📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ > 📄 আমর আস সুলামী (রা)

📄 আমর আস সুলামী (রা)


আমরা বিশেষ করে তাদের দিকে নজর দেব, যারা নিজেদের পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তাদের কাহিনি জানব, যাতে আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে মেলাতে পারি।

আমর (রা)-এর দ্রুত বদলে যাওয়া বেশ চমকপ্রদ ব্যাপার। রাসূল -এর সাথে খুব সংক্ষিপ্ত এক আলাপের পর তিনি তার জীবন পুরোপুরি বদলে ফেলেন। তাদের আলাপের শুরু হয়েছিল এভাবে-
- কে আপনি?
- আমি নবি।
- নবি কী?
- আমাকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন।
- কেন তিনি পাঠিয়েছেন?
- আত্মীয়তার সম্পর্ক জুড়তে, মূর্তি ভেঙে গুড়ো গুড়ো করতে, মহান আল্লাহর একত্ব ঘোষণা করতে।
- ঠিক আছে, আমি আপনাকে অনুসরণ করব।

এই আলাপচারিতার সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, আমর কী অসম্ভব দ্রুত বদলে ফেলেছিলেন নিজেকে! একটা কারণ হতে পারে যে, ইসলামের আগে তিনি তাওহিদবাদী ছিলেন। কাজেই রাসূল যখন মূর্তি ভেঙে গুড়ো গুড়ো করার কথা বললেন, সেটা তার কাছে বোধগম্য হয়েছে, গ্রহণযোগ্য হয়েছে। কিন্তু আরবের অনেকে তাওহিদবাদীই রাতারাতি বদলে যাননি। এক্ষেত্রে আমরের বেলায় কোথায় আলাদা কিছু ছিল?

কেউ কেউ বলতে পারেন, এটা আল্লাহর তরফ থেকে পথনির্দেশ। কিন্তু আরও কিছু মূল ফ্যাক্টর ছিল এই আলাপে যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একটা ফ্যাক্টও ছিল, অন্যের সাথে কথা বলার সময় রাসূল -এর আশ্বস্ত করার সামর্থ্য। সফল আলাপচারিতায় শুধু মুখের কথার বাইরেও অনেক ব্যাপারস্যাপার থাকে। যেমন- রাসূল-এর আন্তরিক মুখভঙ্গী, কণ্ঠে দরদ, প্রাণবন্ত দেহভঙ্গিমা- যা আমরা এই সংলাপ পড়ে উপলব্ধি করতে পারছি না।

জুদি বার্গুন (Judee Burgoon) ১৯৯৬ সালে এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, শুধু মুখের অঙ্গভঙ্গী দিয়ে ২০ হাজার ভিন্ন ভিন্ন হাবভাব প্রকাশ করা যায়।

আর মুখের হাবভাব মিথ্যা বলে না। ১৯৬৭ সালে উকলা (UCLA) গবেষণা থেকে বলা হয়েছে যে, ৯৩ ভাগ যোগাযোগই অবাচনিক (৫৫ ভাগ শারীরিক নড়াচড়া থেকে, ৩৮ ভাগ কন্ঠস্বর থেকে), মাত্র সাতভাগ আসে শব্দ বা কথা থেকে।

রাসূল -এর এক সমসাময়িক ব্যক্তি তাঁর ব্যাপারে বলেছেন, 'তাঁর চেহারা দেখেই বুঝেছি, কোনো মিথ্যুকের চেহারা এমন হতে পারে না'।

আমর ও অন্যান্যরা কীভাবে দ্রুত বদলে গিয়েছিল সেটা বুঝার জন্য রাসূল -এর কথা বলার স্টাইল খেয়াল করুন। কল্পনা করার চেষ্টা করুন অন্যের সাথে কথা বলার সময় তাঁর মুখভঙ্গী, কণ্ঠ, দেহভঙ্গী।

এবার আমর (রা)-এর সাথে রাসূল -এর আলাপের শেষ অংশ দেখি:
- আমি আপনাকে অনুসরণ করব।
- আজকে পারবেন না। দেখছেন না, আমি এবং আমার লোকেরা কী অবস্থায় আছি? আপনি আপনার লোকদের কাছে ফিরে যান। যদি শোনেন আমি এসেছি, তাহলে আমার কাছে আসবেন।

