📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ইসলামোফোবিয়ার কবলে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়

📄 ইসলামোফোবিয়ার কবলে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়


সভ্যতার শুরু থেকেই প্রতিটি ক্ষেত্রে সমাজের উচ্চ শ্রেণির মানুষের স্বার্থে নির্ধারণ করা কিছু তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে আসছে। যত সভ্য, উদার কিংবা আধুনিক হোক না কেন, মানুষের মধ্যে সমাজের এই শ্রেণি বিদ্বেষ যে পরম সত্য ও বাস্তব তা আমরা ইতিহাস থেকে বরাবরই শিক্ষা নিয়ে থাকি। শিক্ষার কোনো শেষ নেই, এমনটা এজন্যেই বলা হয়ে থাকে হয়তো। স্বল্প কিছু মানুষের আরওপ করা বিশ্বাসগুলো একেকটা শিল্পের মতো, যার থেকে তারা কেবল মুনাফাই শোষণ করে না, কেড়ে নিতে থাকে মানবজীবন এবং মানবতা। এরই বাস্তব উদাহারণ রোহিঙ্গা গণহত্যা।
ঘটনাপ্রবাহ হলো- একবার মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কাউন্সিলর ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চি হাঙ্গেরি যান এবং সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর হাঙ্গেরির সরকারের প্রকাশ করা এক বিবৃতিতে বলা হয়, 'দুই নেতা বর্তমানে তাঁদের উভয়ের দেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অভিবাসনের ওপর আলোকপাত করেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন, মুসলমান অভিবাসন বৃদ্ধির কারণে তারা এই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।'
এটা আসলেই বিস্ময়কর যে অং সান সু চি ও অরবান উভয়েই তাদের দেশে 'মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির' বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যে সমস্যাটি তাদের দেশে আদৌ নেই। হাঙ্গেরিতে মাত্র পাঁচ হাজার মুসলমান রয়েছে, যদিও গত কয়েক বছরে যে কয়েক লাখ শরণার্থী সে দেশ অতিক্রম করে পশ্চিমে গিয়েছে, তাদের বেশির ভাগই মুসলমান। তাদের মাত্র কয়েকজন হাঙ্গেরিতে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে এবং দেশটির সরকার তাদের গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মিয়ানমারেও 'মুসলিম অভিবাসন বৃদ্ধির' সমস্যা নেই। প্রকৃতপক্ষে, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে হাজার হাজার মুসলমানকে বহিষ্কার করা হয়েছে, যে রাজ্যটি কিনা কয়েক শতাব্দী ধরে মুসলমান সম্প্রদায়ের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। তবে বার্মিজ ও বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের দাবি হচ্ছে, মুসলমানরা সাম্প্রতিক 'অভিবাসী'। তাদের এই দাবি একেবারেই ভিত্তিহীন। বাস্তব কোনো ভিত্তি না থাকলেও অং সান সু চি ও ভিক্টর অরবান উভয়েই এই বলে জোর দিয়েছেন যে দেশটিতে 'মুসলিম অভিবাসনের' হুমকির সম্মুখীন।
মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের সমর্থক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রশংসিত অং সান সু চি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সমর্থনে দাঁড়িয়েছেন, যারা কিনা মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন নির্যাতন চালিয়েছে। তারা হাজার হাজার মুসলমান নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করেছে। তাদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ও প্রাণ বাঁচাতে ২০১৬ সালে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এদিকে মিয়ানমারে এখনো যেসব মুসলমান রয়ে গেছে, তারা সহিংসতার হুমকিতে রয়েছে এবং নানাভাবে তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। ১০ হাজারের বেশি নাগরিককে ক্যাম্পে থাকতে বাধ্য করা হয়, যেখানে আন্তর্জাতিক পরিদর্শক এবং গণমাধ্যমের প্রবেশের অনুমোদন নেই।
অং সান সু চি অবশ্য সামরিক বাহিনীর পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের খুব সামান্যই সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। ২০১৭ সালে যখন রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমারের নৃশংস নীতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তখন বৌদ্ধদের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা বলেছেন, 'মনে রাখতে হবে যে এ পরিস্থিতিতেই বুদ্ধ নিশ্চয়ই সেই দরিদ্র মুসলমানদের সাহায্য করেছেন। তারপরও আমি তাদের জন্য খুব বেদনা অনুভব করছি।' এরপর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা অব্যাহত থাকলেও দালাই লামা এই বিষয়ে আর কোনো কথা বলেননি।
মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের নির্যাতন বন্ধে কারও তেমন কোনো উদ্যেগ নেই। এদিকে সিরিয়ার সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করার ব্যাপারেও কোনো উদ্যেগ নেই। আট বছর ধরে সেখানে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ চলছে। ২০১৫ সালে ইউরোপে অভিবাসী এবং শরণার্থীদের স্রোত ঠেকানোর জন্য ইউরোপীয় নেতারা তুরস্কের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। ইইউর সদস্যপদ পাওয়ার লোভ দেখিয়ে তারা তুরস্কের ঘাড়ে ৩৫ লাখ সিরীয় শরণার্থীর বোঝা চাপিয়ে দেয়। বাইরের বিশ্ব থেকে এই শরণার্থীরা খুব কম সাহায্যই পেয়ে থাকে।
সিরিয়ার যুদ্ধে এ পর্যন্ত লাখ লাখ মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেকে এখনো একটু নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছে। তাদের অনেকে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই মারা যাচ্ছে। তবু ইউরোপীয়রা সিরিয়ার যুদ্ধ অবসানে খুব সামান্যই আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের উদ্বেগ কেবল মুসলিম অভিবাসন নিয়ে।
অবশ্যই মুসলমান অভিবাসন মিয়ানমার ও হাঙ্গেরির সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়। আসল সমস্যা থেকে বিশ্বের দৃষ্টি অন্যদিকে ধাবিত করার জন্য মুসলমান অভিবাসনকে তাদের হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করছে দুটি দেশ। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, লোকরঞ্জনবাদের উত্থান ও ডানপন্থীদের আন্দোলন, ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের ক্ষয়, মূলধারার রাজনীতির ব্যর্থতা ইত্যাদি তাদের দেশের আসল সমস্যা, মুসলমান বা অন্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যার কার্যত কোনো সম্পর্ক নেই।
একটা কথা মনে রাখতে হবে, মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব পোষণ করলেই ইউরোপ বা এশিয়ার সমস্যার সমাধান হবে না। প্রায় ১৫০ বছর আগে কার্ল মার্ক্স একেবারে ঠিক বলেছিলেন যে ইউরোপের স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয়টি ইহুদিদের অন্তর্ভুক্তির ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে আজ ইউরোপ, এশিয়া বা অন্য কোথাও, এটা মুসলমানদের সমান মানুষ এবং সহ-নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করার ওপর নির্ভর করছে।
একটু পেছনে ফিরে গেলে আমরা দেখতে পাব, এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে ইসলামোফোবিয়ার ভাষা। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিকৃত তাফসির মোতাবেক, শতাধিক রোহিঙ্গা লাঠিসোটা, হাতবোমা ও আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বেশ কয়েকটি পুলিশ চৌকি আক্রমণ করে। এই সংঘাতে বারোজন বর্মি নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও ডজনখানেক রোহিঙ্গা নিহত হয়। রোহিঙ্গা সরকার এই ঘটনাকে অজুহাত করে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আরেক দফা রাষ্ট্র-পরিচালিত রোহিঙ্গা গণহত্যা শুরু করে। কোনো সংবাদ বা বিশ্লেষণী মতামতে রোহিঙ্গা প্রতিরোধ সংগ্রাম ও বর্মি সরকারের জুলুমের মাঝে কোনো প্রকার কার্যকারণ সম্পর্ক দেখালে, তা প্রকারান্তরে বর্মি কর্তৃপক্ষ সমর্থিত জাতিগত নিধনেরই সহায়ক হয়ে ওঠে।
