📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ইসলামোফোবিয়া ও মানবাধিকার

📄 ইসলামোফোবিয়া ও মানবাধিকার


জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার দাউদ দাইন ইসলামোফোবিয়াকে ইউরোপের সবচে ভয়াবহ বর্ণবাদ বলে জানিয়েছেন। ইউরোপের অনেক মানবাধিকার সংগঠন আজও ইসলামোফোবিয়ার ভয়াবহতাকে এতটা ফোকাস করতে পারেনি। সাধারণভাবে গোটা ইউরোপ বিশেষত ফ্রান্সের গোঁড়া ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা কিছু লবির চাপে কথিত বৈশ্বিক মূল্যবোধ পালনে বিভিন্ন সংগঠন ও রাষ্ট্রকে চাপ দেয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন। এমনিতে ইউরোপে ইসলামোফোবিয়ার স্রোত ভয়াবহ। এ ছাড়াও বৈশ্বিক পর্যায়ে কথিত এই মূল্যবোধের অধিক চর্চার দাবি ব্যাপক ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছে।
বর্তমান সময়ে ইসলামবিদ্বেষের শেকড় পর্যালোচনায় একজন গবেষক একাধিক কর্মপন্থা অবলম্বন করতে পারেন। ইউরোপের বুদ্ধিজিবীরা কিছু অলঙ্ঘনীয় নীতিবাক্য ও ধ্রুবক তৈরি করেছে। এসব ধ্রুবক ইউরোপীয় সভ্যতার অংশ। তাদের জনমানুষের মনমগজ এসব চিন্তা লালন করে। এই স্বীকৃত ধ্রুবক তাদের নিকট ধর্ম থেকেও পবিত্র।
প্রথম বিষয়. ইসলাম ও সহিংসতা একে অপরের সাথে অলঙ্ঘনীয় সম্পর্ক রাখে।
দ্বিতীয় বিষয়. ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে রয়েছে মৌলিক বৈপরিত্য।
তৃতীয় বিষয়. ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে রয়েছে ব্যাপক ও শর্তহীন শত্রুতা।
যদিও তাদের নিকট স্বীকৃত এই নীতির কয়েকটি শতাব্দী আগের। কিন্তু ১৯৭৮-১৯৮২ মধ্যে ইউরোপের চিন্তাচেতনায় কথিত এই নীতির শিকড় ব্যাপক গভীরতা লাভ করে। এই সময়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিভিন্ন পরিবর্তন হতে থাকে।
ভূরাজনৈতিক দিক থেকে এই সময়ে বেশ পরিবর্তন দেখা দেয়। ইরান ও সৌদির ভেতর ইসলাম নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পার্থক্য থাকলেও পশ্চিমে এটা বিবেচ্য নয়। তারা এটাকে ইসলামের প্রচার-প্রসার বলেই মনে করে। ১৯৭৮-১৯৮২ সালের মধ্যে ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, সৌদি আরবে উতাইবি আন্দোলন ও সিরিয়ায় সশস্ত্র আন্দোলনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয়। পাশ্চাত্য সভ্যতা এটাকে তাদের জন্য হুমকি মনে করছে।
অন্যদিকে পোপ দ্বিতীয় জনপলের যুগ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের প্রেসিডেন্সির সময়ে নব্য রক্ষণশীলদের হোয়াইটে আগমণ ঘটে। অপরদিকে জেরুসালেম দখলের পর ১৯৮২ সালে লেবাননে পৌঁছে যায় ইসরায়েলি ট্যাঙ্কবহর। আঞ্চলিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক ধোঁয়াশাচ্ছন্নতা এবং পাশ্চাত্যে ইসরায়েলি লবিয়িং গ্রুপগুলোর তৎপরতায় পাশ্চাত্য বিশ্বের নিকট যেকোনো রাজনৈতিক দলের সাথে শত্রুতা করা থেকে ইসলামের সাথে শত্রুতা পোষণ করা একান্ত প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।
ইউরোপীয় অঞ্চলে মুসলিম শরণার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বেকারত্বের হার ব্যাপক আকার ধারণ করে। ইউরোপ প্রবেশ করে নতুন যুগে। নতুন প্রযুক্তি-বিপ্লবে ইউরোপ মহাদেশ নতুন আকৃতি পেতে থাকে। ইউরোপের বেকারত্ব ও শরণার্থীদের সংখ্যাবৃদ্ধির এই সারণি ইউরোপের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংগঠনই দিয়েছে। ১৯৪৬ সালে উত্তর আফ্রিকা থেকে ফ্রান্সে আগত মানুষদের সংখ্যা এক লাখও অতিক্রম করেনি। অন্যদিকে ১৯৭৫ সালে চব্বিশ লাখের অধিক শরণার্থী ফ্রান্সে আসে।
জার্মানিতেও তুর্কি ও কুর্দি কমিউনিটির সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৭৪ সালে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে জার্মানিতে শরণার্থীর সংখ্যা সাত লাখ পনেরো হাজার থেকে পঁয়ত্রিশ লাখে পৌঁছে যায়। অন্যদিকে ইউরোপের শরণার্থীপ্রধান দেশগুলোতে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সালে বেকারত্ব ১৬০ পার্সেন্ট বেড়ে যায়।
যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ১৮১৫ সাল থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৬০ মিলিয়ন মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে। তদুপরি পশ্চিম ইউরোপ নিছক অর্থনৈতিক কারণে হওয়া এই উদ্বাস্তু সমস্যাকে গ্রহণ করতে পারেনি। কিন্তু অর্থনৈতিক কারণে মানুষের এই অবাধ চলাচল তো চলবেই। অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমকেন্দ্রিক এই মানববিশ্বে মানুষের এ অবাধ চলাচল তো থাকবেই। যেখানে সীমান্তের প্রতিবন্ধকতা খুবই গৌণ।
বৈশ্বিক এই পরিবর্তনের কোলাহলের মধ্যে ইউরোপে শুরু হয় পরিচয় সংকট। প্রচুর মানুষ শরণার্থী হওয়ায় সাদা-কালোসহ বহু মানুষ একত্রিত হয় ইউরোপীয় সমাজে। মানুষের ভার আর বেকারত্বে অর্থনীতি হয়ে পড়ে নাজুক। নতুন মানুষের উপস্থিতিতে আবার নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয় সমাজের আদি বাসিন্দাদের মধ্যে। এই আশঙ্কার মধ্যে আসে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনা। যে আশঙ্কাকে প্রকাশ্যে সজোরে বলতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল পশ্চিমা, টুইন টাওয়ার হামলা সেই আশঙ্কার প্রকাশকে অবাধ করে দেয়। বহুজাতিভিত্তিক ইউরোপের দাবিদার 'ইউরোপ সন্ত্রাসী' শত্রুর সন্ধান পেয়ে যায়।
ইউরোপের বুদ্ধিজীবীমহল ইসলামোফোবিয়ার বিষয়টি শুধু উপেক্ষাই করেননি। বরং ইসলামোফোবিয়া নিয়ে যারা শঙ্কা প্রকাশ করছেন, নিম্নে উল্লিখিত পয়েন্ট দ্বারা তাদের প্রতি নগ্ন আগ্রাসন চালিয়েছে তারা। যেমন-
১. যারা ইসলামোফোবিয়ার কথা বলে, এরা হলো ইরানি মোল্লা। এই সমালোচনায় যদিও ভুলে যাওয়া হয়, এই শব্দ প্রথম ১৯২৫ সালে ব্যবহৃত হয়। ফ্রান্সে ইসলামোফোবিয়ার ভয়াবহ বর্ণনায় লিখিত একটি প্রবন্ধে এ শব্দ ব্যবহৃত হয়।
২. ইউরোপের জন্য ইসলাম হুমকি। কারণ, মুসলিমরা সমাজের মধ্যে বিচ্ছিন্ন একটি সমাজ তৈরি করছে।
৩. ইসলামোফোবিয়া নিয়ে এক ধরনের ব্ল্যাকমেইল করা হয়। সাধারণত ইউরোপের ইসলামপন্থিরা বলে থাকেন, ইসলাম একটি ধ্রুবক। এটা কোনো পরিবর্তন গ্রহণ করে না। ইসলামোফোবিয়ার সমর্থকরা এই খণ্ডিত বক্তব্যকে গ্রহণ করে বলে থাকে, ইসলাম যুক্তিকে গ্রহণ করে না। এভাবে ইসলামোফোবিয়ার বিষয়টি সামনে এনে তাদের ঘৃণ্য মানসিকতা লুকিয়ে রাখার অপচেষ্টা চালায়।
