📄 ফেসবুকে ইসলামোফোবিয়া : বাড়ছে বিদ্বেষের সংস্কৃতি
বর্তমানে সবচে বেশি ব্যবহৃত সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম ফেসবুক। এপ্রিল, ২০২০-এর হিসাব অনুযায়ী মাসে ২.৬ বিলিয়ন মানুষ লগইন করছে এই প্লাটফর্মে। এভারেজ দৈনিক লগইন করছে ১.৭৩ বিলিয়ন মানুষ। ফেসবুক ব্যবহারকারী বিশাল এই জনগোষ্ঠীর সবাই কিন্তু কল্যাণ এবং ভালোবাসা ছড়াতে প্লাটফর্মটি ব্যবহার করছে না। বরং অনেকেই এটি ব্যবহার করছে বর্ণবাদ, ইসলামোফোবিয়া, ভায়োলেন্স এবং জাতিগত ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়াতে। পোস্টে, কমেন্টে, মেসেজে, ছবিতে, মিমসে, ভিডিওতে তারা জাতিগত ঘৃণা উসকে দিচ্ছে। ইসলামোফোবিয়ার বিস্তার ঘটাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে ইসলামোফোবিয়া ইন্ডাস্ট্রি। এখানে বিনিয়োগ হচ্ছে বিলিয়ন-মিলিয়ন ডলার। ফেসবুকে কীভাবে ইসলামোফোবিয়া ছড়াচ্ছে তার একটা চিত্র তুলে ধরা হবে এই লেখায়। পাশাপাশি এর কারণ, কার্যকরণ নিয়েও আলোচনা করা হবে।
ডা. ইমরান আওয়ানের রিসার্স
বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং ইসলামোফোবিয়া ও সাইবার বিদ্বেষ বিশেষজ্ঞ ডা. ইমরান আওয়ান ফেসবুকে ইসলামোফোবিয়া বিষয়ে একটি রিসার্স করেছিলেন। তিনি ১০০টি ফেসবুক পেজের পোস্ট, কমেন্ট পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। এই ১০০টি পেইজে তিনি অন্তত ৪৯৪টি পোস্ট পেয়েছিলেন, যে পোস্টগুলো সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। ইসলামোফোবিয়া ছড়ানো হয়েছে। শুধু বিরুদ্ধ মতামত নয়, বরং অনেক পোস্টে মুসলিমদের শারীরিক আঘাতের হুমকিও দেয়া হয়েছে। এ সমস্ত পোস্টে মোট পাঁচটি বিষয়কে হাইলাইট করা হয়েছে।
১. মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখানে ভায়োলেন্ট এবং নন-ভায়োলেন্ট মুসলিমের কোনো পার্থক্য করা হয়নি। বরং ঢালাওভাবে তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
২. মুসলিমদের ধর্ষক এবং সিরিয়াল রেপিস্ট হিসেবে দেখানো হয়েছে।
৩. মুসলিম মহিলাদেরকে সুরক্ষার হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, বোরকা, হিজাব এবং পর্দা সুরক্ষার জন্য হুমকি।
৪. বুঝানো হয়েছে মুসলিম এবং আমাদের মাঝে যুদ্ধ চলে আসছে। তারা আমাদের শত্রু। আমাদের ভূমি দখলকারী।
৫. এখানে মুসলিমদের নির্বাসিত করার প্রতি জোর দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি হালাল ফুড নিষিদ্ধকরণ, বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ নির্বিশেষে মুসলিমদের ওপর বাজে মন্তব্য করা হয়েছে।
ডা. ইমরান আওয়ান তার রিসার্চে মোট পাঁচটি টেবিল তৈরি করেছিলেন। ৩ নং টেবিলে দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ইসলামোফোবিয়া ছড়ানোর ক্ষেত্রে নারীদের তুলনায় এগিয়ে পুরুষরা। পুরুষ ৮০ শতাংশ এবং নারী ২০ শতাংশ। ৪ নং টেবিলে দেখা যায়, ফেসবুকে ইসলামোফোবিয়া ছড়ানোয় প্রথমে রয়েছে যুক্তরাজ্য (৪৩ শতাংশ)। তারপর আমেরিকা (৩৭ শতাংশ)। তারপর অস্ট্রেলিয়া (২০ শতাংশ)।
১ নং টেবিলে ডা. আওয়ান ২০টি শব্দ উল্লেখ করেছেন। এই শব্দগুলো মুসলিমদের চিত্রিত করতে ইসলামোফোবিক গোষ্ঠী ব্যবহার করে। তারমধ্যে অন্যতম হলো- মুসলিম, ইসলামিক, পাকি, গ্যাং, রেপিস্ট, এশিয়ান, ডার্টি, মসজিদ, বোমা, চরমপন্থি, হালাল, সন্ত্রাসী, কিলিং ইত্যাদি।
ডা. ইমরান আওয়ান বিভিন্ন পেজের ইসলামোফোবিক মিমস দিয়েও উদাহরণ দিয়েছেন। একটি মিমসের টেক্সট ছিল 'বয়কট হালাল ফুড; যদি আপনি হালাল ফুড ক্রয় করেন, ধরা হবে আপনি ইসলামিক জিহাদকে সমর্থন করছেন।' একটা মসলার প্যাকেটে পাগড়ি পরা একজনের ছবি দিয়ে তৈরী করা হয়েছে আরেকটি মিমস। তার টেক্সট 'মিস্টার পাকি।' 'ব্যান ইসলাম ইন অস্ট্রেলিয়া' ফেসবুক পেইজের একটি মিমসের নিচে কমেন্ট ছিল 'ইসলাম ইবোলা ভাইরাসের মতো।' 'ইসলাম ক্যান্সারের মতো।' 'ইংলিশ ব্রাদারহুড' ফেসবুক পেইজে একটি মিমস শেয়ার করা হয়েছে। ছবিতে দুটি কুরআন। একটির নিচে লেখা ইসলামিক কুরআন। আরেকটির নিচে লেখা আইএসআইএস কুরআন।
ফ্যাক্ট চেকিং সার্ভিস স্লোপেস ফেসবুকে ইসলামোফোবিয়া নিয়ে একটি তদন্ত করেছিল। তদন্তে আমেরিকার ২৪টি ফেসবুক পেজের সন্ধান পেয়েছে তারা। খ্রিস্টানদের ছোট একটি দল এই পেইজগুলোর মাধ্যমে মুসলিমবিরোধী ঘৃণা এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারক কেলি মনরো কুলবার্গ। এই ছড়ায়। এই পেইজগুলোর পেছনে অর্থায়ন করে 'দ্য আমেরিকা কনজার্ভেন্সি' পেইজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো Women for trump, Christians for trump, Evangelical for trump ।
ফেসবুক ইন্ডিয়া : ইসলামোফোবিয়া
একটি মানবাধিকার ও প্রযুক্তি গবেষণা সংস্থা ইন্ডিয়ান ইউজারদের বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বিশ্লেষণ করেছিল। তাতে দেখা গেছে ভারতের ফেসবুকে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ৩৭ শতাংশই ইসলামোফোবিয়ার সঙ্গে যুক্ত। এরমধ্যে ১৬ শতাংশ ভুয়া খবর, ১৩ শতাংশ হিংসাত্মক বক্তব্য। দীর্ঘ চারমাস ভারতের ছয়টি ভাষার হাজারের অধিক পোস্ট বিশ্লেষণ করে তারা এই তথ্য প্রদান করে।
