📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ইউরোপজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার হালচিত্র

📄 ইউরোপজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার হালচিত্র


কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) এবং ইউসি বার্কলে সেন্টারের রেস অ্যান্ড জেন্ডারের ২০১৬ সালের এক রিপোর্ট অনুসারে, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩২টি সংগঠন ইসলাম ও মুসলিমঘৃণা প্রচারের প্রাথমিক উদ্দেশ্য নিয়ে একটি 'অভ্যন্তরীণ কোর' গঠন করেছে৩১। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে এই সংস্থাগুলো ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি পরিমাণে অকাতরে খরচ করেছে মুসলিমবিরোধী উদ্দেশ্য হাসিলের অভিপ্রায়ে।
ইসলামোফোবিয়া বিষয়ক গবেষক ও লেখক নাথান লিয়ানের ৩২ গবেষণা মতে, ইসলামোফোবিয়া ইন্ডাস্ট্রি (২০১২), 'বিশেষজ্ঞদের' একটি আদর্শগত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকটি নিউজ এজেন্সি দ্বারা নিয়মিতভাবে মুসলিম ও ইসলামের সহিংস, নেগেটিভ ও স্টেরিওটাইপ প্রতিচ্ছবি প্রচার করা হতে থাকে। এই বিশেষ দল কেবল ইসলাম আর মুসলিমদের নির্দিষ্ট করে বাছাই করে নিয়েছে, মানুষের কাছে একে সন্ত্রাসের তকমা দেয়াটা সুচারু ভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মুসলিমবিরোধী মনোভাবের এই পদ্ধতিগত প্রচারে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, অপব্যবহার এবং সহিংসতার প্রতিবেদনলো ভয়ংকর ইঙ্গিত দেয়।
শুধুমাত্র ২০১৮ সালের জানুয়ারী থেকে জুনের মধ্যেই ইসলামোফোবিয়ার ৬০৮টি ঘটনার কথা জানায় যুক্তরাজ্যভিত্তিক টেল মামার ৩৩ প্রতিবেদনে। পরিস্থিতি এতই গুরুতর যে, গত বছর ইউরোপীয় কমিশন বিচার বিভাগের পরিচালক ইউরোপ মহাদেশজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একটি টুলকিট চালু করেছে।
এদিকে ইউরোপজুড়ে চলমান ইসলামোফোবিয়ার সকল ঘটনাকে আলাদা করে নথিভুক্ত করা হয় না। তবে আইনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সদিচ্ছায় ইসলামোফোব ঘটনাগুলো আলাদা নথিভুক্ত হলে তা প্রতিবিধান করা সহজসাধ্য হতো। দুঃখের কথা হলো, ছলচাতুরিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে ইউরোপিয়ান দেশগুলোর অনেকেই উল্টো দাবি তোলে- তারা ইসলামোফোবিয়ার অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ইসলামোফোবিয়া নামক পরিভাষা নাকি মুসলমানদের নিজেদের হাতে তৈরি। তারা নিজেদের সুবিধার জন্য এ টার্মের অবতারণা করেছে। এ জাতীয় কথাবার্তা টেনে এনে ইউরোপিয়ান সাংবাদিকগণ সাধারণ মানুষদের দৃষ্টি অন্যত্র ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে।
একটি ছোট্ট উদাহরণ- ১৯৯৫ সাল। বসনিয়া হার্জেগোভিনায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। মুসলিমদের ওপর চালানো বর্বোরচিত সেই গণহত্যাকে মিথ্যা বানিয়ে দেয় মিডিয়া, যেন দিনকে রাত বলা। ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট ও ক্রোয়েশিয়ান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তার অস্বীকৃতির আওয়াজ ওঠে জোরেশোরে। তারা বসনিয়ার নিরাপত্তার কথা তুলে বসনিয়ার ভূখণ্ডকে ভাগ করতে উদ্যত হয়।
বৈধতার চাদরে বিদ্বেষের লুকোচুরি!
ইউরোপজুড়ে যেখানে বিদ্বেষচর্চার ঢেউ, সে ঢেউকে ফেনিয়ে তুলতে অনেকের প্রচেষ্টা নজর কাড়ার মতো। ইসলামবিদ্বেষকে স্থায়িত্বদানের জন্য বৈধতার চাদরে আবৃত করার পথ খোঁজে। ইউরোপের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বেলজিয়াম। মুসলিমরা দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। এ দেশে সাংসদদের ভোটের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক পশু জবাই তথা কুরবানির প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। মূলত মুসলিমদের কুরবানির পথ রোধ করাই এ নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যে। এরই সাথে বেলজিয়ামের গ্রান্ড মসজিদ অপসারণের রব ওঠে। দেশটির প্রধান মুসলিম এ সেন্টারটি নাকি মরক্কোর গোয়েন্দায় পূর্ণ, তারা উদ্বিগ্ন হয় মসজিদে আবার উগ্রবাদের চর্চা হয় কি না?
দানিউব উপত্যকায় অবস্থিত পূর্ব-মধ্য ইউরোপের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত দেশ হাঙ্গেরি। দেশটির এক মেয়র তার অধীন এলাকায় মসজিদ-মিনার নির্মাণ, মসজিদে আজান প্রদানের সাথে সাথে মেয়েদের জন্য চাদর, নিকাব ও বোরকা নিষিদ্ধ হয়। মেয়র শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে গিয়ে বলেন, শতবছর ধরে লালিত-পালিত হাঙ্গেরির ঐতিহ্যকে রক্ষার্থেই তার এ প্রয়াস। শেষমেষ যদিও সে সফল হয়নি, আন্দোলনের তোপের মুখে এ আইন উঠিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
এমনিভাবে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, রোমানিয়াসহ বহু দেশেই হিজাব নিষিদ্ধকরণ চলছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কাতেও হিজাব নিষিদ্ধ করা হলো। মুসলামনদের নানাভাবে কোণঠাসা করতে অভিনব ও হঠকারী সব আইন নিয়ে আসে তারা। FRA-এর তথ্য মতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে হর্তাকর্তাদের নিকট দাখিলকৃত রিপোর্ট অনুযায়ী মাত্র ১২ শতাংশ মুসলিম বৈষম্যের শিকার। তবে আসল চিত্রে অন্য রূপ ফুটে ওঠে। মুদ্রার যে পিঠ আজ নামধারী সভ্য সমাজ এড়িয়ে যায়। চলুন তা দেখে নেয়া যাক- নিম্নে প্রদত্ত ঘটনাপ্রবাহ।
একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান
ডেনমার্ক ন্যাশনাল পুলিশের তথ্যমতে, ৫৬টি ইসলাম বিদ্বেষের ঘটনা নথিভুক্ত হয় শুধু ২০১৬ সালেই। সে বছরের ২০ শতাংশ ঘটনা শুধু মুসলিমদের কেন্দ্র করে। সিসিআইবি তথ্যমতে, মাত্র এক মাসে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ঘটে ৩৬টি ইসলাম-বিদ্বেষমূলক ঘটনা। EIR রিপোর্ট অনুযায়ী ২৫৬টি ইসলাম-বিদ্বেষমূলক ঘটনা তালিকাভুক্ত হয় কেবল অস্ট্রিয়াতে। 'অবজারভেটরি অব ইসলাম' নামক একটি সংস্থার তথ্যমতে, ফ্রান্সে ১২১টি ইসলাম-বিদ্বেষমূলক ঘটনা রিপোর্ট করা হয়। সরকারের হস্তক্ষেপে ১৯টি ইবাদতগাহ তথা মসজিদে তালা ঝোলানো হয়। ৭৪৯ জন মুসলিমকে ঘর থেকে আটক করা হয়। সাড়ে চার হাজারের অধিক পুলিশি হামলা চালানো হয়। সরকারি নজরদারিতে রাখা হয় ২৫ হাজার মুসলিমকে। ১৭ হাজার ৩৯৩ ব্যক্তির নাম টেরোরিজম প্রিভেন্ট ডাটাবেজে তালিকাভুক্ত করা হয়।
DITIB-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ১০০টি আক্রমণ ঘটে শুধু মসজিদকে কেন্দ্র করে। জার্মান মুসলিমদের টার্গেট করে হামলার ঘটনা ঘটে ৯০৮টি। ৬০শতাংশ মুসলিম অধ্যাপক বৈষম্যের শিকার হয়। মুসলিম শরণার্থীরা ১৯০৬টি সন্ত্রাসী হামলার মুখোমুখি হয়। প্রতিদিন প্রায় ৫.২টি আক্রমণ। অপরদিকে শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্রজুড়ে ঘটে ২৮৬টি মর্মান্তিক ঘটনা। ১৩২টি সন্ত্রাসী ও শারীরিক হামলার ও হতাহতের ঘটনা ঘটে শরণার্থী শিশুদের সাথে। মাল্টার মতো ছোট্ট একটি দেশেও ৭ শতাংশ মুসলিম শারীরিক সহিংসতা ও ২৫ শতাংশ মুসলিম নানাভাবে পরিকল্পিত হয়রানির শিকার হয়।
শান্তি সূচকে টেক্কা দানকারী দেশ নরওয়ে। সেই নরওয়েতেও মুসলিম বিদ্বেষের চিত্র স্পষ্ট। ২০১৭ সালে ১৪ শতাংশ মুসলিম নানাভাবে হয়রানির সম্মুখীন হয়। এনি ফ্রাঙ্ক ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, শুধু ২০১৬ সালেই মুসলিমবিদ্বেষের ঘটনা রিপোর্ট হয় ৩৬৪টি। এরপর ২০১৭ সালে সরাসরি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয় মুসলিমদের। ২০ শতাংশ বিদ্বেষমূলক ঘটনা ঘটে মুসলিমদের কেন্দ্র করে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ১৭-এর জানুয়ারি থেকে অক্টোবরেই ৬৬৪টি মুসলিমবিদ্বেষী সন্ত্রাস ঘটে। তবে ২৯ শতাংশ ঘটনার অভিযোগ দায়ের করা হয় মাত্র।
আমেরিকার ম্যানচেস্টার অঞ্চলে ইসলামবিদ্বেষমূলক সন্ত্রাস পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। লন্ডনজুড়ে ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পায় ইসলামবিদ্বেষ। ফলে ১৬ সালে ঘটে যাওয়া বিদ্বেষমূলক সন্ত্রাস ১২০৪ থেকে বেড়ে ১৬৭৮-এ গিয়ে দাঁড়ায়। যার প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪০ শতাংশ হারে হয়েছিল। ২০১৭-এর মার্চ- জুলাই। এ সামান্য সময়ে মসজিদ আক্রমণের সংখ্যা ১৬ সালের ৪৭টি থেকে বেড়ে ১১০-এ গিয়ে দাঁড়ায়। ২০১৬ সালে Tell MAMA-এর নেটওয়ার্কে ১২২৩টি ইসলামোফোবিয়ার আক্রমণ রিপোর্ট করা হয়। যার ২০ শতাংশ-এ শারীরিক নির্যাতনের নজির মেলে। আক্রান্তদের ৫৬ শতাংশ ছিল মহিলা। পিসিসিআই-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৭ সালে ৫৪৬টি ইসলাম বিদ্বেষের ঘটনা ঘটে। সুইডিশ ক্রাইম সার্ভের তথ্য মতে ৪৩৯টি বিদ্বেষমূলক সন্ত্রাস নথিভুক্ত হয়।
এদিকে ২০১৮ সালে ইউরোপজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার চিত্র আরও ভয়াবহ। বেলজিয়ামে প্রায় ৭০টি ইসলামোফোবিক ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৭৬ শতাংশ ভিকটিম নারী। অস্ট্রিয়ায় ৫৪০টি ইসলামোফোবিক ঘটনা ঘটেছে। অথচ ২০১৭ সালে ছিল ৩০৯টি। ফ্রান্সে ৬৭৬টি ঘটনা ঘটেছে। ২০১৭ সালে ছিল৪৪৬টি। ৬৭৬ জনের মধ্যে ২০ জন শারীরিক আক্রমণের শিকার। ৫৬৪ জন বৈষম্যের শিকার। ৮৮ জন মৌখিক লাঞ্ছনার শিকার। জার্মানে ৬৭৮টি ইসলামোফোবিক ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ৪০টি ঘটেছে মসজিদে। শরণার্থীদের ওপর আক্রমণ হয়েছে ১৭৭৫টি। এদের মধ্যে ১৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে। ৯৫টি জার্মানিতে কাজ করতে আসা কর্মীদের ওপর। নেদারল্যান্ডে পুলিশের কাছে দায়ের করা ১৫১৫টি ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযানগুলোর মধ্যে ৯১ শতাংশই মুসলমানদের বিরুদ্ধে।
২০১৯ সালে এসে ইউরোপীয় মুসলিম দেশগুলো একইরূপ ইসলামোফোবিয়ার আক্রমণ আঁচ করতে পারছে। ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে এমনকি যুক্তরাজ্যে মসজিদগুলোও আক্রমণের শিকার হচ্ছে। তদুপরি, 'গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট'-এর মতো সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রমূলক অধিকার আদায়ের প্রচারণা রটে চলছে। ইউরোপে অমুসলিমদের প্রতিস্থাপনের পক্ষে মুসলিমরা এগিয়ে যাচ্ছে; অপরদিকে তারা ছদ্মবেশে ছড়িয়ে পড়ছে আর শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য বিস্তারে সন্ত্রাসী আক্রমণে মদত দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে 'সর্বব্যাপী শিক্ষার জন্য আরও সক্রিয় পন্থা ও সহায়তা' গ্রহণ প্রয়োজনীয় বলে ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
২০১৯ সালে ৮৭১টিরও বেশি মুসলিম-বিদ্বেষমূলক অপরাধ লিপিবদ্ধ হয়েছে। যার ৫৮টি মুসলিম ধর্মীয় স্থান সম্পর্কিত। অন্য আরও ৪৬টি ছিল ইসলাম-বিদ্বেষী ধর্মান্ধদের দ্বারা শারীরিক নিপীড়নের কেইস। অনুরূপভাবে ফ্রান্সেও ১০৪৩টি ইসলামোফোবিয়ামূলক ঘটনা নিবন্ধিত হয়েছে। যার মধ্যে শারীরিক নিপীড়ন, ধর্মীয় স্থান নিয়ে নানা উস্কানিমূলক বক্তব্যসহ আরও অনেক কিছুই জায়গা করে নিয়েছে। ৩৪
ইউরোপজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার নেপথ্যে
ডানপন্থি আন্দোলনের প্রভাব বৃদ্ধির কারণেই পুরো ইউরোপজুড়ে ইসলামোফোবিয়া বাড়ছে- আঙ্কারাভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। ফাউন্ডেশন ফর পলিটিক্যাল, ইকোনোমিক অ্যান্ড সোস্যাল রিসার্স (এসইটিএ) কর্তৃক প্রকাশিত 'ইউরোপীয় ইসলামোফোবিয়া : রিপোর্ট ২০১৮' ইউরোপে মুসলিম-বিরোধী বর্ণবাদের উত্থানকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন করে, এমনকিছু কারণের ওপর আলোকপাত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'মানবাধিকার, বহুসংস্কৃতিবাদ এবং ইউরোপের রাষ্ট্রীয় আইনের ক্ষেত্রে সবসময় মুসলিমবিরোধী আলোচনা করার কারণেই বৃদ্ধি পেয়েছে ইসলামোফোবিয়া এবং বর্ণবাদ। মুসলিমবিরোধী এই বর্ণবাদের প্রজনন ও প্রতিপালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ইউরোপের গণমাধ্যম। ইউরোপের এমন কম গণমাধ্যমই আছে, যারা মুসলিমদের ইতিবাচক দিকগুলো ফুটিয়ে তোলে। বরং নেতিবাচকভাবেই মুসলিমদের তুলে ধরে সবসময়। আর ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে ক্রমাগত মুসলিবিদ্বেষ তো আছেই।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মুসলমানদের চিত্রিত করার ক্ষেত্রে উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের ইসলামোফোবিক ভাষা এবং ডানপন্থিদের বর্ণবাদী ভাষা- ইসলামোফোবিয়াকে আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং বিশ্বকে সন্ত্রস্ত করছে। এখন ইসলামোফোবিয়া কেবল মুসলমানদের নয়, ইউরোপের সুরক্ষা ও স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও নির্বাচনি উদ্দেশ্যে তারা এই বর্ণবাদ ও ইসলামোফোবিয়াকেই উসকে দেয়।

