📄 সমাজ
আমরা এখন দেখব সপ্তম শতকে মক্কার সামাজিক পরিবেশ কেমন ছিল সেটা। নারীদের ভূমিকা এবং সংখ্যালঘু অনারবরা কীভাবে সামাজিক বাধা টপকে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছিলেন সেটাও দেখব।
প্রতিটা গোষ্ঠীতে অনেকগুলো গোত্র ও বাড়তি পরিবার ছিল। যেমন কুরাইশ গোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ নাযর। কিন্তু এর মধ্যে দশটা গোত্র ছিল। এসব গোত্রের প্রধান ছিল নাযরের দশ পুত্র। সমাজের প্রকৃতি ও মানুষের মনমানসিকতার ওপর গোষ্ঠীয় কাঠামোর বড়সড় প্রভাব ছিল। যে গোষ্ঠী যত শক্তিশালী, সেই গোষ্ঠীর মানুষজন নিজেদের তত বেশি নিরাপদ মনে করতেন। কেউ হামলা করলে সেই হামলাকারীর পুরো গোষ্ঠীকে তার দায় বহন করতে হতো। খেসারত হিসেবে সবাই মিলে 'রক্তমূল্য' দিত।
কোনো ফুটবল দলের কট্টর সমর্থকরা যেমন সেই দলের চরম অনুগত, সেই সময়ের গোষ্ঠীর লোকদের বিশ্বস্ততা ছিল তেমন। গোত্রের প্রথম পূর্বপুরুষের সাথে যার সম্পর্ক যত কাছের, তার বিশ্বস্ততা তত বেশি। গোত্রবন্ধনের উদাহরণ নিয়ে একটা আরবি প্রবাদ আছে: 'আমি আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে, আমার ভাই ও আমি আমার চাচাতো ভাইয়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু আমি ও আমার চাচাতো ভাইয়েরা সবাই অপরিচিত লোকের বিরুদ্ধে'।
একই গোত্রের মধ্যে সহজেই মারামারি লেগে যেত। কুরাইশ গোত্রের নেতা কুসাইয়ের মৃত্যুর পর তার ছেলেদের মধ্যে মারামারি লেগে যায় কাবার দখল নিয়ে (পরের অধ্যায়ে এ ব্যাপারে আরও কথা আছে)।
তবে গোত্রের প্রতি বিশ্বস্ততার মানে এই না যে, কেউ আজীবন তার সঙ্গে থাকবে। গুরুতর কোনো অপরাধের কারণে গোত্রপতিরা মিলে কাউকে বের করে দিতে পারত। যে বের হয়ে যেত তার কপালে আরও শনি ছিল। কারণ, তখন কেউ আর তাকে নিরাপত্তা দিত না। ফলে যে কেউ চাইলে তার ওপর হামলা করতে পারত। সে হতো সহজ শিকার। চাইলে কেউ তাকে মেরেও ফেলতে পারত।
এই অঞ্চলের প্রধান উন্মুক্ত বাজারের নাম ছিল সুক উকাজ। কোনো কোনো গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কৃত সদস্যের নাম সেখানে জানিয়ে দিত। মদ খাওয়া নিয়ে আল-বারাদ ইব্ন কাইস তার গোষ্ঠীর নামহানি করেছিল। তার গোষ্ঠী ৫৯০ সালে বাজারে তাকে ঘোষণা দিয়ে বহিষ্কার করে। কখনো কখনো কোনো কোনো সদস্য এক গোষ্ঠী থেকে বের হয়ে অন্য গোষ্ঠীতে যোগ দিতে পারত। সেক্ষেত্রে তারা তখন সেই গোষ্ঠীর পূর্ণ নিরাপত্তা ভোগ করত। অনেকটা আজকের যুগের সিটিজেনশিপ বা নাগরিকত্ব দেওয়ার মতো। তবে দ্বৈত নাগরিকত্বের মতো দুই গোত্রের অধীনে থাকার সুযোগ ছিল না।
পারস্পরিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য আজকাল যেমন আন্তর্জাতিক জোটচুক্তি হয় তখনও হতো। তখন আন্তগোষ্ঠীয় চুক্তি হতো। যেমন তীর্থযাত্রীদের ভালোভাবে দেখাশোনার জন্য কুরাইশরা মক্কার অন্যান্য গোষ্ঠীর সাথে জোট বেধেছিল। সিরিয়া ও ইয়েমেনে তাদের দুটো বাণিজ্য কাফেলা যেত। তো ওগুলো যেন নিরাপদে যাওয়া-আসা করতে পারে, সেজন্য তারা আরব উপদ্বীপের অন্যান্য বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাথে বাণিজ্য চুক্তি করে। সূরা কুরাইশে এর উল্লেখ আছে।