এখানে আমরা ইসলামোফোবিয়ার পরিভাষা ও এর সূক্ষ্মতম অলিগলি নিয়ে আলোচনা করছি না। ইসলামোফোবিয়াকে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বৈধতা দেয়ার জন্য গত শতাব্দীর শেষার্ধে যে প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হয়েছে, তা নিয়ে আমরা আলোচনা করব। ইসলামোফোবিয়াকে বৈধতা দেয়ার এই প্রক্রিয়া একদল চরমপন্থি বুদ্ধিজীবীর সৃষ্টি করেছে। তারা মানবতার অস্তিত্বের জন্য মুসলিমদের প্রতি ঘৃণাকে শুধু যথেষ্ট মনে করে না বরং ইসলামকে মানবতার জন্য হুমকি মনে করেন।
ইউরোপের ডানপন্থি পত্রিকার পাশাপাশি বিভিন্ন মধ্যপন্থি পত্রিকাগুলোও মুসলিমদের হুমকি হিসেবে তুলে ধরার অদ্ভুত সব যুক্তি উপস্থাপন করে। নিরাপত্তাজনিত কারণে চার্লস দি গল বিমানবন্দরগামী রোডে মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দেয় ফ্রান্সের মধ্যপন্থি ছয়টি জাতীয় পত্রিকা। পত্রিকাগুলো মনে করে এমন ব্যক্তিকে বিমানবন্দরসহ স্পর্শকাতর স্থানে যেতে দেয়া ঠিক নয়, যিনি দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন, সুযোগ পেলেই নামাজ আদায়ে মসজিদে যান কিংবা হজ করার ইচ্ছা রাখেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সর্বোচ্চ কমিশন তাদের এক সিদ্ধান্তে ইউরোপের লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক কর্তৃক ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতাকে বৈধতাদানের নিন্দা জানান। হাইকমিশন আরও বলেন, 'ইসলাম ও সহিংসতার মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক জুড়ে দেয়া প্রকারান্তরে বর্ণবাদ ও বৈষম্য বলে বিবেচিত। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ইসলাম ও সন্ত্রাস অভিন্ন হওয়ার প্রবণতাও বর্ণবাদ ও বৈষম্য।'
নিশ্চয়ই বিভিন্ন স্থানে কিছু অবিবেচক মুসলিমের কারণে যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তা আমরা অস্বীকার করছি না। বৈষম্য ও বর্ণবাদের নামে কোনো ধর্ম ও গোষ্ঠীর সমালোচনার অনুমোদন এবং একজন বিশ্বাসীর স্বাধীনতার মধ্যে অবশ্যই আমরা পার্থক্য করি।
ইউরোপীয় পরিমণ্ডলে ইসলাম প্রবেশের পূর্বেই ইউরো সমাজে ধর্ম ছিল একটি বহুল চর্চিত পাঠ্য ও সমালোচনার বিষয়। তবে প্রথম দিকে ইউরোপে আসা মুসলিমরা অমুসলিম সমাজে মুসলিমদের করণীয় আচার-ব্যবহার ইত্যাদি সম্পর্কে প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পারেনি। মুসলিম-অমুসলিম সমাজে মুসলিমদের পৃথক বিধানের অনবগতি মুসলিমদের জন্য নেতিবাচক অবস্থা তৈরি করেছে।
উদাহরণস্বরূপ একজন ইসলামপন্থি লেখক যিনি সারা জীবন ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে লেখালিখি করেছেন, তারপক্ষে ইউরোপে জন্ম নেয়া নিজ সন্তানকে এটা বলা নিশ্চয়ই কঠিন যে, ইউরোপে মুসলিমদের রক্ষায় গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষতাই সবচে উত্তম।
১৯৯৭ সালে ইসলামোফোবিয়ার একটি পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করেছে বেসরকারী সংস্থা The RnNymede Trust. সংস্থাটি ইসলামোফোবিয়ার আটটি ক্রাইটেরিয়া বর্ণনা করেছেন।
১. ইসলামকে স্থবির জ্ঞান করা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা প্রভাবিত হয় না বললেই চলে।
২. ইসলাম একক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। অন্যসব সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে এর সাদৃশ্যপূর্ণ কোনো মূল্যবোধ নেই। তারা প্রভাবিত হয় না। এবং প্রভাবকও নয়।
৩. পাশ্চাত্যের বিবেচনায় ইসলামকে বর্বর, অবৈজ্ঞানিক, আদিম ও যৌনপ্রবণ বলে আখ্যায়িত করা।
৪. ইসলামকে সহিংস, আগ্রাসী ও সমস্যার উৎস বিবেচনা করে একে সন্ত্রাসবাদ ও সভ্যতার সংঘাত-সহযোগে বিবর্ণ বলে অভিহিত করা।
৫. রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ইসলামকে একটি আদর্শ বলে বিবেচনা করা।
৬. পাশ্চাত্যের প্রতি ইসলামপন্থিদের কোনো ধরনের সমালোচনাকে সহ্য না করা।
৭. সমাজের মূল স্ট্রিম থেকে মুসলিমদের সরিয়ে রাখা। এবং মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের যৌক্তিকতা প্রকাশে ইসলামের প্রতি শত্রুতাকে ব্যবহার করা।
৮. মুসলিমদের প্রতি শত্রুতাকে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক বলে গণ্য করা।
২০০৫ সালে কাউন্সিল অব ইউরোপ 'ইসলামোফোবিয়া এবং যুবকদের উপর এর প্রভাব' শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়- 'ইসলামোফোবিয়া হলো ইসলাম, মুসলিম এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভয় ও কুসংস্কার। চাই সেটা দৈনন্দিন বৈষম্য ও বর্ণবাদ প্রকাশে হোক কিংবা আরও সহিংস পদ্ধতিতে প্রকাশিত হোক মানবধিকারের লঙ্ঘন এবং সামাজিক সংহতির জন্য ঝুঁকি। বর্ণবাদ ও অভিবাসন পর্যবেক্ষণ বিষয়ক ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে ‘বর্ণগত বৈষম্য ও ইসলামোফোবিয়া’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন।
প্রকাশ করে। প্রতিবেদন বলা হয়, ইউরোপে শিক্ষা, বাসস্থান ও কর্মক্ষেত্রে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতন করা হয়।'
আমি যখন পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি চেয়ে আবেদন করলাম, কাউন্সিলের প্রধান বিস্তারিত বলতে অস্বীকার করে তার অভিজ্ঞতার কথা জানালেন, 'ইসলামোফোবিয়াটা মৌখিক তাচ্ছিল্য থেকে শুরু হয়ে শারীরিক নির্যাতন, উপাসনালয় ও গোরস্থানে হামলার ঘটনা ঘটে। সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ব্যাকগ্রাউন্ড বিবেচনা না করেই ইউরোপের সকল নাগরিকদের মধ্যে সমতা রক্ষায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের কার্যকর পদক্ষেপ খুবই প্রয়োজন। মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজের অধিকার রক্ষার বিভিন্ন সভা-সমাবেশে মুসলিমদের ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করা।'
অধিকাংশ মানবাধিকার ও বর্ণবাদবিরোধী সংগঠনের নেতারা মনে করেন, ইসলামোফোবিয়ার রাজনৈতিক ব্যবহার ইউরোপের রাজনৈতিক ব্যবসায় বর্তমানে সবচে জনপ্রিয়। পরবর্তীতে দৃষ্টি দিতে হবে, দৈনন্দিন সকল ধরনের বৈষম্য ও আগ্রাসন থেকে মুসলিমদের রক্ষায় একটি আইনি টিম তৈরি করা। এই টিমে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সকল ব্যক্তিত্ব যুক্ত করা। কারণ, ইসলামোফোবিয়া ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসলামোফোবিয়ার এই উগ্রতার মোকাবিলা করতে হবে। এর জন্য ইউরোপীয় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের দৃঢ় ভূমিকা রাখতে হবে। ৪৯

