📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ফিলহাল ইসলামোফোবিয়া

📄 ফিলহাল ইসলামোফোবিয়া


পশ্চিমের দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান ইসলামভীতি মুসলমান-খ্রিস্টান ঐতিহাসিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। দুঃখজনকভাবে ইসলামভীতির প্রসারে সবচেয়ে বেশি উৎসাহী পশ্চিমের শক্তিশালী গণমাধ্যমগুলো। যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে আন্তর্জাতিক জায়নবাদী চক্র ও তাদের দোসররা। ইতোপূর্বে পশ্চিম সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিপজ্জনক লাল অক্ষ, চীনকে বিপজ্জনক হলুদ অক্ষ ও ইসলামি বিশ্বকে বিপজ্জনক সবুজ অক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। আফগানিস্তানে তালেবানের হাতে ঐতিহাসিক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে পশ্চিমের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগ্যান ঘোষিত দুষ্টরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের। উদীয়মান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনও পশ্চিমের সাথে একটা অলিখিত মীমাংসায় পৌঁছায়। ফলে পশ্চিমারা নতুন শত্রু হিসেবে ইসলাম ও মুসলমানদের মূর্তিমান করতে উঠেপড়ে লাগে। কারণ শত্রুবিহীন কোনো আদর্শ বা রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। দীর্ঘ নির্জীবতার পর ইতোমধ্যে নড়েচড়ে বসেছে মুসলিমবিশ্ব। স্কুল-কলেজ ও ভার্সিটির সর্বত্র শিক্ষিতমহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে ইসলামি চেতনার নব জাগরণ। গৌরবময় অতীতের মিশেলে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগা সমকালকে রূপায়ণের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে মুসলিম তরুণরা। পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যুগ যুগ ধরে মুসলিম বিশ্বে যেভাবে দখলদারিত্ব, নিপীড়ন-নির্যাতন ও বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন চালিয়ে এসেছে। তারই যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া এ মহাজাগরণ।
অবশ্য পশ্চিমের অনেক নিরপেক্ষ চিন্তক ও গবেষক ইসলাম নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ার একদেশদর্শী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন। এদেরই একজন ওয়াশিংটনের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির ধর্ম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ইসলামি স্টাডিজের প্রখ্যাত অধ্যাপক জন এস্পোসিতো [John Esposito]। তিনি “দি ইসলামিক থ্রেট : ফ্যাক্ট অর মিথ” শীর্ষক বইয়ে দেখিয়েছিলেন কীভাবে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে ইসলামভীতির মিথ তৈরি করা হয়।
এটি পশ্চিমের প্রাচীন ব্যাধি
পশ্চিমাদের মাঝে ইসলামকে ঘিরে আতঙ্ক একেবারেই নতুন কিছু না। পশ্চিমা গবেষক, রাজনীতিবিদ এবং ধর্ম পণ্ডিতদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে সেটাই দেখাব আমরা। আমি আমার "ইসলামি সমাধানের শত্রুগণ” শীর্ষক বইতে বিষয়টি সবিস্তারে আলোচনা করেছি। তাৎপর্যপূর্ণতার বিচারে এখানে সেই আলোচনার নির্বাচিত অংশটি তুলে ধরছি।
'ইসলামি পুনর্জাগরণের অন্ধবিরোধিতাকারীদের মধ্যে একেবারে প্রথম সারিতে আছে পশ্চিমা ঔপনিবেশিকরা। দেখুন প্রখ্যাত ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ H.A.R. Gibb (১৮৯৫-১৯৭১) ইসলামি পুনর্জাগরণ আন্দোলন নিয়ে কি ভয়াবহরকম শঙ্কিত। তিনি বলছেন, “ইসলাম কেবলই কিছু ধর্মাচারের সমষ্টি নয় বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা। এ সভ্যতার বিপজ্জনক দিকটি হলো এটি স্থান ও কালের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো মুসলিমজাতিকে একত্রিত করে রাখে। যা একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক অক্ষ তৈরিতে দারুণ সহায়ক। যে অক্ষের উত্থানের মানে হলো ইউরোপের জগতবিচ্ছিন্নতা ও পরাজয়। কারণ ভৌগোলিকভাবে ইউরোপ চারদিক থেকে মুসলিম ভূখণ্ড বেষ্টিত”। ১৮
পাশ্চাত্য বেশ ভালো করেই জেনেছে যে, ইসলাম একটি সর্বব্যাপী বিপ্লবী আদর্শ। যা ব্যক্তির জন্মকাল থেকে মৃত্যু অবধি ব্যপ্ত। এ আদর্শ ব্যক্তিকে অন্য কোনো জাগতিক কিংবা ধর্মীয় মুবাদ- হোক তা প্রাচ্যদেশীয় কিংবা পাশ্চাত্যদেশীয়, গ্রহণ করতে অনুমতি দেয় না। ইসলাম তার অনুসারীেেদর এ সম্পর্কে গর্বিত হতে শিক্ষা দেয়। দীক্ষা দেয় শক্তি অর্জন ও আগ্রাসী শত্রুর হিংসা প্রতিরোধক জিহাদের। যা মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য ও পুণ্যকাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পাশ্চাত্য এও জেনেছে যে, মুসলিমজাতি জন্মভূমি, ভাষা ও বর্ণে যতই আলাদা হোক না কেন, ভ্রাতৃঐক্য লঙ্ঘন এখানে অমার্জনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। এ ঐক্যের ভিত অনেক গভীরে প্রোথিত। এটি মুসলমানদের আবেগ অনুভূতি ও চিন্তাজগতকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে। বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী সব সীমাবদ্ধতা ও পার্থক্য এর উত্তাপে দ্রবীভূত হয়।
ইসলামের বিপুল সুপ্ত শক্তি ও ভ্রাতৃচেতনা নিয়ে পাশ্চাত্যের শঙ্কার সর্বাধিক প্রাসঙ্গিক উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি হলো ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশ মন্ত্রকের পরামর্শক ও বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ গ্যাব্রিয়েলের Gabriel Hanotaux।
এই লেখকের একটি নিবন্ধ ১৯০০ সালে কায়রোর আল মুয়াইয়াদ পত্রিকায় অনূদিত হয়ে ছাপা হয়। এটা আরববিশ্বে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। মিসরের তৎকালীন প্রধান মুফতি মুহাম্মাদ আবদুহু গ্যাব্রিয়েলের নিবন্ধের প্রান্তিকতা ও ভ্রান্তি তুলে ধরে নিরপেক্ষ সমালোচনা করেছিলেন।
গ্যাব্রিয়েল তার নিবন্ধে দেখিয়েছেন, কীভাবে এশিয়ার মুসলিমরা তেজোময় দ্রুততায় পুরো উত্তর আফ্রিকা বিজয় করেছিল। তিনি তুলে ধরেছেন ইসলাম ও খ্রিস্টবাদের মাঝে বিরাজমান দীর্ঘ সংঘাতের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও ঊনবিংশ শতকে ইসলামের ওপর খ্রিস্টবাদের আধিপত্য অর্জনের বয়ান। তবু তিনি শঙ্কিত কারণ ইউরোপকে একদিকে মরক্কো অন্যদিকে কনস্টান্টিনোপলের [ইস্তাম্বুল] মতো মুসলিম ভূখণ্ডগুলো ঘিরে আছে। তিউনিসিয়া, আলজেরিয়ার মতো ফরাসি উপনিবেশগুলো তো বটেই, খোদ ফ্রান্সেও এক্ষণে বিপুল সংখ্যায় মুসলমান বসবাস করছে। ইসলাম আজ পৃথিবীব্যাপী বিরাজমান। মরক্কো, লিবিয়া, মিশর আর যীশুর স্মৃতিসম্পদ ও মানবতার উৎসভূমি জেরুসালেমেও আজ পতপত করে উড়ছে ইসলামের গৌরব পতাকা। শুধু কি তাই! সুদূর চীনেও পৌঁছে গেছে ইসলামের অনুপম আদর্শ। সেখানে আজ ২ কোটি মুসলমানের বসবাস। মুসলমানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনুযায়ী এ সংখ্যা সামনের বছরগুলোতে দশ কোটিতে পৌঁছাবে। ১৯
এটি মোটেই আশ্চর্যের বিষয় নয়। কারণ পৃথিবীর এমন কোন স্থান নেই যেখানে ইসলাম পৌঁছেনি। এটিই একমাত্র ধর্ম যাতে কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি ছাড়াই লাখ লাখ মানুষ গ্রহণ করেছেন। আজও অন্য যেকোনো ধর্মের চেয়ে ইসলাম সর্বাধিক প্রাসঙ্গিক ও জীবন্ত। তদুপরি এই ধর্ম থিতু হয়ে আছে খ্রিস্টবাদের স্মৃতিভূমি কনস্টান্টিনোপলে। ২০ খ্রিস্টান জাতিগুলো দুর্ভেদ্য এ নগরী রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। হারিয়েছে।
ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীরের নিয়ন্ত্রণ। এভাবে পশ্চিমের দেশগুলো একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
ইসলামি ঐক্যের শক্তি
গ্যাব্রিয়েল আরও বলেছেন, ইসলাম পৃথিবীর সকল মুসলমানকে একই সূত্রে গেঁথেছে। এটি তাদের চিন্তা ও কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। পৃথিবীর সুদূর প্রান্তের মুসলমানরা মনে মনে স্বপ্ন লালন করেন পবিত্র গৃহ কাবার সান্নিধ্য পাওয়ার। জমজমের স্বর্গীয় পানীয় আর রুপোর ফ্রেম বাধানো পবিত্র কালো পাথরের ছোঁয়া তাদের হৃদয়ে ধর্মীয় ভালোবাসার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বালায়। লাখো উপাসক২১ একজন মাত্র ইমামের পেছনে সারিবদ্ধ হয়ে নীরবে শ্রবণ করে কুরআনের এই বাণী, 'আল্লাহর নামে শুরু করলাম যিনি পরম করুণাময় ও অসীম দয়াময়। সমবেত স্বরে সমস্ত লোকজন বলে ওঠে 'আল্লাহু আকবার' (আল্লাহ মহান)।' অতঃপর পরম শ্রদ্ধায় লুটিয়ে পড়ে আল্লাহর স্মরণে।
তিনি আরও বলছেন, মনে করবেন না আমরা ফরাসিরা তিউনিসিয়া ও আলজেরিয়ার পরাধীন মুসলমানদের জগতের অন্য মুসলমানদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছি কিংবা তাদের স্বাধীনচেতা মনোভাব ও সংহতি নষ্ট করতে পেরেছি। আমাদের কলোনীগুলো যদিও ইসলামি ভূখণ্ড না কিন্তু মুসলিম পণ্ডিতরা এসব অঞ্চলকে যুদ্ধকবলিত ঘোষণা করেছে। যা তাদের আত্মচেতনা অটুট রেখেছে, হৃদয়ে জাগরুক রেখেছে ইসলামের প্রতি অসম্ভব ভালোবাসা। ইসলাম আজও তাদের বড়ো অংশটির কাছে সর্বোচ্চ প্রিয় ও শ্রদ্ধেয়। আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন মুসলমানদের অবস্থা সেই সিংহীর মতো যে চরম ক্রুদ্ধ হয়ে বন্দি শাবকের খাঁচার চারপাশে ঘুরঘুর করে। হতে পারে খাঁচার বুনন অসম্পূর্ণ কিংবা দুর্বল।
সবশেষে গ্যাব্রিয়েল উপসংহার টেনে বলেন, উপর্যুক্ত আলোচনা একথাই নির্দেশ করে যে, বিপর্যস্ত কিন্তু অদম্য এ জাতির সংহতি ও চিন্তা-চেতনার প্রোজ্জ্বল্য আমাদের জন্য হুমকিই হয়ে আছে।২২
গ্যাব্রিয়েলের এ নিবন্ধটি বেশ খোলামেলাভাবে আমাদের সামনে ইসলামকে ঘিরে পাশ্চাত্যের ভয়ংকর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছে। বিশ্বাস ও আচারকেন্দ্রিক মুসলিম ভ্রাতৃঐক্য পাশ্চাত্যকে কতটা ভাবিত করে তাও সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। গ্যাব্রিয়েল কথাগুলো অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে বললেও পশ্চিমের অবস্থান যে একদমই বদলায়নি, তা-ই প্রমাণ করে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমে ঘটমান ও ক্রমবিস্তারমান মুসলিমবিরোধী হিংসাগুলো।
ধর্মপণ্ডিতদের ইসলামভীতি
খ্রিস্টান মিশনারিদের মুখপত্র 'দি ইসলামিক ওয়ার্ল্ডের' একজন লেখক ইউমান লিখছেন, পশ্চিমা বিশ্বের কিছুটা ভীত হওয়া উচিত। কারণ মক্কায় আবির্ভূত হওয়ার পর ইসলাম কখনোই সাংখ্যিকভাবে দুর্বল হয়নি বরং মুসলমানদের সংখ্যা হু হু করে বেড়েছে। আমরা আমাদের অব্যাহত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কখনোই পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে পারিনি। আদতে ইসলাম কেবলই একটি ধর্ম নয়, এটি একটি লেলিহান শিখা। যার প্রজ্জ্বালক জিহাদ।