গোষ্ঠী আর গোষ্ঠীর সদস্যের মধ্যে যেমন পারস্পরিক নিরাপত্তার অলিখিত চুক্তি ছিল, এসব জোটের মধ্যেও অনুরূপ চুক্তি ছিল। কোনো এক গোষ্ঠীর উপর হামলা মানে পুরো জোটের উপর হামলা।
সেই সমাজে আরেক ধরনের সম্পর্ক ছিল- জাওয়ার। কোনো লোক যদি ভিন্ন কোনো অঞ্চলে সফরে যেত, তাহলে তার গোষ্ঠী সেই অঞ্চলের স্থানীয় কোনো গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে নিরাপত্তার আবেদন করতে পারত। আজকের দিনে আন্তর্জাতিক শরণার্থী ব্যবস্থা অনেকটা এর আদলেই তৈরি।
আমরা এখন দেখব সপ্তম শতকে মক্কার সামাজিক পরিবেশ কেমন ছিল সেটা। নারীদের ভূমিকা এবং সংখ্যালঘু অনারবরা কীভাবে সামাজিক বাধা টপকে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছিলেন সেটাও দেখব।
প্রতিটা গোষ্ঠীতে অনেকগুলো গোত্র ও বাড়তি পরিবার ছিল। যেমন কুরাইশ গোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ নাযর। কিন্তু এর মধ্যে দশটা গোত্র ছিল। এসব গোত্রের প্রধান ছিল নাযরের দশ পুত্র। সমাজের প্রকৃতি ও মানুষের মনমানসিকতার ওপর গোষ্ঠীয় কাঠামোর বড়সড় প্রভাব ছিল। যে গোষ্ঠী যত শক্তিশালী, সেই গোষ্ঠীর মানুষজন নিজেদের তত বেশি নিরাপদ মনে করতেন। কেউ হামলা করলে সেই হামলাকারীর পুরো গোষ্ঠীকে তার দায় বহন করতে হতো। খেসারত হিসেবে সবাই মিলে 'রক্তমূল্য' দিত।
কোনো ফুটবল দলের কট্টর সমর্থকরা যেমন সেই দলের চরম অনুগত, সেই সময়ের গোষ্ঠীর লোকদের বিশ্বস্ততা ছিল তেমন। গোত্রের প্রথম পূর্বপুরুষের সাথে যার সম্পর্ক যত কাছের, তার বিশ্বস্ততা তত বেশি। গোত্রবন্ধনের উদাহরণ নিয়ে একটা আরবি প্রবাদ আছে: 'আমি আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে, আমার ভাই ও আমি আমার চাচাতো ভাইয়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু আমি ও আমার চাচাতো ভাইয়েরা সবাই অপরিচিত লোকের বিরুদ্ধে'।
একই গোত্রের মধ্যে সহজেই মারামারি লেগে যেত। কুরাইশ গোত্রের নেতা কুসাইয়ের মৃত্যুর পর তার ছেলেদের মধ্যে মারামারি লেগে যায় কাবার দখল নিয়ে (পরের অধ্যায়ে এ ব্যাপারে আরও কথা আছে)।
তবে গোত্রের প্রতি বিশ্বস্ততার মানে এই না যে, কেউ আজীবন তার সঙ্গে থাকবে। গুরুতর কোনো অপরাধের কারণে গোত্রপতিরা মিলে কাউকে বের করে দিতে পারত। যে বের হয়ে যেত তার কপালে আরও শনি ছিল। কারণ, তখন কেউ আর তাকে নিরাপত্তা দিত না। ফলে যে কেউ চাইলে তার ওপর হামলা করতে পারত। সে হতো সহজ শিকার। চাইলে কেউ তাকে মেরেও ফেলতে পারত।
এই অঞ্চলের প্রধান উন্মুক্ত বাজারের নাম ছিল সুক উকাজ। কোনো কোনো গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কৃত সদস্যের নাম সেখানে জানিয়ে দিত। মদ খাওয়া নিয়ে আল-বারাদ ইব্ন কাইস তার গোষ্ঠীর নামহানি করেছিল। তার গোষ্ঠী ৫৯০ সালে বাজারে তাকে ঘোষণা দিয়ে বহিষ্কার করে। কখনো কখনো কোনো কোনো সদস্য এক গোষ্ঠী থেকে বের হয়ে অন্য গোষ্ঠীতে যোগ দিতে পারত। সেক্ষেত্রে তারা তখন সেই গোষ্ঠীর পূর্ণ নিরাপত্তা ভোগ করত। অনেকটা আজকের যুগের সিটিজেনশিপ বা নাগরিকত্ব দেওয়ার মতো। তবে দ্বৈত নাগরিকত্বের মতো দুই গোত্রের অধীনে থাকার সুযোগ ছিল না।
