📄 হিজাব নিয়ে পশ্চিমা গপ্পো
সোশ্যাল মিডিয়ায় মাঝে মাঝে আধুনিকতাবাদী এজেন্টদের (পশ্চিমা) কাছ থেকে ওয়েস্টার্ন কাপড় পরে হেটে যাওয়া অতীতকালের মুসলিম দেশের নারীদের ছবি দেখতে পাওয়া যায়। এই প্রচারণায় ইরান ও আফগানি নারীদের তারা লক্ষ্যবস্তু বানায়। আধুনিকতার মশালবাহীরা ওয়েস্টার্ন পোষাক পরা নারীদের ছবি প্রচার করে বলে বেড়ায়, “এরা আগে কী ছিল, আর এখন কী হয়েছে!” আর কেউ কেউ মাথা নেড়ে বলেন, তাই তো! তাই তো!
এখানে একটা বড় ধোকাবাজি রয়েছে। ১৯২৪ সালের ইরানের শাসক ছিলেন সেক্যুলার রেজা শাহ। তবে তিনি কোনো গণতান্ত্রিক নেতা ছিলেন না। তিনি সেখানে ধর্ম পালনে অত্যধিক কড়াকড়ি জারি করছিলেন। হিজাব, বোরকা, দাঁড়ি রাখা সব বে-আইনি। ধর্মীয় উৎসব পালনে বিধিনিষেধ। কিন্তু তিনি ধীরে ধীরে কঠোরতর হতে থাকলে ইংল্যান্ড-সোভিয়েত তাকে নির্বাসনে দেয়। এরপর, তিনি ১৯৪৪ সালে গত হন।
১৯৪১ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত ইরানে ডেমোক্রেটিক সেক্যুলারিজম ছিল। ১৯৫১ সালে মোসাদ্দদেগ ছিলেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। সেক্যুলার হলেও ছিলেন উপনিবেশবিরোধী মানুষ। নিজের দেশের ভালো-মন্দ বুঝতেন। ঐতিহাসিক এরভান্ড আব্রাহামিয়ান তার The Coup: 1953, the CIA and the Roots of Modern US-Iranian Relations বইতে লিখেছেন, মোসাদ্দেগ এমন উপনিবেশবিরোধীএকজন মানুষ ছিলেন, যিনি গনতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে আপোসহীন ছিলেন।
১৯১৩ থেকে ইরানের সব তেল ইন্ড্রাস্ট্রি ছিল এংলো-পারসিয়ান অয়েল কোম্পানির অধীনে। ইউরোপ থেকে আইনে পিইচডি করা মোসাদ্দেকের সরকার তল বানিজ্যের জাতীয়করণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই ঘটনায় ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো। সেই ক্ষতি বজ্রদন্ডের সাহায্যে স্বহস্তে ফেলেছিলেন অলিম্পাসের দেবতা জিউস। তেল রক্ষার্থে ব্রিটিশ সিক্রেট ইন্টিলিজেন্স সার্ভিস (ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের দল) আমেরিকান গোয়েন্দাদের দল সিআইএকে বলল, চলো আমরা একসাথে কাজ করি। শুরু হলো
সামরিক অভ্যুত্থান। সিআইএ মোসাদ্দেগকে সেনাবাহিনী দ্বারা উৎখাতের নাম দিল 'অপারেশন এজাক্স'। মোসাদ্দেগকে গ্রেফতার করে তিন বছরের জেল দেয়া হল। তারপর রাখা হল নিজগৃহে নজরবন্দী অবস্থায়। জনগণের একটা সমর্থন ছিল তার প্রতি। তাই তিনি মারা গেলে তার বাড়িতেই নিরবে দাফন করা হয় বিপ্লবের আশংকায়। মোসাদ্দেগকে সরানোর পর ইরানে আমেরিকান পেট্রোলিয়াম কোম্পানিগুলো কাজ শুরু করে। ফ্রান্স এবং ডাচ পেট্রোলিয়াম কোম্পানিও কাজ শুরু করে।
এরপর রেজা শাহের পুত্র রেজা শাহ পহলবী রাজা হিসেবে শাসন করতে লাগলেন। দেশের সম্পদ বিদেশীরা নিয়ে যাবে এমন ইচ্ছা তারও ছিল না। তিনি তেল বানিজ্যের জাতীয়করণের ক্ষেত্রে মোসাদ্দেকের মতকে সমর্থনই করতেন। তবে পশ্চিমের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস পাননি তিনি। হয়ে গেলেন একজন একনায়ক, সেক্যুলার। পোস্ট রেভ্যুলোশনারী ফ্রান্স এবং ক্লাসিক্যাল আমেরিকান রাজনৈতিক চিন্তা থেকে ধর্ম এবং রাষ্ট্রকে আলাদা করার চিন্তা তার মাথায় ছিল।
দেশে স্বৈরশাসক। এর মাঝে মুসলিম দেশ। যে দেশের শক্ত ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে। সেসব ভুলে গিয়ে তিনি ভীনদেশের তরিকামতো আগানো শুরু করলেন। যার ফলাফল হিসেবে মাথা তুলতে শুরু করল সে দেশের ইসলামি দলগুলো। দেশে দূর্নীতি হলে, মানবাধিকার লংঘিত হলে সাধারণ মানুষ কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারে। অসহ্য পর্যায়ে চলে গেলে যেকোন আদর্শের ছায়াতলে গিয়ে তাদের বিদ্রোহ করার সম্ভাবনা থাকে। মানুষ বিদ্রোহী হলো। শাহ এই বিদ্রোহের উত্থানের নেপথ্যনায়ক হিসেবে ব্রিটিশদের দায়ী করতে লাগলেন। ব্রিটিশদের সাথে সম্পর্ক খারাপ করে তিনি আমেরিকা ও ফ্রান্সের সাথে জোট গঠন করলেন। কিন্তু ইসলামি জনশক্তির বিজয় ঠেকানো সম্ভব হলো না।
১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে হল বিপ্লব। যাকে বলা হয় ইরানি বিপ্লব। শাহের পতন ঘটে। ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র হয়। ইরানের রাজতন্ত্র বিলোপ করা হয়। শাহকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে আসলে কী জানা গেল? মোসাদ্দেক, শাহ বা ইরানের কথা। তবে আলোচ্য বিষয়বস্তু হলো স্কার্ট পরা আধুনিক নারীরা। এই ইতিহাসের সাথে একটু যুক্ত করলেই সেটা বুঝে আসবে। তৎকালীন রেজা শাহ পুলিশদের নির্দেশ দিয়েছিলেন হিজাব পরে বের হলে বা মাথায় কাপড় দিলে পুলিশ যেন জোর করে তা খুলে ফেলে। এটাই হলো ওইসব ছবির মূল ইতিহাস। এইসব অতীতের ছবি দিয়ে এবং তার বিপরীতে বোরকা পরা মেয়েদের ছবি দেখিয়ে ভয়ের পলিটিক্স করা হয়। বুঝানো হয় যে আগে সেখানে মহিলাদের অধিকার ছিল আর এখন কিছুই নাই। এর মাঝে এমন কিছু ইঙ্গিত থাকে যা আধুনিক মানবতাবাদীর মনে ভয়ের উদ্রেক করে। এবং জাগিয়ে তুলে ইসলামোফোবিয়া।
আমাদের দেশেও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মেয়েদের প্রতিবাদের ছবি দেখিয়ে বলা হয়, দেখুন আগে কোন মেয়েদের মাথায় কাপড় ছিল না। কিন্তু এখন ভার্সিটিতে কত হিজাবী মেয়ে দেখা যায়। যারা এসব বলেন তারা বুঝাতে চান যে, দেশে ব্যাপক হারে ইসলামাইজেশন বা মৌলবাদী ইসলামাইজেশন হচ্ছে। সেই একই ভয়ের রাজনীতির চেষ্টা। কিন্তু এই কথার ফাঁকটা হল, ১৯৫২ সালে কতজন রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেত, এখন কতজন পড়ে সেই সংখ্যার তারতম্য। আগে রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়েরা কম যেত বিদ্যালয়ে, এখন অনেক বেশী যাচ্ছে। বর্তমানে ১৯৫২ সালের থেকে অনেক অনেক বেশি কনজারভেটিভ ফ্যামিলির মেয়েরা বিদ্যালয়ে পড়ছেন। সেই অনুপাতে দেখা যাচ্ছে হিজাবের সংখ্যাবৃদ্ধি। এইসব ছবি নিয়ে যারা খেলতে আসেন তাদের ঘরের মেয়েরাও এখন বোরকা পরা শুরু করেছে, এমন খবর আমরা সংবাদমাধ্যমেও দেখতে পাই অহরহ।