রোহিঙ্গাদের ওপরে এই জাতিগত নিপীড়ন কয়েক দশক ধরেই চলছে।
তাদের নাগরিকত্বের অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে; বিচ্ছিন্নকরণ প্রকল্পে দেশব্যাপী কয়েক ডজন গ্রামে তাদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ভ্রমণের ক্ষেত্রে গুরুতর বিধিনিষেধ আরওপ করা হয়েছে; ইবাদতের জায়গাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, বিয়ের ক্ষেত্রে বাধানিষেধের সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার খর্ব করা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, ও গণউচ্ছেদসহ বিভিন্ন নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা।
বর্মি নেত্রী, নোবেল শান্তিপদকপ্রাপ্তা এবং গণতন্ত্রের নামধারী ঠিকাদার অং সান সু চি কেবল চুপ থেকেছেন তা নয়; তিনি উৎপীড়নের সংবাদগুলোকে “ভুয়া খবর” হিসেবে উড়িয়ে দিয়ে সচেতনভাবে এই উৎপীড়নকে সমর্থন দিয়েছেন। “ভুয়া সংবাদ” পরিভাষাকে মূলত বিখ্যাত করেছিলেন ট্রাম্প। শুধু এই পরিভাষা ব্যবহারই সুচির সাথে ট্রাম্পের সাদৃশ্য বহন করে তা নয়, এখানে আদর্শিক ঘনিষ্ঠতাও বিদ্যমান।
২০১১ সালে আনার্শ ব্রাইভিক ৭০ জন নরওয়েজীয় সমাজতন্ত্রবাদীকে হত্যা করে। সে তার এই গণহত্যাকাণ্ডের ন্যায্যতা এভাবে দেখিয়েছে যে, এটা 'মার্ক্সবাদী, মাল্টিকালচারালিস্ট ও মুসলিমদের' অপবিত্র ত্রিত্বের বিরুদ্ধে ক্রুসেডের একটা অংশ। ঠিক এভাবেই ব্রাইভিকের শাদা আধিপত্যবাদী চিন্তাধারা শুধু বর্ণবাদ ও সেমিটীয় বিদ্বেষবাদের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়নি, বরং অন্যান্য অনেক অল্ট-রাইট (অলটার্নেটিভ ডানপন্থি) গোষ্ঠীর আদলে ইসলামোফোবিয়ার মধ্য দিয়েও হয়েছে। তখন থেকেই এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে, ইসলামোফোবিয়া আর চরমপন্থি ডান ঘরানায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে গিয়েছে।
ইসলামোফোবিয়া মুসলিম সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতি কেবল একগুচ্ছ নেতিবাচক মনোভাবের সমষ্টি না। সুবিধা ও নিষ্ঠুরতার এই বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মাণে ইসলামোফোবিয়া যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তাতেই এর মূল গুরুত্ব নিহিত। এটা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, অং সান সু চি মনে করেন রোহিঙ্গারা বহিরাগত সন্ত্রাসী। এটা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, ভারতের নরেন্দ্র মোদি তৎকালীন সুচির সাথে রেঙ্গুনে মোলাকাত করেছেন যখন তার আর্মি রাখাইনে জাতিগত নিধন চালাচ্ছিল, যে রাখাইনে রোহিঙ্গারা শতকের পর শতক ধরে বাস করে আসছে। এটা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের সংবাদগুলোকে সুচি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছেন ভুয়া খবর হিসেবে। এই সুচি, মোদি ও ট্রাম্প - এদের সবাই কথা বলছেন ইসলামোফোবিয়ার ভাষায়।
বিশ্বব্যাপী জাতীয়তাবাদ ও জাতিরাষ্ট্র প্রকল্পের যে সংকট প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তাকে সামাল দিতে জেনোফোবিক জাতীয়তাবাদীরা ইসলামোফোবিয়ার যে ভাষা ব্যবহার করছে এটি সে-ই ভাষা। নিছক মুসলিমদের অস্তিত্বই এই দুনিয়ায় জাতীয়তাবাদী মুক্তি অর্জনের অসম্ভাব্যতার স্মারক হয়ে উঠেছে যারা কোন গোষ্ঠী বা দেশের ছোট মুঠোয় জায়গা করে নিতে পারবে না। জাতীয় মুক্তি ও পুনর্জাগরণের প্রকল্প প্রস্তাবনায় জাতীয়তাবাদী উদ্দীপণার যে ব্যর্থতা তার জন্য নিছক মুসলমানদের অস্তিত্বকেই দায়ী করা হচ্ছে। তো এই ইসলামোফোবিক দুনিয়ায় মুসলিমরা বর্বর বহিরাগত ছাড়া কি-ইবা হতে পারে, যারা সভ্যতাকে নিছক তাদের অস্তিত্ব দিয়েই হুমকি দিয়ে যাচ্ছে?
জেনফোবিক আধিপত্যবাদের শক্তিশালী হওয়াটা ক্রমাগতভাবে মুসিলম বশীভূতকরণ প্রচেষ্টার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহুর্তে মুসলিমরা বিশ্বব্যাপী ট্রান্স-ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদ উৎরে যাওয়ার একটি সিগনিফায়ার হিসেবে পরিণত হয়েছে। ট্রান্স-ন্যাশনালিজমের এই দাবিটা চিহ্নিত হয় (নৈতিকতার দিক থেকে) দ্বৈত আনুগত্য, পরদেশীতা, সীমানা-উত্তর সম্পর্ক ও সম্বন্ধ শীর্ষক চিহ্ন দিয়ে। সুতরাং জাতিরাষ্ট্রের অসম্ভব পূর্ণতার পথে বাধা হিসেবে, বিশ্বায়নের চিহ্নায়ক হিসেবে এবং হোমোজেনাস সমাজের আকাঙ্ক্ষিত সাদৃশ্যের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে বরাবর মুসলিমরা প্রতিফলিত হচ্ছে। বিশ্বায়ন কর্তৃক সৃষ্ট অস্থিরতা ও নয়া-উদারনৈতিক যুক্তিকাঠামোর শাসনে বিশ্বব্যবস্থার কাঠামোগত যে রূপান্তর তার ওপর থেকে নজর সরিয়ে মুসলিমদের অস্তিত্বের উপর নজর আনা হচ্ছে। এই মুসলিমরা বর্তমানে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ডায়াসপোরা (Diaspora) কেননা তাদের কোনো জাতিরাষ্ট্র নির্দিষ্ট কোনো নৃতাত্ত্বিক বা জাতিগত পরিচয়ে ধারণ করতে পারে না। জাতির শরীরে বাসা বাধা বহিরাগত বিষাক্ত উপাদানগুলো সারানোর প্রতিষেধক হিসেবে পরিণত হয়েছে ইসলামোফোবিয়া। মুসলিমরা হচ্ছে নির্দিষ্ট নৃতাত্ত্বিক কাঠামোতে (Ethnos) জনগণকে (Demos) ধারণ করার চূড়ান্ত অক্ষমতার রূপক।
রাষ্ট্রনীতি আকারে ইচ্ছাকৃত নির্বিচার হত্যাকাণ্ড হিসেবে গণহত্যা ঘটে থাকে জাতি এবং ঐ সকল গোষ্ঠীর ছেদবিন্দুতে যারা জাতির সীমানা ভেঙ্গে দিয়ে সংকট তৈরি করে। ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের ফলে বিশ্বের সকল প্রধান ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মুসলিম সংখ্যালঘু রয়েছে যারা 'হালের নৃতাত্ত্বিক-জাতীয়তাবাদের ধারা এবং নাগরিকতা ও নৃতাত্ত্বিকতার মাঝে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে তার সাথে জড়িয়ে পরেছে। বহুল আকাঙ্ক্ষিত নৃতাত্ত্বিকভাবে 'বিশুদ্ধ জাতিরাষ্ট্র' বাস্তবায়নের পথে তাই তাদের প্রধান বাঁধা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের তাদের আদিবাসস্থান গ্রামগুলো থেকে বিতাড়িত করে দেয়া হচ্ছে এবং হত্যা করা হচ্ছে, কারণ তাদের বিদেশি এবং বহিরাগত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইসলামোফোবিক দুনিয়ায় মুসলিমরা কোথাও থাকার যোগ্য নয়। জাতিগত বিভাজনের ওপর ভিত্তি করে যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, বৈশ্বিকভাবে মুসলিম আইডেন্টিটির উত্থান এক্ষেত্রে সীমালংঘন হিসেবে পরিণত হয়েছে; সাংস্কৃতিক সমজাতীয়তার আন্দোলনগুলোর চোখে তারা পাপী; এনলাইটেনমেন্ট টেলিওলজির চোখেও তারা পাপী।
ইসলামোফোবিয়া শুধু মুসলিমদের প্রতি বৈরীভাব নয়, বরং এটি হচ্ছে সেই আঠা যা এমন একটি জোটকে একসাথ করে রাখছে যারা বিশ্বকে আরও প্রশস্ত একটি সহাবস্থানের জায়গা হিসেবে গড়ে উঠতে বাঁধা দিচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের উপর চালানো জাতিগতনিধন তাই নিতান্তই দূরবর্তী কোনো ছোট সংখ্যালঘু একটি গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ নয়। বার্মার জঙ্গলে যা-র ওপরে হামলা করা হচ্ছে, তা আরেক প্রকার নয়া দুনিয়ার সম্ভাবনার ওপরেই হামলা। ৪১

