📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ইসলাম ও ফ্রান্স : শার্লি এদোর নেপথ্যে

📄 ইসলাম ও ফ্রান্স : শার্লি এদোর নেপথ্যে


ইসলাম ও ফ্রান্সের মধ্যে প্রথম পরিচয়টি অষ্টম শতাব্দীর শুরু থেকে, বিশেষত ৭১৮ খ্রিস্টাব্দে। অর্থাৎ মুসলমানরা আন্দালুস জয় করার মাত্র কয়েক বছর পরই। বর্তমান ফ্রান্সের মূল ভূমিকে মুসলমানরা তখন 'গ্রেট ল্যান্ড' বা 'মহান ভূমি' নামে অভিহিত করত। সে বছর স্পেনবিজয়ী তারিক বিন যিয়াদ তার সেনাবাহিনী নিয়ে এক অনুসন্ধানী অভিযানে বের হন। একের পর এক জয়ের পর মুসলিমরা আরবোন (নরবোনে) বিজয়ে সক্ষম হয়। কিন্তু ৭১৫ সালে মুসলিম বাহিনীর সেনা-কমান্ডার সামাহ বিন মালিক আল খুলানি শহিদ হওয়ায় প্রথম প্রচেষ্টার সমাপ্তি হয় এবং মুসলমানরা বার্সেলোনায় তাদের শক্ত ঘাঁটিতে ফিরে যায়।
১০ বছর পর মুসলমানরা পুনরায় নতুন বিজয়ের জন্য ফ্রান্সের দরজায় করাঘাত করে। সুহাইম আল কালবির নেতৃত্বে এক বাহিনী ফ্রান্স বিজয়ে সক্ষম হয়। তাদের বিজয়াভিযানের ফলে প্যারিস তখন মাত্র ১০০ মাইল দূরে ছিল। এখানেই থেমে ছিল না। বরং আবদুর রহমান গাফিকির নেতৃত্বাধীন বাহিনী নতুন ভূমি যুক্ত করার মানসে ৭৩২ 'বর্দে' হতে অভিযান শুরু করেন। একপর্যায়ে 'পয়োটার্সে' তাদের অভিযান থেমে যায়। সেখানে বালাতুশ শুহাদা নামক বিখ্যাত লড়াইয়ে মুসলিম বাহিনীর পরাজয় হয়। ফলে উত্তরে মুসলিমদের অগ্রাভিযান থেমে যায়। তবে তা এ অঞ্চলের ক্ষমতার চিত্র বদলে দেয়নি। তারা ৭৩৭ সালে মার্সেই এবং ৮৮৯ সালে সেন্ট-ট্রয়েসকে মুসলিম ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করে। দশম শতাব্দী পর্যন্ত এখানে মুসলিমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।
আন্দালুসের পতনের পর ফ্রান্স আর মুসলিমদের মধ্যে সম্পর্কের মোড় ঘুরে যায়। এবারের সম্পর্কে কোনো শত্রুতা নেই, বরং যৌথ দুশমন স্পেনের ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধে এক হয়ে যায় তারা। স্পেনের যে সকল মুসলিম আফ্রিকায় না গিয়ে ইউরোপে থাকতে চায়, তাদের ফ্রান্স স্বাগত জানায়। তারা সেখানে ধর্মকর্মসহ সকল ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হয়। বিশেষত ফ্রান্সিসরা যখন ইসলামে প্রবেশ করতে থাকে। ১৬০৫ সালে স্পেনের 'মরিসকোদের' (যারা প্রাণের ভয়ে খ্রিস্টান ধর্ম প্রকাশ করে কিন্তু আদতে মুসলিম) একটি প্রতিনিধিদল ফ্রান্সের বাদশাহ চতুর্থ হ্যানরির নিকট স্পেনের রাজা তৃতীয় ফিলিপের বিরুদ্ধে সহযোগিতা চায়। তিনিও তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এক পাগল পাদ্রীর হাতে বাদশাহ নিহত হওয়ায় নতুন করে মুসলিমদের সেখানে যাওয়ার স্বপ্ন ফিকে হয়ে যায়।
মুসলিমদের একের পর এর দুর্গের পতনের পর বাকি ছিল উসমানি সালতানাত। যা সাইক এবং পিকেটের ষড়যন্ত্রে যেমন ইচ্ছে ব্যবহৃত হচ্ছিল। মুসলিম ও ফ্রান্সের সম্পর্কে নতুন বাঁক দেখা দেয়। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ফ্রান্স তার নৌবহর পাঠিয়ে সেখানকার জনশক্তি ও বিভিন্ন খনিজদ্রব্য ফ্রান্সে আনতে থাকে। আফ্রিকার সম্পদে গড়ে উঠতে থাকে ফ্রান্সের শক্তিসামর্থ্য। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সৈন্যবল জোগাতে ও যুদ্ধের পর ক্ষত সারিয়ে তুলতে ফ্রান্স মুসলিমদের আনতে থাকে। তারা তাদের ধর্মকর্মের জন্য সেনানিবাসের ভেতরও মসজিদ নির্মাণ করে। ধীরে ধীরে তাদের পরিবারও আসতে থাকে। এমনকি এক সময় ফ্রান্সে খ্রিস্টধর্মের পর ইসলাম সেখানে দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মের স্থান দখল করে। যা একসময় ধর্মনিরপেক্ষ ফ্রান্স নিজের জন্য হুমকি মনে করতে থাকে।
ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষতা: সবকিছুর আগে এবং পরে ধর্মের প্রতি শত্রুতা
কেউ যদি অ-ইউরোপীয় কোনো দেশ (মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধপীড়িত অঞ্চল বা দরিদ্র এশীয় কিংবা মঙ্গাকবলিত আফ্রিকা) থেকে ফ্রান্সে যেতে চায়, তাকে প্রথমেই ফ্রান্সের প্রজাতন্ত্রের নীতির অন্তর্ভুক্তি এবং পরিচয় বিভাগের কোর্সে অংশ নিতে হবে। এটা তাকে শেখাবে ফ্রান্স একটি ধর্মহীন রাষ্ট্র। কিন্তু এখানে পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। তবে বাস্তবে এ কথিত স্বাধীনতার অর্ধাংশও পাওয়া কঠিন। ফ্রান্স ১৯০৫ সালে রাষ্ট্র হতে গির্জাকে আলাদা করার পাশাপাশি ফ্রান্সকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়ে আইন পাস করে। যে আইনের কোনো ধরনের ব্যাখ্যা চলবে না; যেন আসমানি নির্দেশনা। এটা নিশ্চিত করার জন্য দুটি বিশেষ অথরিটি আছে। তারা হালাল-হারাম পর্যন্ত নির্ধারণ করে।
ইসলাম সম্পর্কে ফ্রান্সের রাজনৈতিক স্রোতের মনোভাব
বর্তমান ডানপন্থি রাজনৈতিক পরিভাষা মূলত ফ্রান্সের রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের আধ্যাত্মিক পিতা ম্যারিন লুবিনের মতাদর্শনের রূপায়ণ। এদের মূল ফোকাস হলো অ-ফ্রেঞ্চদের বিরোধিতা করা। এরাই মূলত ফ্রান্সে ইহুদিদের উপস্থিতির বিরোধিতা করেছিল। যদিও বর্তমানে তারা তা থেকে নিজেদের দায়মুক্তির দাবি করে। কিন্তু বর্তমানে তারা মুসলিম আইডিওলজির বিরোধিতাকে তাদের প্রচারণার মূল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে।
এদের এই ডানপন্থার আদর্শই মূলত বর্তমানে বিশ্বব্যাপী কাজ করছে। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী মূলত এদের আদর্শেরই অনুসারী। বর্তমান ফ্রান্সের ডানপন্থিরাও ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিরোধিতার কোনো সুযোগকে হাতছাড়া করে না। ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী তার বিবৃতিতে বলেছেন, 'ধর্মের সাথে তাদের কোনো বিরোধ নেই। সমস্যা শুধু ইসলাম বা ইসলামি 'চরমপন্থা' নিয়ে। সাবেক ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি ফ্রান্সের স্কুলগুলো মুসলিম ছাত্রদের জন্য হালাল খাবার ও হিজাবের সোজাসাপ্টা বিরোধিতা করেছেন।
অন্যদিকে বামপন্থিরা মুসলিম কমিউনিটির প্রতি তুলনামূলক ইতিবাচকতা দেখায়। বামপন্থি রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে সন্ত্রাসবাদকে জড়ানোর বিরোধিতা করেছেন। সাবেক বামপন্থি প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সে একাধিকবার বলেছে, 'ইসলাম গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মূল্যবোধের পরিপন্থি নয়। ফ্রান্সে তাদেরও অন্য নাগরিকদের মতো অধিকার আছে। সন্ত্রাসের বলি হওয়া থেকে তারাও নিরাপদ নয়। বামপন্থিরা ডানপন্থিদের মুনাফিক আখ্যায়িত করে বলেন, 'তারা বাদশাহ সালমানের সাথে আলোচনা করে, সেখানে কী হচ্ছে তা জানা সত্ত্বেও তারা তার নিকট উদ্বেগ প্রকাশ করে না। খ্রিস্টানদের ধর্মীয় পোশাকে আপত্তি না থাকলেও তাদের মুসলিমদের পোশাকে আপত্তি। ইসরায়েলি কোনো মন্ত্রী কোনো নারীর সাথে হ্যান্ডশেক করা থেকে বিরত থাকলে তারা চটে না, তারা বেজার হয় যদি কোনো মুসলিম হাত মেলানো থেকে বিরত থাকে।'
ফ্রেঞ্চ ইসলাম
