📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 মুখবন্ধ

📄 মুখবন্ধ


ইসলাম একটি আদর্শিক জীবনব্যবস্থা। সভ্যতার অগ্রযাত্রায় ইসলামের ভূমিকা অত্যুজ্জ্বল। ইসলাম তার আবেদন নিয়ে পৃথিবীর সমগ্র মানচিত্রে ছড়িয়ে দিয়েছে এক অনুপম প্রাণশক্তি। ইসলামের মহান আদর্শই ইসলামবিদ্বেষীদের প্রতিহিংসার কারণ। বিশ্বব্যাপী তাদের অনুদার ও সংকীর্ণ প্রচারণায় ইসলামকে প্রতিনিয়ত দানবীয় রূপে হাজির করা হচ্ছে। প্রোপাগান্ডার মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে 'ইসলামোফোবিয়া' তত্ত্ব। ফলশ্রুতিতে আধুনিক বিশ্বের অনেকের কাছেই ইসলাম একটি ভীতিকর শব্দ, তাদের কাছে ইসলাম ধর্মের অনুসারী মানেই সন্ত্রাসী-উগ্রপন্থী।
ইসলামবিদ্বেষী এ মহামারীতত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ছে পশ্চিম থেকে প্রাচ্যে; এমনকি বাংলাদেশেও এ তত্ত্বের আমদানি করা হচ্ছে সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার মোড়কে। 'বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া' বাংলাভাষায় এ বিষয়ে সর্বপ্রথম প্রচেষ্টা। বইটিতে দেশ-বিদেশের গবেষকদের অনুসন্ধানী কলমে উঠে এসেছে পাশ্চাত্যে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে অনৈতিক প্রচারণার স্বরূপ। বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে বয়ান করা হয়েছে কেন পাশ্চাত্য জগতে ইসলাম ও আরববিশ্বকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেমনটা তারা নয়! কেন ইসলামকে অতিরঞ্জিত প্রদর্শনীর মাধ্যমে দানবীয় ও সন্ত্রাসী ধর্মে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়! কীভাবে রাজনৈতিক প্রয়োজনকে বৈধতা দিতে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়।
সংকলনটির গুরুত্ব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অমুসলিমদের লেখাও এখানে স্থান পেয়েছে। বিষয়বস্তুর ধারাবাহিকতা সামনে রেখে প্রতিটি লেখা সাজানো হয়েছে। বইটি পাঠ করে গভীর মননশীল ব্যক্তিমাত্র উপলব্ধি করতে পারবেন, ইসলামের অনুপম বিষয়াবলি নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা পশ্চিমের দ্বিমুখী বক্তব্য, নেতিবাচক ও অবজ্ঞাসূচক দৃষ্টিভঙ্গি। অথচ এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে ইসলামের শক্তিশালী অবস্থান ও মানবিক মূল্যবোধ-যার ওপর কখনো পশ্চিমা পণ্ডিতদের চোখ পড়ে না। এ সময়ের নানা রাজনৈতিক ও সামরিক মেরুকরণ, নাইন-ইলেভেনউত্তর পাল্টে যাওয়া বিশ্ব পরিস্থিতি ও পশ্চিমি করপোরেট রাজনীতি ও তথাকথিত মানবতার স্বরূপ সম্পর্কেও জানা যাবে।
পাঠকের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি-ব্যক্তিগতভাবে মিডিয়ায় আন্তর্জাতিক ডেস্কে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে 'ইসলামোফোবিয়া'র নানান ঘটনা দৃষ্টিগোচর হতো। প্রায় চার বছর ধরে এমন একটি কাজের প্রচেষ্টার চালিয়ে আসছি কিন্তু তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি একারপক্ষে। তবে বন্ধুবর হাবিবুর রহমান রাকিবের আন্তরিক সহায়তা আমাকে এ কাজে মনোযোগী হতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। উস্তাদ কামরুল হাসান নকীব সাহস যুগিয়েছেন সবসময়। তিনি বইটির আদ্যেপ্রান্ত পড়েছেন, সম্পাদনার কাজে সময় দিয়েছেন। আরও নানাভাবে সহায়তা করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম, রাকিবুল হাসান, জাবির মাহমুদ, হাবিবুল্লাহ বাহার প্রমুখ। রুচিশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মুভমেন্ট পাবলিকেশন্স- এ পথে আলো জ্বালিয়েছে। সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আল্লাহ তায়ালা উত্তম প্রতিদান দিন সবাইকে। আমিন।
রকিব মুহাম্মদ
মুগদা, ঢাকা
১.০৩. ২০২১

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ইসলামোফোবিয়া: ইন দ্য ফিল্ড

📄 ইসলামোফোবিয়া: ইন দ্য ফিল্ড


ইসলামোফোবিয়ার উৎপত্তির ব্যাপারে বলা হয় যে, পারিভাষিকভাবে এই শব্দটি সর্বপ্রথম যুক্তরাজ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। কতিপয় বিশেষজ্ঞের মতে, '১৯৯১ সালে insight নামী আমেরিকান একটি বইয়ে এই পরিভাষা সর্বপ্রথম নজরে আসে সবার।১ ইটন ডিমেট এবং সুলাইমান বিন ইবরাহিম ১৯২৫ সালে ফ্রান্সে এটাকে পরিভাষা হিসেবে সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন। তাদের ভাষ্য ছিল—occes detive islamphobia, যদিও সে-সময় এই পরিভাষা; বর্তমান ব্যবহারিক পরিভাষার সমার্থক ছিল না। কোনো জিনিস ও কর্মে ভয় পাওয়াকে 'ফোবিয়া' বলা হয়। এজন্য শব্দটি ভিন্ন ভিন্ন পরিভাষায় ব্যবহার হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ ওই ব্যক্তি; যার পানিভীতি রয়েছে— তার জন্য হাইড্রোফোবিয়া পরিভাষা ব্যবহৃত হয়। তেমনি একটি পরিভাষা হলো— ফোবোফোবিয়া। এই রোগের রোগী কোনো দুর্ঘটনা দেখা মাত্রই ভীতবিহ্বল হয়ে পড়ে। কারো কারো উচ্চতা ভীতি রয়েছে। তারা হলো অ্যাক্রোফোবিয়ার রোগী। মনোফোবিয়া; একটি মানসিক অসুস্থতার নাম। যে রোগের রোগী একাকিত্বকে ভয় করে। 'ফোবিয়া' (phobia) ভয়, ডর এবং ঘৃণা পোষণকে বলে। এটা বিবেকের এমনই অসুস্থতার নাম; যা কারো পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ভয় অথবা কারো প্রতি ঘৃণা প্রকাশের হালে দৃশ্যত হয়।২ চেম্বার ডিকশনারিতে ফোবিয়ার এই অর্থ লিপিবদ্ধ আছে— afear, aversion, or hatred esp, morbid and irrational (এক ধরনের ভয়, বিদ্বেষ, ঘৃণা, সংঘাত এবং অযৌক্তিক।)
'ফোবিয়া' অযৌক্তিক এবং অসুস্থ চিন্তার নাম। যেটা ভীতি, অনাকাঙ্ক্ষা এবং ঘৃণায় ভরপুর। যখন 'ফোবিয়া' শব্দকে ইসলামের সাথে জুড়ে দেয়া হয়; তখন তার অন্তঃস্থিত অর্থ দাঁড়ায়— 'ইসলামভীতি, ডর এবং ঘৃণা' যেটা ইসলামবিরোধী এবং -বিদ্বেষীদের দিল ও দেমাগে নিবাসিত। ইসলামের বাস্তবিক দৃশ্যকে পাল্টে দেয়া। মুসলমানদের বদনাম করা। তাদের মূর্খ ও দুর্ধর্ষরূপে উপস্থাপন এবং মানসিক ও মনোজাগতিক দিক থেকে তাদের পেরেশান করা। কঠোরতার নিশানা বানানো। মসজিদ ও ইসলামি ঐতিহ্যগুলোর ওপর হামলা করা। মুসলিমদের পোশাকের ওপর সার্কাজমের ট্যাগ লাগানো। তাদের সোনালি সভ্যতাসমূহ, বৈধ কর্মকাণ্ড এবং হকসমূহ থেকে বঞ্চিত করা ইত্যাদি। ইসলামোফোবিয়ার পার্থক্যপূর্ণ ধরন ও যুদ্ধ রয়েছে। যদি উপযুক্ত শব্দে সেটাকে বয়ান করা যায়; তাহলে এই সুরত সামনে আসবে।
ইসলামোফোবিয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য- ইসলাম, মুসলমান, ইসলামি সভ্যতা, রাজনীতিতে ঘৃণা ও ভীতির প্রকাশ এবং বিবিধ কর্মকাণ্ড। ইসলামোফোবিয়া এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি; যার অনুগামী হিসেবে পৃথিবীর সমস্ত অথবা অধিকাংশ মুসলমান পাগল প্রতিপন্ন হয়। যারা অমুসলিমদের ব্যাপারে গোঁড়া দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে। ইসলামিক সহযোগী সংগঠন (oic) ইসলামোফোবিয়াকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে- ইসলামের বিপরীতে অযৌক্তিক, আঘাতস্বর্বস্ব এবং কঠিন অপ্রীতিকর প্রকাশের নাম- 'ইসলামোফোবিয়া'। তেমনিভাবে ইসলামোফোবিয়া বাহানায় মুসলমানদের আত্মিক, সামাজিক এবং সভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে হয়রানি করা। ইসলাম মান্যকারীদের দেশ ও জাতির ঐচ্ছিক-সামাজিক-রাজনৈতিক এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রত্যেককে কর্তৃত্বহীন করাও অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের সাথে কার্যত এমন আচরণই করা হচ্ছে!