📄 ‘ওয়ার অন টেরর’: সন্ত্রাস দমনের নামে মুসলিমনিধন প্রকল্প
চলতি শতকের শুরুর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (ওয়ার অন টেরর) ঘোষণা করে, কি এক অলৌকিক কারণে এই যুদ্ধটা মুসলিম জাতির বিরুদ্ধেই সমাধিক খ্যাতি পেয়ে যায়। পশ্চিমা মোড়লরা 'ওয়ার অন টেরর'র নামে মুসলিম বিশ্বকে সামরিকভাবে যুদ্ধের বেশে ধ্বংস করতো, তা এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় করে দিয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়াই অমুসলিমরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে সামরিক ঢঙ্গে মুসলিমকে মারা শুরু করেছে, ইসলাম আর সংখ্যালঘুদের ওপর যেখানে সেখানে আক্রমণ করছে।
বিশ্বে পশ্চিমা শিক্ষিত পণ্ডিতদের প্রচারিত বিচিত্র সমাজের ধারণা যে অকার্যকর হয়ে পড়েছে, তা দাতব্য সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। সেখানে বলা হয়েছে, নিজেদের সঠিক প্রমাণ করতে শেতাঙ্গ ধর্মান্ধরা এখন হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। আমরা কেবল শোক প্রকাশ করে পরবর্তী নারকীয়তার জন্যে অপেক্ষা করে থাকতে পারি না। সন্ত্রাসী বেন্টন নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে যে নৃশংসতার সৃষ্টি করেছে তা বিশ্বে ভয়াবহ এক পরিণতির চূড়ান্ত সতর্কতা মাত্র। 'স্পষ্টত, এটা শুধু পশ্চিমা সমাজের ব্যাপার নয়। অনেক মুসলিমই ক্রাইস্টচার্চকে বিশ্বে বিপজ্জনক সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠিত ক্রমবর্ধমান ইসলামোফোবিয়ার ক্ষুদ্র একটা অংশ হিসেবেই দেখছে।'
এভাবেই আজকের ক্রাইস্টচার্চের বীজ বপন হয়েছিল পেন্টাগনের গোপন কোনো কক্ষে, আধুনিক বিশ্বের মোড়লদের চকচকে হাতে। ইসলামবিদ্বেষ, সদা চামড়াই শ্রেষ্ঠ, এই শিল্পকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যার ফলে কিছু মুর্খ বর্বর শিকারির হাতে পাখির মতো প্রাণ হারাতে হয়েছে ক্রাইস্টচার্চের দুই মসজিদে প্রার্থনারত অর্ধশত মুসলিমকে। এভাবেই বুলেটভর্তি রাইফেল নিয়ে পশ্চিমের অনেক ঘরেই তৈরি হচ্ছে নব্যক্রুসেড। মানুষের মধ্যে যে অসভ্য উগ্রতা শায়িত থাকে, বর্ণবাদের যে ধারণা শৈশব থেকে মানুষকে পণ্যের ন্যায় চিহ্নিত করতে শেখায়, সেই উগ্রতাকে উসকে দিতে ইসলামোফোবিয়া খুবই কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে পশ্চিমা শেতাঙ্গ অভিজাত শ্রেণির কাছে।
এরকম শত ঘটনার মধ্যে আরেকটি ঘটনা হলো, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখ আনুমানিক দুপুর ২টার দিকে ১৯ বছর বয়সি একজন বন্দুকধারী ফ্লোরিডার মারজোরি স্টোনম্যান ডগলাস হাই স্কুলে তার সাবেক শিক্ষক এবং সহপাঠীদের ওপর গুলি বর্ষণ শুরু করে। এতে ১৭ জন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ গুরুতর আহত হয়। এ পর্যন্ত মার্কিন স্কুল ক্যাম্পাসে এটি ১৮তম হামলার ঘটনা এবং এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটলেও, ভয়াবহ বন্দুক হামলার মধ্যে এটি নবমতম স্থানে ওঠে এসেছে। পরের দিন সকাল ৬ টায় কর্তৃপক্ষ বন্দুকধারীকে নিকোলাস ক্রুজ নামে চিহ্নিত করে এবং ১৭ জনের খুনের মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়। যদিও এই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য এখনো জানা যায়নি। তবে, হত্যাকারীর মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইল ইতোমধ্যে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে এবং তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খুবই সাধারণ একটি বিষয়।
কিলার এমন ঘটনা ঘটাতে পারে সে সম্পর্কে পূর্ব থেকেই অনেক জল্পনা ছিল। সেখানে সতর্কবার্তা ছিল। ফ্লোরিডা টেলিভিশন স্টেশনকে একজন শিক্ষার্থী বলেন, 'অনেক লোক বলছিল যে, সে ক্রুজ এমন একটি ঘটনা ঘটাতে যাচ্ছে। ঘটনাটি অনেকের পূর্বাভাসকে সত্যে পরিণত করেছে। এটা সত্যিই ক্রেজি।' ক্রুজ যে এই ধরনের নিষ্ঠুরতা চালাতে সক্ষম- সে সম্পর্কে তারা কীভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পেরেছিল, ছাত্রটি তা বলেনি। তবে তাদের ভবিষ্যদ্বাণীর কারণগুলো সম্ভবত হতে পারে যে, ক্রুজকে ক্রমাগতভাবে স্কুলটি থেকে বরখাস্ত করা হচ্ছিল এবং অবশেষে তাকে সেখান থেকে বহিষ্কৃত করা হয়। এটি সম্ভবত বন্দুক ও ছুরির প্রতি তার আগ্রহ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার পোস্ট এবং মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা পোষণের কারণে স্কুল কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নেয়। ছাত্রটি বলেছিল, 'সামাজিক মাধ্যমে তার পোস্ট করা সব কিছুই ছিল অস্ত্র সম্পর্কিত। এটা তার অসুস্থতা প্রকাশ করে।' আরেকজন ছাত্র ক্রুজ সম্পর্কে জানায় যে, 'সে প্রায়ই ট্রাম্প ক্যাপ পরতো এবং ইসলাম সম্পর্কে ঘৃণাসূচক লেখা সম্বলিত অতি-দেশপ্রেমিক টি-শার্ট পরতো। এছাড়াও, মুসলিমদের সন্ত্রাসী ও বোমাবাজ হিসেবে উপহাস করার জন্যও ক্রুজ পরিচিত ছিল।'
এই ঘটনার পর ফ্লোরিডার রিপাবলিক প্রতিনিধি ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী গ্রুপের নেতা- যার লক্ষ্য হলো ফ্লারিডাকে শুধুই শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত রাজ্য বানানো। তিনি বলেন, ক্রুজ তাদের আধা-সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছিল এবং সে তাদের একজন সদস্যে পরিণত হয়েছিল এবং হামলায় ব্যবহৃত তার কেনা 'এআর-১৫' রাইফেলটি তাদের গ্রুপটি থেকে কেনা হয়েছিল বলে ছাত্রটি স্বীকার করে।