পারস্পরিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য আজকাল যেমন আন্তর্জাতিক জোটচুক্তি হয় তখনও হতো। তখন আন্তগোষ্ঠীয় চুক্তি হতো। যেমন তীর্থযাত্রীদের ভালোভাবে দেখাশোনার জন্য কুরাইশরা মক্কার অন্যান্য গোষ্ঠীর সাথে জোট বেধেছিল। সিরিয়া ও ইয়েমেনে তাদের দুটো বাণিজ্য কাফেলা যেত। তো ওগুলো যেন নিরাপদে যাওয়া-আসা করতে পারে, সেজন্য তারা আরব উপদ্বীপের অন্যান্য বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাথে বাণিজ্য চুক্তি করে। সূরা কুরাইশে এর উল্লেখ আছে।
গোষ্ঠী আর গোষ্ঠীর সদস্যের মধ্যে যেমন পারস্পরিক নিরাপত্তার অলিখিত চুক্তি ছিল, এসব জোটের মধ্যেও অনুরূপ চুক্তি ছিল। কোনো এক গোষ্ঠীর উপর হামলা মানে পুরো জোটের উপর হামলা।
সেই সমাজে আরেক ধরনের সম্পর্ক ছিল- জাওয়ার। কোনো লোক যদি ভিন্ন কোনো অঞ্চলে সফরে যেত, তাহলে তার গোষ্ঠী সেই অঞ্চলের স্থানীয় কোনো গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে নিরাপত্তার আবেদন করতে পারত। আজকের দিনে আন্তর্জাতিক শরণার্থী ব্যবস্থা অনেকটা এর আদলেই তৈরি।
📄 নারী
সমাজ নারীদের প্রতি নিষ্ঠুর ছিল। তখন লড়াই আর কাজেকর্মে পুরুষদের দাম দিত। ইসলাম আসার আগে কমন কিছু কাজের মধ্যে ছিল-
* মেয়ে জন্ম দেওয়ার কারণে স্ত্রীকে ছেড়ে দিত।
* বহুবিবাহের কোনো সীমা ছিল না। এক পুরুষ একাধিক বোনকে একসাথে বিয়ে করতে পারত।
* বিয়ের পর অন্য নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য ছিল।
* ছেলে সন্তানের আশায় যদি মেয়ে সন্তান হতো তাহলে সেই মেয়েকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হতো। কী নৃশংস! কুরআন পরে এই চর্চা নিষিদ্ধ করে। আত তাকভীর: আয়াত ৮-৯
নারীদের প্রতি সমাজে এত উল্টোস্রোত থাকার পরও কিছু নারী সমাজে নিজেদের আলাদা অবস্থান করে নিতে পেরেছিলেন। পুরুষরা তাদেরকে তাদের সমান ভাবত। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন-
* খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ: বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। যুবক মুহাম্মাদ -কে তার ব্যবসা দেখাশোনার কাজে নিয়োগ দেন। পরে তাঁকে বিয়ে করেন।
* আরওয়া বিনতে হারব: আবু লাহাবের স্ত্রী। তার প্ররোচনাতেই আবু লাহাব তার ভাতিজার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগে ছিল। শুধু তাই না, তার প্রভাব এত বেশি ছিল যে, তিনি তার দুই ছেলেকে দিয়ে রাসূল -এর দুই মেয়েকে তালাক দেওয়ান।
ইসলামে এই দুই নারীর অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই প্রান্তে। তবে তারা দুজনই যে সমাজের প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছিলেন, সেক্ষেত্রে দুজনেই এক।
