📄 দ্বন্দ্ব নিরসন
নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনার মাঝে পার্থক্য আছে। নেতৃত্ব মানে নির্দিষ্ট ভিশন। ব্যবস্থাপনা মানে সেই ভিশন অর্জনের তত্ত্বাবধান। রাসূল -এর মধ্যে এই দুটো গুণই ছিল। তিনি প্রথমে একটি ভিশন দিয়েছেন, পরে সেটি বাস্তবায়নে কাজ করেছেন। অন্যান্যদেরকেও এগুলো শিখিয়েছেন। যেমন- কাউকে সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব দিয়েছেন, কাউকে নিজের অবর্তমানে মদিনার দায়িত্ব দিয়েছেন।
বদর, উহুদ, খন্দকের যুদ্ধে রাসূল -এর নেতৃত্বের ধরন এবং তিনি কীভাবে বিভিন্ন দ্বন্দ্ব নিরসন করেছেন এখন আমরা তা দেখব। আমাদের লক্ষ্য এসব যুদ্ধের গভীরে যাওয়া না; বরং কঠিন অবস্থায় রাসূল -এর চিন্তা ও চর্চা কী ছিল সেটা দেখা উদ্দেশ্য।
তাহলে বদর দিয়ে শুরু করি।
📄 বদরের যুদ্ধ
'যুদ্ধ সবসময়ই ভীষণ ক্ষতিকর। তবে কখনো কখনো এটা দরকার মূল্যবোধ বজায় রাখার জন্য, যেমন ইবাদাতের স্বাধীনতা’।
সাউদি আরবের লোহিত সাগরের উপকূল রেখা ধরে হিজায অঞ্চলে রাসূল তাঁর প্রভাব বাড়ান। অন্যন্য বেশকিছু গোষ্ঠীর সাথে মৈত্রী চুক্তি সাক্ষর করেন। বিশেষ করে যারা ছিল মদিনার প্রান্ত ও উপকূল অঞ্চলে। এর লক্ষ্য পরিষ্কার: মক্কার কাফেলা যেসব জায়গা দিয়ে অতিক্রম করে সেসব জায়গার গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বন্ধ করা। নিশ্চিত করা এসব গোষ্ঠীগুলো যাতে যুদ্ধে না-জড়ায়। রাসূল কুরাইশদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথে বাধা তৈরি করতে পেরেছিলেন। ফলে তারা ব্যয়বহুল পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল।
এমন এক ঘটনায় রাসূল বিশাল এক কুরাইশ কাফেলার গতি রোধ করতে সক্ষম হন। এখানে ২ হাজার উট ছিল। সিরিয়া থেকে আমদানীকৃত প্রায় ৫০ হাজার দিনারের মূল্যমানের মালামাল ছিল। যখন তারা জানতে পারল যে, রাসূল-এর লোকেরা এগিয়ে আসছে, তখন তারা তাদের পথ বদলাতে বাধ্য হয়।
মক্কায় এ নিয়ে হৈচৈ পড়ে যায়। মদিনার লোকদের উপযুক্ত জবাব দেওয়ার জন্য মক্কার একাংশ সশস্ত্র বাহিনী পাঠানোর যুক্তি তুলে ধরলে তা সফল হয়। এক হাজার সৈন্য ও সাতশ উটের বিশাল বহর নিয়ে তারা যাত্রা শুরু করে। রাসূলে ভাবেননি যে, বিষয়টা এদিকে গড়াবে। অপ্রস্তুত অবস্থায় তিনি তিনশ যোদ্ধা ও সত্তর উটের বাহিনী জড়ো করতে সক্ষম হন।
যোদ্ধা ও সরঞ্জাম সেই সময়ের যুদ্ধে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মুসলিমদের ছিল মাত্র দুটো ঘোড়া। উটের চেয়ে তড়িৎ আক্রমণে ঘোড়া বেশি কার্যকর। কুরাইশদের ছিল একশ ঘোড়া। সোজা কথায়, মক্কাবাসিদের চেয়ে মুসলিমগণের অস্ত্রশস্ত্র মারাত্মক কম ছিল। রাসূলে কীভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করলেন?