যে ফ্রান্স এখনো ধর্ম থেকে দূরে থাকা এবং রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে দূরে রাখা নিয়ে গর্ব করে, তারা প্রকৃত ইসলামের প্রচার-প্রসার করবে- এমন চিন্তা করাও কঠিন। ইসলামের বিরোধিতার জন্য তারা মূলত দুভাবে কাজ করে। পরোক্ষভাবে ইসলামিক যেকোনো অনুষ্ঠানে প্রশাসনিক ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের মডারেশন করা। প্রশাসনের সাথে মুসলিম কমিউনিটির দৃঢ় বন্ধন তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ব্যবহারের চেষ্টা করা। প্রত্যক্ষভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সেল মুসলিম কমিউনিটি সংগঠনের বিষয়ে ছাড়পত্র দেয়া।
অনেকে মনে করতে পারেন, সাম্প্রতিক সময়ের অস্থিরতার কারণে ফ্রান্স প্রশাসন এ ব্যবস্থা নিয়েছে। না, তা নয়। এটা বরং বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে নেয়া পদক্ষেপ। ১৯৯৭ সালে সে সময়ের ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার কথা বলেন, যা ইসলামকে ফ্রান্সের অনুকূলে নিয়ে আসবে। তিনি এক জনসভায় মুসলিমদের বলেন, 'আমরা প্রতিষ্ঠান করতে চাই। আমরা ফ্রেঞ্চ ইসলামের প্রতিষ্ঠা করতে চাই।' ২০০৩ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'আজ ফ্রান্সের মুসলিমরা ফ্রেঞ্চ ইসলাম গ্রহণ করছে। এ ইসলাম তাদের বংশধররাও বহন করবে। আমরা এমন ইমাম চাই, যারা আমাদের সভ্যতা ধারণ করবে, আমাদের যুবকদের সাথে কথা বলতে পারবে, আমাদের সাথে আমাদের ভাষায় কথা বলবে।' ২০১৬ সালে মুসলিম প্রতিষ্ঠানে অমুসলিম প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেয়া হয়, যা মূলত ইসলামি জ্ঞানে পাণ্ডিত্য রাখেন এমন ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত।
বাকস্বাধীনতা বনাম অবমাননা
শার্লি এবদোর ঘটনাকে পশ্চিমা দুনিয়া বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে। এ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন বিতর্ক। (পুরনো বিতর্ক নতুন করে) 'মত প্রকাশের স্বাধীনতা কি সীমাহীন?৩৭ ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১৯তম ধারায় বাকস্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হলেও ১২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, 'কাউকে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিবার, বসতবাড়ি বা চিঠিপত্রের ব্যাপারে খেয়ালখুশি মতো হস্তক্ষেপ অথবা সম্মান ও সুনামের ওপর আক্রমণ করা চলবে না।' ২৯-এ বলা হয়েছে, 'স্বীয় অধিকার ও স্বাধীনতাগুলো প্রয়োগকালে প্রত্যেকেরই শুধু ওই ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকবে, যা কেবল অন্যের অধিকার ও স্বাধীনতাগুলোর যথার্থ স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধা নিশ্চিত করে ...।' ১৯৬১ সালের নভেম্বরে গৃহীত মানবাধিকার কনভেনশনের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বাক ও চিন্তার স্বাধীনতাকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি বলা হয়েছে, 'স্বাধীনতা নিঃশর্ত বা চূড়ান্ত নয়। বাকস্বাধীনতা ব্যক্তির মর্যাদা, জনগণের মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলার প্রতি আক্রমণাত্মক হতে পারবে না।' পোেপ ফ্রান্সিস অতি সম্প্রতি বলেছেন, 'বাকস্বাধীনতার সীমা থাকা উচিত।' (কালের কণ্ঠ ১৬-০১-১৫ ইং) চীন, রাশিয়াসহ অসংখ্য দেশে বাকস্বাধীনতাকে শর্তযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। বাকস্বাধীনতা শর্তহীন নয় বলেই প্রতিটি দেশেই আদালত অবমাননা আইন প্রবর্তিত হয়েছে। এটা স্পষ্ট যে, যা ইচ্ছা তা-ই বলে যাওয়া, লিখে যাওয়া, দেখা মাত্র কাউকে গালাগাল দেওয়া বাকস্বাধীনতা হতে পারে না। বাকস্বাধীনতা মানে মিথ্যাচার নয়, বিদ্বেষ ছড়ানো বাকস্বাধীনতা নয়। বাকস্বাধীনতা মানে সত্য বলার অধিকার।