টিকাঃ
[৪০] ভাষাবিদ ফার্দিনান্দ দ্য স্যুসুরের ভাষ্যমতে, 'সিগনিফায়ার' যেই অর্থদ্যোকতা হাজির করে তার উপর 'সিগনিফাইড' তৈরি হয়।
[৪১] সম্পূর্ণ লেখাটি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র ইবরাহিম কালিনের বক্তব্য অবলম্বনে রচিত

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ভারতেও বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষ

📄 ভারতেও বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষ


ভারতে ক্রমাগত মুসলিমবিদ্বেষ বাড়ছে। দেশটির মুসলিমবিদ্বেষী নাগরিকত্ব আইন ও কথিত নাগরিকপঞ্জির মতো ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে বহুদিন থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে। ভারতের মুসলিমবিদ্বেষ চর্চার একটি ঘটনা উল্লেখ করলেই বোঝা যাবে। ২০২০ সালের মার্চে করোনার প্রকোপ শুরু হলে দিল্লিতে তাবলিগ জামাতের এক সমাবেশকে কেন্দ্র করে শুরু হয় তুলকালামা ঘটনা। ওই সমাবেশে যোগ দেয়া অন্তত ৩০০ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ পাওয়া গেছে বলে জানানো হয় সরকারি নোটিশে। আর সরকারি এমন ঘোষণার পরই দেশটিতে উদ্বেগজনক পর্যায়ে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর একটা অংশ এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে নানা মুসলিমবিদ্বেষী হ্যাশট্যাগ তৈরি হয়। পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয় নানা ভুয়া খবর। করোনাজিহাদ বা নিজামুদ্দিন ইডিয়টস নামে বিভিন্ন হ্যাশট্যাগও ব্যবহার করা হয়।
দিল্লির নিজামুদ্দিনে তাবলিগ জামাতের মারকাজে যোগ দিয়ে নিজের রাজ্যে ফিরে যাওয়া কয়েকজনের শরীরে করোনা সংক্রমণ প্রমাণিত হওয়ার পর ভারতের গণমাধ্যমে ওই ঘটনা অতি মাত্রায় গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ওই ঘটনা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সদস্য জাফরিয়াব জিলানি সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, 'ভুল দুই তরফেই হয়েছে। ওই সমাবেশে যারা গিয়েছিলেন, তাদের উচিত ছিল নিজের থেকেই পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া এবং চিকিৎসকদের আর সরকারের পরামর্শ নেয়া। কিন্তু উল্টো দিকে, সরকারই বা ব্যবস্থা নেয়নি কেন! সমাবেশটা তো হয়েছে যখন দেশে কোনো লকডাউন ছিল না, সেই সময়ে। তারপর যারা ফিরতে পারেনি, লকডাউনের ফলে তাদের জন্য তো সরকারের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল।' তিনি বলেন, 'এ রকম একটা কঠিন সময়ে বিষয়টাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটা একেবারেই কাম্য নয়। মুসলমানদের প্রায় সবাই কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কথা মেনে চলছে। আলেমরা নির্দেশ দিয়েছেন জমায়েত না করতে।'
এই ঘটনার পর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের বাংলা পত্রিকা স্বস্তিকার সম্পাদক রন্তিদেব সেনগুপ্ত বিবিসি-কে বলেন, 'এটা মুসলমান বিদ্বেষ কখনোই নয়। তবে যেটা হয়েছে, সেটা তো ভয়াবহ। তাবলিগ জামাত যে ঘটনা ঘটিয়েছে, এ রকম একটা পরিস্থিতিতে বড় সমাবেশ করলেন তারা, সেখান থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লেন। এরকম একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ কী করে করলেন তারা? ধর্মান্ধতা আর পশ্চাদপদতা যে মানুষকে কোথায় টেনে নিয়ে যায়, কীভাবে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনলেন তারা, সেটাই প্রমাণ করলো তাবলিগ জামাত।'
মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে কি-না, তা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ওই ঘটনার পর মুসলমানদের লক্ষ্য করে নানা ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে। ভুয়া খবর যাচাই করে দেখে, এমন একটি ওয়েবসাইট অল্টনিউজের সম্পাদক প্রতীক সিনহা বিবিসিকে বলেন, 'নিজামুদ্দিনের ঘটনার পর থেকে এ রকম অনেক ভিডিও আর পোস্ট ভাইরাল হয়েছে, যেগুলোর টার্গেট মুসলমানরা। আমরা একটা ভুয়া ভিডিও খুঁজে পেয়েছি, যেখানে একদল মুসলমানকে থালা-বাটি চাটতে দেখা যাচ্ছে। বলা হয়েছে, এভাবেই মুসলমানরা করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা যাচাই করে দেখি যে, ওটি আসলে মুসলমানদের একটি রীতি। খাওয়ার পরে যাতে থালায় একটিও খাদ্যকণা অবশিষ্ট না থাকে, সেজন্য তারা চেটে পরিষ্কার করে দেন।'
