📄 ভারতেও বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষ
ভারতে ক্রমাগত মুসলিমবিদ্বেষ বাড়ছে। দেশটির মুসলিমবিদ্বেষী নাগরিকত্ব আইন ও কথিত নাগরিকপঞ্জির মতো ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে বহুদিন থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে। ভারতের মুসলিমবিদ্বেষ চর্চার একটি ঘটনা উল্লেখ করলেই বোঝা যাবে। ২০২০ সালের মার্চে করোনার প্রকোপ শুরু হলে দিল্লিতে তাবলিগ জামাতের এক সমাবেশকে কেন্দ্র করে শুরু হয় তুলকালামা ঘটনা। ওই সমাবেশে যোগ দেয়া অন্তত ৩০০ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ পাওয়া গেছে বলে জানানো হয় সরকারি নোটিশে। আর সরকারি এমন ঘোষণার পরই দেশটিতে উদ্বেগজনক পর্যায়ে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর একটা অংশ এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে নানা মুসলিমবিদ্বেষী হ্যাশট্যাগ তৈরি হয়। পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয় নানা ভুয়া খবর। করোনাজিহাদ বা নিজামুদ্দিন ইডিয়টস নামে বিভিন্ন হ্যাশট্যাগও ব্যবহার করা হয়।
দিল্লির নিজামুদ্দিনে তাবলিগ জামাতের মারকাজে যোগ দিয়ে নিজের রাজ্যে ফিরে যাওয়া কয়েকজনের শরীরে করোনা সংক্রমণ প্রমাণিত হওয়ার পর ভারতের গণমাধ্যমে ওই ঘটনা অতি মাত্রায় গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ওই ঘটনা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সদস্য জাফরিয়াব জিলানি সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, 'ভুল দুই তরফেই হয়েছে। ওই সমাবেশে যারা গিয়েছিলেন, তাদের উচিত ছিল নিজের থেকেই পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া এবং চিকিৎসকদের আর সরকারের পরামর্শ নেয়া। কিন্তু উল্টো দিকে, সরকারই বা ব্যবস্থা নেয়নি কেন! সমাবেশটা তো হয়েছে যখন দেশে কোনো লকডাউন ছিল না, সেই সময়ে। তারপর যারা ফিরতে পারেনি, লকডাউনের ফলে তাদের জন্য তো সরকারের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল।' তিনি বলেন, 'এ রকম একটা কঠিন সময়ে বিষয়টাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটা একেবারেই কাম্য নয়। মুসলমানদের প্রায় সবাই কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কথা মেনে চলছে। আলেমরা নির্দেশ দিয়েছেন জমায়েত না করতে।'
এই ঘটনার পর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের বাংলা পত্রিকা স্বস্তিকার সম্পাদক রন্তিদেব সেনগুপ্ত বিবিসি-কে বলেন, 'এটা মুসলমান বিদ্বেষ কখনোই নয়। তবে যেটা হয়েছে, সেটা তো ভয়াবহ। তাবলিগ জামাত যে ঘটনা ঘটিয়েছে, এ রকম একটা পরিস্থিতিতে বড় সমাবেশ করলেন তারা, সেখান থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লেন। এরকম একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ কী করে করলেন তারা? ধর্মান্ধতা আর পশ্চাদপদতা যে মানুষকে কোথায় টেনে নিয়ে যায়, কীভাবে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনলেন তারা, সেটাই প্রমাণ করলো তাবলিগ জামাত।'
মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে কি-না, তা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ওই ঘটনার পর মুসলমানদের লক্ষ্য করে নানা ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে। ভুয়া খবর যাচাই করে দেখে, এমন একটি ওয়েবসাইট অল্টনিউজের সম্পাদক প্রতীক সিনহা বিবিসিকে বলেন, 'নিজামুদ্দিনের ঘটনার পর থেকে এ রকম অনেক ভিডিও আর পোস্ট ভাইরাল হয়েছে, যেগুলোর টার্গেট মুসলমানরা। আমরা একটা ভুয়া ভিডিও খুঁজে পেয়েছি, যেখানে একদল মুসলমানকে থালা-বাটি চাটতে দেখা যাচ্ছে। বলা হয়েছে, এভাবেই মুসলমানরা করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা যাচাই করে দেখি যে, ওটি আসলে মুসলমানদের একটি রীতি। খাওয়ার পরে যাতে থালায় একটিও খাদ্যকণা অবশিষ্ট না থাকে, সেজন্য তারা চেটে পরিষ্কার করে দেন।'
তিনি বলেন, 'দুই দিন আগে আরেকটি ভিডিও আসে আমাদের কাছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে একটি মসজিদের ভেতরে একদল মুসলমান কোনো একটা আওয়াজ করছেন। ভুয়া পোস্টটিতে বলা হয়, এভাবে হাঁচি দিয়ে মুসলমানরা নাকি করোনা ছড়াচ্ছে। অথচ এটি আসলে একটা সুফি আচার, যেখানে তারা শ্বাস-প্রশ্বাসের একটা অভ্যাস করেন, সেটাই তারা করছিলেন।' তার ভাষায়, 'এসব ভুয়া ভিডিওগুলো ছড়িয়ে দিয়ে ভারতে করোনা ছড়িয়ে পড়ার জন্য মুসলমানরাই দায়ী, এমন একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।'
একটু পেছনে ফিরে তাকালে আমরা দেখব, ভারতের ঐতিহাসিক বহু বিশ্বাসের চরিত্রটি (পুলারিজিম) ২০০২ সালের গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে এক আঘাতের শিকার হয়। যে আঘাতে শত শত মুসলমান মারা গিয়েছিল। হিন্দু জাতীয়তাবাদের মোদির ব্র্যান্ড ঐক্যের পরিবর্তে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। ফলে ক্রমবর্ধমান ঘটনা যেমন সম্প্রতি 'গরু সম্পৃক্ত সহিংসতা' ঘটেছে। প্রত্যহ মুসলিম যুবকদের ইসলামপ্রীতির কারণে জুলুম ও অত্যাচারের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে। তেমনিভাবে কেবল মুসলিম পরিচয়ের কারণেই মুসলমানদের বিপুল হেনস্তার মোকাবেলাও করতে হচ্ছে। এখানে ইসলামোফোবিয়ার ভিত্তির ওপরই গোধরা, মিরাঠ এবং মুজাফফরনগরের মতো ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে।
২০১৫ সালের ২৫ আগস্ট ব্যাঙ্গালুরুতে শাকের নামক এক ছেলেকে সংজ্ঞায়িত করতে বজরঙ্গ দলের কর্মীরা পিলারের সাথে বেঁধে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে প্রহার করে। তার কাপড় ছিঁড়ে ন্যাকড়া বানিয়ে ফেলে। তেমনিভাবে ২০১৫ সালের মে মাসেই মুম্বাইয়ে এমবিএ গ্র্যাজুয়েট জিসানকে এক কোম্পানি এটা বলে চাকরি প্রদানে অস্বীকৃতি জানায় যে, 'আমরা কেবল অমুসলিম প্রার্থীদেরই চাকরি দিয়ে থাকি!'৪২ (আরএসএস) বজরঙ্গ দল, বিজেপি, জাফরানি আন্দোলন ও অন্যান্য আন্দোলনের রূপকার এবং রাজনৈতিক অভিযোগসর্বস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাষণের কারণে ভারতের সমগ্র মুসলিম অস্থির। জাফরানি আন্দোলন সংখ্যাগুরু হিন্দুদের বারবার শুধু একথার দিকেই তাদের নজর ঘুরিয়ে দিচ্ছে যে, 'ভারতের মুসলিমরা তাদের বংশবৃদ্ধি করে ভারতকে মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ভারত একটি মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হবে।'
এর মাধ্যমে এটাই শুধু বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, ভারতের মাটিতে সংখ্যালঘুদের কোনোরূপ বৈধ বাসনা থাকতে নেই বা তারা কোনো নৈতিক আকাঙ্ক্ষার হকদার নয়! ২০১৫ সালের ২৯ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত আরএসএস-এর জাতীয় পর্যায়ের নয়াদিল্লীর বৈঠকে যে বিষয়কে কেন্দ্রীয় রূপদান করা হয়েছে; সেটা ছিল দেশটিতে মুসলিমদের সংখ্যাবৃদ্ধি। বৈঠকের শেষে করা এক শপথনামায় দুটি বিষয়কে প্রকাশ করা হয়। এরমধ্যে একটি এই- 'ভারতে হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম এবং জৈনধর্ম, (একটি ভারতীয় ধর্ম) অনুসারীদের বসতিতে চিন্তাধিক হ্রাস ঘটছে।' এবং সবশেষে এই সংবাদ দেয়া হয়েছে যে, 'ইসলাম, মুসলমান, খ্রিস্টবাদ এইসব বহিরাগত ধর্মাদর্শ। এরা ভারতকে মান্য করে না!'৪৩
আরএসএসের হরিয়ানা রাজ্যের প্রধান বিচারপতি ইন্ডিয়ান এক্সেপ্রেসের সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন- 'ভারতে মুসলমানরা থাকবে ঠিক; কিন্তু এখানে তাদের গরুর গোস্ত খাওয়া ছাড়তে হবে। কেননা গরু ভারতে গো-মাতা।'৪৪ এই ঘোষণার কিছুদিন পরই মুহাম্মাদ আখলাক নামের এক ছেলেকে হিন্দুরা কেবলই এই সংবাদের ভিত্তিতে মারতে মারতে একদম মেরেই ফেলে যে, সে গরুর গোস্ত খেয়েছিল!