বাকস্বাধীনতা নিয়ে পশ্চিমাদের দ্বিমুখী নীতি : পশ্চিমারা অব্যাহতভাবে ইসলাম অবমাননাকে বাকস্বাধীনতা বলে চালিয়ে দিলেও ব্রিটিশ রাজবধূ কেটের নগ্ন ছবি ছাপানো নিষিদ্ধ করেছে। ওই সব ছবি ছাপানোর দায়ে একটি ফরাসি পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে নিয়ে বহু নাটক বিশ্ববাসী দেখেছে।
গত গ্রীষ্মে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলিরা ১৭ জন সাংবাদিক হত্যা করলেও হয়তো সেটা বাকস্বাধীনতার ওপর হামলা নয় (!) বলেই বিশ্বনেতারা এককাতারে সমবেত হননি। যুক্তরাজ্যে প্রচলিত ব্লাসফেমির আওতায় মুসলমানরা সালমান রুশদির বিচার চাইলেও বুঝতে দেরি হলো না, এ আইন খ্রিস্টধর্মের জন্য! ইসলামের অবমাননার জন্য নয়! দুর্ভাগ্যক্রমে রুশদি ও তাঁর বই নিয়ে ব্যঙ্গ করে তৈরি করা পাকিস্তানি একটি চলচ্চিত্র যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ কর হয়। এমনকি মুসলমানরা কেন পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে দিন দিন খেপে যাচ্ছে, এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি কিছু চলচ্চিত্রের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সন্দেহজনক ফ্রেঞ্চ ইসলাম
ইসলামের সাথে ফ্রান্সের সম্পর্ক বেশ প্রাচীন। কখনো সরাসরি সংঘাত, কখনো লিয়াজোঁকেন্দ্রিক। এটা প্যারিসের বহুল চর্চিত পদ্ধতি। নেপোলিয়ন মিসর দখল করা সত্ত্বেও নিজের নাম মুহাম্মাদ রেখে ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তার দুরভিসন্ধি মিসরের আলেমদের নিকট গোপন করতে পারেননি। উপনিবেশিক দেশগুলোতে মুসলিমদের নির্মম নির্যাতনকারী জেনারেল হার্বার কিন্তু প্যারিসের সবচেয়ে বড়ো মসজিদের অর্থায়নকারী।
উপরের তথ্যের আলোকে ফ্রেঞ্চ ইসলাম-প্রচারের মাধ্যম 'ফ্রান্স ইসলামিক ফাউন্ডেশন' নামক প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য, দিকনির্দেশনা এবং বার্তা ধর্মীয় বা ধর্মনিরপেক্ষ হোক, উপেক্ষা করা উচিত নয়। এই প্রকল্প সফল হতে পারে।
আবার মুসলমানরা এতে জড়িত না বলে এটি ব্যর্থ হতে পারে। এখানে সবকিছুই সম্ভব। তবে সবক্ষেত্রেই মুসলমান এবং পশ্চিমাদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সভ্যতার যুদ্ধ একটি নতুন মোড় গ্রহণ করছে বলে মনে হয়।

টিকাঃ
[৩৭] কালের কণ্ঠ ১৪-০১-১৫ ইং

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 কানাডায় ইসলামোফোবিয়া : একজন খ্রিষ্টান নারীর নির্মোহ পর্যবেক্ষণ

📄 কানাডায় ইসলামোফোবিয়া : একজন খ্রিষ্টান নারীর নির্মোহ পর্যবেক্ষণ


আমি একজন খ্রিস্টান শ্বেতাঙ্গ। চতুর্থ প্রজন্মের একজন কানাডিয়ান। এই তিনটি কারণে অন্য অনেক কানাডিয়ানের চেয়ে আমার জীবন অনেক সহজতর হয়েছিল। কখনো বর্ণবাদের নৃশংস আক্রমণের শিকার হইনি। যেখানেই যাই, গলায় ক্রসচিহ্ন পরেই যাই, কেউ কিছু বলে না। প্রকাশ্যে আমি আমার ধর্ম আমার শরীরে ফুটিয়ে তুলে চলাফেরা করি- কিন্তু কখনো চরমপন্থি বলে কেউ গালি দেয় না। এই এখন আমার সুবিধাগুলো নিয়ে খুব ভাবছি, যখন ইসলামোফোবিয়ার শিরশির হাওয়ায় প্রতিটি অমুসলিম ভেতরে ভেতরে কাঁপছে। মুসলিমদের ওপর যে অ্যাটাক এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ড চলছে, এগুলো ঘটাচ্ছে আবার আমারই বর্ণের শ্বেতাঙ্গরা। আমার বর্ণের মানুষগুলো ইসলামোফোবিক আক্রমণ করছে এইজন্য আমি আমাকে নিয়ে ভাবছি না, বরং আমি ভাবছি এরা মুসলিমদের চেনেই না। না চেনা এবং না জানা থেকে তাদের ভেতর এক অদৃশ্য ভয় তাদেরকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়োয়। আমি লক্ষ্য করেছি, আমার মতা সুবিধাভোগী কানাডিয়ানরা মুসলিমদের প্রতি দারুণ বিরক্ত এবং প্রকাশ্য বিরোধী। কিন্তু কেন?
আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করিড়মুসলমানদের যথার্থভাবে ফুটিয়ে না তোলার কারণে মিডিয়ায় কিংবা বইয়ে, এই দেশের লোকদের মনে মুসলিমদের প্রতি প্রচুর নেতিবাচক মনোভাবের জন্ম নেয়। কানাডায় খুব অল্প মুসলমান। যেহেতু আমার শৈশব কেটেছে শ্বেতাঙ্গ স্কুলে, চার্চে, কখনো মুসলমানদের সংস্পর্শেও আসিনি, সেহেতু মুসলিমদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব জন্ম নেয়ার অনেক সুযোগ ছিল। কিন্তু আমার সৌভাগ্য- আমার কমিউনিটি আমাকে অন্য ধর্মের বিশ্বাস, আচার-আচরণ বিশেষ করে মুসলিমদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হতে দেয়নি। ৯/১১-র হামলার পর সবাই যখন ভীত সন্ত্রস্ত, তখন আমাদের কমিউনিটি প্রধান মসজিদের ইমামকে ডেকে এনে বললেন, 'ইসলাম এবং সন্ত্রাসবাদ এক নয়। ইসলাম কখনো সন্ত্রাসবাদ সমর্থন করে না। এগুলো আমার কমিউনিটিকে বুঝিয়ে দিন।' ইমাম সাহেব এত সুন্দর করে বিষয়টি ফুটিয়ে তুললেন, কমিউনিটির লোক এবং আমার বাবা-মা বিষয়টি খুব স্পষ্ট করে বুঝে গেলেন। ইমামের বয়ানের পর ওদের ভেতর কাজ করতে থাকা ভয় যেন নিমেষেই হাওয়া হয়ে গেলো।
এরপর যখন হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই, স্কুল বোর্ড নিয়ন্ত্রিত 'স্টুডেন্টস টুগেদার অ্যাগেইনস্ট রেসিজম' (এস.টি.এ.আর) নামে একটি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের সুযোগ পাই। প্রশিক্ষণে আমাদের শেখানো হয় পক্ষপাতদুষ্টতা, গোঁড়ামি এবং বৈষম্যের সংজ্ঞা। আমার সহনশীল বিশ্বাস এবং বিশ্বদর্শন এই প্রোগ্রামটির মাধ্যমেই উন্নত হয়েছিল। আমার হাইস্কুলে ছাত্র-ছাত্রী ছিল দুই হাজার। একদিন একটি মুসলিম মেয়ে রোজা রেখে, হিজাব পরে স্কুলে আসে। তখন তাকে ক্লাসের সবার সামনে রোজা এবং হিজাব নিয়ে কিছু বলতে দেয়া হয়। সে তার মত করে রোজা এবং হিজাবের বিষয়টি ফুটিয়ে তোলে এবং কারো কারো প্রশ্নের উত্তরও দেয়। এতটুকু স্পেস আমাদের কমিউনিটি অন্য ধর্মকে দিত। দেয়ার কারণেই ওইদিন আমরা নতুন কিছু জানতে পেরেছিলাম। হয়তো অনেকের মনে এসব নিয়ে প্রশ্নও ছিল। কিন্তু মুসলিম মেয়ের বর্ণনার কারণে তা দূর হয়ে গেলো।
মুসলিম অন্য কেউ না, আমাদেরই দেশে, কমিনিউটিতে বাস করে। মিডিয়া তাদের কীভাবে দেখালো, তা বিচার না করে ইসলাম আসলে কী বলে তা খতিয়ে দেখা উচিত। মুসলিমরাই কেবল তাদের নিজেদের রক্ষা করবে এমন নয়, বরং আমাদেরও তাদের প্রতিরক্ষায় দাঁড়াতে হবে। ইসলাম সম্পর্কে না জেনে যারা ফোবিয়া ছড়াচ্ছে, সেইসব বর্ণবাদীদের পক্ষে কেন দাঁড়াবেন? কেউ যখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে কথা বলে, আমি ভাবি সে মুসলমানদের সম্পর্কে না জানার কারণেই এসব বলছে। কথায় আছে- 'অজ্ঞতা ডেকে আনে ভয়। ভয় ডেকে আনে ঘৃণা।' তাই ছোট থেকেই বাচ্চাদের শেখাতে হবে সহনশীলতা। তাহলে বড়ো হয়ে তারা উগ্র, অসহনশীল হবে না। আমি এর জ্বলন্ত প্রমাণ। বর্ণবাদী হওয়ার যাবতীয় পরিবেশ আমি পেয়েছি। কিন্তু সহনশীলতা শিক্ষা পাওয়ার কারণে নেতিবাচক মনোভাবে আক্রান্ত হইনি। আশা করি আমরা যদি আমাদের সন্তানদের সেই শিক্ষা দিতে পারি, তাহলে তারা আমাদের চেয়েও বেশি অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও সুরক্ষা দিতে পারবে!
ভাষান্তর : রাকিবুল হাসান

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলামোফোবিয়া

📄 মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলামোফোবিয়া


সমসাময়িক বিশ্বে সবচেয়ে বহুল পরিচিত এক তত্ত্ব হলো 'ইসলামোফোবিয়া'। বিশ্বে নানান জাতি, নানান বর্ণ, বিচিত্র সংস্কৃতি আর বিভক্ত ধর্মে পরিচিত মানুষ। যেখানে সবার একটা অভিন্ন পরিচয় হলো মানুষ। তবে মুসলমান মানুষের বড় পরিচয় এখন সন্ত্রাসী হিসেবে, ইসলামবিদ্বেষী মনোভাবে মানুষের পরিচয় ছাপিয়ে তাকে এক ধর্মান্ধ জাতি হিসেবে বিবেচনার শিল্পের প্রচলন এখন দারুণ অবস্থায় পৌঁছেছে। পশ্চিমা স্বার্থে ইসলামোফোবিয়া শিল্পের বাম্পার ফলন দেখা যায় আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যে, এশিয়া থেকে আমেরিকা এবং সর্বশেষ ভৌগলিক অবস্থায় সর্ব দক্ষিণে থাকা নিউজিল্যান্ডে।