এই ঘটনার আরেকটি নজরকাড়া দিক হচ্ছে, রাসূল -কে না-দেখেই দশ বছরেরও বেশি সময় আমর মুসলিম ছিলেন। এরপর আবার রাসূল -কে দেখেন যখন তিনি মদিনায় বসতি গড়েন।

হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি যখন শুনলেন রাসূল মদিনায় এসেছেন, তখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
- 'আমাকে চিনতে পারছেন'?
- 'হ্যাঁ। মক্কায় দেখা হয়েছিল আপনার সাথে'।

ক্ষণিকের সেই আলাপচারিত কতটা ছাপ ফেলেছিল সেটাও এখান থেকে বুঝা যায়।

📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ > 📄 আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)

📄 আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)


মক্কার পূর্ব দিকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে হুযাইল নামক জায়গা থেকে আবদুল্লাহ এসেছিলেন। শৈশব থেকেই তিনি এখানে মেষ চড়াতেন। একবার তিনি যখন মেষ চড়াচ্ছিলেন, তখন রাসূল তাঁর পাশ দিয়ে গেলেন। ভেড়ার দুধ খেতে চাইলেন। আবদুল্লাহ দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, তিনি পারবেন না, কারণ ভেড়াগুলো তার না। রাসূল তখন তাকে বললেন কমবয়সী একটা ছাগল নিয়ে আসতে। তিনি কুরআনের একটা আয়াত পড়লেন, ছাগলের ওলান দুধে ভরে উঠল। রাসূল ও আবদুল্লাহ পিয়াস মিটিয়ে খেলেন। আবদুল্লাহর জন্য এটাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ > 📄 মানুষ কীভাবে বদলায়?

📄 মানুষ কীভাবে বদলায়?


আবদুল্লাহ ও আমর দুজনের বেলাতেই আসল প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে ও কেন কিছু লোক রাতারাতি পুরোই বদলে যায়। মহান আল্লাহর পথনির্দেশ তো ছিলই, রাসূল তাদের অনুভূতির ওপর বড় ধরনের নাড়া দিতে পেরেছিলেন।

চিপ (Chip) ও ড্যান হিথ (Dan Heath) এই যুক্তি তুলে ধরেছেন যে, বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায়ে নাড়া পড়লে মানুষের বিশ্বাস ও অভ্যাস যতটা বদলায়, তারচেয়েও বেশি বদলায় মানুষ যখন তার আবেগের পর্যায়ে নাড়া খায়।

এর মানে এই না যে, যুক্তি মানুষকে বদলাতে পারে না। যুক্তি ও আবেগ দুটোই কাজ করে। তবে পরিবর্তনের বেলায় এদুটোর যেটার আধিপত্য বেশি সেটাই পরিবর্তনের প্রকৃতির ওপর বেশি প্রভাব ফেলবে।

যুক্তিচিন্তা মানুষের মধ্যে যে-পরিবর্তনগুলো আনে সেগুলো খুব নির্দিষ্ট। স্পষ্ট। যেমন- আপনি যখন আপনার খরচের হাত কমাতে চান এবং বেতনের দশ ভাগ জমাতে চান, তখন ত্রাঁ বুঝা যায় যে পাঁচবছর পর আপনি একটা ফ্ল্যাট কেনার জন্য এমন করছেন।

যৌক্তিক এই পরিবর্তন একটা ক্রমধারা মেনে হয় চলে। আর তা হচ্ছে, 'বিশ্লেষণ-চিন্তা-পরিবর্তন' বা (Analyze-Think-Change)'। অন্যদিকে যে পরিবর্তন আবেগে দোলা দিয়ে আসে সেটার ক্রমধাপ আলাদা। 'দেখা-অনুভব-পরিবর্তন' বা '(See-Feel-Change)। বড় ধরনের ব্যাপক পরিবর্তনে এটা প্রায়ই দেখা যায়।

