📄 ৪০ বছরে পরিবর্তন
এই অধ্যায়ে আমরা প্রায়ই 'পরিবর্তন' বা 'বদল' শব্দদুটো দেখব। কারণ এ সময়টাতে তিনি নিজে তো বটেই; পরিবার, বন্ধুবান্ধব অনেকের পরিবর্তন দেখেছেন।
এই অধ্যায়ে আমরা কথা বলব, চল্লিশের কোঠার রাসূল-এর জীবন নিয়ে। সেই সঙ্গে যারা তাঁর পাশে ছিলেন, তাদের অনুপ্রেরণামূলক কাহিনিগুলোও বলব।
পরিবর্তন সহজ না। এজন্য প্রশিক্ষণ দরকার। এই অধ্যায়ের আরেকটি মূলশব্দ 'পরিবর্তন'। কেউ কেউ পরিবর্তনের জন্য প্রশিক্ষণের গুরুত্বকে খাটো করে দেখেন। মনে করেন, তথ্য শুষে নিলেই বুঝি আপনাআপনি মানুষ বদলে যায়; বরং এজন্য প্রয়োজন যেকোনো পরিবর্তনের পর নতুন সময়ের সাথে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য নিজের আচরণকে খাপ খাইয়ে নেওয়া।
এই অধ্যায়ে আমরা আরও দেখব, কোন কোন কারণ মানুষকে পরিবর্তনের জন্য তাড়া দেয়। বিশেষভাবে দেখব সেই সব প্রভাব সৃষ্টি করা পরিস্থিতিগুলো, যেগুলো মানুষের মাঝে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে। রাসূল -এর ডাকে বদলে যাওয়া অনেক মানুষের কাহিনি শুনব। আমরা পরিবর্তনের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলব। সেই সাথে পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী বদলে যাওয়া, অকেজো অভ্যাস ছেড়ে দেওয়া এবং যেটা বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করতে পারে, সেগুলো নিয়েও কথা বলব।
আমরা আরও দেখব, মক্কায় অবতীর্ণ হওয়া কুরআনের আয়াতগুলোতে প্রথম দিকের কনভার্টেড মুসলিমদের পরিবর্তনের ধারা ও কার্যকারণ। কেমন করে এ আয়াতগুলো তাদের হৃদয় নাড়িয়ে দিয়েছিল? না-বদলানো মূর্তিপূজারীদের কথাও শুনব। কেনই-বা তারা বদলাতে চায়নি, তাও জানব।
কেন সাধারণভাবে বেশিরভাগ লোক বদলে যেতে ভয় পায়, বা বদলানোর চিন্তাকে বাতিল করে দেয়? আমাদের কিছু অভ্যাস, পরিবেশ নিজেদের বদলানোর পথে বড় বাধা। প্রয়োজনে এসব অভ্যাস আর পরিবেশও ছেড়ে দিতে হয়। রাসূল যে মক্কা ছেড়ে মদিনায় গেলেন কেন? আসুন জেনে নিই।
চল্লিশ বছর বয়সকে মানুষের জীবনের পালাবদলের সময় ধরা হয়। এ বয়সের উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেন,
'যখন সে বলিষ্ঠ হয়, চল্লিশ বছরে পৌঁছে তখন বলে, 'প্রভু, আমাকে, আমার বাবা-মাকে যে-অনুগ্রহ দিয়েছেন, সেজন্য কৃতজ্ঞতা আদায় করার সামর্থ্য দিন'। আহকাফ: ১৫