টিকাঃ
[৪৯] সম্পূর্ণ লেখাটি আল জাজিরা অবলম্বনে রচিত

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ইসলামোফোবিয়া ও গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষতা

📄 ইসলামোফোবিয়া ও গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষতা


রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যানা আরেন্ড। দর্শন শাস্ত্রের পুরোধা। দর্শনের জটিল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে কখনো কখনো তিনি অভিজ্ঞতার আলোকে বয়ান দিয়েছেন আগামীর বিভিন্ন ঘটিতব্য ঘটনাকে।
'পথ তো চলছে, কিন্তু এ পথের বর্ণবাদ পাশ্চাত্য বিশ্ব ও সম্পূর্ণ বিশ্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে।' হানা আরেন্ট এই ভবিষ্যৎবাণী দিয়েছিলেন। পূর্বাপর দৃশ্যমান কোনো যোগসূত্র না থাকায় এটা কারো দৃষ্টি ততটা আকর্ষণ করতে পারেনি। বর্ণবাদ ও ফ্যাসিবাদের জঘন্য খাদ থেকে মুক্তি পাওয়া ইউরোপ কখনো যে চরমপন্থা ও বর্ণবাদের শিকার হবে এটা কখনো কেউ কল্পনা করতে পারেনি। বর্ণবাদটা যেমনই হোক, বর্ণবাদের টার্গেট যেই হোক না কেন?
উদার চিন্তার কথিত গ্যারিসন যুক্তরাষ্ট্র, বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত প্রদানের অন্যতম সদস্য রাশিয়া, বিশাল জনশক্তির বলে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার স্বপ্নে বিভোর চীন এবং একই সাথে জীবনবাহী ব্যাকটেরিয়া ও মৃত্যুবাহী ভাইরাসে আক্রান্ত ইসলামিবিশ্ব আজ বিদ্যমান অস্থিতিশীল বিশ্বকে পরিচালিত করছে।
বিভিন্ন শক্তির বিশ্ব পরিচালনার ব্যর্থতায় তিক্ত মানুষ বিকল্প শক্তি ও সভ্যতার খোঁজে এদিক-সেদিক ফিরছে। এ অস্থিতিশীল অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে মানব জাতিকে রক্ষায় এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অংশ হিসেবে ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা ও ভারসাম্য নীতির প্রয়োজনীয়তা বোধ করে মানুষ। খোদ ইউরোপ ও ইউরোপের বসবাসরত আরব ও মুসলিমদের দায়িত্ব অর্পিত হলো ইউরোপের ওপর। ব্যক্তিক ও সামষ্টিক অধিকার রক্ষায় এবং মৌলিক স্বাধীনতার মূলনীতি তৈরির গুরু দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ইউরোপ। ব্যক্তি ও সমাজের অধিকার রক্ষাকে ইউরোপের স্থিতিশীলতা ও অস্তিত্বের মূল ভিত্তি বিবেচনা করা হয়। সর্বোপরি এই ইউরোপই পুঁজিবাদ ও ঔপনিবেশিক ভয়াবহতা থেকে রক্ষাকারী আলোকায়ন-মূল্যবোধের ধারক।
ইসলাম অর্ধ শতাব্দীর কম সময়ে সাধারণ একটি ধর্মের অবস্থান থেকে সমাজের মৌলিক ও বিশ্বাসী গোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হয়। তবে এটা কোনো পরিকল্পিত নয়। সস্তা শ্রমের জন্য তৃতীয় বিশ্ব থেকে শ্রমিক আমদানীকারক কোনো ব্যবসায়ীর চিন্তায় তা ছিল না। বরং ইউরোপে সক্রিয় বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনগুলো তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মপ্রচার কার্যের লক্ষ্য হিসেবে এটাকে নির্ধারণ করেনি।
যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক পরিবেশে সংলাপ ও দৃষ্টিভঙ্গি যতটা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়, স্বৈরতন্ত্র-বেষ্টিত কোনো পরিমণ্ডলে সংলাপ ও দর্শন ঠিক ততটা সংকুচিত হয়। গণতান্ত্রিক পরিবেশে দ্রুতই একটি দল একটি শক্তিতে পরিণত হতে পারে। নিঃসন্দেহে শক্তি তৈরির এই মুহূর্ত ইসলামভীতি তৈরির জন্য সবচে উর্বর সময়।
একটি গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের শক্তি তৈরির এ মুহূর্ত নিঃসন্দেহে তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্বভাবতই রাজনৈতিক ইসলামি সংগঠনগুলোর জন্য এটা খুবই কাঙ্ক্ষিত। অন্যদিকে মুসলিম কমিউনিটি আছে এমন দেশগুলোর জন্য এটা একটি বড় চাপ। তাছাড়া এসব দেশের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির জন্য এটা শঙ্কাও বটে। সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ যেই নাগরিক- তাদের মধ্যে যদি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বোধে ভিন্নতা তৈরি হয়, তবে তা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অশনি সংকেত। যদিও আমাদের বিদ্যমান সমাজব্যবস্থায় ভিন্ন বোধে বেড়ে ওঠা নতুন জনগোষ্ঠীকে ইনসাফের সাথে গ্রহণ করা হয় না। তাদের বোধ ও রুচিবোধের বিবেচনা না করে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়।
ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার আগে সমাজের মূল ধারার আসতে ইউরোপের ইহুদিদের যুগের পর যুগ লেগেছে। বর্তমানে ইউরোপে বসবাসরত এশিয়ান বিভিন্ন কমিউনিটিকে অর্থনৈতিক কমিউনিটি বলাই শ্রেয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তারা ইউরোপে আগমন করেছে। ইসলামের সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি ইউরোপের সুধী সমাজের জন্য রীতিমতো আশঙ্কার জায়গা। এমনকি শরণার্থীদের অধিকার সচেতন মানবাধিকার কর্মীদের আশঙ্কাও গোপন থাকেনি। তাদের এই আস্থার সংকটকে তীব্র করে ইউরোপে আগমনকারী প্রথম দিকের ইসলামপন্থিরা। যারা তাদের দেশে ধর্মনিরপেক্ষতাকে পাশ্চাত্য প্রোডাক্ট বিবেচনা করে সারা জীবন এর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।