টিকাঃ
[৪২] ইসলামোফোবিয়া : মুহাররিকাত, আছারাত আওর তাদারুক, ইরফান ওয়াহিদ, মাহনামা রফিক মানজিল, দিল্লী, অক্টোবর ২০১৫, পৃষ্ঠা- ২৩
[৪৩] নাজিমুদ্দীন ফারুকী, মুসলমানু কি আবাদী মে ইজোফে কি হাকিকত, ছেহ রোজাহ দাওয়াত, নয়াদিল্লী, ১০ অক্টোবর ২০১৫
[৪৪] আসরারুল হক কাসেমী, মুসলিম দুশমনী কি আঁগ মে বিজেপি, মাহনামা আবলাগ, মুম্বাই, নভেম্বর ২০১৫
📄 ইসলামোফোবিয়া ও আরব-বিদ্বেষ: চমস্কির বয়ানে
সন্দেহাতীতভাবেই ৯/১১-র ঘটনা বিশ্ব রাজনীতি, আদর্শ, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিষয়ের প্রশ্নে ধর্মকে নতুন করে অবতারণা করছে। ৯/১১-র বিপর্যয়ের পর বিশ্বজুড়ে ইসলামকে চরমপন্থা, সন্ত্রাসবাদের কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ইউরোপিয়ান মনিটরিং সেন্টার অন রেসিজম এন্ড জেনোফোবিয়া (EUMC) একটি প্রতিবেদনে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ১৫টি দেশের সম্ভাব্য ইসলামবিদ্বেষী প্রতিক্রিয়া ফুটিয়ে তুলেছে। প্রতিবেদনে চিত্রিত হয়েছে, ইসলাম ও মুসলিম সম্পদ্রায়ের সাথে সাথে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীগুলো দিন দিন চরম আকারের বৈরিতা, বৈষম্য, কুসংস্কার, সহিংসতা ও আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে। ইউএমসির রিপোর্টের মূল প্রতিপাদ্য হলো : জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি; বিশেষত মুসলমান ও ঝুকিপূর্ণ গোষ্ঠীর প্রতি সহিংস, আগ্রাসন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের জনগণের আচরণ পরিবর্তনমূলক কর্মকাণ্ড; ইসলাম-বিদ্বেষী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিরূপণ। ৪৫
আর অপরদিকে আমেরিকায় ২০০৬ সালে Today-Gallup Poll-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ইসলামী বিশ্বাস সম্পর্কে এত বেশি সন্ত্রাসবাদের কুসংস্কার ছড়ানো হয়েছে যে জরিপে দেখা গেছে, ২২ শতাংশ লোকই মুসলমানদের প্রতিবেশী হিসেবে পছন্দ করে না। এবং প্রতি ১০ জনের চারজনই আমেরিকান মুসলিম নাগরিকদের ওপর কঠোর নজরদারি কামনা করে।
২২ জুন, ২০১০। নিউইয়র্ক শহরে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা প্রদান করা হয়। সে মসজিদ নির্মাণ ভেস্তে দিতে নিউইয়র্ক টাইমস সম্পাদকীয়তে মুসলিম-বিদ্বেষী আক্রমণাত্মক কলাম ছাপে। “কারণ যেখানে মসজিদ সেখানেই মুসলমান আর যেখানেই মুসলমান, সেখানেই সমস্যা উৎপত্তির প্রবল সম্ভাবনা” এ বিবরণী সরাসরিভাবে মুসলিম-বিদ্বেষ, ইসলামোফোবিয়ার পালে হাওয়া দেয়। সম্পাদকীয়তে আরও দাবি তোলে- “নিউইয়র্কিস্তান হওয়ার পূর্বে এ মসজিদ নির্মাণ বন্ধ করার দাবি।
তারা আরও দাবি তোলে যে, লন্ডনে মুসলমান থাকতে থাকতে লন্ডনিস্তান হওয়ার উপক্রম তা লক্ষণীয়। ২০১৪ সাল, ব্রিটেনজুড়ে কাউন্টার টেরোরিজম হয়ে ওঠে এক মুখ্য আলোচিত বিষয়। তারই জেরে ২০১৫ সালে নতুন করে “কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড সিকিউরিটি অ্যাক্ট' নামে আইন করা হয়। টনি ব্লেয়ার মার্কিন মুলুকের এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী। সে তার বায়োগ্রাফিতে মুসলিম-বিরোধী অবস্থান জানান দিতে 'সন্ত্রাসী যুদ্ধ' বলে বিবরণ দেন। অপরদিকে ২০১৩ সালে Ta¼ Force on Tackling Radicalisation and Extremism-এর ভাষ্যমতে, চরমপন্থি মুসলমানদের বিবরণ এভাবে প্রদান করা হয়- 'তাদের আপসহীন বিশ্বাসের মধ্যে এটিও অন্তর্ভুক্ত যেকোনো ব্যক্তি ব্রিটিশ ও মুসলিম একই সাথে হতে পারে না। আরও জোর দিয়ে বলে যে, যারা তাদের মতের সাথে একমত নয় তারাও প্রকৃত মুসলমান নয়। অথচ যা ইসলামের রূপরেখার একেবারেই বহির্ভূত চিন্তাধারা, তার রেশ টেনে ইসলামকে ধরাশায়ী করার অপচেষ্টা।
সন্ত্রাস ও বিদ্রোহ দমনের বাহানায় ইসলামোফোবিয়ার বিস্তার
ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুসংস্কার, ভিত্তিহীন ভয়, বিদ্বেষ ও বৈরিতা আর বাস্তবিক বৈষম্যই ইসলামোফোবিয়ার মূলরূপ। এর মাধ্যমে মুসলমানদের মূলধারার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে বিদূরিত করার মাধ্যমে তাদের মনগড়া সব বিষয়াদি বাস্তবায়নের পথ খোলাসা করে নেয়। মুসলমানদের প্রতি ইসলামোফোবিয়ার এসব রূপ নানাভাবে জাহির হতে পারে, যেমন:
১. নেতিবাচক বা পৃষ্ঠপোষকতামূলক দৃশ্যায়নের মিডিয়া প্রচারণায় ও প্রাত্যহিক আলাপচারিতায়
২. রাস্তায় আক্রমণ, অপব্যবহার এবং সহিংসতা
৩. মসজিদ ও কবরস্থানগুলোতে আক্রমণ
৪. কর্মসংস্থান বৈষম্য
৫. অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে মুসলমানদের প্রতি স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদর্শনের কার্পণ্যতা (ATCSA 2001)
অস্ট্রেলিয়ান লেখক ডেভিড ক্যালকুলেন ২০০৪ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলেন, বর্তমানে চলমান সংঘাত মূলত বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিরুদ্ধে এক প্রচারণা। সে আরও বলে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মূলত সন্ত্রাসনিধনের কোনো প্রচেষ্টা নয় বরং তা বিশ্বব্যাপী ইসলামপন্থি বিদ্রোহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। তার মতে, একে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ না বলে বিদ্রোহী-বিরোধী যুদ্ধ বলা বেশি যুক্তিযুক্ত। এখন কারা বিদ্রোহী সে বর্ণনা দিতে গিয়ে রান্নিমেড ট্রাস্ট ইসলামকে দেখার কয়েকটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে যেমন-
