📄 কানাডায় ইসলামোফোবিয়া : একজন খ্রিষ্টান নারীর নির্মোহ পর্যবেক্ষণ
আমি একজন খ্রিস্টান শ্বেতাঙ্গ। চতুর্থ প্রজন্মের একজন কানাডিয়ান। এই তিনটি কারণে অন্য অনেক কানাডিয়ানের চেয়ে আমার জীবন অনেক সহজতর হয়েছিল। কখনো বর্ণবাদের নৃশংস আক্রমণের শিকার হইনি। যেখানেই যাই, গলায় ক্রসচিহ্ন পরেই যাই, কেউ কিছু বলে না। প্রকাশ্যে আমি আমার ধর্ম আমার শরীরে ফুটিয়ে তুলে চলাফেরা করি- কিন্তু কখনো চরমপন্থি বলে কেউ গালি দেয় না। এই এখন আমার সুবিধাগুলো নিয়ে খুব ভাবছি, যখন ইসলামোফোবিয়ার শিরশির হাওয়ায় প্রতিটি অমুসলিম ভেতরে ভেতরে কাঁপছে। মুসলিমদের ওপর যে অ্যাটাক এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ড চলছে, এগুলো ঘটাচ্ছে আবার আমারই বর্ণের শ্বেতাঙ্গরা। আমার বর্ণের মানুষগুলো ইসলামোফোবিক আক্রমণ করছে এইজন্য আমি আমাকে নিয়ে ভাবছি না, বরং আমি ভাবছি এরা মুসলিমদের চেনেই না। না চেনা এবং না জানা থেকে তাদের ভেতর এক অদৃশ্য ভয় তাদেরকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়োয়। আমি লক্ষ্য করেছি, আমার মতা সুবিধাভোগী কানাডিয়ানরা মুসলিমদের প্রতি দারুণ বিরক্ত এবং প্রকাশ্য বিরোধী। কিন্তু কেন?
আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করিড়মুসলমানদের যথার্থভাবে ফুটিয়ে না তোলার কারণে মিডিয়ায় কিংবা বইয়ে, এই দেশের লোকদের মনে মুসলিমদের প্রতি প্রচুর নেতিবাচক মনোভাবের জন্ম নেয়। কানাডায় খুব অল্প মুসলমান। যেহেতু আমার শৈশব কেটেছে শ্বেতাঙ্গ স্কুলে, চার্চে, কখনো মুসলমানদের সংস্পর্শেও আসিনি, সেহেতু মুসলিমদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব জন্ম নেয়ার অনেক সুযোগ ছিল। কিন্তু আমার সৌভাগ্য- আমার কমিউনিটি আমাকে অন্য ধর্মের বিশ্বাস, আচার-আচরণ বিশেষ করে মুসলিমদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হতে দেয়নি। ৯/১১-র হামলার পর সবাই যখন ভীত সন্ত্রস্ত, তখন আমাদের কমিউনিটি প্রধান মসজিদের ইমামকে ডেকে এনে বললেন, 'ইসলাম এবং সন্ত্রাসবাদ এক নয়। ইসলাম কখনো সন্ত্রাসবাদ সমর্থন করে না। এগুলো আমার কমিউনিটিকে বুঝিয়ে দিন।' ইমাম সাহেব এত সুন্দর করে বিষয়টি ফুটিয়ে তুললেন, কমিউনিটির লোক এবং আমার বাবা-মা বিষয়টি খুব স্পষ্ট করে বুঝে গেলেন। ইমামের বয়ানের পর ওদের ভেতর কাজ করতে থাকা ভয় যেন নিমেষেই হাওয়া হয়ে গেলো।
এরপর যখন হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই, স্কুল বোর্ড নিয়ন্ত্রিত 'স্টুডেন্টস টুগেদার অ্যাগেইনস্ট রেসিজম' (এস.টি.এ.আর) নামে একটি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের সুযোগ পাই। প্রশিক্ষণে আমাদের শেখানো হয় পক্ষপাতদুষ্টতা, গোঁড়ামি এবং বৈষম্যের সংজ্ঞা। আমার সহনশীল বিশ্বাস এবং বিশ্বদর্শন এই প্রোগ্রামটির মাধ্যমেই উন্নত হয়েছিল। আমার হাইস্কুলে ছাত্র-ছাত্রী ছিল দুই হাজার। একদিন একটি মুসলিম মেয়ে রোজা রেখে, হিজাব পরে স্কুলে আসে। তখন তাকে ক্লাসের সবার সামনে রোজা এবং হিজাব নিয়ে কিছু বলতে দেয়া হয়। সে তার মত করে রোজা এবং হিজাবের বিষয়টি ফুটিয়ে তোলে এবং কারো কারো প্রশ্নের উত্তরও দেয়। এতটুকু স্পেস আমাদের কমিউনিটি অন্য ধর্মকে দিত। দেয়ার কারণেই ওইদিন আমরা নতুন কিছু জানতে পেরেছিলাম। হয়তো অনেকের মনে এসব নিয়ে প্রশ্নও ছিল। কিন্তু মুসলিম মেয়ের বর্ণনার কারণে তা দূর হয়ে গেলো।