আমেরিকার উচ্চ শক্তিধর অস্ত্রের জন্য বিকৃত লালসা মুসলিম ঘৃণার পিছনে কাজ করছে এবং ক্ষমতাশালী ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন (এনআরএ) দেশটির ৩.৫ মিলিয়ন আমেরিকান মুসলমানদের প্রতি ক্রমবর্ধমানভাবে বিদ্বেষকে উসকে দিচ্ছে। এনআরএ -এর ২০১৫ জাতীয় বার্ষিক সম্মেলনের একটি সেশনে সদস্যদেরকে কিছু নিদের্শনা দেয়া হয়েছিল। এরমধ্যে ছিল-ইসলামিক চরমপন্থিরা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ও ইসলামিক আইন প্রণয়ন করে, সেক্ষেত্রে সদস্যরা কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে, সেইসব নির্দেশনা। এটিকে আমেরিকান বন্দুক মালিকদের জন্য প্রকৃত হুমকি বলে অভিহিত করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক শ্রোতাদের জানান যে, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন এলাকায় ছিলেন যেখানে কেবল মুসলিমদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, এটি এমন এলাকা যেখানে পুলিশও প্রবেশ করতে অস্বীকার করে। তিনি উপস্থিত সদস্যদের উদ্দেশ্য বলেছিলেন, 'রাস্তার চিহ্নগুলো রাতারাতি ইংরেজি থেকে আরবিতে রুপান্তরিত হয়ে যায়। কোনো দোকান বা রাস্তার কোনো চিহ্নে একটি ইংরেজি শব্দও ছিল না। এটা আমি আমার নিজের চোখে দেখেছি এবং এটিই বাস্তব।'
পরে ডানপন্থী 'ফক্স নিউজ' সহ মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে স্বীকার করা হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট এলাকায় শুধু ধর্মের ওপর ভিত্তি করে ব্যক্তিরা থাকেন- এমন বিবৃতিকে সমর্থন করার বিশ্বাসযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু আসল সত্য উৎঘাটন হোক বা না হোক, এই মুসলিম-বিরোধী ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো কেবল সত্য হিসাবেই গ্রহণ করাই হয়নি, বরং এটি মিডিয়ার মাধ্যমেও অতিরঞ্জিত করে তোলা হয়। যারা মুসলমানদের সম্পর্কে ভয়, ঘৃণা ও সন্দেহের গুজব ছড়ায়, এটি ছিল তাদের জন্য এক ধরনের পুরস্কার।
আমেরিকান মানবাধিকার গ্রুপ 'হেইট হার্টস'- এর প্রতিষ্ঠাতা ইমরান সিদ্দিকী বলেন, 'যদিও এই বিষয়ে খুব সামান্যই কভারেজ রয়েছে। এটা খুব কমই বিস্ময়কর যে, বেশির ভাগ মুসলিমবিরোধী রাজ্যগুলোতে ব্যাপক মিলিশিয়া কার্যকলাপ এবং অনিয়ন্ত্রিত বন্দুকসংস্কৃতি বিরাজ করছে। বন্দুক-সংস্কৃতি ও ইসলামোফোবিয়ার মধ্যে যে অন্তচ্ছেদ রয়েছে তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে আমরা ফিনিক্স, অ্যারিজোনার সশস্ত্র মসজিদ প্রতিরক্ষাকে ফিরে দেখতে পারি। মিলিশিয়া সদস্যরা মসজিদের বাইরে এরআর-১৫ এবং অন্যান্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।' ইমরান সিদ্দিকী বলেন, 'এই ধরনের পদক্ষেপসমূহ টেক্সাস, সাউথ ডাকোটা, ক্যানসাসের মতো জায়গায় বিদ্যমান রয়েছে। এটা ভুলে যাওয়ার নয় যে, ট্রাম্পের সমর্থক শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের মিলিশিয়া গ্রুপটি ২০১৬ সালে সোমালি সম্প্রদায়ের ওপর বোমা-হামলার চেষ্টা করেছিল।'
একজন সুপরিচিত আমেরিকান মুসলিম বক্তা ও ইয়াকিন ইনস্টিটিউট ফর ইসলামি রিসার্চের প্রেসিডেন্ট ওমর সুলায়মান এক সাক্ষাতকারে বলেন, 'সশস্ত্র সদস্যরা মুখোশের আড়ালে শুয়োরের রক্তে তাদের বুলেট ডুবিয়ে দিচ্ছে। এটি এই প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা একদিন আমাদের সব মুসলমানদের গুলি করতে যাচ্ছে।' যে শেষ পর্যন্ত আমরা ক্রুজের এই নিষ্ঠুর সহিংস আচরণের একটি পরিষ্কার ধারণা পাব বলে আশা করছি। এটি লক্ষণীয় যে, শ্বেতাঙ্গ মিলিশিয়াদের হাতে হত্যার সংখ্যা ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। 'এন্টি ডিফ্যামেশন লীগ'-এর একটি প্রতিবেদনে এই তথ্য ওঠে এসেছে। বন্দুকের সহজলভ্যতা ঘৃণা অপরাধকে বৃদ্ধি করেছে। এই সহজলভ্যতা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে নিজেদের ঘরের লোকের খবর নেই এইসব মোড়লদের। আজোভ ব্যাটালিয়ন ট্রান্সন্যাশনাল রাইট উইং ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিস্ট (আরডব্লিউএইচ) নামটা শুনেছেন নিশ্চয়? এটি শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বেড়ে উঠছে। এই গোষ্ঠীটি নিজস্ব 'ওয়েস্টার্ন আউটরিচ অফিস' পরিচালনা করে, যা বিশ্বব্যাপী এমন সহিংস ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে হিংস্র সংস্থার লোকদের আকর্ষণ করতে সহায়তা করে এবং এদের প্রশিক্ষণের জন্যে বিদেশি যোদ্ধাদের নিয়োগদান করে। আউটরিচ অফিসের অপারেটররা সংগঠনটিকে প্রচার করার জন্য এবং সাদা আধিপত্যবাদী মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে সমগ্র ইউরোপ ভ্রমণ করে। ২০১৮ সালের জুলাইতে, জার্মানির থুরিঙ্গা প্রদেশে ডানপন্থি এক রক উৎসবে জার্মান ভাষায় লেখা আজোভ ব্যাটালিয়নে যুক্ত হতে আমন্ত্রণপত্র বিলানো হয়। আমন্ত্রণপত্রে 'বিলুপ্তি থেকে ইউরোপকে রক্ষার জন্য' এবং 'সেরাদের দলে যোগদান করতে' আহ্বান জানানো হয়েছিল।
এমন ঘটনা মানুষ জানেও না তেমন, পশ্চিমা মিডিয়ায় জানানো হয়নি এসব, অথচ মুষ্টিমেয় কতক মুসলিম একই কাজ করলে প্রভাবশালী মিডিয়াগুলো চাউর করে সংবাদ প্রকাশ করতো। তার মানে এই নয় যে, উগ্রবাদ ভালো। উগ্রবাদ ক্ষতিকর তা সব ধর্মের জন্যেই একইভাবে সত্য। তবে, মুসলিমদের যেকোনো ক্ষুদ্র সহিংসতাকেও যতো সহজে জঙ্গিবাদের তত্ত্বে ফেলা যায়, অমুসলিমদের এমন নারকীয় কাণ্ডেও তাদের সন্ত্রাসী বলতে বিশ্বমিডিয়ার অনীহা দেখা যায়। বর্ণ, ধর্ম আর শ্রেণিভেদের পক্ষপাতে মানবতাকে গলা টিপে হত্যা করতেও বাধে না সুশীল-সমাজের এই প্রতিনিধিদের।
ওয়ার অন টেররের মাধ্যমে বিশ্বে ইসলামোফোবিয়ার যে নেতিবাচক জনপ্রিয়তা অর্জিত হয়েছে, তা অচিরেই নির্মূল করতে সমাজ থেকে বৈষম্য মুছে ফেলতে হবে। গুটিকতক মানুষের স্বার্থ হাসিলে, বিশ্বের অমুসলিমরা এমন ইসলামঘৃণার তত্ত্বকে আয়ত্ত্ব করতে থাকলে, তা অচিরেই সবকিছু ধ্বংস করে দিবে। বৈষম্যকে কখনই যেখানে স্থান দেয়া উচিৎ নয়। সন্ত্রাসের কোন ধর্ম থাকে না।
📄 ইসলামোফোবিয়া ও শরণার্থী সংকট