এমনকি ইউরোপের সংখ্যালঘুদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাকে সবচে উপযোগী মনে করলেও তারা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে একটি ইসলামি রাষ্ট্র তৈরির চেষ্টা করে। এবং অনবরত অন্যায়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে চরমভাবে আক্রমণ করে। এখানে মনে করিয়ে দেয়া জরুরি মনে করছি, গণতন্ত্রই ধর্মনিরপেক্ষতা নয়। গণতন্ত্র ছিল চার্চের প্রধান শত্রু।
এই গণতন্ত্রই অষ্টাদশ শতাব্দীতে তার জন্মের প্রথম দিন থেকেই বেশকিছু মূলনীতি বুকে ধারণ করেছিল। স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রৃত্ব, সহমর্মিতা, নিরাপত্তা, জনগণের সার্বভৌমত্ব ও প্রশাসনের পৃথকীকরণের মূলনীতি। পরবর্তীতে ১৯০৫ সালে ফ্রান্সে প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ আইন জারি হয়। আইন অনুসারে রাষ্ট্র থেকে চার্চকে পরিপূর্ণভাবে পৃথক করা হয়।
১৯০৫ সালের ঐ আলোচনায় মূল প্রাণসত্তাই ছিল কোনো ধর্ম কিংবা বিশ্বাস-প্রসূত আইন সমাজের ওপর আরোপ না করা। অন্যদিকে সামাজিক ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে গণতন্ত্রের মূলনীতি পরিপক্ব হয়। এই গণতন্ত্র জন-জরিপ এবং পরবর্তীতে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়ায় আরও পুষ্ট হয়। এবং বিংশ শতাব্দীর ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো মূল্যবোধ কিংবা আক্বিদা নয়। বরং এটা একটি মূলনীতি ও প্রস্তাব। সম্ভাব্য পরিণতির বিবেচনা করে একটি প্রস্তাব প্রদানের নামই ধর্মনিরপেক্ষতা। গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বহির্ভূত যেকোনো তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি তারা স্টালিনবাদের বিরোধিতা করেন। কারণ, স্টালিনবাদীরা খোদাদ্রোহিতাকে ধর্ম বানিয়ে একটি স্বতন্ত্র ধর্মের অবস্থান দিয়েছে।
দাতব্য কর্মে 'মৌলিক অর্থনৈতিক অধিকার'-এর মূলনীতির পরিবর্তে কোনো ধর্মজাত প্রেরণাকে প্রত্যাখ্যান এই মতবাদ। মোটকথা ধর্মতাড়িত কোনো ভালো কাজও তাদের কাছে নিন্দনীয়। বরং এই ভালো কাজটির মূল প্রেরণা থাকবে ধর্মভিন্ন ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি। ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা মূলত তিনটি পয়েন্টে খুবই স্পর্শকাতর- -চিন্তা ও মতের শর্তহীন স্বাধীনতা -বৈশ্বিক মানবাধিকার -রাষ্ট্র ও চার্চের পৃথকীকরণ
তবে রাষ্ট্র সমাজের সবকিছু সমান তালে চলে না। সবকিছুকে এক পাল্লায় মাপাও যায় না। সমাজ-রাষ্ট্রে সকল স্থানেই কি ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ নাকি কোথাও কোনো স্পেস আছে? এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা ফ্রান্সিস ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের একটি বহুল চর্চিত 'ফোরস্পেস' থিওরি তুলে ধরছি।
ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা চারটি ক্ষেত্রের কথা খুব বলেন, বিশেষ স্পেস, সাধারণ স্পেস, প্রশাসন ও স্বাধীনতা তৈরির স্পেস।
বিশেষ স্পেস বলতে ব্যক্তি স্বাধীনতা। আর সাধারণ স্পেসের আওতা বেশ বড়। সামাজিক কর্মকাণ্ডের বিশাল পরিধিকে বুঝায় এটা। এ জন্যই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে ব্যাপক অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র সাধারণত এ বিশেষ স্পেসেই ইবাদত, ধর্মপ্রচার ও ধর্মীয় প্রতীকের স্বাধীনতার দাবি করে। এ কারণেই সামাজিক পরিধিতে ধর্মীয় কোনো প্রতীককে অপ্রতিঘাত করার বিশেষ এক ধরনের ঐকমত্য আছে।
রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ বলতে রাষ্ট্রের আইনবিভাগ, নির্বাহী ও প্রশাসনিক বিভাগকেই উদ্দেশ্য করে থাকে। এক্ষেত্রেও ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মীয় আচার- আচরণের বিষয়ে শিথিলতা প্রদর্শন করে। অন্যদিকে স্কুল, কলেজ ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে নাগরিক-তৈরির প্রতিষ্ঠান বলা হয়।
প্রচলিত আছে, জার্মান সমর্থক মিলিশিয়ারা একটি স্কুলে প্রবেশ করে ইহুদি সন্তানদের সামনে আনতে বলেন, স্কুল ইন্সপেক্টর উত্তর দেন, 'আমাদের এখানে কোনো ইহুদি সন্তান নেই, আমাদের রয়েছে শুধু শিক্ষার্থী' এবং ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা হিজাব ও নেকাবের পক্ষে মানবাধিকারকর্মীদের সাথে থেকেছেন। তাদের মতে, নেকাব নিষিদ্ধ করার সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো সম্পর্ক নেই। ধর্মনিরপেক্ষতা হিজাব-নেকাবেরবিরোধী না।
কোনো কোনো ব্যক্তি ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে বর্তমানে কিছু সংযুক্ত করার কথা বলেন। উন্মুক্ত, উদার, বহুত্ত্ববাদী, ইতিবাচক গণতন্ত্র ইত্যাদি নামে বলার চেষ্টা করেন। তবে অধিকাংশ গণতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী এ ধরনের সংযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেন।
ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষ ধারা সবসময় মানবাধিকার ইস্যুতে সামনে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা তাদের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গ্রুপের মুসলিমবিরোধী তৎপরতার লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। হোক তারা জায়নিস্ট কিংবা নিউ লিবারেল সমর্থক। সেজন্য আমরা গোয়েন্তানামো, গোপন কারাগার, কালো তালিকা ইস্যুতে আমাদের সাথে সমাজতান্ত্রিক ও বিশ্বায়নবিরোধী কাউকে দেখলে অবাক হবো না। কিন্তু অল্পই আমাদের সাথে কোনো ডান গণতন্ত্রীকে পাবো। অনুরূপভাবে গাজা ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলের অন্যায় অবরোধ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণ ও সীমান্ত বন্ধের বিরুদ্ধেও বামপন্থি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের দেখা যাবে।