ধর্মযাজক ক্যালহাউন সিহোন লিখেছেন, ইসলাম তামাটে বর্ণধারী জাতিগুলোর মাঝে মহাজাগরণের সৃষ্টি করেছে। তারা আজ ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি পেতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আমাদের মিশনারিদের লক্ষ্য হলো ইউরোপের সভ্যতাকে হাইলাইট করে যুবসমাজকে আকৃষ্ট করা এবং ইসলামি শক্তিগুলোর মৌলিক শক্তি বিনষ্ট করা।
প্রফেসর লরেন্স ব্রাউন তার “ইসলাম অ্যান্ড দ্য মিশনারি” বইতে লিখেছেন, ঐক্যবদ্ধ একটি আরব রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা যদি ঘুরে দাঁড়াতে পারে তবে এটি পুরো পৃথিবীর জন্য বিপজ্জনক অভিশাপ কিংবা অনন্য আশীর্বাদ হতে পারে। আর যতদিন তারা শতধাবিচ্ছিন্ন হয়ে থাকবে ততদিন পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহে তাদের কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকবে না। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত তার অন্য একটি বইতে লিখেছেন, "ইসলাম তার সুপ্ত প্রান্তবন্ততা ও সম্প্রসারণশীলতার কারণে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে”।
ব্রাউনের বক্তব্যগুলো একেবারেই পরিষ্কার। মন্তব্য করার প্রয়োজন নেই। এটি পাশ্চাত্যের গভীরে প্রোথিত ইসলামভীতির প্রতিই নির্দেশ করে। ইসলামের মধ্যপন্থা, ন্যায়নিষ্ঠতা, প্রাণোচ্ছলতা, ঐক্যচেতনা, সম্প্রসারণ ধর্ম, স্বাধীনচেতা মনোভাব ও জিহাদের বাধ্যবাধকতা পাশ্চাত্যের দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ।
উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলন ইসলাম পরিচালিত ছিল
ইসলামের প্রচার পদ্ধতি ও নব উজ্জীবনের কারণে পাশ্চাত্য শঙ্কিত। কারণ ইতোমধ্যেই সবগুলো মুসলিম দেশে দখলদার পশ্চিমারা রীতিমত নাকানি-চুবানি খেয়েছে। যদিও এসব আন্দোলন সংগ্রামের ফল সেক্যুলাররা লুটেছে কিন্তু আন্দোলনগুলো ইসলামপন্থিরাই করেছে। মিসরে নেপোলিয়নের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল, এর নেতৃত্বে ছিলেন আল আজহার বিশ্ববিদ্যলয়ের সম্মানিত আলিমরা। ফরাসিরা আজহারকে ঘোড়ার আস্তাবল বানিয়ে এর প্রতিশোধ নিয়েছিল। সুদানে ব্রিটিশদের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল, এর অগ্রভাগে ছিলেন মুহাম্মাদ আল মাহদি। যিনি ছিলেন একজন মহান আলিম। মিত্রশক্তি ও গ্রিসের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তুরস্কে যে আন্দোলন হয়েছিল, তা আগাগোড়া ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের আন্দোলন ছিল। যদিও এর ফলটা ভোগ করেছে কামালপন্থি সেক্যুলাররা। লিবিয়ায় ইতালির দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল, এর নেতৃত্ব দিয়েছেন “মরু সিংহ” উমার আল মুখতার। যিনি ছিলেন প্রখ্যাত আলিম।
মরক্কোর পল্লি অঞ্চলে স্পেনবিরোধী যে গণবিপ্লব হয়েছিল, তার নেতৃত্বে ছিলেন মরক্কোর গুরুস্থানীয় আলিম আবদুল কারিম আল খততাবি। পল্লি আন্দোলন দমাতে দখলদার স্পেন পুরো ইউরোপের সাহায্য নিয়েছিল। ধর্মযাজক উইলিয়াম ক্যাশ তার "ইসলামিক ওয়ার্ল্ড ইন রেভুল্যাশন” গ্রন্থে আবদুল কারিম খততাবির বিপ্লব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বেশ শ্লেষ নিয়ে বলেন, প্রাচীন আরব্য চেতনাধারী গ্রামীণ বিদ্রোহীদের সাথে লড়তে গিয়ে স্পেনীয়রা মরক্কোর সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ নগরীর নিয়ন্ত্রণ হারায়। উপকূলের সিউটা ও মেলিলার মতো অল্প কটি নগরীই শুধু বাকি ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম কোনো ইউরোপীয় বাহিনী মুসলমানদের কাছে হেরেছে। অবশ্য তুর্কিরাও গ্রিসকে এশিয়া মাইনর থেকে বিতাড়িত করেছে।
আলজেরিয়ার সফল স্বাধীনতা আন্দোলন, যাতে ১৫ লাখ মুসলমান শহিদ হয়েছেন। এ আন্দোলনের মুজাহিদদের মূল চেতনা শক্তি ছিল ইসলাম। সে সময় ফ্রান্স ও তার দোসররা স্লোগান দিত- "আলজেরিয়া ফরাসি"। আর মুজাহিদরা প্রতিবাদী স্লোগান ওঠাতেন- "আলজেরিয় জাতি মুসলমান, আরব্যবোধ তার চেতনা"। যেটি ছিল স্বাধীন আলজেরিয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা শাইখ ইবনু বাদিস প্রদত্ত। ২৩
রাজনীতিবিদদের ইসলামভীতি
সাবেক ফরাসি প্রধানমন্ত্রী Guz Mollet বলেছেন, মরক্কোর ক্রমবিস্তৃত ইসলামি আন্দোলন আমাদের সামাজ্যের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। ফ্রান্সের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী Geovrges Bidult ঘোষণা করেছিলেন, আমি কখনোই চাঁদকে ক্রুশের ওপর বিজয়ী হতে দেব না। ফরাসি লেখক ও রাজনীতিবিদ Farancis Jeanson তার L'Algérie hors বইতে লিখেছেন, '১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া আলজেরীয় স্বাধীনতা আন্দোলন শুধুই ধর্মীয় বা জাতিগত কোনো আন্দোলন নয়। এটি নিপীড়ক শাসকের পীড়ন থেকে মুক্তির আন্দোলন। হ্যাঁ, ইসলাম আলজেরীয় মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রেরণা। আলজেরীয়রা প্রথম দিনেই বুঝেছিল ফরাসিরা তাদের মুসলিম পরিচয় মুছে দিতে চায়। সুতরাং মুক্তি পেতে হলে ইসলামকে সাথে করেই মুক্তি পেতে হবে।' ২৪
পশ্চিমা রাজনীতিবিদরা প্রায়ই কোনো ধরনের রাখঢাক না রেখেই ইসলাম নিয়ে নিজেদের শঙ্কার কথা বলছেন। কারণ মুসলিম দেশগুলোতে সামাজ্যবাদ ও ক্রুসেডের বিরুদ্ধে যতগুলো আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে সবগুলোর পেছনে সক্রিয় ছিল ইসলামি চেতনা। প্রখ্যাত ইহুদি ঐতিহাসিক বার্নার্ড লুইস রচিত 'দ্য মিডল ইস্ট: ব্রিফ হিস্টোরি অব লাস্ট ২০০০ ইয়ার্স” বইতে এসবের বিস্তারিত বিবরণ পাবেন।
আফগান জিহাদ
ইসলামি বিশ্বে সর্বশেষ আলোচিত প্রতিরোধ আন্দোলন আফগানিস্তানের সোভিয়েতবিরোধী গণজিহাদ। লালবাহিনীর সর্বাত্মক স্থল ও আকাশ হামলা উপেক্ষা করে ২০ লাখ আফগান জীবন বিলিয়ে অর্জন করেছিলেন স্বাধীনতা। পরাভূত হয়েছিল হানাদার লালবাহিনী। পতন হয়েছিল তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের।
পশ্চিমীকরণের সাফল্য সত্ত্বেও উদ্বিগ্ন পশ্চিমারা
পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো ইসলামি বিশ্বে পশ্চিমাকরণের যে এজেন্ডা হাতে নিয়েছিল তা আজ অনেকাংশেই সফল। শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনের সর্বত্র এর অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাব। এতদসত্ত্বেও পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তি পর্যবেক্ষকরা ইসলামি শক্তিগুলোর আকস্মিক উত্থানের বিষয়ে শঙ্কিত।
ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ H.A.R. Gibb লিখছেন, ভয়ংকর ও বিস্ময়করভাবে উত্থান ঘটছে ইসলামি আন্দোলনগুলোর। পর্যবেক্ষকদের সব ধারণা ভণ্ডুল করে দিয়ে যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে ইসলামি আন্দোলনগুলো। সালাহুদ্দিন আইয়ুবির মতো যোগ্য নেতৃত্বেরই শুধু ঘাটতি।২৫
জার্মান লেখক হেনরি কুস্তার ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত পলিটিক্যাল ইসলাম২৬ শীর্ষক নিবন্ধে লিখেন, “মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ঘটনাপ্রবাহে ইসলাম কতটা প্রভাব বিস্তার করে আছে তা পাশ্চাত্যের কাছে সুস্পষ্ট নয়। কিন্তু আমরা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, এ অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহ অনেকাংশেই ইসলাম নিয়ন্ত্রণ করে। এশিয়া ও আফ্রিকায় ঘটমান নানা ঘটনার পেছনে আছে মুহাম্মাদি বিশ্বাস। এটি বাস্তব সত্য, যদিও পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবীরা তা মানতে না চান”।
সমসাময়িক ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ অ্যান্টনি নাটিং তার “দি অ্যারাব” বইতে লিখেছেন, “সপ্তম শতকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সংগঠিত হওয়ার পর থেকে আরবরা ক্রমসম্প্রসারিত হয়েছে। যা এখনও থেমে নেই। পশ্চিমা বিশ্বের উচিত ইসলামকে শক্তিশালী ও স্থায়ী শত্রু হিসেবে বিবেচনায় নেয়া। যা ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করছে। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিৎ নয় মুসলমানরা তেরো শতাব্দী সবল-দুর্বল সর্বাবস্থায় খ্রিস্টান বাহিনীর মোকাবেলা করেছে”। ২৭ এ হলো মুক্তচিন্তার ধ্বজাধারী পশ্চিমের রাজনীতিবিদ, চিন্তক ও পর্যবেক্ষকদের উপলব্ধি।
ইউরোপের বর্তমান বাস্তবতায় ইসলামভীতি
এ তো মোটামুটি পুরনো কিছু বক্তব্য। যদিও ইউরোপের বর্তমান বাস্তবতায় এগুলো নতুন মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এইতো সেদিন ২০১০ সালের শেষদিকে সুইজারল্যান্ডের চরম ডানপন্থি খ্রিস্টান রাজনৈতিক দল সুইস পিপলস পার্টি দেশটিতে মসজিদের মিনার নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞার আইন চালু করার লক্ষ্যে এক গণভোটের আয়োজন করে। ৫৭ শতাংশ সুইস জনগণ তাদের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। এ ঘটনা ইউরোপে ইসলামবিদ্বেষী মনোভাবের তীব্রতা ফুটিয়ে তুলেছে। গণভোট আয়োজনকারীদের যুক্তি ছিল মুসলমানরা আজ মিনার নির্মাণ করে সাংস্কৃতিক প্রভাব বাড়াচ্ছে তো কাল শরিয়াহ আইনের দাবি তুলবে।
ওআইসি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের কর্মকর্তারা এর নিন্দা জানিয়েছেন। ভ্যাটিকান এ ফলাফল নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিকদের অভিজাত সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলারস এক বিবৃতিতে গণভোট আয়োজন নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে মুসলমানদের ইসলামি দাওয়ার পরবর্তী পর্যায়ের মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানায়। পাশাপাশি মুসলমানদের নিজেদের মধ্যকার মতপার্থক্য ও ভেদাভেদ ভুলে ধৈর্যের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
পুরো বিষয়টি ইউরোপে তীব্র ইসলামবিদ্বেষের সৃষ্টি করেছে। গণভোটের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হল্যান্ডের কট্টর ডানপন্থিরা তাদের দেশে অনুরূপ গণভোট আয়োজনের দাবি জানায়। অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টি ও ফ্রান্সের ফ্রন্ট ন্যাশনালও একই পথে হাঁটছে।
ইউরোপে খ্রিস্টবাদী চরমপন্থার উত্থান নিঃসন্দেহে মুসলিম তরুণদের ক্ষুব্ধ বরং অনেক ক্ষেত্রে খ্রিস্টবাদের প্রতি বিদ্বিষ্ট করে তুলবে। তারা বিশ্বাস করবে যে, পাশ্চাত্যের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ফাঁকা বুলি ছাড়া কিছুই নয়। সশস্ত্র পদক্ষেপ ও শক্তি প্রয়োগই এর একমাত্র সমাধান। তবু আমরা আশা হারাতে চাই না। আমরা আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে চাই। এটিই ইসলামের মহান শিক্ষা। বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেই ইসলামোফোবিয়ার মোকাবেলা হোক। ২৮
ভাষান্তর: হাবিবুল্লাহ বাহার