দ্বিতীয় যুদ্ধের পর ইউরোপ আজ সবচে বড়ো শরণার্থী সংকটে ভুগছে। রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থের জন্য পাশ্চাত্যের ডানপন্থি এমনকি মধ্যপন্থিরাও ইসলামোফোবিয়াকে ব্যবহার করছেন। আজকের এই শরণার্থী সংকট তো ইউরোপ দখল কিংবা ইউরোপের ওপর কর্তৃত্ব করার জন্য নয়। বরং সন্ত্রাস ও গৃহযুদ্ধে বাস্তচ্যুত বিভিন্ন ধর্মমতের মানুষ জীবন বাঁচানোর তাগিদে ইউরোপমুখী হয়েছে। আশ্রয় চেয়েছে থাকার। তারা চায় শান্তিতে ও নিরাপত্তার সাথে জীবন কাটাতে। একই সাথে এটা ইউরোপের ভেতরকার সংকটকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে; তাদের দুয়ারে এসে করাঘাতকারী শরণার্থীদের সাথে কী আচরণ করেছে তারা। অথচ তারা ইউরোপকে বহুজাতিক মহাদেশ বলে বুলি আওড়ায় এবং একে তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরে।
এদিকে শরণার্থী ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশ একটি অভিন্ন কৌশলে অগ্রসর হয়েছে। প্রতিটি দেশ স্বতন্ত্রভাবে শরণার্থী সংকট মোকাবিলা করছে। কোন যৌথ কর্মকৌশল ব্যতীত ইউরোপীয় শরণার্থী সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়। শরণার্থী-সঙ্কট মোকাবিলায় অভিন্ন কৌশল না থাকায় ইউরোপীয় নাগরিকদের জন্য সব দেশে ভিসামুক্ত অবাধ চলাচলের 'শানগান' চুক্তিও প্রায় হুমকির মুখে। এভাবে বর্তমান শরণার্থী সঙ্কট ইউরোপের জন্য একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ এনে দিয়েছে; তারা কি তাদের পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে না কি ফিরে যাবে পেছনে? সাধারণত পূর্ব ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ আফগান, ইরান, সিরিয়া ও ইরাক থেকে আসা শরণার্থীদের প্রথম টার্গেটে থাকে। এসব দেশ থেকে তারা জার্মানিতে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ কারণে ইউরোপের সীমান্তবর্তী দেশগুলো শরণার্থী ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে মুসলিমদের সংখ্যা বেশ কম। যেমন- ফ্রান্সে মোট নাগরিকের দশ ভাগ হলো মুসলিম। অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, জার্মান ও সুইডেনে শতকরা প্রায় ছয় ভাগ মানুষ মুসলিম। যদিও পশ্চিম ইউরোপের বুলগেরিয়া ও গ্রিসের মতো দেশগুলোতে মুসলিম নাগরিকদের কমিউনিটি আছে। অন্যদিকে ইউরোপের পূর্ব দেশগুলোতে তুলনামূলক মুসলিম কম। অনেক ক্ষেত্রে তো এক শতাংশ।
স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো ৩৩১ জন আশ্রয়প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১৪ জনকে তার দেশে আশ্রয় দিয়েছেন। রবার্ট ফিকো বলেন, খ্রিস্টান শরণার্থীদের আগমণে স্লোভাকিয়ার স্থানীয় মানুষদের মধ্যে কোনো ভীতি কাজ করে না। অথচ স্লোভাকিয়ায় মুসলিমদের সংখ্যা দেশের মাত্র .০২ শতাংশ। ফিকোর ওপর ডানপন্থিরা যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করার কারণে ফিকো ইউরোপের ইসলামাইজেশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন। তাছাড়া চেক প্রজাতন্ত্রের মুসলিমবিরোধী বিভিন্ন দল মুসলিম শরণার্থী প্রবেশের বিরুদ্ধে আনা এক দরখাস্তে ১,৪৫,০০০ ব্যক্তির সই সংগ্রহ করে। কিন্তু চেক প্রধানমন্ত্রী মানবাধিকার রক্ষার পরিবর্তে আগত মুসলিম শরণার্থীদের বিষয়ে বলেন, 'শরণার্থীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যাকগ্রাউন্ডের। তারা চেক প্রজাতন্ত্রে কিছুতেই ভালো অবস্থায় থাকতে পারবে না।'
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদ ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতারা শরণার্থীদের সাথে সন্ত্রাসের আশঙ্কার কথা জুড়ে দেয়া শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তারা সিরীয় শরণার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সিরীয় শরণার্থীদের প্রবেশের সুযোগে সন্ত্রাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারে। তাই সিরীয় শরণার্থী প্রবেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নির্বাচনি প্রচারণায় সিরীয় শরণার্থীদের তথ্য পর্যালোচনা-পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন মসজিদ-নজরাদি করার আহ্বান জানান।
ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক আশান শারু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু আগে ইহুদি শরণার্থীরা যে সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, তার সাথে বর্তমান মুসলিমদের প্রতি পাশ্চাত্যের এই দৃষ্টিভঙ্গির তুলনা করেন। ইহুদিদের প্রতি যখন ফ্যাসিস্ট হিটলার বিভিন্ন উত্তেজনাকর বক্তব্য দিচ্ছিল এবং তাদের ওপর নিপীড়িত হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর জনগণ জার্মান ইহুদিদের বিষয়ে খুব একটা গুরুত্ব দেখায়নি। শারু বরং বলেন, 'পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো ইহুদিদের প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল। তারা ঔদ্ধত্যমূলকভাবে অনেক সময় এমন করতো। যেমন, যেসব সেক্টরে শ্রমিকের প্রয়োজন হতো, পশ্চিম ইউরোপ নিজেদের উন্নাসিকতার জন্য অন্যদের প্রবেশের সুযোগ দিতো না।
মোটকথা, আজকের শরণার্থীদের প্রতি ইউরোপের এই ভীতিচর্চাকে গত শতাব্দীর ত্রিশ শতকের এন্টিসেমিটিজমের মধ্যে পাওয়া যায়। বর্তমান কিছু সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইসলামোফোবিয়াকে 'সামি' বিদ্বেষের গোপন পরিকল্পনার অংশ বলে মনে করেন। ইসলামবিরোধী বিভিন্ন ইলেকট্রিক পেইজে দৃষ্টি দিলেই বোঝা যায়, শরণার্থী আলোচনায় মানেই মুসলিমবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করা। পেজগুলোতে বর্ণবাদের বিষাক্ত ঘৃণা দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে। 'হাঙ্গেরির বর্ডার পার হওয়ার সময় কিছু মুসলিম আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিচ্ছে' একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। হাঙ্গেরির ডানপন্থি রাজনৈতিক কর্মী পামেলা এই ভিডিওর ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, 'এটা ইউরোপের ওপর যুদ্ধঘোষণা করার শামিল। আল্লাহু আকবর আওয়াজকারীদের আগ্রাসী যোদ্ধাও অভিহিত করে বলেন, এদের তো ইউরোপের আসার প্রকৃত কোনো প্রয়োজন নেই।' তিনি গণমাধ্যমকে অভিবাসীদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'আমরা প্রকৃত শরণার্থীদের বিষয়ে কথা বলছি না। কিন্তু ইরাক, আফগানিস্তান ও সিরিয়ার উত্তপ্ত জিহাদের পয়েন্ট থেকে আসা মুসলিমদের নিয়ে আমাদের আপত্তি। যারা মূলত ইউরোপে জিহাদের জন্য হিজরত করছে।' পামেলার মতে, ধনী রাষ্ট্রগুলো তো পৃথিবীর অর্ধেক মানুষকে অর্থায়ন করতে পারে না।