মুসলিম অন্য কেউ না, আমাদেরই দেশে, কমিনিউটিতে বাস করে। মিডিয়া তাদের কীভাবে দেখালো, তা বিচার না করে ইসলাম আসলে কী বলে তা খতিয়ে দেখা উচিত। মুসলিমরাই কেবল তাদের নিজেদের রক্ষা করবে এমন নয়, বরং আমাদেরও তাদের প্রতিরক্ষায় দাঁড়াতে হবে। ইসলাম সম্পর্কে না জেনে যারা ফোবিয়া ছড়াচ্ছে, সেইসব বর্ণবাদীদের পক্ষে কেন দাঁড়াবেন? কেউ যখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে কথা বলে, আমি ভাবি সে মুসলমানদের সম্পর্কে না জানার কারণেই এসব বলছে। কথায় আছে- 'অজ্ঞতা ডেকে আনে ভয়। ভয় ডেকে আনে ঘৃণা।' তাই ছোট থেকেই বাচ্চাদের শেখাতে হবে সহনশীলতা। তাহলে বড়ো হয়ে তারা উগ্র, অসহনশীল হবে না। আমি এর জ্বলন্ত প্রমাণ। বর্ণবাদী হওয়ার যাবতীয় পরিবেশ আমি পেয়েছি। কিন্তু সহনশীলতা শিক্ষা পাওয়ার কারণে নেতিবাচক মনোভাবে আক্রান্ত হইনি। আশা করি আমরা যদি আমাদের সন্তানদের সেই শিক্ষা দিতে পারি, তাহলে তারা আমাদের চেয়েও বেশি অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও সুরক্ষা দিতে পারবে!
ভাষান্তর : রাকিবুল হাসান
📄 মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলামোফোবিয়া
সমসাময়িক বিশ্বে সবচেয়ে বহুল পরিচিত এক তত্ত্ব হলো 'ইসলামোফোবিয়া'। বিশ্বে নানান জাতি, নানান বর্ণ, বিচিত্র সংস্কৃতি আর বিভক্ত ধর্মে পরিচিত মানুষ। যেখানে সবার একটা অভিন্ন পরিচয় হলো মানুষ। তবে মুসলমান মানুষের বড় পরিচয় এখন সন্ত্রাসী হিসেবে, ইসলামবিদ্বেষী মনোভাবে মানুষের পরিচয় ছাপিয়ে তাকে এক ধর্মান্ধ জাতি হিসেবে বিবেচনার শিল্পের প্রচলন এখন দারুণ অবস্থায় পৌঁছেছে। পশ্চিমা স্বার্থে ইসলামোফোবিয়া শিল্পের বাম্পার ফলন দেখা যায় আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যে, এশিয়া থেকে আমেরিকা এবং সর্বশেষ ভৌগলিক অবস্থায় সর্ব দক্ষিণে থাকা নিউজিল্যান্ডে।
বর্ধিষ্ণু ইসলামোফোবিয়া কেবল পশ্চিম ইউরোপের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আজ তা বলকানের মুসলিম দেশগুলোতেও ভয়ানকরূপ ধারণ করছে। কিন্তু কেনই বা এমন হচ্ছে? এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে কারা? তা খতিয়ে দেখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে একটি তুর্কি গবেষণা সংস্থা ইউরোপ ও বলকান অঞ্চলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর পেছনের সত্যকে বের করে এনেছে।