ইসলামবিরোধীদের পক্ষ থেকে এই মূর্খতাসূচক কথাকেও রিপিট করা হয় বারবার 'ইসলামের কোনো সভ্যতাই নেই। যদি থেকেও থাকে তবে সেটা পশ্চিমা সংস্কৃতির তুলনায় সবদিক দিয়েই কম।' এর পাশাপাশি তারা নিজেদের উঁচু এবং মুসলমানদের হেয়জ্ঞান করে।
ফরাসি উপনিবেশিক শাসক Alain Quellien-কে মনে করা হয় তিনিই সর্বপ্রথম একটি লিখিত দলিলে 'ইসলামোফোবিয়া' শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। • আরেকজন উপনিবেশিক প্রশাসক Maurice Delafosse, যার উপনিবেশিক প্রশাসনের ভেতর মুসলিমদের প্রতি ঘৃণাবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। শাসক নীতিগতভাবেই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণাবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন।
পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে ফিলিস্তিন বংশোদ্ভূত আমেরিকান লেখক এডওয়ার্ড সাঈদ এ শব্দটি ব্যবহার করেন। সম্ভবত তিনিই প্রথম একাডেমিক জার্নালে এই শব্দ ব্যবহার করেন। জন্মগতভাবে এডওয়ার্ড সাঈদ একজন আরব খ্রিস্টান। কিন্তু সারাজীবন কাটিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তার পিতা একজন আমেরিকান সৈনিক। একাধিকবার তিনি আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করেছেন। সাঈদ পড়াশোনা করেছেন স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যলয়ে। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে তিনি একজন বামপন্থী চিন্তার মানুষ ছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে 'ইসলামোফোবিয়া' বলতে আমরা যা বুঝি, তার সঙ্গে আক্ষরিক অর্থের মিল কম। বরং বর্তমান সময়ের 'ইসলামোফোবিয়া' ধারণাটিকে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচিত করে তোলে যুক্তরাজ্যভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান 'রানিমেইড ট্রাস্ট'। রানিমেইড ট্রাস্ট যুক্তরাজ্যের প্রথম সারির একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, যারা বর্ণবাদবিরোধী গবেষণা করে এবং সরকার ও পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সাহায্য করে।
১৯৯৬ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি ১৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিশন গঠন করে, যার প্রধান ছিলেন অধ্যাপক গরডন কনওয়ে। এই ১৮ সদস্যের কমিটিতে ধর্মীয় পরিচয়ের দিক থেকে মুসলিম, খ্রিস্টান, হিন্দু, শিখ ও ইহুদি সবাই ছিলেন। এই কমিটি যে রিপোর্টগুলো প্রকাশ করে, তার শিরোনাম ছিল- Islamophobia a Challenge For Us All। রিপোর্টটি প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মিডিয়া ও অন্যান্য মাধ্যম এটা ব্যাপক প্রচার শুরু করে। অনেকে রিপোর্টটিকে স্বাগত জানায়, আবার কেউ কেউ এর বিরোধিতা করে। রানিমেইড ট্রাস্ট-এর এই রিপোর্ট প্রায় ২০ বছর পর আরও ফলোআপ করে প্রকাশ করা হয় Islamophobia -still a challenge to us all শিরোনামে। ফলোআপ রিপোর্টটির শিরোনামে বোঝা যায়, অন্তত রানিমেইড ট্রাস্ট মনে করছে, এই সমস্যাটি এখনো আমাদের সবার জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। দেখা যাক, রানিমেইড ট্রাস্ট ইসলামোফোবিয়া বিষয়টিকে কীভাবে সংজ্ঞাযতি করেছে এবং এর সাথে যুক্ত অর্থবহতার সমস্যাকে কীভাবে উল্লেখ করেছে। সেখানে রয়েছে-
“ইসলামোফোবিয়া শব্দটি ইসলামের প্রতি অদৃশ্যমান শত্রুতা বা শত্রুভাবাপন্নতাকে নির্দেশ করে। এটা আরও নির্দেশ করে এ ধরনের শত্রুভাবাপন্নতার কারণে মুসলমান ব্যক্তি ও সম্প্রদায় অন্যায্য বৈষম্যের শিকার হয় এবং তাতে যদি মুসলমান নাগরিকদের মূলধারার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ড থেকে ভিন্ন করে দেয়া হয়।"
উল্লেখিত এই সংজ্ঞাটি আরও সম্প্রসারিত করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় রিপোর্টটিতে। যেখানে এই সংজ্ঞা সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে এভাবে-
“আসলে ইসলামোফোবিয়া রিপোর্ট এ শব্দটি সম্পর্কে যে বিষয়টি উল্লেখ করেছে তা হলো, ইসলামের প্রতি অদৃশ্যমান বিদ্বেষ এবং এই বিদ্বেষ থেকে বাস্তবজীবনে মুসলমান ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের মানুষ অন্যায় বৈষম্যের স্বীকার হওয়া। বিষয়টি খুব পরিস্কার। ইসলাম বা মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের ফলে যদি মুসলিম ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে বৈষম্যের শিকার হতে হয়, মূলধারার রাজনীতি ও সামাজিক সংগঠনগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়, সেটাই ইসলামোফোবিয়া।”
ইসলামোফোরিয়ার ইতিহাস
এসব তো আজকালের আলাপ। কিন্তু একটু পেছনে দৃষ্টিপাত করলেই দেখতে পাব যে, শতবর্ষ-চলিত প্রোপাগান্ডা এসব। ইসলামের বিরুদ্ধে হিংসা, বাধা, ঘৃণা এবং ভীতি; আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রেরিত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছিল। যখন তিনি জনতার মাঝে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছানো শুরু করেন। তখন ইসলামের শত্রুরা ইসলামের বিরুদ্ধে কঠিন চক্রান্তে মেতে ওঠে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেখানে যেখানে পয়গাম পৌঁছাতেন; তারা সেসব জায়গায়ই গিয়ে হাজির হতো। তারা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অগ্রহণীয় অভিযোগ এবং আপত্তি দায়ের করতো যে, ইনি [হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] নাউজুবিল্লাহ 'জাদুকর এবং কবি' ইত্যাদি। এবং লোকদের বলে বেড়োত যে, তার কথায় যেন কেউ কর্ণপাত না করে!
তারই জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হলো- যখন তোফায়েল বিন আমর দাউসি রাদিয়াল্লাহু তায়া'লা আনহু মক্কা গমন করেন। তখন কুরাইশদের সেসব এলিট ব্যক্তিবর্গ যারা লোকদের হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সান্নিধ্য থেকে দূরে রাখত- তারা তাঁর কাছেও পৌঁছে এবং বলে যে, "তিনি আমাদের মাঝে আবির্ভূত হয়ে বিভাজনের প্রাচীর তুলে দিয়েছেন। জানা নেই, তার জবানে কেমন জাদু লেপ্টে আছে। যার জোরে সে পুত্রকে পিতার বিরুদ্ধে, ভাইকে ভাইয়ের বিরুদ্ধে এবং স্ত্রীকে স্বামীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমাদের আশঙ্কা হয় যে, তুমি এবং তোমার গোত্রও তাদের মতো তার দলে আবার ভিড়ে না যাও! এজন্য আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ পরামর্শ থাকবে- তুমি না তার সাথে সাক্ষাৎ করবে আর না তার কথা শুনবে!” উদ্দেশ্য হচ্ছে, ওই লোকেরা তাকে সর্বপন্থায় বুঝিয়েই নবি কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তার সাক্ষাৎ ঠেকিয়ে দেয়। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা কানে এসে যাওয়ার ভয়েই তোফায়েল দাউসি রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নিজের কানে তুলা গুঁজে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরিশেষে নবিয়ে পাকের জবানে কুরআন শুনে তিনি হয়রান হয়ে যান এবং ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করেন।৪
যে কাফেলাই সামনে অগ্রসর হয়েছে; ইসলামের শত্রুদের ইসলাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভয় ও আশঙ্কা, বাধা ও ঘৃণাও ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। নবি যুগের পর ফারুকী যুগে যখন মুসলিমরা জেরুসালেম ও সিরিয়া বিজয় করে নিয়েছিল, তখন তারা ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানারকমের চক্রান্ত শুরু করে। এরপর দ্বিতীয় খ্রিস্টশতকে মুসলমানরা ইউরোপের পশ্চিমাংশের দিকে অগ্রসর হয়ে সেখানে ইসলামের দেদীপ্যমান শিক্ষাকে বিস্তার করে। পরবর্তীতে সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ (৩০ মার্চ, ১৪৩২ খ্রিস্টাব্দ-৩ মে, ১৪৮১ খ্রিস্টাব্দ) সেই ধারায় আরও বিস্তৃতি এনে ইসলামি হুকুমতের পতাকা স্থাপন করেন। এজন্য কুস্তুনতনিয়াকেও (ইস্তাম্বুল) বিজয় করে নেন। এরপূর্বে ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে খ্রিস্টান ও ইহুদিবিশ্বের সম্মিলিত ক্রুসেড যুদ্ধে তারা কেবল ইসলাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভয়, ঘৃণা এবং বিপরীতধর্মী আত্মপ্রতিক্রিয়ার কথাই পরিবেশন করে গেছে। ইসলামের ইতিহাসে ক্রুসেড যুদ্ধের যুগটা অত্যন্ত নাজুক সময় ছিল। সমগ্র খ্রিস্টানবিশ্ব মুসলমান এবং তাদের ধর্মাদর্শকে মুছে ফেলার জন্য উঠেপড়ে লাগে। কিন্তু তারা বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে শত্রুশক্তির মোকাবিলা করে, তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেয়। এটাকে মুসলিম ইতিহাসের স্বর্ণোজ্জ্বল কৃতিত্বই বলা চলে।৫