ব্যবসায়ী হিসেবে খাদিজা (রা) বিচক্ষণ ছিলেন। ব্যবসাপাতির সবকিছুতে তখন ছিল পুরুষদের একচেটিয়া আধিপত্য। এ রকম পরিবেশেও তিনি তার বিচারবুদ্ধি ও পুঁজির সফল প্রয়োগ করেছিলেন। আপনার পরিস্থিতিও এমন হতে পারে। আপনার পরিবার, জীবনসঙ্গী বা বস আপনার সমর্থন না-ই করতে পারে। ওসব গায়ে না মেখে আপনি বরং নিজের প্রতিভা বের করে সেটা কাজে লাগান।²
টিকাঃ
২. বৈরী পরিবেশে মুসলিম সমাজে খ্যাতিলাভকারী নারীদের ব্যাপারে আরও জানতে 'উইমেন ইন্সপায়ারড বাই দ্য বিলাভড' (লন্ডন, ২০০৭) নামে আমার অডিও লেকচার শুনুন।
সমাজ নারীদের প্রতি নিষ্ঠুর ছিল। তখন লড়াই আর কাজেকর্মে পুরুষদের দাম দিত। ইসলাম আসার আগে কমন কিছু কাজের মধ্যে ছিল-
* মেয়ে জন্ম দেওয়ার কারণে স্ত্রীকে ছেড়ে দিত।
* বহুবিবাহের কোনো সীমা ছিল না। এক পুরুষ একাধিক বোনকে একসাথে বিয়ে করতে পারত।
* বিয়ের পর অন্য নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য ছিল।
* ছেলে সন্তানের আশায় যদি মেয়ে সন্তান হতো তাহলে সেই মেয়েকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হতো। কী নৃশংস! কুরআন পরে এই চর্চা নিষিদ্ধ করে। আত তাকভীর: আয়াত ৮-৯
নারীদের প্রতি সমাজে এত উল্টোস্রোত থাকার পরও কিছু নারী সমাজে নিজেদের আলাদা অবস্থান করে নিতে পেরেছিলেন। পুরুষরা তাদেরকে তাদের সমান ভাবত। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন-
* খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ: বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। যুবক মুহাম্মাদ -কে তার ব্যবসা দেখাশোনার কাজে নিয়োগ দেন। পরে তাঁকে বিয়ে করেন।
* আরওয়া বিনতে হারব: আবু লাহাবের স্ত্রী। তার প্ররোচনাতেই আবু লাহাব তার ভাতিজার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগে ছিল। শুধু তাই না, তার প্রভাব এত বেশি ছিল যে, তিনি তার দুই ছেলেকে দিয়ে রাসূল -এর দুই মেয়েকে তালাক দেওয়ান।
ইসলামে এই দুই নারীর অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই প্রান্তে। তবে তারা দুজনই যে সমাজের প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছিলেন, সেক্ষেত্রে দুজনেই এক।
ব্যবসায়ী হিসেবে খাদিজা (রা) বিচক্ষণ ছিলেন। ব্যবসাপাতির সবকিছুতে তখন ছিল পুরুষদের একচেটিয়া আধিপত্য। এ রকম পরিবেশেও তিনি তার বিচারবুদ্ধি ও পুঁজির সফল প্রয়োগ করেছিলেন। আপনার পরিস্থিতিও এমন হতে পারে। আপনার পরিবার, জীবনসঙ্গী বা বস আপনার সমর্থন না-ই করতে পারে। ওসব গায়ে না মেখে আপনি বরং নিজের প্রতিভা বের করে সেটা কাজে লাগান।²
টিকাঃ
২. বৈরী পরিবেশে মুসলিম সমাজে খ্যাতিলাভকারী নারীদের ব্যাপারে আরও জানতে 'উইমেন ইন্সপায়ারড বাই দ্য বিলাভড' (লন্ডন, ২০০৭) নামে আমার অডিও লেকচার শুনুন।
📄 বিদেশিরা