বর্তমানে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর অনুকূলে কর্মরত রয়েছে গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদ। এসবের কারণে সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামোফোবিয়ার পাঠ যথেষ্ট নয়। বরং ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় জনমত প্রভাবক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে মনোযোগী হতে হবে।
তাছাড়া বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের কর্মপন্থা, পদ্ধতি ও দাওয়াতি কর্মকৌশলের দিকে দৃষ্টি দেয়ার জন্য সাহসও দরকার। কিছু কিছু ইসলামি রাজনৈতিক পক্ষ তাদের ইসলামি প্রতিপক্ষকে ইসলামোফোবিয়ার পদ্ধতিতে মোকাবিলা করে। তারা ইসলামোফোবিয়াবিরোধী মানবাধিকার ও সুশীলদের আন্দোলন থেকে দূরে থাকে। নন-ইউরোপীয় রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে তাদের পরিচয় প্রকাশিত হওয়ার আশঙ্কায় তারা হয়তো এমন করেন।
বিভিন্ন ব্যক্তি ও আন্দোলনের কর্তা ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড দ্বারা প্রতীয়মান হয়, ইউরোপের মুসলিমদের মূল সম্পর্ক মুসলিম কমিউনিটির সাথে। এক্ষেত্রে ইউরোপের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নাই। এভাবে ইউরোপে মানবাধিকার রক্ষায় অভিন্ন লড়াইয়ের মাধ্যমে অস্তিত্বে আসা গঠনমূলক ও ইতিবাচক সকল সেতু বন্ধনকে নষ্ট করে এরা।
একাধিক আলোচনায় একাধিক রাজনীতিবিদ বলেন, 'প্রতিটি লড়াইয়ে হারজিত হয়। কিন্তু সকল অবস্থায় মুসলমানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং আমরা কেন সময় নষ্ট করবো?' এক্ষেত্রে বলতে হবে, আমরা কিছু ইসলামপন্থি দ্বিচারিতাদের জন্য বারবার মূল্য চুকাচ্ছি। যারা নিচু আওয়াজে বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা ইউরোপের সংখ্যালঘু মুসলিমদের জন্য সবচে নিরাপদ ব্যবস্থা। অন্যদিকে জোর আওয়াজে বলেন, ইসলামই সমাধান। তারা পোশাকের স্বাধীনতার নামে নেকাবের পক্ষাবলম্বন করেন। আবার মুসলিম দেশগুলোতে পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে একটি শব্দ পর্যন্ত বলেন না। তাছাড়া গণতন্ত্রের ওপর কিছু সালাফিদের সদা আক্রমণ তো আছেই। তাদের নিকট সকল নোংরামি, জেনা-ব্যভিচার ও সমকামিতার জন্য একমাত্র দায়ী গণতন্ত্র।
সর্বশেষ ফ্রান্সে নেকাব নিষিদ্ধের সময় গণভোটের আয়োজন নিয়ে একটি বিষয় দেখা যায়। বড়ো বড়ো আরব স্যাটালাইট চ্যানেলগুলো এই ফাঁদ থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। তারা একজন লিবারেল ইসলামিস্টের বিপরীতে একজন চরম ডানপন্থি মানুষকে আলোচনায় এনেছে।
একজন মুসলিম কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রতিপক্ষ মুসলিমকে ঘায়েল করছেন। অন্যদিকে একজন ইউরোপীয় উভয়ের মধ্যে সমন্বয়ের ব্যবস্থা করছেন। যেন সমন্বয়ক একজন ফকীহ। অথচ আলোচনা চলছে বর্তমান পরিস্থিতিতে গণভোটের অকার্যকারিতা সম্পর্কে।
তাছাড়া ইসলামি সংস্থা ও রাষ্ট্রগুলোকেও এ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত দেখা যায়। অথচ মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রাজনীতি সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চার্টারের অধীনে কথা বলার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। কিন্তু ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের সবচে বড়ো সংগঠনের সেক্রেটারি স্পষ্ট বলেন, রাস্তায় নেকাব পরা থেকে বিরত রাখা কিংবা বাধা দেয়া ধর্মনিরপেক্ষতা নয়। তাছাড়া পাবলিক প্লেসে নেকাব ও ধর্মীয় প্রতীকে বাধা দেয়া বৈধ নয়।
২১/১/২০১০ সালে ফ্রান্সের মানবাধিকারবিষয়ক জাতীয় পরামর্শ পরিষদ ৩৪/২ ভোটে নেকাব বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাস করে। এই প্রস্তাবে মৌলিকভাবে নেকাববিরোধী যেকোনো আইন প্রণয়নের বিরোধিতা করা হয়। পাশাপাশি পরিষদ সকল ধরনের বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানায়। অথচ কোনো আরব পত্রিকা ও গণমাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কোনো তথ্য আসেনি। বরং কিছু চ্যানেল তো বরং ইসলাম ও মুসলিমদের বিষয়ে বর্ণবাদী কিছু ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের দাবি অনুসারে সম্ভাব্য যে সিদ্ধান্ত হবে সেই কথা প্রচার করছে।
এ ধরনের আচরণ সঠিক নয়। এবং এটা ইউরোপের মুসলিম কমিউনিটির জন্য কোনো সুফল বয়ে আনে না। তাছাড়া ইসলামোফোবিয়ার মোকাবিলায় আমাদের আরও বুদ্ধিবৃত্তিক হওয়া দরকার। মৌলিকভাবে স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদান করার প্রতি মনোযোগী হওয়া একান্ত প্রয়োজন। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে সমাজপ্রভাবক গণমাধ্যম ও সামাজিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। নতুবা শুধু ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় সংগঠনের কোনো উপযোগিতা থাকবে না। ৫০