'ইসলামোফোবিয়া' সুবিন্যস্তভাবে ক্রুসেড যুদ্ধ থেকে শুরু হয়েছে। খ্রিস্টান বিশ্বের সৈন্যদলের আধিক্য এবং অগণিত মাধ্যম থাকা সত্ত্বেও ফলত কোনো লাভ হয়নি! প্রসিদ্ধ লেখক ও নান ক্যারেন আর্মস্ট্রং ইসলামোফোবিয়ার পরিচিতিতে লিখেন- ইসলামোফোবিয়ার ইতিহাস ক্রুসেড যুদ্ধের সাথে গিয়েই মেলে।৬ খ্রিস্টানবিশ্বে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের ঘৃণা এবং ভয় লালনের ইতিহাস লিখিত ও সংরক্ষিত আছে।
৯/১১-র পর ইসলামোফোবিয়া
ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের প্রান্তিক দৃষ্টিভঙ্গি; ২০ শতকের সমাপ্তি এবং আরেকটু খাস করে বলতে গেলে ৯/১১-র (১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ খ্রিস্টাব্দ) পর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে। ইসলামি শিক্ষা এবং মর্যাদাকে পশ্চিমারা তাদের পরিবেশিত উদার গণতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে সাংঘর্ষিক আখ্যা দিয়ে বলে- 'ইসলাম ও মুসলিমবিশ্ব পশ্চিমা চিন্তা-মর্যাদা ও সভ্যতার উপযুক্ত নয়!' এই দৃষ্টিভঙ্গির ছায়ায় পশ্চিম এবং ইউরোপ তদীয় সভ্যতার মর্যাদাকে সমুন্নত রাখার জন্য; ইসলামকে খারাপ নাম দেয়া এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিত্যনতুন যুদ্ধের ট্যাগ লাগাচ্ছে। ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ খ্রিস্টাব্দে যখন কতক দুঃসাহসী অবৈধভাবে আমেরিকা 'ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে' হামলা করে। এরপর পশ্চিম এবং পশ্চিমের আশ্রয়ে ক্ষমতাশালী নানাস্থানে মুখোশধারী পশ্চিমাদের হাতে ইসলামের শিক্ষা-সভ্যতা ও ইতিহাসকে নিশানা বানানোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নীতিই ফলো করা হয় না। তখন থেকে এখন পর্যন্ত মুসলমানদের সভ্যতা ও রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে মসজিদ, স্কুল এবং ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও হামলা করা হচ্ছে।
পশ্চিমে এককথাই বরাবর রিপিট করা হচ্ছে যে, ইসলাম উগ্রবাদিতার মাধ্যম। আমেরিকায় মার্চ ২০০২ খ্রিস্টাব্দে চালিত একটা জরিপে উঠে আসে, দেশটির শতকরা ২৫ শতাংশ মানুষের মতামত ছিল এটা। এমনকি ২০১৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ৫০ শতাংশে পৌঁছে যায়।৭ ব্রিটেনের অবস্থা এই- ক্যারেন আর্মস্ট্রং লিখেন- '৯/১১-র পঞ্চম বর্ষপূর্তিতে পোপ রেনেডেকার্ট জার্মানিতে আক্রমণাত্মক বয়ান দিয়েছেন। তিনি ইসলামোফোবিয়ার চুল্লিতে ইন্ধন সরবরাহ করেছেন। তার প্রদেয় বয়ান থেকে এটাই বুঝে আসে যে, ইসলামোফোবিয়ার আন্দোলনে অবসরকাল যাচ্ছে। এবং পশ্চিমাবিশ্ব এক নতুন ক্রুসেডের প্রস্তুতিসমেত এগোচ্ছে।৮
পশ্চিম ও ইউরোপে ইসলাম এবং হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে ব্যাপক হাস্যরসে রচর্চা করা হয় এবং তামাশা করা হয়। কেননা তাদের জানা আছে যে, মুসলমানরা রাসূলে আরাবির শিক্ষা এবং তাঁর ওপর তুলনাহীন বিশ্বাস রাখে। এজন্যই পশ্চিম এবং ইউরোপে সবযুগে, সবসময় আল্লাহর রাসূলের ওপর ঘৃণ্য আক্রমণ করা হয়েছে। ঠিক এখানটাতে এসেই তাদের প্রশাসনাধীন এবং এর বাইরের রকমারি সংগঠনগুলোর মুখোশও উন্মোচিত হয়ে পড়ে। চাই সেটা প্রশাসনই হোক অথবা কুচক্রী কোনো মহল কিংবা বুদ্ধিজীবী, লেখক, শাস্ত্রবিদ অথবা সাহিত্যিকদের কোনো সংস্থা বা সংগঠন; তাদের উদ্দেশ্য এটাই যে, এদের মধ্য থেকে প্রত্যেকটা শাখা অথবা স্তরের; উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গের সবাই ইসলাম এবং নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র সত্তার ওপর হামলায় সচেষ্ট।
প্রসিদ্ধ পশ্চিমা প্রফেসর মন্ট গোমেরি ওয়াট নবিয়ে পাকের পবিত্র সত্তার ওপর কালিমা লেপন করে পশ্চিমা ইতিহাসের প্রকৃত অবস্থা বয়ানে বলেন- 'ইতিহাসের কোনো বড়ো ব্যক্তিকেই এমনতরো ন্যক্কারজনক পন্থায় উপস্থাপন করা হয়নি; যেমন নাকি মুহাম্মদ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে করা হয়েছে।'*
পশ্চিমে এই জোয়ারই সর্বত্র ধাবমান। কেমন যেন ইসলাম এবং মুসলিম-রিলেটেড প্রত্যেকটা জিনিসের দ্বিতীয় নাম চরমপন্থি এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী। পৃথিবীতে যত মুসলিম নর-নারী রয়েছে; তাদের সবার ওপরই একচেটিয়া এই প্রশ্ন তোলা হয় যে, তাদের পাসপোর্ট সন্দেহযুক্ত! নেকাব ও হিজাব আবৃত মহিলারাও এই সন্দেহের শিকার। যে ধর্মাদর্শকে সবচে বেশি টার্গেট করে সমালোচনা ও ভর্ৎসনা করা হচ্ছে; সেটা কেবলই 'ইসলাম'। csew (ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের মধ্যে অপরাধ জরিপ সংস্থা) এর অনুসন্ধান মাফিক ঘৃণা এবং শত্রুতার শিকার সবচে বেশি মুসলিমরাই। যার পরিসংখ্যান শতকরা ৮ শতাংশ, এর বিপরীতে ইন্ডিয়াতে শতকরা ৩ শতাংশ, খ্রিস্টানরা শতকরা ১ শতাংশ, অবশিষ্ট সকল ধর্মমত মিলে ৫ শতাংশ।১০ এই পরিসংখ্যানও ক্রমশ প্রবৃদ্ধমান।
৯/১১-র পর মুসলিমদের ওপর কঠোরতারও বহু ঘটনা পরিদৃষ্ট হয়েছে। cair (council on american islamic relations এর অধীনে একটি জরিপ পরিচালিত হয়। সেই জরিপে বলা হয়- ২০০৬ সালে ২ হাজার ৪৭২টি হামলার ঘটনার মধ্যে সবগুলো মুসলমানদের ওপরই ঘটে। ১১ এর বিপরীতে যদি পশ্চিমে ৯/১১-র পর কোনো মুসলমান থেকে কোনো জুলুম বা ভুলের ঘটনা ঘটেও থাকে তখন কেবল সেটাকে সন্দেহের চোখেই দেখা হয়নি বরং আইনের আওতায়ও নিয়ে আসা হয়েছে। এবং ইসলামের ওপর আঙুলও উত্তোলিত হয়েছে। বিপরীতে যদি কোনো অমুসলিম থেকে এমন জুলুম অথবা ভুলের প্রকাশ ঘটতো তখন কেবল ঐ ব্যক্তিকেই সমালোচনার লক্ষবস্তুতে পরিণত করা হতো!
ইসলামোফোবিয়া এবং পশ্চিমা মিডিয়া
মিডিয়া ইসলামোফোবিয়ার শেকড় মজবুত করা এবং বিস্তারে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক স্বাক্ষর রাখছে। মুসলমানদের গোঁড়া, পথভ্রষ্ট, মূর্খ, চরমপন্থি ও পাগলরূপে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ৯/১১-র পর থেকে পশ্চিম এবং ইউরোপের কোনো কোনো সংবাদপত্র ও বই এমন ছিল না যাতে ইসলাম ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে বিষ ছড়ানো হয়নি! ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রগুলো প্রতিমাসে আনুমানিক ইসলাম ও মুসলিম-সম্পৃক্ত পাঁচ শতাধিক আর্টিকেল প্রকাশ করে থাকে। সেগুলোর মধ্যে প্রতিটা বিষয়ে শতকরা ৯১ শতাংশ নেতিবাচকতাই পরিবেশন করা হয়। আর ইতিবাচকতা শতকরা ৪ শতাংশ। এছাড়া শতকরা ৬০ শতাংশ সংবাদ বা লেখায় ইসলামকে ইহুদি ও পশ্চিমাবিশ্বের জন্য হুমকিস্বরূপ জ্ঞান করা হয়। হুজুর সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে তারা সজ্ঞানে যেসব ইঙ্গিতবাহী শব্দ ব্যবহার করে; সেসবই এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তেমনিভাবে মুসলিমবিশ্বে কোনো পুরুষ বা নারী ইসলাম অথবা ইসলামের নবির চেহারা অঙ্কনের চেষ্টা করেছে; তখন পশ্চিমা ও ভারতীয় মিডিয়া সেটাকে মুসলিম উম্মাহর জন্য তাকে 'রোল মডেল'রূপে উপস্থাপন করেছে। যার নিকৃষ্ট উদাহরণ হলো, ভারতীয় বংশোদ্ভূত সালমান রুশদী, বাংলাদেশি তাসলিমা নাসরিন, পাকিস্তানের মালালা ইউসুফ এবং সোমালিয়ার ইয়ান হারছে আলী এখানটাতে আলো ফেলে। ক্যারেন আর্মস্ট্রং লিখেন- 'পশ্চিমা স্কলাররা ইসলামকে কুরুচিপূর্ণ প্রকাশ এবং মানহানিকর ধর্মাদর্শ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন এবং ইসলামের নবির ওপর মিথ্যা অপবাদ ও ইসলামকে তরবারির জোরে প্রতিষ্ঠিত মাযহাব হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে বারবার উল্লেখ করেছেন। '১২
ইসলামোফোবিয়া এবং পশ্চিমা শাসকরা
