প্লাটফর্ম সিবিএন। প্যাট রবার্টসন ইসলামের বিরুদ্ধে কুসংস্কার প্রচার করে, যথা- “ইসলাম আসলে অকল্যাণকর ধর্ম, ইসলাম একটি নৈরাজ্যের ধর্ম”- এ জাতীয় রব তুলতে এ মিডিয়া ব্যবহৃত হয়।
Christians and Jews United for Israel: এ সংস্থা মুসলিম-বিরোধী বিভিন্ন বিষয়বস্তু তাদের মিডিয়া প্লাটফর্মে প্রচার-প্রচারণায় নিয়োজিত।
Citizens for National Security: ফ্লোরিডাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা যারা মুসলিম-বিরোধী ষড়যন্ত্র নীতি ও মিথ্যে ত্বরান্বিত করতে তারা একেবারে আঁটঘাট বেঁধে নেমেছে।
Conservative Forum of Silicon Valley: ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক মুসলিম-বিরোধী তৃণমূল সংগঠন। যা ধর্মান্ধতায় সমাকীর্ণ পোস্ট করে সোস্যাল মিডিয়াগুলোতে। এরা বিভিন্ন সেমিনারে ইসলাম-বিরোধী বক্তা সরবরাহ করে।
David Horowitz Freedom Center: মুসলিম-বিরোধী লবিয়িং, মিডিয়া ও মনগড়া তথ্য প্রচারকেন্দ্র। জিহাদ ওয়াচ, ফ্রন্ট পেজ ম্যাগাজিন, ট্রুথ রিভল্ট ডটকম, ইসরায়েল নিরাপত্তা প্রজেক্ট, ডিসকভার দ্য নেট ডটকম, স্টুডেন্ট ফর একাডেমিক ফ্রিডম এবং ইন্ডিভিজ্যুয়াল রাইট ফাউন্ডেশনের মতো বর্ণবাদ ও মুসলিম-বিরোধী কার্যকলাপকে প্রশ্রয় দেয়।
Eagle Forum & Eagle Forum Education and Legal Defense Fund: ইসলাম-বিরোধী নব্য রক্ষণশীল লবিয়িং গ্রুপ যারা বিভিন্ন প্রদেশে ইসলাম-বিরোধী আইনি তৎপরতায় যুক্ত থাকে।
Endowment for Middle East Truth: এটি একটি নীতি নির্ধারণী লবিয়িং সেন্টার হিসেবে কাজ করে। যা ইসলাম-বিদ্বেষী অলীক তথ্য প্রচারে লিপ্ত।
FLAME Facts and Logic about the Middle East : সানফ্রান্সিসকোভিত্তিক গবেষণা সংস্থা যারা মুসলিম- বিরোধী প্রপাগান্ডা উদ্ভাবন ও বিকাশে লিপ্ত। স্বতন্ত্র আত্মপ্রকাশের পূর্বে এফএলএমই CAMERA-এর চ্যাপ্টার হিসেবে পরিগণিত হতো।
Florida Family Association : একটি ডানপন্থি বিদ্বেষমূলক সংস্থা যা মুসলিম-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি ও ষড়যন্ত্রকারী সংস্থা।
Freedom of Conscience Defense Fund: একটি আইনি সংস্থা যারা আমেরিকার মুসলিমদের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা লড়ে এবং স্কুলে ইসলামোফোবিয়া প্রচারে উদ্যোগ নেয়।
Gatestone Institute: একটি নিউইয়র্ক সিটিভিত্তিক মুসলিম-বিদ্বেষী সংস্থা যারা মুসলিম-বিরোধী অসত্য গল্প তৈরি ও বিস্তারে অবদান রাখে।
Global Faith Institute: এটি খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারক সংস্থা যারা মুসলিম-বিরোধী মিডিয়া বিষয়বস্তু, ষড়যন্ত্রমূলক নীতি প্রণয়ন ও ভুল তথ্য উৎপাদন ও বিস্তারে পটু।
Forum for Middle East Understanding : শিক্ষা বিস্তারের ছদ্মবেশে এরা ইসলাম-বিরোধী নীতি ও তথ্য বিচ্ছুরণের কাজের আঞ্জাম দিয়ে থাকে।
Foundation for Advocating Christian Truth: খ্রিস্টান answeringmuslims.com ওয়েবসাইট পরিচালনায় নিয়োজিত সংস্থা এফএসিটি। একটি মুসলিম ও ইসলাম- বিরোধী সাইট যারা অসত্য তথ্য উপস্থাপন করে।
FDD Foundation for Defense of Democracies: একটি নব্য রক্ষণশীল লবিয়িং সংস্থা যারা ইসলামোফোবিয়ার সন্ত্রাসী যুদ্ধের বর্ণনাধারায় নীতি ও চর্চাকে ত্বরান্বিত করে।
Investigative Project on Terrorism: একটি প্রদাহী গ্রুপ, ইসলাম-বিরোধী কুসংস্কার বিনির্মাণ ও প্রচারই যাদের মুখ্য কাজ।
Jihad Watch: ডেভিড হরোউইটয ফ্রিডম সেন্টার আশ্রিত একটি আধুনিক মিডিয়া প্লাটফর্ম জিহাদ ওয়াচ।
Lawfare Project: ৪৩০,০০০-এরও বেশি ডলার তারা ফিডালিটি চ্যারিটেবল থেকে আয় করে।
মিডেল ইস্ট ফোরামের সাবেক পরিচালক প্রতিষ্ঠিত ইসলাম-বিরোধী গ্রুপ হচ্ছে লফেয়ার প্রজেক্ট। যাদের মৌলিক কার্যকরণের মধ্যে ইসলামোফোবিয়া ষড়যন্ত্র ও প্রোপাগান্ডার আয়োজন অন্যতম।
Middle East Forum: ইসলাম-বিরোধী নীতি নির্ধারণী কেন্দ্র যারা অবান্তর বিষয়বস্তু নির্ধারণ, ঘৃণা জিইয়ে রাখা, প্রোপাগান্ডা, অসত্য তথ্য প্রচার এবং ইসলাম-বিরোধী সংস্থাসমূহকে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান ইত্যাদি বিষয়কে নিজেদের কার্যক্রম হিসেবে সাজিয়েছে।
Middle East Media Research Institute : প্রায় ১২০০,০০০ ডলার এরা স্কুয়াব চেরিট্যাবল থেকে আয় করে। এটি একটি ছদ্মবেশী গবেষণা সংস্থা যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের বিভিন্ন পাঠ্যের ভুলভাবে ভাষান্তর করে। এর মাধ্যমে মুসলিম-বিরোধী প্রোপাগান্ডার প্রতি জনসমর্থন ও সাধুবাদ হাসিল করতে পারে।
National Review Institute: একটি নব্য রক্ষণশীল পত্রিকা যারা ইসলাম-বিরোধী ফিচার তৈরি ও প্রকাশনা ও ইসলাম-বিরোধী ষড়যন্ত্র ও প্রোপাগান্ডা নির্মাণ যাদের অন্যতম কাজ।
Society of Americans for National Existence (sanc): ডেভিড ইয়ুরুশালমি প্রতিষ্ঠিত একটি ইসলামবিরোধী নীতি নির্ধারণী সংস্থা যারা ইসলামকে অপরাধী সাজাতে বদ্ধপরিকর। ২০১৫ সালে সেভ এ নেছামা ইন্ডোমেন্ট নামক সংস্থার সাথে জুড়ে নিজেকে পুনরায় চিহ্নিত করেছে।
Straight Way of Grace Ministry : এই ইসলাম-বিরোধী সংস্থার কাজ হলো ইসলাম নিয়ে চক্রান্ত সাজানো ও ইসলাম চর্চা-বিশ্বাসের অসম্মান করার পথ অনুসন্ধান করা এবং আমেরিকান মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের সয়লাব করা।
Unconstrained Analytics : এটি একটি জালিয়াতি নীতি নির্ধারণী সংস্থা জাতীয় সুরক্ষার সাথে তালমিলিয়ে তারা মুসলিম-বিরোধী উপকরণ তৈরি করে।
Oak Initiative : একটি জাতীয় সংস্থা যারা মুসলিম-বিরোধী একরোখা চিন্তন উন্নয়নের কাজ করে।
Proclaiming Justice to the Nations : একটি শিক্ষামূলক সংস্থা যারা ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্ব প্রচারের পাশাপাশি ইসলামি বিশ্বাস ও চর্চাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিভিন্ন মিথ্যার রূপায়ণ করে।
Religious Freedom Coalition : একটি আইনি সংস্থা যারা সভ্যতার সংকটের পক্ষাবলম্বন করার সাথে সাথে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে সহযোগিতা করে।
United West, aka Security Research Associates: একটি ফ্লোরিডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান যারা ইসলামকে শত্রুভাবাপন্ন করে চিত্রিত করে।
এছাড়া আরও যে মানবাধিকার সংস্থা এই নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত-
অক্সফাম, আমেরিকান রেড ক্রস, ইউনিসেফ, দ্য সেলভেশন আর্মি, সাউদার্ন প্রোভার্টি ল সেন্টার, ACLU
আরও যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কের অধীন-
কলম্বিয়া স্কুল অব নার্সিং, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, টিচ ফর আমেরিকা, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি।
রাজনীতি ও আইনে বিরূপ প্রভাব-প্রতিক্রিয়া
প্রায় এক দশক ধরে ইসলামোফোবিয়া ও মুসলিম-বিরোধী উন্মত্ততা নির্বাচনি রাজনীতির মজ্জার সাথে মিশে গেছে। বস্তুত চলমান গবেষণায় দেখাচ্ছে মুসলিম-বিরোধী মানসিকতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেড়েই চলেছে। তা অভ্যন্তরীণ বা বহির্গত সন্ত্রাসী ঘটনা নয় যা অনেকে ভাবতে পারেন।
ইসলামোফোবিয়া যদিও রাজনীতির সাথে স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস- বৃদ্ধি হয়ে থাকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচন আনুষ্ঠানিক ক্ষমতারোহণের জন্য ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কের জন্য একটি বাতায়ন উন্মুক্ত করেন।
ট্রাম্প ইনকর্পোরেশন, মুসিলমবিরোধী দানব-হাইড্রা ৭৬
ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্ক বর্তমান প্রশাসনে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে, ট্রাম্পের বক্তৃতা ও তার অনুসৃত নীতিতেও এর বড় রকমের প্রভাব পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনে এক ডজনেরও বেশি ব্যক্তি সরাসরি এ নেটওয়ার্কের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এটা অনস্বীকার্য যে, মুসলিম-বিরোধী গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও বৈষম্য ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে তীব্রতর হয়ে উঠেছিল এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা লাভ পেয়েছিল। যদিও অসংখ্য ইসলাম-বিরোধী নীতিমালা তার ক্ষমতারোহণের পূর্বেই ছিল। যেমন- Countering Violent Extremism Ges Terrorist Screening Database (এসব মূলত মুসলমানদের হয়রানি করার কূটকৌশল।) পূর্বপ্রতিষ্ঠিত নিরপেক্ষতার ছদ্মবেশের মুখোশ এই প্রশাসন ছুড়ে ফেলেছে এবং ইসলামোফোবিয়ার স্পষ্ট রূপ প্রকট হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প
আমেরিকার ৪৫তম প্রেসিডেন্ট
ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কের অভীষ্ঠ লক্ষ্যের সাথে ট্রাম্পের বক্তৃতা ও নীতি সরাসরি সমর্থন করে। কংগ্রেসের যৌথ আয়োজিত প্রথম বক্তব্যেই সে 'মৌলবাদী ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ' শব্দগুচ্ছ প্রয়োগ করে, যা সরাসরি ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কের হাতিয়ার। তখন থেকে অসংখ্য বার এই শব্দ ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে তার বক্তব্যে ব্যবহৃত হয়েছে।