চারশ' বছরের অধিক সময় ধরে বলকান মুসলিম অঞ্চলের সাথে ইসলামোফোবিয়া জুড়ে যাওয়ায় তা এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে কৌতূহলোদ্দীপক পাঠ্য। বলকান অঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ আলবেনিয়া, কসোবো ও বসনিয়া মুখোমুখি হচ্ছে ইসলাম-বিদ্বেষমূলক (বহু কর্মকাণ্ডের) নানা বাকবিতণ্ডায়। অধিকন্তু ম্যাসেডোনিয়া, সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর আদিবাসী মুসলমানদের বহুলাংশই ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত “Islamophobia in Muslim Majority Societies" বইটি অবান্তর ও আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী মানসিকতার জবাব দিয়েছে। 'ইসলামোফোবিয়ার কলকব্জা নানাভাবেই চালিত হতে পারে। তবে মূলত তা বৈশ্বিক রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই রাজনীতি উত্তর- উপনিবেশী একটি পর্যায়; যা মূলত আমেরিকার সম্পৃক্ততায় তৈরি হয়েছে।' এ দাবি বইটির রচয়িতাদের।
ইসলাম-বিদ্বেষী মনোভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আমেরিকা। Hijacked by Hate: American Philanthropy and the Islamophobia Network নামক প্রতিবেদনে ২০১৯ সালে চিত্রিত হয়েছে মুসলিম-বিদ্বেষী প্রচারণা ছড়িয়ে দিতে ১০৯৬টি সংস্থা দায়বদ্ধ। যারা অকাতরে অর্থ ঢেলে যাচ্ছে। হিসাবটা প্রায় ৩৯ মিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। ফলে ইসলামোফোবিয়া আটলান্টিক ছাড়িয়ে ইউরোপ ও বলকানের দেশগুলোতে চলে গেছে এবং সেখানকার মুসলমানদের সাথে মিলেমিশে হয়ে গেছে একাকার। তাই মুসলিম-বিরোধী মনোভাব বেড়েছে হু হু করে। আত্ম- পশ্চিমীয় ও মুসলমানদের একাংশ যারা অভিজাত (নিজেদের মনে করে) যেমন- বলকানিরা ইসলামি বিধি-বিধানকে নিছক পরিচয় হিসেবে দেখতো; আর সাথে সাথে তা পশ্চিমী ধর্মনিরপেক্ষ দেশের জন্য আশঙ্কাজনক হিসেবেও বিবেচিত হতো।
২০১৯ সালে প্রকাশিত ইসলামোফোবিয়া রিপোর্টে তুর্কি সাংবাদিক নাদা দোস্তী আলবেনিয়ায় মুসলিম-বিদ্বেষী প্রচারণা চিহ্নিতকরণ, বিশ্লেষণ ও সমাধান করা আলবেনিয়া ও আলবেনিয়ান ভাষাভাষী দেশগুলোতে জরুরি বলে দাবি করেন। তুর্কি সংবাদ সংস্থা TRT World-কে তিনি আরও জানান, আলবেনিয়ায় প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানাভাবে নেতিবাচক প্রচারণার ফলে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, গণমাধ্যম প্রতিনিধিত্ব ও বিচারব্যবস্থাসহ জীবনের নানা পর্যায়ে তীব্র থেকে তীব্রতর ইসলামোফোবিয়ার দেখা মিলছে।
২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলায় ৫১ জন শহিদ হওয়ায় আলবেনিয়ান কাস্তরিয়ত মাইফতরাজ নামক একব্যক্তি আলবেনিয়ান মুসলিমদের বিরুদ্ধেও অনুরূপ ব্যবস্থা প্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করে।
ইসলাম-বিদ্বেষী প্রচারণার ক্ষেত্রে 'ইসলামোফোবিয়া'র ইন্ধনদাতার ভূমিকায় থাকে রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকরা। ফলত আলবেনিয়ায় ইসলামোফোবিয়া দিন দিন চিরাচরিত স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে বলে দোস্তীর দাবি।