টিকাঃ
[১৮] আল ইত্তিজাহাতুল ওয়াতানিয়্যা; ডক্টর মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ হুসাইন [২/১৯৮]
[১৯] এটি ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রকের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দেয়া তথ্য। আরও কয়েক দশক পূর্বে প্রখ্যাত লেবানিজ চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদ আমির শাকিব আরসালান চীনের মুসলমানদের সংখ্যা পঞ্চাশ লাখ উল্লেখ করেছেন।
[২০] গ্যাব্রিয়েলের কথার সাথে যোগ করে বলতে চাই, আমরা শুধু কনস্টান্টিনোপলেই নই, আছি আলবেনিয়া, কসোভো ও বসনিয়ায়। এছাড়া আরো অনেকগুলো ইউরোপীয় দেশে মুসলমানদের সংখ্যা একেবারেই ফেলে দেয়ার মতো না।
[২১] হজ আমাদের সংহতির অনন্য নিদর্শন। ২০০৯ সালে ভয়াবহ ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির মধ্যেও ৩০ লাখ মানুষ এতে অংশ নিয়েছে
[২২] তারিখুল উস্তাযিল ইমাম [২/৪০২-৪২৪), আল ইত্তিজাহাতুল ওয়াতানিয়্যা ফিল আদাবিল মুয়াসির, ডক্টর মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ হুসাইন (২/৩৪৭]
[২৩] The Moslem World in Revolution by W.Wilson Cash, London 1928, P-5
[২৪] L'Algérie hors de loi bz Farancis Jeanson, 267-268
[২৫] আল ইত্তিজাহাতুল ওয়াতানিয়‍্যা, ২/২১৬
[২৬] রাজনৈতিক ইসলাম শিরোনামটি ইউরোপীয়দের সৃষ্ট বিভ্রান্তি। যা সাইদ আশমাভির মতো অরাজনৈতিক কোনো ভাগ নেই। ইসলাম একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ধর্ম যাতে রাজনীতিসহ সকল পশ্চিমা দাসরা ব্যাপক প্রচলন দেয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আদতে ইসলামে রাজনৈতিক বিষয়ের সহজ সুন্দর সমাধান রয়েছে
[২৭] আল গযউল ফিকরি; প্রফেসর জামাল কুসক, পৃ-২১
[২৮] বিষয়টির সাথে সম্পৃক্ত কিছু আলোচনা ফিকহুল জিহাদ বইয়ের নবম সংযুক্তিতে আছে। আগ্রহী পাঠক দেখে নিতে পারেন।

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 কল্পিত ইসলামোফোবিয়া এবং ভয়ের পলিটিক্স

📄 কল্পিত ইসলামোফোবিয়া এবং ভয়ের পলিটিক্স


১৪ মার্চ ২০১৬। ভিয়েনার উইনার এভিয়েশনে চলছে রিপাবলিকানদের নির্বাচনি প্রচারণা। প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশে সাংবাদিক এন্ডারসন কপারের ছুড়ে দেয়া প্রশ্ন- 'যদি ইসলাম পশ্চিমাদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে' এর জবাবে সে বলে, “আমার ধারণা মুসলিমরা আমাদের ঘৃণা করে। তাতে ভয়ংকর রকমের ঘৃণা রয়েছে। আমাদের হতে হবে সজাগ ও সতর্ক। মুসলিম ও আমেরিকার প্রতি ঘৃণা পোষণকারী ব্যক্তিদের আমরা এ দেশে প্রবেশাধিকার দিতে পারি না।"
এভাবেই বিভিন্ন টকশো ও টিভি সংবাদে ট্রাম্প প্রদত্ত তথ্যাবলি বেতার ও জনজীবনে ইসলামোফোবিয়ার পরিব্যপ্তি ঘটায়। সেখানে মিডিয়ার সম্প্রচারে ও প্রকৃত সত্য গ্রহণের পরিবর্তে আরও অমার্জিত-নকল গ্রহণে আর আদর্শিক ভদ্র বর্ণবাদের চাল চালার প্রয়োজনে তারা বারবার কর্তৃত্ব ফলিয়ে যাচ্ছে।
মিডিয়ার সম্প্রচার ও জাতীয় আলাপন ইসলামোফোবিয়ার এমন এক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে, যা ইসলাম, মুসলমান এমনকি সামাজিক চিন্তা-চেতনাকে প্রভুত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে ফেলে। পশ্চিমা দেশগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই ইসলাম ও মুসলিম সম্পর্কে মনগড়া গল্প-কাহিনি নির্মাণাধীন রয়েছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা ক্রুসেডে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কার উদ্রেক করে। এই অলীক উপাখ্যানে ইসলাম ও মুসলিমদের মনগড়া ও কল্পিত এক ছাঁচ ও কাঠামোতে বিবেচনা করা হয়। ফলে তারা কখনো স্বাধীনভাবে আলাপচারিতার কিংবা এই মনগড়া গোলকধাঁধার বাইরে যাওয়ার অনুমোদন পায় না। প্রকল্পিত, স্বাপ্নিক ও সূচিত এমন এক অভ্যন্তরীণ ক্লোজ সার্কিটব্যবস্থায় ইসলাম ও মুসলিমদের কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, যা সর্বদাই তাদের চিন্তার দিকে ফিরে আসে। ইসলামকে কোণঠাসা করতেই তাদের ইসলামোফোবিয়া ছড়ানোর এই প্রকল্প। একটি চলচ্চিত্র অলীক স্থান, সময় ও মানবিক মিথস্ক্রিয়া তৈরি করে, যা একবার পেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই (সমাজে) নির্মিত বিষয়ে আলোচনার কাঠামো তৈরি করতে শুরু করে। জর্জ লুকাস প্রতিষ্ঠিত Star Wars অপেরার সমৃদ্ধ, অবাস্তব ও অলীক চলচ্চিত্রগুলোর মতো ইসলামোফোবিয়ার জালও সফলভাবেই বিছানো হয়েছে। কল্পনাসই ইসলামোফোবিয়া গঠনে নিপুণ হাতে তৈরি হয় বিভিন্ন চরিত্র ও উপজীব্য দিয়ে বিন্যস্ত চলচ্চিত্র, তা দেখার প্রভাবে মানুষজন প্রাত্যহিক জীবনে লাভ করে ইসলামোফোবিয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা। সংবাদ ও সামাজিক নেতাদের ইচ্ছামতে নিপুণভাবে পুনর্গঠিত কাল্পনিক চিত্রায়ণে প্রাত্যহিক জীবনকে প্রভাবিত করে।
অধিকন্তু যখন এক মুহূর্তের জন্য বা সম্পূর্ণ ত্রুটির মধ্যে উপাখ্যানটি কল্পিত আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয় তখন একে প্রভাবশালী আদর্শিক (পশ্চিমা আদর্শ) বলে চালানোর পরিবর্তে কল্যাণকর প্রত্যাশায় নির্মিত বলে ইঙ্গিত করা হয়। আর ঠিক তখনই মুসলমানদের ভালো-মন্দ ফ্রেমে আবদ্ধ করার সময় ব্যতিক্রমী কণ্ঠগুলো পশ্চিমা অদর্শকে superior হিসেবে প্রতিফলিত করে। ফলে ইসলামোফোবিয়ার কাল্পনিক রূপ চূড়ান্ত সফলতার মুখ দেখে।
কাল্পনিক এ ইসলামোফোবিয়া ইসলাম ও মুসলিমদের এক সংকুচিত ফ্রেমে আবদ্ধ করে দেখে যা নেতিবাচক আর কেবল সহিংস ও সন্ত্রাসবাদের সম্পৃক্ততায় গড়ে উঠেছে। শুরু থেকে নির্মিত ছাঁচে সবকিছু বিবেচিত হওয়ায় এবং একইভাবে মেধা-মনন নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় ইসলামোফোবিয়ার সৈনিকদের নিকট বিভিন্ন ঘটনা, বর্ণনা ও তথ্যগুলোর প্রকৃত রূপ যেন অবান্তর কিছু (দেখেও দেখে না ভাব)। তার মন-মগজ কিছুতেই সেই রূপকে গ্রহণ করতে রাজি হয় না। ক্রীড়াবিদদের যেমনিভাবে প্রতিযোগিতা বা খেলার পূর্বে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, যাতে খেলা একবার শুরু হলে তারা তা কার্যকর করতে পারে। ইসলামোফোবিয়ার ক্ষেত্রেও ঠিক একই পদ্ধতি অনুসৃত হয়; ইসলাম ও মুসলমানদের প্রশ্নে তারা সমাজে পূর্বশর্ত তৈরি করে নেয়।
১১ সেপ্টেম্বর ২০০১-এর পর সহসাই 'তারা কেন আমাদের ঘৃণা করে?' প্রশ্নটি পুনরুত্থাপিত হচ্ছিল মিডিয়া এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দ্বারা। ফলত আমেরিকান জনগণ সন্ত্রাসী এ হামলার কষ্ট-বেদনায় ক্লিষ্ট হচ্ছিল। প্রশ্নের মধ্যে সমস্যা খোঁজা আর তা নীতির আওতার বাইরে রাখা কোনো সদুত্তর হতে পারে না। তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্নতার ফলে এ সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে মানুষের মনে মুসলমানদের প্রতি সন্দেহ উসকে দেয়। তারা মুসলমানদের একটি গ্রুপ হিসেবে চিত্রিত করে। যা সংবাদমাধ্যম CNN-এর ইন্টারভিউতে সংখ্যালঘুদের (মুসলমানদের '১.৬ বিলিয়ন মুসলিম') দোষারোপের মাধ্যমে ট্রাম্প পুনরুজ্জীবিত করে।
যদি এক মুহূর্তের জন্য CNN-এ প্রদত্ত বিবৃতি সত্য বলে ধরে নেই; তবে জিজ্ঞেস করা যাক, প্রকৃত ইহুদিদের এ ঘটনার প্রতি কী প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত ছিল? আর ধর্মান্ধতার গভীরে প্রোথিত এমন বিষয়ে একজন নির্বাচনি প্রার্থীর অকপট স্পর্ধার সাথে এমন দাবি তোলা কীভাবে সম্ভব! ২৯
এ বিষয়ে কারো থেকেই আমি উত্তর প্রত্যাশা করি না; এমনকি সঠিক সত্যটি জানার জন্য ও সমাধানের জন্য ট্রাম্প থেকেও না। কারণ তার মননও ইসলামোফোবিয়ার বেড়াজালে আবদ্ধ; যেখানে ধর্মান্ধতা, বর্ণবাদ আর তর্জন-গর্জন ছাড়া বাস্তব কিছুই নেই।
ভয়ের পলিটিক্স ও ব্যালটবক্সের দর্শন
মুসলমানদের প্রতি আমেরিকানদের নেতিবাচক আচরণ সর্বদা তুঙ্গে থাকে এবং এ প্রবণতা সুদূর ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো-এই ইসলামোফোবিয়ার সাথে ব্যালটবক্সের সম্পর্ক ও সংযোগ। ইউরোপ-আমেরিকার রাজনীতিবিদরা ইসলাম ও মুসলিমদের মধ্যে ভীতি ও অস্থিরতা ছড়ানোর মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার নতুন মন্ত্র। অর্থনৈতিক ব্যর্থতার জাঁতায় পিষ্ট, আউটসোর্সিংয়ের দরুন কর্পোরেট অধঃপতন, বিপুল ঋণে জর্জরিত, উন্মুক্ত যুদ্ধ আর শ্রেয়তর ভবিষ্যতের আশা হারানো অবসন্ন মানবতার নিকট বাণিজ্য ও বিকিকিনিতে ভয় একটি সহজসাধ্য ও উপযুক্ত পণ্য।
এক সময় আমেরিকান কর্পোরেট অভিজাতরা মধ্যবিত্তদের নিশ্চিহ্ন করে একটি অভূতপূর্ব স্থায়ী বৈষম্য তৈরি করেছিল। তাদের নির্মিত এ স্বপ্নিল ভুবনে মুসলমানরা তাদের ভাবনায় সবচে ভয়ানক বুগিম্যান। যেন সাজানো এ বাগানটিকে তারা তছনছ করে ছাড়বে।৩০
চায়না, ম্যাক্সিকান অভিবাসী, আফ্রিকান-আমেরিকান, মহিলা ও মুসলিমসহ আরও কিছু নাম উল্লেখ করে মধ্যবিত্তদের অধঃপতন ও কল্পনানুসারে দেশি শক্তি হ্রাসের দায় তাদের ঘাড়ে চাপায়। আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের গ্রেট আমেরিকা এগেইন' একটি ফাঁকা বুলি। কেননা আমেরিকান অভিজাতদের সাথে দেশি বিষয়াবলি নিশ্চল হয়ে থাকার প্রকৃত কারণ তার বর্ণবাদী ও বৈষম্যপূর্ণ প্রচারণার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় না।
ইতোপূর্বেও নির্বাচনগুলোতে রিপাবলিকানদের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রচারণা কমিয়ে আনা হয়েছিল একটি প্রতিযোগিতার জন্য। যার উপজীব্য ছিল, কে মুসলিমদের প্রতি অধিক বর্ণবাদী হতে পারে, অভিবাসী ও আফ্রিকান- আমেরিকানদের আন্তঃশহরে সহিংসতার অপবাদে কোণঠাসা করতে পারে। আমেরিকায় যেকোনো ভুলের জন্যই ইসলামোফোবিয়া আর বর্ণবাদকে হাতিয়ার করে মায়াকান্নার রব ওঠে। মাত্রাতিরিক্ত বর্ণবাদ নতুন করে পুনরুত্থিত হচ্ছে। আর 'আমেরিকাকে শক্তিশালী করা'র গূঢ়ার্থ হচ্ছে নাগরিক অধিকার, ধর্মীয়-সামাজিক বৈষম্য পূর্বের ন্যায় পুনরায় গ্রহণযোগ্য করে তোলা।
আমরা এমন এক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছি যখন কারো গাড়ি যদি বিকল হয় তা যেন হওয়ারই ছিল। কেননা হয়তো কোনো মুসলমান বা ম্যাক্সিকান ইঞ্জিনে লুকিয়েছিল! যদি কারো স্বামী অথবা কারো স্ত্রী রাগান্বিত হয়, তা যেন পূর্ব নির্ধারিত বিষয়, কেননা একজন মুসলমান ফ্রিল্যান্সার তার জব ছিনিয়ে নিয়েছে বা কোনো ম্যাক্সিকান কম পারিশ্রমিকে তার কাজ হরণ করেছে। যদি কেউ কাজে ব্যর্থ সমাপ্তির সম্মুখীন হয় তা যেন ছিল অশুভ নিয়তি! কেননা, এটা মুসলমানের কাছ থেকে নেয়া অশুভ লোনের ফল। নিশ্চিতভাবে, আমরা আমেরিকানদের দুর্বলতার কারণে রাজনীতিবিদদের দ্বারা সন্ত্রাসবাদী হুমকিতে আছি। তবে অতিরঞ্জিত এ ভয়ের ব্যাপারে কাউকে সঠিক চিন্তা করতে বাধাও দেইনি আর সমাজ-অভিমুখী কোনো সমস্যা সমাধানে কাউকে দায়িত্বও অর্পণ করিনি। সন্ত্রাসবাদ একটি হুমকি বলেই একে তার যথোপযুক্ত স্থানেই রাখতে হবে। যাতে স্নায়ু যুদ্ধ ও সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধের সাথে এর সংযোগ তৈরি না হয়।
ব্যালটবক্স জয় করতে শক্তিহীন ও প্রান্তিক মানুষজনদের জীবন্ত নরকের ভয় দেখিয়ে বলির পাঁঠা বানানো রাজনীতিবিদদের পুরান একটি কৌশল। এর জন্য তাদের তেমন শ্রম দিতে হয় না। ইউরোপ ও আমেরিকাজুড়ে এমন বিপর্যয়কয় ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বারবার দৃশ্যমান হয়েছে।
বর্তমানে চলমান নিরাপত্তা বিতর্কগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের সমাজ- কাঠামোর প্রতি ইঙ্গিত করে এবং বিচূর্ণ আশা ও প্রত্যাশার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইউরোপ-আমেকিয়ায় কী ধরনের ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রীতিপূর্ণ বৈচিত্র্য রক্ষা হবে তাও ইঙ্গিত করে। নিশ্চিতভাবে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দ্রুত পরিবর্তনগুলোর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক ফলাফল সত্ত্বেও রাজনীতিবিদরা নিজেদের সংকীর্ণ নির্বাচনি সুবিধা ও স্বার্থের জন্য এসব উগ্র অস্থিরতা আবাদ করে যাচ্ছে। নির্বাচনে জয়ী হতে ও ক্ষমতার আসন বাগিয়ে নিতে ভীতি প্রদর্শন ও অরাজকতা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইসলামোফোবিয়া এবং বর্ণবাদকে।
বর্তমান নির্বাচনি চক্রে ভীতি (ইসলামোফোবিয়া) এমন এক গুরুত্বপূর্ণ পারিতোষিক উপাদান যার প্রভাবে মানুষজন তাদের উন্নত বিবেচনা ও দীর্ঘদিনের পছন্দের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দেয়। ভীতি মানুষের ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দুয়ার রুদ্ধ করে দেয়। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বে নিরাপত্তা আর উন্নতির বিহ্বলতায় জনগণ দুর্দশাগ্রস্ত নিষ্প্রাণ অতীতের দিকেই ফিরে চায়। সমসাময়িক কৃত্রিম বিশৃঙ্খলা ও সমস্যাবিধান হিসেবে কল্পিত বা বাস্তব দুর্দশাগ্রস্ত সুদূর অতীতকে স্মৃতিকাতর করে অর্পণ করে। ভয় রাজনৈতিক সংশোধনীকে (সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা জনমন থেকে বিস্মৃত করে দেয়) দুর্বল করে তোলে। ফলে আমেরিকান সমাজব্যবস্থার এই অধঃপতন আর সমস্যাগুলোর প্রকৃত সমাধান অধরাই থেকে যায়। সম্প্রদায়ের প্রতি বর্ণবাদী ভাষা আর যৌন বক্তব্য যেন অবক্ষয়গ্রস্ত আমেরিকাকে পুনরায় মহৎ করে তোলার দাবির প্রতি কুর্নিশ জানানো। আহ্বানটি যেন আমেরিকাকে নতুন করে বর্ণবাদী ও যৌনবাদী করে তোলা!
নির্বাচনি প্রচারণায় বর্ণবাদ আর ধর্মান্ধতায় ব্যালটবক্সে ভোট নগদীকরণার্থে ইসলামোফোবিয়া একটি সুচিন্তিত কৌশল (বর্ণবাদ-ধর্মান্ধতা পুরান ইস্যু আর ইসলামোফোবিয়া নতুন; ইসলামোফোবিয়া প্রচারের মাধ্যমে পুরান ইস্যুগুলোও মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো, সেই সাথে ভোটে পূর্ণ হলো ব্যালটবক্স -অনুবাদক)। আমেরিকান উৎপাদন কাজ হ্রাস ও মধ্যবিত্ত বিলুপ্তির সহজ সমাধানকল্পে দেশকে পুনরায় বর্ণবাদী করে তোলার প্রস্তাবনা ওঠে। প্রচারণায় বর্ণবাদকে চাঙ্গা করে তোলা, প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের শেতাঙ্গদের কাজে নিয়োগ, ধর্মান্ধতা এসব মূলত সুশীলসমাজের ক্ষমতালোভী ব্যক্তির প্রাচীন চাল।
ভয়, বর্ণবাদ, সমাধানহীনতা- এসব ছিল ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণার হাতিয়ার। ব্যালট বক্স ইসলামোফোবিয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা লাভ করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে ট্রাম্পের মুসলিমদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের 'সম্পূর্ণ সমাপ্তি'র প্রচার অভিযান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তিনি বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা স্থির থাকবে যতক্ষণ না দেশের প্রতিনিধিরা "কী ঘটছে তা বের করতে পারে"। সম্ভবত, তার সব বুদ্ধিমত্তার সত্ত্বেও, তিনি এখনও এটি উপলব্ধি করতে পারেনি।
ধর্মভিত্তিক সুরক্ষার দাবি তোলে সেই ভয়ের শাখাগুলোকে চাঙা করে তোলা হয়েছে ফলত তৎকালীন রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রয়াস বিজয়ের পথে এগিয়ে গিয়েছে অনেকদূর। আমেরিকার ভবিষ্যত- বৈচিত্র্য, সর্বসাধারণের অন্তর্ভুক্তি ও পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে ব্যালটবক্সকে ইসলামোফোবিয়া ও বর্ণবাদের শিকারে পরিণত করা একেবারেই অনুচিত।
ভাষান্তর : হাবিবুর রহমান রাকিব