"প্রয়োজনে যেকোনো পন্থায়ই হোক না কেন, উগ্র ইসলামি সন্ত্রাসবাদ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আদালত আমাদের অধিকার অবশ্যই ফিরিয়ে দেবে, আমাদের হতে হবে কঠোর।” (১৮/৮/২০১৭ বিকাল ৪ টা ৬ মিনিটে টুইট করে।)
একই মাস অক্টোবরেই সে পুনরায় মার্কিন আর্মি অফিসার জেনারেল জন পার্সিং শুকরের রক্তে ডুবানো গুলি দিয়ে মুসলমানদের গুলি করার (১৯০১-১৯১৩ সালের ফিলিপাইনের মোরা বিদ্রোহ চলাকালীন ঘটনা-time.com) গল্প বলার ছলে মৌলবাদী ইসলামি সন্ত্রাসবাদ প্রসারের মিথ্যা রব তোলে।
“জেনারেল পার্সিং সন্ত্রাসী আটক করে যা করতেন তা অধ্যয়নের ফলে দেখা যায় মৌলবাদী ইসলামি সন্ত্রাস আমেরিকায় জায়গা করে নিতে পারেনি” যা ছিল যুক্তরাজ্যে অপরাধের হার বৃদ্ধির জন্য দায়ী। নভেম্বরে সে যুক্তরাজ্যের মুসলিম-বিরোধী সংগঠনের পক্ষ নিয়ে তিন বার টুইট করেছে।
অধিকন্তু বিবৃতি ও টুইটের পাশাপাশি ট্রাম্প মুসলিম-বিরোধী নীতি ত্বরান্বিত করেছে যাতে ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কের লাভ হচ্ছে ষোলোআনা। এর মধ্যে অতি আলোচিত 'অসাংবিধানিক মুসলিম নিষিদ্ধকরণ'।
টুইটে প্রদত্ত বিবৃতি
'নিউ ইয়র্ক সিটি শীর্ষ পুলিশ আইনিভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে বুদ্ধিমানের পরিচয় দিয়েছে। সতর্কতা আমাদের সুরক্ষার চাদরে আবৃত করে। আমাদের নিরাপদ রাখতে কমিশনার কেলি ও মেয়র ব্লুমবার্গের প্রয়াসকে আমি সমর্থন করি। (১৩ মার্চ ২০১২, দুপুর ৩:২৬)
সিরিয়ান মুসলিম আমেরিকা হয়ে মেক্সিকোতে অনুপ্রবেশ করেছে। আর এখন ওকলাহোমা ও কানসাসে ঢুকছে, অভিনন্দন? (১৩ অক্টোবর ২০১৫, রাত ১২:৩০)
একজন প্রতিবেদক যে ডাটাবেজ-প্রতিবেদন তৈরি করে তার পক্ষাবলম্বী আমি নই। আমেরিকাকে সুরক্ষিত রাখতে নজরদারি তালিকা, অতন্দ্র প্রহরার মাধ্যমে ইসলামি সন্ত্রাসবাদকে প্রতিহত করতে হবে। (২০ নভেম্বর ২০১৫, দুপর ২:৫১)
আমেরিকার দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করতে গিয়ে ১৩ সিরীয় শরণার্থী ধরা পড়েছে, আরও কতজন এটা করেছে? আমাদের মজবুত প্রাচীর দরকার। (২২ নভেম্বর ২০১৫, রাত ১১:৫৩)
যুক্তরাজ্য তাদের মুসলিম সমস্যা সমাধানে প্রচুর কোশেশ করছে, সত্য বলতে ঘটমান অবস্থা বুঝার মতো জ্ঞানী সবাই। খুবই দুঃখজনক! (১০ ডিসেম্বর ২০১৫, সকাল ৮:৪৯)
ব্রাসেলসে ভয়ানক আক্রমণ সত্ত্বেও অনভিজ্ঞ হিলারি চায় বর্ডার দুর্বল ও উন্মুক্ত থাক, যাতে মুসলিমরা উড়ে এসে জুড়ে বসতে পারে। কোনো সুযোগ নাই! (২২ মার্চ ২০১৬, রাত ৯:৫৯)
এটা ঠিক যে কতিপয় দেশের জন্য ভ্রমণ নিষিদ্ধকরণ আমাদের দরকার। তবে এসব রাজনৈতিকভাবে বলা কিছু শব্দ নয় যা আমাদের জনগণকে সুরক্ষা প্রদানে সমর্থ হবে না। (৫ জুন ২০১৭, রাত ১০:২০)
যেহেতু নিষেধাজ্ঞা একজন বিচারকের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল অনেক বিপজ্জনক লোক গণহারে প্রবেশ করতে পারে আমাদের দেশে। কী এক ভয়ানক সিদ্ধান্ত! (৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বিকাল ৫:৪৪)
বিচার বিভাগের মূলত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় পানি ঢেলে না দিয়ে এর সাথেই থাকা উচিত ছিল, রাজনৈতিকভাবে সঠিক এক সংস্করণ তারা এসসির কাছে অর্পণ করেছে। (৫ জুন ২০১৭, সন্ধ্যা ৭:২৯)
এটা আসলেই হতাশাব্যঞ্জক যে ২৬ জুন ২০১৮-তে উচ্চ আদালত মুসলিম নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ৯ জন বিচারকের ৫ জনই মুসলিম-বিরোধী কুসংস্কার বাস্তবায়নে মুসলিম নিষিদ্ধকরণ কোনো সমস্যা নয় বলে রায় দেয়। ট্রাম্পের মুসলিম-বিরোধী কার্যক্রম শুধু মুসলিম নিষেধাজ্ঞাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ট্রাম্প প্রশাসন Countering Violent Extremism-Gi bvg cv‡ë Countering Islamic Extremism নাম দেয়। যখন ধারাবাহিকভাবে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাসের সয়লাব এফবিআই ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের দ্বারা স্বীকৃত হতো, তাদের ছাপিয়ে সব দায় মুসলিমদের ঘাড়ে চাপাতে তারা ছিল বদ্ধপরিকর।
১. পূর্বে যখন নিরপেক্ষ শব্দে আরওপিত ছিল প্রোগামটি তখনও তারা একচেটিয়াভাবে আমেরিকান মুসলিম নাগরিকদের দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতো।
২. প্রোগ্রামটি নিছক মিথ্যা নিরপেক্ষতা দূর করে স্পষ্টত আমেরিকান মুসলিম নাগরিকদের দিকে নজর তাক করে এবং তাদের লক্ষ্যবস্তু বানায়। যদিও গবেষণামূলক ডাটা সরকারবিরোধী সহিংসদের উগ্রবাদ প্রমাণ করে, যা দেশের জন্য সবচে বড় হুমকি।
২০১৭-এর ডিসেম্বরে জাতীয় নিরাপত্তানীতি ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কের নীতি ও ভাষার প্রচার ও বিন্যাসকে প্রশাসনের ভিতরে আরও পোক্ত করে। উদাহরণস্বরূপ এতে বলা হয়েছে-
"আইএস ও আল-কায়দার মতো জিহাদী সন্ত্রাসবাদীরা বর্বর মতাদর্শ প্রচার করে যাচ্ছে। সরকারের ধ্বংসসাধন ও নির্দোষ ধর্মত্যাগীদের নৃশংসভাবে হত্যা করার কথা বলে। জিহাদী সন্ত্রাসবাদীরা তাদের অধীনস্থদের শরিয়াহ আইন মানতে বাধ্য করে।”
এখানে শরিয়াহ শব্দটিকে যে পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়েছে, তা মৌলিকভাবে মুসলিম-বিদ্বেষী গোষ্ঠীসমূহের অনুসৃত পদ্ধতি। এরা শরিয়াহকে মনে করে গণতন্ত্রবিরোধী ও নিপীড়ন-সহিংসতার অস্ত্র। অথচ শরিয়া বলতে মূলত নৈতিক অবকাঠামোকে বোঝায়।
হাইড্রা প্রশাসন সম্পাদিত মুসলিম-বিরোধী বিবৃতি ও কার্যকলাপ
কিলিয়ান কনওয়ে: কনওয়ে সিএসপির সাথে এক হয়ে কাজ করেছে। এ সংস্থার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সিইও ছিল সে। সংস্থাটি তাদের জন্য অসংখ্য জরিপ চালিয়েছে। ২০১৫ সালে আমেরিকান মুসলিমদের মিথ্যা বাক্যবাণে জর্জরিত করতে সিএসপির কমিশন পেয়ে কনওয়ের দ্বারা অবান্তর জরিপ পরিচালিত হয়েছিল। মুসলিম নিষিদ্ধকরণের পরিকল্পনা ট্রাম্প যখন প্রথম ঘোষণা করে তখন এই ঘুণে ধরা ও বিতর্কিত জরিপকে ন্যায়বিচার হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
ফ্রেড ক্লিটস: ফ্রড ক্লিটস সিএসপি রিপোর্টের সহ-রচয়িতা। যার দাবি ছিল সরকারের উচিত 'শরিয়া অনুসারী আইনজ্ঞদের ও এর চর্চাকে আমেরিকান নাগরিকদের নির্বাসনের আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে নির্ধারণ করা। বিবৃতি দেয় যে, 'অধিকাংশ মুসলিম ও ইসলামি কর্তৃপক্ষ জিহাদ ও শরিয়ার আধিপত্য বিস্তার করে অথবা অন্তত সমর্থন করে'। ইউরোপে 'নো গো জোন' নামে মুসলিম-বিরোধী মিথ-এর জন্ম দিয়েছে, ইসলামী শরিয়া আইন দ্বারা পরিচালিত স্থান বলে এ স্থানের নামে গুজব রটিয়েছে।
দাবি তোলে 'সিংহভাগ আমেরিকান মুসলিম সংস্থা ও মসজিদ জিহাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নে গোপনে কাজ করছে বলে, রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তাদের নিরপেক্ষ হতে হবে।' রব তোলে যে 'মুসলিম সম্প্রদায়গুলোতে সমস্যা বিদ্যমান, তারা মৌলবাদী বিশ্বচিন্তায় নিমগ্ন যা আধুনিক সমাজব্যবস্থার বিচ্যুতি কামনা করে এবং বৈশ্বিক শাসনের মাধ্যমে বিশ্বের সবার ওপর শরিয়া আইন চাপাতে চায়।'
স্টিফেন মিলার: স্টফেন ব্যানন-এর সাথে মিলে সর্বপ্রথম মুসলিম নিষেধাজ্ঞার খসড়া তৈরি করে। লিখেছে 'মুসলমান যেখানেই পাওয়া যাক না কেন, তাদের বিশ্বের সব দেশেই পাওয়া যায়, তারা জিহাদী তত্ত্বের অনুগামী'। ডুক ইউনিভার্সিটিতে ডেভিড হরোউইটয ফ্রিডম সেন্টারের মাধ্যমে Terrorism Awareness Project চালু করেন এবং পরিচালনা করে। প্রজেক্টি দাবি করে তাদের চূড়ান্ত মতামত হলো, 'উগ্রবাদী বামপন্থি এবং তাদের ইসলামি মিত্র মিলে আমেরিকান মূল্যবোধ বিনষ্ট করে এবং সন্ত্রাসের সময় নিজের পিঠ বাঁচাতে দেশকে নিরস্ত্রকরণে আত্মনিয়োগ করে। 'আমেরিকার জিহাদ সম্পর্কে যা জানা উচিত' এবং 'খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে জিহাদ একটি যুদ্ধ' দেশজুড়ে বিভিন্ন ক্যাম্পাস ও সংবাদপত্রের শিরোনামে প্রচারণা চালায়।
A Time to Kill শিরোনামে একটি কলামে সে বলে, “ইসলাম কতটা শান্তিপ্রিয় ও সদয় ধর্ম তা আমরা অনেক শুনেছি! এসব যতবারই বলা হোক প্রকৃত সত্য কিছুতেই পাল্টাবে না। প্রকৃত সত্য হলো, লাখ লাখ উগ্রপন্থি মুসলমান আপনি শুধু একজন ইহুদি-খ্রিস্টান অথবা আমেরিকান হওয়ার কারণে আপনার মৃত্যুতে উল্লাস করবে।” সে আরও বলে, “ইসলামি সন্ত্রাসবাদীরা এই দেশে বসবাসরত প্রতিটি নারী-পুরুষ ও শিশুর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে”
মাইক পম্পেই: তিনি এক বৃিতিতে বলেন, ইসলামিক সোসাইটি অব উইচিতা সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করেছে। তিনি 'সিকিউরড ফ্রিডম রেডিও'তে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দেন যে, মৌলবাদী ইসলামিক সন্ত্রাসী সরকার ও ইসলামি বিষয়াদির বিস্তার জনগণকে সন্ত্রাসী কাজে জড়িত হতে উদ্বুদ্ধ করছে। আমেরিকান মসজিদ ও ইসলামি সংস্থাকে কেন্দ্র করে তিনি একটি কাল্পনিক সন্ত্রাসী অবকাঠামো তৈরি করে জোর প্রচারণা চালান। ২০১৪ সালে একটি গির্জায় আগত জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ইসলামকে যারা একমাত্র জীবনবিধান হিসেবে বিবেচনা করে তারাই আমেরিকার জন্য হুমকিস্বরূপ। তিনি 'ওয়ার অন টেরর'কে মনে করেন খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধে ইসলামের যুদ্ধ।