ইসলামোফোবিয়ায় আক্রান্ত বিভিন্ন গণমাধ্যম ইউরোপে মুসলিমদের এই আগমনকে 'সন্ত্রাসের হিজরত' বলে অভিহিত করেন। পামেলা গেলার বলেন, 'গণমাধ্যম সবসময় আমাদের এটা বিশ্বাস করতে বলে, আপনি যদি আপনার দেশে এদের প্রবেশে অনুমতি না দেন তবে আপনি নির্দয়, গোঁড়া, বর্ণবাদী ও ঘৃণিত।'
ইসলামবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য ও কার্যক্রমের পাশাপাশি শরণার্থী বিষয়ে ইউরোপীয় আলোচনায় একজন স্বাভাবিক পর্যবেক্ষকের নিকটে স্পষ্ট হবে, ইসলামবিরোধী এসব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি এখন ইউরোপের পরিমণ্ডলে খুবই স্বাভাবিক বিষয়।
ইসলামবিরোধী অন্য একটি ইলেকট্রিক পেজে বলা হয়, 'অভিবাসী মুসলিমরা সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা থেকে সুবিধা নেয়ার জন্য একাধিক বিবাহ করার পরিকল্পনা করে।' জার্মানিতে সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার অঝকহিসেবে নারীরা নিজের এবং সন্তানদের জন্য আলাদা বাড়িতে থাকার জন্য অর্থ চাইতে পারে। এক্ষেত্রে নারীদের দেখাতে হয়, তাদের সাথে শুধু সন্তানই আছে, স্বামী নয়।'
তাছাড়া অভিবাসনের ফলে নাগরিকদের ডেমোক্রাফিক পরিবর্তন দেখা দেবে। মুসলিমদের সংখ্যা ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পাবে।
কিছু কিছু পেজ তো এমন কথাও প্রচার করে, 'জার্মানজুড়ে ইসলামি শরিয়াহ বাস্তবায়নের পথ দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে কিছু করতে অক্ষম।' এটা উগ্র ডানপন্থিদের প্রচারণা। ধীরে ধীরে এটা অনেক ট্রাডিশনাল রাজনীতিবিদদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করে।
খ্রিস্টানদের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত দুর্বলতা
২০১৩ সালে ইউরোপের বর্তমানের শরণার্থী সংকট শুরু হওয়ার আগেই অস্ট্রিয়ার ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল সিন্ডলিগার ঘোষণা করেছিলেন, তিনি সিরিয়া থেকে পাঁচ শতাধিক শরণার্থীকে স্বাগত জানাবেন। তবে নারী, পুরুষ এবং খ্রিস্টানদের অগ্রাধিকার দিতে চান তিনি। অস্ট্রিয়ার রেড ক্রিসেন্টের প্রধান বেশ অবাক হয়েই প্রশ্ন করলেন, বিষাক্ত গ্যাস কি খ্রিস্টানদের অধিক যন্ত্রণা দেয় অন্য ধর্মাবলম্বীদের থেকে? জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সর্বোচ্চ পরিষদ এই বক্তব্যেরবিরোধিতা করা সত্ত্বেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্য ও কর্মপন্থায় অবিচল ও অটল থাকেন। এমনকি তার দলের সহকর্মী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাওয়ানা মাইকেল বলেন, 'খ্রিস্টানরা যে বিপদের মুখে এটা অনেকে না জানার চেষ্টা করে। একইভাবে কিছু সাংবাদিক মন্ত্রীর বক্তব্যের সমর্থনে বলেন, প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধের সময়ের ক্যাথলিক গির্জার ভূমিকাটি বর্তমান ভ্যাটিক্যান কর্তৃপক্ষ পালন করছে। আজ ভ্যাটিক্যানকে পবিত্র ভূমির খ্রিস্টানদের সাহায্য করা ও রক্ষা করতে হবে।
মাইকেলের বক্তব্য অনুসারে সিরিয়ায় অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে খ্রিস্টানরা সবচে বেশি নির্যাতিত। অস্ট্রিয়ার একটি গণমাধ্যম শরণার্থীদের গ্রহণের বিষয়ে একটি শিরোনাম দিয়েছিল, 'সিরীয় শরণার্থী জনতা পার্টি চায় খ্রিস্টান; ডেমোক্র্যাটিক পার্টি চায় সবাইকে; ডানপন্থি ফ্রিডম চায় না কাউকে।' সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ ও আইসিসের তাণ্ডব শুরু হওয়ার আগেই পশ্চিমে শরণার্থী গ্রহণ বিষয়ে এই দৃষ্টিভঙ্গি চলছিল। আর গৃহযুদ্ধ ও আইসিসের তাণ্ডবের পর তো ইউরোপে শরণার্থীর ঢল নামে। মাইকেলের এ বক্তব্যের মাধ্যমে ২০১৫ সালে শরণার্থী ঢলের সময় ইউরোপের কিছু দেশের প্রক্রিয়া কী হতে পারে তা অনুমেয়।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর সবচে বড়ো শরণার্থী সংকট
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন জানায়, ২০১৫ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংকটের কারণে ৪ মিলিয়নের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সিরীয় মানুষ শরণার্থী হয়েছে। ইতোপূর্বে ইউরোপ শরণার্থী নিয়ে এতটা সংকটে পড়েনি। তদুপরি পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের কিছু রাজনীতিবিদ এবং সর্বাধিক ধনী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা ধর্মকেন্দ্রিক শরণার্থীদের সাথে বৈষম্য করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্ববৃহৎ এই শরণার্থী সঙ্কটে ইউরোপের যৌক্তিক সহযোগিতা করা উচিত ছিল। অথচ সহযোগিতার পরিবর্তে কীভাবে ইউরোপে নিবন্ধিত শরণার্থীদের সংখ্যা হ্রাস করা যায়, এটাই এখন ইউরোপের সবসময়ের চিন্তা। অথচ এই ইউরোপের সবচে বড়ো অর্জন 'ইউরোপীয় ইউনিয়ন' দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের ওপর গড়ে উঠেছে। যেখানে শরণার্থীদের ভূমিকা সবচে বড়োই বলা চলে।
শরনার্থী সংকটের নেপথ্যে
পশ্চিমারা এখন দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে, একদল মার্কিনপন্থি তো অন্যদল রুশ। আরব বিশ্বেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি, তেল কিংবা এই শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সমর্থনের পক্ষপাত। কোনো না কোনো কারণে একেকটি ইসলামি রাষ্ট্রে হামলে পড়েছে পশ্চিমা শাসকরা। উপনিবেশবাদ অনেক আগেই প্রাচীন তত্ত্বের কোটায় পড়ে গিয়েছে, নব্য-উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ, উদারতাবাদ, নব্য-উদারতাবাদ নামের নানান শিরোনামে সর্বদাই উচ্চ শ্রেণি নিম্নশ্রেণিকে শোষণ করছে। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার নামে একেকটা দেশ গৃহযুদ্ধের নামে ধ্বংস হতে থাকে, এই প্রক্রিয়ায় যাদের প্রাণ যায় তারা হয়তো বেঁচে যায়। যারা জীবিত থাকে তারা স্বজন হারিয়ে কিংবা পরিবারসহ নিজভূমি ছেঁড়ে পাড়ি জমায় উন্নত, উদার বিশ্বে, আর তারাই পরিচিতি পায় উদ্বাস্তু হিসেবে। পরিসংখ্যান না ঘেঁটেও বলে দেয়া যায় চলমান শতকের সব যুদ্ধক্ষেত্র ছিল একেকটা মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র, স্বভাবতই উদ্বাস্ত ও হয়েছে এসব দেশের নিপীড়িত মুসলিমরা।