এ প্রতিবেদনের কসোবো অংশের লেখক আদেম ফেরিজাজের মতে, কসোভো; যার ৯৬ ভাগ মুসলিম। তারা ইসলামোফোবিয়ার তীব্র উপস্থিতি আঁচ করতে পারছেন জীবনের পরতে পরতে। রাষ্ট্র হিসেবে যা কসোভোর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অধিকন্তু মুসলিম গণহত্যার মদতদাতা (যদিও তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন) অস্ট্রিয়ান ঔপন্যাসিক পিটার হ্যান্ড সাহেবকে (২০১৯ সালে) সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করায় দেশটিতে ইসলামোফোবিয়ার আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
সাহিত্যাঙ্গনের সবচেয়ে মূল্যবান পুরস্কার এমন ব্যক্তিকে দেয়ায় বসনিয়া হার্জেগোভিনা, কসোভোর মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি মূল ধারার ইউরো-আটলান্টিকিদের উপেক্ষার কথাই বলছে না; বরং এ অনুষ্ঠান ইউরোপীয় রাজনীতিবিদদের দিয়ে কসোভোর অধিকার অস্তিত্বের বিরুদ্ধে ইসলামোফোবিয়ার আক্রমণকে সহজ ও সুগম করে তোলারই একটি পদক্ষেপ। কসোভোতে দৃশ্যত (হিজাব, দাড়ি) ইসলামচর্চায় মুসলমানগণ প্রতিনিয়ত নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। আর এটাও স্মরণীয় যে, বলকানের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষত বসনিয়া ও কসোভোতে ৯০ শতকের দিকে গণহত্যাগুলোর মূল কারণ ছিল ইসলামচর্চা। এ অঞ্চলের বহু মানুষ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ফলে জীবন হারায়।
ভাষান্তর: হাবিবুর রহমান রাকিব
টিকাঃ
[৩৮] দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলকে বোঝায়। এর পূর্বে কৃষ্ণ সাগর, পশ্চিমে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর, দক্ষিণে ভূমধ্যসাগর। দানিউব, সাভা ও কুপা নদীগুলো অঞ্চলটির উত্তর সীমানা নির্ধারণ করেছে। বুলগেরিয়া থেকে পূর্ব সার্বিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বলকান পর্বতমালার নামে অঞ্চলটির নাম এসেছে।
📄 জেন্ডার ও ইসলামোফোবিয়া
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একটি রেস্টুরেন্ট। সাতজন হিজাব পরিহিত মহিলা প্রায় ৪৫ মিনিট সেখানে অবস্থান করেন। পুরো সময়জুড়ে তাদের পুলিশি নজরদারিতে রাখা হয়। এরপর, সেই সাতজন নারীকে হিজাব পরিধান করার অপরাধে গ্রেফতার করা হয়। তাদের আদালতে হাজির করা হয়। এখান থেকে প্রতিয়মান, মুসলিম নারীদের জন্য রেস্টুরেন্টে আহারাদি গ্রহণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে, তার ওপর হিজাব পরিহিত হলে তো আর কথাই নেই। এ তীব্র প্রচারণাটি আমেরিকা, ইউরোপ ও বেশকিছু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও আগ্রাসী ও সহিংসতার রূপ নিচ্ছে।
ইউরোপীয় ধর্মনিরপেক্ষতার জের ধরে ফ্রান্স ও হল্যান্ডে হিজাব নিয়ে বিতর্ক দিন দিন তুঙ্গে উঠছে। পর্যায়ক্রমে ইউরোপীয় পরিচয়টি সংজ্ঞায়িত হচ্ছে এটি কী তা দিয়ে নয়; বরং ভবিষ্যতে এটি কী হবে তা দিয়ে। ইউরোপিয়ান পরিচয় গড়ে তোলা হয়েছে যা মুসলমানদের দলছুট বলে বিবেচনা করে। অপরদিকে মুসলিম নারীদের সমাজবহির্ভূত জ্ঞান করা হচ্ছে। মুসলিম নারীদের হিজাব পরিধান করা (তাদের আঁতে ঘা দিয়ে) পশ্চিমা ও ইউরোপীয় পরিচয় রক্ষার্থে এবং ইসলাম, মুসলিম নামক হুমকিকে প্রতিহত করতে ডানপন্থি রাজনৈতিক দলকে (টনক নাড়িয়ে) সুসংহত করেছে।