বোস্টনে বোমাহামলার পর এ সহিংসতায় মুসলিমরা জড়িত, এই দাবি নিয়ে পম্পেই গিয়েছিলেন হাউজ ফ্লোরে। সেখানে মিথ্যা দাবি তুলে বলেন, মুসলিম নেতারা এ ঘটনার কোনো রকম নিন্দা জানায়নি। আমেরিকার মসজিদ ও ইসলামি আইনি সংস্থার অর্থায়নের মাধ্যমেই উগ্রবাদের প্রতি নিশ্চুপ থাকার এ প্রচলন হচ্ছে বলে সে সমালোচনা জুড়ে দেয়। পম্পেইয়ের মতে, এ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নীরবতা হলো ইসলামে বিশ্বাসীরা শান্তিতে বিশ্বাস করে না এবং আমেরিকাজুড়ে মুসলিম নেতারা এহেন কাজের সাথে জড়িত আছে।
জন বোল্টন: গেটস্টোন ইনস্টিটিউট-এর কর্ণধার হিসেবে কাজ করছেন। এটি নিউইয়র্কভিত্তিক একটি আইনি সংস্থা যারা আমেরিকাবাসীদের এই বলে সতর্ক করে যে, 'জিহাদিদের ক্ষমতাগ্রহণ' ইউরোপের শ্বেতাঙ্গদের জন্য ব্যাপক মহামারিরূপে আবির্ভূত হবে।
হিদার নিউয়ের্ট: ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ট ট্রাম্প সম্পর্কে মুসলমানদের উদ্বেগ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের একটি রিপোর্টকে কেন্দ্র করে হিদার উপহাস করে টুইটে বলেন 'তাদের আইএসআইএস-এর সাথে মিলিত হওয়া উচিত'।
২০১৩ সালে মিনোসোটা ইয়োমকা (প্রতিযোগিতা আয়োজক সংস্থা, বিশেষত সাঁতার।) ঘোষণা হওয়ার পর মুসলিম মেয়েদের ধর্মীয় পোশাকে এক প্রাইভেট সাঁতার ক্লাসের আয়োজন করতে হয়। একে কেন্দ্র করে হিদার দাবি তোলেন 'শরিয়া আইন এখন সব পরিবর্তন করে ফেলছে।' একটি বিভাগে সোমালি হিজাব পরিহিতা দুই মেয়ের ছবি ব্যবহার করে শিরোনাম দেয়া হয়- 'শরিয়া আইন'।
ওয়াইল্ড ফেরিস: জিহাদিরা পশ্চিমাদের সাথে মিলে মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করেছে। ২০০৮ সালে ক্লারিয়ন প্রজেক্টের অধীনে নির্মিত ছবি The Third Jihad, এর গুপ্ত বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ আঞ্জাম দেয়।
জেফ সিজনস: সিজনস বলে 'উন্মুক্ত ও স্বাধীন বিশ্বে আমরা আবারো এক আধিপত্যবাদী হুমকির মুখোমুখি হয়েছি। এবার সে হুমকি আদর্শিক ও সর্বনাশী ইসলাম'।
ধর্মভিত্তিক শরিয়া আইন... মূলত আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক আইনের সাথে বিরোধপূর্ণ যা গির্জা ও দেশকে আলাদা করে ফেলে, আর উন্নততর পৃথিবীর পথে ফ্রি ডিবেটকে বাধা হিসেবে গণ্য করে।
সিবাসটিয়ান গোর্কা: গোর্কা অবান্তর দাবি তোলেন যে, 'সন্ত্রাসবাদ ইসলাম ও কুরআনে বর্ণিত 'সামরিক' অংশে প্রোথিত। যারা ধর্মের ভূমিকাকে উপস্থাপন করে তারা বাস্তব দুনিয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়াকে অপনোদন করছে।
তার লিখিত Defeating Jihad: The Winnable War নামক বইতে দাবি করে, আমেরিকান সেনাবাহিনী সন্ত্রাস ও উগ্র সহিংসবাদী নয় তা স্বীকৃত হওয়া দরকার তবে বৈশ্বিক জিহাদি আন্দোলন এবং আধুনিককালের সর্বগ্রাসী মতবাদ ইসলামের সামরিক ইতিহাসে প্রোথিত আছে।
ধর্ম ও জাতিগত বিদ্বেষকে স্বাভাবিক বিবেচনায় সমার্থবোধক বলে সে বিশ্বাস করে। ট্রাম্প নির্বাচনের পর ফ্লেরিডার জনসমাবেশে বক্তৃতাকালে গোর্কা একটি মৃত বাদামি চামড়ার লোকের ছবি প্রদর্শন করে যার শরীরে রাইফেলের নির্যাতনের ছাপ দৃশ্যমান ছিল। শ্রোতারা যখন আনন্দে হর্ষধ্বনি করছিল সে চিৎকার করে বললো- 'আমরা এখন জিততে পারি, আমরা বিজয় ছিনিয়ে নিতে পারি'।
ফক্স নিউজে প্রদত্ত এক সাক্ষাতকারে সে বলে, আমেরিকা ছিল একটি জুডো- খ্রিস্টান জাতি, মুসলিম শরণার্থীদের গ্রহণ করা তাদের জন্য জাতীয় আত্মহত্যার শামিল।
স্টিভ ব্যানন: স্টিফেন মিলারের সাথে মিলে ব্যানন মুসলিম নিষেধাজ্ঞার প্রথম নীল নকশা প্রণয়ন করেন। ইসলাম শান্তির ধর্ম নয়, ইসলাম বশ্যতা ও দাসত্বের ধর্ম বলে কটাক্ষ করেন। তিনি ইসলামকে সবচেয়ে উগ্রবাদী ধর্ম হিসেবে উল্লেখ করেন।
রব তোলে, হিটলার ও নাজিইজম থেকেও অন্ধকারজনক কিছু হচ্ছে ইসলাম এবং ইসলামকে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শরিয়া আইনকে নাজিবাদ, ফ্যাসিবাদ ও কমিউনিজমের সাথে তুলনা করে। ব্যানন তার বক্তব্যে উল্লেখ করে, আমরা ইসলামি ফ্যাসিবাদের সাথে সুস্পষ্টভাবে যুদ্ধের ময়দানে আছি। মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মাঝে অস্তিত্বহীন এক যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে সে যুক্ত করে "আমি বিশ্বাস করি উগ্রবাদী ইসলামের বিরুদ্ধে খুব খুব খুব আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়া উচিত।" শরিয়া আইন টেক্সাসের ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে এবং ব্লাসফেমি বিষয়ে শরিয়া আইনের অনুসরণ চলছে- বলে মূল ধারার মিডিয়াগুলোতে অবান্তর আওয়াজ ওঠান স্টিভ ব্যানন।
ডকুমেন্টারিজাতীয় তিন ভাগে বিভক্ত একটি ছবির রূপরেখা প্রণয়ন করেন ব্যনন। যার আলাদা আলাদা নাম হলো the culture of intolerance, radical Muslims I enablers among us. আর সামগ্রিকভাবে ব্যনন এর নামকরণ করে- Destroying the Great Satan: The Rise of Islamic Fascism in America.
বৃটবার্ট নিউজ নেটওয়ার্কে 'রাজনৈতিক সঠিকপন্থা মুসলমান ধর্ষণ সংস্কৃতিকে দমন করেছে' 'জন্ম নিয়ন্ত্রণ মেয়েদের আকর্ষণহীন ও পাগলাটে করে তোলে' 'উপাত্ত: পশ্চিমা যুব মুসলিমরা হলো টিকিং টাইম বোমার মতো যেন উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের সাথে ক্রমবর্ধমান এক সহানুভূতি'। এসব উপহাস মার্কা শিরোনামে সংবাদ প্রচার করেন ব্যনন।
মাইকেল ফ্লিন: 'আমি ইসলামকে ধর্ম মনে করি না। আমি মনে করি এটি একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ। ইসলাম তার ধর্মপরিচয় বিশ্বব্যাপী গোপন করে আছে- বিশেষত পশ্চিমা বিশ্বে ও যুক্তরাষ্ট্রে। টেক্সাসের ডলাস শহরে 'অ্যাক্ট' নামক সংস্থার অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ইসলাম একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ। নিঃসন্দেহে সে ধর্মের ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। আরও বলেন যে, আপনারা জানেন আমি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দিনাতিপাত করেছি। ইসলাম হলো ক্যান্সারের মতো। এটা এখন মারাত্মক ক্যান্সারের রূপ ধারণ করেছে।
সাউথটন শহরের আহাভাত তোরাহ ধর্মকেন্দ্রে তিনি বলেন, 'নাজিইজম, ফ্যাসিজম, ইমপিয়ারিলিজম, কমিউনিজম-এর মতো আমরা আরও একটি ইজম-এর সম্মুখীন হচ্ছি। তা হলো ইসলামিজম। এই পৃথিবীর ১.৭ বিলিয়ন মানুষের শরীরে এই ক্যান্সার বাস করছে। এর মূলোৎপাটন করা তাই আবশ্যক।' আরও দাবি তোলেন 'উগ্রবাদী ইসলাম বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। যা আমাকে রাতের বেলা উপলব্ধি করায় যে শয়তান এখনো বিদ্যমান।
আল জাজিরায় প্রদত্ত এক সাক্ষাতকারে ফ্লেইন বলে, সে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিয়োজিত আছে। নিউইয়র্ক পোস্টের সম্পাদকীয় পাতার বিপরীতে লিখে 'ইসলামি বিশ্ব: এক বিরাট ব্যার্থতার নাম'। তার The Field of Fight নামক বইয়ে লেখে, শরিয়া একটি সহিংস আইন যা বর্বর বিশ্বাসে প্রোথিত। টুইট করে বলে, মুসলমানদের ভয় যৌক্তিক বিষয়।
মুসলিম-বিরোধী ধর্মান্ধতাকে বৈধতা প্রদান
"যদি এটি হাঁসের মতো চলে, হাঁসের মতো সাঁতার কাটে, হাঁসের মতো ডাকে তাহলে তা হাঁসই। ৭৭ প্রাবাসীবিরোধী আইনের উদ্দেশ্য ছিল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা ধর্মের মানুষজনকে লক্ষ্য করে প্রতিকূল ব্যবস্থা গ্রহণ করা।" মন্টনার গভর্নর স্টিভ বুলক
দেশজুড়ে মুসলিম-বিরোধী বিলের নাড়ি-নক্ষত্র
২০১০-২০১৮-র মধ্যে আমেরিকাজুড়ে মুসলিম-বিরোধী ২০১৮টি বিল ও আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। যার মধ্যকার ৮৩টি বিলের ৭টি মুসলিম-বিরোধী সংস্থার সাথে যুক্ত। এ ৮৩টি বিলের ৭২টি যুক্ত ছিল অসবৎযবৎঢ়ড়ষ চঁনষরপ চড়ষরপু অষষরধহপব (অচচঅ)-এর সাথে। অচচঅ একটি আইনি সংস্থা তবে এর ফান্ডিং সম্পর্কে কোনো তথ্য ইন্টারনেটে সহজলভ্য নয়। যার ৫৭টি বিল লিখিত বা সংশোধনী হয়েছিল ALAC মডেল ল্যাংগুয়েজ ব্যবহার করে। American Laws for American Courts (ALAC) হলো ডেভিড ইয়েরুশালমি রচিত উন্নততর আইন যা মূলত ইসলামের বিরুদ্ধে একটি চক্রান্ত।
শরিয়াহর বিরুদ্ধে ভীতি প্রচারে রিপাবলিকান অনুমোদন
২০১৭ সালে রিপাবলিকান জাতীয় কমিটি Listening to America নামে একটি অনলাইন জরিপ করে, যাতে নিম্নোল্লিখিত প্রশ্ন দুটি করা হয়-
১. আপনি কি শরিয়া আইনের সম্ভাব্য বিস্তারের বিষয়ে উদ্বিগ্ন?
২. আমাদের দিকে ধেয়ে আসা উগ্র ইসলামি সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করতে আপনি কি আরও কার্যকার পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন?
২০১২ সালে রিপাবলিকান জাতীয় সম্মেলন একটি পার্টি প্লাটফর্মে সংশোধনী আনে, যা কানসাসের স্টেট সেক্রেটারি ক্রিচ কোবাচ-এর মাধ্যমে উত্থাপিত হয়। যা মূলত মুসলিম-বিরোধী বিদেশি আইন প্রণয়নে শক্তি জোগায়। ২০১৬ সালের পার্টি প্লাটফর্মেও একই ধরনের প্রয়াস দেখা গেছে।
ইসলামোফোবিয়ার পরিসমাপ্তি?
