📄 পরিখার যুদ্ধ
মক্কার কাফের ও মদিনার মুসলিমদের মধ্যে তৃতীয় ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকারক যুদ্ধ হচ্ছে পরিখার যুদ্ধ। উহুদ যুদ্ধের দুবছর পর মক্কার কাফেররা আবার যুদ্ধের জন্য এগোয়। এবার তাদের লক্ষ্য ছিল গোটা মদিনা দখল। তাদের সঙ্গে ছিল ۱۰ হাজার সৈন্যের বিশাল বহর। ভাড়াটে সৈন্যও ছিল।
ঘটনা জানতে পেরে রাসূল দ্রুত তিন হাজারের মতো সৈন্য জড়ো করেন। মদিনার শিশু আর অযোদ্ধাদের দুর্গের মধ্যে নিরাপদে থাকার জন্য পাঠান। প্রকৃতিগতভাবে মদিনার অবস্থান এমন ছিল যে, বেশিরভাগ দিক থেকেই একে রক্ষা করা যেত। ঘন গাছগাছালির সারি এবং আগ্নেয় শিলাখণ্ড অশ্বারোহী সেনাদলদের রুখে দিত। তবে উত্তর দিকটা খোলা ছিল। রাসূল সে দিকটা পরিখা খনন করে সুরক্ষিত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। বায়জেন্তাইন আর পারস্যদের আপাত অনিঃশ্বেষ যুদ্ধে পরিখা খনন করা হতো তখন। শত্রুদের অতর্কিত হামলা থেকে শহর রক্ষার জন্য রক্ষণাত্মক কৌশল হিসেবে এটা ব্যবহৃত হতো। ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও এই কৌশল ব্যবহৃত হয়েছিল। আরবরা অবশ্য আগে কখনো এটা দেখেনি। পারস্য দেশ থেকে আসা সাহাবী সালমান ফারসি এই বুদ্ধি দেন। রাসূল তাতে সায় দেন। মুসলিমরা ২২ ফুট বাই ৯ ফুট পরিখা খনন করেন। এর দৈর্ঘ্য ছিল তিন কিলোমিটার।
📄 নেতৃত্ব শিক্ষা (দুই)
• সিদ্ধান্তে অটল থাকুন: সময়টা ছিল মার্চ। মদিনায় তখন শীতের মৌসুম। তার ওপর হাতে খুব বেশি সময়ও ছিল না। এমন বৈরী সময়ে এত বড় পরিখা খনন ভীষণ খাটাখাটুনির ব্যাপার ছিল। কিন্তু রাসূল তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। আপনিও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকুন। করবেন কী করবেন না এমন ভাবতে ভাবতে সুযোগ হারাবেন না। সুযোগ অনেক থাকতে পারে কিন্তু সময় কম। সবকিছু জড়ো করুন, সময় নির্ধারণ করুন, আপনার সিদ্ধান্তের সাথে আপনার ইনস্টিংক্ট বা স্বাভাবিক মনোভাব যায় কী না দেখুন। এরপর আল্লাহর ওপর ভরসা করে এগিয়ে যান।
• উদ্দীপ্ত করুন: 'কঠিন সময়ে যেসব নেতা হাসেন এবং মজা করেন, তারা সেনাদের মধ্য থেকে দুশ্চিন্তা দূর করেন। আত্মবিশ্বাসের দ্যুতি ছড়ান'।
মদিনার বেশিরভাগ লোকজনের কাছে স্বাভাবিকভাবেই পরিখা খননের কাজ আকর্ষণীয় ছিল না। আরবরা মুখোমুখী যুদ্ধে গর্ব করে। পরিখা খোঁড়ার মতো অরোমাঞ্চকর কাজে তাদের অনাগ্রহ স্বাভাবিক। কিন্তু রাসূল তাদেরকে প্রচণ্ডভাবে উদ্দীপ্ত করেছিলেন। নইলে মাত্র ছয় দিনে তিন কিলোমিটার পরিখা খনন সম্ভব ছিল না।
• নিজে হাত লাগান: তিনি দশ জন করে একেকটা গ্রুপ বানান। প্রত্যেক গ্রুপকে দায়িত্ব দেন ৩০ মিটার করে খোঁড়ার জন্য। নিজেও তাদের সাথে হাত লাগান। বুখারীর এক হাদীসে এক প্রত্যক্ষ্যদর্শীর বলেছেন, 'আমি দেখেছি তিনি গর্ত থেকে মাটি বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর পেট পর্যন্ত ময়লাকাদায় ভরে গিয়েছিল'। আপনার সন্তানরা যা করছে তার সাথে যোগ দিন। কর্মচারীদের কাজের বুঝা কমান।
■ সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহিত করুন: কথা বলার, মত প্রকাশের স্বাধীনতার মতো পরিবেশ যদি রাসূল না-দিতেন তাহলে সালমান ফার্সি পরিখা খননের মতো অভিনব বুদ্ধি আরবদের সামনে তুলে ধরতে পারতেন না। হাসি তামাশা করে কেউ তার বুদ্ধিকে উড়িয়ে দেয়নি; বরং সবাই বেশ উৎসাহের সাথে নিয়েছিল। এর সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে সিরিয়াসলি আলোচনা করে তবেই গ্রহণ করেছে।
📄 অবরোধ
ভয়ানক এই পরিখা দেখে কাফের বাহিনী পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। বুঝতে পারছিল না যে কী করবে। পরিখার খোঁড়া মাটি দিয়ে তারা উঁচু টিলা বানিয়ে সেটার উপর বসে ছিল যাতে তাদেরকে অতিক্রম করতে না-পারে।
দুই দল একে অপরকে দেখতে পাচ্ছিলো। কাফের বাহিনী মুসলিমদের বিদ্রুপ করছিল। লড়াইয়ের জন্য উস্কে দিচ্ছিল। 'তোমরা এক গর্তের পেছনে হাত গুটিয়ে বসে আছ? তোমাদের বাপদাদারা কি এভাবে গর্ত খুঁড়ে তার পেছনে লুকিয়ে থাকত? লড়াই করতে ভয় পেত? তোমরা কোনো আরব যোদ্ধার জাত না'!