বদর যুদ্ধে রাসূল তাঁর সৈন্যদের অভিনব ফরমেশনে সাজালেন। ইংরেজি শেপের মতো সমান্তরাল দুই লাইনে সৈন্যরা দাঁড়াল। উভয়ের পিঠ উভয়ের দিকে। মাঝখানে আড়াআড়িভাবে সৈন্যদের এক লাইন। এর ফলে হলো কি, শত্রুবাহিনী কোনোদিক থেকেই মুসলিম বাহিনীকে চেপে ধরতে পারল না। তিনি তাঁর বাহিনীর কিছু অংশকে বৃষ্টির পানি জমে যেখানে খাবার পানি জমে ছিল, সেটার নিয়ন্ত্রণে রাখলেন। এরপর উপর থেকে সবকিছু দেখার জন্য এবং আদেশ দেওয়ার জন্য তিনি উঁচু জায়গা থেকে যুদ্ধ তত্ত্বাবধান করলেন। সবাইকে চমকে দিয়ে এই যুদ্ধ মুসলিমগণ জয় করে নেন। ৭০ জন কাফের নিহত হয়। আরও ৭০ জন বন্দী হয়।
📄 উহুদ পাহাড়
বদর যুদ্ধের একবছর পর কুরাইশদের সাথে মুসলিমদের আবার যুদ্ধ বাধে। এবার তারা অনেক বড়সড় বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয়। তাদের সাথে ছিল ৩ হাজার যোদ্ধা, ৩ হাজার উট, ২শ ঘোড়া। যুদ্ধের ময়দানে চিয়ার আপ করার জন্য ছিল নারী। কুরাইশ বাহিনী মদিনার দক্ষিণ দিক থেকে এগোয়। কিন্তু আগ্নেয় পাহাড়ের মতো জায়গার কারণে উটের গতি কমে যায়। যে কারণে তারা পরে উত্তর দিক থেকে এগোয় উহুদ পাহাড়ের দিকে। এটি মদিনার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। সাগরপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা প্রায় ১ হাজার মিটার। রাসূল -এর বাসা থেকে এর দূরত্ব চার কিলোমিটার।
এই যুদ্ধে মুসলিমরা এমনভাবে অবস্থান নিয়েছিল যে, উহুদ পাহাড় ছিল তাদের পেছনে। যেখান থেকে তাদেরকে মাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, যদি না কুরাইশ বাহিনী ৭০০ মিটার উঁচু পাহাড় পথ পার না করে।
তাও আবার সেটা রাসূল ৫০ জন সৈন্য দিয়ে পাহারা দিয়ে রেখেছেন। কড়া নির্দেশ দিয়েছেন জয়-পরাজয় যা-ই হোক, কেউ যেন জায়গা ছেড়ে একচুলও না-নড়ে। মুসলিম বাহিনীর সাতশ সৈন্যকে রাসূল আদেশ দিয়েছিলেন ব্যক্তিগতভাবে না লড়ে একাট্টা হয়ে যুদ্ধ করতে। কারণ চারগুণ বেশি কুরাইশ বাহিনীর সাথে ব্যক্তিগতভাবে লড়লে ময়দান থেকে মুহূর্তেই তারা হাওয়া হয়ে যাবে।
দুই বাহিনী মুখোমুখী হলো। প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিমরা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। উঁচু টিলার ওখানে যে ৫০ জন দাঁড়িয়ে ছিলেন তারা ভেবেছিলেন যুদ্ধে মুসলিমরা জিতে গেছে। তারা পলায়নপর কুরাইশদের থেকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নেওয়ার জন্য তাদের জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলেন। পাহাড় অরক্ষিত থাকার পুরো সুযোগ সেদিন কুরাইশ বাহিনী নিয়েছিল। তারা আবার জড়ো হয়ে মুসলিমদের পরে পরাজিত করে।
📄 নেতৃত্ব শিক্ষা (এক)
* ক্ষমা করুন: কাউকে শেখাতে বা গড়ে তুলতে সময় লাগে। কখন ক্ষমা করলে ভালো হবে সেটা জানলে ভালো ফল পাবেন। যারা পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল রাসূল তাদের কঠোর তিরষ্কার করেছিলেন। কিন্তু মাত্রা ছাড়িয়ে যাননি। অনুরূপভাবে ভুল করলে আপনার কর্মচারী বা সন্তানের সাথে মাত্রাতিরিক্ত কঠিন হবেন না। সেক্রেতান বলেছেন- 'অহম বলে ন্যায্য হও। আত্মা বলে দরদি হও'। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'তুমি তাদের সাথে কোমল ছিলে। তুমি যদি তাদের সাথে রূঢ় হতে এবং কঠিন হৃদয় হতে, তাহলে তারা তোমাকে ছেড়ে চলে যেত। তাদের ক্ষমা কর। তাদের জন্য ক্ষমা চাও। সলাপরামর্শ কর'। আলে ইমরান: ১৫৯
* সবকিছু জানুন: নিজে যদি দক্ষ না-হন, নিজের ভূমিকা নিজেই না জানেন, তাহলে নেতা হিসেবে কীভাবে অন্যদের শ্রদ্ধা অর্জন করবেন? রাসূল ৭০ জন যোদ্ধাকে কুরাইশ বাহিনীকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন, যদি কুরাইশরা ঘোড়ায় চড়ে আসে, তাহলে তারা মদিনায় হামলা করবে (ঘোড়া ব্যবহৃত হতো দ্রুত গতি আর কম দূরত্বের নড়াচড়ার জন্য) আর যদি তারা উটে চড়ে আসে তাহলে তারা মক্কায় ফিরে যাবে (উট দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য ভালো)।
* নজর: পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক দাপুটে নেতারা মাথা ঠাণ্ডা রাখতে জানেন। কঠিন পরিস্থিতি যেন আপনাকে ঘায়েল করে না-ফেলে। নইলে দেখা যাবে বাজে সময়ে বাজে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। উহুদ যুদ্ধে রাসূল চোট পেয়েছিলেন। মুসলিমদের ৭০ জন শহিদ হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মাথা ঠাণ্ডা রেখেছিলেন। সেই মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যা যা করা দরকার করেছিলেন। সমস্যা জর্জরিত বাহিনীকে বৈরী অঞ্চলে ২০ কিলোমিটার মার্চের জন্য আবার একত্র করেছিলেন।
টিকাঃ
৬. সেকার্টান, পৃষ্ঠা ১৪৩।