ইউরোপ-আমেরিকার অবকাঠামোগত বর্ণবাদের দীর্ঘ ইতিহাসের খুব গভীরে ইসলামোফোবিয়া প্রোথিত। জরিপ বলছে যে, তা আমেরিকান সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। তাই মুসলিম-বিরোধী ধর্মান্ধতা অদূর ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হবে, এমন আশা করা অমূলক।
যাইহোক, এটাও ভাবার বিষয় যে, মূলধারার জনপরিসরগুলোতে ইসলামোফোবিয়ার কুশীলবদের নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের কাজের দৃশ্যমানতা এবং তাদের কাজের নিন্দা ও সমালোচনার পরিমাণও বেড়ছে। বিদেশিদের নিয়ে আতঙ্কে থাকা রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা মুসলিম রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম বাস্তবায়ন করার পদক্ষেপ নিয়েছে এবং মুসলিমদের অভিবাসনে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরওপের জন্য চাপ প্রয়োগ করেছে। জনগণ এতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং আদালত ন্যায়ের পক্ষে রায় দেয়। যেসব প্রার্থী ইসলামোফোবিয়ার প্রচারণা চালিয়েছে তাদের চেয়ে বিরোধীদল- যারা প্রচারণা চালায়নি তারা ভালো করেছে। ২০১৬-২০১৮-র মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম প্রার্থী পাবলিক অফিসে নির্বাচিত হয়েছে। ২০১৯ সালে কনগ্রেসের হলে দুজন মুসলিম মহিলার অন্তর্ভুক্তি হয়েছে।
জনপরিসরে মুসলিম ও ইসলাম সম্পর্কে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি আরও উন্নততর আচরণের সংকেত থাকা সত্ত্বেও ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যে লোকসান করা হয়েছে তার ক্ষতিপূরণের জন্য প্রচুর শ্রম দিতে হবে।
এ প্রতিবেদন তৃতীয়পক্ষ বা নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের জন্য একটি স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবি প্রদান করছে, যারা তাদের কলিগদের এবং বিশাল জনগোষ্ঠীকে সচেতন করে সাহায্য করতে চায় একটি জটিল জাল সম্পর্কে। যে জালটি ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কের অর্থায়ন করে, সমর্থন জোগায় এবং পৃষ্ঠপোষকতা করে।
যখন বিভিন্ন সমীক্ষা ইসলামোফোবিয়া অর্থায়নের ইঙ্গিত প্রদান করে, এই প্রতিবেদন আমেরিকার মূল ধারার মানবহিতৈষী ও একরোখা ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কের সাথে সংযোগ তৈরি করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ক্ষমতায়ন করতে পছন্দ অবহিতকরণ ও সংযুক্তি শনাক্তকরণে অনেক কিছুই করা হয়েছে। তবে এসব প্রোগ্রাম বাস্তবায়নে কারা অংশীদার ও সহায়তার জন্য আগত আর্থিক প্রণোদনার উৎসই বা কি? (তা অধরাই থেকে যায়)। যদিও এটা আশা করা বাতুলতা যে, বহু মিলিয়ন ডলারের ইসলামোফোবিয়া শিল্প রাতারাতি উধাও হয়ে যাবে না, তবে পাঠকগণ উল্লেখযোগ্য সংস্থা, বিপুল জনগণ, সমাজসেবক সম্প্রদায় যে চুপ করে বসে থাকার পাত্র নয় তা আঁচ করতে পারবে। যখন মুসলিম-বিরোধী সংস্থাসমূহ তাদের এজেন্ডা ত্বরান্বিত করার জন্য আমেরিকান মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের অপব্যবহার করে চলছে।
আমরা আশাবাদী যে, স্থায়ী কর্মপন্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং নিবেদিত ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে উন্নয়নশীল সমাজ ও মূল ধারার মিত্ররা মিলে ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্ককে সমাজের প্রান্ত সীমায় পিছু হটাতে বাধ্য করবে।
ভাষান্তর : হাবিবুর রহমান রাকিব
টিকাঃ
[৭৬] গ্রীক রূপকথায় 'হাইড্রা' এমন এক ক্ষুদ্রকায়-শক্তিশালী ন'মাথার জলজ সাপাকৃতির দৈত্য যার একটি শিরশ্ছেদ করলে তাজা ক্ষত থেকে জন্ম নেয় দুটি শির-বিটানিকা। এখানে ট্রাম্প প্রশাসন ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কে কতটা অক্ষয় তা বুঝাতে রূপকার্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
[৭৭] এটি একটি প্রবাদ, যা ডাক টেস্ট নামেও পরিচিত। কারো বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে সে পরিচিত হয় এটি এ প্রবাদের গূঢ়ার্থ।
📄 ইসলামোফোবিয়ার দায়ভার বনাম অপবাদের রাজনীতি
তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে জেনারেল মঞ্চে উঠে এলেন। মিসরীয় প্রেসিডেন্টের বিশেষ ভাষণের দিন। ২৭ রমজানে সাধারণত প্রেসিডেন্টরা মিসরীয় জাতির উদ্দেশে বিশেষ ভাষণ দেন। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের রমজানে মঞ্চে এলেন প্রেসিডেন্ট আব্দুল ফাত্তাহ সিসি। প্রেসিডেন্ট সিসি শুরুতেই ইসলামোফোবিয়ার কারণ, অনুঘটক ও বিস্তারিত বয়ান দিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রেসিডেন্টের আলোচনার মূল ভাবই হলো ইসলামোফোবিয়ার মৌলিক কারণ, কিছু মুসলিমের কিছু কর্মকাণ্ড। যদিও এবারই প্রথম নয়, বরং ইতোপূর্বে তিনি এমন বলেছেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আল আজহারের ইমাম শায়খ তায়্যিব এর তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। আরও হতাশার বিষয় হলো- আরব গণমাধ্যম ও বিভিন্ন প্লাটফর্মে অনেক আলোচক ও মুহাদ্দিস ইসলামোফোবিয়ার দায় মুসলিমদের ওপরই দিচ্ছেন! কেউ তো এটার খুবই সরলীকরণ করেছেন। সন্দেহ নেই, কিছু ব্যক্তি তুচ্ছ ব্যক্তিস্বার্থে এমনটা করছেন।
ইসলামোফোবিয়া-সংশ্লিষ্ট পরিভাষার পক্ষ-বিপক্ষের আলোচনা করব না আমি। মুসলিম, মুসলিম সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিরুদ্ধে কতটা গভীর ঘৃণা ও - বিদ্বেষ সমাজ, রাজনীতি ও গণমাধ্যমে নির্বিচারে প্রচারিত হচ্ছে তার কিছুটা তুলে ধরবো আমি। এটা একদমই অসমর্থনযোগ্য ঘৃণা ও বিদ্বেষ। আরব ও ইসলামি দুনিয়ায় ইসলামোফোবিয়াকে যতটা আত্ম-সমালোচনা ও সরলীকরণ হিসেবে দেখা হয়, ততটা নয়। বরং শেকড় আরও বহু গভীর ও বহু শাখাপ্রশাখাসমৃদ্ধ।
মুসলিমদের আচরণ দ্বারা ইসলামোফোবিয়ার ব্যাখ্যা করা
কেউ কেউ সদিচ্ছা আবার কেউ হয়তো কুমতলবে মুসলিমদের কথিত আচরণের মাধ্যমে ইসলামোফোবিয়ার ব্যাখ্যায় আগ্রহী হন। তারা মুসলিমের আচরণকে ইসলামোফোবিয়ার মূল কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু এই তত্ত্বের ব্যাখ্যাদাতারা যে বড়ো ধরনের ভুলের শিকার হয়েছেন, তা তারা বুঝতে পারছেন না। তাদের নিকট মুসলমানের শুধু নেতিবাচক ও নিন্দনীয় অবস্থায়ই সামনে আসে। একটি সমাজের ব্যাপকভিত্তিক ইতিবাচক আচরণকে উপেক্ষা করে শুধু নেতিবাচক দিক দ্বারা পুরা সমাজের ওপর বিধান আরওপ করা খুবই অন্যায়। একটি অবকাঠামোর এক-পঞ্চমাংশের অসুস্থতা কি পূর্ণ কাঠামোর অসুস্থতাকে অনিবার্য করে তোলে?
ভিকটিমকে দায় দেয়ার তত্ত্ব মেনে নেয়ার দ্বারা নাৎসি ও ফ্যাসিস্টদের হাতে সাদা চেক হস্তান্তর করার নামান্তর। অন্যদিকে এদের কুৎসিত চেহারা ফুটে ওঠে যখন আমরা দেখি, ভিকটিমকে দোষারোপ করার নীতি সকল স্থানে প্রয়োগ করে না। বরং সমাজের সংখ্যালঘু প্র্যাক্টিসিং মুসলিমসহ ধর্মীয় ব্যক্তিদের দেয়া হয়। কিছু সরল ও বিভ্রান্ত ব্যাখ্যা অনুমিত হয়, আমাদের জগতের সমস্যা শুধু মুসলিমদের মধ্যে। অন্যরা কোনো ভুলই করে না। কিংবা তাদের ভুল ক্ষমাযোগ্য। যেন তারা বর্ণবাদ مسلمانوں দেখেই শিখেছে এবং প্রয়োগ করেছে।
ভিকটিমের আচরণের মাধ্যমে ঘৃণা ও বর্ণবাদী প্রবণতার ব্যাখ্যা করাটা পরিপূর্ণ অন্যায়। এই ব্যাখ্যায় ভুক্তভোগীর নিন্দা করা হয় এবং অপরাধীকে সহযোগিতা করা হয়। বর্ণবাদের মূল উৎস অনুধাবনে কিন্তু এই কর্মপন্থা কোনোভাবে সহায়ক হয় না। একই সাথে এ ধরনের কার্যপদ্ধতি সমস্যার সমাধানের নামে বিভ্রান্তিকর বিকল্প তৈরি করে। ভুক্তভোগীর নিন্দাকে শুধু তার প্রতি লাল কার্ড প্রদর্শনেই ক্ষান্ত হয় না। বরং বিশ্বজুড়ে ঢেকে যাওয়া বর্ণবাদের দায় ইসলামের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। বর্ণবাদী প্রবণতা এবং আত্মসমালোচনার মধ্যে পার্থক্য না করে এসব তাত্ত্বিকরা-বিদ্বেষ ছড়ানো এবং মূল্যবোধ লঙ্ঘন করতে থাকেন।
বাস্তবতা উপেক্ষা করে ভুক্তভোগীর নিন্দা করা
মুসলমান এবং তাদের আচরণের সাথে ইসলামোফোবিয়ার সম্পর্ক জুড়ে দেয়ার অর্থ হলো, বিশ্বের নিকট গ্রহণযোগ্য হতে হলে মুসলমানদের পরিবর্তন করতে হবে। আর তাদের নিকট বিশ্ব বলতে পাশ্চাত্যই। এটা আসলে তাদের কিছু পরিকল্পিত আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য মগজ ধোলাইয়ের একটি মাধ্যম। এসব বক্তারা কখনো পশ্চাৎপদতা ও চরমপন্থার পেছনের মূল বিষয় তুলে ধরার প্রয়োজন অনুভব করে না। যদি মেনে নেয়া হয় যে, 'আমাদের মধ্যকার সমস্যার মূল কারণ আমরাই'। যার দাবি হলো 'আমরা পরিবর্তন হই, যাতে বিশ্ব আমাদের গ্রহণ করে'। এটি তো বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মতো। বৌদ্ধিক ব্যক্তিরা মস্তিস্ক সচেতন রেখে নিজেদের মূলনীতি ও মূল্যবোধকে সংরক্ষণ করবে। যাতে দেশের ভিতরে ও বাইরে তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়।
কিন্তু এই তাত্ত্বিকরা কখনো মানবাধিকার, মানবমর্যাদা ও মজলুমের অধিকার সচেতন হতে সাহস করে না। জনগণের মধ্যে অর্থবৈষম্য, সম্পদের অসম বন্টন ও ধনী-গরিবের বিশাল ফারাক নিয়ে কথা বলাটা যতোটা কঠিন, তাদের নিকট ঠিক ধর্মের মূলপাঠ পূনর্বিবেচনার আহ্বান করাটা ততটাই সহজ। এদের বৈপরিত্য খুব সহজেই প্রকাশ পায়, যখন তারা মুসলমানদের অন্যদের সাথে সহাবস্থান বজায় রাখার জন্য কুরআন-সুন্নাহের দলিল দেয়। কিন্তু তারাই আবার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ইসলামোফোবিয়ার দায় পুরা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে আর তারা কুরআনের আয়াত খুঁজে পায় না।
কিছু মানুষ বুঝতে চায় না, কীভাবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বর্ণবাদ প্রকাশ পাচ্ছে। যুগে যুগে কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করেছে এই বর্ণবাদ। مسلمانوں নিন্দা করতে বয়ান-বিবৃতিতে বর্ণবাদ ব্যবহার করে বিশ্বের নিকট গ্রহণযোগ্য হতে পরিবর্তনের কথা বলে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য। অথচ এরাই জনগণের অধিকার ও প্রাপ্য না দিয়ে জনগণের থেকে লঙ্ঘিত সেসব মূল্যবোধের নিন্দায় সরব থাকে, যে মূল্যবোধ একই সাথে পাশ্চাত্য বিশ্ব ও ইসলামের নিকট সমান গ্রহণযোগ্য।
তাদের বক্তব্য কি এটাই দাবি করছে, মুসলিমরা অন্যদের মতো মানুষ নয়। অন্যদের মতো তাদের থেকে কোনো দোষত্রুটি প্রকাশিত হতে পারবে না। মানুষ তো কখনো ভালো করে, কখনো মন্দ করে। কখনো তো কোনো সমাজের একজন সদস্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাপে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারে। এ জন্য দেড় বিলিয়নের বেশি জনগোষ্ঠীর মূল দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশ কাটিয়ে বিচ্ছিন্নতাকে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করার কোনো অর্থ হয় না। বিশ্বের জাতিগোষ্ঠীর উত্থান-পতনের জটিল সমীকরণ অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।
অনেকে অবচেতনভাবে ভুক্তভোগীর ওপর দায় চাপিয়ে দেন, যদিও তারা এটা অনুভব করেন না। সমাজের অপরিণত গোষ্ঠীর বক্তব্য এবং মানব সমাজের অমোঘ নিয়ম সম্পর্কে অনবগতিই এর উল্লেখ্যযোগ্য কারণ। ইতোপূর্বেও এমন দেখা গেছে। সমাজের নির্দিষ্ট অঙ্ক আরও পরিষ্কার করে বললে ইহুদিদের একটি গোষ্ঠীর অপরিণত কর্মকাণ্ডের কারণে তারা গণহত্যার শিকার হয়েছে। এবং এই অসদাচরণকে তাদের ওপর নির্যাতন করার পক্ষে কারণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে তৎকালীন জাতীয়তাবাদীরা। নাৎসিদের বর্ণবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ কিন্তু আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের ওপর বিশ্বাস করতো না। এই জাতীয়তাবাদের বলি শুধু ইহুদিরা নয়। বরং অন্যান্য জনগোষ্ঠীও এর শিকার হয়েছে। আর এখন ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে উগ্র ডানপন্থি নব্য নাৎসিদের প্রধান শিকার হচ্ছে মুসলিমরা।
চরমপন্থা ও ইসলামোফোবিয়া
বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে থাকা কিছু ব্যক্তি মুসলিমদের আচরণকেই ইসলামোফোবিয়ার দায় হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই সমস্যা মোকাবিলায় 'চরমপন্থার মোকাবিলা' শীর্ষক আলোচনার শিরোনামেই বড় ধরনের গলদ রয়েছে। এতে তাদের পূর্ব কল্পিত চিন্তাপ্রবণতার স্পষ্ট ছাপ থাকে। কিছু মানুষ তো চরমপন্থার মোকাবিলায় আবার নিজেরাই চরমপন্থা অবলম্বন করেন। এমনকি মানবীয় মহান মূল্যবোধ ধারণ করার আহ্বান করে তারাই আবার তা নিজ পায়ে পদদলিত করেন। সমাজের কোনো অনুষ্ঠানে চোরকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে একজন নির্দিষ্ট মুসলিমদের পরিচয় করিয়ে দেয়া এবং অন্য ধর্মাবলম্বী তথা হিন্দু, খ্রিস্টান, ইহুদি ও নাস্তিককে এড়িয়ে যাওয়াকে অবশ্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলতে হবে।
ইসলামোফোবিয়া রোধে ভাবমর্যাদা উন্নয়ন
কিছু কিছু মুসলিম তাদের সামাজিক পরিমণ্ডলে ভাবমর্যাদা উন্নয়নের লক্ষ্যে খুব প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। প্রতিবেশী মুসলিমের প্রতি সদাচার সকল মুসলিমের ওপর নিঃসন্দেহে প্রভাবক নয়। হয়তো সর্বোচ্চ বলা হবে, সে একজন ভালো প্রতিবেশী। তাকে কখনো বলা হবে না 'সে আদর্শিক মুসলিম'। হ্যাঁ, বলবে, সে আমাদের অনেকটা কাছাকাছি।
বর্ণবাদ ও ঘৃণাচর্চার এই আদর্শ কোনো বিশেষ যৌক্তিক ভিত্তির ওপর স্থাপিত নয়। বরং এই বর্ণবাদ বেছে বেছে তার চিত্র প্রকাশ করে শুধু মুসলমানের সামনে। কিছু আরব ও মুসলিম দেশ তাদের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল করার স্বার্থে প্রশাসনে নারীদের নিয়োগ দেয়। বৈদেশিক প্রচারণায় বিভিন্ন ডেলিগেট হিসেবে তাদের অগ্রাধিকার প্রদান করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতৃপ্ত পাশ্চাত্যের বক্তব্য হলো- 'পাশ্চাত্যের অনসরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে তোমাদের'। এক্ষেত্রে যে আরব কিংবা মুসলিমদের মৌলিক চারিত্রিক উৎকর্ষতা ও পরিচয়ের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য অবশিষ্ট থাকে না, তা এখানে বলা বাহুল্য! তবে ভাবমর্যাদা উন্নয়নের কী অর্থ হলো?