'ফেসবুক ইন্ডিয়া: টুওয়ার্ডস দ্য টিপিং পয়েন্ট অফ ভায়োলেন্স ক্যাস্ট অ্যান্ড রিলিজিয়াল হেট স্পিচ' শীর্ষক মার্কিন-ভিত্তিক ইক্যুয়ালিটি ল্যাবসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামোফোবিয়ার বাইরে অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর হার মাত্র ৯ শতাংশ। যেখানে ইসলামোফোবিয়ার হার ৩৭ শতাংশ।
২০২০ সালে দিল্লিতে তাবলিগ জামাতের নিজামুদ্দিন মারাজে তাবলিগের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলামফোবিক পোস্ট এবং কমেন্টের হার বেড়ে গিয়েছিল। করোনার শুরুতে সমাবেশ আয়োজন করেছিল নিজামুদ্দিন মারকাজ। সমাবেশে অংশ নেয়া অনেকের পরবর্তীতে করোনা পজেটিভ আসে। এরপর থেকেই শুরু হয় মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণা। তৈরি হয় #করোনাজিহাদ এবং #নিজামুদ্দিনইডিয়টস। বিদ্বেষী প্রচারণার স্রোতে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ভুয়া খবর।
ভুয়া খবর যাচাই করে দেখে এমন একটি ওয়েবসাইট 'অল্ট নিউজ'। অল্ট নিউজের সম্পাদক প্রতীক সিনহা বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, 'তারা দুটি ভুয়া খবর যাচাই করে দেখেছে। ১. একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মুসলিমরা প্লেট চেটে খাচ্ছে। ভিডিওটি শেয়ার করে কেউ কেউ লিখেছেন এভাবেই মুসলিমরা করোনা ছড়াচ্ছে। অথচ এটি বোহরা মুসলিমদের একটি খাবার রীতি। খাবার পর প্লেটে যেন অবশিষ্ট কিছু না থাকে, তাই তারা চেটে খায়। ২. একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মুসলিমরা মুখ দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ করছে। ভিডিও শেয়ার করে লেখা হয়, 'হাঁচি দিয়ে মুসলিমরা করোনা ছড়াচ্ছে।' অথচ তারা হাঁচি নয়, বরং জিকির করছিল। নিজামুদ্দিনে তাবলিগের সমাবেশের পরই মূলত এসব ভুয়া খবর ছড়াতে থাকে।'
ফেসবুক বাংলাদেশ : ইসলামফোবিয়ার চিত্র
বাংলাদেশে ইসলামোফোবিয়া ছড়ানোর সবচে সুলভ মাধ্যম এখন ফেসবুক। পোস্ট, কমেন্ট, মেসেজ, মিমস, ভিডিওর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ছড়ানো হচ্ছে জাতিগত ঘৃণা, বিদ্বেষ, ইসলামোফোবিয়া। প্রযুক্তির কল্যাণে এই ঘৃণা- সংস্কৃতি ছড়ানোর পেছনে অমুসলিমরা যেমন কাজ করছে, তেমনি দুঃখজনক হলেও সত্যি, নামধারী কিছু মুসলমানও শামিল হয়েছে এই মিছিলে। বাংলাদোশের ইসলামোফোবিকরা কমন কিছু বিষয় নিয়ে সবসময় হৈচৈ করে। নিম্নে কিছু চিত্র তুলে ধরা হলো।
এক. হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
ফেসবুকে প্রায়শই আমাদের প্রিয়নবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করা হয়। অনেকক্ষেত্রে পাড়ার ছেলেটাও কটূক্তি করতে কসুর করে না। ২০১৯ সালের অক্টোবরে ভোলায় বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য নামে এক হিন্দু ছেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে লেখা মেসেজ মেসেঞ্জারে ছড়িয়ে দেয়। প্রতিবাদে জেগে ওঠে তৌহিদি জনতা। ভোলার বুরহানুদ্দিনে প্রতিবাদ সমাবেশে পুলিশ গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হয় ৪ মুসলিম।
প্রথমে একে ফেইক বলা হলেও এখনো পর্যন্ত এটি প্রমাণ করা যায়নি। ধর্ম অবমাননার দায়ে অনেকে গ্রেফতার হয়, অনেকে হয় না। তবে এই গ্রেফতার করা নিয়েও সুশীলদের চুলকানি হয়। একজন তো বলেই ফেলেছে, 'পশ্চিম পাকিস্তানে এমন হতো। এখন পূর্বপাকিস্তানেও ঘন ঘন হচ্ছে।' বাংলাদেশে ফেসবুকে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করার ঘটনা ভুরি ভুরি। অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে।
দুই. ইসলামি ব্যক্তিত্বদের আক্রমণ
বিভিন্ন মিমসে ইসলামি ব্যক্তিত্বদের নিয়ে মিথ্যাচার করা হয়। কটূক্তি করা হয়। হেয় করা হয়। ২০১৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর 'থাবা বাবা রিলোডেড' পেইজে আল্লামা আহমদ শফিকে রাজাকার বলে ট্যাগ দেয়া হয়।
'চক্রধার চৌধুরী' নামের আইডি থেকে হজরত মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারীর মাহফিলের পোস্টার শেয়ার করে হুরদের নিয়ে টিপ্পনি কাটা হয়।
'প্রান্ত দে' আইডি থেকে শেয়ার করা একটি মিমসে হুজুর এবং কুরআন নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়।
'ডাকসু মিমস' পেইজে মুফতি কাজি ইবরাহিমকে উগ্রবাদী ট্যাগ দিয়ে এবং কোটা আন্দোলনের রাশেদ খানকে সীমিত পরিসরে উগ্রবাদী মুফতি ইবরাহীম ট্যাগ দিয়ে একটি মিমস শেয়ার করে।
'ক্বারী সাহেব ৪.০' পেইজে সদ্যপ্রয়াত মাওলানা যুবায়ের আহমাদ আনসারীকে নিয়েও মিমস শেয়ার করা হয়। অপারেশনের কারণে তার মুখে তৈরী বক্রতাকে তুলনা করা হয় মালালা ইউসুফ জাইয়ের মুখ ভেঙচির সাথে। পাশাপাশি এখানেও অশ্লীল ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
'বাংলা মিমস' পেইজে ব্যঙ্গ করা হয় মাওলানা যুবায়ের আহমাদ আনসারীর জানাযায় অংশ নেয়া মুসল্লিদেরও। মিমসের টেক্সটে বলা হয়, 'লকডাউনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জানাযায় অংশ নিয়ে মানুষ এগুলো পেতে পারে?'