একাধিক পন্থায় ইউরোপীয় ও আমেরিকান সমাজে বর্ণবাদী মনোভাবে ঘি ঢালতে মুসলিম নারীদের ইন্ধন হিসেবে ব্যবহার করে ইসলামোফোবিয়ায় গতি সঞ্চার করা হয়। একইভাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ তুরস্কে হিজাবের বিরুদ্ধে বহুদিন ধরে প্রচারণা চলমান ছিল। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে হিজাব, ঐতিহ্যগত মুসলিম নিকাব আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা বিবর্জিত প্রতীক। তাই আধুনিকতায় প্রবেশের এবং উন্নত হিসেবে দাবি করার পূর্বশর্ত ছিল এ আবরণটি বলপূর্বক অপসারণ করা।
বলাবাহুল্য, যে আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে উপনিবেশিক যুগে পরিচিতি লাভ করে এবং পশ্চিমারা ইসলামকে জাগতিক অনুন্নতির জন্য দোষারোপ করে। ইউরোপ আমেরিকার রাষ্ট্রীয় নৈপুণ্যের হাত ধরে মুসলিম জাতিগুলো যখন উন্নয়ন ও আধুনিকতার (স্বপ্নে বিভোর হয়ে) প্রাথমিক ধাপগুলো পার হচ্ছিল তখন ছিল মুসলিম হিজাব পরিহিতাদের জন্য দুঃসময়।
ঔপনিবেশিক চিন্তাধারা আর মুসলিম জাতিগোষ্ঠী একই আবর্তে বৈধতাপ্রাপ্তির দিকে তাড়িত হয়। সাথেসাথে মুসলিম নারীদের সমস্যাজনক বিবেচনাটা স্বাভাবিক হতে থাকে। ঔপনিবেশিক ও বিকৃত সেকুলার আধুনিকতার চোখে মুসলিম নারীর হিজাব পরিধান কোনো প্রকার ধার্মিকতার প্রতীক বলে বিবেচিত হয় না বরং তা পশ্চাদপদতা ও অসঙ্গতির প্রতীক। এ চিন্তার ধারক- বাহকদের নিকট হিজাব অপসারণ করাই আধুনিকতা আর প্রাসঙ্গিকতার প্রতীক। অপরদিকে সে সমাজে তখন হিজাব পরিহিতারা নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতেন। মুসলিম প্রেক্ষিতে আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা উপনিবেশিকতার গর্ভে লালিত হয়েই এসেছে। আর জন্ম দিয়েছে একটি বিকৃত জাতি-রাষ্ট্র প্রকল্প যেখানে গঠনমূলক সামাজিক চুক্তি, নাগরিকত্বের মৌলিক বাস্তবায়ন এবং প্রত্যেকের মৌলিক অধিকারের নিতান্ত অভাব পরিলক্ষিত হয়।
ইসলামোফোবিয়া ইন্ডাস্ট্রি, আধুনিক সেকুলার আর ঔপনিবেশিকদের অব্যাহত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় হিজাবি মুসলিম নারী। আধুনিকীকরণ ও সেকুলারাইজেশনের নামে মুসলিম নারীকে হিজাব বর্জনের নির্দেশনা প্রদান করা হয়, যদি না করে তাদের হিজাব ছাড়তে বাধ্য করা হয়; কেননা পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে মুসলিম নারীগণের বুদ্ধির স্বল্পতা রয়েছে। তারা নিজেদের ভালোটা বোঝার জ্ঞান রাখে না।