১. ইসলামকে একরোখা ও অনাধুনিক হিসেবে দেখা হয় নাকি বিচিত্র ও গতিশীল হিসেবে দেখা হয়।
২. ইসলামকে পৃথক আর আলাদা হিসেবে দেখা হয় নাকি পরস্পর নির্ভরশীল হিসেবে দেখা হয়।
৩. ইসলামকে নিকৃষ্ট হিসেবে দেখা হয় নাকি আলাদা হলেও সমতার নজরে দেখা হয়।
৪. ইসলামকে আক্রমণাত্মক শত্রু হিসেবে দেখা হয় নাকি সহযোগী সংঙ্গী হিসেবে দেখা হয়।
৫. মুসলমানদের ধোঁকাবাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয় নাকি আন্তরিক হিসেবে।
৬. মুসলমানদের পশ্চিমা সমালোচনা গৃহীত হয় নাকি বিতর্কিত হয়।
৭. মুসলমাদের প্রতি বৈষম্যের আচরণ নিন্দিত হয় নাকি নন্দিত হয়।
৮. মুসলিম-বিরোধী আলোচনা-মনোভাব স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত হয় নাকি সমস্যাজনক।
দৃষ্টিভঙ্গির এই জটিলতার জন্য, বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটির ধর্ম-রাজনীতির অধ্যাপক 'জগতলিন সিজারি বলেন, ইসলামোফোবিয়া জেনোফোবিয়া, অভিবাসনবিরোধী মনোভাব এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্রায়ণ প্রত্যাখ্যানের মতো বৈষম্যগুলোর সাথে জড়িয়ে গেছে। আর এন্টি সেমেটিজম যা মূলত এন্টি জুইস থেকে উদ্ভূত, এটা থেকে নতুন বাস্তবতার ভীতিকর পরিস্থিতির জন্য এন্টি মুসলিম নামটি তৈরি করা হয়েছে।
ইসলামের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব উস্কে দেয়া হয় সময়ে সময়ে, ইসলামকে মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ ও মুসলমানদের আপদ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এ বিষয়ে সেন্টার অব ওয়ার্ল্ড পলিটিকসের পরিচালক হাংপিং বলেন, সহিংসতাকে শিল্পায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক আকার দেয়া হয়েছে। যা আধুনিকতার দুধারী তলোয়ার (উভয় সংকট) বোঝার একমাত্র চাবিকাঠি।
৯/১১-র ঘটনার পরই ইসলাম-বিদ্বেষ সজোরে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ঐ ঘটনার ব্যাখ্যায় চমস্কি বলেন, আক্রমণটি চারটি রাজনৈতিক স্বার্থ থেকে ইন্ধন লাভ করেছে। তা হলো-
১. সৌদি অঞ্চলে মার্কিন সেনাদের সরব উপস্থিতি
২. ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘর্ষের প্রতি আমেরিকার তিক্ত নীতি
৩. ইরাকের ওপর আরওপিত ধ্বংসাত্মক চলমান নিষেধাজ্ঞা
৪. মুসলিম ও অমুসলিম বিশ্বজুড়ে দমনমূলক স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থায় আমেরিকার সমর্থন
সন্ত্রাসের গীতিকা: সুরক্ষা ও বিপদাশঙ্কা
পরিচালনা ও বোধগম্যতার ধরন উল্লেখ যে, বিট্রিশ নীতিনির্ধারণী আলোচনায় "সন্ত্রাসবাদ” শব্দটি বৈষম্য ও সিলেকটিভ পন্থায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। জনসাধারণের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর্তৃক সহিংসতা ছড়ানো হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় 'আক্রমণ ও ভীতি প্রদর্শন' ইরাকে মার্কিনিদের বোমাবর্ষণকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয় না। একইভাবে সন্ত্রাসবাদ শব্দ ব্যবহার করা হয় না। ইংলিশ ডিফেন্স লিগের মতো কেউ যখন হয়রানি ও ভয় প্রদর্শনের কাজ করে। অপরদিকে দেখা যাক ইসরাইলি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিমন পেরেজ আমেরিকার ৪০তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড রিগ্যানের সহায়তায় তিউনেসিয়ায় হামলা চালিয়ে ৭৫ জনকে হত্যা করে অপরদিকে লেবাননের বৈরুতে হামলা করে ৮০ জনকে নিহত আর ২৫৬ জনকে আহত করে। চমস্কি বলেন, বোমাহামলায় “দগ্ধ শিশুরা তাদের বিছানায় কাতরে কাতরে মরেছে, মসজিদ থেকে বাড়ির দিকে আগত নামাজি শিশুগুলোকে হত্যা করেছে, পশ্চিম বৈরুতের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার প্রধান সড়ক বিধ্বস্ত করে ছেড়েছে। এ সন্ত্রাস আয়োজিত হয়েছে, ব্রিটিশ গোয়েন্দা, সিআইএ এবং সৌদি ক্লায়েন্টদের যোগসাজশে। অথচ এসবকে সন্ত্রাসবাদ বলে আখ্যা দেয়া হয় না। সন্ত্রাসবাদ তকমাজুড়ে দেয়ার হর্তাকর্তারাই যে এর দোষে দুষ্ট। নিজেদের দোষ ঢাকার তাদের সে কী যে কোশেশ! ৪৬
ড্যানিশ ম্যাককোয়েন, ব্রিটিশ থ্রিলার লেখক, ২০০৭-এর অক্টোবরে একটি বই প্রকাশ করে 'হাইজ্যাকিং অব ব্রিটিশ ইসলাম' নামে। সে ইসলামকে আখ্যা দেয় 'ইসলাম শুধু একটি নিরাপত্তা সমস্যার নামই নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক সমস্যারও নাম।' তারা ব্রিটেনের মুসলমানদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতালব্ধ ইসলামোফোবিয়া ও বৈষম্য শনাক্ত করার চেষ্টা করেছিল এবং পরবর্তীতে তা গুজব বা রূপকথা এবং প্রতিষ্ঠান, রাজনীতিবিদ এবং অন্যান্য সামাজিক দলগুলো প্রদত্ত মানসিক দায় বলে চালিয়ে দেয়ার পরম চেষ্টা করেছিল।
ভবিষ্যৎ ইসলামোফোবিয়া: নিরাময়ের নব প্রত্যাশা!
