📄 সৃষ্টিশীল হোন
গত অধ্যায়ে আমরা কিশোর রাসূল-কে দেখেছি। কীভাবে তিনি চ্যালেঞ্জে মোকাবিলা করেছেন, তাঁর এনার্জিকে প্রোডাক্টিভ উপায়ে ব্যবহার করে কাজ ও সফর থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন সেগুলো দেখেছি।
এই অধ্যায়ে আমরা দেখব ২০ ও ৩০-এর কোঠার রাসূল-কে। যে বয়সে একজন তার লব্ধ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজসেবা করতে পারে।
রাসূল মক্কায় 'উদীয়মান তারকা'-তে পরিণত হন। সমস্যা সমাধানে তাঁর দক্ষতার কারণে মানুষের নজর কেড়েছিলেন। কাবাঘর নির্মাণ নিয়ে কুরাইশদের মধ্যকার বিতণ্ডা নিরসনে তিনি চমৎকার এক সমাধান বের করে দেন।
ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি সততার খ্যাতি অর্জন করেন। গ্রাহকদের আস্থা কুড়ান। সে সময়ের মক্কার এক শ্রদ্ধাভাজন ব্যবসায়ী নারী খাদিজার শ্রদ্ধা অর্জন করেন। তাঁরা দুজনে পরে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ঘরে ছিল চার মেয়ে, দুই ছেলে।
📄 বাস্তব মডেল
পরিণত বয়সের রাসূল-এর যে দিকটা সবচেয়ে অনুপ্রেরণা জাগায় তা হচ্ছে, কিশোর বয়স থেকেই দায়িত্ব গ্রহণের মানসিকতা। চাচার পরিবারকে সহযোগিতা করার জন্য তিনি রাখাল হিসেবে কাজ করেছেন। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য সিরিয়ায় গিয়েছেন। মানুষের সাথে সুন্দরভাবে কথা বলেছেন। ইফেক্টিভলি ডিল করেছেন। কিন্তু তাই বলে অন্যকে খুশি করার জন্য নিজের আদর্শে ছাড় দেননি। তরুণ বয়সে তাঁর মধ্যে এই গুণগুলো স্বাভাবিক ছিল। কেউ কেউ ভাবেন, রাসূল মনুষ্য ক্ষমতার বাইরে। কিন্তু কথাটা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যেতে পারে। যেমন, সেই একই লোক হয়ত কুরআনের এই আয়াত উদ্ধৃত করবেন,
'আল্লাহর রাসূল-এর মধ্যে তোমাদের জন্য অবশ্যই চমৎকার উদাহরণ আছে'। আয যুখরুফ: ৭৩
কিন্তু সেই তিনিই হয়ত মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলবেন, রাসূল বলে অমুক অমুক কাজ করতে পেরেছেন। আমরা কি আর পারব?
গভীর ও নিখাদ শ্রদ্ধার কারণে কোনো কোনো মুসলিম ভাবেন তাদের আর তাঁর জীবনের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। রাসূল-এর কাহিনি শুধু সমীহ জাগানোর জন্য। এতে কি কোনো বাস্তব উদাহরণ নেই, যা থেকে আমরা আরও ভালো মানুষে পরিণত হতে পারি? আমরা তাঁর জীবনী পড়ি, তাঁর প্রতি ভক্তি জাগে। কিন্তু নিজের জীবনে কীভাবে তাঁর জীবন দৃষ্টান্ত প্রয়োগ করতে পারি, সেটা দেখি না।
চ্যালেঞ্জটা এখানেই। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ধরে রেখে কীভাবে তাঁকে আমরা আমাদের প্রতিদিনের জীবনে অনুপ্রেরণা হিসেবে প্রয়োগ করব।
বিষয়টা এভাবে দেখুন, একজন মানুষ তার মনুষ্য ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে যত সেরা হতে পারেন, রাসূল ছিলেন তা-ই। আমাদের কাজ হলো কত ভালোভাবে আমরা এখন তাকে অনুসরণ করতে পারি, সেই পথ খোঁজা।