এই বর্ণবাদী মনোভাবটি ইসলামোফোবিয়ার কুশীলব ও অরিয়েন্টালিস্টদের হিজাব বিষয়ে মৌলিক অবস্থানটি পরিষ্কার করে। হিজাবকে কেন্দ্র করে নারীর প্রতি এহেন অবমননাকর ধারণা পোষণ করা হয়- বিশেষত যেসব নারী জনসমক্ষে হিজাব পরিধান করে তাদের সম্পর্কে। মুসলিম নারীদের সভ্য করার জন্য আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে তত্ত্ব ও মতাদর্শের খোলসে মুড়িয়ে এই চলমান ও বৈশ্বিক প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রজেক্ট হাল আমলের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজেক্ট হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। হিজাবী নারীদের প্রতি তেড়ে আসা সকল আক্রমণই গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয় যখন তা সভ্যতা সমুন্নত রাখা, পিছিয়ে পড়া মুসলিম মেয়েদের আলোকিতকরণের নাম করে করা হয়।
মুসলিম নারী হয়রানি ঘটনার যেন কোনো অন্ত নেই। যার আওতায় যেমন আছে তীব্র মৌখিক আক্রমণ তেমন আছে শারীরিক হুমকি; যার মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিপর্যায়ে সহিংসতা ও হিজাব ছিনিয়ে নেয়া। উন্মাদনার ধোঁয়াশায় আরও একটু ঘৃতাহুতি দিতে যুক্ত করে, মুসলিম হিজাব পরিহিতা নারী প্যাসিভ সন্ত্রাসবাদের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই এটি একটি চ্যালেঞ্জ যা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। ইসলামি অন্যান্য নিদর্শনের চেয়ে তারা ডানপন্থি বামপন্থি উভয় চরম মাত্রার ইসলামোফোবিয়াকে ত্বরান্বিত করতে মুসলিম নারীদের মাথায় পরিহিত এ পোশাককে কাজে লাগায়। আর তারা সভ্যতা নামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। তাই সভ্যতা রক্ষার নামে ইসলামোফোবিয়ার প্রচারণা কোনো কলঙ্কজনক কিছু নয় বরং তা বর্ণবাদী জনতার লক্ষ্যকে ত্বরান্বিতকারী।
ইসলাম বিদ্বেষের নানা রূপই সমাজে উপস্থিত। তবে সবচে দৃঢ় ও ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী ভূমিকা ললালিত হয় মুসলিম নারীদের কেন্দ্র করে। কেননা হিজাব দৃশ্যমানভাবে চিহ্নিতকরণের কাজ করে। ইসলাম-বিদ্বেষের বিদ্যমান তথ্য ও গবেষণায় দেখা যায় যে, মুসলিম নারীদের প্রতি সহিংসতা ও বৈরিতার ঘটনার আরও বেড়ে চলার দিকে ইঙ্গিত করে। মুসলিম মেয়েরা মুসলিম পুরুষদের তুলনায় মারাত্মক আক্রমণের শিকার হয় প্রতিনিয়ত; অথচ তারা পশ্চিমা সংস্কৃতি ধারণ করে নিমেষেই পশ্চিমা ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারত। বেঁচে যেতে পারত এহেন সব বৈরিতার ভয়াল থাবা থেকে। মুসলিম পুরুষরা পশ্চিমা সমাজে যেখানে ক্লার্ক কেন্ট হয়ে থাকে সেখানে মুসলিম রমণীরা সমাজে ইসলামের নিদর্শন উজ্জীবিতকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়।
ভাষান্তর : হাবিবুর রহমান রাকিব
📄 হিজাব নিয়ে পশ্চিমা গপ্পো
সোশ্যাল মিডিয়ায় মাঝে মাঝে আধুনিকতাবাদী এজেন্টদের (পশ্চিমা) কাছ থেকে ওয়েস্টার্ন কাপড় পরে হেটে যাওয়া অতীতকালের মুসলিম দেশের নারীদের ছবি দেখতে পাওয়া যায়। এই প্রচারণায় ইরান ও আফগানি নারীদের তারা লক্ষ্যবস্তু বানায়। আধুনিকতার মশালবাহীরা ওয়েস্টার্ন পোষাক পরা নারীদের ছবি প্রচার করে বলে বেড়ায়, “এরা আগে কী ছিল, আর এখন কী হয়েছে!” আর কেউ কেউ মাথা নেড়ে বলেন, তাই তো! তাই তো!