আফ্রিকা, সিরিয়া, মিশর, ইরাকের ব্যবসায়ী ও কারিগরদের অনেকে মক্কায় থাকতেন। এদের মধ্যে দাস ও স্বাধীন উভয় ধরনের মানুষ ছিলেন। তারা ছিলেন আরব অনারবের মিক্স। এদের বেশিরভাগই বাইজেন্টাইনের খ্রিষ্টানদের অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে এখানে পালিয়ে এসেছিলেন। অন্যান্যদের মধ্যে কেউ কেউ মক্কা ও তার আশেপাশের এলাকায় কাজের খোঁজে এসেছিলেন।
এদের সংখ্যা ঠিক কত সে ব্যাপারে জানা যায় না। তবে বিভিন্ন উৎস থেকে ধারণা এদের সংখ্যা কয়েক শ হবে। ধর্মবিশ্বাসে এরা খ্রিষ্টান। কামার, ট্যানার, স্বর্ণকার ও অন্যান্য কারিগরি দক্ষতায় এদের কদর ছিল। তাছাড়া স্থানীয় জনগণের সাথে তাদের সম্ভাব ছিল।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, এদের কিন্তু কোনো গোষ্ঠীয় নিরাপত্তা ছিল না। তারপরও এরা তাদের বিশেষ দক্ষতা আর প্রতিভার কারণে সমাজে সফল হয়েছিলেন। যেমন-
• জাবরা আর-রুমি: তিনি পেশায় ছিলেন কামার। ধর্মগ্রন্থের প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। রাসূল-এর ভালো বন্ধু ছিলেন। মূর্তিপূজারি আরবদের কেউ কেউ এজন্য দাবি করেছিল যে, এই লোকই নবিকে কুরআন শিখিয়েছে। কুরআনের এক আয়াতে এই অভিযোগের উল্লেখ আছে,
'আমি ভালো করেই জানি তারা কী বলে। তারা বলে, 'নবিকে তো এক লোক এসব শিখিয়ে দেয়'। তারা যে লোকের কথা বলে তার ভাষা তো অনারবি। অথচ এই কুরআন স্পষ্ট আরবিতে'। আন নাহল: ১০৩
ইয়াসার আর রুমি: তিনি জাবরার বন্ধু। ধর্মগ্রন্থের প্রতি তারও বেশ আগ্রহ ছিল। দুজনের নামের শেষে রুমি আছে বলে ভাববেন না তাদের মধ্যে পারিবারিক কোনো সম্পর্ক আছে। রুমি নামে বিখ্যাত এক সুফি কবি আছেন। এর মানে আসলে 'রোমান' বা 'বাইজেন্টাইন'। ঐ অঞ্চল থেকে যারা আসত তাদেরকে এই নাম দেওয়া হতো।
সুহাইব আর রুমি: মক্কায় এসেছিলেন এক কাপড়ে। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেখানকার শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীর খাতায় নাম লেখান। এছাড়াও আরও অনেক বিদেশি ছিলেন। যেমন পারস্যের সালমান ফারসি। সিরিয়ার বালা'আম সুরি। ইথিয়োপিয়ার বিলাল হাবশি। কপটিক এক কাঠমিস্ত্রী ছিলেন। তার নাম জানা যায় না।
সেই সময়ের আরবে ভাষাদক্ষতার আলাদা কদর ছিল। তাদের ভিন্ন মর্যাদায় দেখা হতো। কিন্তু অনারবরা কথা বলতেন ভাঙা ভাঙা আরবিতে। তবে তাদের জ্ঞান ও দক্ষতার কারণে তারা অন্যদের ছাড়িয়ে যান।
ক্ল্যাসিকাল আরবি জানেন না বলে আজকাল অনেকে হীনমন্যতায় ভোগেন। কিন্তু মক্কায় ভিনদেশিদের সাফল্য আমাদের ভিন্ন কথা বলে। নিজের দুর্বল দিক নিয়ে পড়ে থাকার মানে হয় না; বরং নিজের শক্তির দিকগুলো ঝালাই করার দিকে অনুপ্রেরণা দেয়।
টম রুথ তার স্ট্রেনস ফাইন্ডার ২.০ বইতে বলেছেন, নিজের কমতিগুলো পূরণ করার চেয়ে শক্তির দিকগুলো বিকশিত করার পেছনে শ্রম দিলে সাফল্যের সম্ভাবনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তিনি গবেষণা করে দেখেছেন, যারা নিজেদের শক্তির দিকটাতে বেশি ফোকাস করেন, তারা তাদের কাজে ছয়গুণ বেশি মগ্ন থাকতে পারেন। সাধারণভাবে তাদের জীবনের মান তিনগুণ বেশি থাকে বলে তারা বলে থাকেন।³