টিকাঃ
[২৯] পরোক্ষভাবে বিশ্ব নিয়ন্তা ইহুদিদের সমর্থন আছে বলেই এতটা নিঃসংকোচে ট্রাম্প এ দাবি তোলার সাহস করতে পেরেছে; বরং এ দাবি তোলার মাধ্যমে সে তাদের সমর্থন ও আস্থা লাভ করেছে।
[৩০] বুগিম্যান হচ্ছে সেই কল্পচরিত্র যে মানুষকে ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখিয়ে ভীত করে তোলে, পশ্চিমারা মুসলমানদের সবচে ভয়ংকর বুগিম্যান হিসেবে গণ্য করে।

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ইউরোপজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার হালচিত্র

📄 ইউরোপজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার হালচিত্র


কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) এবং ইউসি বার্কলে সেন্টারের রেস অ্যান্ড জেন্ডারের ২০১৬ সালের এক রিপোর্ট অনুসারে, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩২টি সংগঠন ইসলাম ও মুসলিমঘৃণা প্রচারের প্রাথমিক উদ্দেশ্য নিয়ে একটি 'অভ্যন্তরীণ কোর' গঠন করেছে৩১। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে এই সংস্থাগুলো ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি পরিমাণে অকাতরে খরচ করেছে মুসলিমবিরোধী উদ্দেশ্য হাসিলের অভিপ্রায়ে।
ইসলামোফোবিয়া বিষয়ক গবেষক ও লেখক নাথান লিয়ানের ৩২ গবেষণা মতে, ইসলামোফোবিয়া ইন্ডাস্ট্রি (২০১২), 'বিশেষজ্ঞদের' একটি আদর্শগত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকটি নিউজ এজেন্সি দ্বারা নিয়মিতভাবে মুসলিম ও ইসলামের সহিংস, নেগেটিভ ও স্টেরিওটাইপ প্রতিচ্ছবি প্রচার করা হতে থাকে। এই বিশেষ দল কেবল ইসলাম আর মুসলিমদের নির্দিষ্ট করে বাছাই করে নিয়েছে, মানুষের কাছে একে সন্ত্রাসের তকমা দেয়াটা সুচারু ভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মুসলিমবিরোধী মনোভাবের এই পদ্ধতিগত প্রচারে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, অপব্যবহার এবং সহিংসতার প্রতিবেদনলো ভয়ংকর ইঙ্গিত দেয়।
শুধুমাত্র ২০১৮ সালের জানুয়ারী থেকে জুনের মধ্যেই ইসলামোফোবিয়ার ৬০৮টি ঘটনার কথা জানায় যুক্তরাজ্যভিত্তিক টেল মামার ৩৩ প্রতিবেদনে। পরিস্থিতি এতই গুরুতর যে, গত বছর ইউরোপীয় কমিশন বিচার বিভাগের পরিচালক ইউরোপ মহাদেশজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একটি টুলকিট চালু করেছে।
এদিকে ইউরোপজুড়ে চলমান ইসলামোফোবিয়ার সকল ঘটনাকে আলাদা করে নথিভুক্ত করা হয় না। তবে আইনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সদিচ্ছায় ইসলামোফোব ঘটনাগুলো আলাদা নথিভুক্ত হলে তা প্রতিবিধান করা সহজসাধ্য হতো। দুঃখের কথা হলো, ছলচাতুরিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে ইউরোপিয়ান দেশগুলোর অনেকেই উল্টো দাবি তোলে- তারা ইসলামোফোবিয়ার অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ইসলামোফোবিয়া নামক পরিভাষা নাকি মুসলমানদের নিজেদের হাতে তৈরি। তারা নিজেদের সুবিধার জন্য এ টার্মের অবতারণা করেছে। এ জাতীয় কথাবার্তা টেনে এনে ইউরোপিয়ান সাংবাদিকগণ সাধারণ মানুষদের দৃষ্টি অন্যত্র ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে।
একটি ছোট্ট উদাহরণ- ১৯৯৫ সাল। বসনিয়া হার্জেগোভিনায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। মুসলিমদের ওপর চালানো বর্বোরচিত সেই গণহত্যাকে মিথ্যা বানিয়ে দেয় মিডিয়া, যেন দিনকে রাত বলা। ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট ও ক্রোয়েশিয়ান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তার অস্বীকৃতির আওয়াজ ওঠে জোরেশোরে। তারা বসনিয়ার নিরাপত্তার কথা তুলে বসনিয়ার ভূখণ্ডকে ভাগ করতে উদ্যত হয়।
বৈধতার চাদরে বিদ্বেষের লুকোচুরি!
ইউরোপজুড়ে যেখানে বিদ্বেষচর্চার ঢেউ, সে ঢেউকে ফেনিয়ে তুলতে অনেকের প্রচেষ্টা নজর কাড়ার মতো। ইসলামবিদ্বেষকে স্থায়িত্বদানের জন্য বৈধতার চাদরে আবৃত করার পথ খোঁজে। ইউরোপের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বেলজিয়াম। মুসলিমরা দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। এ দেশে সাংসদদের ভোটের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক পশু জবাই তথা কুরবানির প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। মূলত মুসলিমদের কুরবানির পথ রোধ করাই এ নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যে। এরই সাথে বেলজিয়ামের গ্রান্ড মসজিদ অপসারণের রব ওঠে। দেশটির প্রধান মুসলিম এ সেন্টারটি নাকি মরক্কোর গোয়েন্দায় পূর্ণ, তারা উদ্বিগ্ন হয় মসজিদে আবার উগ্রবাদের চর্চা হয় কি না?
দানিউব উপত্যকায় অবস্থিত পূর্ব-মধ্য ইউরোপের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত দেশ হাঙ্গেরি। দেশটির এক মেয়র তার অধীন এলাকায় মসজিদ-মিনার নির্মাণ, মসজিদে আজান প্রদানের সাথে সাথে মেয়েদের জন্য চাদর, নিকাব ও বোরকা নিষিদ্ধ হয়। মেয়র শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে গিয়ে বলেন, শতবছর ধরে লালিত-পালিত হাঙ্গেরির ঐতিহ্যকে রক্ষার্থেই তার এ প্রয়াস। শেষমেষ যদিও সে সফল হয়নি, আন্দোলনের তোপের মুখে এ আইন উঠিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
এমনিভাবে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, রোমানিয়াসহ বহু দেশেই হিজাব নিষিদ্ধকরণ চলছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কাতেও হিজাব নিষিদ্ধ করা হলো। মুসলামনদের নানাভাবে কোণঠাসা করতে অভিনব ও হঠকারী সব আইন নিয়ে আসে তারা। FRA-এর তথ্য মতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে হর্তাকর্তাদের নিকট দাখিলকৃত রিপোর্ট অনুযায়ী মাত্র ১২ শতাংশ মুসলিম বৈষম্যের শিকার। তবে আসল চিত্রে অন্য রূপ ফুটে ওঠে। মুদ্রার যে পিঠ আজ নামধারী সভ্য সমাজ এড়িয়ে যায়। চলুন তা দেখে নেয়া যাক- নিম্নে প্রদত্ত ঘটনাপ্রবাহ।
একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান
ডেনমার্ক ন্যাশনাল পুলিশের তথ্যমতে, ৫৬টি ইসলাম বিদ্বেষের ঘটনা নথিভুক্ত হয় শুধু ২০১৬ সালেই। সে বছরের ২০ শতাংশ ঘটনা শুধু মুসলিমদের কেন্দ্র করে। সিসিআইবি তথ্যমতে, মাত্র এক মাসে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ঘটে ৩৬টি ইসলাম-বিদ্বেষমূলক ঘটনা। EIR রিপোর্ট অনুযায়ী ২৫৬টি ইসলাম-বিদ্বেষমূলক ঘটনা তালিকাভুক্ত হয় কেবল অস্ট্রিয়াতে। 'অবজারভেটরি অব ইসলাম' নামক একটি সংস্থার তথ্যমতে, ফ্রান্সে ১২১টি ইসলাম-বিদ্বেষমূলক ঘটনা রিপোর্ট করা হয়। সরকারের হস্তক্ষেপে ১৯টি ইবাদতগাহ তথা মসজিদে তালা ঝোলানো হয়। ৭৪৯ জন মুসলিমকে ঘর থেকে আটক করা হয়। সাড়ে চার হাজারের অধিক পুলিশি হামলা চালানো হয়। সরকারি নজরদারিতে রাখা হয় ২৫ হাজার মুসলিমকে। ১৭ হাজার ৩৯৩ ব্যক্তির নাম টেরোরিজম প্রিভেন্ট ডাটাবেজে তালিকাভুক্ত করা হয়।
DITIB-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ১০০টি আক্রমণ ঘটে শুধু মসজিদকে কেন্দ্র করে। জার্মান মুসলিমদের টার্গেট করে হামলার ঘটনা ঘটে ৯০৮টি। ৬০শতাংশ মুসলিম অধ্যাপক বৈষম্যের শিকার হয়। মুসলিম শরণার্থীরা ১৯০৬টি সন্ত্রাসী হামলার মুখোমুখি হয়। প্রতিদিন প্রায় ৫.২টি আক্রমণ। অপরদিকে শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্রজুড়ে ঘটে ২৮৬টি মর্মান্তিক ঘটনা। ১৩২টি সন্ত্রাসী ও শারীরিক হামলার ও হতাহতের ঘটনা ঘটে শরণার্থী শিশুদের সাথে। মাল্টার মতো ছোট্ট একটি দেশেও ৭ শতাংশ মুসলিম শারীরিক সহিংসতা ও ২৫ শতাংশ মুসলিম নানাভাবে পরিকল্পিত হয়রানির শিকার হয়।
শান্তি সূচকে টেক্কা দানকারী দেশ নরওয়ে। সেই নরওয়েতেও মুসলিম বিদ্বেষের চিত্র স্পষ্ট। ২০১৭ সালে ১৪ শতাংশ মুসলিম নানাভাবে হয়রানির সম্মুখীন হয়। এনি ফ্রাঙ্ক ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, শুধু ২০১৬ সালেই মুসলিমবিদ্বেষের ঘটনা রিপোর্ট হয় ৩৬৪টি। এরপর ২০১৭ সালে সরাসরি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয় মুসলিমদের। ২০ শতাংশ বিদ্বেষমূলক ঘটনা ঘটে মুসলিমদের কেন্দ্র করে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ১৭-এর জানুয়ারি থেকে অক্টোবরেই ৬৬৪টি মুসলিমবিদ্বেষী সন্ত্রাস ঘটে। তবে ২৯ শতাংশ ঘটনার অভিযোগ দায়ের করা হয় মাত্র।
আমেরিকার ম্যানচেস্টার অঞ্চলে ইসলামবিদ্বেষমূলক সন্ত্রাস পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। লন্ডনজুড়ে ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পায় ইসলামবিদ্বেষ। ফলে ১৬ সালে ঘটে যাওয়া বিদ্বেষমূলক সন্ত্রাস ১২০৪ থেকে বেড়ে ১৬৭৮-এ গিয়ে দাঁড়ায়। যার প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪০ শতাংশ হারে হয়েছিল। ২০১৭-এর মার্চ- জুলাই। এ সামান্য সময়ে মসজিদ আক্রমণের সংখ্যা ১৬ সালের ৪৭টি থেকে বেড়ে ১১০-এ গিয়ে দাঁড়ায়। ২০১৬ সালে Tell MAMA-এর নেটওয়ার্কে ১২২৩টি ইসলামোফোবিয়ার আক্রমণ রিপোর্ট করা হয়। যার ২০ শতাংশ-এ শারীরিক নির্যাতনের নজির মেলে। আক্রান্তদের ৫৬ শতাংশ ছিল মহিলা। পিসিসিআই-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৭ সালে ৫৪৬টি ইসলাম বিদ্বেষের ঘটনা ঘটে। সুইডিশ ক্রাইম সার্ভের তথ্য মতে ৪৩৯টি বিদ্বেষমূলক সন্ত্রাস নথিভুক্ত হয়।
এদিকে ২০১৮ সালে ইউরোপজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার চিত্র আরও ভয়াবহ। বেলজিয়ামে প্রায় ৭০টি ইসলামোফোবিক ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৭৬ শতাংশ ভিকটিম নারী। অস্ট্রিয়ায় ৫৪০টি ইসলামোফোবিক ঘটনা ঘটেছে। অথচ ২০১৭ সালে ছিল ৩০৯টি। ফ্রান্সে ৬৭৬টি ঘটনা ঘটেছে। ২০১৭ সালে ছিল৪৪৬টি। ৬৭৬ জনের মধ্যে ২০ জন শারীরিক আক্রমণের শিকার। ৫৬৪ জন বৈষম্যের শিকার। ৮৮ জন মৌখিক লাঞ্ছনার শিকার। জার্মানে ৬৭৮টি ইসলামোফোবিক ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ৪০টি ঘটেছে মসজিদে। শরণার্থীদের ওপর আক্রমণ হয়েছে ১৭৭৫টি। এদের মধ্যে ১৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে। ৯৫টি জার্মানিতে কাজ করতে আসা কর্মীদের ওপর। নেদারল্যান্ডে পুলিশের কাছে দায়ের করা ১৫১৫টি ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযানগুলোর মধ্যে ৯১ শতাংশই মুসলমানদের বিরুদ্ধে।
২০১৯ সালে এসে ইউরোপীয় মুসলিম দেশগুলো একইরূপ ইসলামোফোবিয়ার আক্রমণ আঁচ করতে পারছে। ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে এমনকি যুক্তরাজ্যে মসজিদগুলোও আক্রমণের শিকার হচ্ছে। তদুপরি, 'গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট'-এর মতো সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রমূলক অধিকার আদায়ের প্রচারণা রটে চলছে। ইউরোপে অমুসলিমদের প্রতিস্থাপনের পক্ষে মুসলিমরা এগিয়ে যাচ্ছে; অপরদিকে তারা ছদ্মবেশে ছড়িয়ে পড়ছে আর শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য বিস্তারে সন্ত্রাসী আক্রমণে মদত দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে 'সর্বব্যাপী শিক্ষার জন্য আরও সক্রিয় পন্থা ও সহায়তা' গ্রহণ প্রয়োজনীয় বলে ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
২০১৯ সালে ৮৭১টিরও বেশি মুসলিম-বিদ্বেষমূলক অপরাধ লিপিবদ্ধ হয়েছে। যার ৫৮টি মুসলিম ধর্মীয় স্থান সম্পর্কিত। অন্য আরও ৪৬টি ছিল ইসলাম-বিদ্বেষী ধর্মান্ধদের দ্বারা শারীরিক নিপীড়নের কেইস। অনুরূপভাবে ফ্রান্সেও ১০৪৩টি ইসলামোফোবিয়ামূলক ঘটনা নিবন্ধিত হয়েছে। যার মধ্যে শারীরিক নিপীড়ন, ধর্মীয় স্থান নিয়ে নানা উস্কানিমূলক বক্তব্যসহ আরও অনেক কিছুই জায়গা করে নিয়েছে। ৩৪
ইউরোপজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার নেপথ্যে
ডানপন্থি আন্দোলনের প্রভাব বৃদ্ধির কারণেই পুরো ইউরোপজুড়ে ইসলামোফোবিয়া বাড়ছে- আঙ্কারাভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। ফাউন্ডেশন ফর পলিটিক্যাল, ইকোনোমিক অ্যান্ড সোস্যাল রিসার্স (এসইটিএ) কর্তৃক প্রকাশিত 'ইউরোপীয় ইসলামোফোবিয়া : রিপোর্ট ২০১৮' ইউরোপে মুসলিম-বিরোধী বর্ণবাদের উত্থানকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন করে, এমনকিছু কারণের ওপর আলোকপাত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'মানবাধিকার, বহুসংস্কৃতিবাদ এবং ইউরোপের রাষ্ট্রীয় আইনের ক্ষেত্রে সবসময় মুসলিমবিরোধী আলোচনা করার কারণেই বৃদ্ধি পেয়েছে ইসলামোফোবিয়া এবং বর্ণবাদ। মুসলিমবিরোধী এই বর্ণবাদের প্রজনন ও প্রতিপালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ইউরোপের গণমাধ্যম। ইউরোপের এমন কম গণমাধ্যমই আছে, যারা মুসলিমদের ইতিবাচক দিকগুলো ফুটিয়ে তোলে। বরং নেতিবাচকভাবেই মুসলিমদের তুলে ধরে সবসময়। আর ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে ক্রমাগত মুসলিবিদ্বেষ তো আছেই।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মুসলমানদের চিত্রিত করার ক্ষেত্রে উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের ইসলামোফোবিক ভাষা এবং ডানপন্থিদের বর্ণবাদী ভাষা- ইসলামোফোবিয়াকে আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং বিশ্বকে সন্ত্রস্ত করছে। এখন ইসলামোফোবিয়া কেবল মুসলমানদের নয়, ইউরোপের সুরক্ষা ও স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও নির্বাচনি উদ্দেশ্যে তারা এই বর্ণবাদ ও ইসলামোফোবিয়াকেই উসকে দেয়।