৪০ বছর বয়সে হওয়া রাসূল-এর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন শুরু করব। পর্বত গুহায় রাসূল চিন্তামগ্ন। হঠাৎ করে অভূতপূর্ব একটা ব্যাপার ঘটে গেল। মহান আল্লাহর এক বার্তাবাহক (ফেরেশতা) তাঁর সামনে এসে বললেন, 'পড়'! রাসূল ভীষণ ভয় পেলেন। তিনি বার বার বলছিলেন, তিনি পড়তে জানেন না। আতঙ্কে তাঁর কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। ফেরেশতা তাঁকে খপ করে ধরে প্রচণ্ড জোরে ঝাঁকি দিলেন। আবার বললেন, 'পড়'! রাসূল-এর সামনে পড়ার মতো কিছুই ছিল না যদিও। রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, 'কী পড়ব'? ফেরেশতা আবার তাঁকে ঝাঁকি দিয়ে বললেন, 'পড়'! রাসূল আবারও বললেন যে তিনি অক্ষরজ্ঞানহীন। পড়তে জানেন না। ফেরেশতা শেষবারের মতো তাঁকে ঝাঁকি দিলেন। এবার এত জোরে যে তাঁর মনে হলো আত্মা বুঝি দেহ থেকে বের হয়ে যাবে। তিনি আবার বললেন, 'পড় তোমার সেই প্রভুর নামে যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন'। আল আ'লাক: ১
ফেরেশতা জিবরাঈলের সাথে রাসূল-এর এই ঘটনার পর তাঁর জীবন খোলনলচে বদলে গিয়েছিল। পর্বত গুহায় রাসূল-কে শারীরিকভাবে যন্ত্রণাময় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ফেরেশতা জিবরাঈল তাঁকে কঠিনভাবে চেপে ধরেছিলেন। কিন্তু তারপরও তিনি তাকে আবার দেখার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। লম্বা সময় ধরে তিনি যদি না-আসতেন তাহলে চিন্তিত হয়ে পড়তেন।
পরিবর্তন আমাদের সবার জন্য প্রচণ্ড কঠিন বা যন্ত্রণাময় হতে পারে। কারণ, এটা একজন মানুষকে আরামের জায়গা থেকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে অপরিচিত জায়গায় নিয়ে যায়। কিন্তু একবার যখন সে নতুন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেয়, তখন আর ব্যথা থাকে না। মানুষ আসলে পরিবর্তন নিয়ে দোনমনা করে না, তারা আসলে পরিবর্তনের সাথে আসা কষ্টকে ভয় পায়।
আপনাকেও কষ্ট সহ্য করার জন্য তৈরি থাকতে হবে। দিনশেষে এগিয়ে থাকার জন্য মূল্য দিতে হবে। বড় কোনো পরিবর্তন ফ্রি ফ্রি আসে না।
রাসূল খুব দ্রুত সাতজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পেরেছিলেন। তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রা) (৫৫ বছর), তাঁর কন্যা যাইনাব (রা), রুকাইয়া (রা) ও উম্ম কুলসুম (রা); তাঁর চাচাতো ভাই আলী ইবনে আবু তালিব (রা) (১০ বছর); সে-সময়ে তাঁর পালকপুত্র (পালকপুত্রে বিধান পরে বাতিল হয়ে যায়) যায়েদ ইবনে হারিসা (রা) (৩০ বছর); তাঁর বন্ধু আবু বকর (রা) (৩৮ বছর)।
আবু বকর (রা) আরও পাঁচজন লোককে বদলে দিয়েছিলেন। ওসমান ইবনে আফফান (রা) (৩৪ বছর), আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) (৩০ বছর), তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ, সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা) (১৯ বছর), আয যুবাইর ইবনে আল আওওয়াম (রা) (১৬ বছর)।
মজার বিষয় হচ্ছে, এই লোকগুলোর মধ্যে পরিবর্তন এত দ্রুত কীভাবে হলো? সাধারণভাবে মানুষের মাঝে আইডিয়াগুলোই বা কীভাবে ছড়ায়?