মানবতা রক্ষার্থে পশ্চিমারা নিজদেশে এই উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়। জোর করেই হোক কিংবা চক্ষুলজ্জায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আহত, ক্ষত- বিক্ষত এই মুসলিম শরণার্থীরা সেই পশ্চিমাদের কাছেই আশ্রিত হচ্ছে যাদের হাতে ইসলামোফোবিয়ার প্রচলন। কাকতালীয়ভাবে না, অনেকটা স্বচ্ছভাবেই এই যুদ্ধে সৃষ্ট মুসলিম শরণার্থীরা সেসব দেশেই আশ্রয় নেয়। যেখানকার নাগরিকদের মনস্পটে তাদের মতো মোড়লেরা 'ওয়ার অন টেরর' নামের এক আদর্শের বীজ আগে থেকেই রোপন করে যত্ন নিয়ে বড় করে তুলছে।
শেষকথা
বিদ্যমান সমস্যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন কর্মকৌশল না থাকায় দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর এতবড়ো শরণার্থী সংকটে ইউরোপকে অপ্রস্তুতই মনে হচ্ছে। কারণ, প্রতিটি দেশকে তাদের দেশে আসা শরণার্থীদের নিয়ন্ত্রণ ও দেখভালের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ইসলামবিরোধী কথাবার্তা শুধু এসব দেশের ডানপন্থি, বামপন্থি ও বিরোধীরা বলে ক্ষান্ত হয়নি। বরং রক্ষণশীল খ্রিস্টান ও প্রশাসনিক ব্যক্তিরাও ইসলামের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ গোপন করতে পারেননি। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনীতিবিদদের ইসলামবিরোধী এ ধরনের শত্রুতা বেসরকারি এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর কড়া প্রতিবাদের মুখে পড়তে হয়েছে। শরণার্থী সংকটের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা সমাজের ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডকে ইউরোপের পুরনো উত্তরাধিকার; পশ্চিমাজগত শুধু খ্রিস্টানদের জন্য বরাদ্দ। অন্য সবকিছু থেকে ইউরোপকে মুক্ত করতে হবে। পশ্চিমকে ইসলামায়ন করা যাবে না। মোটকথা, পাশ্চাত্য বিশ্বের বিভিন্ন ব্যক্তির এসব বক্তব্য তাদের নিজস্ব কোনো মতামত নয়। ৩৯
টিকাঃ
[৩৯] সম্পূর্ণ লেখাটি আল জাজিরা প্রচারিত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'হেড টু হেড' সঞ্চালক মেহেদী হাসানের বক্তব্য অবলম্বনে রচিত
📄 ইসলামোফোবিয়ার কবলে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়
সভ্যতার শুরু থেকেই প্রতিটি ক্ষেত্রে সমাজের উচ্চ শ্রেণির মানুষের স্বার্থে নির্ধারণ করা কিছু তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে আসছে। যত সভ্য, উদার কিংবা আধুনিক হোক না কেন, মানুষের মধ্যে সমাজের এই শ্রেণি বিদ্বেষ যে পরম সত্য ও বাস্তব তা আমরা ইতিহাস থেকে বরাবরই শিক্ষা নিয়ে থাকি। শিক্ষার কোনো শেষ নেই, এমনটা এজন্যেই বলা হয়ে থাকে হয়তো। স্বল্প কিছু মানুষের আরওপ করা বিশ্বাসগুলো একেকটা শিল্পের মতো, যার থেকে তারা কেবল মুনাফাই শোষণ করে না, কেড়ে নিতে থাকে মানবজীবন এবং মানবতা। এরই বাস্তব উদাহারণ রোহিঙ্গা গণহত্যা।
ঘটনাপ্রবাহ হলো- একবার মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কাউন্সিলর ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চি হাঙ্গেরি যান এবং সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর হাঙ্গেরির সরকারের প্রকাশ করা এক বিবৃতিতে বলা হয়, 'দুই নেতা বর্তমানে তাঁদের উভয়ের দেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অভিবাসনের ওপর আলোকপাত করেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন, মুসলমান অভিবাসন বৃদ্ধির কারণে তারা এই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।'
এটা আসলেই বিস্ময়কর যে অং সান সু চি ও অরবান উভয়েই তাদের দেশে 'মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির' বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যে সমস্যাটি তাদের দেশে আদৌ নেই। হাঙ্গেরিতে মাত্র পাঁচ হাজার মুসলমান রয়েছে, যদিও গত কয়েক বছরে যে কয়েক লাখ শরণার্থী সে দেশ অতিক্রম করে পশ্চিমে গিয়েছে, তাদের বেশির ভাগই মুসলমান। তাদের মাত্র কয়েকজন হাঙ্গেরিতে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে এবং দেশটির সরকার তাদের গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মিয়ানমারেও 'মুসলিম অভিবাসন বৃদ্ধির' সমস্যা নেই। প্রকৃতপক্ষে, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে হাজার হাজার মুসলমানকে বহিষ্কার করা হয়েছে, যে রাজ্যটি কিনা কয়েক শতাব্দী ধরে মুসলমান সম্প্রদায়ের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। তবে বার্মিজ ও বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের দাবি হচ্ছে, মুসলমানরা সাম্প্রতিক 'অভিবাসী'। তাদের এই দাবি একেবারেই ভিত্তিহীন। বাস্তব কোনো ভিত্তি না থাকলেও অং সান সু চি ও ভিক্টর অরবান উভয়েই এই বলে জোর দিয়েছেন যে দেশটিতে 'মুসলিম অভিবাসনের' হুমকির সম্মুখীন।
মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের সমর্থক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রশংসিত অং সান সু চি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সমর্থনে দাঁড়িয়েছেন, যারা কিনা মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন নির্যাতন চালিয়েছে। তারা হাজার হাজার মুসলমান নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করেছে। তাদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ও প্রাণ বাঁচাতে ২০১৬ সালে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এদিকে মিয়ানমারে এখনো যেসব মুসলমান রয়ে গেছে, তারা সহিংসতার হুমকিতে রয়েছে এবং নানাভাবে তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। ১০ হাজারের বেশি নাগরিককে ক্যাম্পে থাকতে বাধ্য করা হয়, যেখানে আন্তর্জাতিক পরিদর্শক এবং গণমাধ্যমের প্রবেশের অনুমোদন নেই।