ডেভিড বারসামিয়ানকে দেয়া সাক্ষাতকারে চমস্কি বলেন, ভবিষ্যৎ আমেরিকা শক্তি বলে বিশ্ব শাসন করবে, তখন সে কোনো বিষয় হুমকি হয়ে ওঠার আগেই তা ধ্বংসের প্রয়াস চালাবে। তাই নতুন কোনো প্রতিকার আনতে কিছু তো করতেই হবে। নিশ্চিত করে নতুন প্রতিকার আনার সক্ষমতা তো আর সব দেশের থাকবে না... এটাই শক্তির তাৎপর্য। তারা প্রতিরোধমূলক বা আক্রমণাত্মক যুদ্ধে অবতরণ করবে। আর প্রতিরোধমূলক বা আক্রমণাত্মক যুদ্ধ মানে হলো সম্পূর্ণরূপে একটি অরক্ষিত লক্ষ্য বা টার্গেট ঠিক করা, যা অতি সহজেই বৃহদাকার সেনাবাহিনী দেখে ঘাবড়ে যাবে। যাইহোক এটা নিশ্চিতরূপে ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে করতে হলে, জনগণের মনে ভয়ের সঞ্চার করতে হবে। “ইসলামোফোবিয়াও এমন একটি প্রোপাগান্ডা যার টার্গেট একেবারে দুর্বল অসহায় ও বর্মশূন্য।”
এটি একটি দর্শনমূলক বা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রোপাগান্ডা যা বাস্তবায়নে কোনো প্রকার সন্দেহের উদ্রেকের অবকাশ দেয়া যাবে না। ওয়াশিংটন আমেরিকানদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তনে জোর প্রচেষ্টা চালালো যে, সাদ্দাম হোসেন শুধু খারাপই ছিল তা নয় বরং সে ছিল আমেরিকান নাগরিকদের অস্তিত্বের জন্যও হুমকিস্বরূপ। এ অবান্তর প্রোপাগান্ডা শেষে আলোর মুখ বেশ ভালোভাবে দেখেছে। আমেরিকার প্রায় অর্ধেক নাগরিক মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে ৯/১১-র ঘটনার সাথে সাদ্দাম হোসেন ব্যক্তিগতভাবে জড়িত ছিল। ⁸⁹
আরবে মুসলিমবিদ্বেষ: নোম চমস্কি
ইহুদিবাদের বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, অর্থাৎ যখন আমরা শিশু অবস্থায় বাড়ন্ত ছিলাম আমরা ছিলাম ইহুদি। সে সময়টাতে ইহুদি-বিরোধিতা ছিল খুবই স্বাভাবিক দৃশ্যমান বিষয়। আমার বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, শহরের আইরিশ ও জার্মান ক্যাথলিকদের মাঝে মধ্যবিত্ত এরিয়ার একমাত্র ইহুদি পরিবার হিসেবে আমরা বেড়ে উঠেছি যার সিংহভাগই খোলাখুলি ভাবে নাৎসিপন্থী ছিল। আমি বড় হয়েছি ক্যাথলিকদের ভয়ে ভিতরে ভিতরে আড়ষ্ট হয়ে। যুবক বয়স পর্যন্ত কোন প্রকারেই আমি ক্যাথলিকদের সাথে যে কোন বিষয়ে ভয়-ভীতি মুক্ত হয়ে করতে পারতাম না। যা ছিল নিতান্ত যন্ত্রনাদায়ক। যখন ক্যাথলিকরা জেস্যুট স্কুল ধারণা নিয়ে আসে (ক্যাথলিক পুরোহিতের আদেশ প্রাপ্ত সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত স্কুল)। তাদের আচরণ আরো নিষ্ঠুরতায় ভরে গেল। অধিকন্তু আমার পিতা যখন পুরোনো একটি গাড়ি ক্রয়ে সমর্থ হলো, যাতে আমরা কোন মতে দিন গুজরান করতে পারি (গাঁ বাঁচিয়ে)। যদি তা নিয়ে আমরা কোন পাহাড়ের পাদদেশেও পৌঁছতাম সেখানে গাড়ি পার্ক করতে গেলেও বেশ বেগ পেতে হতো কারণ অধিকাংশ মোটেলে ( আবাসিক হোটেল যা ব্যাক্তিগত যানবাহন নিয়ে ভ্রমণকারীদের পার্কিং সুবিধার জন্য বিশেষায়িত) ইহুদিদের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ছিল। ১৯৫০ এর দিকে যখন আমি হার্ভার্ডে ভর্তি হই, সেখানে ইহুদিবিদ্বেষ এতটা প্রকট ছিল যে পান থেকে চুন খসলেই ইহুদী কাউকে নিধন করা যেন নিমেষের ব্যাপার। প্রথম ধাপের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় নিয়েও সেখানে পল সামুয়েলসন ও রবার্ট উইনারের মতন বহু প্রথম গ্রেডের মানুষজন ইহুদি ধর্মালম্বী হওয়ার কারণে চাকরি জুটাতে পারেনি। হার্ভার্ডকে প্রথম ইহুদি গণিতবিদ নিয়োগ দিতে হয়েছিল তার পান্ডিত্যের প্রমাণ স্বরূপ। ১৯৫৩ সাল, তখন আমি সেখানে উপস্থিত; বিভাগটি ইহুদি বিদ্বেষে পূর্ণ ছিল। আমি বুঝাতে চাচ্ছি, পরিস্থিতির সার্বিক পরিবর্তন ৫০ এর দশকেই হয়েছে অথচ তখনো পর্যন্ত ইহুদি বিদ্বেষ ছিল দিনের আলোর মতন জাজ্বল্যমান আর বাস্তবমুখর। ইহুদি জাতি যদিও যথেষ্ট পদদলিত হয়েছিল, তারা তা লুকিয়েই রাখত দৃশ্যমান করত না কারণ তাদের মাথার উপর ঝুলত খড়ার ঘা/ বিপদ যেন লেগেই থাকত। এ কারণেই হলোকাস্ট (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সরকারের সহায়তায় নাৎসি বাহিনী কর্তৃক ৬০ লাখের বেশি ইহুদি নিধনকে হলোকাস্ট নামে আখ্যা দেয়া হয়।- ব্রিটানিকা সহ্য করলেও ইহুদি শরণার্থীরা কোথাও যেত না। (কারণ তাদের জানা ছিল নতুন জায়গা মানেই নতুন কোন বিপদ।)
ইউরোপের প্রায় সকলে, বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর 'ডিসপ্লেস পারসনস ক্যাম্প' বা ডিপি ক্যাম্পে আবদ্ধ মানুষগুলো যুক্তরাষ্ট্রে জায়গা করে নিয়ে স্বস্তির নিস্বাশ নিতে পারত কিন্তু তারা পারে নাই। ডিপি ক্যাম্পে মরনাপন্ন মানুষগুলো জার্মানরা পরাজিত হওয়ার পরও সেখানে আটকা পড়েছিল। এটা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যকর ছিল না, বরং পরিবর্তনের মধ্যে এটাই ছিল যে সেখানটা সাক্ষাত এক শ্মশানে পরিণত হয়েছিল (মানুষগুলো ক্ষয় হতে হতে)। তাদের হাতে গোনা অল্প কজনই প্রাণ নিয়ে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে পেরেছে। কিছুটা ইহুদি বিদ্বেষ ও কিছুটা ইহুদিরা তাদের তাদের ফিরিয়ে আনতে না চাওয়ায় তাদেরকে সেখান থেকে উত্তরণের কোন কোশেশ করা হয়নি, কারণ ইহুদিরা ইতিমধ্যেই সমস্যায় জর্জরিত, ডিপি ক্যাম্পের ইহুদি এনে সমস্যা তারা ফুসলিয়ে দেয়ার পক্ষে ছিল না।