টিকাঃ
[৩১] দেখুন, 'সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
[৩২] পশ্চিমা গবেষক ও ইসলামোফোবিয়া বিষয়ক একাধিক গবেষনার জনক
[৩৩] মুসলিমবিরোধী হামলার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা
[৩৪] এসইটিএ কর্তৃক প্রকাশিত প্রতি বছরের (European Islamophobic Report 2017,2017,2018) প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এসইটিএ হলো জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণামূলক একটি প্রতিষ্ঠান।

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ইসলামোফোবিয়ার শেকড় সন্ধানে

📄 ইসলামোফোবিয়ার শেকড় সন্ধানে


বিশ্বজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার বিষাক্ত উত্থান চরমপর্যায়ে পৌঁছেছে। যখন উদারপন্থি লেখক মাইকেল টমাস্কি মুসলিমদের আমেরিকার সুনাগরিক প্রমাণে সচেষ্ট হলেন; এক সপ্তাহের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প মুসলিমদের সেই দেশে অভিগমন বন্ধের প্রস্তাব করে বসলেন। এমন পরিস্থিতিতে কী করা উচিৎ, এমন মিথ্যাচারের প্রতি কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত নয়?
আমাদের অন্তত দুটি কারণে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। প্রথমত. সানবার্নিডো আর প্যারিসের ঘটনার পর ইসলামোফোবিয়া ও বিদ্বেষচর্চার ক্রমঃবৃদ্ধি আমাদের নজর কেড়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে গ্লেন গ্রিনওয়ার্ল্ড মুসলমানদের ওপর হুমকি-হামলার তালিকা সংগ্রহ করেছে, যা বস্তুতই আতংকজনক। ৯/১১-র ঘটনার পর অনেক বন্ধুমহলেই হিজাবের ওপর হুডি পরে অপরিচিতদের কটাক্ষ-আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে দেখা গেছে।
বর্ণবাদী আক্রমণ নতুন কিছু নয়, শুধু এটা নতুন মাত্রায় তীব্রতর হচ্ছে। ৯/১১-র মতো 'গ্রাউন্ড জিরো মসজিদ'৩৬ বিতর্ক আর বুস্টনে একটানা বোমাবর্ষণ এমন প্রতিটি ঘটনাই সেই নেতিবাচক প্রবাহের ঢেউয়ে নতুন মাত্রাযোগে আরও উদ্বেলিত করে। ইসলামোফোবিয়াকে হাতিয়ার করে সন্ত্রাসী অভিযান পরিচালনা করা যেন আমেরিকান সমাজব্যবস্থার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, কেননা এটি সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদকে বিশাল এক সুরক্ষা বলয়ে আবৃত করে রাখে।
দ্বিতীয়ত, সে পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে, প্রথমত; প্যারিস আক্রমণের রেশ কাটাতে আন্তর্জাতিকভাবে তা আরোপিত হয়। দ্বিতীয়ত্ব; এটা রাজনৈতিক মৌসুমকে বেগবান করা হয়েছে। বিগত বছরগুলোর মতো রিপাবলিকানরা রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ইসলামোফোবিয়াকে হাতিয়ার বানিয়ে আদানুন খেয়ে মাঠে নামে। তাদের অবান্তর বক্তব্যগুলোকে মূলধারায় পৌঁছানোর জন্য মূলধারার রাজনীতিবিদদের বাগে এনে তাদের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থাপন করতে চায়। তাই নিজেদের খোলস বদলে নির্লজ্জভাবে ওয়েলফান্ডেড ইসলামোফোবিয়াকে নিয়ে বর্ণবাদ ও ডানপন্থির রূপ ধারণ করে বারবার। ফলত আমরা কী প্রত্যক্ষ করেছি! আন্তর্জাতিক ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কের আঁচলে লালিত ডানপন্থি ধারণার উত্থান, যার নাম দেয়া হয়েছিল 'কাউন্টার জিহাদ মুভমেন্ট' বা জিহাদবিরোধী আন্দোলন। বিশ্বের আনাচে-কানাচে যা প্রতিধ্বনিত হয়েছে রিপাবলিকান রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীদের মুখে মুখে। তাদের মধ্যে ট্রাম্প অগ্রগণ্য।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থার গবেষণা জরিপে ফুটে উঠেছে 'কাউন্টার জিহাদ মুভমেন্ট' ধারণা কীভাবে কুয়া থেকে সাগরে মিশেছে (এক প্রান্ত থেকে জাতীয় রাজনীতির অংশে একীভূত হয়েছে।) আর বৈশ্বিক মদতপুষ্ট হয়েছে, আর তা বাস্তবায়নের চাকায় ট্রাম্পের মতো লোকজন কী পরিমাণ ইন্ধন দিয়েছে।
ইদানীং রিপাবলিকান কিছু প্রার্থীসহ অনেকেই ট্রাম্পের মুসলিম অভিবাসন বন্ধ করা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য ছুড়ছে। বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের হুঁশ ফিরেছে। ট্রাম্প সীমা অতিক্রম করেছে, তাকে অযোগ্যপ্রার্থী বলে ঘোষণা করা উচিত বলে তারা মন্তব্যও করেছে।
ট্রাম্প প্রত্যুত্তরে বুক ফুলিয়ে বলেছিল, প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ১৯৪২ সালে পার্ল হারবার আক্রমণকে কেন্দ্র করে যে নীতি অনুসরণ করেছিল তার পরিকল্পনাও তা থেকে ভিন্ন কিছু নয়। যখন সে ১১০,০০০ (যাদের ৬০ শতাংশ-ই জন্মগতভাবে আমেরিকান) জাপানিজ আমেরিকানদের অভ্যন্তরীণ কার্যনির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিল। বস্তুত ট্রাম্প যথাযথ একটি উপমা টেনেছে, সেই শীতল যুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান সন্ত্রাসী যুদ্ধ পর্যন্ত ডেমোক্রেট আর রিপাবলিকান উভয়েই রাষ্ট্রকে সুসংহতকরণ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে উসকে দিতে বর্ণবাদী পুলিশিব্যবস্থার আশ্রয় নিয়েছে। বস্তুত কেউ একজন দেশের সাথে সম্পৃক্ত দুটি বিষয়ে মজবুত এক সংযোগ তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্পের ১৯৪২ সালের পূর্বেকার কোনো নজির উপস্থাপনের প্রয়োজন পড়েনি। ৯/১১-র পর থেকে তার বিনোদন প্রস্তাবনা বিভিন্ন ধাচে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কয়েক সহস্রাধিক মুসলিম অভিবাসী ও নাগরিকদের কারা-শিল্পের জটিলতার মধ্যে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে।
৯/১১-র পক্ষান্তরেই ১২০০ মুসলিম নাগরিক ও অভিবাসীকে এফবিআইসহ রাষ্ট্রীয় আরও আইনি সংস্থাগুলো জিজ্ঞাসাবাদ করে। যদিও তাদের মধ্যকার কারোরই ৯/১১-র ঘটনার সাথে যোগসূত্র মেলেনি। আর তখন থেকেই কয়েদ ও বাস্তুচ্যুত করার প্রবণতা বেড়েছে হুড়োহুড়ি করে। বুশ ও ওবামার আমলে মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার আর শিশুদের আনন্দালয়গুলো ছিল নিবিড় নজরদারির আওতায়।
ট্রাম্প যখন সকল মুসলমান নিবন্ধনসম্বলিত তথ্যপুঞ্জি তৈরির নির্দেশনা দেয়, হিলারি ক্লিনটন টুইটেএকে 'মর্মান্তিক দাবি' বলে আখ্যা দেয়। তবু সে একটা দশকের বেশি সময় ধরে চলে আসা প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে, যেমন- ২০০২- এর জাতীয় সুরক্ষা প্রবেশ-প্রস্থান নিবন্ধন পদ্ধতি যা তার স্বামীর ১৯৬৬ সালের সন্ত্রাসবাদের অর্থায়নের ভিত্তি ছিল।
পঁচিশটি পৃথক দেশের ষোলো-ঊর্ধ্ব পুরুষদের সাক্ষাৎকার প্রদান, ছবি তোলা, আঙ্গুলের ছাপ প্রদান এবং অর্থনৈতিক তথ্যাবলি প্রদান করা আবশ্যক ছিল এ প্রক্রিয়ার আওতায়ীন। ২০০৩-এ পতনের পর প্রায় ৮৩,০০০ অভিবাসী এ পদ্ধতিতে নথিভুক্ত হয়।
তাই আমাদের বিস্মৃত হলে চলবে না যে, রিপাবলিকান আর ডেমোক্রেট উভয়েই এক নায়ের মাঝি। তাদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপের কারণেই আজ বিশ্বের এই হাল। ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ এনোক পল ইংল্যান্ডে ‘রক্ত নদী' নামক যে খেলার আবির্ভাব করেছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প তার কুখ্যাত বক্তব্যেও এর আবদান রাখে। যা বর্ণবাদ, অভিবাসনবিরোধে পূর্ণ ছিল ফলত সে রাজনৈতিক অঙ্গনে তার নবরূপের আবির্ভাব হয়।
এ. শিবানন্দ, পল-এর 'রক্ত নদী' বিষয়টাকে এভাবে ফুটিয়ে তুলেছে যে, 'আজ এনোক পল যে রব তুলছে, কাল তা নিয়ে কনজারভেটিভ পার্টি উঠেপড়ে লাগবে, আর পরশু তাতে ইন্ধন জোগাবে লেবার পার্টি। বস্তুত সব শিয়ালের এক রাঁ। ১৯৭০ দশকের পর থেকেই আমেরিকায় এ ধরনের গতিশীলতা দৃশ্যমান। ফলে সেখানে রাজনৈতিক চর্চাঙ্গন এতটা সংকীর্ণ, যে কারণে কেউ চাইলেই ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিবর্গের হেঁয়ালি বা দলছুট নেকড়ে তথা ব্যতিক্রম আখ্যা দিয়ে অপসারণ করার সিস্টেমে কোনো প্রভাব ফেলতে অপারগ।
মাইকেল টমাস্কি মুসলিম আমেরিকানদের তাদের বৈধতার প্রমাণ চাইলেন। ঠিক একই স্বরে বারাক ওবামার একটি ভাষণও প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। ওবামা যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন যে, যেহেতু মুসলিম কমিউনিটিতে চরমপন্থি বা সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়েছে তাই এটা কোনো অজুহাত ছাড়া মোকাবিলা করা মুসলমানদের কর্তব্য।
ওবামার বইতে পুনরায় এ বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে, সেখানে সানবার্নিডোর ঘটনার জন্য শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টানদের বাদ দিয়ে মুসলমানদের ওপর দোষারোপ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ, ঘটনার মূল হোতা রোবাট ডিয়ার।
স্পষ্টত ডিয়ার একজন ধর্মপ্রচারক খ্রিস্টান, যে ঈশ্বরের সেনাবাহিনী নামে গর্ভপাতবিরোধী একটি দল গঠন করেছে। যারা ৯/১১-র পর থেকে অসংখ্য বোমাহামলা আর হত্যাকাণ্ড নির্দ্বিধায় ঘটিয়ে চলছে। তথাকথিত জিহাদী নামধারী পক্ষের চেয়েও এই ডানপন্থি সন্ত্রাসীরা অধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত।
তারপরও কেন শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টানদের এসবের দায়িত্ব নিতে বলা হচ্ছে না। ডিয়ারের অপকর্ম চাপা দিয়ে সানবার্নিডোকে ঘিরেই কেন সব মনোযোগ আকর্ষিত হলো! ওবاما যখন উচ্চারণ করে 'বিশ্বব্যাপী বিপদগামী মতাদর্শ যা মৌলবাদের দিকে নিয়ে যায়, তার মূলোৎপাটন করা মুসলমানদের দায়িত্ব'- এর মাধ্যমে সে ইসলামোফোবিয়ার দারাজদিল সংস্করণ প্রবর্তন করলেন; যা সিংহভাগ মুসলমান শান্তিপ্রিয় হলেও ইসলাম যেন সন্ত্রাসবাদের একটি দ্বার চির উন্মোচন করেই রেখেছে!