বর্ধিষ্ণু ইসলামোফোবিয়া কেবল পশ্চিম ইউরোপের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আজ তা বলকানের মুসলিম দেশগুলোতেও ভয়ানকরূপ ধারণ করছে। কিন্তু কেনই বা এমন হচ্ছে? এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে কারা? তা খতিয়ে দেখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে একটি তুর্কি গবেষণা সংস্থা ইউরোপ ও বলকান অঞ্চলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর পেছনের সত্যকে বের করে এনেছে।
চারশ' বছরের অধিক সময় ধরে বলকান মুসলিম অঞ্চলের সাথে ইসলামোফোবিয়া জুড়ে যাওয়ায় তা এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে কৌতূহলোদ্দীপক পাঠ্য। বলকান অঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ আলবেনিয়া, কসোবো ও বসনিয়া মুখোমুখি হচ্ছে ইসলাম-বিদ্বেষমূলক (বহু কর্মকাণ্ডের) নানা বাকবিতণ্ডায়। অধিকন্তু ম্যাসেডোনিয়া, সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর আদিবাসী মুসলমানদের বহুলাংশই ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত “Islamophobia in Muslim Majority Societies" বইটি অবান্তর ও আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী মানসিকতার জবাব দিয়েছে। 'ইসলামোফোবিয়ার কলকব্জা নানাভাবেই চালিত হতে পারে। তবে মূলত তা বৈশ্বিক রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই রাজনীতি উত্তর- উপনিবেশী একটি পর্যায়; যা মূলত আমেরিকার সম্পৃক্ততায় তৈরি হয়েছে।' এ দাবি বইটির রচয়িতাদের।
ইসলাম-বিদ্বেষী মনোভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আমেরিকা। Hijacked by Hate: American Philanthropy and the Islamophobia Network নামক প্রতিবেদনে ২০১৯ সালে চিত্রিত হয়েছে মুসলিম-বিদ্বেষী প্রচারণা ছড়িয়ে দিতে ১০৯৬টি সংস্থা দায়বদ্ধ। যারা অকাতরে অর্থ ঢেলে যাচ্ছে। হিসাবটা প্রায় ৩৯ মিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। ফলে ইসলামোফোবিয়া আটলান্টিক ছাড়িয়ে ইউরোপ ও বলকানের দেশগুলোতে চলে গেছে এবং সেখানকার মুসলমানদের সাথে মিলেমিশে হয়ে গেছে একাকার। তাই মুসলিম-বিরোধী মনোভাব বেড়েছে হু হু করে। আত্ম- পশ্চিমীয় ও মুসলমানদের একাংশ যারা অভিজাত (নিজেদের মনে করে) যেমন- বলকানিরা ইসলামি বিধি-বিধানকে নিছক পরিচয় হিসেবে দেখতো; আর সাথে সাথে তা পশ্চিমী ধর্মনিরপেক্ষ দেশের জন্য আশঙ্কাজনক হিসেবেও বিবেচিত হতো।
২০১৯ সালে প্রকাশিত ইসলামোফোবিয়া রিপোর্টে তুর্কি সাংবাদিক নাদা দোস্তী আলবেনিয়ায় মুসলিম-বিদ্বেষী প্রচারণা চিহ্নিতকরণ, বিশ্লেষণ ও সমাধান করা আলবেনিয়া ও আলবেনিয়ান ভাষাভাষী দেশগুলোতে জরুরি বলে দাবি করেন। তুর্কি সংবাদ সংস্থা TRT World-কে তিনি আরও জানান, আলবেনিয়ায় প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানাভাবে নেতিবাচক প্রচারণার ফলে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, গণমাধ্যম প্রতিনিধিত্ব ও বিচারব্যবস্থাসহ জীবনের নানা পর্যায়ে তীব্র থেকে তীব্রতর ইসলামোফোবিয়ার দেখা মিলছে।
২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলায় ৫১ জন শহিদ হওয়ায় আলবেনিয়ান কাস্তরিয়ত মাইফতরাজ নামক একব্যক্তি আলবেনিয়ান মুসলিমদের বিরুদ্ধেও অনুরূপ ব্যবস্থা প্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করে।
ইসলাম-বিদ্বেষী প্রচারণার ক্ষেত্রে 'ইসলামোফোবিয়া'র ইন্ধনদাতার ভূমিকায় থাকে রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকরা। ফলত আলবেনিয়ায় ইসলামোফোবিয়া দিন দিন চিরাচরিত স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে বলে দোস্তীর দাবি।
এ প্রতিবেদনের কসোবো অংশের লেখক আদেম ফেরিজাজের মতে, কসোভো; যার ৯৬ ভাগ মুসলিম। তারা ইসলামোফোবিয়ার তীব্র উপস্থিতি আঁচ করতে পারছেন জীবনের পরতে পরতে। রাষ্ট্র হিসেবে যা কসোভোর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অধিকন্তু মুসলিম গণহত্যার মদতদাতা (যদিও তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন) অস্ট্রিয়ান ঔপন্যাসিক পিটার হ্যান্ড সাহেবকে (২০১৯ সালে) সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করায় দেশটিতে ইসলামোফোবিয়ার আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