ইহুদি বিদ্বেষ জাতিগত/বর্ণবৈষম্যের কোন আইনসম্মত ধরণ নয়, অথচ পক্ষপাতমূলক ভাবে আরব বিদ্বেষকে বর্ণবৈষম্যের বৈধ রূপ বা ধরণ বলে গণ্য করা হয়। অর্থায় বর্ণবাদের অধিকাংশ ধরণেই লুকোচুরির প্রয়োজন পড়ে না, তারা বর্ণবাদ না হওয়ার ভান করে থাকে শুধু (কাকের খাবার লুকানোর মত)। অন্যন্যা বর্ণবৈষম্যের ক্ষেত্রে হয়ত একজনকে ইহুদি বিরোধী বা কৃষ্ণাজ্ঞ বিরোধী না হওয়ার ছদ্মবেশে থাকে, প্রকৃত অবস্থার আত্মপ্রকাশ করে না। অথচ আরব বিদ্বেষের ক্ষেত্রে সে ভানটাও করার প্রয়োজন পড়ে না, বরং তারা তা কথায় কাজে বেশ প্রকট ভাবে ফুটিয়ে তোলে ও প্রকাশ করে। ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ এর আগেও এ আরব বিদ্বেষ মানুষেরা বিভিন্ন মুভি, বই-পত্রপত্রিকা এবং আচার-আচরণে প্রত্যক্ষ করেছে, এসব গোপনেও করা হয় নাই। অর্থাৎ কেউই তো এসে বলবে না যে আমি আমি বর্ণবাদী-আরব বিদ্বেষী; সর্বত্র মুসলিম ও আববের নিকটই এটা ওপেন সিক্রেট। আর এখন ১১ সেপ্টেম্বরের পর এমন আচরণ প্রদর্শণ তো তুঙ্গে উঠারই কথা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যাক বোস্টনের কথা। বোস্টনে বড় মাপের লেবানিজ সম্প্রদায় ছিল, তারা তেমন সম্পদশালী না হলেও ব্যাবসায়ী ও দোকানদারদের মাধ্যমে তারা বেশ স্বচ্ছল ছিল।
সাল ১৯৮২। ইসরায়েলিরা লেবানিজদের উপর ভয়াবহ নৃশংস আগ্রাসন চালায়। লেবাননের হতাহত মানুষগুলো জন্য আমাদের অল্প কিছু লোক দাতব্য ত্রাণ সংগ্রহের আয়োজনে লিপ্ত হয়। সেখানকার লেবানিজ সম্প্রদায় থেকে আমরা কোন প্রকার সাপোর্ট পাইনি। অবশ্য তার কারণও আমি বুঝতে পারি। সেই ছোট্ট কাল থেকে এসব দেখে দেখে আমি মানুষ হয়েছি। তারা বেশি একটা প্রকাশিত হতে চায় না, এবং এর কারণটাও বেশ স্পষ্ট। আমি এটা প্রমাণ করতে না পারলেও যে দৃশ্যটা আমার চেখে ভাসে তা শুধু ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকেই না। তবে ১১ সেপ্টেম্বরের পর তার উত্তাপ কিছুটা বেড়েছে তা ঠিক। শুধু আরবরাই না এর অন্ধকারাচ্ছন্নতা সকলেরই গোচরীভূত হওয়ার কথা।
ভাষান্তর: হাবিবুর রহমান রাকিব
টিকাঃ
[৪৫] Christopher Allen & Jorgen S. Nielsen, 2002: 6
[৪৬] Chom¼y, accessed on January 15, 2016
⁸⁹] Noam Chom¼y, 2005:3
📄 আরব মুসলিমবিদ্বেষ: নোম চমস্কি
ইহুদিবাদের বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, অর্থাৎ যখন আমরা শিশু অবস্থায় বাড়ন্ত ছিলাম আমরা ছিলাম ইহুদি। সে সময়টাতে ইহুদি-বিরোধিতা ছিল খুবই স্বাভাবিক দৃশ্যমান বিষয়। আমার বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, শহরের আইরিশ ও জার্মান ক্যাথলিকদের মাঝে মধ্যবিত্ত এরিয়ার একমাত্র ইহুদি পরিবার হিসেবে আমরা বেড়ে উঠেছি যার সিংহভাগই খোলাখুলি ভাবে নাৎসিপন্থী ছিল। আমি বড় হয়েছি ক্যাথলিকদের ভয়ে ভিতরে ভিতরে আড়ষ্ট হয়ে। যুবক বয়স পর্যন্ত কোন প্রকারেই আমি ক্যাথলিকদের সাথে যে কোন বিষয়ে ভয়-ভীতি মুক্ত হয়ে করতে পারতাম না। যা ছিল নিতান্ত যন্ত্রনাদায়ক। যখন ক্যাথলিকরা জেস্যুট স্কুল ধারণা নিয়ে আসে (ক্যাথলিক পুরোহিতের আদেশ প্রাপ্ত সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত স্কুল)। তাদের আচরণ আরো নিষ্ঠুরতায় ভরে গেল। অধিকন্তু আমার পিতা যখন পুরোনো একটি গাড়ি ক্রয়ে সমর্থ হলো, যাতে আমরা কোন মতে দিন গুজরান করতে পারি (গাঁ বাঁচিয়ে)। যদি তা নিয়ে আমরা কোন পাহাড়ের পাদদেশেও পৌঁছতাম সেখানে গাড়ি পার্ক করতে গেলেও বেশ বেগ পেতে হতো কারণ অধিকাংশ মোটেলে ( আবাসিক হোটেল যা ব্যাক্তিগত যানবাহন নিয়ে ভ্রমণকারীদের পার্কিং সুবিধার জন্য বিশেষায়িত) ইহুদিদের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ছিল। ১৯৫০ এর দিকে যখন আমি হার্ভার্ডে ভর্তি হই, সেখানে ইহুদিবিদ্বেষ এতটা প্রকট ছিল যে পান থেকে চুন খসলেই ইহুদী কাউকে নিধন করা যেন নিমেষের ব্যাপার। প্রথম ধাপের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় নিয়েও সেখানে পল সামুয়েলসন ও রবার্ট উইনারের মতন বহু প্রথম গ্রেডের মানুষজন ইহুদি ধর্মালম্বী হওয়ার কারণে চাকরি জুটাতে পারেনি। হার্ভার্ডকে প্রথম ইহুদি গণিতবিদ নিয়োগ দিতে হয়েছিল তার পান্ডিত্যের প্রমাণ স্বরূপ। ১৯৫৩ সাল, তখন আমি সেখানে উপস্থিত; বিভাগটি ইহুদি বিদ্বেষে পূর্ণ ছিল। আমি বুঝাতে চাচ্ছি, পরিস্থিতির সার্বিক পরিবর্তন ৫০ এর দশকেই হয়েছে অথচ তখনো পর্যন্ত ইহুদি বিদ্বেষ ছিল দিনের আলোর মতন জাজ্বল্যমান আর বাস্তবমুখর। ইহুদি জাতি যদিও যথেষ্ট পদদলিত হয়েছিল, তারা তা লুকিয়েই রাখত দৃশ্যমান করত না কারণ তাদের মাথার উপর ঝুলত খড়ার ঘা/ বিপদ যেন লেগেই থাকত। এ কারণেই হলোকাস্ট (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সরকারের সহায়তায় নাৎসি বাহিনী কর্তৃক ৬০ লাখের বেশি ইহুদি নিধনকে হলোকাস্ট নামে আখ্যা দেয়া হয়।- ব্রিটানিকা সহ্য করলেও ইহুদি শরণার্থীরা কোথাও যেত না। (কারণ তাদের জানা ছিল নতুন জায়গা মানেই নতুন কোন বিপদ।)
ইউরোপের প্রায় সকলে, বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর 'ডিসপ্লেস পারসনস ক্যাম্প' বা ডিপি ক্যাম্পে আবদ্ধ মানুষগুলো যুক্তরাষ্ট্রে জায়গা করে নিয়ে স্বস্তির নিস্বাশ নিতে পারত কিন্তু তারা পারে নাই। ডিপি ক্যাম্পে মরনাপন্ন মানুষগুলো জার্মানরা পরাজিত হওয়ার পরও সেখানে আটকা পড়েছিল। এটা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যকর ছিল না, বরং পরিবর্তনের মধ্যে এটাই ছিল যে সেখানটা সাক্ষাত এক শ্মশানে পরিণত হয়েছিল (মানুষগুলো ক্ষয় হতে হতে)। তাদের হাতে গোনা অল্প কজনই প্রাণ নিয়ে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে পেরেছে। কিছুটা ইহুদি বিদ্বেষ ও কিছুটা ইহুদিরা তাদের তাদের ফিরিয়ে আনতে না চাওয়ায় তাদেরকে সেখান থেকে উত্তরণের কোন কোশেশ করা হয়নি, কারণ ইহুদিরা ইতিমধ্যেই সমস্যায় জর্জরিত, ডিপি ক্যাম্পের ইহুদি এনে সমস্যা তারা ফুসলিয়ে দেয়ার পক্ষে ছিল না।