এ বিতর্কিত বিষয়াদির প্রতি নজর বুলালে যদিও যৎসামান্য পরিবর্তন আঁচ করা যায়; তবে ইসলামোফোবিয়ার উদারপন্থি রূপগুলোতে গিয়ে বিতর্ক আটকে আছে। যেন তা দুধে ধোয়া তুলসি পাতা, ময়ূরের পালক পরে কাকের নেক সুরতে দেয়া ধোঁকা। তাই এটা স্পষ্ট যে, ট্রাম্পের বক্তব্যে যেমন রিপাবলিকানরা তীব্র সমালোচনা করেছে ঠিক একই দৃষ্টিতে গণতান্ত্রিকভাবে রিপাবলিকানরাও নিন্দিত।
যখন ডানপন্থিরা মুসলমানদের পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য পঞ্চম কলাম বা সমস্যাজনক বলে মনে করে, তখন উদারপন্থি/ডানপন্থিদের যৌক্তিক রূপে উপস্থাপন করা হয়, যেন তারা মুসলমান ও সন্ত্রাসবাদের পার্থক্যকারী। তবুও এটি সম্পূর্ণ একটি দলকে দায়ী করে বিধায় সন্ত্রাস দমনের দায়ভার মডারেট মুসলিমদের কাঁধে চাপাতেই উদারপন্থিরা বদ্ধমূল। যাতে বামপন্থি ও বর্ণবিরোধীরা তাদের রাজনৈতিক ভিত টান করে দাঁড়াতে পারে আর যুদ্ধচর্চা, সন্ত্রাসবাদিতা, আটক করা, ড্রোনহামলায় হুরহুর করে মানুষজন তাদের পক্ষ নেয়।
সাম্রাজ্যবাদের প্রেক্ষাপট
সচরাচর চাপা থাকে। বহির্বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদের ভিত গড়ে ওঠার উপাখ্যান, এই আঘাতগুলো পুনরায় আমেরিকার মাটিতে কীভাবে প্রতিঘাত তৈরি করে, বর্ণবাদের অন্তর্নিহিত কী অর্থ তারা দাঁড় করায়, সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপকে চালিত করতে দেশে বিদেশের কী পরিমাণ সহিংসতা যে মার্কিন রাজনৈতিক সংস্থার মদতপুষ্ট তার ইয়ত্তা নেই।
আতঙ্ক ও ধর্মান্ধতায় মিডিয়ার ইন্ধন
হাল আমলে কেবল কর্পোরেট মিডিয়ার মদতেই ট্রাম্পের উন্মত্ত বক্তব্য এতটা আলোচিত হচ্ছে ও নজর কাড়তে সমর্থ হচ্ছে। এতে কিছু বাস্তবতাও বিদ্যমান। মিডিয়া খুব আগ্রহের সাথে বিতর্কিত ও চাঞ্চল্যকর বিষয়গুলো কভার করে। যাতে বৃহৎসংখ্যক শ্রোতা আকর্ষণ করতে পারে এবং নিচের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে। যেমন- ট্রাম্পের লাখ লাখ ল্যাটিন আমেরিকান অভিবাসীকে বাস্তুচ্যুত করে ওয়াটারবোডিংয়ে ফিরিয়ে আনার আহ্বানকে কারণ দর্শিয়ে সংবাদযোগ্য বলে উপস্থাপন করে। বস্তুত আর্থিক প্রণোদনা লাভের আশায়ই অধিকাংশ সংবাদ প্রচারণা সংস্থা এসব প্রচারে লিপ্ত হয়।
তবে ইসলামোফোবিয়ার উত্থানের পেছনে কেবল ডোনাল্ড ট্রাম্প বা মিডিয়া ইন্ধন জোগায় ভাবলে ভুল হবে। ইসলামোফোবিয়া নিয়ে আমার বইতে নিরীক্ষণ করে দেখানো হয়েছে 'ম্যাট্রিক্স অব ইসলামোফোবিয়া' বা ইসলামোফোবিয়ার উৎসমূল। যাতে মুসলিম-বিরোধী মতবাদ ও তার চর্চায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর রূপরেখা প্রদত্ত হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক স্থাপনা (ডেমোক্রাট ও রিপাবলিকান উভয়েরই), জাতীয় নিরাপত্তা যন্ত্রাদি, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ, থিঙ্কট্যাংক বা নীতিনির্ধারণী সংস্থার অন্তর্ভুক্তি রয়েছে। এদের প্রত্যেকেই দু ধরনের ইসলামোফোবিয়ার প্রচার-প্রসারে লিপ্ত- উদার ও গোঁড়া।
এ ধরনের প্রপাগান্ডা জনমনে প্রচারিত হওয়ার মূল হোতা হচ্ছে মূল ধারার মিডিয়াগুলো। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে তারা বক্তব্য প্রচারণা এগিয়ে রাখে এবং রক্ষণশীল আর উদারপন্থিদের মধ্যকার বিতর্কের লাগামও হাতে রাখে।
এটা এমনই এক বিরল দৃষ্টান্ত যেখানে বামপন্থি যে কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারে। এসব প্রেক্ষাপট যা সর্বদাই সামাজিক আন্দোলন ও প্রতিবাদের ফসল। মিডিয়া বিতর্কের পরিধি বাড়াতে যথেষ্ট শক্তিশালী (১৯৯৭ সালের ইউপিএস ধর্মঘট নিয়ে ঘটা এক দৃষ্টান্ত আমার বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে)।
সানবার্নিডো ও অন্যান্য ঘটনায় অমুসলিম ও মুসলিমদের মিডিয়া কীভাবে চিত্রিত করেছে?
প্রথমেই বন্দুক-সহিংসতা নিয়ে কিছু বলা যাক; তা যেন আমেরিকান আপেল পাই। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে যে, মার্কিন ভূমিতেই ৪০৬৪৯৬ জন আমেরিকান আগ্নেয়াস্ত্রে প্রাণ হারিয়েছে আর তাদের সন্ত্রাসবাদের ফলে বিশ্বব্যাপী ৩৩৮০ জন মারা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে জিহাদী নামধারীদের দ্বারা ৯/১১-র পর ৪৫ জন প্রাণ হারিয়েছে। অন্যকথায় বন্দুক- সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ এর অনুপাত যেন দশ হাজার ও এক।
স্কুলে ও অন্যত্র সহিংসতায় শ্বেতাঙ্গদের অগ্রগণ্য ভূমিকা লক্ষ্যণীয়। মুসলিমরা আমেরিকার সকল ঐতিহ্যে একীভূত হলেও সানবার্নিডোর ঘটনায় এসে যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ আর জাতীয় সুরক্ষার বুলি আওড়ে মুসলিমদের ওপর চড়াও হতে দেখা গেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সহিংস ঘটনাকে চাপা দিতে দুটি ফ্রেম ব্যবহার করা হয়, শ্বেতাঙ্গ অপরাধী আর মুসলিম। প্রথম ক্ষেত্রে অপরাধকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। উদাহরণত মানসিক অসুস্থতার অজুহাত। অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা যার সমাধান মনে করা হয়।
দ্বিতীয়ত, মুসলমানদের ক্ষেত্রে অপরাধকে গণ্য করা হয় 'সভ্যতার সংকট' হিসেবে। যেখানে সমগ্র মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও লড়াই তথা 'ওয়ার অন টেরর'কে সমাধানের একমাত্র উপায় হিসেবে ফলাও করে প্রচার করা হয়। ফরাসী দার্শনিক আলবার্ট মোমি তার mark of the plural আলোচনায় বুঝিয়েছেন যে বর্ণবাদী কর্মকাণ্ড মানুষজনের কাছে স্বাভাবিক বলে উপস্থাপন করা হয় আর শ্বেতাঙ্গ কুকীর্তি সীমাবদ্ধ করে রাখা হয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে।
এই যুক্তি শুধু রক্ষণশীলদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা নয় বরং উদারপন্থিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। উদারপন্থার প্রবক্তারা দীর্ঘদিন ধরে স্বতন্ত্র অধিকার ও স্বাধীনতা হরণ করে স্বতন্ত্রতার অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। আর তাই অধিকার আদায়ের নিমিত্তে মানুষজন বর্ণবাদকে আপন করে নিয়েছে।
জাতীয় রাজনীতিতে সানবার্নিডো আর ট্রাম্প-বক্তব্যের প্রভাব
ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রভাব পূর্বোল্লিখিত এনোক পাওয়েলের বক্তব্যের প্রভাবের অনুরূপ। ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্ক বিদ্যমান।
অপরদিকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা ওয়ার অন টেরর, জাতীয় সুরক্ষানীতি গঠন, মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক বৈষম্য ডেমোক্রেটদের এহেন দুষ্কর্ম কেবল রিপাবলিকানদের নিজস্ব প্লট রচনার বৈধতাই দেয় না; বরং আগামী দিনে আরও উগ্রচর্চার স্বাধীনতা তাদেরও দেয়া হয়।
অন্যভাবে, রিপাবলিকানরা নিজেদের ডানপন্থি উপস্থাপনের সাথে সাথে ডেমোক্রেটরা তাদের চরমপন্থার দিকে কেবল আঙ্গুলি নির্দেশই করে না বরং নিজেদের আরও চরমপন্থার রাহাও পাকাপোক্ত করে নেয়, তারা কেবল অসৎ মুসলমানদের পিছু নেয়, তাদের উস্কানিমূলক বক্তব্যে খুব কমই মেলে।
এর সুষ্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় নিউইয়র্ক টাইমস-এর তৎকালীন সম্পাদকীয় কলাম থেকে যা ট্রাম্পের বর্ণবাদের ভঙ্গিতে ফ্যাসিবাদের ভয়াল রূপ তুলে ধরে। সম্পাদকীয় এর শুরুটায় এমন কিছুই ছিল না- যার বিপক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো যায়। তবে এতে রিপাবলিকানদের ইসলামোফোবিয়ার পট তৈরি ও ফ্যাসিবাদের অপচ্ছায়া হিসেবে দায়ী করা হয়েছে। কেননা তারা অভ্যন্তরীণ বিতণ্ডায় বেশি আগ্রহী। ডেমোক্রেটদের দোষ এতে উপেক্ষা করা হয়েছে, এসব অপকর্মে যাদের অবদান কোনো অংশেই কম নয়।
এটা অবশ্য ডেমোক্রেটদের বাঁ-হাতের চাল। কারণ সমগ্র জাতি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ যা তাদের সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথ করে দিয়েছে পরিষ্কার, পেছনে থেকে কোনো বিরূপ মন্তব্যের ঝঞ্ঝাটও নেই।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নিশ্চিত করে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে ভয়াল মোড় নেয়ার প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে ভীতিহীন রাজনৈতিক যে শক্তি তাকে ক্ষমতায় এনেছে তা উপলব্ধি করার কোশেশ আমাদের করা দরকার। এমন এক গতিশীলতা যা সম্পূর্ণই রাজনৈতিক চাল। পুনরাবৃত্তি করতে হয় তা পদ্ধতিগত রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তন, একক কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের চাল নয়।
ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতি কী পরিমাণ চাপের মুখে দীর্ঘসূত্রতায় বলিরপাঁঠার রূপ দিয়েছে তা নিয়ে অবশ্য কোনো ভ্রূক্ষেপ কারো নেই। পালের গোদার মতো ট্রাম্পও বুঝেছিল যে, অভিবাসন সস্তা শ্রমের উৎস যা আমেরিকার অর্থনীতির সাথে জুড়ে বসে আছে, বর্তমানে যেন তা বিশেষভাবে সত্যায়িত, তার মাথায় এটাও খেলেছে যে, ঝুঁকির মধ্যে রাখতে পারলেই তাদের অপদস্থ ও জব্দ করে রাখা যাবে। আর তাদের বলিরপাঁঠা বানানোর দ্বারা সামগ্রিকভাবে আমেরিকান শ্রমজীবীদের প্রভাবিত করে এসব অস্বস্তি থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়া যাবে।