পশ্চিম এবং ইউরোপে; মিডিয়া, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি শাসক স্তরের লোকজন ইসলামোফোবিয়াকে বিস্তারের জন্য আগ বেড়ে অংশগ্রহণ করছে। আমেরিকায় তাদের অনেক উদাহরণ ব্যাপকতা লাভ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ফ্রান্স এমন একটি রাষ্ট্র; যেখানে সবচে বেশি মুসলমান (৬০ লাখ) বসবাস করে। মেরিন লতপন ওখানকার মুসলিমবিরোধী দল ফ্রন্ট ন্যাশনালে (প্রতিষ্ঠা; ৫ অক্টোবর, ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ) ২০১০ সালে বিবৃতি দেয় যে, 'যখন মুসলিমরা গলি এবং সড়কে ইবাদত করে তখন আমাদের এমন মনে হয় যে, নাৎসি প্রভাবাধীন জার্মান অঞ্চল দ্বিতীয়বার ফ্রান্স করায়ত্ব করবে।' প্রশাসনের মাধ্যমে তারা হিজাব এবং মুসলিম মুহাজিরদের আগমণের ধারাবাহিকতার ওপর অনুসন্ধান করে আসছে। ইসলামবিদ্বেষী ইউরোপীয় শাসকদের মধ্যে হল্যান্ডের ব্যবসায়ীরা অধিক প্রসিদ্ধ। ১৩
ইসলামোফোবিয়া এবং জাতিগত কুসংস্কার
কতিপয় বিজ্ঞজনের মতানুযায়ী ইসলামোফোবিয়া মুসলমান ও আরবদের বিপরীত জাতিগত কুসংস্কারের নাম। ধর্ম এবং জাতিগত কুসংস্কার অধিক হারে রয়েছে ডেনমার্ক, জার্মানি, হাঙ্গেরি, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস ও ইটালিতে। ১৪ পশ্চিমবিশ্ব এবং ইউরোপে মুসলমানদের জন্য others অর্থাৎ 'অপর' শব্দ ব্যবহৃত হয়।
ডক্টর মোসেলা তানকেরি (হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি) লিখেন- 'ইউরোপ ও পশ্চিম; ইসলাম এবং মুসলমানদের প্রথম থেকে শত্রু-জ্ঞান করে আসছে। মধ্যযুগ থেকে মুসলিমদের পশ্চিমবিশ্বে ভিন্ন নজরে দেখা হয়েছে। বিশেষত তুর্কি, গোত্র, ব্যক্তি এবং সেক্যুলারদের ভিত্তির ওপরই পশ্চিমারা এমন এক দৃষ্টিভঙ্গির ধারাবাহিকতায় ধাবমান; যার অধীনে ইসলামকে আদর্শহীন ট্যাগ লাগানো যায়। মুসলিমদের পরিচিতিকে উপযুক্ত আকাঙ্ক্ষা জ্ঞান করে অভ্যন্তরীণ শত্রুর দৃষ্টিতে দেখা হয়। এর পাশাপাশি পশ্চিমা সভ্যতার সাথে ইসলামকে বহিরাগত লড়াকু শত্রুও মনে করা হয়। ১৫
অস্ট্রেলিয়ায় মুসলমানদের বিমুগ্ধ ব্যবহার এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা; বিধর্মীদের মোকাবিলায় আনুমানিক তিনগুণ বেশি করতে হচ্ছে। শতকরা ৬০ জন লোকের ভাষ্য এমন ছিল যে, তাদের ইসলামোফোবিয়ার কারণে অনেককিছুর মোকাবিলা করতে হয়েছে। ১৬ এমনিভাবে এয়ারপোর্টে, বিমানে ওঠা-নামার সময়ও মুসলমানদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়। ২০১৫ সালের নভেম্বরে আমেরিকার অঙ্গরাজ্য শিকাগো থেকে ফিলাডেলফিয়াগামী বিমানের দুজন ভ্রমণার্থীকে সেই সন্দেহের জেরে বিমানে আরওহণে বাধা দেয় হয়। কেননা তারা আরবিতে কথোপকথন করছিল। যুক্তরাজ্য মুসলমানদের ওপর আক্রমণের হার ক্রমশ বৃদ্ধিই পাচ্ছে। ১৭ মুসলমানরা নিজেদের পশ্চিমা এবং ইউরোপের দেশগুলোতে দিনদিন শেকড়হীন, বিচ্ছিন্নই মনে করছে।
ভাষান্তর: জাবির মাহমুদ

টিকাঃ
[১] ক্রিস অ্যালেন, ইসলামোফোবিয়া, লন্ডন, ২০১০, পৃষ্ঠা- ৫
[২] অক্সফোর্ড ইংলিশ-উর্দু ডিকশনারী, শানুল হক হক্কী, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচি, ২০১৩, পৃষ্ঠা- ১২৩৩
[^১] The Muslim Policy in West Africa, 1910
[৪] শাহ্ মঈমুদ্দীন আহমাদ নদভী, মুহাজিরীন, দ্বিতীয় খণ্ড, দারুল মুসান্নেফীন, শিবলী একাডেমি আজমগড়, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা- ২৪৭
[৫] সায়্যিদ সাবাহুদ্দীন আব্দুর রহমান, সেলেবি জঙ্গ, দারুল মুসান্নেফীন, শিবলী একাডেমি আজমগড়, ২০০৫, পৃষ্ঠা- ৩৯
[৬] ক্যারেন আর্মস্ট্রং, দ্যা গার্ডিয়ান, ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৬
[৭] দ্যা ওয়াশিংটন পোস্ট, ৩ ডিসেম্বর ২০১৫
[৮] ক্যারেন আর্মস্ট্রং, ৭ ডিসেম্বর ২০০৬
[*] মন্ট গোমেরি ওয়াট, মুহাম্মাদ এ্যাট মাক্কা, লন্ডন, ১৯৫৩, পৃষ্ঠা- ৫২
[১০] দেখুন, www.news.org- দ্যা ফেয়ার অব ইসলাম
[১১] আব্দুর রশীদ মাতিন, দ্যা ওয়েস্ট ইসলাম অ্যান্ড দ্যা মুসলিম ইসলামোফোবিয়া অ্যান্ড এক্সট্রিমিজম
[১২] ক্যারেন আর্মস্ট্রং, মুহাম্মাদ: এ বায়োগ্রাফি অব দ্যা প্রোফেট, নিউইয়র্ক, ১৯৯২
[১৩] সায়্যিদ আসেম মাহমুদ, দুনিয়ায়ে মাগরিব মে বাড়তা হোয়া ইসলামোফোবিয়া, লাহোর
[১৪] নিউজ উইক ১৫ মে ২০১৫
[১৫] www.commongroundnews.org
[১৬] রোজনামা ইনকিলাব, নয়াদিল্লী, ১ ডিসেম্বর ২০১৫
[১৭] রোজনামা ইনকিলাব, নয়াদিল্লী, নভেম্বর ২০১৫

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 ফিলহাল ইসলামোফোবিয়া

📄 ফিলহাল ইসলামোফোবিয়া


পশ্চিমের দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান ইসলামভীতি মুসলমান-খ্রিস্টান ঐতিহাসিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। দুঃখজনকভাবে ইসলামভীতির প্রসারে সবচেয়ে বেশি উৎসাহী পশ্চিমের শক্তিশালী গণমাধ্যমগুলো। যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে আন্তর্জাতিক জায়নবাদী চক্র ও তাদের দোসররা। ইতোপূর্বে পশ্চিম সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিপজ্জনক লাল অক্ষ, চীনকে বিপজ্জনক হলুদ অক্ষ ও ইসলামি বিশ্বকে বিপজ্জনক সবুজ অক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। আফগানিস্তানে তালেবানের হাতে ঐতিহাসিক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে পশ্চিমের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগ্যান ঘোষিত দুষ্টরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের। উদীয়মান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনও পশ্চিমের সাথে একটা অলিখিত মীমাংসায় পৌঁছায়। ফলে পশ্চিমারা নতুন শত্রু হিসেবে ইসলাম ও মুসলমানদের মূর্তিমান করতে উঠেপড়ে লাগে। কারণ শত্রুবিহীন কোনো আদর্শ বা রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। দীর্ঘ নির্জীবতার পর ইতোমধ্যে নড়েচড়ে বসেছে মুসলিমবিশ্ব। স্কুল-কলেজ ও ভার্সিটির সর্বত্র শিক্ষিতমহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে ইসলামি চেতনার নব জাগরণ। গৌরবময় অতীতের মিশেলে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগা সমকালকে রূপায়ণের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে মুসলিম তরুণরা। পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যুগ যুগ ধরে মুসলিম বিশ্বে যেভাবে দখলদারিত্ব, নিপীড়ন-নির্যাতন ও বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন চালিয়ে এসেছে। তারই যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া এ মহাজাগরণ।
অবশ্য পশ্চিমের অনেক নিরপেক্ষ চিন্তক ও গবেষক ইসলাম নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ার একদেশদর্শী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন। এদেরই একজন ওয়াশিংটনের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির ধর্ম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ইসলামি স্টাডিজের প্রখ্যাত অধ্যাপক জন এস্পোসিতো [John Esposito]। তিনি “দি ইসলামিক থ্রেট : ফ্যাক্ট অর মিথ” শীর্ষক বইয়ে দেখিয়েছিলেন কীভাবে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে ইসলামভীতির মিথ তৈরি করা হয়।
এটি পশ্চিমের প্রাচীন ব্যাধি
পশ্চিমাদের মাঝে ইসলামকে ঘিরে আতঙ্ক একেবারেই নতুন কিছু না। পশ্চিমা গবেষক, রাজনীতিবিদ এবং ধর্ম পণ্ডিতদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে সেটাই দেখাব আমরা। আমি আমার "ইসলামি সমাধানের শত্রুগণ” শীর্ষক বইতে বিষয়টি সবিস্তারে আলোচনা করেছি। তাৎপর্যপূর্ণতার বিচারে এখানে সেই আলোচনার নির্বাচিত অংশটি তুলে ধরছি।
'ইসলামি পুনর্জাগরণের অন্ধবিরোধিতাকারীদের মধ্যে একেবারে প্রথম সারিতে আছে পশ্চিমা ঔপনিবেশিকরা। দেখুন প্রখ্যাত ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ H.A.R. Gibb (১৮৯৫-১৯৭১) ইসলামি পুনর্জাগরণ আন্দোলন নিয়ে কি ভয়াবহরকম শঙ্কিত। তিনি বলছেন, “ইসলাম কেবলই কিছু ধর্মাচারের সমষ্টি নয় বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা। এ সভ্যতার বিপজ্জনক দিকটি হলো এটি স্থান ও কালের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো মুসলিমজাতিকে একত্রিত করে রাখে। যা একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক অক্ষ তৈরিতে দারুণ সহায়ক। যে অক্ষের উত্থানের মানে হলো ইউরোপের জগতবিচ্ছিন্নতা ও পরাজয়। কারণ ভৌগোলিকভাবে ইউরোপ চারদিক থেকে মুসলিম ভূখণ্ড বেষ্টিত”। ১৮