ইহুদি বিদ্বেষ জাতিগত/বর্ণবৈষম্যের কোন আইনসম্মত ধরণ নয়, অথচ পক্ষপাতমূলক ভাবে আরব বিদ্বেষকে বর্ণবৈষম্যের বৈধ রূপ বা ধরণ বলে গণ্য করা হয়। অর্থায় বর্ণবাদের অধিকাংশ ধরণেই লুকোচুরির প্রয়োজন পড়ে না, তারা বর্ণবাদ না হওয়ার ভান করে থাকে শুধু (কাকের খাবার লুকানোর মত)। অন্যন্যা বর্ণবৈষম্যের ক্ষেত্রে হয়ত একজনকে ইহুদি বিরোধী বা কৃষ্ণাজ্ঞ বিরোধী না হওয়ার ছদ্মবেশে থাকে, প্রকৃত অবস্থার আত্মপ্রকাশ করে না। অথচ আরব বিদ্বেষের ক্ষেত্রে সে ভানটাও করার প্রয়োজন পড়ে না, বরং তারা তা কথায় কাজে বেশ প্রকট ভাবে ফুটিয়ে তোলে ও প্রকাশ করে। ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ এর আগেও এ আরব বিদ্বেষ মানুষেরা বিভিন্ন মুভি, বই-পত্রপত্রিকা এবং আচার-আচরণে প্রত্যক্ষ করেছে, এসব গোপনেও করা হয় নাই। অর্থাৎ কেউই তো এসে বলবে না যে আমি আমি বর্ণবাদী-আরব বিদ্বেষী; সর্বত্র মুসলিম ও আববের নিকটই এটা ওপেন সিক্রেট। আর এখন ১১ সেপ্টেম্বরের পর এমন আচরণ প্রদর্শণ তো তুঙ্গে উঠারই কথা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যাক বোস্টনের কথা। বোস্টনে বড় মাপের লেবানিজ সম্প্রদায় ছিল, তারা তেমন সম্পদশালী না হলেও ব্যাবসায়ী ও দোকানদারদের মাধ্যমে তারা বেশ স্বচ্ছল ছিল।
সাল ১৯৮২। ইসরায়েলিরা লেবানিজদের উপর ভয়াবহ নৃশংস আগ্রাসন চালায়। লেবাননের হতাহত মানুষগুলো জন্য আমাদের অল্প কিছু লোক দাতব্য ত্রাণ সংগ্রহের আয়োজনে লিপ্ত হয়। সেখানকার লেবানিজ সম্প্রদায় থেকে আমরা কোন প্রকার সাপোর্ট পাইনি। অবশ্য তার কারণও আমি বুঝতে পারি। সেই ছোট্ট কাল থেকে এসব দেখে দেখে আমি মানুষ হয়েছি। তারা বেশি একটা প্রকাশিত হতে চায় না, এবং এর কারণটাও বেশ স্পষ্ট। আমি এটা প্রমাণ করতে না পারলেও যে দৃশ্যটা আমার চেখে ভাসে তা শুধু ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকেই না। তবে ১১ সেপ্টেম্বরের পর তার উত্তাপ কিছুটা বেড়েছে তা ঠিক। শুধু আরবরাই না এর অন্ধকারাচ্ছন্নতা সকলেরই গোচরীভূত হওয়ার কথা।
ভাষান্তর: হাবিবুর রহমান রাকিব
📄 ফেসবুকে ইসলামোফোবিয়া : বাড়ছে বিদ্বেষের সংস্কৃতি
বর্তমানে সবচে বেশি ব্যবহৃত সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম ফেসবুক। এপ্রিল, ২০২০-এর হিসাব অনুযায়ী মাসে ২.৬ বিলিয়ন মানুষ লগইন করছে এই প্লাটফর্মে। এভারেজ দৈনিক লগইন করছে ১.৭৩ বিলিয়ন মানুষ। ফেসবুক ব্যবহারকারী বিশাল এই জনগোষ্ঠীর সবাই কিন্তু কল্যাণ এবং ভালোবাসা ছড়াতে প্লাটফর্মটি ব্যবহার করছে না। বরং অনেকেই এটি ব্যবহার করছে বর্ণবাদ, ইসলামোফোবিয়া, ভায়োলেন্স এবং জাতিগত ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়াতে। পোস্টে, কমেন্টে, মেসেজে, ছবিতে, মিমসে, ভিডিওতে তারা জাতিগত ঘৃণা উসকে দিচ্ছে। ইসলামোফোবিয়ার বিস্তার ঘটাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে ইসলামোফোবিয়া ইন্ডাস্ট্রি। এখানে বিনিয়োগ হচ্ছে বিলিয়ন-মিলিয়ন ডলার। ফেসবুকে কীভাবে ইসলামোফোবিয়া ছড়াচ্ছে তার একটা চিত্র তুলে ধরা হবে এই লেখায়। পাশাপাশি এর কারণ, কার্যকরণ নিয়েও আলোচনা করা হবে।
ডা. ইমরান আওয়ানের রিসার্স
বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং ইসলামোফোবিয়া ও সাইবার বিদ্বেষ বিশেষজ্ঞ ডা. ইমরান আওয়ান ফেসবুকে ইসলামোফোবিয়া বিষয়ে একটি রিসার্স করেছিলেন। তিনি ১০০টি ফেসবুক পেজের পোস্ট, কমেন্ট পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। এই ১০০টি পেইজে তিনি অন্তত ৪৯৪টি পোস্ট পেয়েছিলেন, যে পোস্টগুলো সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। ইসলামোফোবিয়া ছড়ানো হয়েছে। শুধু বিরুদ্ধ মতামত নয়, বরং অনেক পোস্টে মুসলিমদের শারীরিক আঘাতের হুমকিও দেয়া হয়েছে। এ সমস্ত পোস্টে মোট পাঁচটি বিষয়কে হাইলাইট করা হয়েছে।
১. মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখানে ভায়োলেন্ট এবং নন-ভায়োলেন্ট মুসলিমের কোনো পার্থক্য করা হয়নি। বরং ঢালাওভাবে তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
২. মুসলিমদের ধর্ষক এবং সিরিয়াল রেপিস্ট হিসেবে দেখানো হয়েছে।
৩. মুসলিম মহিলাদেরকে সুরক্ষার হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, বোরকা, হিজাব এবং পর্দা সুরক্ষার জন্য হুমকি।
৪. বুঝানো হয়েছে মুসলিম এবং আমাদের মাঝে যুদ্ধ চলে আসছে। তারা আমাদের শত্রু। আমাদের ভূমি দখলকারী।
৫. এখানে মুসলিমদের নির্বাসিত করার প্রতি জোর দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি হালাল ফুড নিষিদ্ধকরণ, বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ নির্বিশেষে মুসলিমদের ওপর বাজে মন্তব্য করা হয়েছে।
ডা. ইমরান আওয়ান তার রিসার্চে মোট পাঁচটি টেবিল তৈরি করেছিলেন। ৩ নং টেবিলে দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ইসলামোফোবিয়া ছড়ানোর ক্ষেত্রে নারীদের তুলনায় এগিয়ে পুরুষরা। পুরুষ ৮০ শতাংশ এবং নারী ২০ শতাংশ। ৪ নং টেবিলে দেখা যায়, ফেসবুকে ইসলামোফোবিয়া ছড়ানোয় প্রথমে রয়েছে যুক্তরাজ্য (৪৩ শতাংশ)। তারপর আমেরিকা (৩৭ শতাংশ)। তারপর অস্ট্রেলিয়া (২০ শতাংশ)।
১ নং টেবিলে ডা. আওয়ান ২০টি শব্দ উল্লেখ করেছেন। এই শব্দগুলো মুসলিমদের চিত্রিত করতে ইসলামোফোবিক গোষ্ঠী ব্যবহার করে। তারমধ্যে অন্যতম হলো- মুসলিম, ইসলামিক, পাকি, গ্যাং, রেপিস্ট, এশিয়ান, ডার্টি, মসজিদ, বোমা, চরমপন্থি, হালাল, সন্ত্রাসী, কিলিং ইত্যাদি।
ডা. ইমরান আওয়ান বিভিন্ন পেজের ইসলামোফোবিক মিমস দিয়েও উদাহরণ দিয়েছেন। একটি মিমসের টেক্সট ছিল 'বয়কট হালাল ফুড; যদি আপনি হালাল ফুড ক্রয় করেন, ধরা হবে আপনি ইসলামিক জিহাদকে সমর্থন করছেন।' একটা মসলার প্যাকেটে পাগড়ি পরা একজনের ছবি দিয়ে তৈরী করা হয়েছে আরেকটি মিমস। তার টেক্সট 'মিস্টার পাকি।' 'ব্যান ইসলাম ইন অস্ট্রেলিয়া' ফেসবুক পেইজের একটি মিমসের নিচে কমেন্ট ছিল 'ইসলাম ইবোলা ভাইরাসের মতো।' 'ইসলাম ক্যান্সারের মতো।' 'ইংলিশ ব্রাদারহুড' ফেসবুক পেইজে একটি মিমস শেয়ার করা হয়েছে। ছবিতে দুটি কুরআন। একটির নিচে লেখা ইসলামিক কুরআন। আরেকটির নিচে লেখা আইএসআইএস কুরআন।
ফ্যাক্ট চেকিং সার্ভিস স্লোপেস ফেসবুকে ইসলামোফোবিয়া নিয়ে একটি তদন্ত করেছিল। তদন্তে আমেরিকার ২৪টি ফেসবুক পেজের সন্ধান পেয়েছে তারা। খ্রিস্টানদের ছোট একটি দল এই পেইজগুলোর মাধ্যমে মুসলিমবিরোধী ঘৃণা এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারক কেলি মনরো কুলবার্গ। এই ছড়ায়। এই পেইজগুলোর পেছনে অর্থায়ন করে 'দ্য আমেরিকা কনজার্ভেন্সি' পেইজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো Women for trump, Christians for trump, Evangelical for trump ।