এক্ষেত্রে আমেরিকান প্রশাসন বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসন উভয়ক্ষেত্রে সমান তালে মদত দিয়ে যাচ্ছে তাতে আমরা অমনযোগী হয়ে রই। (দৃষ্টান্ত; নাফটা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসমূহ, মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার যুদ্ধ) এবং অভিবাসন দণ্ড। (ওবামার গণনির্বাসন নীতি) এর সবই মনে করিয়ে দেয় যে, বর্ণবাদ শ্রেণিবদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের এক অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস।
ফরাসি আঞ্চলিক নির্বাচনের প্রথম দফায় ২৮ ভাগ ভোট দখল করেছে ডানপন্থি ন্যাশনাল ফ্রন্ট এবং অন্যান্য ইউরোপীয় বর্ণবাদী পার্টি (যদিও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছে)। তবুও ডানপন্থি মার্কিনিরা ইউরোপের থেকে আলাদা। ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের মর্মমূলে প্রোথিত ইসলামোফোবিয়া নিয়ে আমাদের কেমন চিন্তিত হওয়া উচিত!
ইউরোপে ইসলামোফোবিয়ার সাথে ডানপন্থির ভিন্নরূপ সম্পর্ক। ইউরোপের এ পার্থক্যের গোড়ায় আছে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর অফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার এক দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাস। অর্থাৎ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের সম্পর্কে বর্ণবাদী আদর্শিক তকমা দেয়ার চর্চা হয়।
ফ্রান্সের ক্ষেত্রে, ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়নের মিসর আক্রমণ এবং পরবর্তীকালে ফ্রান্সের আলজেরিয়া বিজয়ের ফলে প্রাচ্যবাদ ও বর্ণবাদচর্চার পথ সুগম হয়। 'কোড দে লিংকডিগনাত' নামক আইন প্রথমত আলজেরিয়া এবং পরবর্তীতে অন্যান্য উপনিবেশের ঘাড়ে চাপানোর মাধ্যমে ফ্রান্স এক নিয়মতান্ত্রিক বৈষম্যের জন্ম দেয়। যেখানে জনগোষ্ঠীগুলোকে নিম্ন মানের মর্যাদা প্রদান করা হয়। এমনকি উপনিবেশ উৎখাতের পরও এ বৈষম্য চলমান ছিল। জাতীয় ফ্রন্ট যার দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রতিচ্ছবি।
যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়া আরও সাম্প্রতিক বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর যখন আমেরিকা ফ্রান্স, ব্রিটেন, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সাম্রাজ্যবাদের লাগাম হাতে নেয় তখন থেকেই এ লড়াই গুরুতর রূপ নেয়। ইসরায়েলের সাথে মার্কিনিদের গলায় গলায় ভাব থাকায় প্রাচ্যবাদ ও ইসলামোফোবিয়ার বিস্তারের পথ কণ্টকমুক্ত হয়েছে। সন্ত্রাসবাদী হুমকি ১৯৭০-এর দিকেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ১৯৭৯ সালে ইরানী বিপ্লব তা রূপায়ণে মুখ্য ভূমিকা রাখে। অন্যত্র আমি উল্লেখ করেছি যে, ১৯৮০-র দশকে 'নিউকন লিকুদ জোট' নামক ইসরায়েলি রাজনৈতিক সংস্থা ইসলামের ভিন্ন বিপদের আভাস দিয়েছে।
এভাবেই ইসলামোফোবিয়া ১৯৯০-এর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে বিস্তৃত হতে শুরু করে। এমনকি ৯/১১-র পর তাতে জনগণের চিত্তাকর্ষনে সমর্থ হয়। এটা একটি আংশিক বিষয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম অভিবাসীবিরোধী প্রচারণার সাথে ইউরোপের মিল নেই। এটা প্রাথমিকভাবে ল্যাটিন অভিবাসীদের বঞ্চিতকরণ। এটাও বলা হয় যে, আমেরিকা ইউরোপিয়ান দেশগুলোর কাছ থেকে বৈশ্বিক জিহাদবিরোধী আন্দোলন শিক্ষা লাভ করছে।
ইসলামবিরোধী বক্তৃতাকে উপজীব্য করে ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে অনেক বেশি ডানপন্থি দলগুলো মুসলিম-বিরোধী ও অভিবাসীবিরোধী বিষবাষ্পে দেশি ও ইউরোপীয় সংসদ নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাফল্যের দেখা পেয়েছে।
ফ্যাসিবাদী দলগুলোর কেন্দ্রবিন্দু ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টি মিলিয়ন ভোেট লাভে সমর্থ হয় এবং প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় সংসদে দুটি আসন লাভ করে। হল্যান্ডে এগিয়ে যায় গ্রিট ওয়াইল্ডের ফ্রিডম পার্টি। এমনকি হল্যান্ড ও সুইডেনের মতো উদারপন্থি দেশগুলোতেও ডানপন্থি দলগুলোর তখন জয়জয়কার। সুইডেনে ডেমোক্রেটরা মুসলিম-বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে সংসদীয় ক্ষমতা হাসিল করেছে, যার নেতা জিমি একিসন- অভিবাসন সীমাবদ্ধ করার দাবি জানান, আর সুইডিশদের সামনে ইসলামকে সবচে মারাত্মক জাতিগত হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করে।
পুনরায় বর্ণবাদী আবেদন ও শ্রমজীবী মানুষজনের ম্রিয়মাণ জীবনব্যবস্থায় যোগসূত্র দেখিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট থেকে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছে। ইউরোপিয়ান সরকারব্যবস্থাগুলো অসহায় মানুষগুলোর প্রতি ধৃষ্ট ও দৌরাত্যপূর্ন ব্যবস্থাই কেবল চাপিয়ে দেয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঐতিহ্যগত বাম দলগুলো এ সমস্যার বিকল্প কোনো সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়। ভোটারদের মধ্যে উৎকণ্ঠা সঞ্চারে মুসলিম অভিবাসনকে বলিদানের মাধ্যমে রাজনৈতিক শূন্যস্থান পূরণ হয়।
২০১০ সালে ফ্রান্সের উচ্চকক্ষ সর্বসম্মতিক্রমে বোরকা নিষিদ্ধ করার পক্ষে রায় দিয়েছে। যখন নিম্নকক্ষে ভোেট পাস হয়ে গেলে বাম দলগুলো বিরত থাকে (সমাজতান্ত্রিক, গ্রিনস, কমিউনিস্ট) নীতিগতভাবে মুসলমানদের বিপক্ষে যাওয়ার পরিবর্তে তারা চুপচাপ বসে থাকারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এরপর সমাজতান্ত্রিক দল এগিয়ে এসে বিষয়টিকে আপত্তিকর বললেও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতী ছিল না। বামদের এই নগণ্য প্রতিক্রিয়া অপরপক্ষকে শক্তিশালী হতে সহায়তা করেছে। ইউরোপ যেন মার্কিন মূলধারার রাজনীতির ভূত-ভবিষ্যতের আয়না। ডানপন্থিরা খুব একটা পিছিয়ে না পড়লে ইউরোপ বামপন্থিদেরও শিক্ষাদান শুরু করে দেবে।
• ইসলামোফোবিয়ার ক্রমোত্থানের বিরুদ্ধে বামদের করণীয়
ইউরোপ থেকে লব্ধ প্রথম পাঠ হলো, কোন কেন্দ্র থেকে এর মোকাবিলা করা পণ্ডশ্রম। অতিমাত্রায় মুসলিম বিদ্বেষের মুখে, একটি অদৃঢ় সংকল্প কেবল ডানপন্থিদের জোর বাড়িয়ে তুলবে।
দ্বিতীয়ত, ডানপন্থিরা জন প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়, মাঝেমধ্যে বর্ণবাদবিরোধী বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে বামপন্থিদের বাধারও সম্মুখীন তারা হয়। মূলধারার বাইরের বিভিন্ন ইউরোপীয় জাতি বামপন্থি থেকে ডানপন্থি হওয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিদ্যমান।
দৃষ্টান্তে, ব্রিটেনে এন্টি-নাজি লিগ ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টির পূর্বসরি ফ্যাসিস্ট ন্যাশনাল ফ্রন্টকে দুই ফ্রন্টের নির্বাচনে সফলভাবে পেছনে ফেলেছে। প্রথমত, তারা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে একটি মৌলিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। দ্বিতীয়ত, তারা উন্মুক্ত রাজনৈতিকাঙ্গন তৈরি করেছিল যা অগ্রসরমান বিকল্প ও পদ্ধতিগত সমালোচনাকে সামনে রেখে গঠিত, যে বর্ণবাদ বৃহৎ পরিসরে রাজনৈতিক অর্থনীতিতে নিহিত আছে।
ভুলে গেলে চলবে না, ইসলামোফোবিয়া সাম্রাজ্যবাদের তুরুপের তাস। এটা নিজে থেকে বিলীন হওয়ার নয়। আমি ইতোমধ্যে প্রমাণ দিয়েছি যে, আস্থাযোগ্য মতবিনিময় ও ইসলামি শিক্ষাই যথেষ্ট নয়। আমাদের সামষ্টিক কণ্ঠস্বরকে উচ্চকিত করতে মিছিল বা অন্যান্য বাহ্যিক প্রকাশের আয়োজন করতে হবে।
তবে এর জন্য আমাদের কৌশল প্রয়োজন যা কেবল সমসাময়িক ট্রাম্পদের ডানপন্থি বক্তব্যকেই মোকাবিলা করবে না; বরং অন্যান্য হুমকি সম্ভবপর করে তোলার গোড়ার কথাও মূলোৎপাটিত করেই তবে ক্ষান্ত হবে। অন্যকথায় আমাদের পদচারণার কৌশল রপ্ত করতে হবে এবং কি করে সুবিধা আদায় করে নিতে হয় সে কৌশলও রপ্ত করতে হবে। একইসাথে স্বল্প পরিসরে তবে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল যা ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ক্ষুণ্ণ না করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখবে। এভাবেই বৃহৎ-ক্ষুদ্র সকল পরিস্থিতির সামাল দেয়া হবে সম্ভবপর।
বামপন্থিদের দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় দুর্বলতা ছিল, সহসাই ভয়ের মুহূর্তে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে সতর্ক না হয়েই এমনসব স্বল্পমেয়াদি কৌশল তারা অবলম্বন করতো যা আমরা কোথায় আছি বা কোথায় তা পৌঁছে দেবে তার কোনো ইয়ত্তা থাকে না।
তাই ইসলামোফোবিয়া ও বর্ণবাদের আরও সার্বজনীন প্রতিরোধকল্পে প্রতিপক্ষ সংঘবদ্ধ হওয়ার পূর্বে গুরুতর কিছু প্রকাশ হতে চলছে (হয়তো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল)। এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো ইসলামোফোবিয়ার দুই রূপের- 'লিবারেল ও কনজারভেটিব'- যেসব ইন্সটিটিউট দ্বারা সৃজিত ও চর্চিত তাদের ভিত নাড়িয়ে দেয়া। অন্যকথায় এর জন্য প্রয়োজন একটি মৌলিক পদ্ধতি যা সমস্যার মূলে পৌঁছতে পারবে অর্থাৎ অন্তত সন্ত্রাসী যুদ্ধের অবসান ঘটাবে, জাতীয় সুরক্ষা রাষ্ট্রকে নিঃশেষ করবে (যে সুরক্ষা একপক্ষীয়, সবাই যার আঁচলে ছায়া পায় না) এবং বর্ণবাদী শক্তিকে বিলুপ্ত করে পূর্ববৎ স্বাভাবিক অবস্থার পুনর্জাগরণ করবে। এ পরিবর্তনের ফলে এমন এক রাজনীতির প্রয়োজন পড়বে যা গণআন্দোলনকে করবে শক্তিশালী। আর চলমান রাজনৈতিক পদ্ধতিকে গণতান্ত্রিকীকরণ করবে।
আপাত দৃষ্টিতে একে এক অতিরঞ্জিত পরিকল্পনা ভাবা যেতে পারে, তবে এর চেয়ে নাতিদীর্ঘ কোনো পরিকল্পনায় নজর দেয়ার অর্থ হবে আমরা প্রকৃত হুমকি যা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করবে এবং তা প্রতিহত করার কৌশল কোনোটা সম্পর্কেই যথেষ্ট ওয়াকিবহাল নই।
ভাষান্তর: হাবিবুর রহমান রাকিব