তিন. মুসলিমদের সন্ত্রাসী ট্যাগ
'ক্বারী সাহেব ৪.০' পেইজে একটি মিমস শেয়ার করা হয়েছে। তাতে প্রবলেম হিসেবে দেখানো হয়েছে পাঁচটি জিনিস। নাস্তিক, মুক্তমানা, বিজ্ঞান, সমকামী, লিঙ্গসমতায় বিশ্বাসী। সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখানো হয়েছে একটি ছবি। মেয়েটির মাথায় টুপি, হাতে দেশীয় অস্ত্র, মুখে রক্ত।
'বাংলা মিমস' পেইজে ইদুল ফিতরের দিন (২৫ মে ২০২০) একটি মিমস শেয়ার করা হয়েছে। সেখানেও কৌশলে মুসলিমদের সন্ত্রাসী বলা হয়েছে।
'কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বাংলাদেশ' পেইজে ভারতভাগের জন্য মুসলিমদের দায়ী করেছে। বলেছে, মুসলিমরা দেশভক্ত হলে পাকিস্তান হতো না, বাংলাদেশ হতো না। শুধু মুসলিম নয়, প্রাকারান্তরে এখানে বাংলাদেশের জন্মকেই অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে।
চার. ইসলামের বিভিন্ন বিধান, জায়গা নিয়ে ঠাট্টা
'ডাকসু মিমস' পেইজ থেকে 'ক্যাম্পাসে মেট্রোর স্টেশন চাই না' আন্দোলন নিয়ে একটা মিম শেয়ার করা হয়েছিল। সেখানে ইসলামের বিখ্যাত 'মুতার 'যুদ্ধ' নিয়া ফান করা হয়েছে। মূলত মুতার যুদ্ধের সাথে টিএসসিতে স্টেশনের কোন সম্পর্ক নেই। 'মুতা' নামটাকে ফানি সেন্সে ব্যবহার করতে, সাথে মুসলিমদের চটাতে এই কনটেক্সটা ব্যবহার করা হয়েছে। আরেক কারণ হলো টিএসসিতে মেট্রোর স্টেশন হলে বাইরে থেকে লোকজন এসে পেশাব করে বা মুতে পুরা টিএসসি ভাসিয়ে ফেলবে। তাই এটাকে 'মুতার যুদ্ধ' ট্যাগ দিয়ে ইসলামের যুদ্ধের জায়গার সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এটা ইসলামের প্রতি বিরুপ একটা মিম।
'সুষুপ্ত পাঠক' আইডি থেকে একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, রমজানে উন্মুক্তভাবে খাবার বিক্রি করায় খাবার ভ্যানওয়ালাকে পুলিশ শাসাচ্ছেন। সুসপ্ত পাঠক তাকে 'শরিয়াহ পুলিশ' বলে ঠাট্টা করেছেন।
'ক্বারী সাহেব ৪.০' পেইজে হজ এবং ইজতেমা নিয়েও বিদ্রূপ করা হয়েছে। দুটোকেই দেখা হয়েছে বিজনেস পলিসি হিসেবে।
করোনাকে মুসলমানরা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দার পাপের শাস্তি হিসেবেই দেখছেন। কারোনাকে কেন আল্লাহ তায়ালার শাস্তি হিসেবে দেখা হবে এটা নিয়ে রীতিমতো গালি গালাজ করেছেন নির্বাসিত লেখিকা তাসলিমা নাসরীন।
২০২০ এর বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী প্রাঙ্গনে বিশাল জামাত নিয়ে নামাজ আদায় করেছিল মাদরাসা ছাত্র এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। এই নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন।
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতায় মুসলিম বিদ্বেষ
ফেসবুকে বিভিন্ন উপলক্ষে শর্ট ফিল্ম প্রতিযোগিতা ঘোষণা করা হয়।। ২০২০ সালেও 'সবাই ভিন্ন একসাথে অনন্য' শিরোনামে এই প্রতিযোগিতার আহ্বান করা হয়েছিল। প্রতিযোগিতায় মূলত গল্প আহ্বান করা হয়। বাছাইকৃত গল্প দিয়ে তৈরী হয় শর্ট ফিল্ম। সম্প্রীতির নামে এসব প্রতিযেগিতায় ছড়ানো হয় জাতিগত বিদ্বেষ। ইসলামোফোবিয়া।
২০২০ সালের একটি শর্টফিল্ম 'নিঃশব্দ'। এতে দেখানো হয় হিন্দু ছেলের ফেসবুক আইডি থেকে মুসলিম বিদ্বেষী পোস্ট দেয়ার কারণে তাকে মারধর করা হয়। ছেলেটা মারাও যায়। কিন্তু গল্পে এটাও দেখানো হয়, মূলত হিন্দু ছেলের আইডি হ্যাক করেছে মুসলিম ছেলে। মুসলিম ছেলেই মূলত মুসলিম বিদ্বেষী পোস্ট দিয়েছে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেবার জন্য। গল্পে ক্রিমিনাল বানানো হয় মুসলিমদেরকেই। হিন্দুদেরকে বানানো হয় নিষ্পাপ। যেন সবকিছুর জন্য দায়ী মুসলিমরা।
প্রতিযোগিতার আরেকটি শর্টফিল্ম 'পর্দা'। এতে দেখানো হয় মুসলিম ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসে ঢাকায়। ঢাকায় তার পরিচিত কেউ নেই। গ্রামের ইমামের সূত্র ধরে এক মাদরাসায় রাত কাটাতে চেয়েছিল। কিন্তু মাদরাসা কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার অজুহাতে ছেলেটিকে রাতা কাটানোর জায়গা দেয়নি। গেট থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। পরে হিন্দু ছেলে তাকে জায়গা দেয়। নিরাপত্তার ধার ধারে না সে। গল্পে মূলত মাদরাসার সংকীর্ণ, অসামাজিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আর মুসলিমরা কেবল সম্প্রীতির পথে বাধাই সৃষ্টি করে।
২০১৮ সালে আরেকটি ভিডিও ক্যাম্পেইন করা হয়েছিল। ওখানেও মূলত গল্প আহ্বান করা হয়েছিল। গল্পে নির্মিত হয়েছিল শর্টফিল্ম। এরমধ্যে একটি শর্টফিল্মের নাম 'আব্দুল্লাহ'। এখানে মূলত সরাসরি মাদরাসা শিক্ষার প্রতিই অনাস্থা প্রকাশ করা হয়েছে। মাদরাসায় ছাত্রদের ছোট ছোট বিষয়ে বেত্রাঘাত করা হয়। মাদরাসা শিক্ষিতরা মাদরাসার বাইরে কেনো কাজ করতে পারে না, বাইরে কাজ করতে গেলেও তাদের কনফিডেন্স থাকে না, মাথা নুইয়ে মিনমিন করে চলতে হয় এইসব।
আব্দুল্লাহ ছিল মূল চরিত্র। এই চরিত্রে যে অভিনয় করেছে, তাকে ইনবক্সে জিজ্ঞেস করেছিলাম কওমির ছাত্ররা আসলেই তো এত কনফিডেন্সহীন না যে, অফিসের সামান্য কেরানির দায়িত্বও পালন করতে পারবে না। সবজায়গায় উপেক্ষিত। আসলে এই চিত্রায়নটা কেন? অভিনেতার সরল উত্তর ছিল স্ক্রিপ্টের বাইরে কিছু করার সাধ্য আমার ছিল না!
উধোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে
আসলে পুরো ফেসবুক জুড়েই এখন মুসলিমবিরোধী সর্বগ্রাসী প্রচারণা চলছে। আরব নিউজ একবার তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছিল ফেসবুকের এলগরিদম এন্টি মুসলিম এলগরিদম। মুসলিমদের বিরুদ্ধে যতই ঘৃণা ছড়ানো হোক, ফেসবুক পোস্টগুলো রিমুভ করে না। দক্ষিণ এশিয়ার আমেরিকান মানবাধিকার এবং প্রযুক্তি গবেষণা সংস্থা তাদের তদন্তে বলেছিল ভারতের ফেসবুকে যেসব মুসলিম বিদ্বেষমূলক পোস্টে রিপোর্ট করা হয়েছে, তার ৯৩ শতাংশই ফেসবুক কর্তৃপক্ষ রিমুভ করেনি। জাতিসংঘের তদন্তকারী ইয়াঙ্গি লি বলেছেন, 'ফেসবুক এখন সংঘাতকে উদ্বুদ্ধ করার বাহন হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার পেছনের চালিকাশক্তি ছিল ফেসবুক এবং এর বিদ্বেষমূলক প্রচারণা।'
বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকগণ বলছেন, ফেসবুকের শক্ত নীতি এবং নৈতিকতা দরকার। নয়ত আগামী পৃথিবী আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে ফেসবুক। প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ যুক্ত হচ্ছে। প্লাটফর্ম বড় এবং বিস্তৃত হচ্ছে। সবার ক্ষেত্রে সমান দৃষ্টি বজায় না রাখলে, ফেসবুকের পোস্ট এবং মন্তব্য ঘিরেই তৈরী হবে সংঘাত, সংঘর্ষ। এভাবেই বাড়বে বিদ্বেষের সংস্কৃতি। ৪৮
টিকাঃ
[৪৮] সূত্র: মিডলইস্ট আই, ২৯ জুলাই, ২০১৬, আরব নিউজ, ২১ জুন, ২০১৯, ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস, ১১ জুন, ২০১৯, দ্য গার্ডিয়ান, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯, Islamphobia on Social Media: A Qualitative Analysis of the Facebook