টিকাঃ
[৩১] দেখুন, 'সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
[৩২] পশ্চিমা গবেষক ও ইসলামোফোবিয়া বিষয়ক একাধিক গবেষনার জনক
[৩৩] মুসলিমবিরোধী হামলার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা
[৩৪] এসইটিএ কর্তৃক প্রকাশিত প্রতি বছরের (European Islamophobic Report 2017,2017,2018) প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এসইটিএ হলো জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণামূলক একটি প্রতিষ্ঠান।

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ইসলামোফোবিয়ার শেকড় সন্ধানে

📄 ইসলামোফোবিয়ার শেকড় সন্ধানে


বিশ্বজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার বিষাক্ত উত্থান চরমপর্যায়ে পৌঁছেছে। যখন উদারপন্থি লেখক মাইকেল টমাস্কি মুসলিমদের আমেরিকার সুনাগরিক প্রমাণে সচেষ্ট হলেন; এক সপ্তাহের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প মুসলিমদের সেই দেশে অভিগমন বন্ধের প্রস্তাব করে বসলেন। এমন পরিস্থিতিতে কী করা উচিৎ, এমন মিথ্যাচারের প্রতি কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত নয়?
আমাদের অন্তত দুটি কারণে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। প্রথমত. সানবার্নিডো আর প্যারিসের ঘটনার পর ইসলামোফোবিয়া ও বিদ্বেষচর্চার ক্রমঃবৃদ্ধি আমাদের নজর কেড়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে গ্লেন গ্রিনওয়ার্ল্ড মুসলমানদের ওপর হুমকি-হামলার তালিকা সংগ্রহ করেছে, যা বস্তুতই আতংকজনক। ৯/১১-র ঘটনার পর অনেক বন্ধুমহলেই হিজাবের ওপর হুডি পরে অপরিচিতদের কটাক্ষ-আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে দেখা গেছে।
বর্ণবাদী আক্রমণ নতুন কিছু নয়, শুধু এটা নতুন মাত্রায় তীব্রতর হচ্ছে। ৯/১১-র মতো 'গ্রাউন্ড জিরো মসজিদ'৩৬ বিতর্ক আর বুস্টনে একটানা বোমাবর্ষণ এমন প্রতিটি ঘটনাই সেই নেতিবাচক প্রবাহের ঢেউয়ে নতুন মাত্রাযোগে আরও উদ্বেলিত করে। ইসলামোফোবিয়াকে হাতিয়ার করে সন্ত্রাসী অভিযান পরিচালনা করা যেন আমেরিকান সমাজব্যবস্থার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, কেননা এটি সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদকে বিশাল এক সুরক্ষা বলয়ে আবৃত করে রাখে।
দ্বিতীয়ত, সে পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে, প্রথমত; প্যারিস আক্রমণের রেশ কাটাতে আন্তর্জাতিকভাবে তা আরোপিত হয়। দ্বিতীয়ত্ব; এটা রাজনৈতিক মৌসুমকে বেগবান করা হয়েছে। বিগত বছরগুলোর মতো রিপাবলিকানরা রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ইসলামোফোবিয়াকে হাতিয়ার বানিয়ে আদানুন খেয়ে মাঠে নামে। তাদের অবান্তর বক্তব্যগুলোকে মূলধারায় পৌঁছানোর জন্য মূলধারার রাজনীতিবিদদের বাগে এনে তাদের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থাপন করতে চায়। তাই নিজেদের খোলস বদলে নির্লজ্জভাবে ওয়েলফান্ডেড ইসলামোফোবিয়াকে নিয়ে বর্ণবাদ ও ডানপন্থির রূপ ধারণ করে বারবার। ফলত আমরা কী প্রত্যক্ষ করেছি! আন্তর্জাতিক ইসলামোফোবিয়া নেটওয়ার্কের আঁচলে লালিত ডানপন্থি ধারণার উত্থান, যার নাম দেয়া হয়েছিল 'কাউন্টার জিহাদ মুভমেন্ট' বা জিহাদবিরোধী আন্দোলন। বিশ্বের আনাচে-কানাচে যা প্রতিধ্বনিত হয়েছে রিপাবলিকান রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীদের মুখে মুখে। তাদের মধ্যে ট্রাম্প অগ্রগণ্য।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থার গবেষণা জরিপে ফুটে উঠেছে 'কাউন্টার জিহাদ মুভমেন্ট' ধারণা কীভাবে কুয়া থেকে সাগরে মিশেছে (এক প্রান্ত থেকে জাতীয় রাজনীতির অংশে একীভূত হয়েছে।) আর বৈশ্বিক মদতপুষ্ট হয়েছে, আর তা বাস্তবায়নের চাকায় ট্রাম্পের মতো লোকজন কী পরিমাণ ইন্ধন দিয়েছে।
ইদানীং রিপাবলিকান কিছু প্রার্থীসহ অনেকেই ট্রাম্পের মুসলিম অভিবাসন বন্ধ করা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য ছুড়ছে। বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের হুঁশ ফিরেছে। ট্রাম্প সীমা অতিক্রম করেছে, তাকে অযোগ্যপ্রার্থী বলে ঘোষণা করা উচিত বলে তারা মন্তব্যও করেছে।
ট্রাম্প প্রত্যুত্তরে বুক ফুলিয়ে বলেছিল, প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ১৯৪২ সালে পার্ল হারবার আক্রমণকে কেন্দ্র করে যে নীতি অনুসরণ করেছিল তার পরিকল্পনাও তা থেকে ভিন্ন কিছু নয়। যখন সে ১১০,০০০ (যাদের ৬০ শতাংশ-ই জন্মগতভাবে আমেরিকান) জাপানিজ আমেরিকানদের অভ্যন্তরীণ কার্যনির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিল। বস্তুত ট্রাম্প যথাযথ একটি উপমা টেনেছে, সেই শীতল যুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান সন্ত্রাসী যুদ্ধ পর্যন্ত ডেমোক্রেট আর রিপাবলিকান উভয়েই রাষ্ট্রকে সুসংহতকরণ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে উসকে দিতে বর্ণবাদী পুলিশিব্যবস্থার আশ্রয় নিয়েছে। বস্তুত কেউ একজন দেশের সাথে সম্পৃক্ত দুটি বিষয়ে মজবুত এক সংযোগ তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্পের ১৯৪২ সালের পূর্বেকার কোনো নজির উপস্থাপনের প্রয়োজন পড়েনি। ৯/১১-র পর থেকে তার বিনোদন প্রস্তাবনা বিভিন্ন ধাচে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কয়েক সহস্রাধিক মুসলিম অভিবাসী ও নাগরিকদের কারা-শিল্পের জটিলতার মধ্যে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে।
৯/১১-র পক্ষান্তরেই ১২০০ মুসলিম নাগরিক ও অভিবাসীকে এফবিআইসহ রাষ্ট্রীয় আরও আইনি সংস্থাগুলো জিজ্ঞাসাবাদ করে। যদিও তাদের মধ্যকার কারোরই ৯/১১-র ঘটনার সাথে যোগসূত্র মেলেনি। আর তখন থেকেই কয়েদ ও বাস্তুচ্যুত করার প্রবণতা বেড়েছে হুড়োহুড়ি করে। বুশ ও ওবামার আমলে মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার আর শিশুদের আনন্দালয়গুলো ছিল নিবিড় নজরদারির আওতায়।
ট্রাম্প যখন সকল মুসলমান নিবন্ধনসম্বলিত তথ্যপুঞ্জি তৈরির নির্দেশনা দেয়, হিলারি ক্লিনটন টুইটেএকে 'মর্মান্তিক দাবি' বলে আখ্যা দেয়। তবু সে একটা দশকের বেশি সময় ধরে চলে আসা প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে, যেমন- ২০০২- এর জাতীয় সুরক্ষা প্রবেশ-প্রস্থান নিবন্ধন পদ্ধতি যা তার স্বামীর ১৯৬৬ সালের সন্ত্রাসবাদের অর্থায়নের ভিত্তি ছিল।
পঁচিশটি পৃথক দেশের ষোলো-ঊর্ধ্ব পুরুষদের সাক্ষাৎকার প্রদান, ছবি তোলা, আঙ্গুলের ছাপ প্রদান এবং অর্থনৈতিক তথ্যাবলি প্রদান করা আবশ্যক ছিল এ প্রক্রিয়ার আওতায়ীন। ২০০৩-এ পতনের পর প্রায় ৮৩,০০০ অভিবাসী এ পদ্ধতিতে নথিভুক্ত হয়।
তাই আমাদের বিস্মৃত হলে চলবে না যে, রিপাবলিকান আর ডেমোক্রেট উভয়েই এক নায়ের মাঝি। তাদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপের কারণেই আজ বিশ্বের এই হাল। ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ এনোক পল ইংল্যান্ডে ‘রক্ত নদী' নামক যে খেলার আবির্ভাব করেছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প তার কুখ্যাত বক্তব্যেও এর আবদান রাখে। যা বর্ণবাদ, অভিবাসনবিরোধে পূর্ণ ছিল ফলত সে রাজনৈতিক অঙ্গনে তার নবরূপের আবির্ভাব হয়।
এ. শিবানন্দ, পল-এর 'রক্ত নদী' বিষয়টাকে এভাবে ফুটিয়ে তুলেছে যে, 'আজ এনোক পল যে রব তুলছে, কাল তা নিয়ে কনজারভেটিভ পার্টি উঠেপড়ে লাগবে, আর পরশু তাতে ইন্ধন জোগাবে লেবার পার্টি। বস্তুত সব শিয়ালের এক রাঁ। ১৯৭০ দশকের পর থেকেই আমেরিকায় এ ধরনের গতিশীলতা দৃশ্যমান। ফলে সেখানে রাজনৈতিক চর্চাঙ্গন এতটা সংকীর্ণ, যে কারণে কেউ চাইলেই ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিবর্গের হেঁয়ালি বা দলছুট নেকড়ে তথা ব্যতিক্রম আখ্যা দিয়ে অপসারণ করার সিস্টেমে কোনো প্রভাব ফেলতে অপারগ।
মাইকেল টমাস্কি মুসলিম আমেরিকানদের তাদের বৈধতার প্রমাণ চাইলেন। ঠিক একই স্বরে বারাক ওবামার একটি ভাষণও প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। ওবামা যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন যে, যেহেতু মুসলিম কমিউনিটিতে চরমপন্থি বা সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়েছে তাই এটা কোনো অজুহাত ছাড়া মোকাবিলা করা মুসলমানদের কর্তব্য।
ওবামার বইতে পুনরায় এ বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে, সেখানে সানবার্নিডোর ঘটনার জন্য শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টানদের বাদ দিয়ে মুসলমানদের ওপর দোষারোপ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ, ঘটনার মূল হোতা রোবাট ডিয়ার।
স্পষ্টত ডিয়ার একজন ধর্মপ্রচারক খ্রিস্টান, যে ঈশ্বরের সেনাবাহিনী নামে গর্ভপাতবিরোধী একটি দল গঠন করেছে। যারা ৯/১১-র পর থেকে অসংখ্য বোমাহামলা আর হত্যাকাণ্ড নির্দ্বিধায় ঘটিয়ে চলছে। তথাকথিত জিহাদী নামধারী পক্ষের চেয়েও এই ডানপন্থি সন্ত্রাসীরা অধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত।
তারপরও কেন শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টানদের এসবের দায়িত্ব নিতে বলা হচ্ছে না। ডিয়ারের অপকর্ম চাপা দিয়ে সানবার্নিডোকে ঘিরেই কেন সব মনোযোগ আকর্ষিত হলো! ওবاما যখন উচ্চারণ করে 'বিশ্বব্যাপী বিপদগামী মতাদর্শ যা মৌলবাদের দিকে নিয়ে যায়, তার মূলোৎপাটন করা মুসলমানদের দায়িত্ব'- এর মাধ্যমে সে ইসলামোফোবিয়ার দারাজদিল সংস্করণ প্রবর্তন করলেন; যা সিংহভাগ মুসলমান শান্তিপ্রিয় হলেও ইসলাম যেন সন্ত্রাসবাদের একটি দ্বার চির উন্মোচন করেই রেখেছে!