টিকাঃ
[৩৫] ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান বার্নিডোতে এক মুসলিম দম্পতির হামলায় ১৪ জন নিহতের ঘটনার পর রিপাবলিকান প্রার্থ ডোনাল্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার দাবি করেন। তার এই বক্তব্য বিশ্বজুড়ে ঝড় তোলে। পরে ডোনাল্ট ট্রাম্প নিজের কথাকে ঘুরিয়ে বলেন, 'ওটা ছিল সার্ন বার্নিডো হামলার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া।' তবে এর কিছুদিন আগে ফ্রান্সের প্যারিসে এক সন্ত্রাসী হামলার দায়ও চাপানো হয় নিরীহ মুসলিমদের ঘাড়ে। তখন চলছিল নির্বাচনি মৌসুম, মুসলিমদের অপরাধী বানিয়ে শুরু হয় ইসলামফোবিয়ার খেলা। এরই জের ধরে আমেরিকাজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার শেকড় সন্ধান করেন Islamophobia and the Politics of Empire বইয়ের লেখক ও সাংবাদিক দীপা কুমার।
[৩৬].৯/১১-এর হামলার পর সেই হামলাস্থলই আজ পরিচিত 'গ্রাউন্ড জিরো' হিসেবে। সেখানেই পশ্চিমা বিশ্ব ও মুসলমানদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় একটি গ্রুপ 'কর্দোবা ইনিশিয়েটিভ'। কিন্তু এমন একটি ■বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া ৪২ আরও পিডিএফ বই ডাউনলোড করুন www.boimate.com
জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করা ঠিক নয় এই যুক্তিতে, এর ঘোর বিরোধিতা শুরু করে নিউইয়র্কবাসী।