📄 ইসলামোফোবিয়া ও মানবাধিকার
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার দাউদ দাইন ইসলামোফোবিয়াকে ইউরোপের সবচে ভয়াবহ বর্ণবাদ বলে জানিয়েছেন। ইউরোপের অনেক মানবাধিকার সংগঠন আজও ইসলামোফোবিয়ার ভয়াবহতাকে এতটা ফোকাস করতে পারেনি। সাধারণভাবে গোটা ইউরোপ বিশেষত ফ্রান্সের গোঁড়া ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা কিছু লবির চাপে কথিত বৈশ্বিক মূল্যবোধ পালনে বিভিন্ন সংগঠন ও রাষ্ট্রকে চাপ দেয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন। এমনিতে ইউরোপে ইসলামোফোবিয়ার স্রোত ভয়াবহ। এ ছাড়াও বৈশ্বিক পর্যায়ে কথিত এই মূল্যবোধের অধিক চর্চার দাবি ব্যাপক ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছে।
বর্তমান সময়ে ইসলামবিদ্বেষের শেকড় পর্যালোচনায় একজন গবেষক একাধিক কর্মপন্থা অবলম্বন করতে পারেন। ইউরোপের বুদ্ধিজিবীরা কিছু অলঙ্ঘনীয় নীতিবাক্য ও ধ্রুবক তৈরি করেছে। এসব ধ্রুবক ইউরোপীয় সভ্যতার অংশ। তাদের জনমানুষের মনমগজ এসব চিন্তা লালন করে। এই স্বীকৃত ধ্রুবক তাদের নিকট ধর্ম থেকেও পবিত্র।
প্রথম বিষয়. ইসলাম ও সহিংসতা একে অপরের সাথে অলঙ্ঘনীয় সম্পর্ক রাখে।
দ্বিতীয় বিষয়. ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে রয়েছে মৌলিক বৈপরিত্য।
তৃতীয় বিষয়. ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে রয়েছে ব্যাপক ও শর্তহীন শত্রুতা।
যদিও তাদের নিকট স্বীকৃত এই নীতির কয়েকটি শতাব্দী আগের। কিন্তু ১৯৭৮-১৯৮২ মধ্যে ইউরোপের চিন্তাচেতনায় কথিত এই নীতির শিকড় ব্যাপক গভীরতা লাভ করে। এই সময়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিভিন্ন পরিবর্তন হতে থাকে।
ভূরাজনৈতিক দিক থেকে এই সময়ে বেশ পরিবর্তন দেখা দেয়। ইরান ও সৌদির ভেতর ইসলাম নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পার্থক্য থাকলেও পশ্চিমে এটা বিবেচ্য নয়। তারা এটাকে ইসলামের প্রচার-প্রসার বলেই মনে করে। ১৯৭৮-১৯৮২ সালের মধ্যে ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, সৌদি আরবে উতাইবি আন্দোলন ও সিরিয়ায় সশস্ত্র আন্দোলনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয়। পাশ্চাত্য সভ্যতা এটাকে তাদের জন্য হুমকি মনে করছে।
অন্যদিকে পোপ দ্বিতীয় জনপলের যুগ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের প্রেসিডেন্সির সময়ে নব্য রক্ষণশীলদের হোয়াইটে আগমণ ঘটে। অপরদিকে জেরুসালেম দখলের পর ১৯৮২ সালে লেবাননে পৌঁছে যায় ইসরায়েলি ট্যাঙ্কবহর। আঞ্চলিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক ধোঁয়াশাচ্ছন্নতা এবং পাশ্চাত্যে ইসরায়েলি লবিয়িং গ্রুপগুলোর তৎপরতায় পাশ্চাত্য বিশ্বের নিকট যেকোনো রাজনৈতিক দলের সাথে শত্রুতা করা থেকে ইসলামের সাথে শত্রুতা পোষণ করা একান্ত প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।
ইউরোপীয় অঞ্চলে মুসলিম শরণার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বেকারত্বের হার ব্যাপক আকার ধারণ করে। ইউরোপ প্রবেশ করে নতুন যুগে। নতুন প্রযুক্তি-বিপ্লবে ইউরোপ মহাদেশ নতুন আকৃতি পেতে থাকে। ইউরোপের বেকারত্ব ও শরণার্থীদের সংখ্যাবৃদ্ধির এই সারণি ইউরোপের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংগঠনই দিয়েছে। ১৯৪৬ সালে উত্তর আফ্রিকা থেকে ফ্রান্সে আগত মানুষদের সংখ্যা এক লাখও অতিক্রম করেনি। অন্যদিকে ১৯৭৫ সালে চব্বিশ লাখের অধিক শরণার্থী ফ্রান্সে আসে।
জার্মানিতেও তুর্কি ও কুর্দি কমিউনিটির সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৭৪ সালে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে জার্মানিতে শরণার্থীর সংখ্যা সাত লাখ পনেরো হাজার থেকে পঁয়ত্রিশ লাখে পৌঁছে যায়। অন্যদিকে ইউরোপের শরণার্থীপ্রধান দেশগুলোতে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সালে বেকারত্ব ১৬০ পার্সেন্ট বেড়ে যায়।
যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ১৮১৫ সাল থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৬০ মিলিয়ন মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে। তদুপরি পশ্চিম ইউরোপ নিছক অর্থনৈতিক কারণে হওয়া এই উদ্বাস্তু সমস্যাকে গ্রহণ করতে পারেনি। কিন্তু অর্থনৈতিক কারণে মানুষের এই অবাধ চলাচল তো চলবেই। অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমকেন্দ্রিক এই মানববিশ্বে মানুষের এ অবাধ চলাচল তো থাকবেই। যেখানে সীমান্তের প্রতিবন্ধকতা খুবই গৌণ।
বৈশ্বিক এই পরিবর্তনের কোলাহলের মধ্যে ইউরোপে শুরু হয় পরিচয় সংকট। প্রচুর মানুষ শরণার্থী হওয়ায় সাদা-কালোসহ বহু মানুষ একত্রিত হয় ইউরোপীয় সমাজে। মানুষের ভার আর বেকারত্বে অর্থনীতি হয়ে পড়ে নাজুক। নতুন মানুষের উপস্থিতিতে আবার নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয় সমাজের আদি বাসিন্দাদের মধ্যে। এই আশঙ্কার মধ্যে আসে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনা। যে আশঙ্কাকে প্রকাশ্যে সজোরে বলতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল পশ্চিমা, টুইন টাওয়ার হামলা সেই আশঙ্কার প্রকাশকে অবাধ করে দেয়। বহুজাতিভিত্তিক ইউরোপের দাবিদার 'ইউরোপ সন্ত্রাসী' শত্রুর সন্ধান পেয়ে যায়।
ইউরোপের বুদ্ধিজীবীমহল ইসলামোফোবিয়ার বিষয়টি শুধু উপেক্ষাই করেননি। বরং ইসলামোফোবিয়া নিয়ে যারা শঙ্কা প্রকাশ করছেন, নিম্নে উল্লিখিত পয়েন্ট দ্বারা তাদের প্রতি নগ্ন আগ্রাসন চালিয়েছে তারা। যেমন-
১. যারা ইসলামোফোবিয়ার কথা বলে, এরা হলো ইরানি মোল্লা। এই সমালোচনায় যদিও ভুলে যাওয়া হয়, এই শব্দ প্রথম ১৯২৫ সালে ব্যবহৃত হয়। ফ্রান্সে ইসলামোফোবিয়ার ভয়াবহ বর্ণনায় লিখিত একটি প্রবন্ধে এ শব্দ ব্যবহৃত হয়।
২. ইউরোপের জন্য ইসলাম হুমকি। কারণ, মুসলিমরা সমাজের মধ্যে বিচ্ছিন্ন একটি সমাজ তৈরি করছে।
৩. ইসলামোফোবিয়া নিয়ে এক ধরনের ব্ল্যাকমেইল করা হয়। সাধারণত ইউরোপের ইসলামপন্থিরা বলে থাকেন, ইসলাম একটি ধ্রুবক। এটা কোনো পরিবর্তন গ্রহণ করে না। ইসলামোফোবিয়ার সমর্থকরা এই খণ্ডিত বক্তব্যকে গ্রহণ করে বলে থাকে, ইসলাম যুক্তিকে গ্রহণ করে না। এভাবে ইসলামোফোবিয়ার বিষয়টি সামনে এনে তাদের ঘৃণ্য মানসিকতা লুকিয়ে রাখার অপচেষ্টা চালায়।
এখানে আমরা ইসলামোফোবিয়ার পরিভাষা ও এর সূক্ষ্মতম অলিগলি নিয়ে আলোচনা করছি না। ইসলামোফোবিয়াকে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বৈধতা দেয়ার জন্য গত শতাব্দীর শেষার্ধে যে প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হয়েছে, তা নিয়ে আমরা আলোচনা করব। ইসলামোফোবিয়াকে বৈধতা দেয়ার এই প্রক্রিয়া একদল চরমপন্থি বুদ্ধিজীবীর সৃষ্টি করেছে। তারা মানবতার অস্তিত্বের জন্য মুসলিমদের প্রতি ঘৃণাকে শুধু যথেষ্ট মনে করে না বরং ইসলামকে মানবতার জন্য হুমকি মনে করেন।