এ বিতর্কিত বিষয়াদির প্রতি নজর বুলালে যদিও যৎসামান্য পরিবর্তন আঁচ করা যায়; তবে ইসলামোফোবিয়ার উদারপন্থি রূপগুলোতে গিয়ে বিতর্ক আটকে আছে। যেন তা দুধে ধোয়া তুলসি পাতা, ময়ূরের পালক পরে কাকের নেক সুরতে দেয়া ধোঁকা। তাই এটা স্পষ্ট যে, ট্রাম্পের বক্তব্যে যেমন রিপাবলিকানরা তীব্র সমালোচনা করেছে ঠিক একই দৃষ্টিতে গণতান্ত্রিকভাবে রিপাবলিকানরাও নিন্দিত।
যখন ডানপন্থিরা মুসলমানদের পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য পঞ্চম কলাম বা সমস্যাজনক বলে মনে করে, তখন উদারপন্থি/ডানপন্থিদের যৌক্তিক রূপে উপস্থাপন করা হয়, যেন তারা মুসলমান ও সন্ত্রাসবাদের পার্থক্যকারী। তবুও এটি সম্পূর্ণ একটি দলকে দায়ী করে বিধায় সন্ত্রাস দমনের দায়ভার মডারেট মুসলিমদের কাঁধে চাপাতেই উদারপন্থিরা বদ্ধমূল। যাতে বামপন্থি ও বর্ণবিরোধীরা তাদের রাজনৈতিক ভিত টান করে দাঁড়াতে পারে আর যুদ্ধচর্চা, সন্ত্রাসবাদিতা, আটক করা, ড্রোনহামলায় হুরহুর করে মানুষজন তাদের পক্ষ নেয়।
সাম্রাজ্যবাদের প্রেক্ষাপট
সচরাচর চাপা থাকে। বহির্বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদের ভিত গড়ে ওঠার উপাখ্যান, এই আঘাতগুলো পুনরায় আমেরিকার মাটিতে কীভাবে প্রতিঘাত তৈরি করে, বর্ণবাদের অন্তর্নিহিত কী অর্থ তারা দাঁড় করায়, সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপকে চালিত করতে দেশে বিদেশের কী পরিমাণ সহিংসতা যে মার্কিন রাজনৈতিক সংস্থার মদতপুষ্ট তার ইয়ত্তা নেই।
আতঙ্ক ও ধর্মান্ধতায় মিডিয়ার ইন্ধন
হাল আমলে কেবল কর্পোরেট মিডিয়ার মদতেই ট্রাম্পের উন্মত্ত বক্তব্য এতটা আলোচিত হচ্ছে ও নজর কাড়তে সমর্থ হচ্ছে। এতে কিছু বাস্তবতাও বিদ্যমান। মিডিয়া খুব আগ্রহের সাথে বিতর্কিত ও চাঞ্চল্যকর বিষয়গুলো কভার করে। যাতে বৃহৎসংখ্যক শ্রোতা আকর্ষণ করতে পারে এবং নিচের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে। যেমন- ট্রাম্পের লাখ লাখ ল্যাটিন আমেরিকান অভিবাসীকে বাস্তুচ্যুত করে ওয়াটারবোডিংয়ে ফিরিয়ে আনার আহ্বানকে কারণ দর্শিয়ে সংবাদযোগ্য বলে উপস্থাপন করে। বস্তুত আর্থিক প্রণোদনা লাভের আশায়ই অধিকাংশ সংবাদ প্রচারণা সংস্থা এসব প্রচারে লিপ্ত হয়।
তবে ইসলামোফোবিয়ার উত্থানের পেছনে কেবল ডোনাল্ড ট্রাম্প বা মিডিয়া ইন্ধন জোগায় ভাবলে ভুল হবে। ইসলামোফোবিয়া নিয়ে আমার বইতে নিরীক্ষণ করে দেখানো হয়েছে 'ম্যাট্রিক্স অব ইসলামোফোবিয়া' বা ইসলামোফোবিয়ার উৎসমূল। যাতে মুসলিম-বিরোধী মতবাদ ও তার চর্চায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর রূপরেখা প্রদত্ত হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক স্থাপনা (ডেমোক্রাট ও রিপাবলিকান উভয়েরই), জাতীয় নিরাপত্তা যন্ত্রাদি, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ, থিঙ্কট্যাংক বা নীতিনির্ধারণী সংস্থার অন্তর্ভুক্তি রয়েছে। এদের প্রত্যেকেই দু ধরনের ইসলামোফোবিয়ার প্রচার-প্রসারে লিপ্ত- উদার ও গোঁড়া।
এ ধরনের প্রপাগান্ডা জনমনে প্রচারিত হওয়ার মূল হোতা হচ্ছে মূল ধারার মিডিয়াগুলো। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে তারা বক্তব্য প্রচারণা এগিয়ে রাখে এবং রক্ষণশীল আর উদারপন্থিদের মধ্যকার বিতর্কের লাগামও হাতে রাখে।
এটা এমনই এক বিরল দৃষ্টান্ত যেখানে বামপন্থি যে কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারে। এসব প্রেক্ষাপট যা সর্বদাই সামাজিক আন্দোলন ও প্রতিবাদের ফসল। মিডিয়া বিতর্কের পরিধি বাড়াতে যথেষ্ট শক্তিশালী (১৯৯৭ সালের ইউপিএস ধর্মঘট নিয়ে ঘটা এক দৃষ্টান্ত আমার বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে)।
সানবার্নিডো ও অন্যান্য ঘটনায় অমুসলিম ও মুসলিমদের মিডিয়া কীভাবে চিত্রিত করেছে?
প্রথমেই বন্দুক-সহিংসতা নিয়ে কিছু বলা যাক; তা যেন আমেরিকান আপেল পাই। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে যে, মার্কিন ভূমিতেই ৪০৬৪৯৬ জন আমেরিকান আগ্নেয়াস্ত্রে প্রাণ হারিয়েছে আর তাদের সন্ত্রাসবাদের ফলে বিশ্বব্যাপী ৩৩৮০ জন মারা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে জিহাদী নামধারীদের দ্বারা ৯/১১-র পর ৪৫ জন প্রাণ হারিয়েছে। অন্যকথায় বন্দুক- সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ এর অনুপাত যেন দশ হাজার ও এক।
স্কুলে ও অন্যত্র সহিংসতায় শ্বেতাঙ্গদের অগ্রগণ্য ভূমিকা লক্ষ্যণীয়। মুসলিমরা আমেরিকার সকল ঐতিহ্যে একীভূত হলেও সানবার্নিডোর ঘটনায় এসে যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ আর জাতীয় সুরক্ষার বুলি আওড়ে মুসলিমদের ওপর চড়াও হতে দেখা গেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সহিংস ঘটনাকে চাপা দিতে দুটি ফ্রেম ব্যবহার করা হয়, শ্বেতাঙ্গ অপরাধী আর মুসলিম। প্রথম ক্ষেত্রে অপরাধকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। উদাহরণত মানসিক অসুস্থতার অজুহাত। অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা যার সমাধান মনে করা হয়।
দ্বিতীয়ত, মুসলমানদের ক্ষেত্রে অপরাধকে গণ্য করা হয় 'সভ্যতার সংকট' হিসেবে। যেখানে সমগ্র মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও লড়াই তথা 'ওয়ার অন টেরর'কে সমাধানের একমাত্র উপায় হিসেবে ফলাও করে প্রচার করা হয়। ফরাসী দার্শনিক আলবার্ট মোমি তার mark of the plural আলোচনায় বুঝিয়েছেন যে বর্ণবাদী কর্মকাণ্ড মানুষজনের কাছে স্বাভাবিক বলে উপস্থাপন করা হয় আর শ্বেতাঙ্গ কুকীর্তি সীমাবদ্ধ করে রাখা হয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে।
এই যুক্তি শুধু রক্ষণশীলদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা নয় বরং উদারপন্থিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। উদারপন্থার প্রবক্তারা দীর্ঘদিন ধরে স্বতন্ত্র অধিকার ও স্বাধীনতা হরণ করে স্বতন্ত্রতার অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। আর তাই অধিকার আদায়ের নিমিত্তে মানুষজন বর্ণবাদকে আপন করে নিয়েছে।
জাতীয় রাজনীতিতে সানবার্নিডো আর ট্রাম্প-বক্তব্যের প্রভাব
ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রভাব পূর্বোল্লিখিত এনোক পাওয়েলের বক্তব্যের প্রভাবের অনুরূপ। ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্ক বিদ্যমান।
অপরদিকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা ওয়ার অন টেরর, জাতীয় সুরক্ষানীতি গঠন, মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক বৈষম্য ডেমোক্রেটদের এহেন দুষ্কর্ম কেবল রিপাবলিকানদের নিজস্ব প্লট রচনার বৈধতাই দেয় না; বরং আগামী দিনে আরও উগ্রচর্চার স্বাধীনতা তাদেরও দেয়া হয়।
অন্যভাবে, রিপাবলিকানরা নিজেদের ডানপন্থি উপস্থাপনের সাথে সাথে ডেমোক্রেটরা তাদের চরমপন্থার দিকে কেবল আঙ্গুলি নির্দেশই করে না বরং নিজেদের আরও চরমপন্থার রাহাও পাকাপোক্ত করে নেয়, তারা কেবল অসৎ মুসলমানদের পিছু নেয়, তাদের উস্কানিমূলক বক্তব্যে খুব কমই মেলে।
এর সুষ্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় নিউইয়র্ক টাইমস-এর তৎকালীন সম্পাদকীয় কলাম থেকে যা ট্রাম্পের বর্ণবাদের ভঙ্গিতে ফ্যাসিবাদের ভয়াল রূপ তুলে ধরে। সম্পাদকীয় এর শুরুটায় এমন কিছুই ছিল না- যার বিপক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো যায়। তবে এতে রিপাবলিকানদের ইসলামোফোবিয়ার পট তৈরি ও ফ্যাসিবাদের অপচ্ছায়া হিসেবে দায়ী করা হয়েছে। কেননা তারা অভ্যন্তরীণ বিতণ্ডায় বেশি আগ্রহী। ডেমোক্রেটদের দোষ এতে উপেক্ষা করা হয়েছে, এসব অপকর্মে যাদের অবদান কোনো অংশেই কম নয়।
এটা অবশ্য ডেমোক্রেটদের বাঁ-হাতের চাল। কারণ সমগ্র জাতি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ যা তাদের সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথ করে দিয়েছে পরিষ্কার, পেছনে থেকে কোনো বিরূপ মন্তব্যের ঝঞ্ঝাটও নেই।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নিশ্চিত করে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে ভয়াল মোড় নেয়ার প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে ভীতিহীন রাজনৈতিক যে শক্তি তাকে ক্ষমতায় এনেছে তা উপলব্ধি করার কোশেশ আমাদের করা দরকার। এমন এক গতিশীলতা যা সম্পূর্ণই রাজনৈতিক চাল। পুনরাবৃত্তি করতে হয় তা পদ্ধতিগত রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তন, একক কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের চাল নয়।
ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতি কী পরিমাণ চাপের মুখে দীর্ঘসূত্রতায় বলিরপাঁঠার রূপ দিয়েছে তা নিয়ে অবশ্য কোনো ভ্রূক্ষেপ কারো নেই। পালের গোদার মতো ট্রাম্পও বুঝেছিল যে, অভিবাসন সস্তা শ্রমের উৎস যা আমেরিকার অর্থনীতির সাথে জুড়ে বসে আছে, বর্তমানে যেন তা বিশেষভাবে সত্যায়িত, তার মাথায় এটাও খেলেছে যে, ঝুঁকির মধ্যে রাখতে পারলেই তাদের অপদস্থ ও জব্দ করে রাখা যাবে। আর তাদের বলিরপাঁঠা বানানোর দ্বারা সামগ্রিকভাবে আমেরিকান শ্রমজীবীদের প্রভাবিত করে এসব অস্বস্তি থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়া যাবে।