অং সান সু চি অবশ্য সামরিক বাহিনীর পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের খুব সামান্যই সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। ২০১৭ সালে যখন রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমারের নৃশংস নীতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তখন বৌদ্ধদের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা বলেছেন, 'মনে রাখতে হবে যে এ পরিস্থিতিতেই বুদ্ধ নিশ্চয়ই সেই দরিদ্র মুসলমানদের সাহায্য করেছেন। তারপরও আমি তাদের জন্য খুব বেদনা অনুভব করছি।' এরপর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা অব্যাহত থাকলেও দালাই লামা এই বিষয়ে আর কোনো কথা বলেননি।
মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের নির্যাতন বন্ধে কারও তেমন কোনো উদ্যেগ নেই। এদিকে সিরিয়ার সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করার ব্যাপারেও কোনো উদ্যেগ নেই। আট বছর ধরে সেখানে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ চলছে। ২০১৫ সালে ইউরোপে অভিবাসী এবং শরণার্থীদের স্রোত ঠেকানোর জন্য ইউরোপীয় নেতারা তুরস্কের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। ইইউর সদস্যপদ পাওয়ার লোভ দেখিয়ে তারা তুরস্কের ঘাড়ে ৩৫ লাখ সিরীয় শরণার্থীর বোঝা চাপিয়ে দেয়। বাইরের বিশ্ব থেকে এই শরণার্থীরা খুব কম সাহায্যই পেয়ে থাকে।
সিরিয়ার যুদ্ধে এ পর্যন্ত লাখ লাখ মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেকে এখনো একটু নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছে। তাদের অনেকে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই মারা যাচ্ছে। তবু ইউরোপীয়রা সিরিয়ার যুদ্ধ অবসানে খুব সামান্যই আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের উদ্বেগ কেবল মুসলিম অভিবাসন নিয়ে।
অবশ্যই মুসলমান অভিবাসন মিয়ানমার ও হাঙ্গেরির সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়। আসল সমস্যা থেকে বিশ্বের দৃষ্টি অন্যদিকে ধাবিত করার জন্য মুসলমান অভিবাসনকে তাদের হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করছে দুটি দেশ। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, লোকরঞ্জনবাদের উত্থান ও ডানপন্থীদের আন্দোলন, ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের ক্ষয়, মূলধারার রাজনীতির ব্যর্থতা ইত্যাদি তাদের দেশের আসল সমস্যা, মুসলমান বা অন্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যার কার্যত কোনো সম্পর্ক নেই।
একটা কথা মনে রাখতে হবে, মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব পোষণ করলেই ইউরোপ বা এশিয়ার সমস্যার সমাধান হবে না। প্রায় ১৫০ বছর আগে কার্ল মার্ক্স একেবারে ঠিক বলেছিলেন যে ইউরোপের স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয়টি ইহুদিদের অন্তর্ভুক্তির ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে আজ ইউরোপ, এশিয়া বা অন্য কোথাও, এটা মুসলমানদের সমান মানুষ এবং সহ-নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করার ওপর নির্ভর করছে।
একটু পেছনে ফিরে গেলে আমরা দেখতে পাব, এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে ইসলামোফোবিয়ার ভাষা। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিকৃত তাফসির মোতাবেক, শতাধিক রোহিঙ্গা লাঠিসোটা, হাতবোমা ও আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বেশ কয়েকটি পুলিশ চৌকি আক্রমণ করে। এই সংঘাতে বারোজন বর্মি নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও ডজনখানেক রোহিঙ্গা নিহত হয়। রোহিঙ্গা সরকার এই ঘটনাকে অজুহাত করে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আরেক দফা রাষ্ট্র-পরিচালিত রোহিঙ্গা গণহত্যা শুরু করে। কোনো সংবাদ বা বিশ্লেষণী মতামতে রোহিঙ্গা প্রতিরোধ সংগ্রাম ও বর্মি সরকারের জুলুমের মাঝে কোনো প্রকার কার্যকারণ সম্পর্ক দেখালে, তা প্রকারান্তরে বর্মি কর্তৃপক্ষ সমর্থিত জাতিগত নিধনেরই সহায়ক হয়ে ওঠে।
রোহিঙ্গাদের ওপরে এই জাতিগত নিপীড়ন কয়েক দশক ধরেই চলছে।
তাদের নাগরিকত্বের অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে; বিচ্ছিন্নকরণ প্রকল্পে দেশব্যাপী কয়েক ডজন গ্রামে তাদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ভ্রমণের ক্ষেত্রে গুরুতর বিধিনিষেধ আরওপ করা হয়েছে; ইবাদতের জায়গাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, বিয়ের ক্ষেত্রে বাধানিষেধের সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার খর্ব করা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, ও গণউচ্ছেদসহ বিভিন্ন নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা।
বর্মি নেত্রী, নোবেল শান্তিপদকপ্রাপ্তা এবং গণতন্ত্রের নামধারী ঠিকাদার অং সান সু চি কেবল চুপ থেকেছেন তা নয়; তিনি উৎপীড়নের সংবাদগুলোকে “ভুয়া খবর” হিসেবে উড়িয়ে দিয়ে সচেতনভাবে এই উৎপীড়নকে সমর্থন দিয়েছেন। “ভুয়া সংবাদ” পরিভাষাকে মূলত বিখ্যাত করেছিলেন ট্রাম্প। শুধু এই পরিভাষা ব্যবহারই সুচির সাথে ট্রাম্পের সাদৃশ্য বহন করে তা নয়, এখানে আদর্শিক ঘনিষ্ঠতাও বিদ্যমান।