ইউরোপের ডানপন্থি পত্রিকার পাশাপাশি বিভিন্ন মধ্যপন্থি পত্রিকাগুলোও মুসলিমদের হুমকি হিসেবে তুলে ধরার অদ্ভুত সব যুক্তি উপস্থাপন করে। নিরাপত্তাজনিত কারণে চার্লস দি গল বিমানবন্দরগামী রোডে মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দেয় ফ্রান্সের মধ্যপন্থি ছয়টি জাতীয় পত্রিকা। পত্রিকাগুলো মনে করে এমন ব্যক্তিকে বিমানবন্দরসহ স্পর্শকাতর স্থানে যেতে দেয়া ঠিক নয়, যিনি দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন, সুযোগ পেলেই নামাজ আদায়ে মসজিদে যান কিংবা হজ করার ইচ্ছা রাখেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সর্বোচ্চ কমিশন তাদের এক সিদ্ধান্তে ইউরোপের লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক কর্তৃক ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতাকে বৈধতাদানের নিন্দা জানান। হাইকমিশন আরও বলেন, 'ইসলাম ও সহিংসতার মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক জুড়ে দেয়া প্রকারান্তরে বর্ণবাদ ও বৈষম্য বলে বিবেচিত। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ইসলাম ও সন্ত্রাস অভিন্ন হওয়ার প্রবণতাও বর্ণবাদ ও বৈষম্য।'
নিশ্চয়ই বিভিন্ন স্থানে কিছু অবিবেচক মুসলিমের কারণে যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তা আমরা অস্বীকার করছি না। বৈষম্য ও বর্ণবাদের নামে কোনো ধর্ম ও গোষ্ঠীর সমালোচনার অনুমোদন এবং একজন বিশ্বাসীর স্বাধীনতার মধ্যে অবশ্যই আমরা পার্থক্য করি।
ইউরোপীয় পরিমণ্ডলে ইসলাম প্রবেশের পূর্বেই ইউরো সমাজে ধর্ম ছিল একটি বহুল চর্চিত পাঠ্য ও সমালোচনার বিষয়। তবে প্রথম দিকে ইউরোপে আসা মুসলিমরা অমুসলিম সমাজে মুসলিমদের করণীয় আচার-ব্যবহার ইত্যাদি সম্পর্কে প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পারেনি। মুসলিম-অমুসলিম সমাজে মুসলিমদের পৃথক বিধানের অনবগতি মুসলিমদের জন্য নেতিবাচক অবস্থা তৈরি করেছে।
উদাহরণস্বরূপ একজন ইসলামপন্থি লেখক যিনি সারা জীবন ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে লেখালিখি করেছেন, তারপক্ষে ইউরোপে জন্ম নেয়া নিজ সন্তানকে এটা বলা নিশ্চয়ই কঠিন যে, ইউরোপে মুসলিমদের রক্ষায় গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষতাই সবচে উত্তম।
১৯৯৭ সালে ইসলামোফোবিয়ার একটি পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করেছে বেসরকারী সংস্থা The RnNymede Trust. সংস্থাটি ইসলামোফোবিয়ার আটটি ক্রাইটেরিয়া বর্ণনা করেছেন।
১. ইসলামকে স্থবির জ্ঞান করা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা প্রভাবিত হয় না বললেই চলে।
২. ইসলাম একক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। অন্যসব সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে এর সাদৃশ্যপূর্ণ কোনো মূল্যবোধ নেই। তারা প্রভাবিত হয় না। এবং প্রভাবকও নয়।
৩. পাশ্চাত্যের বিবেচনায় ইসলামকে বর্বর, অবৈজ্ঞানিক, আদিম ও যৌনপ্রবণ বলে আখ্যায়িত করা।
৪. ইসলামকে সহিংস, আগ্রাসী ও সমস্যার উৎস বিবেচনা করে একে সন্ত্রাসবাদ ও সভ্যতার সংঘাত-সহযোগে বিবর্ণ বলে অভিহিত করা।
৫. রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ইসলামকে একটি আদর্শ বলে বিবেচনা করা।
৬. পাশ্চাত্যের প্রতি ইসলামপন্থিদের কোনো ধরনের সমালোচনাকে সহ্য না করা।
৭. সমাজের মূল স্ট্রিম থেকে মুসলিমদের সরিয়ে রাখা। এবং মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের যৌক্তিকতা প্রকাশে ইসলামের প্রতি শত্রুতাকে ব্যবহার করা।
৮. মুসলিমদের প্রতি শত্রুতাকে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক বলে গণ্য করা।
২০০৫ সালে কাউন্সিল অব ইউরোপ 'ইসলামোফোবিয়া এবং যুবকদের উপর এর প্রভাব' শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়- 'ইসলামোফোবিয়া হলো ইসলাম, মুসলিম এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভয় ও কুসংস্কার। চাই সেটা দৈনন্দিন বৈষম্য ও বর্ণবাদ প্রকাশে হোক কিংবা আরও সহিংস পদ্ধতিতে প্রকাশিত হোক মানবধিকারের লঙ্ঘন এবং সামাজিক সংহতির জন্য ঝুঁকি। বর্ণবাদ ও অভিবাসন পর্যবেক্ষণ বিষয়ক ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে ‘বর্ণগত বৈষম্য ও ইসলামোফোবিয়া’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন।
প্রকাশ করে। প্রতিবেদন বলা হয়, ইউরোপে শিক্ষা, বাসস্থান ও কর্মক্ষেত্রে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতন করা হয়।'
আমি যখন পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি চেয়ে আবেদন করলাম, কাউন্সিলের প্রধান বিস্তারিত বলতে অস্বীকার করে তার অভিজ্ঞতার কথা জানালেন, 'ইসলামোফোবিয়াটা মৌখিক তাচ্ছিল্য থেকে শুরু হয়ে শারীরিক নির্যাতন, উপাসনালয় ও গোরস্থানে হামলার ঘটনা ঘটে। সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ব্যাকগ্রাউন্ড বিবেচনা না করেই ইউরোপের সকল নাগরিকদের মধ্যে সমতা রক্ষায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের কার্যকর পদক্ষেপ খুবই প্রয়োজন। মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজের অধিকার রক্ষার বিভিন্ন সভা-সমাবেশে মুসলিমদের ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করা।'
অধিকাংশ মানবাধিকার ও বর্ণবাদবিরোধী সংগঠনের নেতারা মনে করেন, ইসলামোফোবিয়ার রাজনৈতিক ব্যবহার ইউরোপের রাজনৈতিক ব্যবসায় বর্তমানে সবচে জনপ্রিয়। পরবর্তীতে দৃষ্টি দিতে হবে, দৈনন্দিন সকল ধরনের বৈষম্য ও আগ্রাসন থেকে মুসলিমদের রক্ষায় একটি আইনি টিম তৈরি করা। এই টিমে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সকল ব্যক্তিত্ব যুক্ত করা। কারণ, ইসলামোফোবিয়া ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসলামোফোবিয়ার এই উগ্রতার মোকাবিলা করতে হবে। এর জন্য ইউরোপীয় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের দৃঢ় ভূমিকা রাখতে হবে। ৪৯
টিকাঃ
[৪৯] সম্পূর্ণ লেখাটি আল জাজিরা অবলম্বনে রচিত
📄 ইসলামোফোবিয়া ও গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষতা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যানা আরেন্ড। দর্শন শাস্ত্রের পুরোধা। দর্শনের জটিল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে কখনো কখনো তিনি অভিজ্ঞতার আলোকে বয়ান দিয়েছেন আগামীর বিভিন্ন ঘটিতব্য ঘটনাকে।
'পথ তো চলছে, কিন্তু এ পথের বর্ণবাদ পাশ্চাত্য বিশ্ব ও সম্পূর্ণ বিশ্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে।' হানা আরেন্ট এই ভবিষ্যৎবাণী দিয়েছিলেন। পূর্বাপর দৃশ্যমান কোনো যোগসূত্র না থাকায় এটা কারো দৃষ্টি ততটা আকর্ষণ করতে পারেনি। বর্ণবাদ ও ফ্যাসিবাদের জঘন্য খাদ থেকে মুক্তি পাওয়া ইউরোপ কখনো যে চরমপন্থা ও বর্ণবাদের শিকার হবে এটা কখনো কেউ কল্পনা করতে পারেনি। বর্ণবাদটা যেমনই হোক, বর্ণবাদের টার্গেট যেই হোক না কেন?