কখনো কখনো মুসলিমরা তাদের বিদ্রুপের জবাব দিয়েছে। কাফের বাহিনী মদিনায় প্রবেশের জন্য ভিন্ন পথ খুঁজল। পশ্চিম দিকে ইহুদি গোত্রের সাথে কথা বলল। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। একদিকে রসদ কম অন্যদিকে ঠাণ্ডা বালুঝড়ে ওদের মনোবল কমে গেল। একমাস অবরোধের পর কোনো ধরনের যুদ্ধ ছাড়াই তারা চলে গেল।
📄 শাস্তি
মুসলিম-অমুসলিমদের লেখা কিছু জীবনীতে রাসূল -এর জীবনের জিহাদগুলোতে বেশি নজর দেওয়া হয়। কিন্তু রাসূল -এর গোটা জীবনে খুব কম অংশ জুড়েই ছিল জিহাদ। তিনি সন্তানসন্ততি আর নাতিদের নিয়ে স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন কাটিয়েছেন। তার সরল-সিধা জীবন ও আড়ম্বরহীনতার কারণে সবাই তাকে ভালোবাসতেন। জিহাদ ছিল তাঁর সর্বশেষ পন্থা। যখন আর কোনো উপায় ছিল না, তখন শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি যুদ্ধে নামতেন। পরিখার যুদ্ধের এক বছর পর কুরাইশদের সাথে তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। রাসূল যখন সাহাবীগণকে নিয়ে উমরার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন, তা শুনে কুরাইশরা হকচকিয়ে গিয়েছিল। কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কাবায় আসা থেকে তারা তাকে বাধাও দিতে পারছিল না। আবার তাকে আসতেও দিতে চাচ্ছিল না। তাই কাবায় আসার আগেই তারা তাঁর পথ আটকে দেয়। রাসূল তখন পথ বদলে মক্কা থেকে ১১ কিলোমিটার পশ্চিমে হুদায়বিয়াতে যান। কী হয় দেখার জন্য অপেক্ষা করেন।
কুরাইশরা ভেবেছে তিনি উমরার উসিলায় মক্কা দখল করতে এসেছেন। তিনি অবশ্য সেটা অস্বীকার করেছেন। তাঁরা দেখালেন যে, আত্মরক্ষার জন্য ছুড়ি জাতীয় কিছু অস্ত্র ছাড়া তাদের সাথে কোনো ভারী অস্ত্রসস্ত্র নেই। আবার এগুলো তারা হারামে প্রবেশের সময় সাথে নেবেনও না। কুরাইশ দূত মক্কায় ফিরে কুরাইশ নেতাদের বুঝান যে, রাসূল আর তাঁর সাহাবীগণ উমরার জন্য মক্কায় আসতে পারেন।
কুরাইশদের আশ্বস্ত করার জন্য তিনি বিভিন্ন পদ্ধতি নেন। নেগোশিয়েশন ও পার্সয়েশন কৌশল নিয়ে আজকাল যেসব লেখালেখি হয় সেগুলোতে এগুলো পাওয়া যায়। যেমন যাকে আশ্বস্ত করতে চাচ্ছেন তার প্রকৃতি ও স্বভাব বুঝা।
আহাবিশ যে গোত্র প্রধান দূত হয়ে এসেছিলেন, তিনি আল্লাহর জন্য পশু কুরবানী পছন্দ করতেন। তো যখন রাসূল তাঁকে আসতে দেখলেন, তিনি তার সামনে ভেড়া ও অন্যান্য যেসব জিনিস তারা কুরবানীর জন্য এনেছিলেন সেগুলো হাইলাইট করে রাখলেন। এগুলো দেখে তার খুব ভালো লাগল। মক্কায় ফিরে যেয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মুসলিমদের উমরা পূরণে তিনি কুরাইশদের বলতে লাগলেন।