পাশ্চাত্য বেশ ভালো করেই জেনেছে যে, ইসলাম একটি সর্বব্যাপী বিপ্লবী আদর্শ। যা ব্যক্তির জন্মকাল থেকে মৃত্যু অবধি ব্যপ্ত। এ আদর্শ ব্যক্তিকে অন্য কোনো জাগতিক কিংবা ধর্মীয় মুবাদ- হোক তা প্রাচ্যদেশীয় কিংবা পাশ্চাত্যদেশীয়, গ্রহণ করতে অনুমতি দেয় না। ইসলাম তার অনুসারীেেদর এ সম্পর্কে গর্বিত হতে শিক্ষা দেয়। দীক্ষা দেয় শক্তি অর্জন ও আগ্রাসী শত্রুর হিংসা প্রতিরোধক জিহাদের। যা মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য ও পুণ্যকাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পাশ্চাত্য এও জেনেছে যে, মুসলিমজাতি জন্মভূমি, ভাষা ও বর্ণে যতই আলাদা হোক না কেন, ভ্রাতৃঐক্য লঙ্ঘন এখানে অমার্জনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। এ ঐক্যের ভিত অনেক গভীরে প্রোথিত। এটি মুসলমানদের আবেগ অনুভূতি ও চিন্তাজগতকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে। বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী সব সীমাবদ্ধতা ও পার্থক্য এর উত্তাপে দ্রবীভূত হয়।
ইসলামের বিপুল সুপ্ত শক্তি ও ভ্রাতৃচেতনা নিয়ে পাশ্চাত্যের শঙ্কার সর্বাধিক প্রাসঙ্গিক উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি হলো ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশ মন্ত্রকের পরামর্শক ও বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ গ্যাব্রিয়েলের Gabriel Hanotaux।
এই লেখকের একটি নিবন্ধ ১৯০০ সালে কায়রোর আল মুয়াইয়াদ পত্রিকায় অনূদিত হয়ে ছাপা হয়। এটা আরববিশ্বে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। মিসরের তৎকালীন প্রধান মুফতি মুহাম্মাদ আবদুহু গ্যাব্রিয়েলের নিবন্ধের প্রান্তিকতা ও ভ্রান্তি তুলে ধরে নিরপেক্ষ সমালোচনা করেছিলেন।
গ্যাব্রিয়েল তার নিবন্ধে দেখিয়েছেন, কীভাবে এশিয়ার মুসলিমরা তেজোময় দ্রুততায় পুরো উত্তর আফ্রিকা বিজয় করেছিল। তিনি তুলে ধরেছেন ইসলাম ও খ্রিস্টবাদের মাঝে বিরাজমান দীর্ঘ সংঘাতের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও ঊনবিংশ শতকে ইসলামের ওপর খ্রিস্টবাদের আধিপত্য অর্জনের বয়ান। তবু তিনি শঙ্কিত কারণ ইউরোপকে একদিকে মরক্কো অন্যদিকে কনস্টান্টিনোপলের [ইস্তাম্বুল] মতো মুসলিম ভূখণ্ডগুলো ঘিরে আছে। তিউনিসিয়া, আলজেরিয়ার মতো ফরাসি উপনিবেশগুলো তো বটেই, খোদ ফ্রান্সেও এক্ষণে বিপুল সংখ্যায় মুসলমান বসবাস করছে। ইসলাম আজ পৃথিবীব্যাপী বিরাজমান। মরক্কো, লিবিয়া, মিশর আর যীশুর স্মৃতিসম্পদ ও মানবতার উৎসভূমি জেরুসালেমেও আজ পতপত করে উড়ছে ইসলামের গৌরব পতাকা। শুধু কি তাই! সুদূর চীনেও পৌঁছে গেছে ইসলামের অনুপম আদর্শ। সেখানে আজ ২ কোটি মুসলমানের বসবাস। মুসলমানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনুযায়ী এ সংখ্যা সামনের বছরগুলোতে দশ কোটিতে পৌঁছাবে। ১৯
এটি মোটেই আশ্চর্যের বিষয় নয়। কারণ পৃথিবীর এমন কোন স্থান নেই যেখানে ইসলাম পৌঁছেনি। এটিই একমাত্র ধর্ম যাতে কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি ছাড়াই লাখ লাখ মানুষ গ্রহণ করেছেন। আজও অন্য যেকোনো ধর্মের চেয়ে ইসলাম সর্বাধিক প্রাসঙ্গিক ও জীবন্ত। তদুপরি এই ধর্ম থিতু হয়ে আছে খ্রিস্টবাদের স্মৃতিভূমি কনস্টান্টিনোপলে। ২০ খ্রিস্টান জাতিগুলো দুর্ভেদ্য এ নগরী রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। হারিয়েছে।
ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীরের নিয়ন্ত্রণ। এভাবে পশ্চিমের দেশগুলো একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
ইসলামি ঐক্যের শক্তি
গ্যাব্রিয়েল আরও বলেছেন, ইসলাম পৃথিবীর সকল মুসলমানকে একই সূত্রে গেঁথেছে। এটি তাদের চিন্তা ও কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। পৃথিবীর সুদূর প্রান্তের মুসলমানরা মনে মনে স্বপ্ন লালন করেন পবিত্র গৃহ কাবার সান্নিধ্য পাওয়ার। জমজমের স্বর্গীয় পানীয় আর রুপোর ফ্রেম বাধানো পবিত্র কালো পাথরের ছোঁয়া তাদের হৃদয়ে ধর্মীয় ভালোবাসার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বালায়। লাখো উপাসক২১ একজন মাত্র ইমামের পেছনে সারিবদ্ধ হয়ে নীরবে শ্রবণ করে কুরআনের এই বাণী, 'আল্লাহর নামে শুরু করলাম যিনি পরম করুণাময় ও অসীম দয়াময়। সমবেত স্বরে সমস্ত লোকজন বলে ওঠে 'আল্লাহু আকবার' (আল্লাহ মহান)।' অতঃপর পরম শ্রদ্ধায় লুটিয়ে পড়ে আল্লাহর স্মরণে।
তিনি আরও বলছেন, মনে করবেন না আমরা ফরাসিরা তিউনিসিয়া ও আলজেরিয়ার পরাধীন মুসলমানদের জগতের অন্য মুসলমানদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছি কিংবা তাদের স্বাধীনচেতা মনোভাব ও সংহতি নষ্ট করতে পেরেছি। আমাদের কলোনীগুলো যদিও ইসলামি ভূখণ্ড না কিন্তু মুসলিম পণ্ডিতরা এসব অঞ্চলকে যুদ্ধকবলিত ঘোষণা করেছে। যা তাদের আত্মচেতনা অটুট রেখেছে, হৃদয়ে জাগরুক রেখেছে ইসলামের প্রতি অসম্ভব ভালোবাসা। ইসলাম আজও তাদের বড়ো অংশটির কাছে সর্বোচ্চ প্রিয় ও শ্রদ্ধেয়। আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন মুসলমানদের অবস্থা সেই সিংহীর মতো যে চরম ক্রুদ্ধ হয়ে বন্দি শাবকের খাঁচার চারপাশে ঘুরঘুর করে। হতে পারে খাঁচার বুনন অসম্পূর্ণ কিংবা দুর্বল।
সবশেষে গ্যাব্রিয়েল উপসংহার টেনে বলেন, উপর্যুক্ত আলোচনা একথাই নির্দেশ করে যে, বিপর্যস্ত কিন্তু অদম্য এ জাতির সংহতি ও চিন্তা-চেতনার প্রোজ্জ্বল্য আমাদের জন্য হুমকিই হয়ে আছে।২২
গ্যাব্রিয়েলের এ নিবন্ধটি বেশ খোলামেলাভাবে আমাদের সামনে ইসলামকে ঘিরে পাশ্চাত্যের ভয়ংকর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছে। বিশ্বাস ও আচারকেন্দ্রিক মুসলিম ভ্রাতৃঐক্য পাশ্চাত্যকে কতটা ভাবিত করে তাও সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। গ্যাব্রিয়েল কথাগুলো অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে বললেও পশ্চিমের অবস্থান যে একদমই বদলায়নি, তা-ই প্রমাণ করে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমে ঘটমান ও ক্রমবিস্তারমান মুসলিমবিরোধী হিংসাগুলো।
ধর্মপণ্ডিতদের ইসলামভীতি
খ্রিস্টান মিশনারিদের মুখপত্র 'দি ইসলামিক ওয়ার্ল্ডের' একজন লেখক ইউমান লিখছেন, পশ্চিমা বিশ্বের কিছুটা ভীত হওয়া উচিত। কারণ মক্কায় আবির্ভূত হওয়ার পর ইসলাম কখনোই সাংখ্যিকভাবে দুর্বল হয়নি বরং মুসলমানদের সংখ্যা হু হু করে বেড়েছে। আমরা আমাদের অব্যাহত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কখনোই পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে পারিনি। আদতে ইসলাম কেবলই একটি ধর্ম নয়, এটি একটি লেলিহান শিখা। যার প্রজ্জ্বালক জিহাদ।
ধর্মযাজক ক্যালহাউন সিহোন লিখেছেন, ইসলাম তামাটে বর্ণধারী জাতিগুলোর মাঝে মহাজাগরণের সৃষ্টি করেছে। তারা আজ ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি পেতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আমাদের মিশনারিদের লক্ষ্য হলো ইউরোপের সভ্যতাকে হাইলাইট করে যুবসমাজকে আকৃষ্ট করা এবং ইসলামি শক্তিগুলোর মৌলিক শক্তি বিনষ্ট করা।
প্রফেসর লরেন্স ব্রাউন তার “ইসলাম অ্যান্ড দ্য মিশনারি” বইতে লিখেছেন, ঐক্যবদ্ধ একটি আরব রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা যদি ঘুরে দাঁড়াতে পারে তবে এটি পুরো পৃথিবীর জন্য বিপজ্জনক অভিশাপ কিংবা অনন্য আশীর্বাদ হতে পারে। আর যতদিন তারা শতধাবিচ্ছিন্ন হয়ে থাকবে ততদিন পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহে তাদের কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকবে না। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত তার অন্য একটি বইতে লিখেছেন, "ইসলাম তার সুপ্ত প্রান্তবন্ততা ও সম্প্রসারণশীলতার কারণে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে”।
ব্রাউনের বক্তব্যগুলো একেবারেই পরিষ্কার। মন্তব্য করার প্রয়োজন নেই। এটি পাশ্চাত্যের গভীরে প্রোথিত ইসলামভীতির প্রতিই নির্দেশ করে। ইসলামের মধ্যপন্থা, ন্যায়নিষ্ঠতা, প্রাণোচ্ছলতা, ঐক্যচেতনা, সম্প্রসারণ ধর্ম, স্বাধীনচেতা মনোভাব ও জিহাদের বাধ্যবাধকতা পাশ্চাত্যের দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ।
উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলন ইসলাম পরিচালিত ছিল