তিনি বলেন, 'দুই দিন আগে আরেকটি ভিডিও আসে আমাদের কাছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে একটি মসজিদের ভেতরে একদল মুসলমান কোনো একটা আওয়াজ করছেন। ভুয়া পোস্টটিতে বলা হয়, এভাবে হাঁচি দিয়ে মুসলমানরা নাকি করোনা ছড়াচ্ছে। অথচ এটি আসলে একটা সুফি আচার, যেখানে তারা শ্বাস-প্রশ্বাসের একটা অভ্যাস করেন, সেটাই তারা করছিলেন।' তার ভাষায়, 'এসব ভুয়া ভিডিওগুলো ছড়িয়ে দিয়ে ভারতে করোনা ছড়িয়ে পড়ার জন্য মুসলমানরাই দায়ী, এমন একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।'
একটু পেছনে ফিরে তাকালে আমরা দেখব, ভারতের ঐতিহাসিক বহু বিশ্বাসের চরিত্রটি (পুলারিজিম) ২০০২ সালের গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে এক আঘাতের শিকার হয়। যে আঘাতে শত শত মুসলমান মারা গিয়েছিল। হিন্দু জাতীয়তাবাদের মোদির ব্র্যান্ড ঐক্যের পরিবর্তে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। ফলে ক্রমবর্ধমান ঘটনা যেমন সম্প্রতি 'গরু সম্পৃক্ত সহিংসতা' ঘটেছে। প্রত্যহ মুসলিম যুবকদের ইসলামপ্রীতির কারণে জুলুম ও অত্যাচারের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে। তেমনিভাবে কেবল মুসলিম পরিচয়ের কারণেই মুসলমানদের বিপুল হেনস্তার মোকাবেলাও করতে হচ্ছে। এখানে ইসলামোফোবিয়ার ভিত্তির ওপরই গোধরা, মিরাঠ এবং মুজাফফরনগরের মতো ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে।
২০১৫ সালের ২৫ আগস্ট ব্যাঙ্গালুরুতে শাকের নামক এক ছেলেকে সংজ্ঞায়িত করতে বজরঙ্গ দলের কর্মীরা পিলারের সাথে বেঁধে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে প্রহার করে। তার কাপড় ছিঁড়ে ন্যাকড়া বানিয়ে ফেলে। তেমনিভাবে ২০১৫ সালের মে মাসেই মুম্বাইয়ে এমবিএ গ্র্যাজুয়েট জিসানকে এক কোম্পানি এটা বলে চাকরি প্রদানে অস্বীকৃতি জানায় যে, 'আমরা কেবল অমুসলিম প্রার্থীদেরই চাকরি দিয়ে থাকি!'৪২ (আরএসএস) বজরঙ্গ দল, বিজেপি, জাফরানি আন্দোলন ও অন্যান্য আন্দোলনের রূপকার এবং রাজনৈতিক অভিযোগসর্বস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাষণের কারণে ভারতের সমগ্র মুসলিম অস্থির। জাফরানি আন্দোলন সংখ্যাগুরু হিন্দুদের বারবার শুধু একথার দিকেই তাদের নজর ঘুরিয়ে দিচ্ছে যে, 'ভারতের মুসলিমরা তাদের বংশবৃদ্ধি করে ভারতকে মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ভারত একটি মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হবে।'
এর মাধ্যমে এটাই শুধু বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, ভারতের মাটিতে সংখ্যালঘুদের কোনোরূপ বৈধ বাসনা থাকতে নেই বা তারা কোনো নৈতিক আকাঙ্ক্ষার হকদার নয়! ২০১৫ সালের ২৯ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত আরএসএস-এর জাতীয় পর্যায়ের নয়াদিল্লীর বৈঠকে যে বিষয়কে কেন্দ্রীয় রূপদান করা হয়েছে; সেটা ছিল দেশটিতে মুসলিমদের সংখ্যাবৃদ্ধি। বৈঠকের শেষে করা এক শপথনামায় দুটি বিষয়কে প্রকাশ করা হয়। এরমধ্যে একটি এই- 'ভারতে হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম এবং জৈনধর্ম, (একটি ভারতীয় ধর্ম) অনুসারীদের বসতিতে চিন্তাধিক হ্রাস ঘটছে।' এবং সবশেষে এই সংবাদ দেয়া হয়েছে যে, 'ইসলাম, মুসলমান, খ্রিস্টবাদ এইসব বহিরাগত ধর্মাদর্শ। এরা ভারতকে মান্য করে না!'৪৩
আরএসএসের হরিয়ানা রাজ্যের প্রধান বিচারপতি ইন্ডিয়ান এক্সেপ্রেসের সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন- 'ভারতে মুসলমানরা থাকবে ঠিক; কিন্তু এখানে তাদের গরুর গোস্ত খাওয়া ছাড়তে হবে। কেননা গরু ভারতে গো-মাতা।'৪৪ এই ঘোষণার কিছুদিন পরই মুহাম্মাদ আখলাক নামের এক ছেলেকে হিন্দুরা কেবলই এই সংবাদের ভিত্তিতে মারতে মারতে একদম মেরেই ফেলে যে, সে গরুর গোস্ত খেয়েছিল!