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ইসলাম ও ফ্রান্স : শার্লি এদোর নেপথ্যে

📄 ইসলাম ও ফ্রান্স : শার্লি এদোর নেপথ্যে


ইসলাম ও ফ্রান্সের মধ্যে প্রথম পরিচয়টি অষ্টম শতাব্দীর শুরু থেকে, বিশেষত ৭১৮ খ্রিস্টাব্দে। অর্থাৎ মুসলমানরা আন্দালুস জয় করার মাত্র কয়েক বছর পরই। বর্তমান ফ্রান্সের মূল ভূমিকে মুসলমানরা তখন 'গ্রেট ল্যান্ড' বা 'মহান ভূমি' নামে অভিহিত করত। সে বছর স্পেনবিজয়ী তারিক বিন যিয়াদ তার সেনাবাহিনী নিয়ে এক অনুসন্ধানী অভিযানে বের হন। একের পর এক জয়ের পর মুসলিমরা আরবোন (নরবোনে) বিজয়ে সক্ষম হয়। কিন্তু ৭১৫ সালে মুসলিম বাহিনীর সেনা-কমান্ডার সামাহ বিন মালিক আল খুলানি শহিদ হওয়ায় প্রথম প্রচেষ্টার সমাপ্তি হয় এবং মুসলমানরা বার্সেলোনায় তাদের শক্ত ঘাঁটিতে ফিরে যায়।
১০ বছর পর মুসলমানরা পুনরায় নতুন বিজয়ের জন্য ফ্রান্সের দরজায় করাঘাত করে। সুহাইম আল কালবির নেতৃত্বে এক বাহিনী ফ্রান্স বিজয়ে সক্ষম হয়। তাদের বিজয়াভিযানের ফলে প্যারিস তখন মাত্র ১০০ মাইল দূরে ছিল। এখানেই থেমে ছিল না। বরং আবদুর রহমান গাফিকির নেতৃত্বাধীন বাহিনী নতুন ভূমি যুক্ত করার মানসে ৭৩২ 'বর্দে' হতে অভিযান শুরু করেন। একপর্যায়ে 'পয়োটার্সে' তাদের অভিযান থেমে যায়। সেখানে বালাতুশ শুহাদা নামক বিখ্যাত লড়াইয়ে মুসলিম বাহিনীর পরাজয় হয়। ফলে উত্তরে মুসলিমদের অগ্রাভিযান থেমে যায়। তবে তা এ অঞ্চলের ক্ষমতার চিত্র বদলে দেয়নি। তারা ৭৩৭ সালে মার্সেই এবং ৮৮৯ সালে সেন্ট-ট্রয়েসকে মুসলিম ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করে। দশম শতাব্দী পর্যন্ত এখানে মুসলিমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।
আন্দালুসের পতনের পর ফ্রান্স আর মুসলিমদের মধ্যে সম্পর্কের মোড় ঘুরে যায়। এবারের সম্পর্কে কোনো শত্রুতা নেই, বরং যৌথ দুশমন স্পেনের ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধে এক হয়ে যায় তারা। স্পেনের যে সকল মুসলিম আফ্রিকায় না গিয়ে ইউরোপে থাকতে চায়, তাদের ফ্রান্স স্বাগত জানায়। তারা সেখানে ধর্মকর্মসহ সকল ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হয়। বিশেষত ফ্রান্সিসরা যখন ইসলামে প্রবেশ করতে থাকে। ১৬০৫ সালে স্পেনের 'মরিসকোদের' (যারা প্রাণের ভয়ে খ্রিস্টান ধর্ম প্রকাশ করে কিন্তু আদতে মুসলিম) একটি প্রতিনিধিদল ফ্রান্সের বাদশাহ চতুর্থ হ্যানরির নিকট স্পেনের রাজা তৃতীয় ফিলিপের বিরুদ্ধে সহযোগিতা চায়। তিনিও তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এক পাগল পাদ্রীর হাতে বাদশাহ নিহত হওয়ায় নতুন করে মুসলিমদের সেখানে যাওয়ার স্বপ্ন ফিকে হয়ে যায়।
মুসলিমদের একের পর এর দুর্গের পতনের পর বাকি ছিল উসমানি সালতানাত। যা সাইক এবং পিকেটের ষড়যন্ত্রে যেমন ইচ্ছে ব্যবহৃত হচ্ছিল। মুসলিম ও ফ্রান্সের সম্পর্কে নতুন বাঁক দেখা দেয়। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ফ্রান্স তার নৌবহর পাঠিয়ে সেখানকার জনশক্তি ও বিভিন্ন খনিজদ্রব্য ফ্রান্সে আনতে থাকে। আফ্রিকার সম্পদে গড়ে উঠতে থাকে ফ্রান্সের শক্তিসামর্থ্য। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সৈন্যবল জোগাতে ও যুদ্ধের পর ক্ষত সারিয়ে তুলতে ফ্রান্স মুসলিমদের আনতে থাকে। তারা তাদের ধর্মকর্মের জন্য সেনানিবাসের ভেতরও মসজিদ নির্মাণ করে। ধীরে ধীরে তাদের পরিবারও আসতে থাকে। এমনকি এক সময় ফ্রান্সে খ্রিস্টধর্মের পর ইসলাম সেখানে দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মের স্থান দখল করে। যা একসময় ধর্মনিরপেক্ষ ফ্রান্স নিজের জন্য হুমকি মনে করতে থাকে।
ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষতা: সবকিছুর আগে এবং পরে ধর্মের প্রতি শত্রুতা
কেউ যদি অ-ইউরোপীয় কোনো দেশ (মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধপীড়িত অঞ্চল বা দরিদ্র এশীয় কিংবা মঙ্গাকবলিত আফ্রিকা) থেকে ফ্রান্সে যেতে চায়, তাকে প্রথমেই ফ্রান্সের প্রজাতন্ত্রের নীতির অন্তর্ভুক্তি এবং পরিচয় বিভাগের কোর্সে অংশ নিতে হবে। এটা তাকে শেখাবে ফ্রান্স একটি ধর্মহীন রাষ্ট্র। কিন্তু এখানে পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। তবে বাস্তবে এ কথিত স্বাধীনতার অর্ধাংশও পাওয়া কঠিন। ফ্রান্স ১৯০৫ সালে রাষ্ট্র হতে গির্জাকে আলাদা করার পাশাপাশি ফ্রান্সকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়ে আইন পাস করে। যে আইনের কোনো ধরনের ব্যাখ্যা চলবে না; যেন আসমানি নির্দেশনা। এটা নিশ্চিত করার জন্য দুটি বিশেষ অথরিটি আছে। তারা হালাল-হারাম পর্যন্ত নির্ধারণ করে।
ইসলাম সম্পর্কে ফ্রান্সের রাজনৈতিক স্রোতের মনোভাব
বর্তমান ডানপন্থি রাজনৈতিক পরিভাষা মূলত ফ্রান্সের রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের আধ্যাত্মিক পিতা ম্যারিন লুবিনের মতাদর্শনের রূপায়ণ। এদের মূল ফোকাস হলো অ-ফ্রেঞ্চদের বিরোধিতা করা। এরাই মূলত ফ্রান্সে ইহুদিদের উপস্থিতির বিরোধিতা করেছিল। যদিও বর্তমানে তারা তা থেকে নিজেদের দায়মুক্তির দাবি করে। কিন্তু বর্তমানে তারা মুসলিম আইডিওলজির বিরোধিতাকে তাদের প্রচারণার মূল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে।
এদের এই ডানপন্থার আদর্শই মূলত বর্তমানে বিশ্বব্যাপী কাজ করছে। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী মূলত এদের আদর্শেরই অনুসারী। বর্তমান ফ্রান্সের ডানপন্থিরাও ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিরোধিতার কোনো সুযোগকে হাতছাড়া করে না। ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী তার বিবৃতিতে বলেছেন, 'ধর্মের সাথে তাদের কোনো বিরোধ নেই। সমস্যা শুধু ইসলাম বা ইসলামি 'চরমপন্থা' নিয়ে। সাবেক ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি ফ্রান্সের স্কুলগুলো মুসলিম ছাত্রদের জন্য হালাল খাবার ও হিজাবের সোজাসাপ্টা বিরোধিতা করেছেন।
অন্যদিকে বামপন্থিরা মুসলিম কমিউনিটির প্রতি তুলনামূলক ইতিবাচকতা দেখায়। বামপন্থি রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে সন্ত্রাসবাদকে জড়ানোর বিরোধিতা করেছেন। সাবেক বামপন্থি প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সে একাধিকবার বলেছে, 'ইসলাম গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মূল্যবোধের পরিপন্থি নয়। ফ্রান্সে তাদেরও অন্য নাগরিকদের মতো অধিকার আছে। সন্ত্রাসের বলি হওয়া থেকে তারাও নিরাপদ নয়। বামপন্থিরা ডানপন্থিদের মুনাফিক আখ্যায়িত করে বলেন, 'তারা বাদশাহ সালমানের সাথে আলোচনা করে, সেখানে কী হচ্ছে তা জানা সত্ত্বেও তারা তার নিকট উদ্বেগ প্রকাশ করে না। খ্রিস্টানদের ধর্মীয় পোশাকে আপত্তি না থাকলেও তাদের মুসলিমদের পোশাকে আপত্তি। ইসরায়েলি কোনো মন্ত্রী কোনো নারীর সাথে হ্যান্ডশেক করা থেকে বিরত থাকলে তারা চটে না, তারা বেজার হয় যদি কোনো মুসলিম হাত মেলানো থেকে বিরত থাকে।'