ড্যান আর চিপ হিথ লিখেছেন, 'সাধারণত এমন হয় না যে, না-বুঝার কারণে মানুষ বদলাতে পারেনি। ধূমপায়ীরা জানে সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ, কিন্তু তাও ছাড়ে না। কিছুটা হলেও আমরা তাদের এই অবস্থা বুঝতে পারি। কীভাবে করতে হবে এটা জানা, আর করার জন্য উদ্দীপ্ত হওয়া এদুটোর মধ্যে যে পার্থক্য আছে, তা আমরা জানি। কিন্তু অন্যের আচরণ পরিবর্তনের বেলায় প্রথমেই আমাদের মাথায় আসে তাকে কিছু শেখাতে হবে'।

আবেগের কারণে বদলে গেছেন এমন আরও নজির আছে। এর কারণ, তারা যা দেখেছেন বা শুনেছেন তা তাদের ভালোর দিকে বদলে যেতে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছে।

দাউস গোত্রের একজন নেতা তুফাইল আমর। মক্কার দক্ষিণে আল বাহা নামক জায়গায় তিনি থাকতেন। রাসূল ﷺ-কে তিনি কুরআনের কিছু আয়াত তেলাওয়াত করতে শোনেন। আর তাতেই তার হৃদয়ে শিহরণ বয়ে যায়। তিনি বলতে বাধ্য হন, 'আমার জীবনে এর চেয়ে ভালো কিছু শুনিনি কখনো'।

তিনি ইসলামে আসার পর তার পরিবারসহ আরও ৭০ জনকে ইসলাম গ্রহণে রাজি করান। আল কুরআনের শব্দ আর রাসূল ﷺ-এর বাচনভঙ্গি দুটোই বেশ শক্তিশালী ছিল।

দিম্মাদ সালাবা ছিলেন প্রসিদ্ধ ডাকিনিবিদ। জিনের আসর ও জাদুটোনা থেকে মানুষকে মুক্ত করতেন। তার পরিবর্তন ছিল পুরো ১৮০ ডিগ্রি। তিনিও রাসূল ﷺ-এর মুখে কুরআন পাঠ শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। বলেছেন, 'একরম কথা তো কোনো দিন শুনিনি'।

আবু যর (রা) ছিলেন গিফার অঞ্চলের তাওহিদবাদী। মক্কা থেকে ২৫০ কিলোমিটার উত্তরে গিফার। রাসূল ﷺ-এর সাথে দেখা করে জায়গায় দাঁড়িয়েই ইসলামে প্রবেশ করেন। কুরাইশ বা অন্যরা কী করবে না-করবে এ নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। হাদীসে পাওয়া যায়, ইসলাম গ্রহণের কারণে একদল মূর্তিপূজারি দুষ্কৃতিকারীরা তার ওপর হামলা করেছিল।

এই তিনজন মানুষের প্রত্যেকের বেলায় কমন ব্যাপার হচ্ছে পরিবর্তনের চিন্তার ব্যাপারে তাদের খোলামন। পরিবর্তনের ব্যাপারে যাদের মন বন্ধ, তারা একে তাদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখবে।

বদলে যাওয়ার পর কী কী বদলাতে হবে (যেমন অভ্যাস, স্মৃতি ইত্যাদি) সেগুলোতে তাদের নজর ছিল না; বরং পরিবর্তনের পর নতুন যে- জীবনব্যবস্থায় তারা কাটাবেন, সেদিকে তাদের খেয়াল ছিল।

📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ > 📄 পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়া

📄 পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়া


অন্য শতাব্দীগুলোর সাথে একুশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় পার্থক্য দ্রুত পরিবর্তনশীলতা। টেলিফোন থেকে মোবাইল, এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে উইকিপিডিয়া, ইটপাথরের মার্কেট থেকে অনলাইন শপিং আরও কত কী! যে কারণে পরিস্থিতির দাবি মেনে বদলে যাওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

