📄 নেতৃত্ব শিক্ষা (দুই)
• সিদ্ধান্তে অটল থাকুন: সময়টা ছিল মার্চ। মদিনায় তখন শীতের মৌসুম। তার ওপর হাতে খুব বেশি সময়ও ছিল না। এমন বৈরী সময়ে এত বড় পরিখা খনন ভীষণ খাটাখাটুনির ব্যাপার ছিল। কিন্তু রাসূল তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। আপনিও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকুন। করবেন কী করবেন না এমন ভাবতে ভাবতে সুযোগ হারাবেন না। সুযোগ অনেক থাকতে পারে কিন্তু সময় কম। সবকিছু জড়ো করুন, সময় নির্ধারণ করুন, আপনার সিদ্ধান্তের সাথে আপনার ইনস্টিংক্ট বা স্বাভাবিক মনোভাব যায় কী না দেখুন। এরপর আল্লাহর ওপর ভরসা করে এগিয়ে যান।
• উদ্দীপ্ত করুন: 'কঠিন সময়ে যেসব নেতা হাসেন এবং মজা করেন, তারা সেনাদের মধ্য থেকে দুশ্চিন্তা দূর করেন। আত্মবিশ্বাসের দ্যুতি ছড়ান'।
মদিনার বেশিরভাগ লোকজনের কাছে স্বাভাবিকভাবেই পরিখা খননের কাজ আকর্ষণীয় ছিল না। আরবরা মুখোমুখী যুদ্ধে গর্ব করে। পরিখা খোঁড়ার মতো অরোমাঞ্চকর কাজে তাদের অনাগ্রহ স্বাভাবিক। কিন্তু রাসূল তাদেরকে প্রচণ্ডভাবে উদ্দীপ্ত করেছিলেন। নইলে মাত্র ছয় দিনে তিন কিলোমিটার পরিখা খনন সম্ভব ছিল না।
• নিজে হাত লাগান: তিনি দশ জন করে একেকটা গ্রুপ বানান। প্রত্যেক গ্রুপকে দায়িত্ব দেন ৩০ মিটার করে খোঁড়ার জন্য। নিজেও তাদের সাথে হাত লাগান। বুখারীর এক হাদীসে এক প্রত্যক্ষ্যদর্শীর বলেছেন, 'আমি দেখেছি তিনি গর্ত থেকে মাটি বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর পেট পর্যন্ত ময়লাকাদায় ভরে গিয়েছিল'। আপনার সন্তানরা যা করছে তার সাথে যোগ দিন। কর্মচারীদের কাজের বুঝা কমান।
■ সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহিত করুন: কথা বলার, মত প্রকাশের স্বাধীনতার মতো পরিবেশ যদি রাসূল না-দিতেন তাহলে সালমান ফার্সি পরিখা খননের মতো অভিনব বুদ্ধি আরবদের সামনে তুলে ধরতে পারতেন না। হাসি তামাশা করে কেউ তার বুদ্ধিকে উড়িয়ে দেয়নি; বরং সবাই বেশ উৎসাহের সাথে নিয়েছিল। এর সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে সিরিয়াসলি আলোচনা করে তবেই গ্রহণ করেছে।
📄 অবরোধ
ভয়ানক এই পরিখা দেখে কাফের বাহিনী পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। বুঝতে পারছিল না যে কী করবে। পরিখার খোঁড়া মাটি দিয়ে তারা উঁচু টিলা বানিয়ে সেটার উপর বসে ছিল যাতে তাদেরকে অতিক্রম করতে না-পারে।
দুই দল একে অপরকে দেখতে পাচ্ছিলো। কাফের বাহিনী মুসলিমদের বিদ্রুপ করছিল। লড়াইয়ের জন্য উস্কে দিচ্ছিল। 'তোমরা এক গর্তের পেছনে হাত গুটিয়ে বসে আছ? তোমাদের বাপদাদারা কি এভাবে গর্ত খুঁড়ে তার পেছনে লুকিয়ে থাকত? লড়াই করতে ভয় পেত? তোমরা কোনো আরব যোদ্ধার জাত না'!