আমি কাউকে আরবি ভাষা বা অন্য কোনো দক্ষতা শিখতে নিষেধ করছি না। শুধু সতর্ক করছি, আপনি নিজে যাতে ভালো, সেটাকে উপেক্ষা করে বা সেটার কদর না করে অন্য কিছু নিয়ে আচ্ছন্ন হয়ে থাকবেন না।
উকাজ বাজারে মুহাম্মাদ, ব্যবসায় ও জনমণ্ডলে নারীরা এবং বিদেশি সংখ্যালঘুরা আমাদেরকে মানুষের আসল শক্তি দেখায়। উদ্বেগের জায়গা নিয়ে মাথা নষ্ট না-করে, তারা যাতে ভালো সেটা নিয়ে কাজ করেছেন। হাতের কাছে সব উপায় উপকরণ থাকুক কী না-থাকুক, সমাজের সাহায্য পান কী না-পান, যেখানেই থাকুন নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টা করুন। নিজের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র ধরে রাখুন।
টিকাঃ
৩. দেখুন- রুথ, স্ট্রেন্থস ফাইন্ডার ২.০।
আফ্রিকা, সিরিয়া, মিশর, ইরাকের ব্যবসায়ী ও কারিগরদের অনেকে মক্কায় থাকতেন। এদের মধ্যে দাস ও স্বাধীন উভয় ধরনের মানুষ ছিলেন। তারা ছিলেন আরব অনারবের মিক্স। এদের বেশিরভাগই বাইজেন্টাইনের খ্রিষ্টানদের অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে এখানে পালিয়ে এসেছিলেন। অন্যান্যদের মধ্যে কেউ কেউ মক্কা ও তার আশেপাশের এলাকায় কাজের খোঁজে এসেছিলেন।
এদের সংখ্যা ঠিক কত সে ব্যাপারে জানা যায় না। তবে বিভিন্ন উৎস থেকে ধারণা এদের সংখ্যা কয়েক শ হবে। ধর্মবিশ্বাসে এরা খ্রিষ্টান। কামার, ট্যানার, স্বর্ণকার ও অন্যান্য কারিগরি দক্ষতায় এদের কদর ছিল। তাছাড়া স্থানীয় জনগণের সাথে তাদের সম্ভাব ছিল।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, এদের কিন্তু কোনো গোষ্ঠীয় নিরাপত্তা ছিল না। তারপরও এরা তাদের বিশেষ দক্ষতা আর প্রতিভার কারণে সমাজে সফল হয়েছিলেন। যেমন-
• জাবরা আর-রুমি: তিনি পেশায় ছিলেন কামার। ধর্মগ্রন্থের প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। রাসূল-এর ভালো বন্ধু ছিলেন। মূর্তিপূজারি আরবদের কেউ কেউ এজন্য দাবি করেছিল যে, এই লোকই নবিকে কুরআন শিখিয়েছে। কুরআনের এক আয়াতে এই অভিযোগের উল্লেখ আছে,
'আমি ভালো করেই জানি তারা কী বলে। তারা বলে, 'নবিকে তো এক লোক এসব শিখিয়ে দেয়'। তারা যে লোকের কথা বলে তার ভাষা তো অনারবি। অথচ এই কুরআন স্পষ্ট আরবিতে'। আন নাহল: ১০৩
ইয়াসার আর রুমি: তিনি জাবরার বন্ধু। ধর্মগ্রন্থের প্রতি তারও বেশ আগ্রহ ছিল। দুজনের নামের শেষে রুমি আছে বলে ভাববেন না তাদের মধ্যে পারিবারিক কোনো সম্পর্ক আছে। রুমি নামে বিখ্যাত এক সুফি কবি আছেন। এর মানে আসলে 'রোমান' বা 'বাইজেন্টাইন'। ঐ অঞ্চল থেকে যারা আসত তাদেরকে এই নাম দেওয়া হতো।
সুহাইব আর রুমি: মক্কায় এসেছিলেন এক কাপড়ে। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেখানকার শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীর খাতায় নাম লেখান। এছাড়াও আরও অনেক বিদেশি ছিলেন। যেমন পারস্যের সালমান ফারসি। সিরিয়ার বালা'আম সুরি। ইথিয়োপিয়ার বিলাল হাবশি। কপটিক এক কাঠমিস্ত্রী ছিলেন। তার নাম জানা যায় না।