ফেসবুক ইন্ডিয়া : ইসলামোফোবিয়া
একটি মানবাধিকার ও প্রযুক্তি গবেষণা সংস্থা ইন্ডিয়ান ইউজারদের বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বিশ্লেষণ করেছিল। তাতে দেখা গেছে ভারতের ফেসবুকে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ৩৭ শতাংশই ইসলামোফোবিয়ার সঙ্গে যুক্ত। এরমধ্যে ১৬ শতাংশ ভুয়া খবর, ১৩ শতাংশ হিংসাত্মক বক্তব্য। দীর্ঘ চারমাস ভারতের ছয়টি ভাষার হাজারের অধিক পোস্ট বিশ্লেষণ করে তারা এই তথ্য প্রদান করে।
'ফেসবুক ইন্ডিয়া: টুওয়ার্ডস দ্য টিপিং পয়েন্ট অফ ভায়োলেন্স ক্যাস্ট অ্যান্ড রিলিজিয়াল হেট স্পিচ' শীর্ষক মার্কিন-ভিত্তিক ইক্যুয়ালিটি ল্যাবসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামোফোবিয়ার বাইরে অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর হার মাত্র ৯ শতাংশ। যেখানে ইসলামোফোবিয়ার হার ৩৭ শতাংশ।
২০২০ সালে দিল্লিতে তাবলিগ জামাতের নিজামুদ্দিন মারাজে তাবলিগের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলামফোবিক পোস্ট এবং কমেন্টের হার বেড়ে গিয়েছিল। করোনার শুরুতে সমাবেশ আয়োজন করেছিল নিজামুদ্দিন মারকাজ। সমাবেশে অংশ নেয়া অনেকের পরবর্তীতে করোনা পজেটিভ আসে। এরপর থেকেই শুরু হয় মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণা। তৈরি হয় #করোনাজিহাদ এবং #নিজামুদ্দিনইডিয়টস। বিদ্বেষী প্রচারণার স্রোতে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ভুয়া খবর।
ভুয়া খবর যাচাই করে দেখে এমন একটি ওয়েবসাইট 'অল্ট নিউজ'। অল্ট নিউজের সম্পাদক প্রতীক সিনহা বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, 'তারা দুটি ভুয়া খবর যাচাই করে দেখেছে। ১. একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মুসলিমরা প্লেট চেটে খাচ্ছে। ভিডিওটি শেয়ার করে কেউ কেউ লিখেছেন এভাবেই মুসলিমরা করোনা ছড়াচ্ছে। অথচ এটি বোহরা মুসলিমদের একটি খাবার রীতি। খাবার পর প্লেটে যেন অবশিষ্ট কিছু না থাকে, তাই তারা চেটে খায়। ২. একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মুসলিমরা মুখ দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ করছে। ভিডিও শেয়ার করে লেখা হয়, 'হাঁচি দিয়ে মুসলিমরা করোনা ছড়াচ্ছে।' অথচ তারা হাঁচি নয়, বরং জিকির করছিল। নিজামুদ্দিনে তাবলিগের সমাবেশের পরই মূলত এসব ভুয়া খবর ছড়াতে থাকে।'
ফেসবুক বাংলাদেশ : ইসলামফোবিয়ার চিত্র
বাংলাদেশে ইসলামোফোবিয়া ছড়ানোর সবচে সুলভ মাধ্যম এখন ফেসবুক। পোস্ট, কমেন্ট, মেসেজ, মিমস, ভিডিওর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ছড়ানো হচ্ছে জাতিগত ঘৃণা, বিদ্বেষ, ইসলামোফোবিয়া। প্রযুক্তির কল্যাণে এই ঘৃণা- সংস্কৃতি ছড়ানোর পেছনে অমুসলিমরা যেমন কাজ করছে, তেমনি দুঃখজনক হলেও সত্যি, নামধারী কিছু মুসলমানও শামিল হয়েছে এই মিছিলে। বাংলাদোশের ইসলামোফোবিকরা কমন কিছু বিষয় নিয়ে সবসময় হৈচৈ করে। নিম্নে কিছু চিত্র তুলে ধরা হলো।
এক. হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
ফেসবুকে প্রায়শই আমাদের প্রিয়নবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করা হয়। অনেকক্ষেত্রে পাড়ার ছেলেটাও কটূক্তি করতে কসুর করে না। ২০১৯ সালের অক্টোবরে ভোলায় বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য নামে এক হিন্দু ছেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে লেখা মেসেজ মেসেঞ্জারে ছড়িয়ে দেয়। প্রতিবাদে জেগে ওঠে তৌহিদি জনতা। ভোলার বুরহানুদ্দিনে প্রতিবাদ সমাবেশে পুলিশ গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হয় ৪ মুসলিম।
প্রথমে একে ফেইক বলা হলেও এখনো পর্যন্ত এটি প্রমাণ করা যায়নি। ধর্ম অবমাননার দায়ে অনেকে গ্রেফতার হয়, অনেকে হয় না। তবে এই গ্রেফতার করা নিয়েও সুশীলদের চুলকানি হয়। একজন তো বলেই ফেলেছে, 'পশ্চিম পাকিস্তানে এমন হতো। এখন পূর্বপাকিস্তানেও ঘন ঘন হচ্ছে।' বাংলাদেশে ফেসবুকে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করার ঘটনা ভুরি ভুরি। অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে।
দুই. ইসলামি ব্যক্তিত্বদের আক্রমণ
বিভিন্ন মিমসে ইসলামি ব্যক্তিত্বদের নিয়ে মিথ্যাচার করা হয়। কটূক্তি করা হয়। হেয় করা হয়। ২০১৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর 'থাবা বাবা রিলোডেড' পেইজে আল্লামা আহমদ শফিকে রাজাকার বলে ট্যাগ দেয়া হয়।
'চক্রধার চৌধুরী' নামের আইডি থেকে হজরত মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারীর মাহফিলের পোস্টার শেয়ার করে হুরদের নিয়ে টিপ্পনি কাটা হয়।
'প্রান্ত দে' আইডি থেকে শেয়ার করা একটি মিমসে হুজুর এবং কুরআন নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়।
'ডাকসু মিমস' পেইজে মুফতি কাজি ইবরাহিমকে উগ্রবাদী ট্যাগ দিয়ে এবং কোটা আন্দোলনের রাশেদ খানকে সীমিত পরিসরে উগ্রবাদী মুফতি ইবরাহীম ট্যাগ দিয়ে একটি মিমস শেয়ার করে।
'ক্বারী সাহেব ৪.০' পেইজে সদ্যপ্রয়াত মাওলানা যুবায়ের আহমাদ আনসারীকে নিয়েও মিমস শেয়ার করা হয়। অপারেশনের কারণে তার মুখে তৈরী বক্রতাকে তুলনা করা হয় মালালা ইউসুফ জাইয়ের মুখ ভেঙচির সাথে। পাশাপাশি এখানেও অশ্লীল ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
'বাংলা মিমস' পেইজে ব্যঙ্গ করা হয় মাওলানা যুবায়ের আহমাদ আনসারীর জানাযায় অংশ নেয়া মুসল্লিদেরও। মিমসের টেক্সটে বলা হয়, 'লকডাউনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জানাযায় অংশ নিয়ে মানুষ এগুলো পেতে পারে?'