২০১১ সালে আনার্শ ব্রাইভিক ৭০ জন নরওয়েজীয় সমাজতন্ত্রবাদীকে হত্যা করে। সে তার এই গণহত্যাকাণ্ডের ন্যায্যতা এভাবে দেখিয়েছে যে, এটা 'মার্ক্সবাদী, মাল্টিকালচারালিস্ট ও মুসলিমদের' অপবিত্র ত্রিত্বের বিরুদ্ধে ক্রুসেডের একটা অংশ। ঠিক এভাবেই ব্রাইভিকের শাদা আধিপত্যবাদী চিন্তাধারা শুধু বর্ণবাদ ও সেমিটীয় বিদ্বেষবাদের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়নি, বরং অন্যান্য অনেক অল্ট-রাইট (অলটার্নেটিভ ডানপন্থি) গোষ্ঠীর আদলে ইসলামোফোবিয়ার মধ্য দিয়েও হয়েছে। তখন থেকেই এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে, ইসলামোফোবিয়া আর চরমপন্থি ডান ঘরানায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে গিয়েছে।
ইসলামোফোবিয়া মুসলিম সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতি কেবল একগুচ্ছ নেতিবাচক মনোভাবের সমষ্টি না। সুবিধা ও নিষ্ঠুরতার এই বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মাণে ইসলামোফোবিয়া যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তাতেই এর মূল গুরুত্ব নিহিত। এটা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, অং সান সু চি মনে করেন রোহিঙ্গারা বহিরাগত সন্ত্রাসী। এটা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, ভারতের নরেন্দ্র মোদি তৎকালীন সুচির সাথে রেঙ্গুনে মোলাকাত করেছেন যখন তার আর্মি রাখাইনে জাতিগত নিধন চালাচ্ছিল, যে রাখাইনে রোহিঙ্গারা শতকের পর শতক ধরে বাস করে আসছে। এটা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের সংবাদগুলোকে সুচি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছেন ভুয়া খবর হিসেবে। এই সুচি, মোদি ও ট্রাম্প - এদের সবাই কথা বলছেন ইসলামোফোবিয়ার ভাষায়।
বিশ্বব্যাপী জাতীয়তাবাদ ও জাতিরাষ্ট্র প্রকল্পের যে সংকট প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তাকে সামাল দিতে জেনোফোবিক জাতীয়তাবাদীরা ইসলামোফোবিয়ার যে ভাষা ব্যবহার করছে এটি সে-ই ভাষা। নিছক মুসলিমদের অস্তিত্বই এই দুনিয়ায় জাতীয়তাবাদী মুক্তি অর্জনের অসম্ভাব্যতার স্মারক হয়ে উঠেছে যারা কোন গোষ্ঠী বা দেশের ছোট মুঠোয় জায়গা করে নিতে পারবে না। জাতীয় মুক্তি ও পুনর্জাগরণের প্রকল্প প্রস্তাবনায় জাতীয়তাবাদী উদ্দীপণার যে ব্যর্থতা তার জন্য নিছক মুসলমানদের অস্তিত্বকেই দায়ী করা হচ্ছে। তো এই ইসলামোফোবিক দুনিয়ায় মুসলিমরা বর্বর বহিরাগত ছাড়া কি-ইবা হতে পারে, যারা সভ্যতাকে নিছক তাদের অস্তিত্ব দিয়েই হুমকি দিয়ে যাচ্ছে?
জেনফোবিক আধিপত্যবাদের শক্তিশালী হওয়াটা ক্রমাগতভাবে মুসিলম বশীভূতকরণ প্রচেষ্টার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহুর্তে মুসলিমরা বিশ্বব্যাপী ট্রান্স-ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদ উৎরে যাওয়ার একটি সিগনিফায়ার হিসেবে পরিণত হয়েছে। ট্রান্স-ন্যাশনালিজমের এই দাবিটা চিহ্নিত হয় (নৈতিকতার দিক থেকে) দ্বৈত আনুগত্য, পরদেশীতা, সীমানা-উত্তর সম্পর্ক ও সম্বন্ধ শীর্ষক চিহ্ন দিয়ে। সুতরাং জাতিরাষ্ট্রের অসম্ভব পূর্ণতার পথে বাধা হিসেবে, বিশ্বায়নের চিহ্নায়ক হিসেবে এবং হোমোজেনাস সমাজের আকাঙ্ক্ষিত সাদৃশ্যের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে বরাবর মুসলিমরা প্রতিফলিত হচ্ছে। বিশ্বায়ন কর্তৃক সৃষ্ট অস্থিরতা ও নয়া-উদারনৈতিক যুক্তিকাঠামোর শাসনে বিশ্বব্যবস্থার কাঠামোগত যে রূপান্তর তার ওপর থেকে নজর সরিয়ে মুসলিমদের অস্তিত্বের উপর নজর আনা হচ্ছে। এই মুসলিমরা বর্তমানে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ডায়াসপোরা (Diaspora) কেননা তাদের কোনো জাতিরাষ্ট্র নির্দিষ্ট কোনো নৃতাত্ত্বিক বা জাতিগত পরিচয়ে ধারণ করতে পারে না। জাতির শরীরে বাসা বাধা বহিরাগত বিষাক্ত উপাদানগুলো সারানোর প্রতিষেধক হিসেবে পরিণত হয়েছে ইসলামোফোবিয়া। মুসলিমরা হচ্ছে নির্দিষ্ট নৃতাত্ত্বিক কাঠামোতে (Ethnos) জনগণকে (Demos) ধারণ করার চূড়ান্ত অক্ষমতার রূপক।
রাষ্ট্রনীতি আকারে ইচ্ছাকৃত নির্বিচার হত্যাকাণ্ড হিসেবে গণহত্যা ঘটে থাকে জাতি এবং ঐ সকল গোষ্ঠীর ছেদবিন্দুতে যারা জাতির সীমানা ভেঙ্গে দিয়ে সংকট তৈরি করে। ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের ফলে বিশ্বের সকল প্রধান ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মুসলিম সংখ্যালঘু রয়েছে যারা 'হালের নৃতাত্ত্বিক-জাতীয়তাবাদের ধারা এবং নাগরিকতা ও নৃতাত্ত্বিকতার মাঝে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে তার সাথে জড়িয়ে পরেছে। বহুল আকাঙ্ক্ষিত নৃতাত্ত্বিকভাবে 'বিশুদ্ধ জাতিরাষ্ট্র' বাস্তবায়নের পথে তাই তাদের প্রধান বাঁধা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের তাদের আদিবাসস্থান গ্রামগুলো থেকে বিতাড়িত করে দেয়া হচ্ছে এবং হত্যা করা হচ্ছে, কারণ তাদের বিদেশি এবং বহিরাগত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইসলামোফোবিক দুনিয়ায় মুসলিমরা কোথাও থাকার যোগ্য নয়। জাতিগত বিভাজনের ওপর ভিত্তি করে যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, বৈশ্বিকভাবে মুসলিম আইডেন্টিটির উত্থান এক্ষেত্রে সীমালংঘন হিসেবে পরিণত হয়েছে; সাংস্কৃতিক সমজাতীয়তার আন্দোলনগুলোর চোখে তারা পাপী; এনলাইটেনমেন্ট টেলিওলজির চোখেও তারা পাপী।
ইসলামোফোবিয়া শুধু মুসলিমদের প্রতি বৈরীভাব নয়, বরং এটি হচ্ছে সেই আঠা যা এমন একটি জোটকে একসাথ করে রাখছে যারা বিশ্বকে আরও প্রশস্ত একটি সহাবস্থানের জায়গা হিসেবে গড়ে উঠতে বাঁধা দিচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের উপর চালানো জাতিগতনিধন তাই নিতান্তই দূরবর্তী কোনো ছোট সংখ্যালঘু একটি গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ নয়। বার্মার জঙ্গলে যা-র ওপরে হামলা করা হচ্ছে, তা আরেক প্রকার নয়া দুনিয়ার সম্ভাবনার ওপরেই হামলা। ৪১
টিকাঃ
[৪০] ভাষাবিদ ফার্দিনান্দ দ্য স্যুসুরের ভাষ্যমতে, 'সিগনিফায়ার' যেই অর্থদ্যোকতা হাজির করে তার উপর 'সিগনিফাইড' তৈরি হয়।
[৪১] সম্পূর্ণ লেখাটি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র ইবরাহিম কালিনের বক্তব্য অবলম্বনে রচিত