সেই সময়ের আরবে ভাষাদক্ষতার আলাদা কদর ছিল। তাদের ভিন্ন মর্যাদায় দেখা হতো। কিন্তু অনারবরা কথা বলতেন ভাঙা ভাঙা আরবিতে। তবে তাদের জ্ঞান ও দক্ষতার কারণে তারা অন্যদের ছাড়িয়ে যান।
ক্ল্যাসিকাল আরবি জানেন না বলে আজকাল অনেকে হীনমন্যতায় ভোগেন। কিন্তু মক্কায় ভিনদেশিদের সাফল্য আমাদের ভিন্ন কথা বলে। নিজের দুর্বল দিক নিয়ে পড়ে থাকার মানে হয় না; বরং নিজের শক্তির দিকগুলো ঝালাই করার দিকে অনুপ্রেরণা দেয়।
টম রুথ তার স্ট্রেনস ফাইন্ডার ২.০ বইতে বলেছেন, নিজের কমতিগুলো পূরণ করার চেয়ে শক্তির দিকগুলো বিকশিত করার পেছনে শ্রম দিলে সাফল্যের সম্ভাবনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তিনি গবেষণা করে দেখেছেন, যারা নিজেদের শক্তির দিকটাতে বেশি ফোকাস করেন, তারা তাদের কাজে ছয়গুণ বেশি মগ্ন থাকতে পারেন। সাধারণভাবে তাদের জীবনের মান তিনগুণ বেশি থাকে বলে তারা বলে থাকেন।³
আমি কাউকে আরবি ভাষা বা অন্য কোনো দক্ষতা শিখতে নিষেধ করছি না। শুধু সতর্ক করছি, আপনি নিজে যাতে ভালো, সেটাকে উপেক্ষা করে বা সেটার কদর না করে অন্য কিছু নিয়ে আচ্ছন্ন হয়ে থাকবেন না।
উকাজ বাজারে মুহাম্মাদ, ব্যবসায় ও জনমণ্ডলে নারীরা এবং বিদেশি সংখ্যালঘুরা আমাদেরকে মানুষের আসল শক্তি দেখায়। উদ্বেগের জায়গা নিয়ে মাথা নষ্ট না-করে, তারা যাতে ভালো সেটা নিয়ে কাজ করেছেন। হাতের কাছে সব উপায় উপকরণ থাকুক কী না-থাকুক, সমাজের সাহায্য পান কী না-পান, যেখানেই থাকুন নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টা করুন। নিজের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র ধরে রাখুন।
টিকাঃ
৩. দেখুন- রুথ, স্ট্রেন্থস ফাইন্ডার ২.০।
📄 অর্থনীতি
কৃষিকাজের জন্য মক্কার আবহাওয়া ছিল বৈরি। সেই সময়ে সেখানকার অর্থনীতি পুরোটাই ছিল বাণিজ্যনির্ভর। তৎকালীন দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তি ইয়েমেন আর সিরিয়া ছিল মক্কার দুপাশে। অর্থনীতি চাঙা রাখতে তারা এর ভালো ব্যবহার করেছিল।
দেশিবিদেশি নানারকম পণ্য মক্কায় যেত। ভারত, মিশর, সিরিয়া, পারস্য ও ইয়েমেন থেকে পারফিউম, অলংকার, পোশাক, খাবার আমদানি করা হতো। সিরিয়া ও ইয়েমেনে বছরে গড়ে সাত সাতটা বাণিজ্য কাফেলা যেত। আরবের বাজারে এসব পণ্যের বিপুল চাহিদা তারা জানত। হাটবাজার ও হজ্জের মৌসুমে তাই এগুলো পাওয়ার সুব্যবস্থা করত।
ব্যবসায়ী হিসেবে কুরাইশদের তীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায় আমর ইবনুল আসের ঘটনায়। মুসলিম শরণার্থীরা ইথিয়োপিয়াতে গিয়েছিলেন। তাদেরকে সেখান থেকে বহিষ্কার করার জন্য কুরাইশ মূর্তিপূজারীরা তাকে পাঠিয়েছিলেন বনিবনা করার জন্য। তিনি উপহার হিসেবে পোড়ানো চামড়া নিয়ে গিয়েছিলেন। ঝানু ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি জানতেন চামড়ার ব্যাপারে ইথিয়োপিয়ানদের দুর্বলতা।