এতদিন পর্যন্ত আপনি কী করলেন আর রাসূল তাঁর এক জীবনে কী করেছেন, তার মধ্যে বিস্তর ফারাক। সাধারণ চোখে দেখলে এতে আপনি হতাশ হয়ে পড়তে পারেন। কিন্তু বিষয়টাকে এভাবে না-দেখে মোটিভেশন হিসেবে নিন। রাসূল যা করেছেন আপনি কখনো তাঁর কাছাকাছি যেতে পারবেন না, এমনটা ভেবে কখনো হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবেন না।
নবি হওয়ার আগেও কিন্তু তিনি অসাধারণ মানুষ ছিলেন। কুরআন তাঁকে বর্ণনা করছে, 'নৈতিক চরিত্রের পরাকাষ্ঠা হিসেবে'। আল কুলাম: ৪
এই আয়াত যখন অবতীর্ণ হয়, তখনও তিনি কিন্তু মক্কাতেই ছিলেন। বিষয়টা এমন না যে, এই আয়াত অবতীর্ণের পর তার চরিত্র এক রাতের মধ্যে বদলে গেছে; বরং বছরের পর বছর ধরেই তাঁর চরিত্র এমন ছিল। কাজেই আমরা বলতে পারি, নবি হওয়ার আগেই তিনি নীতিবাগিশ ছিলেন। নবি হওয়ার পর সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।
খাদিজাকে বিয়ের সময় তাঁর বয়স ছিল ২৫। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছিলেন, তিনি তাঁকে ভালোবাসেন তাঁর দয়া, সততা ও সত্যবাদিতার জন্য। তখন কিন্তু তিনি নবি ছিলেন না।
তরুণ বয়সে রাসূল কেমন ছিলেন, সেটা বুঝার জন্য আমরা তার শারীরিক অ্যাপিয়ারেন্স দিয়ে শুরু করব। কারণ একজন ব্যক্তির অ্যাপিয়ারেন্স সাধারণত শৈশবে বদলায়। আর তরুণ বয়সে মুখমণ্ডলের বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আমরা তার মুখ ও চালচলন দিয়ে শুরু করব। কারণ এ দুটো কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে প্রথম আমাদের নজর কাড়ে।
📄 রাসূল ﷺ দেখতে কেমন ছিলেন?
নির্ভরযোগ্য উৎসগুলো থেকে রাসূল ﷺ-কে যেমন পাওয়া যায়-
তাঁর মুখ ছিল কিছুটা গোলাকৃতির। দীপ্ত সুন্দর চেহারা। লালাভ ফর্সা গায়ের রং। মুখে কোনো দাগ ছিল না। মসৃণ। কালো বড় চোখ। বড় চোখের পাতা। সাদা দাঁত। কণ্ঠ ছিল নরম। ঠাণ্ডায় অনেকের গলা যেমন হয়। তবে অনেকের স্বাভাবিক কণ্ঠও এরকম হয়। চুলগুলো মাঝারি। তা কাঁধ স্পর্শ করেনি। আবার খুব ছোটও ছিল না। তিনি যখন চুল কাটতে দেরি করতেন, তখন তা কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছাত। যখন তিনি তা কাটতেন, তিনি কান পর্যন্ত কাটতেন অথবা কানের লতি পর্যন্ত।
তাঁর উচ্চতা ও গড়ন ছিল মাঝারি। প্রশস্ত কাঁধ। পেটানো শরীর। পেশিবহুল না; তবে যথেষ্ট ভারি হাত, মোটা আঙুল। পা ও অন্যান্য অঙ্গগুলো সোজা ও লম্বা। পায়ের পাতার বাইরের বাঁকানো অংশটা মাটিতে লাগত না।
তাঁর হাঁটার মধ্যে একটা কর্মচঞ্চলতা ছিল। সতেজ ভাব ছিল। মাটির সাথে পা ঘেঁষে ঘেঁষে চলতেন না। তাড়া না-থাকলে ধীরস্থিরভাবে হাঁটতেন। শান্তভাবে কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটতেন, যেন কোনো ঢালু বেয়ে নামছেন।
তার চলাফেরা ছিল দ্রুত। কারও দিকে ফিরলে পুরো শরীর ঘুরিয়ে ফিরতেন। শুধু মাথা ঘোরাতেন না। তাঁর ঘাম ছিল মুক্তোর মতো, এত স্বচ্ছ ছিল সেগুলো। কস্তুরি ও অম্বরের চেয়ে তাঁর গায়ের ঘ্রাণ সুন্দর ছিল।
বাহ্যিক রূপ জেনে কী হবে? বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে তো আর বুঝা যায় না বইটা কেমন। কাজেই নবি মুহাম্মাদ ﷺ-এর বাহ্যিক রূপ জানার প্রয়োজন কী?