লিডারশিপ ও ম্যানেজমেন্ট থিউরিতে 'কানেক্টর' নামে একটা কথা আছে। এরা জানেন কীভাবে মানুষের সাথে লিংক করতে হয়। এরা একজন থেকে আরেকজনে অনুপ্রেরণা ও উদ্দীপনামূলক আইডিয়া নিয়ে যায়। আজকের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো ঠিক যেভাবে করে। এ ধরনের লোকদের মাধ্যমে আইডিয়া সফলভাবে ছড়ায়।
আবু বকর আস সিদ্দিক (রা) এখানে একজন কানেক্টর। তিনি বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের লোকদের সাথে সম্পর্ক রাখতেন। যেমন সা'দ ছিলেন টিনএজ বয়সী। অন্যদিকে ওসমান (রা)-এর বয়স ছিল ৩৪।
পরিবর্তনের আইডিয়াতে যারা আশ্বস্ত হয়েছিলেন, দ্রুতই তাদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। ১৩ থেকে ২০। এরপর ৩০। প্রথম দিকের ইসলামি ইতিহাসবিদ ইব্ন্ হিশাম এমনটাই বর্ণনা করেছেন।
আমরা এখন এমন কিছু লোকদের ব্যাপারে জানব, যারা তাদের জীবন বদলে ফেলেছিলেন (এক্ষেত্রে ইসলামে ফিরে এসেছিলেন)। আপনারা যারা নিজেদের জীবন বদলাতে চাচ্ছেন তাদের জন্য এই অভিজ্ঞতাগুলো নতুন কিছু দিতে পারে।
📄 আমর আস সুলামী (রা)
আমরা বিশেষ করে তাদের দিকে নজর দেব, যারা নিজেদের পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তাদের কাহিনি জানব, যাতে আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে মেলাতে পারি।
আমর (রা)-এর দ্রুত বদলে যাওয়া বেশ চমকপ্রদ ব্যাপার। রাসূল -এর সাথে খুব সংক্ষিপ্ত এক আলাপের পর তিনি তার জীবন পুরোপুরি বদলে ফেলেন। তাদের আলাপের শুরু হয়েছিল এভাবে-
- কে আপনি?
- আমি নবি।
- নবি কী?
- আমাকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন।
- কেন তিনি পাঠিয়েছেন?
- আত্মীয়তার সম্পর্ক জুড়তে, মূর্তি ভেঙে গুড়ো গুড়ো করতে, মহান আল্লাহর একত্ব ঘোষণা করতে।
- ঠিক আছে, আমি আপনাকে অনুসরণ করব।
এই আলাপচারিতার সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, আমর কী অসম্ভব দ্রুত বদলে ফেলেছিলেন নিজেকে! একটা কারণ হতে পারে যে, ইসলামের আগে তিনি তাওহিদবাদী ছিলেন। কাজেই রাসূল যখন মূর্তি ভেঙে গুড়ো গুড়ো করার কথা বললেন, সেটা তার কাছে বোধগম্য হয়েছে, গ্রহণযোগ্য হয়েছে। কিন্তু আরবের অনেকে তাওহিদবাদীই রাতারাতি বদলে যাননি। এক্ষেত্রে আমরের বেলায় কোথায় আলাদা কিছু ছিল?
কেউ কেউ বলতে পারেন, এটা আল্লাহর তরফ থেকে পথনির্দেশ। কিন্তু আরও কিছু মূল ফ্যাক্টর ছিল এই আলাপে যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একটা ফ্যাক্টও ছিল, অন্যের সাথে কথা বলার সময় রাসূল -এর আশ্বস্ত করার সামর্থ্য। সফল আলাপচারিতায় শুধু মুখের কথার বাইরেও অনেক ব্যাপারস্যাপার থাকে। যেমন- রাসূল-এর আন্তরিক মুখভঙ্গী, কণ্ঠে দরদ, প্রাণবন্ত দেহভঙ্গিমা- যা আমরা এই সংলাপ পড়ে উপলব্ধি করতে পারছি না।
জুদি বার্গুন (Judee Burgoon) ১৯৯৬ সালে এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, শুধু মুখের অঙ্গভঙ্গী দিয়ে ২০ হাজার ভিন্ন ভিন্ন হাবভাব প্রকাশ করা যায়।