সাহিত্যাঙ্গনের সবচেয়ে মূল্যবান পুরস্কার এমন ব্যক্তিকে দেয়ায় বসনিয়া হার্জেগোভিনা, কসোভোর মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি মূল ধারার ইউরো-আটলান্টিকিদের উপেক্ষার কথাই বলছে না; বরং এ অনুষ্ঠান ইউরোপীয় রাজনীতিবিদদের দিয়ে কসোভোর অধিকার অস্তিত্বের বিরুদ্ধে ইসলামোফোবিয়ার আক্রমণকে সহজ ও সুগম করে তোলারই একটি পদক্ষেপ। কসোভোতে দৃশ্যত (হিজাব, দাড়ি) ইসলামচর্চায় মুসলমানগণ প্রতিনিয়ত নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। আর এটাও স্মরণীয় যে, বলকানের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষত বসনিয়া ও কসোভোতে ৯০ শতকের দিকে গণহত্যাগুলোর মূল কারণ ছিল ইসলামচর্চা। এ অঞ্চলের বহু মানুষ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ফলে জীবন হারায়।
ভাষান্তর: হাবিবুর রহমান রাকিব

টিকাঃ
[৩৮] দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলকে বোঝায়। এর পূর্বে কৃষ্ণ সাগর, পশ্চিমে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর, দক্ষিণে ভূমধ্যসাগর। দানিউব, সাভা ও কুপা নদীগুলো অঞ্চলটির উত্তর সীমানা নির্ধারণ করেছে। বুলগেরিয়া থেকে পূর্ব সার্বিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বলকান পর্বতমালার নামে অঞ্চলটির নাম এসেছে।

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 জেন্ডার ও ইসলামোফোবিয়া

📄 জেন্ডার ও ইসলামোফোবিয়া


দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একটি রেস্টুরেন্ট। সাতজন হিজাব পরিহিত মহিলা প্রায় ৪৫ মিনিট সেখানে অবস্থান করেন। পুরো সময়জুড়ে তাদের পুলিশি নজরদারিতে রাখা হয়। এরপর, সেই সাতজন নারীকে হিজাব পরিধান করার অপরাধে গ্রেফতার করা হয়। তাদের আদালতে হাজির করা হয়। এখান থেকে প্রতিয়মান, মুসলিম নারীদের জন্য রেস্টুরেন্টে আহারাদি গ্রহণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে, তার ওপর হিজাব পরিহিত হলে তো আর কথাই নেই। এ তীব্র প্রচারণাটি আমেরিকা, ইউরোপ ও বেশকিছু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও আগ্রাসী ও সহিংসতার রূপ নিচ্ছে।
ইউরোপীয় ধর্মনিরপেক্ষতার জের ধরে ফ্রান্স ও হল্যান্ডে হিজাব নিয়ে বিতর্ক দিন দিন তুঙ্গে উঠছে। পর্যায়ক্রমে ইউরোপীয় পরিচয়টি সংজ্ঞায়িত হচ্ছে এটি কী তা দিয়ে নয়; বরং ভবিষ্যতে এটি কী হবে তা দিয়ে। ইউরোপিয়ান পরিচয় গড়ে তোলা হয়েছে যা মুসলমানদের দলছুট বলে বিবেচনা করে। অপরদিকে মুসলিম নারীদের সমাজবহির্ভূত জ্ঞান করা হচ্ছে। মুসলিম নারীদের হিজাব পরিধান করা (তাদের আঁতে ঘা দিয়ে) পশ্চিমা ও ইউরোপীয় পরিচয় রক্ষার্থে এবং ইসলাম, মুসলিম নামক হুমকিকে প্রতিহত করতে ডানপন্থি রাজনৈতিক দলকে (টনক নাড়িয়ে) সুসংহত করেছে।
একাধিক পন্থায় ইউরোপীয় ও আমেরিকান সমাজে বর্ণবাদী মনোভাবে ঘি ঢালতে মুসলিম নারীদের ইন্ধন হিসেবে ব্যবহার করে ইসলামোফোবিয়ায় গতি সঞ্চার করা হয়। একইভাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ তুরস্কে হিজাবের বিরুদ্ধে বহুদিন ধরে প্রচারণা চলমান ছিল। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে হিজাব, ঐতিহ্যগত মুসলিম নিকাব আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা বিবর্জিত প্রতীক। তাই আধুনিকতায় প্রবেশের এবং উন্নত হিসেবে দাবি করার পূর্বশর্ত ছিল এ আবরণটি বলপূর্বক অপসারণ করা।
বলাবাহুল্য, যে আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে উপনিবেশিক যুগে পরিচিতি লাভ করে এবং পশ্চিমারা ইসলামকে জাগতিক অনুন্নতির জন্য দোষারোপ করে। ইউরোপ আমেরিকার রাষ্ট্রীয় নৈপুণ্যের হাত ধরে মুসলিম জাতিগুলো যখন উন্নয়ন ও আধুনিকতার (স্বপ্নে বিভোর হয়ে) প্রাথমিক ধাপগুলো পার হচ্ছিল তখন ছিল মুসলিম হিজাব পরিহিতাদের জন্য দুঃসময়।
