📄 শাস্তি
মুসলিম-অমুসলিমদের লেখা কিছু জীবনীতে রাসূল -এর জীবনের জিহাদগুলোতে বেশি নজর দেওয়া হয়। কিন্তু রাসূল -এর গোটা জীবনে খুব কম অংশ জুড়েই ছিল জিহাদ। তিনি সন্তানসন্ততি আর নাতিদের নিয়ে স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন কাটিয়েছেন। তার সরল-সিধা জীবন ও আড়ম্বরহীনতার কারণে সবাই তাকে ভালোবাসতেন। জিহাদ ছিল তাঁর সর্বশেষ পন্থা। যখন আর কোনো উপায় ছিল না, তখন শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি যুদ্ধে নামতেন। পরিখার যুদ্ধের এক বছর পর কুরাইশদের সাথে তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। রাসূল যখন সাহাবীগণকে নিয়ে উমরার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন, তা শুনে কুরাইশরা হকচকিয়ে গিয়েছিল। কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কাবায় আসা থেকে তারা তাকে বাধাও দিতে পারছিল না। আবার তাকে আসতেও দিতে চাচ্ছিল না। তাই কাবায় আসার আগেই তারা তাঁর পথ আটকে দেয়। রাসূল তখন পথ বদলে মক্কা থেকে ১১ কিলোমিটার পশ্চিমে হুদায়বিয়াতে যান। কী হয় দেখার জন্য অপেক্ষা করেন।
কুরাইশরা ভেবেছে তিনি উমরার উসিলায় মক্কা দখল করতে এসেছেন। তিনি অবশ্য সেটা অস্বীকার করেছেন। তাঁরা দেখালেন যে, আত্মরক্ষার জন্য ছুড়ি জাতীয় কিছু অস্ত্র ছাড়া তাদের সাথে কোনো ভারী অস্ত্রসস্ত্র নেই। আবার এগুলো তারা হারামে প্রবেশের সময় সাথে নেবেনও না। কুরাইশ দূত মক্কায় ফিরে কুরাইশ নেতাদের বুঝান যে, রাসূল আর তাঁর সাহাবীগণ উমরার জন্য মক্কায় আসতে পারেন।
কুরাইশদের আশ্বস্ত করার জন্য তিনি বিভিন্ন পদ্ধতি নেন। নেগোশিয়েশন ও পার্সয়েশন কৌশল নিয়ে আজকাল যেসব লেখালেখি হয় সেগুলোতে এগুলো পাওয়া যায়। যেমন যাকে আশ্বস্ত করতে চাচ্ছেন তার প্রকৃতি ও স্বভাব বুঝা।
আহাবিশ যে গোত্র প্রধান দূত হয়ে এসেছিলেন, তিনি আল্লাহর জন্য পশু কুরবানী পছন্দ করতেন। তো যখন রাসূল তাঁকে আসতে দেখলেন, তিনি তার সামনে ভেড়া ও অন্যান্য যেসব জিনিস তারা কুরবানীর জন্য এনেছিলেন সেগুলো হাইলাইট করে রাখলেন। এগুলো দেখে তার খুব ভালো লাগল। মক্কায় ফিরে যেয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মুসলিমদের উমরা পূরণে তিনি কুরাইশদের বলতে লাগলেন।
📄 কীভাবে অন্যদের রাজি করাবেন?