টিকাঃ
[৪২] ইসলামোফোবিয়া : মুহাররিকাত, আছারাত আওর তাদারুক, ইরফান ওয়াহিদ, মাহনামা রফিক মানজিল, দিল্লী, অক্টোবর ২০১৫, পৃষ্ঠা- ২৩
[৪৩] নাজিমুদ্দীন ফারুকী, মুসলমানু কি আবাদী মে ইজোফে কি হাকিকত, ছেহ রোজাহ দাওয়াত, নয়াদিল্লী, ১০ অক্টোবর ২০১৫
[৪৪] আসরারুল হক কাসেমী, মুসলিম দুশমনী কি আঁগ মে বিজেপি, মাহনামা আবলাগ, মুম্বাই, নভেম্বর ২০১৫

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ইসলামোফোবিয়া ও আরব-বিদ্বেষ: চমস্কির বয়ানে

📄 ইসলামোফোবিয়া ও আরব-বিদ্বেষ: চমস্কির বয়ানে


সন্দেহাতীতভাবেই ৯/১১-র ঘটনা বিশ্ব রাজনীতি, আদর্শ, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিষয়ের প্রশ্নে ধর্মকে নতুন করে অবতারণা করছে। ৯/১১-র বিপর্যয়ের পর বিশ্বজুড়ে ইসলামকে চরমপন্থা, সন্ত্রাসবাদের কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ইউরোপিয়ান মনিটরিং সেন্টার অন রেসিজম এন্ড জেনোফোবিয়া (EUMC) একটি প্রতিবেদনে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ১৫টি দেশের সম্ভাব্য ইসলামবিদ্বেষী প্রতিক্রিয়া ফুটিয়ে তুলেছে। প্রতিবেদনে চিত্রিত হয়েছে, ইসলাম ও মুসলিম সম্পদ্রায়ের সাথে সাথে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীগুলো দিন দিন চরম আকারের বৈরিতা, বৈষম্য, কুসংস্কার, সহিংসতা ও আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে। ইউএমসির রিপোর্টের মূল প্রতিপাদ্য হলো : জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি; বিশেষত মুসলমান ও ঝুকিপূর্ণ গোষ্ঠীর প্রতি সহিংস, আগ্রাসন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের জনগণের আচরণ পরিবর্তনমূলক কর্মকাণ্ড; ইসলাম-বিদ্বেষী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিরূপণ। ৪৫
আর অপরদিকে আমেরিকায় ২০০৬ সালে Today-Gallup Poll-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ইসলামী বিশ্বাস সম্পর্কে এত বেশি সন্ত্রাসবাদের কুসংস্কার ছড়ানো হয়েছে যে জরিপে দেখা গেছে, ২২ শতাংশ লোকই মুসলমানদের প্রতিবেশী হিসেবে পছন্দ করে না। এবং প্রতি ১০ জনের চারজনই আমেরিকান মুসলিম নাগরিকদের ওপর কঠোর নজরদারি কামনা করে।
২২ জুন, ২০১০। নিউইয়র্ক শহরে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা প্রদান করা হয়। সে মসজিদ নির্মাণ ভেস্তে দিতে নিউইয়র্ক টাইমস সম্পাদকীয়তে মুসলিম-বিদ্বেষী আক্রমণাত্মক কলাম ছাপে। “কারণ যেখানে মসজিদ সেখানেই মুসলমান আর যেখানেই মুসলমান, সেখানেই সমস্যা উৎপত্তির প্রবল সম্ভাবনা” এ বিবরণী সরাসরিভাবে মুসলিম-বিদ্বেষ, ইসলামোফোবিয়ার পালে হাওয়া দেয়। সম্পাদকীয়তে আরও দাবি তোলে- “নিউইয়র্কিস্তান হওয়ার পূর্বে এ মসজিদ নির্মাণ বন্ধ করার দাবি।
তারা আরও দাবি তোলে যে, লন্ডনে মুসলমান থাকতে থাকতে লন্ডনিস্তান হওয়ার উপক্রম তা লক্ষণীয়। ২০১৪ সাল, ব্রিটেনজুড়ে কাউন্টার টেরোরিজম হয়ে ওঠে এক মুখ্য আলোচিত বিষয়। তারই জেরে ২০১৫ সালে নতুন করে “কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড সিকিউরিটি অ্যাক্ট' নামে আইন করা হয়। টনি ব্লেয়ার মার্কিন মুলুকের এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী। সে তার বায়োগ্রাফিতে মুসলিম-বিরোধী অবস্থান জানান দিতে 'সন্ত্রাসী যুদ্ধ' বলে বিবরণ দেন। অপরদিকে ২০১৩ সালে Ta¼ Force on Tackling Radicalisation and Extremism-এর ভাষ্যমতে, চরমপন্থি মুসলমানদের বিবরণ এভাবে প্রদান করা হয়- 'তাদের আপসহীন বিশ্বাসের মধ্যে এটিও অন্তর্ভুক্ত যেকোনো ব্যক্তি ব্রিটিশ ও মুসলিম একই সাথে হতে পারে না। আরও জোর দিয়ে বলে যে, যারা তাদের মতের সাথে একমত নয় তারাও প্রকৃত মুসলমান নয়। অথচ যা ইসলামের রূপরেখার একেবারেই বহির্ভূত চিন্তাধারা, তার রেশ টেনে ইসলামকে ধরাশায়ী করার অপচেষ্টা।
সন্ত্রাস ও বিদ্রোহ দমনের বাহানায় ইসলামোফোবিয়ার বিস্তার
ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুসংস্কার, ভিত্তিহীন ভয়, বিদ্বেষ ও বৈরিতা আর বাস্তবিক বৈষম্যই ইসলামোফোবিয়ার মূলরূপ। এর মাধ্যমে মুসলমানদের মূলধারার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে বিদূরিত করার মাধ্যমে তাদের মনগড়া সব বিষয়াদি বাস্তবায়নের পথ খোলাসা করে নেয়। মুসলমানদের প্রতি ইসলামোফোবিয়ার এসব রূপ নানাভাবে জাহির হতে পারে, যেমন:
১. নেতিবাচক বা পৃষ্ঠপোষকতামূলক দৃশ্যায়নের মিডিয়া প্রচারণায় ও প্রাত্যহিক আলাপচারিতায়
২. রাস্তায় আক্রমণ, অপব্যবহার এবং সহিংসতা
৩. মসজিদ ও কবরস্থানগুলোতে আক্রমণ
৪. কর্মসংস্থান বৈষম্য
৫. অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে মুসলমানদের প্রতি স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদর্শনের কার্পণ্যতা (ATCSA 2001)
অস্ট্রেলিয়ান লেখক ডেভিড ক্যালকুলেন ২০০৪ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলেন, বর্তমানে চলমান সংঘাত মূলত বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিরুদ্ধে এক প্রচারণা। সে আরও বলে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মূলত সন্ত্রাসনিধনের কোনো প্রচেষ্টা নয় বরং তা বিশ্বব্যাপী ইসলামপন্থি বিদ্রোহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। তার মতে, একে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ না বলে বিদ্রোহী-বিরোধী যুদ্ধ বলা বেশি যুক্তিযুক্ত। এখন কারা বিদ্রোহী সে বর্ণনা দিতে গিয়ে রান্নিমেড ট্রাস্ট ইসলামকে দেখার কয়েকটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে যেমন-
১. ইসলামকে একরোখা ও অনাধুনিক হিসেবে দেখা হয় নাকি বিচিত্র ও গতিশীল হিসেবে দেখা হয়।
২. ইসলামকে পৃথক আর আলাদা হিসেবে দেখা হয় নাকি পরস্পর নির্ভরশীল হিসেবে দেখা হয়।
৩. ইসলামকে নিকৃষ্ট হিসেবে দেখা হয় নাকি আলাদা হলেও সমতার নজরে দেখা হয়।