টিকাঃ
[৫০] সম্পূর্ণ লেখাটি আল জাজিরা অবলম্বনে

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ইসলামোফোবিয়া থেকে মসজিদফোবিয়া

📄 ইসলামোফোবিয়া থেকে মসজিদফোবিয়া


বিশ্ব চলছে বিনিয়োগ পদ্ধতিতে। বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থবিত্ত অর্জন করে মানুষ। কখনো রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থে অর্থ ছাড়াও অনেক বিনিয়োগ-পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। তবে দৃশ্যমান বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে আজ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক ফলপ্রসূ বিনিয়োগ পদ্ধতি হলো ঘৃণা ও বিদ্বেষের চাষ। ঘৃণা ও বিদ্বেষ চাষ থেকে লাভজনক কোনো বিনিয়োগ পদ্ধতি বিশ্বে দ্বিতীয় আরেকটি নেই। রুটিরুজির স্বপ্ন যেসব দেশ ও অঞ্চলের লোকদের নিকট সেরা স্বপ্ন, সেই অঞ্চল ও দেশে মূলত এই বিনিয়োগ পদ্ধতির ব্যাপক চাষ করে কথিত উন্নতবিশ্ব। বিদ্বেষ ও ঘৃণাচাষের অন্যতম হাতিয়ার ইসলামোফোবিয়া; ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করা এবং তা সমাজে বাস্তবায়ন করা। আমেরিকার রাজধানী নিউইয়র্কের বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে বিমান-হামলার পর থেকে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। ইসলামকে সভ্যতা, সংস্কৃতি ও প্রগতির বিরুদ্ধ-শক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়ে মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। যেকোনো সুবিবেচক ব্যক্তি পশ্চিমা এই ইসলামোফোবিয়ার কথিত ডামাডোলের মধ্যে স্বভাবত দুটি বিষয় লক্ষ্য করতে পারবেন।
প্রথমত, ইউরো-মার্কিন পরিমণ্ডলে ইসলামোফোবিয়া তৈরি করা এবং রাজনৈতিক স্বার্থচরিতার্থ করার হীন মানসিকতা নিয়ে নির্বাচনি প্রচারণায় তার প্রয়োগ ঘটানো। সর্বত্র ইসলাম ও মুসলিমদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার গুরুত্ব প্রদানের পাশাপাশি এর নীরব ও কৌশলী প্রচারণা। ইসলামকে পরিশুদ্ধকরণের কথিত দাবি তুলে উম্মাহকে পদাবনত করার হীন প্রচেষ্টা। আর হ্যাঁ, মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান অবস্থা অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত অবস্থা আমাদের এ ব্যাখ্যার গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে।
দ্বিতীয়ত, মুসলিম সমাজের রক্ষণশীল অংশকে পাশ্চাত্যে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার প্রবণতা। ইসলামোফোবিয়া বললে অবচেতন মনে পাশ্চাত্য ও অমুসলিম সমাজের চিত্র ধরা দেয়। কিন্তু মুসলিম সমাজে ইসলাম-বিদ্বেষ ও ঘৃণা আজ শিকড় গেড়েছে। বরং আমরা মুসলিমরা পাশ্চাত্যে ইসলামোফোবিয়া-চুল্লিতে আরও কিছুটা জ্বালানি ছিটিয়ে দেয়ার কাজটি বেশ পারঙ্গমতার সাথে করে থাকি। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রায়িত করা এবং মুসলিমদের সন্ত্রাসী ট্যাগ দেয়ার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় আরও একহাত এগিয়ে দেই, এই আমরা মুসলিমরা।
তিউনিশিয়ার বিন আলী থেকে সিরিয়ার বাশার আল আসাদের মতো আরব জালিম শাসকদের কথা চিন্তা করুন; অধিকার আদায়ের জন্য মজলুম জনগণ যখন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে, লড়াই করছে তখন জালিম শাসকবর্গ এদের সন্ত্রাসীর তকমা লাগিয়ে পশ্চিমা প্রভুদের নিকট উপস্থাপন করছে।
মুসলিম শাসকদের এই কর্মকাণ্ড পশ্চিমের মুসলিমদের হুমকির মুখে ফেলে দেয়। পশ্চিমা থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলো মুসলিম শাসকদের এ কর্মকাণ্ডকে পশ্চিমে বসবাসকারী মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রমাণস্বরূপ হাজির করে। এবং পশ্চিমা দেশের মুসলিম কমিউনিটির বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় মানুষদের আহ্বানে পুরাতন রীতিনীতির পরিবর্তে সময়ের সাথে চলমান কর্মপন্থা-অবলম্বনের দাবিও উঠছে বেশ উচ্চকণ্ঠে। এই দাবির প্রবক্তারা মনে করেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র অর্জনের ক্ষেত্রে একমাত্র বাধা হলো ধর্মীয় বয়ানে নতুনত্বের অভাব।
কিন্তু পশ্চিমাবিশ্ব আজ ইসলামভীতির পথ মাড়িয়ে নতুন ভীতি ও নতুন ঘৃণার রসদ খুঁজে পেয়েছে। এখন ইসলাম থেকে ইসলামের বিভিন্ন প্রতীকের প্রতি এই -বিদ্বেষ ও ঘৃণা প্রলম্বিত হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকার পথেঘাটে ইসলামের বিভিন্ন প্রতীকের বিরুদ্ধে সভাসমাবেশ বের হচ্ছে। দাড়ি-টুপি-হিজাবের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে। সবচে বেশি ঘৃণার শিকার হচ্ছে মসজিদ। হাতে হাতে প্ল্যাকার্ড শোভা পাচ্ছে। এগুলোতে লেখা- 'আমরা আর মসজিদ চাই না' অথবা 'মসজিদকে না বলুন। ভীতিচর্চার বিবর্তন-ইতিহাসে নতুন ফোবিয়া তৈরি হয়েছে; মসজিদফোবিয়া। আজ ইসলামের বিশ্বাসের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতীকের প্রতিও একধরনের ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রকাশ পাচ্ছে।
ভাষান্তর: রকিব মুহাম্মদ

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 সভ্যতার সংঘাত ও ইসলামোফোবিয়ার শোরগোল