এখানে একটা বড় ধোকাবাজি রয়েছে। ১৯২৪ সালের ইরানের শাসক ছিলেন সেক্যুলার রেজা শাহ। তবে তিনি কোনো গণতান্ত্রিক নেতা ছিলেন না। তিনি সেখানে ধর্ম পালনে অত্যধিক কড়াকড়ি জারি করছিলেন। হিজাব, বোরকা, দাঁড়ি রাখা সব বে-আইনি। ধর্মীয় উৎসব পালনে বিধিনিষেধ। কিন্তু তিনি ধীরে ধীরে কঠোরতর হতে থাকলে ইংল্যান্ড-সোভিয়েত তাকে নির্বাসনে দেয়। এরপর, তিনি ১৯৪৪ সালে গত হন।
১৯৪১ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত ইরানে ডেমোক্রেটিক সেক্যুলারিজম ছিল। ১৯৫১ সালে মোসাদ্দদেগ ছিলেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। সেক্যুলার হলেও ছিলেন উপনিবেশবিরোধী মানুষ। নিজের দেশের ভালো-মন্দ বুঝতেন। ঐতিহাসিক এরভান্ড আব্রাহামিয়ান তার The Coup: 1953, the CIA and the Roots of Modern US-Iranian Relations বইতে লিখেছেন, মোসাদ্দেগ এমন উপনিবেশবিরোধীএকজন মানুষ ছিলেন, যিনি গনতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে আপোসহীন ছিলেন।
১৯১৩ থেকে ইরানের সব তেল ইন্ড্রাস্ট্রি ছিল এংলো-পারসিয়ান অয়েল কোম্পানির অধীনে। ইউরোপ থেকে আইনে পিইচডি করা মোসাদ্দেকের সরকার তল বানিজ্যের জাতীয়করণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই ঘটনায় ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো। সেই ক্ষতি বজ্রদন্ডের সাহায্যে স্বহস্তে ফেলেছিলেন অলিম্পাসের দেবতা জিউস। তেল রক্ষার্থে ব্রিটিশ সিক্রেট ইন্টিলিজেন্স সার্ভিস (ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের দল) আমেরিকান গোয়েন্দাদের দল সিআইএকে বলল, চলো আমরা একসাথে কাজ করি। শুরু হলো
সামরিক অভ্যুত্থান। সিআইএ মোসাদ্দেগকে সেনাবাহিনী দ্বারা উৎখাতের নাম দিল 'অপারেশন এজাক্স'। মোসাদ্দেগকে গ্রেফতার করে তিন বছরের জেল দেয়া হল। তারপর রাখা হল নিজগৃহে নজরবন্দী অবস্থায়। জনগণের একটা সমর্থন ছিল তার প্রতি। তাই তিনি মারা গেলে তার বাড়িতেই নিরবে দাফন করা হয় বিপ্লবের আশংকায়। মোসাদ্দেগকে সরানোর পর ইরানে আমেরিকান পেট্রোলিয়াম কোম্পানিগুলো কাজ শুরু করে। ফ্রান্স এবং ডাচ পেট্রোলিয়াম কোম্পানিও কাজ শুরু করে।
এরপর রেজা শাহের পুত্র রেজা শাহ পহলবী রাজা হিসেবে শাসন করতে লাগলেন। দেশের সম্পদ বিদেশীরা নিয়ে যাবে এমন ইচ্ছা তারও ছিল না। তিনি তেল বানিজ্যের জাতীয়করণের ক্ষেত্রে মোসাদ্দেকের মতকে সমর্থনই করতেন। তবে পশ্চিমের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস পাননি তিনি। হয়ে গেলেন একজন একনায়ক, সেক্যুলার। পোস্ট রেভ্যুলোশনারী ফ্রান্স এবং ক্লাসিক্যাল আমেরিকান রাজনৈতিক চিন্তা থেকে ধর্ম এবং রাষ্ট্রকে আলাদা করার চিন্তা তার মাথায় ছিল।