৪. ইসলামকে আক্রমণাত্মক শত্রু হিসেবে দেখা হয় নাকি সহযোগী সংঙ্গী হিসেবে দেখা হয়।
৫. মুসলমানদের ধোঁকাবাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয় নাকি আন্তরিক হিসেবে।
৬. মুসলমানদের পশ্চিমা সমালোচনা গৃহীত হয় নাকি বিতর্কিত হয়।
৭. মুসলমাদের প্রতি বৈষম্যের আচরণ নিন্দিত হয় নাকি নন্দিত হয়।
৮. মুসলিম-বিরোধী আলোচনা-মনোভাব স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত হয় নাকি সমস্যাজনক।
দৃষ্টিভঙ্গির এই জটিলতার জন্য, বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটির ধর্ম-রাজনীতির অধ্যাপক 'জগতলিন সিজারি বলেন, ইসলামোফোবিয়া জেনোফোবিয়া, অভিবাসনবিরোধী মনোভাব এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্রায়ণ প্রত্যাখ্যানের মতো বৈষম্যগুলোর সাথে জড়িয়ে গেছে। আর এন্টি সেমেটিজম যা মূলত এন্টি জুইস থেকে উদ্ভূত, এটা থেকে নতুন বাস্তবতার ভীতিকর পরিস্থিতির জন্য এন্টি মুসলিম নামটি তৈরি করা হয়েছে।
ইসলামের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব উস্কে দেয়া হয় সময়ে সময়ে, ইসলামকে মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ ও মুসলমানদের আপদ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এ বিষয়ে সেন্টার অব ওয়ার্ল্ড পলিটিকসের পরিচালক হাংপিং বলেন, সহিংসতাকে শিল্পায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক আকার দেয়া হয়েছে। যা আধুনিকতার দুধারী তলোয়ার (উভয় সংকট) বোঝার একমাত্র চাবিকাঠি।
৯/১১-র ঘটনার পরই ইসলাম-বিদ্বেষ সজোরে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ঐ ঘটনার ব্যাখ্যায় চমস্কি বলেন, আক্রমণটি চারটি রাজনৈতিক স্বার্থ থেকে ইন্ধন লাভ করেছে। তা হলো-
১. সৌদি অঞ্চলে মার্কিন সেনাদের সরব উপস্থিতি
২. ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘর্ষের প্রতি আমেরিকার তিক্ত নীতি
৩. ইরাকের ওপর আরওপিত ধ্বংসাত্মক চলমান নিষেধাজ্ঞা
৪. মুসলিম ও অমুসলিম বিশ্বজুড়ে দমনমূলক স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থায় আমেরিকার সমর্থন
সন্ত্রাসের গীতিকা: সুরক্ষা ও বিপদাশঙ্কা
পরিচালনা ও বোধগম্যতার ধরন উল্লেখ যে, বিট্রিশ নীতিনির্ধারণী আলোচনায় "সন্ত্রাসবাদ” শব্দটি বৈষম্য ও সিলেকটিভ পন্থায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। জনসাধারণের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর্তৃক সহিংসতা ছড়ানো হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় 'আক্রমণ ও ভীতি প্রদর্শন' ইরাকে মার্কিনিদের বোমাবর্ষণকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয় না। একইভাবে সন্ত্রাসবাদ শব্দ ব্যবহার করা হয় না। ইংলিশ ডিফেন্স লিগের মতো কেউ যখন হয়রানি ও ভয় প্রদর্শনের কাজ করে। অপরদিকে দেখা যাক ইসরাইলি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিমন পেরেজ আমেরিকার ৪০তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড রিগ্যানের সহায়তায় তিউনেসিয়ায় হামলা চালিয়ে ৭৫ জনকে হত্যা করে অপরদিকে লেবাননের বৈরুতে হামলা করে ৮০ জনকে নিহত আর ২৫৬ জনকে আহত করে। চমস্কি বলেন, বোমাহামলায় “দগ্ধ শিশুরা তাদের বিছানায় কাতরে কাতরে মরেছে, মসজিদ থেকে বাড়ির দিকে আগত নামাজি শিশুগুলোকে হত্যা করেছে, পশ্চিম বৈরুতের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার প্রধান সড়ক বিধ্বস্ত করে ছেড়েছে। এ সন্ত্রাস আয়োজিত হয়েছে, ব্রিটিশ গোয়েন্দা, সিআইএ এবং সৌদি ক্লায়েন্টদের যোগসাজশে। অথচ এসবকে সন্ত্রাসবাদ বলে আখ্যা দেয়া হয় না। সন্ত্রাসবাদ তকমাজুড়ে দেয়ার হর্তাকর্তারাই যে এর দোষে দুষ্ট। নিজেদের দোষ ঢাকার তাদের সে কী যে কোশেশ! ৪৬
ড্যানিশ ম্যাককোয়েন, ব্রিটিশ থ্রিলার লেখক, ২০০৭-এর অক্টোবরে একটি বই প্রকাশ করে 'হাইজ্যাকিং অব ব্রিটিশ ইসলাম' নামে। সে ইসলামকে আখ্যা দেয় 'ইসলাম শুধু একটি নিরাপত্তা সমস্যার নামই নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক সমস্যারও নাম।' তারা ব্রিটেনের মুসলমানদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতালব্ধ ইসলামোফোবিয়া ও বৈষম্য শনাক্ত করার চেষ্টা করেছিল এবং পরবর্তীতে তা গুজব বা রূপকথা এবং প্রতিষ্ঠান, রাজনীতিবিদ এবং অন্যান্য সামাজিক দলগুলো প্রদত্ত মানসিক দায় বলে চালিয়ে দেয়ার পরম চেষ্টা করেছিল।
ভবিষ্যৎ ইসলামোফোবিয়া: নিরাময়ের নব প্রত্যাশা!
ডেভিড বারসামিয়ানকে দেয়া সাক্ষাতকারে চমস্কি বলেন, ভবিষ্যৎ আমেরিকা শক্তি বলে বিশ্ব শাসন করবে, তখন সে কোনো বিষয় হুমকি হয়ে ওঠার আগেই তা ধ্বংসের প্রয়াস চালাবে। তাই নতুন কোনো প্রতিকার আনতে কিছু তো করতেই হবে। নিশ্চিত করে নতুন প্রতিকার আনার সক্ষমতা তো আর সব দেশের থাকবে না... এটাই শক্তির তাৎপর্য। তারা প্রতিরোধমূলক বা আক্রমণাত্মক যুদ্ধে অবতরণ করবে। আর প্রতিরোধমূলক বা আক্রমণাত্মক যুদ্ধ মানে হলো সম্পূর্ণরূপে একটি অরক্ষিত লক্ষ্য বা টার্গেট ঠিক করা, যা অতি সহজেই বৃহদাকার সেনাবাহিনী দেখে ঘাবড়ে যাবে। যাইহোক এটা নিশ্চিতরূপে ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে করতে হলে, জনগণের মনে ভয়ের সঞ্চার করতে হবে। “ইসলামোফোবিয়াও এমন একটি প্রোপাগান্ডা যার টার্গেট একেবারে দুর্বল অসহায় ও বর্মশূন্য।”
এটি একটি দর্শনমূলক বা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রোপাগান্ডা যা বাস্তবায়নে কোনো প্রকার সন্দেহের উদ্রেকের অবকাশ দেয়া যাবে না। ওয়াশিংটন আমেরিকানদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তনে জোর প্রচেষ্টা চালালো যে, সাদ্দাম হোসেন শুধু খারাপই ছিল তা নয় বরং সে ছিল আমেরিকান নাগরিকদের অস্তিত্বের জন্যও হুমকিস্বরূপ। এ অবান্তর প্রোপাগান্ডা শেষে আলোর মুখ বেশ ভালোভাবে দেখেছে। আমেরিকার প্রায় অর্ধেক নাগরিক মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে ৯/১১-র ঘটনার সাথে সাদ্দাম হোসেন ব্যক্তিগতভাবে জড়িত ছিল। ⁸⁹