কিছু মানুষ আবার চরিত্র ও আচরণ সংশোধন এবং বর্ণবাদ ও ঘৃণাপ্রকাশ বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। তাদের বক্তব্য মুসলিমকে সংশোধন হতে হবে। তাদের দাবি অনুসারে বলতে হয়, কোনো মুসলিম-কর্তৃক কৃত নির্দিষ্ট বিব্রতকর আচরণ কি সকল মুসলমানকে দোষীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে? মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম হোক! ব্যক্তির আচরণ দ্বারা কি গোষ্ঠীকে অভিযুক্ত করা ন্যায়সঙ্গত?
অনেকে পাশ্চাত্য মুসলিমদের ভাবমর্যাদার বৃদ্ধির অংশ হিসেবে মুসলমানদের শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। পাশ্চাত্য তো তাদের বাইরের গোষ্ঠী, সমাজ ও রাষ্ট্রকে জগতই জ্ঞান করে না, বরং তৃতীয় বিশ্ব ইত্যাদি নাম দ্বারা অভিহিত করে মানসিকভাবে নিপীড়ন করে। অথচ আমার মতে, কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের শক্তিশালী হওয়ার অর্থই পাশ্চাত্যের সাথে কৌশলগত লড়াই-সংঘাতের রাস্তা প্রশস্ত হওয়া। শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা থাকা সত্ত্বেও ইসলামোফোবিয়াকে এটা আরও উস্কে দেবে।
পাশ্চাত্যে মুসলিমদের অর্জনকে উপেক্ষা করা
অনেকের ধারণা 'মুসলমানদের ভাবমর্যাদার উন্নয়ন হলে পাশ্চাত্য তাদের ইজ্জত দেবে। এই অর্জন ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি ঘৃণার মাত্রা হ্রাস করবে।' যদি এটা বলি তবে নিশ্চিত বাড়িয়ে বলা হবে না যে, ইউরোপের অধিকাংশ দেশের হাসপাতাল থেকে যদি বিশেষজ্ঞ মুসলিম ডাক্তার প্রত্যাহার করা হয়, তবে সব হাসপাতাল অচল হয়ে পড়বে। আরব ও ইসলামি বিশ্বের অনেক মেধা শরণার্থীর ঢলের সাথে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। হ্যাঁ, এটা সত্য! ইউরোপ আশ্রয় দিয়েছে কিন্তু তাদের যে জীবনের সব মহাঅর্জন তারা বিতরণ করেছে, অভিজ্ঞতা দিয়েছে' তা কিন্তু কম নয়।
সবসময় কিছু আওয়াজ তো বৈচিত্র্যময় অর্জনের কথা বলতে থাকে। ভাবমর্যাদা উজ্জ্বলের কথা বলে। অন্যরা নাকি এতে আমাদের স্বীকৃতি দেবে। ইউরোপের মাঠকাঁপানো তারকা মুহাম্মাদ সালাহ, মাসউদ ওজিল, যায়নুদ্দিন যায়দান ও সামী খাদিরাহের মতো ব্যক্তিদের অর্জন কিন্তু তেমন পরিবর্তন আনেনি। বরং তা আরও বর্ণবাদের তাপকে বাড়িয়েছে।
জীবিত ব্যক্তিদের অবদানে যদি কারো সন্তুষ্টি না আসে, তবে মাটির ভেতর সন্ধান করতে পারেন। গত দুটি বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের হয়ে যেসব মুসলিম জীবনদান করেছে, তাদের দিকে দেখুন। সেসব কবরস্থান দেখুন! একটি জাতির জন্য রক্তদানের থেকে বড়ো কোনো দান হতে পারে না। ফ্রান্স, ব্রিটেন ও অস্ট্রিয়াসহ আরও অনেক ইউরোপীয় শক্তির পক্ষ হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্র শক্তির পক্ষে প্রায় পঁচিশ লাখের বেশি মুসলিম সৈন্য লড়াই করেছে। হতে পারে সেসব যুদ্ধ ছিল অনৈতিক ও অবৈধ। এসব সৈন্যদের মরদেহ বিভিন্ন গ্যারিসন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ইসলামোফোবিয়ার এসব ব্যাখ্যাদাতারা কিন্তু ফ্রান্সের, ইংল্যান্ডের, বেলজিয়াম, ইতালি, কিংবা অস্ট্রিয়ার গ্যারিসনের গোরস্তানে অনুসন্ধানের সুযোগ পায়নি।
যারা সফলতা ও অর্জনের খবর জানতে চান, তারা তো জানতে পারবেন। কিন্তু যে বিষয় সম্পর্কে সতর্ক থাকার কথা বলি তা হলো, ভাবমর্যাদা বাড়াতে নতুন নতুন সফলতা ও অর্জনে উৎসাহিত করার মধ্যে কোনো মানবাধিকার তো থাকে না। কারণ, যারা কোনো উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জনে সক্ষম নয়, তাদের সাথে কি তবে বর্ণবাদী ও ঘৃণামূলক আচরণ করার সুযোগ রয়েই যাচ্ছে! এটা তো দেখা যাচ্ছে, অর্জনহীন মানুষকে মূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই, তাকে নিদেনপক্ষে মানবিক সম্মানও দেয়া যায় না!
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা
পাশ্চাত্য ও ইউরোপীয় গণমাধ্যমের স্বাভাবিক ট্রেন্ড হলো- কোনো হামলার ঘটনায় হামলাকারীর পারসোনাল লাইফকে পৃথক রাখা। প্রায়ই 'হামলাকারী মুসলিম' শুধু এই তথ্যের আলোকেই ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিভিন্ন তথ্য তুলে আনতে থাকে। কোন জনবহুল মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে সে থাকে, কোন মসজিদে নামাজ আদায় করতো এবং তারপর ঐ মসজিদের ইমামকেও কোনোভাবে সন্দেহের তালিকায় আনার চেষ্টা করা। গণমাধ্যম কর্তৃক এই প্রতিবেদন আসার সাথে সাথে এলাকাটির মুসলিমরা, তাদের বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান অপরাধের সাথে তাদের ধর্ম ও ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার কথা নাকচ করে দিয়ে বিবৃতি দিতে থাকেন।
তাছাড়া আরও একটি দৃশ্যমান অজুহাত খুবই সচারচার দেখা যায়, কোনো মুসলিম কর্তৃক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পর গণমাধ্যমগুলো একটি বিষয় চেপে যায়; হামলাকারী মানসিক বৈকল্যতায় ভুগছিলেন কি না? অথচ অমুসলিম কেনো ব্যক্তি যদি এমন হামলার সাথে জড়িত হতো, সেক্ষেত্রে গণমাধ্যমে ব্যাপক আকারে প্রচারিত হয়, হামলাকারী বন্ধুর বিচ্ছেদে কিংবা অর্থনৈতিক সংকটে মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। প্রতিটি হামলার পর এ ধরনের কর্মপন্থা খুবই স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়। অন্যদিকে ইন্টারনেটের সার্চ ইঞ্জিনগুলোতে সন্ত্রাস ও সহিংসতা শব্দ সার্চ করলেই তার সাথে ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে সম্পর্কিত কোনো কী ওয়ার্ড চলে আসে।
পাশ্চাত্যের ইসলামোফোবিয়া
পাশ্চাত্যের ইসলামোফোবিয়া আজকের নয়। নাৎসি জার্মানির জাতীয়তাবাদী চিন্তার প্রধান অনুঘটক বর্ণবাদ এবং এন্টিসেমেটিজম। ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা এই ইসলাম-বিদ্বেষ থেকে ইউরোপ এখনো মুক্ত হতে পারেনি। বরং শরণার্থী ও ভিনদেশিদের প্রতি বর্ণবাদী আক্রমণ সত্তর ও আশির দশকে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তারপর নব্বই এর দশকে এটার তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পেতে পেতে উপস্থিত হয় ২০০১ সালের এগার সেপ্টেম্বর। এই তারিখের পর থেকে শরণার্থী, বহিরাগত ও বিদেশি বিশেষত মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতা বহুমাত্রিকতা পায়। ইউরোপজুড়ে মুসলিমদের ওপর হামলা শুরু হয়। এরপর থেকে পশ্চিম গোলার্ধের এই অঞ্চলটি ইসলামবিরোধী একটি বিশেষ পরিমণ্ডলে রূপ নেয়। গত কয়েক বছর থেকে রাজনীতিবিদরা বিশেষত চরম ডানপন্থিরা তাদের নির্বাচনি প্রচারণায় ইসলামোফোবিয়াকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করছে। যেমন- ফ্রান্সের জাতীয়তাবাদী দল, অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টি, বেলজিয়ামের ফালামিস পার্টি ও সুইডেনের সুইডিশ পার্টিসহ আরও অনেক দেশের অনেক দল রয়েছে। তাছাড়া গত পনেরো বছরে খোদ মধ্যপন্থি দলগুলোও ইসলামোফোবিয়ার বিভিন্ন বক্তব্যকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কোথাও তো ইসলামবিরোধী আইন কার্যকর করেছে মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ইসলাম-বিরোধী আইনের কারণে মিনার নির্মাণে নিষেধাজ্ঞাসহ মসজিদ বন্ধ করা হয়েছে। মুসলিম নারীদের হিজাবের প্রতি নিষেধাজ্ঞা প্রদানের পাশাপাশি মুসলিম কমিউনিটিকে পর্যবেক্ষণে বিশেষ আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে। অপরদিকে অস্ট্রিয়ার ইসলামবিরোধী আইনের মতো বিভিন্ন বর্ণবাদী আইনেরও স্বীকৃতি দিচ্ছে বিভিন্ন দেশ। এসবকিছুই একজন মুসলিমকে পাশ্চাত্য সমাজ ও সভ্যতার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করছে।
এখানে বর্ণবাদ-পাঠে একটি গভীর দৃষ্টিভঙ্গি দৃষ্টিগোচর হয়। বর্ণবাদ কখনো বর্ণবাদের শিকার ব্যক্তিদের সামনে আনে না। বরং তারা সবসময় সামনে আনে বর্ণবাদীকে। বর্ণবাদী শুধু তার বক্তব্যই বলে যায়। কিন্তু বর্ণবাদের শিকার ব্যক্তি কিন্তু তার কোনোকিছু বলার সুযোগ পায় না। উদাহরণস্বরূপ- সবসময় মানুষের মনে একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়, সুইডেনে মিনার নির্মাণ- বিরোধীদের কথাই গণমাধ্যমে আসে। 'এখানে বলতে গেলে মুসলিম নেই বা খুবই অল্প। এ অঞ্চলে মসজিদের প্রয়োজন নেই।' এভাবে ব্যক্তি-স্বার্থ হাসিলের জন্য রাজনীতিবিদরা ইসলামোফোবিয়াকে ব্যবহার করে। ২০১৫ সালে অস্ট্রিয়ার সাধারণ নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টি তাদের নির্বাচনি প্রচারণায় 'শরণার্থী ও ইসলামায়নের বিশৃঙ্খলা কিছুতেই চলতে দেয়া হবে না'- এই শিরোনাম ব্যবহার করে।
বর্তমানে তো ইসলামোফোবিয়া একটি নতুন আদর্শ খুঁজে পেয়েছে। ইসলামোফোবিয়ার সমর্থকরা নিখাঁদ খ্রিস্ট রাজ্য নির্মাণের ইচ্ছা পোষণ করছে। কিছুদিন আগে এস্তোনিয়ার রক্ষণশীল সমাজকল্যাণমন্ত্রী খ্রিস্টান শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর যৌক্তিকতায় একপর্যায়ে দাবি করেন, 'যাই হোক আমরা খ্রিস্ট সভ্যতার সাথে সংশ্লিষ্ট একটি দেশে আছি।'
পোল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইফা কোপাকজ তার দেশকে খ্রিস্টান রাষ্ট্র বলে অভিহিত করেন। খ্রিস্টান জনগণকে সাহায্য করা পোল্যান্ডের দায়িত্ব বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রকৃতপক্ষে এটা কোনো বিচ্ছিন্ন দাবি নয়। বরং এর গভীর কারণও রয়েছে।
পোল্যান্ডের অভিবাসন এজেন্সি জানায়, 'শরণার্থীদের আবেদন গ্রহণে ধর্মীয় ব্যাকগ্রাউণ্ড যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে। হাঙ্গেরিতে বিশালসংখ্যক শরণার্থী মানুষ রয়েছে। দেয়ালহীন ইউরোপের ঐক্যের প্রতীক বহুজাতিক তত্ত্ব আজ হুমকির মুখে।'
হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ফিকো জানান, 'যারা দেশে ঢুকছে, এরা অন্য ধর্মের অনুসারী। তারা পুরোপুরি ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। এদের অধিকাংশ খ্রিস্টান নয়, এরা মুসলিম' এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- ইউরোপ এবং ইউরোপের পরিচিতি কি খ্রিস্টধর্মের প্রচার-প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ? উল্লিখিত বক্তব্যগুলোর ভেতর স্পষ্টভাবেই মুসলিম শরণার্থীকে আলাদা রাখা হয়েছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, 'আমরা তাদের প্রবেশ করতে দেবো না। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের দেশে এত সংখ্যক মুসলিম শরণার্থী না নেয়ার সিদ্ধান্তে পূর্ণ অধিকার আমাদের আছে।' ৭৮
টিকাঃ
[*] ইংরেজি প্রবন্ধ অবলম্বনে
📄 ফোবিয়ার চ্যালেঞ্জে ইসলাম
ক্রুসেড যুদ্ধেকে নিরূপদ্রব চালিয়ে যাওয়ার জন্য জর্জ বুশের চেতনাদীপ্ত বাণীই হোক অথবা নবি আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর কঠোরতর প্রশিক্ষণের কালিমালেপন কিংবা জিহাদকে হিংস্রতা বলে ব্যক্ত করার কার্যত কৌশল- এই সবকিছুর পেছনে একটা উদ্দেশ্যই নিয়ামক। ইসলামকে একটি বর্বর ধর্মাদর্শ সাব্যস্ত করে বিশ্বব্যাপী তার গ্রহণযোগ্যতাকে বাধাগ্রস্ত করা।
এতদসত্ত্বেও যে ইসলাম একটি শান্তি, শৃঙ্খলা, মধ্যমপন্থি এবং সহজতর মাযহাব। কঠোরতা, বিশৃঙ্খলা, স্বেচ্ছাচারিতা, গোঁড়ামি হুলুস্থুল যতো কর্মযজ্ঞের সাথে ইসলামের সম্পর্ক তেমনই; যেমন সম্পর্ক আঁধারের সাথে আলোর। দিনের সাথে রাতের এবং সত্যের সাথে মিথ্যার। ফিরে দেখা ইতিহাসে পশ্চিম এবং ইসলামের এই অন্তর্দ্বন্দ্ব তো যথেষ্ট প্রাচীন ও সেকেলে।
ইসলামের বিস্তৃতির পর থেকেই খ্রিস্টানবিশ্ব মুসলমানদের ওপর ক্রুসেডের নামে; এক-দুটি নয়, সাত-সাতটি ক্রুসেড যুদ্ধ চাপিয়েছে।
পরবর্তীতে সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ূবীর বিজয়ের মাধ্যমে সেই ধারার সমাপ্তি ঘটে। সেসময় সম্রাট নবম লুই مسلمانوں হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভের পর পশ্চিমাদের উপদেশ প্রদান করেছিলেন যে, 'যদি তোমরা مسلمانوں ওপর বিজয় লাভ করতে চাও; তবে তোমরা যোদ্ধা বাহিনী তৈরির পরিবর্তে তাদের আক্বিদার ওপর আঘাত করো। যাতে করে مسلمانوں ভবিষ্যৎ বংশধররা পাকা ফলের মতো তোমাদের ঝুড়িতে এসে পড়ে।' সম্রাট ফ্রান্সিসের ওই উপদেশের ওপর ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের থেকে orientalist এবং ঈসায়ী মুবাল্লিগরাই বেশি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। রোমের পোপের; ইসালাম এবং পয়গম্বরে ইসলাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর আরোপিত ভিত্তিহীন অভিযোগ, এরই ধারাবাহিকতার অংশ।
বিশেষত তার এই আপত্তি যে, 'পৃথিবীতে ইসলাম তরবারির জোরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।' এই প্রচারণারই একটা অংশ; যা পশ্চিমারা ইসলামের বিরুদ্ধাচরণের জন্য তুলে রেখেছে। চিন্তা ও কাজের দিক থেকে যার উদ্দেশ্য ইসলামের মোকাবিলায় পিছ পা হওয়ার পর; পৃথিবীকে তার ব্যাপারে পথভ্রষ্ট করা। অতীতে এমনতরো অপবাদের দালিলিক জবাব উলামা, ফুকাহারা দিয়েছেন। হিন্দুস্থানে আল্লামা শিবলী নু'মানী 'সিরাতুন্নাবী' লিখে পয়গম্বরে ইসলাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মানবিক বৈশিষ্ট্য এবং চিন্তার ব্যাপকতা সাব্যস্ত করেছিলেন। স্যার সৈয়দ রহ. ও যুগের বদনাম এবং উইলিয়াম ম্যুরের সিরাতুন্নাবীর ওপর করা কতক আপত্তির জবাব দিয়েছেন। অন্যান্য মুফাক্কিরে ইসলামরাও ইসলামের ওপর আরওপিত বিশেষত 'ইসলাম তরবারির জোরে পৃথিবীতে বিস্তৃত হয়েছে' অভিযোগের প্রশান্ত জবাব দিয়ে একথা স্পষ্ট করেছেন যে, ইসলাম তার প্রকাশকাল থেকেই শান্তির মাযহাব ছিল।
পৃথিবী অবগত আছে যে, মক্কা মুকাররমা যেখান থেকে ইসলামের রবি প্রথম বিকিরিত হয়েছে, সেখানে তরবারি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে নয়; বরং তাকে অমান্যকারীদের কজায়ই ছিল। নবিয়ে পাক সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যেই প্যানেল যুদ্ধবাজের তকমা লাগায়; তারা ওই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে যে, হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৫৩ বছর বয়স অব্দি যুদ্ধ তো দূরের কথা; তরবারিই হাতে নেননি। এমনকি তখন আরব সংস্কৃতিতে যুদ্ধ-বিগ্রহ ব্যাপক ছিল। প্রত্যেকেই অল্প বয়সে সৈনিক হিসেবে গড়ে ওঠতো। জীবনের শেষ লগ্নে এসে; মদিনায় অবস্থানকালে হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সেসব রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়েছে; তারা তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধের ময়দানে আগমণ করেন। তখন তিনি যুদ্ধকে ইবাদত বানিয়ে দেন। আদেশ জারি হয় যে, মহিলা, বাচ্চা, বৃদ্ধা-বৃদ্ধ, অসুস্থ এবং ইবাদতখানায় আশ্রিত কারো ওপর যেন হাত ওঠানো না হয়! ঐশ্বরিক ফরমান ছিল, শুধু তাদের সাথেই যুদ্ধ কর; যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধে উদগ্রীব। তাকিদ করেছেন যে, যদি প্রতিপক্ষ সন্ধি করতে চায় তবে তাদের সন্ধি-প্রস্তাব কবুল করে নাও।
নবিয়ে রহমত সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যাখ্যা করেন যে, যুদ্ধের উদ্দেশ্য বুঝে নাও। এটা না গণিমতের সম্পদ লাভের জন্য; আর না সক্ষমতা অর্জনের। কুরআনে জিহাদের উদ্দেশ্য এমন করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, যদি আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে একদলকে অপর দলের মাধ্যমে দমন না করতেন; তাহলে পাদ্রীদের খানকা, ইহুদি এবং নাসারাদের উপাসনালয় এবং मुसलमानों মসজিদ; যাতে অধিক পরিমাণে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয়, সবই ধ্বংস হয়ে যেতো। এজন্যই জোর গলায় এই দাবি উত্থাপন করা যায় যে, মুসলমানরা যেখানেই তরবারি উত্তোলন করুক না কেন; তাদের উদ্দেশ্য কেবলই নিজেদের এবং মজলুমদের তরফ থেকে প্রতিরোধই ছিল। অমুসলিমদের জোরপূর্বক ইসলামে দিক্ষিত করা মোটেই নয়। পাশাপাশি এমন একটি পরিবেশ গড়ার ইচ্ছে ছিল। যেখানে সমূহ মতবাদের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকবে। এবং সেসব ধর্মানুসারীরা কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই নিজেদের ধর্মীয় বিধান নির্বিঘ্নে পালন করতে পারবে।
রাসূল সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গোটা জীবনই বিশ্ববাসীর সামনে রয়েছে। যেখান থেকে এমন একটা উদাহরণও দেয়া যাবে না যে, কাউকে ইমান আনতে জবরদস্তি করা হয়েছে। কারণ এটাই, مسلمانوں অনেক নিকটাত্মীয়দের মৃত্যুও কুফর অবস্থাতেই হয়েছে। মক্কার কাফেরই হোক বা ইহুদি সম্প্রদায়; তারা ইসলামের মতো শান্তি আর ভাতৃত্বের ধর্ম এবং তাদের নীতি-নির্ধারকদের বিরোধিতা এজন্যই করেছেন যে, তারা বুঝতেন যে, মানবিক সমতা ও ভারসাম্যতার এই আন্দোলন; শতবর্ষ ধরে চলমান। এবং এই আন্দোলনই তাদের কর্মযজ্ঞ নিষ্ফল করে দেবে। ফলে মদিনায় যে উচ্চতর উসূলের উপর ইসলামি রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাকে বিচারকের আসনে বসার পূর্বেই নিষিদ্ধ করে দেয়া হবে। এই লক্ষ্যেই যুদ্ধের সিলসিলা শুরু হয়। ব্রিটিশ লেখক লর্ড রেডলে উল্লেখিত যুদ্ধের খুঁটিনাটি টেনে লিখেছেন যে, সেসব যুদ্ধে আহত ব্যক্তিকে আর কেই-বা আহত ব্যক্তির মোকাবিলা করছিল; যুদ্ধের সিলসিলার সূচনাতে তাকালেই সেটা জানা যায়।
বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয় একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধ। মদিনা থেকে যার দূরত্ব ২৩ মাইল। মদিনা থেকে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে মক্কার কাফেররা সেখানে পৌঁছেছিল। দ্বিতীয় যুদ্ধ, উহুদ। উহুদ প্রান্তরে সংঘটিত হয়। যেটা মদিনা থেকে ১২ মাইল দূরত্বে অবস্থিত। সেই যুদ্ধের আক্রমণ সূচনা মক্কার কাফেররাই করেছিল। তৃতীয় যুদ্ধ, গাজওয়ায়ে আহযাব। যেই যুদ্ধে ইসলামের সব দুশমনরা বিশেষত ইহুদিরা মদিনা অবরোধ করে রেখেছিল। এই তিনটি যুদ্ধে একটি বিষয়ই সাব্যস্ত হয় যে, আক্রমণকারীরা মুসলমান ছিলনা। তাদের প্রতিপক্ষ ছিল। আর প্রতিরক্ষার দায়িত্বই কেবল মুসলমানরা পালন করেছিল। এটাও চিন্তার বিষয় যে, মুসলমানরা শক্তি অর্জনের পর; প্রথমবারেই যুদ্ধের জন্য নয়; বরং হজ্জ আদায়ের জন্য মক্কায় যাওয়ার ইচ্ছা করেছিল। অথচ তারা তাদের বাহুর শক্তিবলেই চাইলে সেখানে পৌঁছতে পারতো! তবুও মক্কাবাসীরা তাদের তখনই প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। বরং একবছর পরের শর্তজুড়ে দেয়। হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য; মক্কাবাসীদের সমস্ত শর্ত মেনে নেন।
হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শৃঙ্খলাপ্রীতির এরচেয়েও বড়ো দৃষ্টান্ত হলো সে সময়ের; যখন হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম مسلمانوں বিরাট সৈন্যবাহিনীর সাথে বিজয়ীর বেশে নিজের পুরনো ভূমি মক্কায় প্রবেশ করেন। তো, যারা তাকে মক্কা থেকে বের করেছিল। তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন। যুদ্ধ এবং রক্তপাত তো দূরের কথা; ইসলামের কোনো শত্রুরই গায়ে একটা আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি। তাদের জীবন এবং ধন- সম্পদ নিরাপদ থাকে। এর থেকে বেশি ইসলামের নিরাপত্তাপ্রীতি এবং নবি সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মানবিক সম্মাননা প্রদানের দলিল, আর কিই-বা হতে পারে! বর্তমান ইসলামি বিশ্বের মানচিত্রে যদি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যায়; তাইলেই জানা যাবে যে, সেখানকার কিছু অঞ্চল এমন রয়েছে যে, যেখানে কখনোই মুসলমানরা যুদ্ধের জন্য সৈন্য প্রস্তুত করেনি।