কখনো কখনো মুসলিমরা তাদের বিদ্রুপের জবাব দিয়েছে। কাফের বাহিনী মদিনায় প্রবেশের জন্য ভিন্ন পথ খুঁজল। পশ্চিম দিকে ইহুদি গোত্রের সাথে কথা বলল। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। একদিকে রসদ কম অন্যদিকে ঠাণ্ডা বালুঝড়ে ওদের মনোবল কমে গেল। একমাস অবরোধের পর কোনো ধরনের যুদ্ধ ছাড়াই তারা চলে গেল।
📄 শাস্তি
মুসলিম-অমুসলিমদের লেখা কিছু জীবনীতে রাসূল -এর জীবনের জিহাদগুলোতে বেশি নজর দেওয়া হয়। কিন্তু রাসূল -এর গোটা জীবনে খুব কম অংশ জুড়েই ছিল জিহাদ। তিনি সন্তানসন্ততি আর নাতিদের নিয়ে স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন কাটিয়েছেন। তার সরল-সিধা জীবন ও আড়ম্বরহীনতার কারণে সবাই তাকে ভালোবাসতেন। জিহাদ ছিল তাঁর সর্বশেষ পন্থা। যখন আর কোনো উপায় ছিল না, তখন শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি যুদ্ধে নামতেন। পরিখার যুদ্ধের এক বছর পর কুরাইশদের সাথে তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। রাসূল যখন সাহাবীগণকে নিয়ে উমরার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন, তা শুনে কুরাইশরা হকচকিয়ে গিয়েছিল। কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কাবায় আসা থেকে তারা তাকে বাধাও দিতে পারছিল না। আবার তাকে আসতেও দিতে চাচ্ছিল না। তাই কাবায় আসার আগেই তারা তাঁর পথ আটকে দেয়। রাসূল তখন পথ বদলে মক্কা থেকে ১১ কিলোমিটার পশ্চিমে হুদায়বিয়াতে যান। কী হয় দেখার জন্য অপেক্ষা করেন।
কুরাইশরা ভেবেছে তিনি উমরার উসিলায় মক্কা দখল করতে এসেছেন। তিনি অবশ্য সেটা অস্বীকার করেছেন। তাঁরা দেখালেন যে, আত্মরক্ষার জন্য ছুড়ি জাতীয় কিছু অস্ত্র ছাড়া তাদের সাথে কোনো ভারী অস্ত্রসস্ত্র নেই। আবার এগুলো তারা হারামে প্রবেশের সময় সাথে নেবেনও না। কুরাইশ দূত মক্কায় ফিরে কুরাইশ নেতাদের বুঝান যে, রাসূল আর তাঁর সাহাবীগণ উমরার জন্য মক্কায় আসতে পারেন।
কুরাইশদের আশ্বস্ত করার জন্য তিনি বিভিন্ন পদ্ধতি নেন। নেগোশিয়েশন ও পার্সয়েশন কৌশল নিয়ে আজকাল যেসব লেখালেখি হয় সেগুলোতে এগুলো পাওয়া যায়। যেমন যাকে আশ্বস্ত করতে চাচ্ছেন তার প্রকৃতি ও স্বভাব বুঝা।
আহাবিশ যে গোত্র প্রধান দূত হয়ে এসেছিলেন, তিনি আল্লাহর জন্য পশু কুরবানী পছন্দ করতেন। তো যখন রাসূল তাঁকে আসতে দেখলেন, তিনি তার সামনে ভেড়া ও অন্যান্য যেসব জিনিস তারা কুরবানীর জন্য এনেছিলেন সেগুলো হাইলাইট করে রাখলেন। এগুলো দেখে তার খুব ভালো লাগল। মক্কায় ফিরে যেয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মুসলিমদের উমরা পূরণে তিনি কুরাইশদের বলতে লাগলেন।
📄 কীভাবে অন্যদের রাজি করাবেন?
• নিজের মানুষদের জানুন: যাদের নিয়ে আপনার কাজ, তাদের ব্যাপারে জানুন। যেমন তাদের সামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ড, শিক্ষাদীক্ষা, আগ্রহ ইত্যাদি। নির্ণয় করার চেষ্টা করুন আপনার আইডিয়া ছড়িয়ে দিতে কোন জিনিসটা প্রভাব ফেলতে পারে। হতে পারে তা কোনো যুক্তিচিন্তাভিত্তিক পয়েন্ট, আবেগময় কথা বা তার আগের বিশ্বাসের প্রতি আবেদন ইত্যাদি। মক্কা থেকে যে-দূত এসেছিলেন রাসূল তাঁর ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে যা জানতেন তা কাজে লাগিয়েছিলেন।
আহাবিশরা যে কাবায় হজ্জ করতে আসাদের কী পরিমাণ সম্মানের চোখে দেখতেন এটা তিনি জানতেন। এজন্য তাঁরা যে কেবল হজ্জের জন্য এসেছেন তার প্রমাণ দেখাতে পেরেছিলেন।
- নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ান: আপনার কথাবার্তার মাত্র ৭ ভাগ মানুষের মনে ছাপ ফেলে। আপনার আচারআচরণের প্রভাব ৫৩ ভাগ। রাসূল -এর ওপর আগে একসময় হামলা করেছিল এমন ৪০ জন মাক্কী বন্দীসেনাকে হুদায়বিয়াতে ক্ষমা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এটা কুরাইশদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল, কারণ আরবদের ঐতিহ্য অনুযায়ী কেবল মুক্তিপণের বিনিময়েই বন্দীদের ছেড়ে দেওয়া হতো। কথার চেয়ে কাজের ক্ষমতা বেশি।
- কীভাবে নিজের আইডিয়া মার্কেট করতে হবে জানুন: বিভিন্ন দূতিয়ালীদের সাথে রাসূল-এর আচরণ বিভিন্ন ছিল। কিন্তু মূলকথা একই ছিল: আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি, [কাবা] প্রদক্ষিণ করতে এসেছি'। এই কথা কুরাইশদের কানে বারবার অনুরণিত হয়ে থাকবে। তারা জানত এই মুহূর্তে যুদ্ধ মক্কার স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে, অন্যদিকে ১৪০০ হজ্জযাত্রী এলে আর্থিকভাবে তাদের লাভ হবে।