এক্ষেত্রে আমেরিকান প্রশাসন বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসন উভয়ক্ষেত্রে সমান তালে মদত দিয়ে যাচ্ছে তাতে আমরা অমনযোগী হয়ে রই। (দৃষ্টান্ত; নাফটা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসমূহ, মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার যুদ্ধ) এবং অভিবাসন দণ্ড। (ওবামার গণনির্বাসন নীতি) এর সবই মনে করিয়ে দেয় যে, বর্ণবাদ শ্রেণিবদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের এক অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস।
ফরাসি আঞ্চলিক নির্বাচনের প্রথম দফায় ২৮ ভাগ ভোট দখল করেছে ডানপন্থি ন্যাশনাল ফ্রন্ট এবং অন্যান্য ইউরোপীয় বর্ণবাদী পার্টি (যদিও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছে)। তবুও ডানপন্থি মার্কিনিরা ইউরোপের থেকে আলাদা। ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের মর্মমূলে প্রোথিত ইসলামোফোবিয়া নিয়ে আমাদের কেমন চিন্তিত হওয়া উচিত!
ইউরোপে ইসলামোফোবিয়ার সাথে ডানপন্থির ভিন্নরূপ সম্পর্ক। ইউরোপের এ পার্থক্যের গোড়ায় আছে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর অফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার এক দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাস। অর্থাৎ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের সম্পর্কে বর্ণবাদী আদর্শিক তকমা দেয়ার চর্চা হয়।
ফ্রান্সের ক্ষেত্রে, ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়নের মিসর আক্রমণ এবং পরবর্তীকালে ফ্রান্সের আলজেরিয়া বিজয়ের ফলে প্রাচ্যবাদ ও বর্ণবাদচর্চার পথ সুগম হয়। 'কোড দে লিংকডিগনাত' নামক আইন প্রথমত আলজেরিয়া এবং পরবর্তীতে অন্যান্য উপনিবেশের ঘাড়ে চাপানোর মাধ্যমে ফ্রান্স এক নিয়মতান্ত্রিক বৈষম্যের জন্ম দেয়। যেখানে জনগোষ্ঠীগুলোকে নিম্ন মানের মর্যাদা প্রদান করা হয়। এমনকি উপনিবেশ উৎখাতের পরও এ বৈষম্য চলমান ছিল। জাতীয় ফ্রন্ট যার দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রতিচ্ছবি।
যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়া আরও সাম্প্রতিক বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর যখন আমেরিকা ফ্রান্স, ব্রিটেন, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সাম্রাজ্যবাদের লাগাম হাতে নেয় তখন থেকেই এ লড়াই গুরুতর রূপ নেয়। ইসরায়েলের সাথে মার্কিনিদের গলায় গলায় ভাব থাকায় প্রাচ্যবাদ ও ইসলামোফোবিয়ার বিস্তারের পথ কণ্টকমুক্ত হয়েছে। সন্ত্রাসবাদী হুমকি ১৯৭০-এর দিকেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ১৯৭৯ সালে ইরানী বিপ্লব তা রূপায়ণে মুখ্য ভূমিকা রাখে। অন্যত্র আমি উল্লেখ করেছি যে, ১৯৮০-র দশকে 'নিউকন লিকুদ জোট' নামক ইসরায়েলি রাজনৈতিক সংস্থা ইসলামের ভিন্ন বিপদের আভাস দিয়েছে।
এভাবেই ইসলামোফোবিয়া ১৯৯০-এর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে বিস্তৃত হতে শুরু করে। এমনকি ৯/১১-র পর তাতে জনগণের চিত্তাকর্ষনে সমর্থ হয়। এটা একটি আংশিক বিষয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম অভিবাসীবিরোধী প্রচারণার সাথে ইউরোপের মিল নেই। এটা প্রাথমিকভাবে ল্যাটিন অভিবাসীদের বঞ্চিতকরণ। এটাও বলা হয় যে, আমেরিকা ইউরোপিয়ান দেশগুলোর কাছ থেকে বৈশ্বিক জিহাদবিরোধী আন্দোলন শিক্ষা লাভ করছে।
ইসলামবিরোধী বক্তৃতাকে উপজীব্য করে ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে অনেক বেশি ডানপন্থি দলগুলো মুসলিম-বিরোধী ও অভিবাসীবিরোধী বিষবাষ্পে দেশি ও ইউরোপীয় সংসদ নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাফল্যের দেখা পেয়েছে।
ফ্যাসিবাদী দলগুলোর কেন্দ্রবিন্দু ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টি মিলিয়ন ভোেট লাভে সমর্থ হয় এবং প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় সংসদে দুটি আসন লাভ করে। হল্যান্ডে এগিয়ে যায় গ্রিট ওয়াইল্ডের ফ্রিডম পার্টি। এমনকি হল্যান্ড ও সুইডেনের মতো উদারপন্থি দেশগুলোতেও ডানপন্থি দলগুলোর তখন জয়জয়কার। সুইডেনে ডেমোক্রেটরা মুসলিম-বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে সংসদীয় ক্ষমতা হাসিল করেছে, যার নেতা জিমি একিসন- অভিবাসন সীমাবদ্ধ করার দাবি জানান, আর সুইডিশদের সামনে ইসলামকে সবচে মারাত্মক জাতিগত হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করে।
পুনরায় বর্ণবাদী আবেদন ও শ্রমজীবী মানুষজনের ম্রিয়মাণ জীবনব্যবস্থায় যোগসূত্র দেখিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট থেকে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছে। ইউরোপিয়ান সরকারব্যবস্থাগুলো অসহায় মানুষগুলোর প্রতি ধৃষ্ট ও দৌরাত্যপূর্ন ব্যবস্থাই কেবল চাপিয়ে দেয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঐতিহ্যগত বাম দলগুলো এ সমস্যার বিকল্প কোনো সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়। ভোটারদের মধ্যে উৎকণ্ঠা সঞ্চারে মুসলিম অভিবাসনকে বলিদানের মাধ্যমে রাজনৈতিক শূন্যস্থান পূরণ হয়।
২০১০ সালে ফ্রান্সের উচ্চকক্ষ সর্বসম্মতিক্রমে বোরকা নিষিদ্ধ করার পক্ষে রায় দিয়েছে। যখন নিম্নকক্ষে ভোেট পাস হয়ে গেলে বাম দলগুলো বিরত থাকে (সমাজতান্ত্রিক, গ্রিনস, কমিউনিস্ট) নীতিগতভাবে মুসলমানদের বিপক্ষে যাওয়ার পরিবর্তে তারা চুপচাপ বসে থাকারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এরপর সমাজতান্ত্রিক দল এগিয়ে এসে বিষয়টিকে আপত্তিকর বললেও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতী ছিল না। বামদের এই নগণ্য প্রতিক্রিয়া অপরপক্ষকে শক্তিশালী হতে সহায়তা করেছে। ইউরোপ যেন মার্কিন মূলধারার রাজনীতির ভূত-ভবিষ্যতের আয়না। ডানপন্থিরা খুব একটা পিছিয়ে না পড়লে ইউরোপ বামপন্থিদেরও শিক্ষাদান শুরু করে দেবে।
• ইসলামোফোবিয়ার ক্রমোত্থানের বিরুদ্ধে বামদের করণীয়
ইউরোপ থেকে লব্ধ প্রথম পাঠ হলো, কোন কেন্দ্র থেকে এর মোকাবিলা করা পণ্ডশ্রম। অতিমাত্রায় মুসলিম বিদ্বেষের মুখে, একটি অদৃঢ় সংকল্প কেবল ডানপন্থিদের জোর বাড়িয়ে তুলবে।
দ্বিতীয়ত, ডানপন্থিরা জন প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়, মাঝেমধ্যে বর্ণবাদবিরোধী বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে বামপন্থিদের বাধারও সম্মুখীন তারা হয়। মূলধারার বাইরের বিভিন্ন ইউরোপীয় জাতি বামপন্থি থেকে ডানপন্থি হওয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিদ্যমান।
দৃষ্টান্তে, ব্রিটেনে এন্টি-নাজি লিগ ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টির পূর্বসরি ফ্যাসিস্ট ন্যাশনাল ফ্রন্টকে দুই ফ্রন্টের নির্বাচনে সফলভাবে পেছনে ফেলেছে। প্রথমত, তারা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে একটি মৌলিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। দ্বিতীয়ত, তারা উন্মুক্ত রাজনৈতিকাঙ্গন তৈরি করেছিল যা অগ্রসরমান বিকল্প ও পদ্ধতিগত সমালোচনাকে সামনে রেখে গঠিত, যে বর্ণবাদ বৃহৎ পরিসরে রাজনৈতিক অর্থনীতিতে নিহিত আছে।
ভুলে গেলে চলবে না, ইসলামোফোবিয়া সাম্রাজ্যবাদের তুরুপের তাস। এটা নিজে থেকে বিলীন হওয়ার নয়। আমি ইতোমধ্যে প্রমাণ দিয়েছি যে, আস্থাযোগ্য মতবিনিময় ও ইসলামি শিক্ষাই যথেষ্ট নয়। আমাদের সামষ্টিক কণ্ঠস্বরকে উচ্চকিত করতে মিছিল বা অন্যান্য বাহ্যিক প্রকাশের আয়োজন করতে হবে।
তবে এর জন্য আমাদের কৌশল প্রয়োজন যা কেবল সমসাময়িক ট্রাম্পদের ডানপন্থি বক্তব্যকেই মোকাবিলা করবে না; বরং অন্যান্য হুমকি সম্ভবপর করে তোলার গোড়ার কথাও মূলোৎপাটিত করেই তবে ক্ষান্ত হবে। অন্যকথায় আমাদের পদচারণার কৌশল রপ্ত করতে হবে এবং কি করে সুবিধা আদায় করে নিতে হয় সে কৌশলও রপ্ত করতে হবে। একইসাথে স্বল্প পরিসরে তবে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল যা ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ক্ষুণ্ণ না করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখবে। এভাবেই বৃহৎ-ক্ষুদ্র সকল পরিস্থিতির সামাল দেয়া হবে সম্ভবপর।
বামপন্থিদের দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় দুর্বলতা ছিল, সহসাই ভয়ের মুহূর্তে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে সতর্ক না হয়েই এমনসব স্বল্পমেয়াদি কৌশল তারা অবলম্বন করতো যা আমরা কোথায় আছি বা কোথায় তা পৌঁছে দেবে তার কোনো ইয়ত্তা থাকে না।
তাই ইসলামোফোবিয়া ও বর্ণবাদের আরও সার্বজনীন প্রতিরোধকল্পে প্রতিপক্ষ সংঘবদ্ধ হওয়ার পূর্বে গুরুতর কিছু প্রকাশ হতে চলছে (হয়তো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল)। এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো ইসলামোফোবিয়ার দুই রূপের- 'লিবারেল ও কনজারভেটিব'- যেসব ইন্সটিটিউট দ্বারা সৃজিত ও চর্চিত তাদের ভিত নাড়িয়ে দেয়া। অন্যকথায় এর জন্য প্রয়োজন একটি মৌলিক পদ্ধতি যা সমস্যার মূলে পৌঁছতে পারবে অর্থাৎ অন্তত সন্ত্রাসী যুদ্ধের অবসান ঘটাবে, জাতীয় সুরক্ষা রাষ্ট্রকে নিঃশেষ করবে (যে সুরক্ষা একপক্ষীয়, সবাই যার আঁচলে ছায়া পায় না) এবং বর্ণবাদী শক্তিকে বিলুপ্ত করে পূর্ববৎ স্বাভাবিক অবস্থার পুনর্জাগরণ করবে। এ পরিবর্তনের ফলে এমন এক রাজনীতির প্রয়োজন পড়বে যা গণআন্দোলনকে করবে শক্তিশালী। আর চলমান রাজনৈতিক পদ্ধতিকে গণতান্ত্রিকীকরণ করবে।
আপাত দৃষ্টিতে একে এক অতিরঞ্জিত পরিকল্পনা ভাবা যেতে পারে, তবে এর চেয়ে নাতিদীর্ঘ কোনো পরিকল্পনায় নজর দেয়ার অর্থ হবে আমরা প্রকৃত হুমকি যা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করবে এবং তা প্রতিহত করার কৌশল কোনোটা সম্পর্কেই যথেষ্ট ওয়াকিবহাল নই।
ভাষান্তর: হাবিবুর রহমান রাকিব