আর মুখের হাবভাব মিথ্যা বলে না। ১৯৬৭ সালে উকলা (UCLA) গবেষণা থেকে বলা হয়েছে যে, ৯৩ ভাগ যোগাযোগই অবাচনিক (৫৫ ভাগ শারীরিক নড়াচড়া থেকে, ৩৮ ভাগ কন্ঠস্বর থেকে), মাত্র সাতভাগ আসে শব্দ বা কথা থেকে।
রাসূল -এর এক সমসাময়িক ব্যক্তি তাঁর ব্যাপারে বলেছেন, 'তাঁর চেহারা দেখেই বুঝেছি, কোনো মিথ্যুকের চেহারা এমন হতে পারে না'।
আমর ও অন্যান্যরা কীভাবে দ্রুত বদলে গিয়েছিল সেটা বুঝার জন্য রাসূল -এর কথা বলার স্টাইল খেয়াল করুন। কল্পনা করার চেষ্টা করুন অন্যের সাথে কথা বলার সময় তাঁর মুখভঙ্গী, কণ্ঠ, দেহভঙ্গী।
এবার আমর (রা)-এর সাথে রাসূল -এর আলাপের শেষ অংশ দেখি:
- আমি আপনাকে অনুসরণ করব।
- আজকে পারবেন না। দেখছেন না, আমি এবং আমার লোকেরা কী অবস্থায় আছি? আপনি আপনার লোকদের কাছে ফিরে যান। যদি শোনেন আমি এসেছি, তাহলে আমার কাছে আসবেন।
এই ঘটনার আরেকটি নজরকাড়া দিক হচ্ছে, রাসূল -কে না-দেখেই দশ বছরেরও বেশি সময় আমর মুসলিম ছিলেন। এরপর আবার রাসূল -কে দেখেন যখন তিনি মদিনায় বসতি গড়েন।
হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি যখন শুনলেন রাসূল মদিনায় এসেছেন, তখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
- 'আমাকে চিনতে পারছেন'?
- 'হ্যাঁ। মক্কায় দেখা হয়েছিল আপনার সাথে'।
ক্ষণিকের সেই আলাপচারিত কতটা ছাপ ফেলেছিল সেটাও এখান থেকে বুঝা যায়।
📄 আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)
মক্কার পূর্ব দিকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে হুযাইল নামক জায়গা থেকে আবদুল্লাহ এসেছিলেন। শৈশব থেকেই তিনি এখানে মেষ চড়াতেন। একবার তিনি যখন মেষ চড়াচ্ছিলেন, তখন রাসূল তাঁর পাশ দিয়ে গেলেন। ভেড়ার দুধ খেতে চাইলেন। আবদুল্লাহ দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, তিনি পারবেন না, কারণ ভেড়াগুলো তার না। রাসূল তখন তাকে বললেন কমবয়সী একটা ছাগল নিয়ে আসতে। তিনি কুরআনের একটা আয়াত পড়লেন, ছাগলের ওলান দুধে ভরে উঠল। রাসূল ও আবদুল্লাহ পিয়াস মিটিয়ে খেলেন। আবদুল্লাহর জন্য এটাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
📄 মানুষ কীভাবে বদলায়?
আবদুল্লাহ ও আমর দুজনের বেলাতেই আসল প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে ও কেন কিছু লোক রাতারাতি পুরোই বদলে যায়। মহান আল্লাহর পথনির্দেশ তো ছিলই, রাসূল তাদের অনুভূতির ওপর বড় ধরনের নাড়া দিতে পেরেছিলেন।
চিপ (Chip) ও ড্যান হিথ (Dan Heath) এই যুক্তি তুলে ধরেছেন যে, বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায়ে নাড়া পড়লে মানুষের বিশ্বাস ও অভ্যাস যতটা বদলায়, তারচেয়েও বেশি বদলায় মানুষ যখন তার আবেগের পর্যায়ে নাড়া খায়।
এর মানে এই না যে, যুক্তি মানুষকে বদলাতে পারে না। যুক্তি ও আবেগ দুটোই কাজ করে। তবে পরিবর্তনের বেলায় এদুটোর যেটার আধিপত্য বেশি সেটাই পরিবর্তনের প্রকৃতির ওপর বেশি প্রভাব ফেলবে।