পরিস্থিতির দাবি মেনে বদলে যাওয়া মানে শুধু নতুন নতুন জিনিস শেখা না। যেসব জিনিস এখন আর কাজে লাগে না, সেগুলো ভুলে যাওয়াটাও এর মধ্যে পড়ে।

ভুলে যাওয়া কঠিন। সবাই তা পারে না। বিশেষ করে নির্দিষ্ট একটা বয়সে পৌছার পর। ভুলে যাওয়ার জন্য পরিবর্তনকে বরণ করতে হয়। একে সামলানোর আত্মবিশ্বাস লাগে। প্রফেসর বিল লুকাস বলেছেন,

'আজকের জমানায় টিকে থাকতে হলে প্রতিভার ব্যাপারে ভিন্ন চোখ গড়তে হবে। আইকিউয়ের মতো সংকীর্ণ ধরনের বুদ্ধিমত্তার ধরা বাঁধা ধারণার ওপর নির্ভর করার দিন আর এখন নেই। সামনের দিনগুলোতে দিনে দিনে আমরা আগ্রহী হবো মানুষের মন কীভাবে কোনো জিনিস ভুলে যাওয়ার দিকে যাচ্ছে সেদিকে। যাতে বিভিন্ন পরিবেশে লাগাতার সে তার বুদ্ধিমত্তা বাড়াতে পারে'।

ভুলে যাওয়ার এই সামর্থ্যই তুফাইল ও দিম্মাদের অভিজ্ঞতার অনুপ্রেরণামূলক দিক। পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের ব্যাপারে তুফাইল ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। 'আমি খারাপ থেকে ভালো আলাদা করতে পারি। এই লোকের কথা আমি কেন শুনব না'?

দিম্মাদ ছিলেন ডাকিনিবিদ। কিন্তু সত্য চেনার পর অতীতের এই বিদ্যা ভোলার জন্য তিনি পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলেন। 'আমি জ্যোতিষী, জাদুকর, কবিদের কথা শুনেছি। কিন্তু এমন কথা আমি জীবনে শুনিনি'।

পরিবর্তনের বেলায় অনেকের চ্যালেঞ্জ হলো, পরিচিত ও আরামদায়ক কিছু ছেড়ে পুরোপুরি নতুন ও অপরিচিত কিছু হাতে নেওয়া। আবু যর (রা)-এর বেলাতে তা-ই হয়েছিল। কাফেলা আর সফরকারীদের লুট করাই ছিল তার কাজ। কিন্তু সেটা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে নতুন জীবন রীতি গ্রহণ করেছিলেন।

যত ইচ্ছাই থাকুক, অভ্যাস ছেড়ে দেওয়া সবসময় কঠিন। কারণ অতীত স্মৃতি হৃদয়ে কড়া নাড়তে পারে। কিন্তু নতুন ও অপরিচিত কিছুর সাথে স্মৃতিকাতরতার কিছু নেই।

তবে আবু যর (রা) তার পুরোনো সুখ (দ্রুত টাকা, লুট করে নিজের ক্ষমতা জাহির) ছেড়ে দিতে পেরেছিলেন। ভবিষ্যতের দিকে চিন্তার মোড় ঘুরিয়েছিলেন (যেমন- কীভাবে কুরাইশদেরকে তার ইসলামে আসার কথা বলবেন)।

পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এটা ভালো মানসিক কৌশল। পুরোনো স্মৃতি নিয়ে আহাজারির মানসিকতা ছেড়ে নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতির জন্য আগ্রহভরে অপেক্ষা করুন। আপনার নতুন অভ্যাস কীভাবে আপনার জীবনকে আরও সুন্দর করবে সেটা কল্পনা করুন। পুরোনো অভ্যাস ফেলে দিলে কী হারাবেন, এগুলো চিন্তা করে মাথা খারাপ করবেন না। পরিবর্তনের পর আপনার অবস্থা কল্পনা করুন যাতে পরিবর্তনের ব্যাপারে অধীর আগ্রহ বাড়ে। আর অতীতের সাথে জোড়া কমে।

আমি বলছি না যে এতে পরিবর্তনের পথ সহজ হবে। তবে এতে পরিবর্তনের কষ্ট অনেকটা কমবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00