তিন. মুসলিমদের সন্ত্রাসী ট্যাগ
'ক্বারী সাহেব ৪.০' পেইজে একটি মিমস শেয়ার করা হয়েছে। তাতে প্রবলেম হিসেবে দেখানো হয়েছে পাঁচটি জিনিস। নাস্তিক, মুক্তমানা, বিজ্ঞান, সমকামী, লিঙ্গসমতায় বিশ্বাসী। সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখানো হয়েছে একটি ছবি। মেয়েটির মাথায় টুপি, হাতে দেশীয় অস্ত্র, মুখে রক্ত।
'বাংলা মিমস' পেইজে ইদুল ফিতরের দিন (২৫ মে ২০২০) একটি মিমস শেয়ার করা হয়েছে। সেখানেও কৌশলে মুসলিমদের সন্ত্রাসী বলা হয়েছে।
'কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বাংলাদেশ' পেইজে ভারতভাগের জন্য মুসলিমদের দায়ী করেছে। বলেছে, মুসলিমরা দেশভক্ত হলে পাকিস্তান হতো না, বাংলাদেশ হতো না। শুধু মুসলিম নয়, প্রাকারান্তরে এখানে বাংলাদেশের জন্মকেই অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে।
চার. ইসলামের বিভিন্ন বিধান, জায়গা নিয়ে ঠাট্টা
'ডাকসু মিমস' পেইজ থেকে 'ক্যাম্পাসে মেট্রোর স্টেশন চাই না' আন্দোলন নিয়ে একটা মিম শেয়ার করা হয়েছিল। সেখানে ইসলামের বিখ্যাত 'মুতার 'যুদ্ধ' নিয়া ফান করা হয়েছে। মূলত মুতার যুদ্ধের সাথে টিএসসিতে স্টেশনের কোন সম্পর্ক নেই। 'মুতা' নামটাকে ফানি সেন্সে ব্যবহার করতে, সাথে মুসলিমদের চটাতে এই কনটেক্সটা ব্যবহার করা হয়েছে। আরেক কারণ হলো টিএসসিতে মেট্রোর স্টেশন হলে বাইরে থেকে লোকজন এসে পেশাব করে বা মুতে পুরা টিএসসি ভাসিয়ে ফেলবে। তাই এটাকে 'মুতার যুদ্ধ' ট্যাগ দিয়ে ইসলামের যুদ্ধের জায়গার সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এটা ইসলামের প্রতি বিরুপ একটা মিম।
'সুষুপ্ত পাঠক' আইডি থেকে একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, রমজানে উন্মুক্তভাবে খাবার বিক্রি করায় খাবার ভ্যানওয়ালাকে পুলিশ শাসাচ্ছেন। সুসপ্ত পাঠক তাকে 'শরিয়াহ পুলিশ' বলে ঠাট্টা করেছেন।
'ক্বারী সাহেব ৪.০' পেইজে হজ এবং ইজতেমা নিয়েও বিদ্রূপ করা হয়েছে। দুটোকেই দেখা হয়েছে বিজনেস পলিসি হিসেবে।
করোনাকে মুসলমানরা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দার পাপের শাস্তি হিসেবেই দেখছেন। কারোনাকে কেন আল্লাহ তায়ালার শাস্তি হিসেবে দেখা হবে এটা নিয়ে রীতিমতো গালি গালাজ করেছেন নির্বাসিত লেখিকা তাসলিমা নাসরীন।
২০২০ এর বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী প্রাঙ্গনে বিশাল জামাত নিয়ে নামাজ আদায় করেছিল মাদরাসা ছাত্র এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। এই নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন।
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতায় মুসলিম বিদ্বেষ
ফেসবুকে বিভিন্ন উপলক্ষে শর্ট ফিল্ম প্রতিযোগিতা ঘোষণা করা হয়।। ২০২০ সালেও 'সবাই ভিন্ন একসাথে অনন্য' শিরোনামে এই প্রতিযোগিতার আহ্বান করা হয়েছিল। প্রতিযোগিতায় মূলত গল্প আহ্বান করা হয়। বাছাইকৃত গল্প দিয়ে তৈরী হয় শর্ট ফিল্ম। সম্প্রীতির নামে এসব প্রতিযেগিতায় ছড়ানো হয় জাতিগত বিদ্বেষ। ইসলামোফোবিয়া।
২০২০ সালের একটি শর্টফিল্ম 'নিঃশব্দ'। এতে দেখানো হয় হিন্দু ছেলের ফেসবুক আইডি থেকে মুসলিম বিদ্বেষী পোস্ট দেয়ার কারণে তাকে মারধর করা হয়। ছেলেটা মারাও যায়। কিন্তু গল্পে এটাও দেখানো হয়, মূলত হিন্দু ছেলের আইডি হ্যাক করেছে মুসলিম ছেলে। মুসলিম ছেলেই মূলত মুসলিম বিদ্বেষী পোস্ট দিয়েছে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেবার জন্য। গল্পে ক্রিমিনাল বানানো হয় মুসলিমদেরকেই। হিন্দুদেরকে বানানো হয় নিষ্পাপ। যেন সবকিছুর জন্য দায়ী মুসলিমরা।
প্রতিযোগিতার আরেকটি শর্টফিল্ম 'পর্দা'। এতে দেখানো হয় মুসলিম ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসে ঢাকায়। ঢাকায় তার পরিচিত কেউ নেই। গ্রামের ইমামের সূত্র ধরে এক মাদরাসায় রাত কাটাতে চেয়েছিল। কিন্তু মাদরাসা কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার অজুহাতে ছেলেটিকে রাতা কাটানোর জায়গা দেয়নি। গেট থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। পরে হিন্দু ছেলে তাকে জায়গা দেয়। নিরাপত্তার ধার ধারে না সে। গল্পে মূলত মাদরাসার সংকীর্ণ, অসামাজিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আর মুসলিমরা কেবল সম্প্রীতির পথে বাধাই সৃষ্টি করে।
২০১৮ সালে আরেকটি ভিডিও ক্যাম্পেইন করা হয়েছিল। ওখানেও মূলত গল্প আহ্বান করা হয়েছিল। গল্পে নির্মিত হয়েছিল শর্টফিল্ম। এরমধ্যে একটি শর্টফিল্মের নাম 'আব্দুল্লাহ'। এখানে মূলত সরাসরি মাদরাসা শিক্ষার প্রতিই অনাস্থা প্রকাশ করা হয়েছে। মাদরাসায় ছাত্রদের ছোট ছোট বিষয়ে বেত্রাঘাত করা হয়। মাদরাসা শিক্ষিতরা মাদরাসার বাইরে কেনো কাজ করতে পারে না, বাইরে কাজ করতে গেলেও তাদের কনফিডেন্স থাকে না, মাথা নুইয়ে মিনমিন করে চলতে হয় এইসব।
আব্দুল্লাহ ছিল মূল চরিত্র। এই চরিত্রে যে অভিনয় করেছে, তাকে ইনবক্সে জিজ্ঞেস করেছিলাম কওমির ছাত্ররা আসলেই তো এত কনফিডেন্সহীন না যে, অফিসের সামান্য কেরানির দায়িত্বও পালন করতে পারবে না। সবজায়গায় উপেক্ষিত। আসলে এই চিত্রায়নটা কেন? অভিনেতার সরল উত্তর ছিল স্ক্রিপ্টের বাইরে কিছু করার সাধ্য আমার ছিল না!
উধোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে
আসলে পুরো ফেসবুক জুড়েই এখন মুসলিমবিরোধী সর্বগ্রাসী প্রচারণা চলছে। আরব নিউজ একবার তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছিল ফেসবুকের এলগরিদম এন্টি মুসলিম এলগরিদম। মুসলিমদের বিরুদ্ধে যতই ঘৃণা ছড়ানো হোক, ফেসবুক পোস্টগুলো রিমুভ করে না। দক্ষিণ এশিয়ার আমেরিকান মানবাধিকার এবং প্রযুক্তি গবেষণা সংস্থা তাদের তদন্তে বলেছিল ভারতের ফেসবুকে যেসব মুসলিম বিদ্বেষমূলক পোস্টে রিপোর্ট করা হয়েছে, তার ৯৩ শতাংশই ফেসবুক কর্তৃপক্ষ রিমুভ করেনি। জাতিসংঘের তদন্তকারী ইয়াঙ্গি লি বলেছেন, 'ফেসবুক এখন সংঘাতকে উদ্বুদ্ধ করার বাহন হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার পেছনের চালিকাশক্তি ছিল ফেসবুক এবং এর বিদ্বেষমূলক প্রচারণা।'
বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকগণ বলছেন, ফেসবুকের শক্ত নীতি এবং নৈতিকতা দরকার। নয়ত আগামী পৃথিবী আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে ফেসবুক। প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ যুক্ত হচ্ছে। প্লাটফর্ম বড় এবং বিস্তৃত হচ্ছে। সবার ক্ষেত্রে সমান দৃষ্টি বজায় না রাখলে, ফেসবুকের পোস্ট এবং মন্তব্য ঘিরেই তৈরী হবে সংঘাত, সংঘর্ষ। এভাবেই বাড়বে বিদ্বেষের সংস্কৃতি। ৪৮
টিকাঃ
[৪৮] সূত্র: মিডলইস্ট আই, ২৯ জুলাই, ২০১৬, আরব নিউজ, ২১ জুন, ২০১৯, ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস, ১১ জুন, ২০১৯, দ্য গার্ডিয়ান, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯, Islamphobia on Social Media: A Qualitative Analysis of the Facebook