আরবে মুসলিমবিদ্বেষ: নোম চমস্কি
ইহুদিবাদের বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, অর্থাৎ যখন আমরা শিশু অবস্থায় বাড়ন্ত ছিলাম আমরা ছিলাম ইহুদি। সে সময়টাতে ইহুদি-বিরোধিতা ছিল খুবই স্বাভাবিক দৃশ্যমান বিষয়। আমার বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, শহরের আইরিশ ও জার্মান ক্যাথলিকদের মাঝে মধ্যবিত্ত এরিয়ার একমাত্র ইহুদি পরিবার হিসেবে আমরা বেড়ে উঠেছি যার সিংহভাগই খোলাখুলি ভাবে নাৎসিপন্থী ছিল। আমি বড় হয়েছি ক্যাথলিকদের ভয়ে ভিতরে ভিতরে আড়ষ্ট হয়ে। যুবক বয়স পর্যন্ত কোন প্রকারেই আমি ক্যাথলিকদের সাথে যে কোন বিষয়ে ভয়-ভীতি মুক্ত হয়ে করতে পারতাম না। যা ছিল নিতান্ত যন্ত্রনাদায়ক। যখন ক্যাথলিকরা জেস্যুট স্কুল ধারণা নিয়ে আসে (ক্যাথলিক পুরোহিতের আদেশ প্রাপ্ত সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত স্কুল)। তাদের আচরণ আরো নিষ্ঠুরতায় ভরে গেল। অধিকন্তু আমার পিতা যখন পুরোনো একটি গাড়ি ক্রয়ে সমর্থ হলো, যাতে আমরা কোন মতে দিন গুজরান করতে পারি (গাঁ বাঁচিয়ে)। যদি তা নিয়ে আমরা কোন পাহাড়ের পাদদেশেও পৌঁছতাম সেখানে গাড়ি পার্ক করতে গেলেও বেশ বেগ পেতে হতো কারণ অধিকাংশ মোটেলে ( আবাসিক হোটেল যা ব্যাক্তিগত যানবাহন নিয়ে ভ্রমণকারীদের পার্কিং সুবিধার জন্য বিশেষায়িত) ইহুদিদের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ছিল। ১৯৫০ এর দিকে যখন আমি হার্ভার্ডে ভর্তি হই, সেখানে ইহুদিবিদ্বেষ এতটা প্রকট ছিল যে পান থেকে চুন খসলেই ইহুদী কাউকে নিধন করা যেন নিমেষের ব্যাপার। প্রথম ধাপের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় নিয়েও সেখানে পল সামুয়েলসন ও রবার্ট উইনারের মতন বহু প্রথম গ্রেডের মানুষজন ইহুদি ধর্মালম্বী হওয়ার কারণে চাকরি জুটাতে পারেনি। হার্ভার্ডকে প্রথম ইহুদি গণিতবিদ নিয়োগ দিতে হয়েছিল তার পান্ডিত্যের প্রমাণ স্বরূপ। ১৯৫৩ সাল, তখন আমি সেখানে উপস্থিত; বিভাগটি ইহুদি বিদ্বেষে পূর্ণ ছিল। আমি বুঝাতে চাচ্ছি, পরিস্থিতির সার্বিক পরিবর্তন ৫০ এর দশকেই হয়েছে অথচ তখনো পর্যন্ত ইহুদি বিদ্বেষ ছিল দিনের আলোর মতন জাজ্বল্যমান আর বাস্তবমুখর। ইহুদি জাতি যদিও যথেষ্ট পদদলিত হয়েছিল, তারা তা লুকিয়েই রাখত দৃশ্যমান করত না কারণ তাদের মাথার উপর ঝুলত খড়ার ঘা/ বিপদ যেন লেগেই থাকত। এ কারণেই হলোকাস্ট (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সরকারের সহায়তায় নাৎসি বাহিনী কর্তৃক ৬০ লাখের বেশি ইহুদি নিধনকে হলোকাস্ট নামে আখ্যা দেয়া হয়।- ব্রিটানিকা সহ্য করলেও ইহুদি শরণার্থীরা কোথাও যেত না। (কারণ তাদের জানা ছিল নতুন জায়গা মানেই নতুন কোন বিপদ।)
ইউরোপের প্রায় সকলে, বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর 'ডিসপ্লেস পারসনস ক্যাম্প' বা ডিপি ক্যাম্পে আবদ্ধ মানুষগুলো যুক্তরাষ্ট্রে জায়গা করে নিয়ে স্বস্তির নিস্বাশ নিতে পারত কিন্তু তারা পারে নাই। ডিপি ক্যাম্পে মরনাপন্ন মানুষগুলো জার্মানরা পরাজিত হওয়ার পরও সেখানে আটকা পড়েছিল। এটা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যকর ছিল না, বরং পরিবর্তনের মধ্যে এটাই ছিল যে সেখানটা সাক্ষাত এক শ্মশানে পরিণত হয়েছিল (মানুষগুলো ক্ষয় হতে হতে)। তাদের হাতে গোনা অল্প কজনই প্রাণ নিয়ে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে পেরেছে। কিছুটা ইহুদি বিদ্বেষ ও কিছুটা ইহুদিরা তাদের তাদের ফিরিয়ে আনতে না চাওয়ায় তাদেরকে সেখান থেকে উত্তরণের কোন কোশেশ করা হয়নি, কারণ ইহুদিরা ইতিমধ্যেই সমস্যায় জর্জরিত, ডিপি ক্যাম্পের ইহুদি এনে সমস্যা তারা ফুসলিয়ে দেয়ার পক্ষে ছিল না।
ইহুদি বিদ্বেষ জাতিগত/বর্ণবৈষম্যের কোন আইনসম্মত ধরণ নয়, অথচ পক্ষপাতমূলক ভাবে আরব বিদ্বেষকে বর্ণবৈষম্যের বৈধ রূপ বা ধরণ বলে গণ্য করা হয়। অর্থায় বর্ণবাদের অধিকাংশ ধরণেই লুকোচুরির প্রয়োজন পড়ে না, তারা বর্ণবাদ না হওয়ার ভান করে থাকে শুধু (কাকের খাবার লুকানোর মত)। অন্যন্যা বর্ণবৈষম্যের ক্ষেত্রে হয়ত একজনকে ইহুদি বিরোধী বা কৃষ্ণাজ্ঞ বিরোধী না হওয়ার ছদ্মবেশে থাকে, প্রকৃত অবস্থার আত্মপ্রকাশ করে না। অথচ আরব বিদ্বেষের ক্ষেত্রে সে ভানটাও করার প্রয়োজন পড়ে না, বরং তারা তা কথায় কাজে বেশ প্রকট ভাবে ফুটিয়ে তোলে ও প্রকাশ করে। ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ এর আগেও এ আরব বিদ্বেষ মানুষেরা বিভিন্ন মুভি, বই-পত্রপত্রিকা এবং আচার-আচরণে প্রত্যক্ষ করেছে, এসব গোপনেও করা হয় নাই। অর্থাৎ কেউই তো এসে বলবে না যে আমি আমি বর্ণবাদী-আরব বিদ্বেষী; সর্বত্র মুসলিম ও আববের নিকটই এটা ওপেন সিক্রেট। আর এখন ১১ সেপ্টেম্বরের পর এমন আচরণ প্রদর্শণ তো তুঙ্গে উঠারই কথা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যাক বোস্টনের কথা। বোস্টনে বড় মাপের লেবানিজ সম্প্রদায় ছিল, তারা তেমন সম্পদশালী না হলেও ব্যাবসায়ী ও দোকানদারদের মাধ্যমে তারা বেশ স্বচ্ছল ছিল।
সাল ১৯৮২। ইসরায়েলিরা লেবানিজদের উপর ভয়াবহ নৃশংস আগ্রাসন চালায়। লেবাননের হতাহত মানুষগুলো জন্য আমাদের অল্প কিছু লোক দাতব্য ত্রাণ সংগ্রহের আয়োজনে লিপ্ত হয়। সেখানকার লেবানিজ সম্প্রদায় থেকে আমরা কোন প্রকার সাপোর্ট পাইনি। অবশ্য তার কারণও আমি বুঝতে পারি। সেই ছোট্ট কাল থেকে এসব দেখে দেখে আমি মানুষ হয়েছি। তারা বেশি একটা প্রকাশিত হতে চায় না, এবং এর কারণটাও বেশ স্পষ্ট। আমি এটা প্রমাণ করতে না পারলেও যে দৃশ্যটা আমার চেখে ভাসে তা শুধু ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকেই না। তবে ১১ সেপ্টেম্বরের পর তার উত্তাপ কিছুটা বেড়েছে তা ঠিক। শুধু আরবরাই না এর অন্ধকারাচ্ছন্নতা সকলেরই গোচরীভূত হওয়ার কথা।
ভাষান্তর: হাবিবুর রহমান রাকিব