ইরাক আর সিরিয়া থেকে মালামাল নিয়ে মক্কার ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ইথিয়োপিয়া যাতায়াত করতেন। ফিরে আসতেন ইথিয়োপিয়ান পণ্যসামগ্রী নিয়ে। ব্যবসা খাতে সরাসরি অনেকে কাজ করতেন। নারীরা বা যারা বয়সের কারণে পারতেন না, তারা টাকা বিনিয়োগ করতেন। বা তাদের পক্ষে মালামাল বিক্রির জন্য অন্যদের ভাড়ায় খাটাতেন।
তো এই ছিল মক্কার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। আমরা একটু-আধটু দেখেছি মক্কার লোকজনদের মনমানসিকতা। দেখেছি কীভাবে সেখানকার নারী ও বিদেশিরা প্রতিকূল পরিবেশে সফল হয়েছিলেন। আমি এখন মক্কার বাজারের ভেতরে ঢুকব। দেখব সেখানে রাসূল কী করতেন। আমরা খুব বেশি ভেতরে ঢুকব না। শুধু দেখার চেষ্টা করব, যে পরিবেশে তিনি জীবনযাপন করেছিলেন সেটা। আমার উদ্দেশ্য, পরিবেশের ভেতর ডুবে না-যেয়েও বা নিজের স্বাতন্ত্র না হারিয়েও আপনি যে তার মনিব হতে পারেন সেটা দেখানো।
কৃষিকাজের জন্য মক্কার আবহাওয়া ছিল বৈরি। সেই সময়ে সেখানকার অর্থনীতি পুরোটাই ছিল বাণিজ্যনির্ভর। তৎকালীন দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তি ইয়েমেন আর সিরিয়া ছিল মক্কার দুপাশে। অর্থনীতি চাঙা রাখতে তারা এর ভালো ব্যবহার করেছিল।
দেশিবিদেশি নানারকম পণ্য মক্কায় যেত। ভারত, মিশর, সিরিয়া, পারস্য ও ইয়েমেন থেকে পারফিউম, অলংকার, পোশাক, খাবার আমদানি করা হতো। সিরিয়া ও ইয়েমেনে বছরে গড়ে সাত সাতটা বাণিজ্য কাফেলা যেত। আরবের বাজারে এসব পণ্যের বিপুল চাহিদা তারা জানত। হাটবাজার ও হজ্জের মৌসুমে তাই এগুলো পাওয়ার সুব্যবস্থা করত।
ব্যবসায়ী হিসেবে কুরাইশদের তীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায় আমর ইবনুল আসের ঘটনায়। মুসলিম শরণার্থীরা ইথিয়োপিয়াতে গিয়েছিলেন। তাদেরকে সেখান থেকে বহিষ্কার করার জন্য কুরাইশ মূর্তিপূজারীরা তাকে পাঠিয়েছিলেন বনিবনা করার জন্য। তিনি উপহার হিসেবে পোড়ানো চামড়া নিয়ে গিয়েছিলেন। ঝানু ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি জানতেন চামড়ার ব্যাপারে ইথিয়োপিয়ানদের দুর্বলতা।
ইরাক আর সিরিয়া থেকে মালামাল নিয়ে মক্কার ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ইথিয়োপিয়া যাতায়াত করতেন। ফিরে আসতেন ইথিয়োপিয়ান পণ্যসামগ্রী নিয়ে। ব্যবসা খাতে সরাসরি অনেকে কাজ করতেন। নারীরা বা যারা বয়সের কারণে পারতেন না, তারা টাকা বিনিয়োগ করতেন। বা তাদের পক্ষে মালামাল বিক্রির জন্য অন্যদের ভাড়ায় খাটাতেন।
তো এই ছিল মক্কার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। আমরা একটু-আধটু দেখেছি মক্কার লোকজনদের মনমানসিকতা। দেখেছি কীভাবে সেখানকার নারী ও বিদেশিরা প্রতিকূল পরিবেশে সফল হয়েছিলেন। আমি এখন মক্কার বাজারের ভেতরে ঢুকব। দেখব সেখানে রাসূল কী করতেন। আমরা খুব বেশি ভেতরে ঢুকব না। শুধু দেখার চেষ্টা করব, যে পরিবেশে তিনি জীবনযাপন করেছিলেন সেটা। আমার উদ্দেশ্য, পরিবেশের ভেতর ডুবে না-যেয়েও বা নিজের স্বাতন্ত্র না হারিয়েও আপনি যে তার মনিব হতে পারেন সেটা দেখানো।