ইসলামের প্রচার পদ্ধতি ও নব উজ্জীবনের কারণে পাশ্চাত্য শঙ্কিত। কারণ ইতোমধ্যেই সবগুলো মুসলিম দেশে দখলদার পশ্চিমারা রীতিমত নাকানি-চুবানি খেয়েছে। যদিও এসব আন্দোলন সংগ্রামের ফল সেক্যুলাররা লুটেছে কিন্তু আন্দোলনগুলো ইসলামপন্থিরাই করেছে। মিসরে নেপোলিয়নের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল, এর নেতৃত্বে ছিলেন আল আজহার বিশ্ববিদ্যলয়ের সম্মানিত আলিমরা। ফরাসিরা আজহারকে ঘোড়ার আস্তাবল বানিয়ে এর প্রতিশোধ নিয়েছিল। সুদানে ব্রিটিশদের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল, এর অগ্রভাগে ছিলেন মুহাম্মাদ আল মাহদি। যিনি ছিলেন একজন মহান আলিম। মিত্রশক্তি ও গ্রিসের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তুরস্কে যে আন্দোলন হয়েছিল, তা আগাগোড়া ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের আন্দোলন ছিল। যদিও এর ফলটা ভোগ করেছে কামালপন্থি সেক্যুলাররা। লিবিয়ায় ইতালির দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল, এর নেতৃত্ব দিয়েছেন “মরু সিংহ” উমার আল মুখতার। যিনি ছিলেন প্রখ্যাত আলিম।
মরক্কোর পল্লি অঞ্চলে স্পেনবিরোধী যে গণবিপ্লব হয়েছিল, তার নেতৃত্বে ছিলেন মরক্কোর গুরুস্থানীয় আলিম আবদুল কারিম আল খততাবি। পল্লি আন্দোলন দমাতে দখলদার স্পেন পুরো ইউরোপের সাহায্য নিয়েছিল। ধর্মযাজক উইলিয়াম ক্যাশ তার "ইসলামিক ওয়ার্ল্ড ইন রেভুল্যাশন” গ্রন্থে আবদুল কারিম খততাবির বিপ্লব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বেশ শ্লেষ নিয়ে বলেন, প্রাচীন আরব্য চেতনাধারী গ্রামীণ বিদ্রোহীদের সাথে লড়তে গিয়ে স্পেনীয়রা মরক্কোর সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ নগরীর নিয়ন্ত্রণ হারায়। উপকূলের সিউটা ও মেলিলার মতো অল্প কটি নগরীই শুধু বাকি ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম কোনো ইউরোপীয় বাহিনী মুসলমানদের কাছে হেরেছে। অবশ্য তুর্কিরাও গ্রিসকে এশিয়া মাইনর থেকে বিতাড়িত করেছে।
আলজেরিয়ার সফল স্বাধীনতা আন্দোলন, যাতে ১৫ লাখ মুসলমান শহিদ হয়েছেন। এ আন্দোলনের মুজাহিদদের মূল চেতনা শক্তি ছিল ইসলাম। সে সময় ফ্রান্স ও তার দোসররা স্লোগান দিত- "আলজেরিয়া ফরাসি"। আর মুজাহিদরা প্রতিবাদী স্লোগান ওঠাতেন- "আলজেরিয় জাতি মুসলমান, আরব্যবোধ তার চেতনা"। যেটি ছিল স্বাধীন আলজেরিয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা শাইখ ইবনু বাদিস প্রদত্ত। ২৩
রাজনীতিবিদদের ইসলামভীতি
সাবেক ফরাসি প্রধানমন্ত্রী Guz Mollet বলেছেন, মরক্কোর ক্রমবিস্তৃত ইসলামি আন্দোলন আমাদের সামাজ্যের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। ফ্রান্সের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী Geovrges Bidult ঘোষণা করেছিলেন, আমি কখনোই চাঁদকে ক্রুশের ওপর বিজয়ী হতে দেব না। ফরাসি লেখক ও রাজনীতিবিদ Farancis Jeanson তার L'Algérie hors বইতে লিখেছেন, '১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া আলজেরীয় স্বাধীনতা আন্দোলন শুধুই ধর্মীয় বা জাতিগত কোনো আন্দোলন নয়। এটি নিপীড়ক শাসকের পীড়ন থেকে মুক্তির আন্দোলন। হ্যাঁ, ইসলাম আলজেরীয় মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রেরণা। আলজেরীয়রা প্রথম দিনেই বুঝেছিল ফরাসিরা তাদের মুসলিম পরিচয় মুছে দিতে চায়। সুতরাং মুক্তি পেতে হলে ইসলামকে সাথে করেই মুক্তি পেতে হবে।' ২৪
পশ্চিমা রাজনীতিবিদরা প্রায়ই কোনো ধরনের রাখঢাক না রেখেই ইসলাম নিয়ে নিজেদের শঙ্কার কথা বলছেন। কারণ মুসলিম দেশগুলোতে সামাজ্যবাদ ও ক্রুসেডের বিরুদ্ধে যতগুলো আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে সবগুলোর পেছনে সক্রিয় ছিল ইসলামি চেতনা। প্রখ্যাত ইহুদি ঐতিহাসিক বার্নার্ড লুইস রচিত 'দ্য মিডল ইস্ট: ব্রিফ হিস্টোরি অব লাস্ট ২০০০ ইয়ার্স” বইতে এসবের বিস্তারিত বিবরণ পাবেন।
আফগান জিহাদ
ইসলামি বিশ্বে সর্বশেষ আলোচিত প্রতিরোধ আন্দোলন আফগানিস্তানের সোভিয়েতবিরোধী গণজিহাদ। লালবাহিনীর সর্বাত্মক স্থল ও আকাশ হামলা উপেক্ষা করে ২০ লাখ আফগান জীবন বিলিয়ে অর্জন করেছিলেন স্বাধীনতা। পরাভূত হয়েছিল হানাদার লালবাহিনী। পতন হয়েছিল তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের।
পশ্চিমীকরণের সাফল্য সত্ত্বেও উদ্বিগ্ন পশ্চিমারা
পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো ইসলামি বিশ্বে পশ্চিমাকরণের যে এজেন্ডা হাতে নিয়েছিল তা আজ অনেকাংশেই সফল। শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনের সর্বত্র এর অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাব। এতদসত্ত্বেও পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তি পর্যবেক্ষকরা ইসলামি শক্তিগুলোর আকস্মিক উত্থানের বিষয়ে শঙ্কিত।
ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ H.A.R. Gibb লিখছেন, ভয়ংকর ও বিস্ময়করভাবে উত্থান ঘটছে ইসলামি আন্দোলনগুলোর। পর্যবেক্ষকদের সব ধারণা ভণ্ডুল করে দিয়ে যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে ইসলামি আন্দোলনগুলো। সালাহুদ্দিন আইয়ুবির মতো যোগ্য নেতৃত্বেরই শুধু ঘাটতি।২৫
জার্মান লেখক হেনরি কুস্তার ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত পলিটিক্যাল ইসলাম২৬ শীর্ষক নিবন্ধে লিখেন, “মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ঘটনাপ্রবাহে ইসলাম কতটা প্রভাব বিস্তার করে আছে তা পাশ্চাত্যের কাছে সুস্পষ্ট নয়। কিন্তু আমরা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, এ অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহ অনেকাংশেই ইসলাম নিয়ন্ত্রণ করে। এশিয়া ও আফ্রিকায় ঘটমান নানা ঘটনার পেছনে আছে মুহাম্মাদি বিশ্বাস। এটি বাস্তব সত্য, যদিও পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবীরা তা মানতে না চান”।
সমসাময়িক ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ অ্যান্টনি নাটিং তার “দি অ্যারাব” বইতে লিখেছেন, “সপ্তম শতকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সংগঠিত হওয়ার পর থেকে আরবরা ক্রমসম্প্রসারিত হয়েছে। যা এখনও থেমে নেই। পশ্চিমা বিশ্বের উচিত ইসলামকে শক্তিশালী ও স্থায়ী শত্রু হিসেবে বিবেচনায় নেয়া। যা ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করছে। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিৎ নয় মুসলমানরা তেরো শতাব্দী সবল-দুর্বল সর্বাবস্থায় খ্রিস্টান বাহিনীর মোকাবেলা করেছে”। ২৭ এ হলো মুক্তচিন্তার ধ্বজাধারী পশ্চিমের রাজনীতিবিদ, চিন্তক ও পর্যবেক্ষকদের উপলব্ধি।
ইউরোপের বর্তমান বাস্তবতায় ইসলামভীতি
এ তো মোটামুটি পুরনো কিছু বক্তব্য। যদিও ইউরোপের বর্তমান বাস্তবতায় এগুলো নতুন মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এইতো সেদিন ২০১০ সালের শেষদিকে সুইজারল্যান্ডের চরম ডানপন্থি খ্রিস্টান রাজনৈতিক দল সুইস পিপলস পার্টি দেশটিতে মসজিদের মিনার নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞার আইন চালু করার লক্ষ্যে এক গণভোটের আয়োজন করে। ৫৭ শতাংশ সুইস জনগণ তাদের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। এ ঘটনা ইউরোপে ইসলামবিদ্বেষী মনোভাবের তীব্রতা ফুটিয়ে তুলেছে। গণভোট আয়োজনকারীদের যুক্তি ছিল মুসলমানরা আজ মিনার নির্মাণ করে সাংস্কৃতিক প্রভাব বাড়াচ্ছে তো কাল শরিয়াহ আইনের দাবি তুলবে।
ওআইসি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের কর্মকর্তারা এর নিন্দা জানিয়েছেন। ভ্যাটিকান এ ফলাফল নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিকদের অভিজাত সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলারস এক বিবৃতিতে গণভোট আয়োজন নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে মুসলমানদের ইসলামি দাওয়ার পরবর্তী পর্যায়ের মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানায়। পাশাপাশি মুসলমানদের নিজেদের মধ্যকার মতপার্থক্য ও ভেদাভেদ ভুলে ধৈর্যের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
পুরো বিষয়টি ইউরোপে তীব্র ইসলামবিদ্বেষের সৃষ্টি করেছে। গণভোটের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হল্যান্ডের কট্টর ডানপন্থিরা তাদের দেশে অনুরূপ গণভোট আয়োজনের দাবি জানায়। অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টি ও ফ্রান্সের ফ্রন্ট ন্যাশনালও একই পথে হাঁটছে।