উদার চিন্তার কথিত গ্যারিসন যুক্তরাষ্ট্র, বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত প্রদানের অন্যতম সদস্য রাশিয়া, বিশাল জনশক্তির বলে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার স্বপ্নে বিভোর চীন এবং একই সাথে জীবনবাহী ব্যাকটেরিয়া ও মৃত্যুবাহী ভাইরাসে আক্রান্ত ইসলামিবিশ্ব আজ বিদ্যমান অস্থিতিশীল বিশ্বকে পরিচালিত করছে।
বিভিন্ন শক্তির বিশ্ব পরিচালনার ব্যর্থতায় তিক্ত মানুষ বিকল্প শক্তি ও সভ্যতার খোঁজে এদিক-সেদিক ফিরছে। এ অস্থিতিশীল অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে মানব জাতিকে রক্ষায় এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অংশ হিসেবে ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা ও ভারসাম্য নীতির প্রয়োজনীয়তা বোধ করে মানুষ। খোদ ইউরোপ ও ইউরোপের বসবাসরত আরব ও মুসলিমদের দায়িত্ব অর্পিত হলো ইউরোপের ওপর। ব্যক্তিক ও সামষ্টিক অধিকার রক্ষায় এবং মৌলিক স্বাধীনতার মূলনীতি তৈরির গুরু দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ইউরোপ। ব্যক্তি ও সমাজের অধিকার রক্ষাকে ইউরোপের স্থিতিশীলতা ও অস্তিত্বের মূল ভিত্তি বিবেচনা করা হয়। সর্বোপরি এই ইউরোপই পুঁজিবাদ ও ঔপনিবেশিক ভয়াবহতা থেকে রক্ষাকারী আলোকায়ন-মূল্যবোধের ধারক।
ইসলাম অর্ধ শতাব্দীর কম সময়ে সাধারণ একটি ধর্মের অবস্থান থেকে সমাজের মৌলিক ও বিশ্বাসী গোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হয়। তবে এটা কোনো পরিকল্পিত নয়। সস্তা শ্রমের জন্য তৃতীয় বিশ্ব থেকে শ্রমিক আমদানীকারক কোনো ব্যবসায়ীর চিন্তায় তা ছিল না। বরং ইউরোপে সক্রিয় বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনগুলো তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মপ্রচার কার্যের লক্ষ্য হিসেবে এটাকে নির্ধারণ করেনি।
যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক পরিবেশে সংলাপ ও দৃষ্টিভঙ্গি যতটা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়, স্বৈরতন্ত্র-বেষ্টিত কোনো পরিমণ্ডলে সংলাপ ও দর্শন ঠিক ততটা সংকুচিত হয়। গণতান্ত্রিক পরিবেশে দ্রুতই একটি দল একটি শক্তিতে পরিণত হতে পারে। নিঃসন্দেহে শক্তি তৈরির এই মুহূর্ত ইসলামভীতি তৈরির জন্য সবচে উর্বর সময়।
একটি গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের শক্তি তৈরির এ মুহূর্ত নিঃসন্দেহে তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্বভাবতই রাজনৈতিক ইসলামি সংগঠনগুলোর জন্য এটা খুবই কাঙ্ক্ষিত। অন্যদিকে মুসলিম কমিউনিটি আছে এমন দেশগুলোর জন্য এটা একটি বড় চাপ। তাছাড়া এসব দেশের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির জন্য এটা শঙ্কাও বটে। সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ যেই নাগরিক- তাদের মধ্যে যদি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বোধে ভিন্নতা তৈরি হয়, তবে তা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অশনি সংকেত। যদিও আমাদের বিদ্যমান সমাজব্যবস্থায় ভিন্ন বোধে বেড়ে ওঠা নতুন জনগোষ্ঠীকে ইনসাফের সাথে গ্রহণ করা হয় না। তাদের বোধ ও রুচিবোধের বিবেচনা না করে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়।
ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার আগে সমাজের মূল ধারার আসতে ইউরোপের ইহুদিদের যুগের পর যুগ লেগেছে। বর্তমানে ইউরোপে বসবাসরত এশিয়ান বিভিন্ন কমিউনিটিকে অর্থনৈতিক কমিউনিটি বলাই শ্রেয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তারা ইউরোপে আগমন করেছে। ইসলামের সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি ইউরোপের সুধী সমাজের জন্য রীতিমতো আশঙ্কার জায়গা। এমনকি শরণার্থীদের অধিকার সচেতন মানবাধিকার কর্মীদের আশঙ্কাও গোপন থাকেনি। তাদের এই আস্থার সংকটকে তীব্র করে ইউরোপে আগমনকারী প্রথম দিকের ইসলামপন্থিরা। যারা তাদের দেশে ধর্মনিরপেক্ষতাকে পাশ্চাত্য প্রোডাক্ট বিবেচনা করে সারা জীবন এর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।
এমনকি ইউরোপের সংখ্যালঘুদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাকে সবচে উপযোগী মনে করলেও তারা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে একটি ইসলামি রাষ্ট্র তৈরির চেষ্টা করে। এবং অনবরত অন্যায়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে চরমভাবে আক্রমণ করে। এখানে মনে করিয়ে দেয়া জরুরি মনে করছি, গণতন্ত্রই ধর্মনিরপেক্ষতা নয়। গণতন্ত্র ছিল চার্চের প্রধান শত্রু।
এই গণতন্ত্রই অষ্টাদশ শতাব্দীতে তার জন্মের প্রথম দিন থেকেই বেশকিছু মূলনীতি বুকে ধারণ করেছিল। স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রৃত্ব, সহমর্মিতা, নিরাপত্তা, জনগণের সার্বভৌমত্ব ও প্রশাসনের পৃথকীকরণের মূলনীতি। পরবর্তীতে ১৯০৫ সালে ফ্রান্সে প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ আইন জারি হয়। আইন অনুসারে রাষ্ট্র থেকে চার্চকে পরিপূর্ণভাবে পৃথক করা হয়।
১৯০৫ সালের ঐ আলোচনায় মূল প্রাণসত্তাই ছিল কোনো ধর্ম কিংবা বিশ্বাস-প্রসূত আইন সমাজের ওপর আরোপ না করা। অন্যদিকে সামাজিক ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে গণতন্ত্রের মূলনীতি পরিপক্ব হয়। এই গণতন্ত্র জন-জরিপ এবং পরবর্তীতে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়ায় আরও পুষ্ট হয়। এবং বিংশ শতাব্দীর ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো মূল্যবোধ কিংবা আক্বিদা নয়। বরং এটা একটি মূলনীতি ও প্রস্তাব। সম্ভাব্য পরিণতির বিবেচনা করে একটি প্রস্তাব প্রদানের নামই ধর্মনিরপেক্ষতা। গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বহির্ভূত যেকোনো তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি তারা স্টালিনবাদের বিরোধিতা করেন। কারণ, স্টালিনবাদীরা খোদাদ্রোহিতাকে ধর্ম বানিয়ে একটি স্বতন্ত্র ধর্মের অবস্থান দিয়েছে।
দাতব্য কর্মে 'মৌলিক অর্থনৈতিক অধিকার'-এর মূলনীতির পরিবর্তে কোনো ধর্মজাত প্রেরণাকে প্রত্যাখ্যান এই মতবাদ। মোটকথা ধর্মতাড়িত কোনো ভালো কাজও তাদের কাছে নিন্দনীয়। বরং এই ভালো কাজটির মূল প্রেরণা থাকবে ধর্মভিন্ন ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি। ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা মূলত তিনটি পয়েন্টে খুবই স্পর্শকাতর- -চিন্তা ও মতের শর্তহীন স্বাধীনতা -বৈশ্বিক মানবাধিকার -রাষ্ট্র ও চার্চের পৃথকীকরণ
