📄 দ্বন্দ্ব
একটা সময় রাসূল ও পরিবর্তন বিরোধীদের মধ্যকার সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি হয়। মক্কায় প্রায় ৪০ জন উচ্চবর্গের নেতাগোছের লোক ছিলেন। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন রাসূল ও হাশিমীদের (রাসূল -এর পরিবার) সাথে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। মানে তাদের সাথে কোনো আর্থিক লেনদেন হবে না। তাদের কাউকে বিয়ে করবে না।
আধুনিক পরিভাষায় একে বলা যায়, সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখা। অর্থনৈতিক বয়কট। কারণ তখন মক্কার জীবন এমন ছিল না যে, কেউ আলাদাভাবে থেকে জীবন চালাতে পারবে। ৩ বছরেরও বেশি সময় হাশিমীদেরকে চরম খাদ্যাভাবের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তা আরও বাড়ত যদি না মক্কার এক নেতা হিশাম ইবনে আমরের খারাপ না-লাগত। খারাপ হতে থাকা মানবিক পরিস্থিতি দেখে এবং এই বয়কট শেষ করার জন্য তিনি কোনো পদক্ষেপ না-নিতেন, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহতার দিকে যেত। আচ্ছা, হিশাম ইবনে আমর কীভাবে নিজে নিজে এই উদ্যোগ নিলেন? চলুন দেখি।
📄 যোগাযোগের মাধ্যমে বদল
হিশাম নীরব থাকেননি। তিনি অন্য আরেক স্থানীয় নেতা যুহাইরের সাথে এ নিয়ে আলাপ করেন। তিনিও তাদের এই অবস্থা নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন। তবে কিছু করার আগে তিনি আরও লোক খুঁজতে বলেন। হিশام আল মিত'আমের কাছে যান। তিনিও অনুরূপ কথা বলেন এবং আরও লোক খুঁজতে বলেন। এবার হিশাম আবু আল বাহতারীর কাছে যান। তিনি তাকে পঞ্চমজন খুঁজতে বলেন। তো শেষমেষ তারা ছয়জনের গ্রুপে পরিণত হন যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং সফলভাবে বয়কট শেষ করেন।
খেয়াল করুন, হিশাম কিন্তু কাউকে তাদের মন বদলাতে রাজি করেননি। তারা আগে থেকেই বিষয়টা নিয়ে একমত ছিলেন। তিনি শুধু সংযোগকারী হিসেবে কাজ করেছেন। ঠিক আবু বকর (রা)-এর প্রথম দিকের মুসলিমদের সাথে যেভাবে কানেক্টর হিসেবে কাজ করেছিলেন, ঠিক সেভাবে।
📄 পরিবর্তনের উপকরণ
যেসব আন্দোলন সফলভাবে পরিবর্তন নিয়ে আসে তার মধ্যে যা থাকে: অনুপ্রেরণামূলক চিন্তা, ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব, নিবেদিতপ্রাণ অনুসারী।
আজ কোটি কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। বেশিরভাগই ফেসবুক আর টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগ সাইটের মাধ্যমে সংযুক্ত। এরা একটি চিন্তার পেছনে এক হতে পারে এবং পরিবর্তন দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে পারে।
কীভাবে সাধারণত পরিবর্তন ঘটে সে ব্যাপারে সেথ গোডিন তার সাড়া জাগানো বই 'ট্রাইবস'-এ বলেছেন-
'[পরিবর্তনের জন্য) আন্দোলন ঘটে যখন লোকেরা একে অপরের সাথে কথা বলে, যখন চিন্তা গোটা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে এবং সবশেষে একে অপরের সমর্থন পেয়ে তারা সেই কাজটার দিকে এগিয়ে যায়, যেটা তারা সবসময় জেনে এসেছিল সঠিক কাজ'।
📄 হিজরত
বয়কট শেষ হলেও রাসূল-এর অবস্থা খুব একটা উন্নত হয়নি; বরং আরও অবনতি হয়েছিল। কারণ কয়েকদিনের ব্যবধানে তাঁর চাচা আবু তালিব ও স্ত্রী খাদিজা মারা যান।
তাঁর রাজনৈতিক আশ্রয়দাতার মৃত্যুতে বিরোধীরা নতুন সমারোহে নাজেহাল অভিযান শুরু করে। 'চাচা মারা যাওয়ার আগে কুরাইশরা আমার সাথে ঘৃণ্য কিছু করতে পারত না'। রাসূল স্মৃতিচারণ করে বলেছেন।
৫৩ বছর বয়সে রাসূল মক্কা ছেড়ে চলে যান। শেষ দশ বছর মদিনাতে কাটান। পরের অধ্যায় ও শেষ অধ্যায়ে আমরা মদিনা জীবন নিয়ে কথা বলব এবং আরও বলব আরব উপদ্বীপে পরিবর্তনের জন্য তিনি যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেটা নিয়ে।
আমরা এই অধ্যায়ের শেষে চলে এসেছি। আমার লক্ষ্য ছিল পরিবর্তন সৃষ্টির জন্য আপনাকে উদ্দীপ্ত করা, রাসূল এবং তাঁর কিছু বন্ধুদের অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ দেওয়া।
আমরা তাঁর জীবনের বাঁকবদল করা মুহূর্ত দেখেছি। এর শুরু হেরা পর্বতগুহায় অহী অবতীর্ণ দিয়ে আর শেষ মদিনায় হিজরত করে। বলেছি নিজের উন্নতি ও ভালো কোনো পরিবর্তনের পথে কীভাবে আপনি এই বাঁকবদল মুহূর্ত থেকে উপকৃত হতে পারেন।
পরিবর্তনে পেছনে কী কী কাজ করে তাও দেখেছি। আবেগি ও যৌক্তিক ব্যাপারস্যাপার; পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, নতুন জীবনের আকাঙ্ক্ষা, কীভাবে নিজেকে বিকশিত করা যায় তা নিয়ে চিন্তা এবং সফলভাবে পরিবর্তন আনতে দক্ষতা অর্জনে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব নিশ্চয় উপলব্ধি করতে পারছেন।