দেশে স্বৈরশাসক। এর মাঝে মুসলিম দেশ। যে দেশের শক্ত ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে। সেসব ভুলে গিয়ে তিনি ভীনদেশের তরিকামতো আগানো শুরু করলেন। যার ফলাফল হিসেবে মাথা তুলতে শুরু করল সে দেশের ইসলামি দলগুলো। দেশে দূর্নীতি হলে, মানবাধিকার লংঘিত হলে সাধারণ মানুষ কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারে। অসহ্য পর্যায়ে চলে গেলে যেকোন আদর্শের ছায়াতলে গিয়ে তাদের বিদ্রোহ করার সম্ভাবনা থাকে। মানুষ বিদ্রোহী হলো। শাহ এই বিদ্রোহের উত্থানের নেপথ্যনায়ক হিসেবে ব্রিটিশদের দায়ী করতে লাগলেন। ব্রিটিশদের সাথে সম্পর্ক খারাপ করে তিনি আমেরিকা ও ফ্রান্সের সাথে জোট গঠন করলেন। কিন্তু ইসলামি জনশক্তির বিজয় ঠেকানো সম্ভব হলো না।
১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে হল বিপ্লব। যাকে বলা হয় ইরানি বিপ্লব। শাহের পতন ঘটে। ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র হয়। ইরানের রাজতন্ত্র বিলোপ করা হয়। শাহকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে আসলে কী জানা গেল? মোসাদ্দেক, শাহ বা ইরানের কথা। তবে আলোচ্য বিষয়বস্তু হলো স্কার্ট পরা আধুনিক নারীরা। এই ইতিহাসের সাথে একটু যুক্ত করলেই সেটা বুঝে আসবে। তৎকালীন রেজা শাহ পুলিশদের নির্দেশ দিয়েছিলেন হিজাব পরে বের হলে বা মাথায় কাপড় দিলে পুলিশ যেন জোর করে তা খুলে ফেলে। এটাই হলো ওইসব ছবির মূল ইতিহাস। এইসব অতীতের ছবি দিয়ে এবং তার বিপরীতে বোরকা পরা মেয়েদের ছবি দেখিয়ে ভয়ের পলিটিক্স করা হয়। বুঝানো হয় যে আগে সেখানে মহিলাদের অধিকার ছিল আর এখন কিছুই নাই। এর মাঝে এমন কিছু ইঙ্গিত থাকে যা আধুনিক মানবতাবাদীর মনে ভয়ের উদ্রেক করে। এবং জাগিয়ে তুলে ইসলামোফোবিয়া।
আমাদের দেশেও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মেয়েদের প্রতিবাদের ছবি দেখিয়ে বলা হয়, দেখুন আগে কোন মেয়েদের মাথায় কাপড় ছিল না। কিন্তু এখন ভার্সিটিতে কত হিজাবী মেয়ে দেখা যায়। যারা এসব বলেন তারা বুঝাতে চান যে, দেশে ব্যাপক হারে ইসলামাইজেশন বা মৌলবাদী ইসলামাইজেশন হচ্ছে। সেই একই ভয়ের রাজনীতির চেষ্টা। কিন্তু এই কথার ফাঁকটা হল, ১৯৫২ সালে কতজন রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেত, এখন কতজন পড়ে সেই সংখ্যার তারতম্য। আগে রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়েরা কম যেত বিদ্যালয়ে, এখন অনেক বেশী যাচ্ছে। বর্তমানে ১৯৫২ সালের থেকে অনেক অনেক বেশি কনজারভেটিভ ফ্যামিলির মেয়েরা বিদ্যালয়ে পড়ছেন। সেই অনুপাতে দেখা যাচ্ছে হিজাবের সংখ্যাবৃদ্ধি। এইসব ছবি নিয়ে যারা খেলতে আসেন তাদের ঘরের মেয়েরাও এখন বোরকা পরা শুরু করেছে, এমন খবর আমরা সংবাদমাধ্যমেও দেখতে পাই অহরহ।