ঔপনিবেশিক চিন্তাধারা আর মুসলিম জাতিগোষ্ঠী একই আবর্তে বৈধতাপ্রাপ্তির দিকে তাড়িত হয়। সাথেসাথে মুসলিম নারীদের সমস্যাজনক বিবেচনাটা স্বাভাবিক হতে থাকে। ঔপনিবেশিক ও বিকৃত সেকুলার আধুনিকতার চোখে মুসলিম নারীর হিজাব পরিধান কোনো প্রকার ধার্মিকতার প্রতীক বলে বিবেচিত হয় না বরং তা পশ্চাদপদতা ও অসঙ্গতির প্রতীক। এ চিন্তার ধারক- বাহকদের নিকট হিজাব অপসারণ করাই আধুনিকতা আর প্রাসঙ্গিকতার প্রতীক। অপরদিকে সে সমাজে তখন হিজাব পরিহিতারা নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতেন। মুসলিম প্রেক্ষিতে আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা উপনিবেশিকতার গর্ভে লালিত হয়েই এসেছে। আর জন্ম দিয়েছে একটি বিকৃত জাতি-রাষ্ট্র প্রকল্প যেখানে গঠনমূলক সামাজিক চুক্তি, নাগরিকত্বের মৌলিক বাস্তবায়ন এবং প্রত্যেকের মৌলিক অধিকারের নিতান্ত অভাব পরিলক্ষিত হয়।
ইসলামোফোবিয়া ইন্ডাস্ট্রি, আধুনিক সেকুলার আর ঔপনিবেশিকদের অব্যাহত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় হিজাবি মুসলিম নারী। আধুনিকীকরণ ও সেকুলারাইজেশনের নামে মুসলিম নারীকে হিজাব বর্জনের নির্দেশনা প্রদান করা হয়, যদি না করে তাদের হিজাব ছাড়তে বাধ্য করা হয়; কেননা পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে মুসলিম নারীগণের বুদ্ধির স্বল্পতা রয়েছে। তারা নিজেদের ভালোটা বোঝার জ্ঞান রাখে না।
এই বর্ণবাদী মনোভাবটি ইসলামোফোবিয়ার কুশীলব ও অরিয়েন্টালিস্টদের হিজাব বিষয়ে মৌলিক অবস্থানটি পরিষ্কার করে। হিজাবকে কেন্দ্র করে নারীর প্রতি এহেন অবমননাকর ধারণা পোষণ করা হয়- বিশেষত যেসব নারী জনসমক্ষে হিজাব পরিধান করে তাদের সম্পর্কে। মুসলিম নারীদের সভ্য করার জন্য আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে তত্ত্ব ও মতাদর্শের খোলসে মুড়িয়ে এই চলমান ও বৈশ্বিক প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রজেক্ট হাল আমলের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজেক্ট হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। হিজাবী নারীদের প্রতি তেড়ে আসা সকল আক্রমণই গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয় যখন তা সভ্যতা সমুন্নত রাখা, পিছিয়ে পড়া মুসলিম মেয়েদের আলোকিতকরণের নাম করে করা হয়।
মুসলিম নারী হয়রানি ঘটনার যেন কোনো অন্ত নেই। যার আওতায় যেমন আছে তীব্র মৌখিক আক্রমণ তেমন আছে শারীরিক হুমকি; যার মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিপর্যায়ে সহিংসতা ও হিজাব ছিনিয়ে নেয়া। উন্মাদনার ধোঁয়াশায় আরও একটু ঘৃতাহুতি দিতে যুক্ত করে, মুসলিম হিজাব পরিহিতা নারী প্যাসিভ সন্ত্রাসবাদের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই এটি একটি চ্যালেঞ্জ যা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। ইসলামি অন্যান্য নিদর্শনের চেয়ে তারা ডানপন্থি বামপন্থি উভয় চরম মাত্রার ইসলামোফোবিয়াকে ত্বরান্বিত করতে মুসলিম নারীদের মাথায় পরিহিত এ পোশাককে কাজে লাগায়। আর তারা সভ্যতা নামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। তাই সভ্যতা রক্ষার নামে ইসলামোফোবিয়ার প্রচারণা কোনো কলঙ্কজনক কিছু নয় বরং তা বর্ণবাদী জনতার লক্ষ্যকে ত্বরান্বিতকারী।
ইসলাম বিদ্বেষের নানা রূপই সমাজে উপস্থিত। তবে সবচে দৃঢ় ও ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী ভূমিকা ললালিত হয় মুসলিম নারীদের কেন্দ্র করে। কেননা হিজাব দৃশ্যমানভাবে চিহ্নিতকরণের কাজ করে। ইসলাম-বিদ্বেষের বিদ্যমান তথ্য ও গবেষণায় দেখা যায় যে, মুসলিম নারীদের প্রতি সহিংসতা ও বৈরিতার ঘটনার আরও বেড়ে চলার দিকে ইঙ্গিত করে। মুসলিম মেয়েরা মুসলিম পুরুষদের তুলনায় মারাত্মক আক্রমণের শিকার হয় প্রতিনিয়ত; অথচ তারা পশ্চিমা সংস্কৃতি ধারণ করে নিমেষেই পশ্চিমা ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারত। বেঁচে যেতে পারত এহেন সব বৈরিতার ভয়াল থাবা থেকে। মুসলিম পুরুষরা পশ্চিমা সমাজে যেখানে ক্লার্ক কেন্ট হয়ে থাকে সেখানে মুসলিম রমণীরা সমাজে ইসলামের নিদর্শন উজ্জীবিতকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়।
ভাষান্তর : হাবিবুর রহমান রাকিব

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00