ফ্রেঞ্চ ইসলাম
যে ফ্রান্স এখনো ধর্ম থেকে দূরে থাকা এবং রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে দূরে রাখা নিয়ে গর্ব করে, তারা প্রকৃত ইসলামের প্রচার-প্রসার করবে- এমন চিন্তা করাও কঠিন। ইসলামের বিরোধিতার জন্য তারা মূলত দুভাবে কাজ করে। পরোক্ষভাবে ইসলামিক যেকোনো অনুষ্ঠানে প্রশাসনিক ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের মডারেশন করা। প্রশাসনের সাথে মুসলিম কমিউনিটির দৃঢ় বন্ধন তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ব্যবহারের চেষ্টা করা। প্রত্যক্ষভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সেল মুসলিম কমিউনিটি সংগঠনের বিষয়ে ছাড়পত্র দেয়া।
অনেকে মনে করতে পারেন, সাম্প্রতিক সময়ের অস্থিরতার কারণে ফ্রান্স প্রশাসন এ ব্যবস্থা নিয়েছে। না, তা নয়। এটা বরং বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে নেয়া পদক্ষেপ। ১৯৯৭ সালে সে সময়ের ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার কথা বলেন, যা ইসলামকে ফ্রান্সের অনুকূলে নিয়ে আসবে। তিনি এক জনসভায় মুসলিমদের বলেন, 'আমরা প্রতিষ্ঠান করতে চাই। আমরা ফ্রেঞ্চ ইসলামের প্রতিষ্ঠা করতে চাই।' ২০০৩ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'আজ ফ্রান্সের মুসলিমরা ফ্রেঞ্চ ইসলাম গ্রহণ করছে। এ ইসলাম তাদের বংশধররাও বহন করবে। আমরা এমন ইমাম চাই, যারা আমাদের সভ্যতা ধারণ করবে, আমাদের যুবকদের সাথে কথা বলতে পারবে, আমাদের সাথে আমাদের ভাষায় কথা বলবে।' ২০১৬ সালে মুসলিম প্রতিষ্ঠানে অমুসলিম প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেয়া হয়, যা মূলত ইসলামি জ্ঞানে পাণ্ডিত্য রাখেন এমন ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত।
বাকস্বাধীনতা বনাম অবমাননা
শার্লি এবদোর ঘটনাকে পশ্চিমা দুনিয়া বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে। এ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন বিতর্ক। (পুরনো বিতর্ক নতুন করে) 'মত প্রকাশের স্বাধীনতা কি সীমাহীন?৩৭ ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১৯তম ধারায় বাকস্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হলেও ১২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, 'কাউকে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিবার, বসতবাড়ি বা চিঠিপত্রের ব্যাপারে খেয়ালখুশি মতো হস্তক্ষেপ অথবা সম্মান ও সুনামের ওপর আক্রমণ করা চলবে না।' ২৯-এ বলা হয়েছে, 'স্বীয় অধিকার ও স্বাধীনতাগুলো প্রয়োগকালে প্রত্যেকেরই শুধু ওই ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকবে, যা কেবল অন্যের অধিকার ও স্বাধীনতাগুলোর যথার্থ স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধা নিশ্চিত করে ...।' ১৯৬১ সালের নভেম্বরে গৃহীত মানবাধিকার কনভেনশনের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বাক ও চিন্তার স্বাধীনতাকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি বলা হয়েছে, 'স্বাধীনতা নিঃশর্ত বা চূড়ান্ত নয়। বাকস্বাধীনতা ব্যক্তির মর্যাদা, জনগণের মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলার প্রতি আক্রমণাত্মক হতে পারবে না।' পোেপ ফ্রান্সিস অতি সম্প্রতি বলেছেন, 'বাকস্বাধীনতার সীমা থাকা উচিত।' (কালের কণ্ঠ ১৬-০১-১৫ ইং) চীন, রাশিয়াসহ অসংখ্য দেশে বাকস্বাধীনতাকে শর্তযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। বাকস্বাধীনতা শর্তহীন নয় বলেই প্রতিটি দেশেই আদালত অবমাননা আইন প্রবর্তিত হয়েছে। এটা স্পষ্ট যে, যা ইচ্ছা তা-ই বলে যাওয়া, লিখে যাওয়া, দেখা মাত্র কাউকে গালাগাল দেওয়া বাকস্বাধীনতা হতে পারে না। বাকস্বাধীনতা মানে মিথ্যাচার নয়, বিদ্বেষ ছড়ানো বাকস্বাধীনতা নয়। বাকস্বাধীনতা মানে সত্য বলার অধিকার।
বাকস্বাধীনতা নিয়ে পশ্চিমাদের দ্বিমুখী নীতি : পশ্চিমারা অব্যাহতভাবে ইসলাম অবমাননাকে বাকস্বাধীনতা বলে চালিয়ে দিলেও ব্রিটিশ রাজবধূ কেটের নগ্ন ছবি ছাপানো নিষিদ্ধ করেছে। ওই সব ছবি ছাপানোর দায়ে একটি ফরাসি পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে নিয়ে বহু নাটক বিশ্ববাসী দেখেছে।
গত গ্রীষ্মে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলিরা ১৭ জন সাংবাদিক হত্যা করলেও হয়তো সেটা বাকস্বাধীনতার ওপর হামলা নয় (!) বলেই বিশ্বনেতারা এককাতারে সমবেত হননি। যুক্তরাজ্যে প্রচলিত ব্লাসফেমির আওতায় মুসলমানরা সালমান রুশদির বিচার চাইলেও বুঝতে দেরি হলো না, এ আইন খ্রিস্টধর্মের জন্য! ইসলামের অবমাননার জন্য নয়! দুর্ভাগ্যক্রমে রুশদি ও তাঁর বই নিয়ে ব্যঙ্গ করে তৈরি করা পাকিস্তানি একটি চলচ্চিত্র যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ কর হয়। এমনকি মুসলমানরা কেন পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে দিন দিন খেপে যাচ্ছে, এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি কিছু চলচ্চিত্রের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সন্দেহজনক ফ্রেঞ্চ ইসলাম
ইসলামের সাথে ফ্রান্সের সম্পর্ক বেশ প্রাচীন। কখনো সরাসরি সংঘাত, কখনো লিয়াজোঁকেন্দ্রিক। এটা প্যারিসের বহুল চর্চিত পদ্ধতি। নেপোলিয়ন মিসর দখল করা সত্ত্বেও নিজের নাম মুহাম্মাদ রেখে ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তার দুরভিসন্ধি মিসরের আলেমদের নিকট গোপন করতে পারেননি। উপনিবেশিক দেশগুলোতে মুসলিমদের নির্মম নির্যাতনকারী জেনারেল হার্বার কিন্তু প্যারিসের সবচেয়ে বড়ো মসজিদের অর্থায়নকারী।
উপরের তথ্যের আলোকে ফ্রেঞ্চ ইসলাম-প্রচারের মাধ্যম 'ফ্রান্স ইসলামিক ফাউন্ডেশন' নামক প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য, দিকনির্দেশনা এবং বার্তা ধর্মীয় বা ধর্মনিরপেক্ষ হোক, উপেক্ষা করা উচিত নয়। এই প্রকল্প সফল হতে পারে।
আবার মুসলমানরা এতে জড়িত না বলে এটি ব্যর্থ হতে পারে। এখানে সবকিছুই সম্ভব। তবে সবক্ষেত্রেই মুসলমান এবং পশ্চিমাদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সভ্যতার যুদ্ধ একটি নতুন মোড় গ্রহণ করছে বলে মনে হয়।