📄 সভ্যতার সংঘাত ও ইসলামোফোবিয়ার শোরগোল


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার পর থেকে পাশ্চাত্য মিডিয়ায় ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা-পর্যালোচনা বেশ বেড়ে যায়। পলিটিক্যাল ইসলাম আজ পশ্চিমা গণমাধ্যমের বিশেষ মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে। সমসাময়িক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনা বেশ জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু শঙ্কার দিকটি অনেকটা আঙ্গুল তুলে বলে দিয়েছেন প্রসিদ্ধ ফ্রান্সিস রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অলিভিয়ার রায়। তিনি বলেন, 'সামাজিক ও রাজনৈতিক ফেনোমনো হিসেবে ইসলামের পাঠ সবসময়ই একটি কঠিন বিষয়।' তিনি আরও বলেন, 'ইসলামকে নতুন দৃষ্টিগ্রাহ্য বিষয়বস্তু হিসেবে বিচার-বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মারাত্মক বেশকিছু পদ্ধতিগত জটিলতা আছে।'
সমাজে ইসলামের দৃশ্যমান যেকোনো কাজ কিংবা কোন ইস্যুতে ইসলামের জোরদার উপস্থিতিতি পশ্চিমাদের চোখকে বড়ো করে তোলে। তারা ঘটনার পেছনের দিকটি তুলে আনতে শুরু করে বিভিন্ন বিশ্লেষণ। বিশ্লেষণে সর্বদা উদ্ভূত ঘটনার পেছনে ইসলামের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, দূরদর্শিতা কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থের দিকটিকে পরিকল্পিতভাবে সামনে আনে পশ্চিমা এই জনগণ। ইসলামের দৃশ্যমান যেকোনো কার্যক্রম বিশ্লেষণের আওতায় আসতেই পারে; এটা আওতাভুক্ত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। বরং প্রতিটি ঘটনার বিশ্লেষণ একান্ত প্রয়োজনীয়। ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়া যে আধ্যাত্মিক কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে, তা পাশ্চাত্য মিডিয়া কিংবা একাডেমিতে অনুপস্থিত। ইসলামের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির ওপর পাশ্চাত্য মিডিয়ার এই অতি আগ্রহ পশ্চিমা একডেমিয়াতেও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। ইসলামকে একটি সর্বজনীন ও পূর্ণাঙ্গ ধর্ম বিবেচনা না করে বরং রাজনৈতিক ধর্ম হিসেবে তারা বিবেচনা করছে। ফলে রাষ্ট্র থেকে এখানে ধর্মকে পৃথক করা বড়ো কঠিন। ইসলামের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের স্বার্থে যে ইসলামের অন্যান্য বিশ্বাস ও আচার-আচরণ প্রয়োগ হতে পারে, তা এ জগতে অনেকটা অপরিচিত। পশ্চিমা মিডিয়ার চেতন কিংবা অবচেতন এই চর্চার কারণে রাজনৈতিক ইসলাম মিডিয়া ও একাডেমিতে একটি পৃথক ও স্বতন্ত্র আলোচ্য বিষয় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
পাশ্চাত্যের বিচার-বিশ্লেষণিক পরিমণ্ডলে ইসলামপন্থিদের সামান্য উপস্থিতিকেও ধর্মীয় জাগরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সত্তরের দশকে ইসলামপন্থিদের এই জাগরণ দেখা দেয়। এবং ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সাথে সাথে এই জাগরণ সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে যায় বলে মনে করে পাশ্চাত্যবিশ্ব।
পাশ্চাত্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মানদাফিল বলেন, পাশ্চাত্য সাহিত্যকলায় রাজনৈতিক ইসলাম নিয়ে সর্বদা তিনটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসা হয়। প্রথমত, একই সাথে ধর্ম আর রাজনীতি এটা একমাত্র ইসলামের একটি বৈশিষ্ট্য।
দ্বিতীয়ত, ইসলাম বলতেই রাজনৈতিক ইসলাম। অর্থাৎ তারা ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপকে উপেক্ষা করে একমাত্র রাজনৈতিক অংশকে পূর্ণ ইসলাম বিবেচনা করছে। তৃতীয়ত, প্রকৃতিগতভাবে রাজনৈতিক ইসলাম সহিংস। 'মুসলিম বিশ্বের অনেকে পাশ্চাত্যের কথিত এনলাইটেন্টমেন্টের নীতিকে লিবারেল গণতন্ত্র আখ্যা দিয়ে অনুসরণ করেছেন। কিন্তু ক্ষমতার স্বার্থে তারা এটাকে স্বৈরতন্ত্রের রূপ দিয়েছেন। এটা ইসলামের ব্যর্থতা নয়, বরং নন প্র্যাক্টিসিং মুসলিমের ব্যক্তিক স্বার্থ এখানে জড়িত।' এমন বক্তব্যও মানতে রাজি নয় পাশ্চাত্যের ইসলামোফোবিয়া রোগাক্রান্ত ব্যক্তিরা।
ইসলাম নিয়ে পশ্চিমের জ্ঞানবহরের এই দীনতার পেছনে মূলত প্রাচ্যবাদ প্রবলভাবে জড়িত। তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পশ্চিমা একাডেমিয়া ও মিডিয়া ইসলামের সমকালীন এ অবস্থার জন্য কল্পিত একটি পাঠ তৈরি করেছেন; গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ পশ্চিম ও ইসলামের মধ্যে রয়েছে ঢের বৈপরিত্য। অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্ব যখন এ ধরনের দাবি করছে, তখন আবার ইসলামি বিশ্ব গতিহীন, স্থবির ও স্বৈরতান্ত্রিক এক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে।
প্রাচ্যবাদ পূর্ব থেকেই পরিচয় দিয়েছে, প্রাচ্যের ইসলাম ও পশ্চিমা খ্রিস্টধর্মের বিভাজনটা শুধু বাহ্যিক নয়। এবং পাশ্চাত্য দর্শন তো শুরু থেকে তাদের পরিমণ্ডল ও একাডেমিয়াতে বারবার বলে চলছে, ইসলামি সভ্যতা শুধু অগণতান্ত্রিক শক্তিকে অনুপ্রাণিত করে। প্রাচ্যবাদীদের এসব আলোচনা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় মুসলিম সম্প্রদায় ইসলামোফোবিয়াকে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সাথে সংশ্লিষ্ট করেন। এবং তা তীব্রতর হওয়ার দাবি তোলেন। অথচ এই ইসলামোফোবিয়া বহু শতাব্দী-পুরনো পশ্চিমা ঘৃণ্য বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্বেষের মাত্র খণ্ডিত অংশ।