টিকাঃ
[৩৫] ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান বার্নিডোতে এক মুসলিম দম্পতির হামলায় ১৪ জন নিহতের ঘটনার পর রিপাবলিকান প্রার্থ ডোনাল্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার দাবি করেন। তার এই বক্তব্য বিশ্বজুড়ে ঝড় তোলে। পরে ডোনাল্ট ট্রাম্প নিজের কথাকে ঘুরিয়ে বলেন, 'ওটা ছিল সার্ন বার্নিডো হামলার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া।' তবে এর কিছুদিন আগে ফ্রান্সের প্যারিসে এক সন্ত্রাসী হামলার দায়ও চাপানো হয় নিরীহ মুসলিমদের ঘাড়ে। তখন চলছিল নির্বাচনি মৌসুম, মুসলিমদের অপরাধী বানিয়ে শুরু হয় ইসলামফোবিয়ার খেলা। এরই জের ধরে আমেরিকাজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার শেকড় সন্ধান করেন Islamophobia and the Politics of Empire বইয়ের লেখক ও সাংবাদিক দীপা কুমার।
[৩৬].৯/১১-এর হামলার পর সেই হামলাস্থলই আজ পরিচিত 'গ্রাউন্ড জিরো' হিসেবে। সেখানেই পশ্চিমা বিশ্ব ও মুসলমানদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় একটি গ্রুপ 'কর্দোবা ইনিশিয়েটিভ'। কিন্তু এমন একটি ■বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া ৪২ আরও পিডিএফ বই ডাউনলোড করুন www.boimate.com
জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করা ঠিক নয় এই যুক্তিতে, এর ঘোর বিরোধিতা শুরু করে নিউইয়র্কবাসী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00