টিকাঃ
[৪৫] Christopher Allen & Jorgen S. Nielsen, 2002: 6
[৪৬] Chom¼y, accessed on January 15, 2016
⁸⁹] Noam Chom¼y, 2005:3

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 আরব মুসলিমবিদ্বেষ: নোম চমস্কি

📄 আরব মুসলিমবিদ্বেষ: নোম চমস্কি


ইহুদিবাদের বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, অর্থাৎ যখন আমরা শিশু অবস্থায় বাড়ন্ত ছিলাম আমরা ছিলাম ইহুদি। সে সময়টাতে ইহুদি-বিরোধিতা ছিল খুবই স্বাভাবিক দৃশ্যমান বিষয়। আমার বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, শহরের আইরিশ ও জার্মান ক্যাথলিকদের মাঝে মধ্যবিত্ত এরিয়ার একমাত্র ইহুদি পরিবার হিসেবে আমরা বেড়ে উঠেছি যার সিংহভাগই খোলাখুলি ভাবে নাৎসিপন্থী ছিল। আমি বড় হয়েছি ক্যাথলিকদের ভয়ে ভিতরে ভিতরে আড়ষ্ট হয়ে। যুবক বয়স পর্যন্ত কোন প্রকারেই আমি ক্যাথলিকদের সাথে যে কোন বিষয়ে ভয়-ভীতি মুক্ত হয়ে করতে পারতাম না। যা ছিল নিতান্ত যন্ত্রনাদায়ক। যখন ক্যাথলিকরা জেস্যুট স্কুল ধারণা নিয়ে আসে (ক্যাথলিক পুরোহিতের আদেশ প্রাপ্ত সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত স্কুল)। তাদের আচরণ আরো নিষ্ঠুরতায় ভরে গেল। অধিকন্তু আমার পিতা যখন পুরোনো একটি গাড়ি ক্রয়ে সমর্থ হলো, যাতে আমরা কোন মতে দিন গুজরান করতে পারি (গাঁ বাঁচিয়ে)। যদি তা নিয়ে আমরা কোন পাহাড়ের পাদদেশেও পৌঁছতাম সেখানে গাড়ি পার্ক করতে গেলেও বেশ বেগ পেতে হতো কারণ অধিকাংশ মোটেলে ( আবাসিক হোটেল যা ব্যাক্তিগত যানবাহন নিয়ে ভ্রমণকারীদের পার্কিং সুবিধার জন্য বিশেষায়িত) ইহুদিদের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ছিল। ১৯৫০ এর দিকে যখন আমি হার্ভার্ডে ভর্তি হই, সেখানে ইহুদিবিদ্বেষ এতটা প্রকট ছিল যে পান থেকে চুন খসলেই ইহুদী কাউকে নিধন করা যেন নিমেষের ব্যাপার। প্রথম ধাপের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় নিয়েও সেখানে পল সামুয়েলসন ও রবার্ট উইনারের মতন বহু প্রথম গ্রেডের মানুষজন ইহুদি ধর্মালম্বী হওয়ার কারণে চাকরি জুটাতে পারেনি। হার্ভার্ডকে প্রথম ইহুদি গণিতবিদ নিয়োগ দিতে হয়েছিল তার পান্ডিত্যের প্রমাণ স্বরূপ। ১৯৫৩ সাল, তখন আমি সেখানে উপস্থিত; বিভাগটি ইহুদি বিদ্বেষে পূর্ণ ছিল। আমি বুঝাতে চাচ্ছি, পরিস্থিতির সার্বিক পরিবর্তন ৫০ এর দশকেই হয়েছে অথচ তখনো পর্যন্ত ইহুদি বিদ্বেষ ছিল দিনের আলোর মতন জাজ্বল্যমান আর বাস্তবমুখর। ইহুদি জাতি যদিও যথেষ্ট পদদলিত হয়েছিল, তারা তা লুকিয়েই রাখত দৃশ্যমান করত না কারণ তাদের মাথার উপর ঝুলত খড়ার ঘা/ বিপদ যেন লেগেই থাকত। এ কারণেই হলোকাস্ট (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সরকারের সহায়তায় নাৎসি বাহিনী কর্তৃক ৬০ লাখের বেশি ইহুদি নিধনকে হলোকাস্ট নামে আখ্যা দেয়া হয়।- ব্রিটানিকা সহ্য করলেও ইহুদি শরণার্থীরা কোথাও যেত না। (কারণ তাদের জানা ছিল নতুন জায়গা মানেই নতুন কোন বিপদ।)
ইউরোপের প্রায় সকলে, বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর 'ডিসপ্লেস পারসনস ক্যাম্প' বা ডিপি ক্যাম্পে আবদ্ধ মানুষগুলো যুক্তরাষ্ট্রে জায়গা করে নিয়ে স্বস্তির নিস্বাশ নিতে পারত কিন্তু তারা পারে নাই। ডিপি ক্যাম্পে মরনাপন্ন মানুষগুলো জার্মানরা পরাজিত হওয়ার পরও সেখানে আটকা পড়েছিল। এটা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যকর ছিল না, বরং পরিবর্তনের মধ্যে এটাই ছিল যে সেখানটা সাক্ষাত এক শ্মশানে পরিণত হয়েছিল (মানুষগুলো ক্ষয় হতে হতে)। তাদের হাতে গোনা অল্প কজনই প্রাণ নিয়ে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে পেরেছে। কিছুটা ইহুদি বিদ্বেষ ও কিছুটা ইহুদিরা তাদের তাদের ফিরিয়ে আনতে না চাওয়ায় তাদেরকে সেখান থেকে উত্তরণের কোন কোশেশ করা হয়নি, কারণ ইহুদিরা ইতিমধ্যেই সমস্যায় জর্জরিত, ডিপি ক্যাম্পের ইহুদি এনে সমস্যা তারা ফুসলিয়ে দেয়ার পক্ষে ছিল না।
ইহুদি বিদ্বেষ জাতিগত/বর্ণবৈষম্যের কোন আইনসম্মত ধরণ নয়, অথচ পক্ষপাতমূলক ভাবে আরব বিদ্বেষকে বর্ণবৈষম্যের বৈধ রূপ বা ধরণ বলে গণ্য করা হয়। অর্থায় বর্ণবাদের অধিকাংশ ধরণেই লুকোচুরির প্রয়োজন পড়ে না, তারা বর্ণবাদ না হওয়ার ভান করে থাকে শুধু (কাকের খাবার লুকানোর মত)। অন্যন্যা বর্ণবৈষম্যের ক্ষেত্রে হয়ত একজনকে ইহুদি বিরোধী বা কৃষ্ণাজ্ঞ বিরোধী না হওয়ার ছদ্মবেশে থাকে, প্রকৃত অবস্থার আত্মপ্রকাশ করে না। অথচ আরব বিদ্বেষের ক্ষেত্রে সে ভানটাও করার প্রয়োজন পড়ে না, বরং তারা তা কথায় কাজে বেশ প্রকট ভাবে ফুটিয়ে তোলে ও প্রকাশ করে। ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ এর আগেও এ আরব বিদ্বেষ মানুষেরা বিভিন্ন মুভি, বই-পত্রপত্রিকা এবং আচার-আচরণে প্রত্যক্ষ করেছে, এসব গোপনেও করা হয় নাই। অর্থাৎ কেউই তো এসে বলবে না যে আমি আমি বর্ণবাদী-আরব বিদ্বেষী; সর্বত্র মুসলিম ও আববের নিকটই এটা ওপেন সিক্রেট। আর এখন ১১ সেপ্টেম্বরের পর এমন আচরণ প্রদর্শণ তো তুঙ্গে উঠারই কথা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যাক বোস্টনের কথা। বোস্টনে বড় মাপের লেবানিজ সম্প্রদায় ছিল, তারা তেমন সম্পদশালী না হলেও ব্যাবসায়ী ও দোকানদারদের মাধ্যমে তারা বেশ স্বচ্ছল ছিল।
সাল ১৯৮২। ইসরায়েলিরা লেবানিজদের উপর ভয়াবহ নৃশংস আগ্রাসন চালায়। লেবাননের হতাহত মানুষগুলো জন্য আমাদের অল্প কিছু লোক দাতব্য ত্রাণ সংগ্রহের আয়োজনে লিপ্ত হয়। সেখানকার লেবানিজ সম্প্রদায় থেকে আমরা কোন প্রকার সাপোর্ট পাইনি। অবশ্য তার কারণও আমি বুঝতে পারি। সেই ছোট্ট কাল থেকে এসব দেখে দেখে আমি মানুষ হয়েছি। তারা বেশি একটা প্রকাশিত হতে চায় না, এবং এর কারণটাও বেশ স্পষ্ট। আমি এটা প্রমাণ করতে না পারলেও যে দৃশ্যটা আমার চেখে ভাসে তা শুধু ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকেই না। তবে ১১ সেপ্টেম্বরের পর তার উত্তাপ কিছুটা বেড়েছে তা ঠিক। শুধু আরবরাই না এর অন্ধকারাচ্ছন্নতা সকলেরই গোচরীভূত হওয়ার কথা।
ভাষান্তর: হাবিবুর রহমান রাকিব

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00