ইসলামের প্রতি খ্রিস্টধর্মের বিদ্বেষ অনুধাবন করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ৬৩৪ সালে। যখন মুসলিমদের হাতে জেরুসালেমের পতন হলো, খ্রিস্টানরা খ্রিস্ট ধর্মকে বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের বৈশ্বিক ধর্ম বলে দাবি তোলে। জেরুসালেমের পতন অর্থ বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের পতন। এভাবে বিশ্বকে মুসলিম বিশ্বের মুখোমুখি করার হীন প্রচেষ্টা চালায় খ্রিস্টবিশ্ব। এডওয়ার্ড সাঈদ বলেন, প্রাচ্যের সাথে যখন ইউরোপের পরিচয় হয়, ইউরোপীয় জনমানসে ইসলামকে বহিরাগত ও অনাকাঙ্ক্ষিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কিন্তু ইফান কালমার মনে করেন, 'ইউরোপে ইসলামের প্রকাশ হয়। কিন্তু জনমনে নতুন কোনো ধর্ম ও আইডিওলজির উপস্থিতি বা পরিবর্তনকে ইউরোপ ও বহিরাগতদের মধ্যকার বিভেদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। বরং এই উপস্থিতি ছিল একেকজন খ্রিস্টনের ভেতর প্রকাশিত ফাঁলের মতো। অর্থাৎ প্রত্যেকের ভেতরে পরিবর্তন হচ্ছিল; কারো ভেতর ইতিবাচক কারো ভেতর নেতিবাচক। কিন্তু তা ব্যক্তিকপর্যায়ে। জাতীয়ভাবে এটাকে ফেনোমনো তৈরি করেনি।'
এই অবস্থা স্থায়ী হয়নি। যখন উসমানি সাম্রাজ্য কসোভো যুদ্ধে জয়লাভ করে। এবং ১৩৮৮ সালে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করে। তারপর ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপলের পতন হয়। কনস্টান্টিনোপলের পতনের পর খ্রিস্টান আর মুসলিমদের মধ্যকার সম্পর্ক খুবই নাজুক হয়ে পড়ে। অনতিক্রম্য সংকটে পড়ে যায় মুসলিম ও খ্রিস্টবিশ্ব।
পরবর্তীতে কনস্টান্টিনোপল বিজয় নতুন ইউরোপ তৈরির সূচনা করে। এই ইউরোপ হলো ধর্মীয় রীতিনীতি ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এক মহাদেশ। এটা হবে খ্রিস্টানদের মহাদেশ। এরই ধারিবাহিকতায় ক্যাথলিক রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও রানি ইসাবেলা স্পেন ও পর্তুগাল থেকে ইহুদি ও মুসলিমদের তাড়াতে শুরু করেন। খ্রিস্টানরা পশ্চিমে তাদের অবস্থান দৃঢ় করে। এবং মুসলিমরা প্রাচ্যে তাদের উপস্থিতি যথারীতি বজায় রাখে।
এই সংবেদনশীল ও সংস্কারের সময়ে সহিংস আন্দোলন হিসেবে ১৫৪৪ সালে মার্টিন লুথার ইসলামকে সহিংস আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করেন। তার মতে, ইসলাম খ্রিস্টবিরোধী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কসুর করেনি। এই সহিংস আন্দোলনকে একমাত্র অনুরূপ সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিহত করা সম্ভব বলেই মনে করে মার্টিন লুথার।
ক্রোয়েশিয়ার তৎকালীন লেখক বার্থলোমিউ তার কালজয়ী Mesriz and Triplations of the Christians বই রচনা করেন। এবং এটা তৎকালীন সর্বাধিক বিক্রিত বই ছিল। এটাকে বর্তমান-মানদণ্ডে সচিত্র উপন্যাস বলা যেতে পারে। এই বইয়ের চিত্রে দেখানো হয়, মুসলিমরা ইউরোপে বন্দিদের নির্যাতন করছে। নারী ও শিশুদের হত্যা করছে। অন্যদিকে ইউরোপে তখন নিরক্ষরতার বিপদ চরম শিখরে। এই বই ব্যাপক আকারে প্রচারিত হয়। মুসলিমবিরোধী প্রচারণায় বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় খ্রিস্টবিশ্বে।
পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও ইসলামকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরার প্রয়াস দেখা যায়। পাশ্চাত্য সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমগুলো ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে উত্তেজনাকর বিভিন্ন সচিত্র সাহিত্য ও রম্যসাহিত্যের ট্রাডিশন গড়ে তোলে। অনেক সময় এ ধরনের কার্যক্রমে মুসলিমদের তুর্কি, মোরো ও সারাসিন নামে উল্লেখ করা হয়। ভলতেয়ার ইসলামকে থিওক্রেসি ও স্বেচ্ছাচারী, শেক্সপিয়র মোরোদের হিংস্র, হেগেল ইসলামি সভ্যতাকে প্রাণহীন হিসেবে চিহ্নিত করে। ফ্রান্সিস দার্শনিক মনটেস্কু তো বলেন, স্বৈরতন্ত্রই ইসলামি ভূখণ্ডে শাসন প্রতিষ্ঠার একমাত্র মাধ্যম। হেগেল আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, ইসলাম বিজ্ঞানসম্মত নয়। মুসলিমরা নতুন নতুন চিন্তার সাথে চলতে অক্ষম।
পশ্চিমা একাডেমিয়ার বিজ্ঞানীরা আজও এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক ও পশ্চাদপদ ট্রাডিশনে ডুবে আছে। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন, এলি কেদুরি, ডেনিয়েল ও বার্নাড লিউসের মতো ইউরোপের খ্যাতিমান দার্শনিকরা তাদের পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া এই গন্ধময় উত্তরাধিকার রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। 'ইসলাম পাশ্চাত্য সভ্যতার জন্য হুমকি'- এই তত্ত্ব প্রচারে পাশ্চাত্যের মৌলিক ভূমিকাকে যদিও ভুলে থাকার অপপ্রয়াস করেছে, তাদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে মুসলিম সমাজ ইসলামোফোবিয়ার মূল শেকড় সন্ধানে ব্যর্থ হয়।
প্রসিদ্ধ মার্কিন দার্শনিক ও লেখক হ্যাম হারিস বলেন, 'আমাদের সমস্যার মূল জায়গাটি যদি আমাকে কেহ নির্ধারণ করতে বলে, তবে আমি বলবো, ইসলামি বিশ্বই আমাদের মূল সমস্যা। আমরা এখন সভ্যতার সংঘাতের মধ্যে আছি। বিভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করে আমরা মূলত আমাদেরই প্রবঞ্চিত করছি। কখন কোনটি ইসলাম ও মুসলিম-বিদ্বেষ হচ্ছে, তা নির্ধারণ করে দূর করার প্রয়াস একান্তই অবান্তর। বরং পাশ্চাত্য সভ্যতায় এর সন্ধান মিলবে বহু শতাব্দী পূর্বে।'
আমরা যদি ইসলামোফোবিয়ার মূল কাঠামো ও প্রকৃতির মূলে পৌঁছতে না পারি, আমরা কিছুতেই কার্যকর কোনো প্রতিবিধান করতে পারব না। ইসলামোফোবিয়া শুধু বর্ণবাদী কিছু কর্মকাণ্ড নয়। বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী হাত বদল হয়ে এটা আজ পাশ্চাত্য সভ্যতার অবিভাজ্য নীতি বনে গেছে।

টিকাঃ
[৫১] সম্পূর্ণ লেখাটি মুসলিম হান্ট অবলম্বনে রচিত

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00