• নিজের মানুষদের জানুন: যাদের নিয়ে আপনার কাজ, তাদের ব্যাপারে জানুন। যেমন তাদের সামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ড, শিক্ষাদীক্ষা, আগ্রহ ইত্যাদি। নির্ণয় করার চেষ্টা করুন আপনার আইডিয়া ছড়িয়ে দিতে কোন জিনিসটা প্রভাব ফেলতে পারে। হতে পারে তা কোনো যুক্তিচিন্তাভিত্তিক পয়েন্ট, আবেগময় কথা বা তার আগের বিশ্বাসের প্রতি আবেদন ইত্যাদি। মক্কা থেকে যে-দূত এসেছিলেন রাসূল তাঁর ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে যা জানতেন তা কাজে লাগিয়েছিলেন।
আহাবিশরা যে কাবায় হজ্জ করতে আসাদের কী পরিমাণ সম্মানের চোখে দেখতেন এটা তিনি জানতেন। এজন্য তাঁরা যে কেবল হজ্জের জন্য এসেছেন তার প্রমাণ দেখাতে পেরেছিলেন।
- নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ান: আপনার কথাবার্তার মাত্র ৭ ভাগ মানুষের মনে ছাপ ফেলে। আপনার আচারআচরণের প্রভাব ৫৩ ভাগ। রাসূল -এর ওপর আগে একসময় হামলা করেছিল এমন ৪০ জন মাক্কী বন্দীসেনাকে হুদায়বিয়াতে ক্ষমা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এটা কুরাইশদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল, কারণ আরবদের ঐতিহ্য অনুযায়ী কেবল মুক্তিপণের বিনিময়েই বন্দীদের ছেড়ে দেওয়া হতো। কথার চেয়ে কাজের ক্ষমতা বেশি।
- কীভাবে নিজের আইডিয়া মার্কেট করতে হবে জানুন: বিভিন্ন দূতিয়ালীদের সাথে রাসূল-এর আচরণ বিভিন্ন ছিল। কিন্তু মূলকথা একই ছিল: আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি, [কাবা] প্রদক্ষিণ করতে এসেছি'। এই কথা কুরাইশদের কানে বারবার অনুরণিত হয়ে থাকবে। তারা জানত এই মুহূর্তে যুদ্ধ মক্কার স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে, অন্যদিকে ১৪০০ হজ্জযাত্রী এলে আর্থিকভাবে তাদের লাভ হবে।
📄 অচলাবস্থা নিরসন
শেষপর্যন্ত কুরাইশরা রাজি হলো যে, তারা হজ্জ করতে পারবে তবে এবছর না। আগামী বছর। দশকব্যাপী শত্রুতা এভাবেই শেষ হলো।
মুসলিমদের কাছে এই চুক্তি অবশ্য অন্যায্য মনে হয়েছিল। কারণ, তারা উমরার সব প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল। দেরি হোক এমনটা তারা চাননি। তাছাড়া চুক্তিতে আরেকটা কথা ছিল যে, যারা মক্কা ছেড়ে এসেছে তাদেরকে মুসলিমরা ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু কেউ যদি মদিনা ছেড়ে আসে, তাহলে তাকে ফিরিয়ে দিতে কুরাইশরা বাধ্য থাকবে না।
যাহোক, শেষমেষ তারা চুক্তির শর্ত মেনে নেয়। কারণ রাসূল একে তাদের বৃহৎ স্বার্থের জন্য দেখেছেন। বিষয়টাকে তিনি শুধু অন্য আদল থেকে দেখেননি; বরং প্রথমে যারা চুক্তিটাকে অন্যায্য ভেবেছিল তাদেরকেও তিনি তা বুঝাতে পেরেছিলেন। রাসূল কীভাবে হুদায়বিয়ার শান্তিচুক্তির ফায়দা অন্যান্য মুসলিমদের বুঝালেন? আপনি কীভাবে অন্যদের সহজে বুঝাতে পারবেন?
📄 প্রতিপক্ষকে কীভাবে বুঝাবেন?
• শুনুন: ব্যালডোনি তার ইন্সপায়ার, হোয়াট গ্রেট লিডারস ডু বইতে দেখিয়েছেন যে, লোকজনদেরকে তাদের ভিন্নমত বলতে দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। ‘এটা কেবল ভিন্নমত দেওয়ার বিষয় না; বরং সত্যিকার অর্থে ভিন্নমত স্বীকার করা।’ ব্যালডোনি, ১০৮-১০৯ কোনো ধরনের বাধা, তিরস্কার বা রায় দেওয়া ছাড়া রাসূল তাঁর সাহাবীগণকে তাদের হতাশা প্রকাশের সুযোগ দিয়েছিলেন।
• লাগতে যাবেন না: জোরাজোরি না করে যুক্তি, প্রমাণ ব্যবহার করে রাজি করানোর মাধ্যমে বুঝান। রাসূল তাঁর সাহাবীগণকে বললেন, কুরবানী করতে। মাথা চেছে ফেলতে। তারা যখন করলেন না, তখন তিনি নিজেই শুরু করলেন। বাকিরা পরে তাঁকে অনুসরণ করতে বাধ্য হলো। তিনি তাদের মন বদলে দিয়েছিলেন প্ররোচনার মাধ্যমে। নিজের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি জোরাজোরি না করে।