ইউরোপে খ্রিস্টবাদী চরমপন্থার উত্থান নিঃসন্দেহে মুসলিম তরুণদের ক্ষুব্ধ বরং অনেক ক্ষেত্রে খ্রিস্টবাদের প্রতি বিদ্বিষ্ট করে তুলবে। তারা বিশ্বাস করবে যে, পাশ্চাত্যের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ফাঁকা বুলি ছাড়া কিছুই নয়। সশস্ত্র পদক্ষেপ ও শক্তি প্রয়োগই এর একমাত্র সমাধান। তবু আমরা আশা হারাতে চাই না। আমরা আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে চাই। এটিই ইসলামের মহান শিক্ষা। বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেই ইসলামোফোবিয়ার মোকাবেলা হোক। ২৮
ভাষান্তর: হাবিবুল্লাহ বাহার

টিকাঃ
[১৮] আল ইত্তিজাহাতুল ওয়াতানিয়্যা; ডক্টর মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ হুসাইন [২/১৯৮]
[১৯] এটি ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রকের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দেয়া তথ্য। আরও কয়েক দশক পূর্বে প্রখ্যাত লেবানিজ চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদ আমির শাকিব আরসালান চীনের মুসলমানদের সংখ্যা পঞ্চাশ লাখ উল্লেখ করেছেন।
[২০] গ্যাব্রিয়েলের কথার সাথে যোগ করে বলতে চাই, আমরা শুধু কনস্টান্টিনোপলেই নই, আছি আলবেনিয়া, কসোভো ও বসনিয়ায়। এছাড়া আরো অনেকগুলো ইউরোপীয় দেশে মুসলমানদের সংখ্যা একেবারেই ফেলে দেয়ার মতো না।
[২১] হজ আমাদের সংহতির অনন্য নিদর্শন। ২০০৯ সালে ভয়াবহ ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির মধ্যেও ৩০ লাখ মানুষ এতে অংশ নিয়েছে
[২২] তারিখুল উস্তাযিল ইমাম [২/৪০২-৪২৪), আল ইত্তিজাহাতুল ওয়াতানিয়্যা ফিল আদাবিল মুয়াসির, ডক্টর মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ হুসাইন (২/৩৪৭]
[২৩] The Moslem World in Revolution by W.Wilson Cash, London 1928, P-5
[২৪] L'Algérie hors de loi bz Farancis Jeanson, 267-268
[২৫] আল ইত্তিজাহাতুল ওয়াতানিয়‍্যা, ২/২১৬
[২৬] রাজনৈতিক ইসলাম শিরোনামটি ইউরোপীয়দের সৃষ্ট বিভ্রান্তি। যা সাইদ আশমাভির মতো অরাজনৈতিক কোনো ভাগ নেই। ইসলাম একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ধর্ম যাতে রাজনীতিসহ সকল পশ্চিমা দাসরা ব্যাপক প্রচলন দেয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আদতে ইসলামে রাজনৈতিক বিষয়ের সহজ সুন্দর সমাধান রয়েছে
[২৭] আল গযউল ফিকরি; প্রফেসর জামাল কুসক, পৃ-২১
[২৮] বিষয়টির সাথে সম্পৃক্ত কিছু আলোচনা ফিকহুল জিহাদ বইয়ের নবম সংযুক্তিতে আছে। আগ্রহী পাঠক দেখে নিতে পারেন।

📘 বিহাইন্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া > 📄 কল্পিত ইসলামোফোবিয়া এবং ভয়ের পলিটিক্স

📄 কল্পিত ইসলামোফোবিয়া এবং ভয়ের পলিটিক্স


১৪ মার্চ ২০১৬। ভিয়েনার উইনার এভিয়েশনে চলছে রিপাবলিকানদের নির্বাচনি প্রচারণা। প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশে সাংবাদিক এন্ডারসন কপারের ছুড়ে দেয়া প্রশ্ন- 'যদি ইসলাম পশ্চিমাদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে' এর জবাবে সে বলে, “আমার ধারণা মুসলিমরা আমাদের ঘৃণা করে। তাতে ভয়ংকর রকমের ঘৃণা রয়েছে। আমাদের হতে হবে সজাগ ও সতর্ক। মুসলিম ও আমেরিকার প্রতি ঘৃণা পোষণকারী ব্যক্তিদের আমরা এ দেশে প্রবেশাধিকার দিতে পারি না।"
এভাবেই বিভিন্ন টকশো ও টিভি সংবাদে ট্রাম্প প্রদত্ত তথ্যাবলি বেতার ও জনজীবনে ইসলামোফোবিয়ার পরিব্যপ্তি ঘটায়। সেখানে মিডিয়ার সম্প্রচারে ও প্রকৃত সত্য গ্রহণের পরিবর্তে আরও অমার্জিত-নকল গ্রহণে আর আদর্শিক ভদ্র বর্ণবাদের চাল চালার প্রয়োজনে তারা বারবার কর্তৃত্ব ফলিয়ে যাচ্ছে।
মিডিয়ার সম্প্রচার ও জাতীয় আলাপন ইসলামোফোবিয়ার এমন এক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে, যা ইসলাম, মুসলমান এমনকি সামাজিক চিন্তা-চেতনাকে প্রভুত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে ফেলে। পশ্চিমা দেশগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই ইসলাম ও মুসলিম সম্পর্কে মনগড়া গল্প-কাহিনি নির্মাণাধীন রয়েছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা ক্রুসেডে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কার উদ্রেক করে। এই অলীক উপাখ্যানে ইসলাম ও মুসলিমদের মনগড়া ও কল্পিত এক ছাঁচ ও কাঠামোতে বিবেচনা করা হয়। ফলে তারা কখনো স্বাধীনভাবে আলাপচারিতার কিংবা এই মনগড়া গোলকধাঁধার বাইরে যাওয়ার অনুমোদন পায় না। প্রকল্পিত, স্বাপ্নিক ও সূচিত এমন এক অভ্যন্তরীণ ক্লোজ সার্কিটব্যবস্থায় ইসলাম ও মুসলিমদের কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, যা সর্বদাই তাদের চিন্তার দিকে ফিরে আসে। ইসলামকে কোণঠাসা করতেই তাদের ইসলামোফোবিয়া ছড়ানোর এই প্রকল্প। একটি চলচ্চিত্র অলীক স্থান, সময় ও মানবিক মিথস্ক্রিয়া তৈরি করে, যা একবার পেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই (সমাজে) নির্মিত বিষয়ে আলোচনার কাঠামো তৈরি করতে শুরু করে। জর্জ লুকাস প্রতিষ্ঠিত Star Wars অপেরার সমৃদ্ধ, অবাস্তব ও অলীক চলচ্চিত্রগুলোর মতো ইসলামোফোবিয়ার জালও সফলভাবেই বিছানো হয়েছে। কল্পনাসই ইসলামোফোবিয়া গঠনে নিপুণ হাতে তৈরি হয় বিভিন্ন চরিত্র ও উপজীব্য দিয়ে বিন্যস্ত চলচ্চিত্র, তা দেখার প্রভাবে মানুষজন প্রাত্যহিক জীবনে লাভ করে ইসলামোফোবিয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা। সংবাদ ও সামাজিক নেতাদের ইচ্ছামতে নিপুণভাবে পুনর্গঠিত কাল্পনিক চিত্রায়ণে প্রাত্যহিক জীবনকে প্রভাবিত করে।
অধিকন্তু যখন এক মুহূর্তের জন্য বা সম্পূর্ণ ত্রুটির মধ্যে উপাখ্যানটি কল্পিত আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয় তখন একে প্রভাবশালী আদর্শিক (পশ্চিমা আদর্শ) বলে চালানোর পরিবর্তে কল্যাণকর প্রত্যাশায় নির্মিত বলে ইঙ্গিত করা হয়। আর ঠিক তখনই মুসলমানদের ভালো-মন্দ ফ্রেমে আবদ্ধ করার সময় ব্যতিক্রমী কণ্ঠগুলো পশ্চিমা অদর্শকে superior হিসেবে প্রতিফলিত করে। ফলে ইসলামোফোবিয়ার কাল্পনিক রূপ চূড়ান্ত সফলতার মুখ দেখে।
কাল্পনিক এ ইসলামোফোবিয়া ইসলাম ও মুসলিমদের এক সংকুচিত ফ্রেমে আবদ্ধ করে দেখে যা নেতিবাচক আর কেবল সহিংস ও সন্ত্রাসবাদের সম্পৃক্ততায় গড়ে উঠেছে। শুরু থেকে নির্মিত ছাঁচে সবকিছু বিবেচিত হওয়ায় এবং একইভাবে মেধা-মনন নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় ইসলামোফোবিয়ার সৈনিকদের নিকট বিভিন্ন ঘটনা, বর্ণনা ও তথ্যগুলোর প্রকৃত রূপ যেন অবান্তর কিছু (দেখেও দেখে না ভাব)। তার মন-মগজ কিছুতেই সেই রূপকে গ্রহণ করতে রাজি হয় না। ক্রীড়াবিদদের যেমনিভাবে প্রতিযোগিতা বা খেলার পূর্বে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, যাতে খেলা একবার শুরু হলে তারা তা কার্যকর করতে পারে। ইসলামোফোবিয়ার ক্ষেত্রেও ঠিক একই পদ্ধতি অনুসৃত হয়; ইসলাম ও মুসলমানদের প্রশ্নে তারা সমাজে পূর্বশর্ত তৈরি করে নেয়।
১১ সেপ্টেম্বর ২০০১-এর পর সহসাই 'তারা কেন আমাদের ঘৃণা করে?' প্রশ্নটি পুনরুত্থাপিত হচ্ছিল মিডিয়া এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দ্বারা। ফলত আমেরিকান জনগণ সন্ত্রাসী এ হামলার কষ্ট-বেদনায় ক্লিষ্ট হচ্ছিল। প্রশ্নের মধ্যে সমস্যা খোঁজা আর তা নীতির আওতার বাইরে রাখা কোনো সদুত্তর হতে পারে না। তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্নতার ফলে এ সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে মানুষের মনে মুসলমানদের প্রতি সন্দেহ উসকে দেয়। তারা মুসলমানদের একটি গ্রুপ হিসেবে চিত্রিত করে। যা সংবাদমাধ্যম CNN-এর ইন্টারভিউতে সংখ্যালঘুদের (মুসলমানদের '১.৬ বিলিয়ন মুসলিম') দোষারোপের মাধ্যমে ট্রাম্প পুনরুজ্জীবিত করে।
যদি এক মুহূর্তের জন্য CNN-এ প্রদত্ত বিবৃতি সত্য বলে ধরে নেই; তবে জিজ্ঞেস করা যাক, প্রকৃত ইহুদিদের এ ঘটনার প্রতি কী প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত ছিল? আর ধর্মান্ধতার গভীরে প্রোথিত এমন বিষয়ে একজন নির্বাচনি প্রার্থীর অকপট স্পর্ধার সাথে এমন দাবি তোলা কীভাবে সম্ভব! ২৯