তবে রাষ্ট্র সমাজের সবকিছু সমান তালে চলে না। সবকিছুকে এক পাল্লায় মাপাও যায় না। সমাজ-রাষ্ট্রে সকল স্থানেই কি ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ নাকি কোথাও কোনো স্পেস আছে? এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা ফ্রান্সিস ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের একটি বহুল চর্চিত 'ফোরস্পেস' থিওরি তুলে ধরছি।
ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা চারটি ক্ষেত্রের কথা খুব বলেন, বিশেষ স্পেস, সাধারণ স্পেস, প্রশাসন ও স্বাধীনতা তৈরির স্পেস।
বিশেষ স্পেস বলতে ব্যক্তি স্বাধীনতা। আর সাধারণ স্পেসের আওতা বেশ বড়। সামাজিক কর্মকাণ্ডের বিশাল পরিধিকে বুঝায় এটা। এ জন্যই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে ব্যাপক অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র সাধারণত এ বিশেষ স্পেসেই ইবাদত, ধর্মপ্রচার ও ধর্মীয় প্রতীকের স্বাধীনতার দাবি করে। এ কারণেই সামাজিক পরিধিতে ধর্মীয় কোনো প্রতীককে অপ্রতিঘাত করার বিশেষ এক ধরনের ঐকমত্য আছে।
রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ বলতে রাষ্ট্রের আইনবিভাগ, নির্বাহী ও প্রশাসনিক বিভাগকেই উদ্দেশ্য করে থাকে। এক্ষেত্রেও ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মীয় আচার- আচরণের বিষয়ে শিথিলতা প্রদর্শন করে। অন্যদিকে স্কুল, কলেজ ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে নাগরিক-তৈরির প্রতিষ্ঠান বলা হয়।
প্রচলিত আছে, জার্মান সমর্থক মিলিশিয়ারা একটি স্কুলে প্রবেশ করে ইহুদি সন্তানদের সামনে আনতে বলেন, স্কুল ইন্সপেক্টর উত্তর দেন, 'আমাদের এখানে কোনো ইহুদি সন্তান নেই, আমাদের রয়েছে শুধু শিক্ষার্থী' এবং ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা হিজাব ও নেকাবের পক্ষে মানবাধিকারকর্মীদের সাথে থেকেছেন। তাদের মতে, নেকাব নিষিদ্ধ করার সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো সম্পর্ক নেই। ধর্মনিরপেক্ষতা হিজাব-নেকাবেরবিরোধী না।
কোনো কোনো ব্যক্তি ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে বর্তমানে কিছু সংযুক্ত করার কথা বলেন। উন্মুক্ত, উদার, বহুত্ত্ববাদী, ইতিবাচক গণতন্ত্র ইত্যাদি নামে বলার চেষ্টা করেন। তবে অধিকাংশ গণতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী এ ধরনের সংযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেন।
ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষ ধারা সবসময় মানবাধিকার ইস্যুতে সামনে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা তাদের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গ্রুপের মুসলিমবিরোধী তৎপরতার লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। হোক তারা জায়নিস্ট কিংবা নিউ লিবারেল সমর্থক। সেজন্য আমরা গোয়েন্তানামো, গোপন কারাগার, কালো তালিকা ইস্যুতে আমাদের সাথে সমাজতান্ত্রিক ও বিশ্বায়নবিরোধী কাউকে দেখলে অবাক হবো না। কিন্তু অল্পই আমাদের সাথে কোনো ডান গণতন্ত্রীকে পাবো। অনুরূপভাবে গাজা ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলের অন্যায় অবরোধ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণ ও সীমান্ত বন্ধের বিরুদ্ধেও বামপন্থি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের দেখা যাবে।
বর্তমানে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর অনুকূলে কর্মরত রয়েছে গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদ। এসবের কারণে সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামোফোবিয়ার পাঠ যথেষ্ট নয়। বরং ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় জনমত প্রভাবক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে মনোযোগী হতে হবে।
তাছাড়া বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের কর্মপন্থা, পদ্ধতি ও দাওয়াতি কর্মকৌশলের দিকে দৃষ্টি দেয়ার জন্য সাহসও দরকার। কিছু কিছু ইসলামি রাজনৈতিক পক্ষ তাদের ইসলামি প্রতিপক্ষকে ইসলামোফোবিয়ার পদ্ধতিতে মোকাবিলা করে। তারা ইসলামোফোবিয়াবিরোধী মানবাধিকার ও সুশীলদের আন্দোলন থেকে দূরে থাকে। নন-ইউরোপীয় রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে তাদের পরিচয় প্রকাশিত হওয়ার আশঙ্কায় তারা হয়তো এমন করেন।
বিভিন্ন ব্যক্তি ও আন্দোলনের কর্তা ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড দ্বারা প্রতীয়মান হয়, ইউরোপের মুসলিমদের মূল সম্পর্ক মুসলিম কমিউনিটির সাথে। এক্ষেত্রে ইউরোপের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নাই। এভাবে ইউরোপে মানবাধিকার রক্ষায় অভিন্ন লড়াইয়ের মাধ্যমে অস্তিত্বে আসা গঠনমূলক ও ইতিবাচক সকল সেতু বন্ধনকে নষ্ট করে এরা।
একাধিক আলোচনায় একাধিক রাজনীতিবিদ বলেন, 'প্রতিটি লড়াইয়ে হারজিত হয়। কিন্তু সকল অবস্থায় মুসলমানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং আমরা কেন সময় নষ্ট করবো?' এক্ষেত্রে বলতে হবে, আমরা কিছু ইসলামপন্থি দ্বিচারিতাদের জন্য বারবার মূল্য চুকাচ্ছি। যারা নিচু আওয়াজে বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা ইউরোপের সংখ্যালঘু মুসলিমদের জন্য সবচে নিরাপদ ব্যবস্থা। অন্যদিকে জোর আওয়াজে বলেন, ইসলামই সমাধান। তারা পোশাকের স্বাধীনতার নামে নেকাবের পক্ষাবলম্বন করেন। আবার মুসলিম দেশগুলোতে পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে একটি শব্দ পর্যন্ত বলেন না। তাছাড়া গণতন্ত্রের ওপর কিছু সালাফিদের সদা আক্রমণ তো আছেই। তাদের নিকট সকল নোংরামি, জেনা-ব্যভিচার ও সমকামিতার জন্য একমাত্র দায়ী গণতন্ত্র।
সর্বশেষ ফ্রান্সে নেকাব নিষিদ্ধের সময় গণভোটের আয়োজন নিয়ে একটি বিষয় দেখা যায়। বড়ো বড়ো আরব স্যাটালাইট চ্যানেলগুলো এই ফাঁদ থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। তারা একজন লিবারেল ইসলামিস্টের বিপরীতে একজন চরম ডানপন্থি মানুষকে আলোচনায় এনেছে।
একজন মুসলিম কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রতিপক্ষ মুসলিমকে ঘায়েল করছেন। অন্যদিকে একজন ইউরোপীয় উভয়ের মধ্যে সমন্বয়ের ব্যবস্থা করছেন। যেন সমন্বয়ক একজন ফকীহ। অথচ আলোচনা চলছে বর্তমান পরিস্থিতিতে গণভোটের অকার্যকারিতা সম্পর্কে।