রাসূল ﷺ-এর কিছু কিছু ব্যাপার মহান আল্লাহর তরফ থেকে উপহার। তবে কিছু আছে যা রাসূল ﷺ-এর বাহ্যরূপ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আপনি আপনার জীবনে কাজে লাগাতে পারেন।
তাঁর দাঁতগুলোর মধ্যকার স্বাভাবিক যে ফাঁক ছিল, আপনার হয়ত তেমন না; কিন্তু দাঁতের যত্ন ও সেগুলো সাদা ও পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে আপনি নজর দিতে পারেন। আপনার গায়ের স্বাভাবিক ঘ্রাণ হয়ত কস্তুরির মতো না, যেমনটা রাসূল-এর ছিল (আর এটা কেবল তাঁর বেলাতেই ইউনিক ছিল), কিন্তু আপনি নিয়মিত গোসল করতে পারেন। হাতপা ধুয়ে রাখতে পারেন। আরও যেসব দিক আপনি খেয়াল রাখতে পারেন-
| রাসূল-এর বাহ্যিকরূপ | আপনার বাহ্যিকরূপ |
| :--- | :--- |
| রাসূল-এর চুল পরিপাটি ছিল। | আপনি চুল আঁচড়ান। |
| রাসূল মোটাসোটা ছিলেন না। তাঁর দাঁত সাদা ছিল। | শরীরচর্চা করুন। স্বাস্থ্যকর খাবার খান। ক্যাভিটি ও হলুদ হয়ে যাওয়া থেকে নিজের দাঁতকে রক্ষা করুন। |
বিষয়গুলো নতুন কিছু না। কিন্তু এগুলো মানুষ খুব সহজেই ভুলে যায়। যেমন ফ্লসিং ও হালকা ব্যায়াম।
📄 রাসূল ﷺ-এর ব্যক্তিত্ব
রাসূল-এর ব্যক্তিত্বের যে দিকটা আপনাকে নাড়া দিতে পারে, তা হলো ভারসাম্য বজায় রেখে চলা। তিনি সহজে লোকজনদের সাথে মেলামেশা করতেন, বন্ধুবান্ধবদের সাথে শক্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন, সমাজকে সাহায্য করার জন্য উদ্ভাবনীমূলক পদক্ষেপ নিতেন। কিন্তু একই সময়ে দৈনন্দিন জীবনের সমস্যায় পুরোপুরি ডুবে যেতেন না। একাকী চিন্তাভাবনার প্রয়োজনের কথা ভুলে যেতেন না। প্রথমে আমরা দেখব রাসূল তাঁর স্থানীয় সমাজের সাথে কীভাবে মেলামেশা করেছেন। ৫৯১ সালে বাণিজ্য নগরী মক্কায় একটা ঘটনা বেশ তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল। মক্কার এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আল আস ইব্ন্ ওয়াইল এক ইয়েমেনি ব্যবসায়ীর থেকে পণ্য নিয়েছিল টাকা শোধ না করে। সেই ইয়েমেনি মক্কার নেতাদের হস্তক্ষেপ কামনায় আকুতি জানিয়েছিল।
সম্মানীয় নেতারা আল আসের কাছে যেয়ে তাকে টাকা দিতে বাধ্য করে। এরকম অবিচার যেন আবার না-হয় এবং মক্কার বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিতে যেন বিরূপ প্রভাব না-আসে, নগর নেতারা সেজন্য একটা চুক্তি করেন। এর নাম হিলফুল ফুদূল (মর্যাদাপূর্ণদের মৈত্রী)। ন্যায্য লেনদেন নিশ্চিত করার জন্য এই চুক্তি। বহিরাগত ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষাও এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল।
রাসূল তখন যদিও মাত্র ২১ বছরের তরুণ, তিনি বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন চুক্তি করার জন্য। বিশিষ্ট গোষ্ঠীপ্রধান আবদুল্লাহ জুদআনের বাড়িতে তারা জড়ো হয়েছিলেন। তিনি সেখানে কেবল পর্যবেক্ষণকারী রূপে ছিলেন না; বরং সেই চুক্তির মুখর সমর্থক ছিলেন।
অনেক দশক পর রাসূল এ ঘটনার উল্লেখ করে বলেন,
'আবদুল্লাহ জুদআনের বাড়িতে একটি চুক্তিতে আমি সাক্ষী ছিলাম, ইসলামের সময়ও যদি আমাকে এই চুক্তিতে ডাকা হতো, তাহলে আমি সাড়া দিতাম।'
এই ঘটনা থেকে সমাজের ইস্যুগুলো নিয়ে আমরা চিন্তা করতে শিখি। এর আপনার বয়স বা ভূমিকা রাখার ধরন যা-ই হোক, সমাজ পরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখুন। পরিবর্তনের জন্য আপনার বয়স অনেক কম-বেশী এসব সাতপাঁচ না-ভেবে নিজের ব্যক্তিত্ব বিকশিত করুন। তখন আপনি নিজেই আপনাকে সমাজের উঁচুদের মাঝে খুঁজে পাবেন।