এ বিষয়ে কারো থেকেই আমি উত্তর প্রত্যাশা করি না; এমনকি সঠিক সত্যটি জানার জন্য ও সমাধানের জন্য ট্রাম্প থেকেও না। কারণ তার মননও ইসলামোফোবিয়ার বেড়াজালে আবদ্ধ; যেখানে ধর্মান্ধতা, বর্ণবাদ আর তর্জন-গর্জন ছাড়া বাস্তব কিছুই নেই।
ভয়ের পলিটিক্স ও ব্যালটবক্সের দর্শন
মুসলমানদের প্রতি আমেরিকানদের নেতিবাচক আচরণ সর্বদা তুঙ্গে থাকে এবং এ প্রবণতা সুদূর ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো-এই ইসলামোফোবিয়ার সাথে ব্যালটবক্সের সম্পর্ক ও সংযোগ। ইউরোপ-আমেরিকার রাজনীতিবিদরা ইসলাম ও মুসলিমদের মধ্যে ভীতি ও অস্থিরতা ছড়ানোর মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার নতুন মন্ত্র। অর্থনৈতিক ব্যর্থতার জাঁতায় পিষ্ট, আউটসোর্সিংয়ের দরুন কর্পোরেট অধঃপতন, বিপুল ঋণে জর্জরিত, উন্মুক্ত যুদ্ধ আর শ্রেয়তর ভবিষ্যতের আশা হারানো অবসন্ন মানবতার নিকট বাণিজ্য ও বিকিকিনিতে ভয় একটি সহজসাধ্য ও উপযুক্ত পণ্য।
এক সময় আমেরিকান কর্পোরেট অভিজাতরা মধ্যবিত্তদের নিশ্চিহ্ন করে একটি অভূতপূর্ব স্থায়ী বৈষম্য তৈরি করেছিল। তাদের নির্মিত এ স্বপ্নিল ভুবনে মুসলমানরা তাদের ভাবনায় সবচে ভয়ানক বুগিম্যান। যেন সাজানো এ বাগানটিকে তারা তছনছ করে ছাড়বে।৩০
চায়না, ম্যাক্সিকান অভিবাসী, আফ্রিকান-আমেরিকান, মহিলা ও মুসলিমসহ আরও কিছু নাম উল্লেখ করে মধ্যবিত্তদের অধঃপতন ও কল্পনানুসারে দেশি শক্তি হ্রাসের দায় তাদের ঘাড়ে চাপায়। আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের গ্রেট আমেরিকা এগেইন' একটি ফাঁকা বুলি। কেননা আমেরিকান অভিজাতদের সাথে দেশি বিষয়াবলি নিশ্চল হয়ে থাকার প্রকৃত কারণ তার বর্ণবাদী ও বৈষম্যপূর্ণ প্রচারণার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় না।
ইতোপূর্বেও নির্বাচনগুলোতে রিপাবলিকানদের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রচারণা কমিয়ে আনা হয়েছিল একটি প্রতিযোগিতার জন্য। যার উপজীব্য ছিল, কে মুসলিমদের প্রতি অধিক বর্ণবাদী হতে পারে, অভিবাসী ও আফ্রিকান- আমেরিকানদের আন্তঃশহরে সহিংসতার অপবাদে কোণঠাসা করতে পারে। আমেরিকায় যেকোনো ভুলের জন্যই ইসলামোফোবিয়া আর বর্ণবাদকে হাতিয়ার করে মায়াকান্নার রব ওঠে। মাত্রাতিরিক্ত বর্ণবাদ নতুন করে পুনরুত্থিত হচ্ছে। আর 'আমেরিকাকে শক্তিশালী করা'র গূঢ়ার্থ হচ্ছে নাগরিক অধিকার, ধর্মীয়-সামাজিক বৈষম্য পূর্বের ন্যায় পুনরায় গ্রহণযোগ্য করে তোলা।
আমরা এমন এক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছি যখন কারো গাড়ি যদি বিকল হয় তা যেন হওয়ারই ছিল। কেননা হয়তো কোনো মুসলমান বা ম্যাক্সিকান ইঞ্জিনে লুকিয়েছিল! যদি কারো স্বামী অথবা কারো স্ত্রী রাগান্বিত হয়, তা যেন পূর্ব নির্ধারিত বিষয়, কেননা একজন মুসলমান ফ্রিল্যান্সার তার জব ছিনিয়ে নিয়েছে বা কোনো ম্যাক্সিকান কম পারিশ্রমিকে তার কাজ হরণ করেছে। যদি কেউ কাজে ব্যর্থ সমাপ্তির সম্মুখীন হয় তা যেন ছিল অশুভ নিয়তি! কেননা, এটা মুসলমানের কাছ থেকে নেয়া অশুভ লোনের ফল। নিশ্চিতভাবে, আমরা আমেরিকানদের দুর্বলতার কারণে রাজনীতিবিদদের দ্বারা সন্ত্রাসবাদী হুমকিতে আছি। তবে অতিরঞ্জিত এ ভয়ের ব্যাপারে কাউকে সঠিক চিন্তা করতে বাধাও দেইনি আর সমাজ-অভিমুখী কোনো সমস্যা সমাধানে কাউকে দায়িত্বও অর্পণ করিনি। সন্ত্রাসবাদ একটি হুমকি বলেই একে তার যথোপযুক্ত স্থানেই রাখতে হবে। যাতে স্নায়ু যুদ্ধ ও সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধের সাথে এর সংযোগ তৈরি না হয়।
ব্যালটবক্স জয় করতে শক্তিহীন ও প্রান্তিক মানুষজনদের জীবন্ত নরকের ভয় দেখিয়ে বলির পাঁঠা বানানো রাজনীতিবিদদের পুরান একটি কৌশল। এর জন্য তাদের তেমন শ্রম দিতে হয় না। ইউরোপ ও আমেরিকাজুড়ে এমন বিপর্যয়কয় ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বারবার দৃশ্যমান হয়েছে।
বর্তমানে চলমান নিরাপত্তা বিতর্কগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের সমাজ- কাঠামোর প্রতি ইঙ্গিত করে এবং বিচূর্ণ আশা ও প্রত্যাশার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইউরোপ-আমেকিয়ায় কী ধরনের ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রীতিপূর্ণ বৈচিত্র্য রক্ষা হবে তাও ইঙ্গিত করে। নিশ্চিতভাবে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দ্রুত পরিবর্তনগুলোর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক ফলাফল সত্ত্বেও রাজনীতিবিদরা নিজেদের সংকীর্ণ নির্বাচনি সুবিধা ও স্বার্থের জন্য এসব উগ্র অস্থিরতা আবাদ করে যাচ্ছে। নির্বাচনে জয়ী হতে ও ক্ষমতার আসন বাগিয়ে নিতে ভীতি প্রদর্শন ও অরাজকতা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইসলামোফোবিয়া এবং বর্ণবাদকে।
বর্তমান নির্বাচনি চক্রে ভীতি (ইসলামোফোবিয়া) এমন এক গুরুত্বপূর্ণ পারিতোষিক উপাদান যার প্রভাবে মানুষজন তাদের উন্নত বিবেচনা ও দীর্ঘদিনের পছন্দের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দেয়। ভীতি মানুষের ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দুয়ার রুদ্ধ করে দেয়। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বে নিরাপত্তা আর উন্নতির বিহ্বলতায় জনগণ দুর্দশাগ্রস্ত নিষ্প্রাণ অতীতের দিকেই ফিরে চায়। সমসাময়িক কৃত্রিম বিশৃঙ্খলা ও সমস্যাবিধান হিসেবে কল্পিত বা বাস্তব দুর্দশাগ্রস্ত সুদূর অতীতকে স্মৃতিকাতর করে অর্পণ করে। ভয় রাজনৈতিক সংশোধনীকে (সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা জনমন থেকে বিস্মৃত করে দেয়) দুর্বল করে তোলে। ফলে আমেরিকান সমাজব্যবস্থার এই অধঃপতন আর সমস্যাগুলোর প্রকৃত সমাধান অধরাই থেকে যায়। সম্প্রদায়ের প্রতি বর্ণবাদী ভাষা আর যৌন বক্তব্য যেন অবক্ষয়গ্রস্ত আমেরিকাকে পুনরায় মহৎ করে তোলার দাবির প্রতি কুর্নিশ জানানো। আহ্বানটি যেন আমেরিকাকে নতুন করে বর্ণবাদী ও যৌনবাদী করে তোলা!
নির্বাচনি প্রচারণায় বর্ণবাদ আর ধর্মান্ধতায় ব্যালটবক্সে ভোট নগদীকরণার্থে ইসলামোফোবিয়া একটি সুচিন্তিত কৌশল (বর্ণবাদ-ধর্মান্ধতা পুরান ইস্যু আর ইসলামোফোবিয়া নতুন; ইসলামোফোবিয়া প্রচারের মাধ্যমে পুরান ইস্যুগুলোও মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো, সেই সাথে ভোটে পূর্ণ হলো ব্যালটবক্স -অনুবাদক)। আমেরিকান উৎপাদন কাজ হ্রাস ও মধ্যবিত্ত বিলুপ্তির সহজ সমাধানকল্পে দেশকে পুনরায় বর্ণবাদী করে তোলার প্রস্তাবনা ওঠে। প্রচারণায় বর্ণবাদকে চাঙ্গা করে তোলা, প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের শেতাঙ্গদের কাজে নিয়োগ, ধর্মান্ধতা এসব মূলত সুশীলসমাজের ক্ষমতালোভী ব্যক্তির প্রাচীন চাল।
ভয়, বর্ণবাদ, সমাধানহীনতা- এসব ছিল ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণার হাতিয়ার। ব্যালট বক্স ইসলামোফোবিয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা লাভ করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে ট্রাম্পের মুসলিমদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের 'সম্পূর্ণ সমাপ্তি'র প্রচার অভিযান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তিনি বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা স্থির থাকবে যতক্ষণ না দেশের প্রতিনিধিরা "কী ঘটছে তা বের করতে পারে"। সম্ভবত, তার সব বুদ্ধিমত্তার সত্ত্বেও, তিনি এখনও এটি উপলব্ধি করতে পারেনি।
ধর্মভিত্তিক সুরক্ষার দাবি তোলে সেই ভয়ের শাখাগুলোকে চাঙা করে তোলা হয়েছে ফলত তৎকালীন রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রয়াস বিজয়ের পথে এগিয়ে গিয়েছে অনেকদূর। আমেরিকার ভবিষ্যত- বৈচিত্র্য, সর্বসাধারণের অন্তর্ভুক্তি ও পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে ব্যালটবক্সকে ইসলামোফোবিয়া ও বর্ণবাদের শিকারে পরিণত করা একেবারেই অনুচিত।
ভাষান্তর : হাবিবুর রহমান রাকিব

টিকাঃ
[২৯] পরোক্ষভাবে বিশ্ব নিয়ন্তা ইহুদিদের সমর্থন আছে বলেই এতটা নিঃসংকোচে ট্রাম্প এ দাবি তোলার সাহস করতে পেরেছে; বরং এ দাবি তোলার মাধ্যমে সে তাদের সমর্থন ও আস্থা লাভ করেছে।
[৩০] বুগিম্যান হচ্ছে সেই কল্পচরিত্র যে মানুষকে ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখিয়ে ভীত করে তোলে, পশ্চিমারা মুসলমানদের সবচে ভয়ংকর বুগিম্যান হিসেবে গণ্য করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00