টিকাঃ
[৩৭] কালের কণ্ঠ ১৪-০১-১৫ ইং

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 কানাডায় ইসলামোফোবিয়া : একজন খ্রিষ্টান নারীর নির্মোহ পর্যবেক্ষণ

📄 কানাডায় ইসলামোফোবিয়া : একজন খ্রিষ্টান নারীর নির্মোহ পর্যবেক্ষণ


আমি একজন খ্রিস্টান শ্বেতাঙ্গ। চতুর্থ প্রজন্মের একজন কানাডিয়ান। এই তিনটি কারণে অন্য অনেক কানাডিয়ানের চেয়ে আমার জীবন অনেক সহজতর হয়েছিল। কখনো বর্ণবাদের নৃশংস আক্রমণের শিকার হইনি। যেখানেই যাই, গলায় ক্রসচিহ্ন পরেই যাই, কেউ কিছু বলে না। প্রকাশ্যে আমি আমার ধর্ম আমার শরীরে ফুটিয়ে তুলে চলাফেরা করি- কিন্তু কখনো চরমপন্থি বলে কেউ গালি দেয় না। এই এখন আমার সুবিধাগুলো নিয়ে খুব ভাবছি, যখন ইসলামোফোবিয়ার শিরশির হাওয়ায় প্রতিটি অমুসলিম ভেতরে ভেতরে কাঁপছে। মুসলিমদের ওপর যে অ্যাটাক এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ড চলছে, এগুলো ঘটাচ্ছে আবার আমারই বর্ণের শ্বেতাঙ্গরা। আমার বর্ণের মানুষগুলো ইসলামোফোবিক আক্রমণ করছে এইজন্য আমি আমাকে নিয়ে ভাবছি না, বরং আমি ভাবছি এরা মুসলিমদের চেনেই না। না চেনা এবং না জানা থেকে তাদের ভেতর এক অদৃশ্য ভয় তাদেরকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়োয়। আমি লক্ষ্য করেছি, আমার মতা সুবিধাভোগী কানাডিয়ানরা মুসলিমদের প্রতি দারুণ বিরক্ত এবং প্রকাশ্য বিরোধী। কিন্তু কেন?
আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করিড়মুসলমানদের যথার্থভাবে ফুটিয়ে না তোলার কারণে মিডিয়ায় কিংবা বইয়ে, এই দেশের লোকদের মনে মুসলিমদের প্রতি প্রচুর নেতিবাচক মনোভাবের জন্ম নেয়। কানাডায় খুব অল্প মুসলমান। যেহেতু আমার শৈশব কেটেছে শ্বেতাঙ্গ স্কুলে, চার্চে, কখনো মুসলমানদের সংস্পর্শেও আসিনি, সেহেতু মুসলিমদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব জন্ম নেয়ার অনেক সুযোগ ছিল। কিন্তু আমার সৌভাগ্য- আমার কমিউনিটি আমাকে অন্য ধর্মের বিশ্বাস, আচার-আচরণ বিশেষ করে মুসলিমদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হতে দেয়নি। ৯/১১-র হামলার পর সবাই যখন ভীত সন্ত্রস্ত, তখন আমাদের কমিউনিটি প্রধান মসজিদের ইমামকে ডেকে এনে বললেন, 'ইসলাম এবং সন্ত্রাসবাদ এক নয়। ইসলাম কখনো সন্ত্রাসবাদ সমর্থন করে না। এগুলো আমার কমিউনিটিকে বুঝিয়ে দিন।' ইমাম সাহেব এত সুন্দর করে বিষয়টি ফুটিয়ে তুললেন, কমিউনিটির লোক এবং আমার বাবা-মা বিষয়টি খুব স্পষ্ট করে বুঝে গেলেন। ইমামের বয়ানের পর ওদের ভেতর কাজ করতে থাকা ভয় যেন নিমেষেই হাওয়া হয়ে গেলো।
এরপর যখন হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই, স্কুল বোর্ড নিয়ন্ত্রিত 'স্টুডেন্টস টুগেদার অ্যাগেইনস্ট রেসিজম' (এস.টি.এ.আর) নামে একটি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের সুযোগ পাই। প্রশিক্ষণে আমাদের শেখানো হয় পক্ষপাতদুষ্টতা, গোঁড়ামি এবং বৈষম্যের সংজ্ঞা। আমার সহনশীল বিশ্বাস এবং বিশ্বদর্শন এই প্রোগ্রামটির মাধ্যমেই উন্নত হয়েছিল। আমার হাইস্কুলে ছাত্র-ছাত্রী ছিল দুই হাজার। একদিন একটি মুসলিম মেয়ে রোজা রেখে, হিজাব পরে স্কুলে আসে। তখন তাকে ক্লাসের সবার সামনে রোজা এবং হিজাব নিয়ে কিছু বলতে দেয়া হয়। সে তার মত করে রোজা এবং হিজাবের বিষয়টি ফুটিয়ে তোলে এবং কারো কারো প্রশ্নের উত্তরও দেয়। এতটুকু স্পেস আমাদের কমিউনিটি অন্য ধর্মকে দিত। দেয়ার কারণেই ওইদিন আমরা নতুন কিছু জানতে পেরেছিলাম। হয়তো অনেকের মনে এসব নিয়ে প্রশ্নও ছিল। কিন্তু মুসলিম মেয়ের বর্ণনার কারণে তা দূর হয়ে গেলো।
মুসলিম অন্য কেউ না, আমাদেরই দেশে, কমিনিউটিতে বাস করে। মিডিয়া তাদের কীভাবে দেখালো, তা বিচার না করে ইসলাম আসলে কী বলে তা খতিয়ে দেখা উচিত। মুসলিমরাই কেবল তাদের নিজেদের রক্ষা করবে এমন নয়, বরং আমাদেরও তাদের প্রতিরক্ষায় দাঁড়াতে হবে। ইসলাম সম্পর্কে না জেনে যারা ফোবিয়া ছড়াচ্ছে, সেইসব বর্ণবাদীদের পক্ষে কেন দাঁড়াবেন? কেউ যখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে কথা বলে, আমি ভাবি সে মুসলমানদের সম্পর্কে না জানার কারণেই এসব বলছে। কথায় আছে- 'অজ্ঞতা ডেকে আনে ভয়। ভয় ডেকে আনে ঘৃণা।' তাই ছোট থেকেই বাচ্চাদের শেখাতে হবে সহনশীলতা। তাহলে বড়ো হয়ে তারা উগ্র, অসহনশীল হবে না। আমি এর জ্বলন্ত প্রমাণ। বর্ণবাদী হওয়ার যাবতীয় পরিবেশ আমি পেয়েছি। কিন্তু সহনশীলতা শিক্ষা পাওয়ার কারণে নেতিবাচক মনোভাবে আক্রান্ত হইনি। আশা করি আমরা যদি আমাদের সন্তানদের সেই শিক্ষা দিতে পারি, তাহলে তারা আমাদের চেয়েও বেশি অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও সুরক্ষা দিতে পারবে!
ভাষান্তর : রাকিবুল হাসান

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00