তাছাড়া ইসলামি সংস্থা ও রাষ্ট্রগুলোকেও এ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত দেখা যায়। অথচ মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রাজনীতি সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চার্টারের অধীনে কথা বলার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। কিন্তু ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের সবচে বড়ো সংগঠনের সেক্রেটারি স্পষ্ট বলেন, রাস্তায় নেকাব পরা থেকে বিরত রাখা কিংবা বাধা দেয়া ধর্মনিরপেক্ষতা নয়। তাছাড়া পাবলিক প্লেসে নেকাব ও ধর্মীয় প্রতীকে বাধা দেয়া বৈধ নয়।
২১/১/২০১০ সালে ফ্রান্সের মানবাধিকারবিষয়ক জাতীয় পরামর্শ পরিষদ ৩৪/২ ভোটে নেকাব বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাস করে। এই প্রস্তাবে মৌলিকভাবে নেকাববিরোধী যেকোনো আইন প্রণয়নের বিরোধিতা করা হয়। পাশাপাশি পরিষদ সকল ধরনের বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানায়। অথচ কোনো আরব পত্রিকা ও গণমাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কোনো তথ্য আসেনি। বরং কিছু চ্যানেল তো বরং ইসলাম ও মুসলিমদের বিষয়ে বর্ণবাদী কিছু ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের দাবি অনুসারে সম্ভাব্য যে সিদ্ধান্ত হবে সেই কথা প্রচার করছে।
এ ধরনের আচরণ সঠিক নয়। এবং এটা ইউরোপের মুসলিম কমিউনিটির জন্য কোনো সুফল বয়ে আনে না। তাছাড়া ইসলামোফোবিয়ার মোকাবিলায় আমাদের আরও বুদ্ধিবৃত্তিক হওয়া দরকার। মৌলিকভাবে স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদান করার প্রতি মনোযোগী হওয়া একান্ত প্রয়োজন। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে সমাজপ্রভাবক গণমাধ্যম ও সামাজিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। নতুবা শুধু ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় সংগঠনের কোনো উপযোগিতা থাকবে না। ৫০
টিকাঃ
[৫০] সম্পূর্ণ লেখাটি আল জাজিরা অবলম্বনে
📄 ইসলামোফোবিয়া থেকে মসজিদফোবিয়া
বিশ্ব চলছে বিনিয়োগ পদ্ধতিতে। বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থবিত্ত অর্জন করে মানুষ। কখনো রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থে অর্থ ছাড়াও অনেক বিনিয়োগ-পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। তবে দৃশ্যমান বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে আজ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক ফলপ্রসূ বিনিয়োগ পদ্ধতি হলো ঘৃণা ও বিদ্বেষের চাষ। ঘৃণা ও বিদ্বেষ চাষ থেকে লাভজনক কোনো বিনিয়োগ পদ্ধতি বিশ্বে দ্বিতীয় আরেকটি নেই। রুটিরুজির স্বপ্ন যেসব দেশ ও অঞ্চলের লোকদের নিকট সেরা স্বপ্ন, সেই অঞ্চল ও দেশে মূলত এই বিনিয়োগ পদ্ধতির ব্যাপক চাষ করে কথিত উন্নতবিশ্ব। বিদ্বেষ ও ঘৃণাচাষের অন্যতম হাতিয়ার ইসলামোফোবিয়া; ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করা এবং তা সমাজে বাস্তবায়ন করা। আমেরিকার রাজধানী নিউইয়র্কের বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে বিমান-হামলার পর থেকে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। ইসলামকে সভ্যতা, সংস্কৃতি ও প্রগতির বিরুদ্ধ-শক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়ে মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। যেকোনো সুবিবেচক ব্যক্তি পশ্চিমা এই ইসলামোফোবিয়ার কথিত ডামাডোলের মধ্যে স্বভাবত দুটি বিষয় লক্ষ্য করতে পারবেন।
প্রথমত, ইউরো-মার্কিন পরিমণ্ডলে ইসলামোফোবিয়া তৈরি করা এবং রাজনৈতিক স্বার্থচরিতার্থ করার হীন মানসিকতা নিয়ে নির্বাচনি প্রচারণায় তার প্রয়োগ ঘটানো। সর্বত্র ইসলাম ও মুসলিমদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার গুরুত্ব প্রদানের পাশাপাশি এর নীরব ও কৌশলী প্রচারণা। ইসলামকে পরিশুদ্ধকরণের কথিত দাবি তুলে উম্মাহকে পদাবনত করার হীন প্রচেষ্টা। আর হ্যাঁ, মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান অবস্থা অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত অবস্থা আমাদের এ ব্যাখ্যার গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে।
দ্বিতীয়ত, মুসলিম সমাজের রক্ষণশীল অংশকে পাশ্চাত্যে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার প্রবণতা। ইসলামোফোবিয়া বললে অবচেতন মনে পাশ্চাত্য ও অমুসলিম সমাজের চিত্র ধরা দেয়। কিন্তু মুসলিম সমাজে ইসলাম-বিদ্বেষ ও ঘৃণা আজ শিকড় গেড়েছে। বরং আমরা মুসলিমরা পাশ্চাত্যে ইসলামোফোবিয়া-চুল্লিতে আরও কিছুটা জ্বালানি ছিটিয়ে দেয়ার কাজটি বেশ পারঙ্গমতার সাথে করে থাকি। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রায়িত করা এবং মুসলিমদের সন্ত্রাসী ট্যাগ দেয়ার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় আরও একহাত এগিয়ে দেই, এই আমরা মুসলিমরা।
তিউনিশিয়ার বিন আলী থেকে সিরিয়ার বাশার আল আসাদের মতো আরব জালিম শাসকদের কথা চিন্তা করুন; অধিকার আদায়ের জন্য মজলুম জনগণ যখন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে, লড়াই করছে তখন জালিম শাসকবর্গ এদের সন্ত্রাসীর তকমা লাগিয়ে পশ্চিমা প্রভুদের নিকট উপস্থাপন করছে।
মুসলিম শাসকদের এই কর্মকাণ্ড পশ্চিমের মুসলিমদের হুমকির মুখে ফেলে দেয়। পশ্চিমা থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলো মুসলিম শাসকদের এ কর্মকাণ্ডকে পশ্চিমে বসবাসকারী মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রমাণস্বরূপ হাজির করে। এবং পশ্চিমা দেশের মুসলিম কমিউনিটির বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় মানুষদের আহ্বানে পুরাতন রীতিনীতির পরিবর্তে সময়ের সাথে চলমান কর্মপন্থা-অবলম্বনের দাবিও উঠছে বেশ উচ্চকণ্ঠে। এই দাবির প্রবক্তারা মনে করেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র অর্জনের ক্ষেত্রে একমাত্র বাধা হলো ধর্মীয় বয়ানে নতুনত্বের অভাব।
কিন্তু পশ্চিমাবিশ্ব আজ ইসলামভীতির পথ মাড়িয়ে নতুন ভীতি ও নতুন ঘৃণার রসদ খুঁজে পেয়েছে। এখন ইসলাম থেকে ইসলামের বিভিন্ন প্রতীকের প্রতি এই -বিদ্বেষ ও ঘৃণা প্রলম্বিত হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকার পথেঘাটে ইসলামের বিভিন্ন প্রতীকের বিরুদ্ধে সভাসমাবেশ বের হচ্ছে। দাড়ি-টুপি-হিজাবের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে। সবচে বেশি ঘৃণার শিকার হচ্ছে মসজিদ। হাতে হাতে প্ল্যাকার্ড শোভা পাচ্ছে। এগুলোতে লেখা- 'আমরা আর মসজিদ চাই না' অথবা 'মসজিদকে না বলুন। ভীতিচর্চার বিবর্তন-ইতিহাসে নতুন ফোবিয়া তৈরি হয়েছে; মসজিদফোবিয়া। আজ ইসলামের বিশ্বাসের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতীকের প্রতিও একধরনের ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রকাশ পাচ্ছে।
ভাষান্তর: রকিব মুহাম্মদ