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ এবং আফ্রিকার অনেক ভূখণ্ডেই আরব বণিক এবং উলামায়ে কেরামদের মাধ্যমে ইসলামের আলো পৌঁছে। হিন্দুস্তানের দিকে এমন অনেক অঞ্চল রয়েছে; যেখানে সর্বপ্রথম সুফিরাই তাদের তাঁবু স্থাপন করেন। এবং চারিত্রিক তেজস্বীতায় মানুষের দিল জয় করে নেন। হযরত খাজা মঈন উদ্দীন চিশতী, খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী এবং মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরীদের হাতে লাখো মানুষ ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন। এই অন্তরজয়ী কাফেলা মানুষদের মুহাব্বতকারী তরবারি দিয়ে কাবু করার বিদ্যে জানতেন।
আজকাল আমেরিকা, ইউরোপে ইসলাম গ্রহণের যে প্রবাহ চলমান; তার নেপথ্যে কোন্ শক্তি এবং জুলুম ক্রিয়াশীল আছে? এটি ইসলামের সাধারণত নীতিশ্রদ্ধা এবং চিন্তাশক্তিরই নিছক একটি ঝলক। সেখানে এই ধর্মমতের প্রতি চৈন্তিকদের আগ্রহের প্রবাহ ক্রমশই বাড়ছে। ইসলামোফোবিয়ায় আকণ্ঠ ডুবে থাকা পশ্চিমা সম্প্রদায়ও আলোচিত বাস্তবত্ সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিবহাল। কিন্তু ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা তাদের এ বিষয়ের ওপর অপারগ করছে যে, তারা ইসলামের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ইমেজের প্রকাশ ঘটাবে! তাদের নিকট পৃথিবীতে কমিউনিজমের পরাজয়ের পর ইসলামই সবচে বড়ো হুমকির কারণ। বর্তমানে আমেরিকা এবং ইউরোপে হাজার হাজার লোক ইসলাম গ্রহণ করছে। বিগত কয়েক বছরে মাজারেরও অধিক আমেরিকান সৈন্য ইসলাম গ্রহণে ধন্য হয়েছেন। এটা কোনো ধরনের জুলুম বা উদ্বুদ্ধের ফলাফল নয়। বরং ইসলামি শিষ্টাচার, দৃষ্টিভঙ্গি এবং উত্তম নীতিরই প্রভাব। ইসলামের সৌন্দর্য যতোটুকুই উদ্ভাসিত হচ্ছে; মানুষও ঠিক তেমনই ইসলামের দিকে ঝুঁকছে। মিথ্যা, অপবাদ এবং প্রোপাগান্ডীয় এজেন্ডার কার্যত কোনো স্থায়িত্ব নেই। সবশেষে তাদের সত্যের সামনেই মাথা পেতে নিতে হয়। ইসলামের গুরুত্ব ফিলহাল এজন্য বাড়ছে যে, পশ্চিমা এবং তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি দীর্ঘকাল ধরেই মানবজীবনের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা এটাই প্রথম এবং একমাত্র সভ্যতা; যা কার্যত বর্ণবাদী। এবং প্রান্তিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই অধুনিক সভ্যতা মানুষদের অগণিত মাসআলার শিকারে পরিণত করে। বঙ্কবৃদ্ধি, পারস্পরিক সম্মানবোধের অভাব, সত্তাগত কুপথ-গমন এবং পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে সামগ্রিক এবং ব্যক্তিগত শোষণ বা নির্যাতনই তার ফলাফল। এই সভ্যতাকে ঠিক ঈসায়ী সভ্যতাও বলা যায় না। কেননা ওটা আধুনিক ভাবাদর্শের জনক। এবং যতোক্ষণ পর্যন্ত না ওখানে ঐশ্বরিক শক্তিকে জায়গা দেয়া যাচ্ছে; এই সভ্যতা এমনিভাবে পরাজিত হয়েই থাকবে।
ইসলামোফোবিয়ার চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার জন্য যেখানে উল্লিখিত বাস্তবতার প্রসিদ্ধি এবং প্রচার জরুরি; সেখানে ইসলামের সৌন্দর্য এবং বরকতের ব্যাপারে পশ্চিমাদের পরিচিত করানোও উপকারী হবে। কেননা অভিজ্ঞতাবলেই এ বিষয়টি পরিস্ফুট হয়েছে যে, যারা ইসলামের শিক্ষায় প্রভাবিত হয়ে এর চর্চা শুরু করে দেয়; তারা খুব দ্রুতই সেটাকে গ্রহণ করে নেয়। এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা পেরেশানই থেকে যায় যে, পশ্চিমাদের মুক্তচিন্তা, মানুষ নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছাকে ছেড়ে একটা ধর্মাদর্শের অনুসরণকে কেন আপন করে নিচ্ছে! পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা; এই মগজ-গ্রথিত বিষয়-সমাধানে এজন্য ব্যর্থ হয়েছেন যে, তারা প্রথমত. ইসলামকে কঠোরতার নজরে দেখতো। দ্বিতীয়ত. জেহেনকে আপন কব্জায় রেখে ইসলামের চর্চা করতো। সামগ্রিক অবস্থায় ইসলামের দাওয়াত অথবা তার ইতিবাচক পরিচিতিই সেই মাধ্যম, যেটা 'ইসলামোফোবিয়া'র ভিত্তিকে দুর্বল করে পতন ঘটাতে সক্ষম।
📄 কাভারিং ইসলাম: ইসলামোফোবিয়ার পাঠ্য
ইসলাম একটি আদর্শিক জীবব্যবস্থা, যার শক্তিশালী সংস্কৃতি রয়েছে। এটি অদ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যযুক্ত একটি বিশ্বাস। প্রাগতৈহাসিক কাল থেকে সভ্যতার অগ্রযাত্রায় ইসলামের ভূমিকা অত্যুজ্জ্বল। সাহিত্য, আইন, রাজনীতি, ইতিহাস ও শিল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে ইসলামের রয়েছে অসামান্য অবদান। ইসলাম তার আবেদন নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী। এককথায় এটি মন এক জীবনবিধান যা, ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক সীমানা মাড়িয়ে বিস্তৃতি লাভ করেছে আফ্রিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এমনকি পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকায়ও। ফলত সব মানচিত্রে ছড়িয়ে পড়েছে এর অনুপম প্রাণশক্তি। কিন্তু বিশ্বব্যাপী পশ্চিমের অনুদার ও সংকীর্ণ প্রচারণার অনিবার্য ফলস্বরূপ ইসলাম ও এই বিশ্বাসের অনুসারীদের যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তার নগদ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে 'ইসলামোফোবিয়া'। গোয়েবলসের এর 'প্রোপ্যাগান্ডা' তত্ত্বমতে একটি মিথ্যাকে বারবার প্রচার করা হলে সেটিই সবার কাছে সত্য বলে গ্রহণীয় হয়। আর দর্শকদের এই মহাজধোলাইকে সহজ করে দেয় কিছু বায়াজড মিডিয়া।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভত্তিক কিছু গণমাধ্যমের ইসলাম ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদের একটি বিশ্লেষণে দেখা যায় তারা ৯৪.১২ শতাংশ সংবাদ করে থাকে "এন্টি-ইসলামিক সেন্টিমেন্ট” উসকে দেওয়ার জন্য। এসব সংবাদ দেখে দর্শকরা ইসলামকে সন্ত্রাসের ধর্ম মনে করবে সেটাই স্বাভাবিক। ইসলামোফোবিয়া হল ইসলামের বিপরীতে ভীতি সৃষ্টি করে যুদ্ধ, লুটপাট ও গণহত্যার সমর্থন আদায় করার একটি সহজ পদ্ধতি। মুসলমানদের বর্বর-সন্ত্রাসী হিসাবে পরিচয়ের কারণেই ইসলাম ধর্মের অনুসারী মৃত্যুবরণ করলে অথবা বৈষয়িক ক্ষয়-ক্ষতির শিকার হলে অনেকেই আনন্দিত হয়, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলে অনেকেই তাতে সমর্থন দেয়। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব মিডিয়ায় উপস্থাপিত ইসলাম নিয়ে। এই আলোচনার বিষয়বস্তুকে সামনে রেখে আমরা এক নজর বুলিয়ে আসব এডওয়ার্ড সাঈদের 'কাভারিং ইসলাম' বইয়ে।
এডওয়ার্ড সাঈদ ১ নভেম্বর ১৯৩৫ সালে ফিলিস্তিনের জেরুসালেমে জন্মগ্রহণ করেন। ৭৯ বিশ্বাসগত দিক থেকে তিনি ছিলেন পোটাস্ট্যান্ট ধর্মের অনুসারী।
শ্বেতবর্ণের এই লোকটি পেশায় ছিলেন একজন শিক্ষক, দার্শনিক। সত্যউচ্চারণে নির্ভীক সাঈদ ছিলেন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। সাঈদকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। সাঈদ একজন বাস্তববাদী অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তি। সত্যিকারের একজন জানা মানুষের দায়িত্ব তিনি সমগ্রজীবন পালন করেছেন। তার অবস্থান ছিল ন্যায় ও ন্যায্যতার পক্ষে। তার সবচেয়ে বিখ্যাত কর্ম হচ্ছে, ওরিয়েন্টালিজম। চিন্তার জগতে বিপ্লব সৃষ্টিকারী এই গ্রন্থটি রচিত হয় ১৯৭৮ সালে। প্রাচ্যকে নিয়ে পাশ্চাত্যের সুদূরপ্রসারী ও সুগভীর কলাকৌশলগুলো তিনি চিত্রিত করেছেন এই বইয়ের পৃষ্ঠাজুড়ে। ওরিয়েন্টালিজম সারাদুনিয়ার বুদ্ধিজীবী মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওরিয়েন্টালিজমের মাধ্যমে সাঈদ প্রাচ্যতন্ত্রের স্বরূপ উদঘাটন করে এ বিষয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তার আরেকটি বিখ্যাত বই হচ্ছে, 'কাভারিং ইসলাম: হাউ দ্য মিডিয়া এন্ড দ্য এক্সপার্টস ডিটারমাইন হাউ উই সি দ্য রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড'।
কাভারিং ইসলাম বইয়ে তিনি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেন, পশ্চিমের কর্পোরেশনগুলো কীভাবে তাদের মিডিয়াকে ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। তার গভীর অনুসন্ধান পাশ্চাত্যে ইসলাম ও مسلمانوں সম্পর্কে পূর্ব থেকে চলে আসা অনৈতিক অথচ জোরালো প্রচারণার স্বরূপ তুলে ধরেছে। বিশেষত ইউএসএ মিডিয়ার সংকীর্ণ অভিব্যক্তির বাদানুবাদ করে সাঈদ শক্তিশালীভাবে ইসলামের অবস্থান তুলে ধরেছেন। সাঈদ দেখিয়েছেন, পশ্চিমের তাঁবেদার গোষ্ঠী যাদের মাঝে আবার অনেক ইসলামিস্টও রয়েছেন, মূলত তারা ওরিয়েন্টালিস্ট [প্রাচ্যবিদ] বলেই খ্যাত, এরা ভিন্নধারার ইসলামিক দৈত্যের উপকথা হাজির করেন।
সাঈদ এখানে তুলে ধরেন কেন পাশ্চাত্য জগতে ইসলাম এবং আরব বিশ্বকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেমনটা তারা নয়! কেন পাশ্চাত্য মিডিয়াতে ইসলাম ও আরব বিশ্বের লোকদের নামে প্রোপাগান্ডা করা হয়! ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সাথে পাশ্চাত্য দুনিয়ার এমন কি সমস্যা ছিল যার জন্য খোমেইনীর বিপ্লবকে পাশ্চাত্যে ভালোভাবে দেখা হয়নি! কেন ইহুদী এবং খ্রিস্ট ধর্মের কাছাকাছি ধর্ম সত্ত্বেও ইসলামকে অতিরঞ্জিত প্রদর্শনীর মাধ্যমে দানবীয় এবং সন্ত্রাসী ধর্মে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়!