যুক্তিচিন্তা মানুষের মধ্যে যে-পরিবর্তনগুলো আনে সেগুলো খুব নির্দিষ্ট। স্পষ্ট। যেমন- আপনি যখন আপনার খরচের হাত কমাতে চান এবং বেতনের দশ ভাগ জমাতে চান, তখন ত্রাঁ বুঝা যায় যে পাঁচবছর পর আপনি একটা ফ্ল্যাট কেনার জন্য এমন করছেন।
যৌক্তিক এই পরিবর্তন একটা ক্রমধারা মেনে হয় চলে। আর তা হচ্ছে, 'বিশ্লেষণ-চিন্তা-পরিবর্তন' বা (Analyze-Think-Change)'। অন্যদিকে যে পরিবর্তন আবেগে দোলা দিয়ে আসে সেটার ক্রমধাপ আলাদা। 'দেখা-অনুভব-পরিবর্তন' বা '(See-Feel-Change)। বড় ধরনের ব্যাপক পরিবর্তনে এটা প্রায়ই দেখা যায়।
ড্যান আর চিপ হিথ লিখেছেন, 'সাধারণত এমন হয় না যে, না-বুঝার কারণে মানুষ বদলাতে পারেনি। ধূমপায়ীরা জানে সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ, কিন্তু তাও ছাড়ে না। কিছুটা হলেও আমরা তাদের এই অবস্থা বুঝতে পারি। কীভাবে করতে হবে এটা জানা, আর করার জন্য উদ্দীপ্ত হওয়া এদুটোর মধ্যে যে পার্থক্য আছে, তা আমরা জানি। কিন্তু অন্যের আচরণ পরিবর্তনের বেলায় প্রথমেই আমাদের মাথায় আসে তাকে কিছু শেখাতে হবে'।
আবেগের কারণে বদলে গেছেন এমন আরও নজির আছে। এর কারণ, তারা যা দেখেছেন বা শুনেছেন তা তাদের ভালোর দিকে বদলে যেতে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছে।
দাউস গোত্রের একজন নেতা তুফাইল আমর। মক্কার দক্ষিণে আল বাহা নামক জায়গায় তিনি থাকতেন। রাসূল ﷺ-কে তিনি কুরআনের কিছু আয়াত তেলাওয়াত করতে শোনেন। আর তাতেই তার হৃদয়ে শিহরণ বয়ে যায়। তিনি বলতে বাধ্য হন, 'আমার জীবনে এর চেয়ে ভালো কিছু শুনিনি কখনো'।
তিনি ইসলামে আসার পর তার পরিবারসহ আরও ৭০ জনকে ইসলাম গ্রহণে রাজি করান। আল কুরআনের শব্দ আর রাসূল ﷺ-এর বাচনভঙ্গি দুটোই বেশ শক্তিশালী ছিল।
দিম্মাদ সালাবা ছিলেন প্রসিদ্ধ ডাকিনিবিদ। জিনের আসর ও জাদুটোনা থেকে মানুষকে মুক্ত করতেন। তার পরিবর্তন ছিল পুরো ১৮০ ডিগ্রি। তিনিও রাসূল ﷺ-এর মুখে কুরআন পাঠ শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। বলেছেন, 'একরম কথা তো কোনো দিন শুনিনি'।
আবু যর (রা) ছিলেন গিফার অঞ্চলের তাওহিদবাদী। মক্কা থেকে ২৫০ কিলোমিটার উত্তরে গিফার। রাসূল ﷺ-এর সাথে দেখা করে জায়গায় দাঁড়িয়েই ইসলামে প্রবেশ করেন। কুরাইশ বা অন্যরা কী করবে না-করবে এ নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। হাদীসে পাওয়া যায়, ইসলাম গ্রহণের কারণে একদল মূর্তিপূজারি দুষ্কৃতিকারীরা তার ওপর হামলা করেছিল।
এই তিনজন মানুষের প্রত্যেকের বেলায় কমন ব্যাপার হচ্ছে পরিবর্তনের চিন্তার ব্যাপারে তাদের খোলামন। পরিবর্তনের ব্যাপারে যাদের মন বন্ধ, তারা একে তাদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখবে।
বদলে যাওয়ার পর কী কী বদলাতে হবে (যেমন অভ্যাস, স্মৃতি ইত্যাদি) সেগুলোতে তাদের নজর ছিল না; বরং পরিবর্তনের পর নতুন যে- জীবনব্যবস্থায় তারা কাটাবেন, সেদিকে তাদের খেয়াল ছিল।