এই গ্রন্থটিতে সাঈদ দাবি করেছেন, পাশ্চাত্য জগতে ইসলামের প্রদর্শনী কোন নতুন বিষয় নয়। সাঈদ তার ওরিয়েন্টালিজমের উদ্ধৃতি টেনে এই গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কীভাবে ইতালির বিখ্যাত মহাকাব্যিক দান্তে তার “ডিভাইন কমেডিতে” রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে 'নরকে' পাঠিয়েছিলেন, যেখানে দান্তের কমেডিতে সাম্রাজ্যবাদী রোমান সম্রাট ট্রজানের অবস্থান ছিল স্বর্গে।
এছাড়াও সাঈদ বর্ণনা করেছেন, কীভাবে রাজনৈতিক প্রয়োজনকে বৈধতা দিতে পোপ দ্বিতীয় আরবান ধর্মের নামে খ্রিস্টান্দের ইসলামের বিরুদ্ধে ক্রুসেডে পাঠিয়েছিলেন। তিনি জানান দিয়েছেন, এরকমটা ভাবার কোন কারণ নেই যে, ধর্ম হিসেবে পাশ্চাত্য জগতের সাথে ইসলামের কিংবা নবি মোহাম্মদের সাথে পাশ্চাত্যের কোন সমস্যা আছে। পাশ্চাত্যের প্রধাণ সমস্যা হল, ইসলামের অনুপম আদর্শের সাথে।
সাঈদ দেখিয়েছেন কীভাবে উত্তর-আধুনিক যুগে পাশ্চাত্য বিশ্বের তেলের চাহিদা পূরণের জন্য ইসলামের বিরুদ্ধে প্রোপাগাণ্ডা লিপ্ত তারা। উদাহরণস্বরূপ তিনি উল্লেখ করেছেন, পাশ্চাত্য বিশ্বের দুই তৈলশিকারী ডব্লিউ টাকার এবং ডি পি মইনিহানের প্রতিবেদনের কথা। যারা তাদেরে রচনাতে প্রমাণ করতে চেয়েছেন মুসলিম রাষ্ট্রগুলো তেলের দাম বৃদ্ধি করে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে তেল আমদানি ও রপ্তানিতে বাঁধার সৃষ্টি করছে। এজন্য তারা সুপারিশ করেছে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে যেন সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সাঈদ বিশ্বাস করতেন, “মানবজাতি সে বিষয়ের প্রতি সবচেয়ে বেশী সচেতন হয়, যা তারা বাস্তব অভিজ্ঞতার দ্বারা উপলব্ধি করে, এবং তাদের এই অভিজ্ঞতা হয় পরোক্ষ, যা তারা অন্যদের থেকে পায়।"- এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সাঈদের দাবি, পাশ্চাত্য মিডিয়ার কল্যাণে লোকে ইসলাম সম্বন্ধে অসত্য এবং বানোয়াট ধারণা গ্রহণ করে। এই মিডিয়ার উপকরণগুলো হল, টেলিভিশন, রেডিও, দৈনিক সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, চলচ্চিত্র, প্রতিবেদন, প্রবন্ধ, গ্রন্থ ইত্যাদির মাধ্যমে।
সাঈদ এই গ্রন্থটিতে আরও ব্যাখ্যা করেন, ইরানের ইসলামি বিপ্লব না ছিল সমাজতান্ত্রিক, না পুঁজিবাদী, তবুও পাশ্চাত্য মাধ্যম এই বিপ্লবের সাথে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল, কারণ খোমেইনীর পূর্ববর্তী শাহ শাসকেরা আমেরিকার পুতুল হয়ে থাকার শপথ করেছিল, যা খোমেইনী মেনে নেননি। যার দরুন পাশ্চাত্য মিডিয়া ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে সনাতন প্রোপাগান্ডা শুরু করেছিল, এবং বলেছিল, নবি মোহাম্মদ ভন্ড নবী (আল্লাহ আমাদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন), আয়াতুল্লাহ বিংশ শতাব্দীতে আল্লাহ্ ছায়া। আমেরিকার টিভি চ্যানেল এবিসি এসময় পর্দা, মোল্লাহ, শিয়া, সুন্নী ইত্যাদি ব্যাপারগুলোকে খুবই বাজেভাবে উপস্থাপন করে।
সাঈদ তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে সেসকল ঘটনাবলির সর্বোৎকৃষ্ট ইলাস্ট্রেশন করেছেন, যেখানে দেখানো হয়েছে বিপ্লব পূর্ব ইরানের সাথে আমেরিকার মধুর সম্পর্ক এবং একই সাথে সাম্প্রতিক সময়ে ইরান সংকট পাশ্চাত্যমিডিয়ায় কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষত ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, যার উদ্যেক্তা মূলত পশ্চিমা দুনিয়া। নিউইয়র্ক পোস্ট-এর বরাত দিয়ে তিনি জানান, নিউইয়র্ক পোস্টের সিনিয়র রিপোর্টার জর্জ কারপুজি। কারপুজি নিজস্ব যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে খোমেনির ইসলামি সরকার বই প্রসঙ্গে দাবি করেন, খোমেনি ও হিটলার প্রায় সমকক্ষ। মানে, সেই যুগের এডলফ হিটলারের মতো আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনিও একজন অত্যাচারী, স্বেচ্ছাচারী ও শান্তি বিঘ্নকারী শাসক। মেইন ক্যাম্পের-এর লেখক আর ইসলামি সরকার-এর লেখকের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে, একজন নাস্তিক, অন্যজন নিজেকে আল্লাহরমানুষ বলার ভান করেন।
সাঈদের মতে, ১৯৮৩ থেকেই দেখা যায় মুসলিম সন্ত্রাসীরা পাশ্চাত্য মাধ্যমের সর্বত্র বিবৃতি দিয়ে বেড়াচ্ছে ইসলামের প্রতি তাদের আস্থা ও বিশ্বাস সম্বন্ধে, যেমনটা আগে লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু বাস্তবতা ছিল এই যে এদের মদতদাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই ছিল পাশ্চাত্য গণমাধ্যমের কার্যাদির দিকনির্দেশক। যে নির্দেশকের পরামর্শে পাশ্চাত্য মিডিয়ার বিশেষ কৃপায় লোকে জানতে পেরেছিল, ১৯৯৫-এ ওকলহামা সিটিতে মুসলিম সন্ত্রাসীরা বোমা বিস্ফোরন করেছে; যদিও এই কর্ম অন্য সন্ত্রাসী গ্রুপ দ্বারা সাধণ হয়েছিল।৮০
সাঈদ তার কর্মে উল্লেখ করেছেন ১৯৮০ এর দশক থেকে হলিউডের চলচ্চিত্রগুলোতে, যেমন “প্রিন্সেস এপিসড”, “ডেল্টা ফোর্স”, “ট্র লাইস”, “জিহাদ ইন আমেরিকা” আরব বিশ্বের লোকেদের জীবনধরণ ও সংস্কৃতি নিয়ে কীভাবে ভ্রান্ত প্রদর্শনী শুরু হয়েছিল। এসমস্ত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে গোটা দুনিয়া জেনেছিল আরবরা নিষ্ঠুর, কট্টরপন্থী, কুৎসিত, সন্ত্রাসী, আত্মঘাতী বোমাবিস্ফোরণকারী।
পশ্চিমা মিডিয়া আমাদেরকে একথা বিশ্বাস করাতে চায়, তৃতীয় বিশ্বের প্রতিবাদী ও সচেতন আন্দোলনগুলো, বিশেষ করে ধর্মীয় পরিচয় বহনকারী আন্দোলনগুলো মূলত ইসলামি জঙ্গিবাদী আন্দোলন। ব্রিটিশ বা ফরাসি প্রচারমাধ্যম থেকে মার্কিন প্রচারমাধ্যম একটু ভিন্নধর্মী। পশ্চিমা সমাজ, ভোক্তা গোষ্ঠী, সংগঠন ও তাদের স্বার্থও ভিন্নধরনের। প্রত্যেক মার্কিন সাংবাদিকের মাথায় একটা কথা সবসময় উপস্থিত থাকে, তার দেশ পৃথিবীর একমাত্র পরাশক্তি, যার নির্দিষ্ট স্বার্থ রয়েছে এবং সেই স্বার্থ হাসিলের দায়িত্ব তার আছে; অন্য দেশের লোকদের-সাংবাদিকদের মাথায় এসব চিন্তা থাকে না। প্রত্যেক মার্কিন সাংবাদিক বিশ্ব সম্পর্কে প্রতিবেদন তৈরি করার সময় এ ব্যাপারে সচেতন থাকেন, তার চাকরিদাতা কর্পোরেশনটিও মার্কিন ক্ষমতার অংশীদার।
স্নায়ুযুদ্ধোত্তর যুগে পাশ্চাত্য বিশ্বের বুদ্ধিজীবীরা ভবিষ্যতবাণী করতে শুরু করে যে ইসলাম হবে ভবিষ্যতের জন্য আতংক। এদের মধ্যে বার্নার্ড লুইস, স্যামুয়েল হান্টিংটন, ড্যানিয়েল পাইপ ছিল সর্বাধিক অগ্রগামী। তারা দাবী করে, “আমাদের (আমেরিকার) পৃথিবী হল ইসরায়েল এবং পাশ্চাত্যের, আর তাদের পৃথিবী হল ইসলাম এবং অবশিষ্টদের, সামরিক ইসলাম হল পৃথিবীর জন্য আতংক এবং আমাদের সভ্যতার প্রধাণ শত্রু, এবং ভবিষ্যত সভ্যতার সংঘাত হবে পাশ্চাত্য ও ইসলামের মধ্যে, রাজনৈতিক ইসলাম হল সাম্যবাদ আর ফ্যাসীবাদের মত অযৌক্তিক এবং অসন্তোষজনক।” এ ধরণের অযৌক্তিক দাবীর জবাবে সাঈদ আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্যের উদ্ধৃতি দেন, যেখানে বলা হয়েছিল, “অপকর্মের দিক থেকে বিচার করলে আরব বিশ্বের সন্ত্রাসীদের অবস্থান পৃথিবীতে ষষ্ঠ পর্যায়ে রয়েছে।” এমনকি ২০০৮ সালের ইউরোেপলের রিপোর্টেও বলা হয়েছে ইসলামি সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসবাদের পরিমাণ .০৪শতাংশ, তবে ৯৯.৯৬শতাংশ সন্ত্রাসী অন্য ধর্মের হওয়া সত্ত্বেও তাদের ধর্মকে ধুয়া তুলশী পাতা বানিয়ে কেন কেবলমাত্র ইসলামকেই সন্ত্রাসীদের ধর্ম হিসেবে মিডিয়াতে প্রচার করা হয়?
পরিশেষে সাঈদ দাবী করেন, যেভাবে পাশ্চাত্য জগতে ইসলামকে প্রচার করা হয়, আসলে ইসলাম তা নয়। ইসলাম কি এটা বুঝা পাশ্চাত্য দুনিয়ার পক্ষে দুঃসাধ্য, যতক্ষণ না তারা ইসলামের বিষয়ে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করবে। ইসলামকে শয়তানের ধর্মে পরিণত করার জন্য আজকের পাশ্চাত্য মিডিয়া প্রকৃত ইসলামকে পর্দার অন্তরালে লুকিয়ে তাকে বহুরূপে বিভক্ত করেছে। যেমন, কট্টরপন্থী ইসলাম, গোঁড়া ইসলাম, সন্ত্রাসী ইসলাম, সহিংস ইসলাম, সামরিক ইসলাম, রাজনৈতিক ইসলাম এবং পরিবর্তিত ইসলাম। ইসলামের এই প্রতিটি রূপের আবর্তন হয় পাশ্চাত্যশক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুসারে যে কাজটি তদারকির দায়িত্ব পালন করে পাশ্চাত্য মিডিয়া। পাশ্চাত্য মিডিয়া নিজেদের প্রয়োজনে ইসলামের বিরুদ্ধে পৌরাণিক গল্প তৈরী করে এবং জনগণের মাঝে তা বিতরণ করে, যাতে লোকেরা জানে, আরবরা কল্পনার জগতে বাস করে, সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করে, ফতুয়ার চর্চা করে, ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করে, নারীর অধিকারকে স্বীকৃতি দেয় না, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল থাকে না ইত্যাদি।
সমগ্র বইটি জুড়ে সাঈদ আলোচনা করেছেন কেন পশ্চিমা মিডিয়া ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। সাঈদ বইটিতে কোন ধরণের অতিরঞ্জিত তথ্য দেননি, এবং নিজের কর্মকে প্রসিদ্ধ করার জন্য কোন ধরণের ছলনার আশ্রয় নেননি। তিনি দ্যর্থকন্ঠে দাবী করেছিলেন, কেউ জানে না, এটি হল পশ্চিমা মিডিয়া, যা ইহুদী-খ্রিষ্টানদের ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে, ইসলামকে শয়তানের ধর্মে পরিণত করার অপচেষ্টা চালায়, ইসলামকে সন্ত্রাসীদের ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করে, যার বদৌলতে লোকে জানতে ব্যর্থ হয় যে ইসলাম শান্তির উৎস; দাবী করে ইসলাম মধ্যযুগীয় ভাবধারা নিয়ে চলে, যদিও আধুনিকতার সূচনা করেছিল ইসলাম; বলে ইসলামে নারীর অধিকার নেই, যদিও এরিষ্টটলীয় দর্শনে যা বলা হত- (অপবিত্র এবং কুলষিত আত্মা থেকে যে সন্তানের জন্ম হয়, তা হল নারী) তা থেকে নারীর অবস্থার উন্নয়নের জন্য ইসলামই প্রথম নারীকে অধিকার দিয়েছিল। সাঈদ এই বইটিতে যা উপস্থাপন করেছিলেন ইসলামি দুনিয়ার প্রতি তাই ছিল পাশ্চাত্য জগতের প্রকৃত মনোভাব।
সর্ব সমেত সাঈদ সহজবোধ্য ভাষায় মন্তব্য টানেন, জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনাপ্রবাহের, যেগুলো পশ্চিমের ইসলাম সম্পর্কিত অভিজ্ঞতায় প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে। তিনি প্রাঞ্জল ভাষায় সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন মিডিয়ার রসালো সেসকল উপাদান সম্পর্কে, যা ইসলাম ও প্রাচ্য বিষয়ে পশ্চিমাদের অবস্থান নির্ধারণ করে। পরবর্তীতে ষোল বছর পর ১৯৯৭ সালে সাঈদ যখন ভিন্টেজ প্রকাশনী থেকে এই গ্রন্থটির পুনঃমুদ্রণ করেন, তখনও সাঈদ দাবী করেন, এত বছরেও মুসলিম বিশ্বের প্রতি পাশ্চাত্যের ব্যবহারের কোন পরিবর্তন আসেনি।
সাঈদ বলতে চান, মধ্যপ্রাচ্যের অমীমাংসিত বিষয়াবলি নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা দ্বিমুখী বক্তব্য, পশ্চিমের নেতিবাচক ও অবজ্ঞাসূচক দৃষ্টিভঙ্গি। অথচ এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে ইসলামের শক্তিশালী অবস্থান ও মানবিক মূল্যবোধ, যা পশ্চিমারা কখনো বলে না। তাঁর রচনাবলি পাঠ করে গভীর মননশীল ব্যক্তি মাত্র উপলব্ধি করতে পারবেন এ সময়ের নানা রাজনৈতিক ও সামরিক মেরুকরণ, ৯/১১ উত্তর পাল্টে যাওয়া বিশ্ব পরিস্থিতি ও পশ্চিমী করপোরেট সাংবাদিকতা ও প্রাচ্য তন্ত্রের স্বরূপ। নিম্মে সাঈদের একটি মতামত সংযুক্ত করা হলো। লেখাটি প্রকাশের ৪০ বছর পরও তার কথাগুলো মিলে যায় সংবাদপত্রের প্রতিটি পাতার সাথে।
টিকাঃ
[৭৯] ক্যান্সারে আক্রান্ত সাঈদ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৩ সালে পরলোকগমন করেন। লেবাননের পোটাস্ট্যান্ট সমাধিক্ষেত্রে তাকে সমাহিত করা হয়।
[৮০] 'মিডিয়া কন্ট্রোল' ও '৯/১১'-নোয়াম চমস্কি এবং 'আমেরিকাস ওয়ার অন টেররিজম'- কসডোভস্কির