📄 আবদুল্লাহ
আমরা জানি তিনি ২৫ বছর বয়সে মারা যান। তবে তিনি কিন্তু এর আগেও মারা যেতে পারতেন! যমযম কূপের খোঁজ পাওয়ার পর আবদুল মুttalibের সাথে কুরাইশের অন্যান্য নেতাদের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। বিরোধের কারণ- যমযম কূপের দখল কে নেবে। সেই বিরোধের মীমাংসা হলে তিনি চাইলেন, এই কূপের উত্তরাধিকার দখল প্রজন্মের পর প্রজন্ম তার ছেলে-নাতিরা পাক। একবার মানত করলেন, আল্লাহ যদি তাকে দশটা ছেলে দেন, তাহলে তিনি তাদের মধ্যে একজনকে কুরবানী করে দেবেন।
আল্লাহ তাকে সত্যিই দশজন ছেলে দিলেন। একদিন তিনি তাদের সবাইকে খড়ের গাদা থেকে খড় টানতে বললেন। যে সবচেয়ে ছোট খড় টানবে তাকেই কুরবানী দেওয়া হবে। আবদুল্লাহ সবচেয়ে ছোট খড় টানলেন। তার বুক ধক করে উঠল। আবদুল্লাহকে কুরবানী দিতে হবে, এমনটা যে তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। তিনি ছিলেন তার সবচেয়ে কাছের আর আদরের ছেলে। হয়ত এ কারণেই নাতি মুহাম্মাদের প্রতিও তার টান বেশি ছিল।
তো তার কিছু বন্ধু তাকে বললেন, গণকের কাছে যেতে। সে হয়ত তাকে মানসম্মান বাঁচিয়ে কোনো বিকল্প বলে দেবে। তিনি গেলেন। গণক বলল ছেলের বদলে ১০০ উট কুরবানী দিতে। তিনি তা-ই করলেন।
এই ঘটনাও তিনি তার নাতিদের কাছে বলে থাকবেন। কিন্তু এই ঘটনা 'থেকে আমাদের কী ফায়দা?
• আপনাকে যারা সহযোগিতা করবে তাদের খোঁজ করুন (এক্ষেত্রে তার সন্তানেরা)।
• পরিবার দিয়ে অনুগৃহীত করায় মহান আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা জানান।
• অন্যের উপদেশ শুনতে একগুঁয়ে হবেন না (এই ঘটনায় তার বন্ধুরা)।
• নিজের আইডিয়াগুলো অন্যদের জানান। ভালো ভালো আইডিয়া নিয়ে চুপ করে বসে থাকবেন না। কে জানে, হয়ত এমন কোনো আইডিয়াই অন্যের জীবন বাঁচাতে পারে।
আবদুল্লাহর কথায় ফিরে আসি। তিনি বেশ সুদর্শন ছিলেন। সন্দেহ নেই, তিনি অনেকের নজর কেড়েছিলেন। তবে তার পারিবারিক মর্যাদা, কাবাঘরের দায়িত্ব আর পারিবারিক ব্যবসার কারণে সতর্ক থাকতে হয়েছে, যাতে তাকে দিয়ে এমন কোনো কাজ না-হয় যেটাতে বংশের মুখে চুনকালি পড়ে। যাহোক, তিনি আমিনাকে বিয়ে করলেন। কিন্তু সে বিয়ের সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। ফিলিস্তিন সফরের সময় তিনি অসুস্থ হয়ে মারা যান। রাসূল -এর জন্মের আগেই সন্তানের মুখ না দেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন।
যেসব অর্জন ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই দুএকজনের কলিজার জোরে। টাকাপয়সা বা জনবলের আধিক্যের কারণে না। বলুন তো, কজন মিলে কাবাঘর বানিয়েছিলেন? ইব্রাহীম ও তাঁর ছেলে ইসমাঈল (আলাইহিমাস-সালাম)। মাত্র দুজন। অথচ লাখ লাখ লোক এখন সেখানে হজ্জ করে। যে যমযম কূপ থেকে হাজিরা পানি খায়, সেই কূপ খুঁজে পেলেন আবদুল মুত্তালিব।
আমি চাই, এই ঘটনা আপনাকে অনুপ্রাণিত করুক। উপায়-উপকরণ যত কমই হোক না কেন, আপনার সামর্থ্য যত অল্পই হোক না কেন, জীবনের শেষ বিন্দু দিয়ে লড়াই করুন। দেখবেন, আল্লাহ তায়ালার সাহায্য পেয়ে গেছেন। লড়াকুর কোনো পরাজয় নাই।
তিনি ও তার সঙ্গীরা যে চরম বিপাকে পড়েছিলেন, তাতে করে তিনি সহজেই হাল ছেড়ে দিয়ে বাকিদের মতো নিজের কবর খুঁড়তে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি পানির উৎস খুঁজেছেন। পরে পেয়েছেনও। সেই পানি খেয়ে তিনিসহ বাকিদের প্রাণ বেঁচেছে। সুতরাং হাল ছাড়বেন না। সাফল্য আশেপাশে ছড়িয়ে আছে। আবদুল মুত্তালিব যে পানির উৎস পেলেন হয়ত তার নিরাশ সঙ্গীদের পায়ের তলাতেই তা লুকিয়ে ছিল।
'নিদারুণ বেদনার সময় মনকে শক্ত করুন। এমনকি মৃত্যুমুখে হলেও। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। আহত সিংহও জানে কীভাবে গর্জন করতে হয়'।
স্যামুয়েল হানাগিদ, দশম শতাব্দীর ইসলামিক স্পেনের হিব্রুভাষী কবি
'জীবনের কঠিন দুঃখ মোকাবিলার সাহস রাখুন। ছোটগুলোতে ধৈর্য ধরুন। প্রচণ্ড খেটেখুটে প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ অর্জনের পর শান্তিতে ঘুমোতে যান'। ভিক্টর হুগো
📄 পরিবারের সুব্যবহার
রাসূল এতিম ছিলেন। তবে একা ছিলেন না। পরিবারের অন্যান্যরা তাঁর বাবা-মা'র অভাব ঘুচিয়েছিলেন। তাদেরকে যারা চিনতেন তারা তাঁর কাছে তাদের গল্প করেছেন। এমনকি যারা সরাসরি তাদের চিনতেন না, তারাও তাদের কথা বলেছেন। তিনি মায়ের কাছ থেকে ত্যাগ শিখেছেন। বাবার কাছ থেকে ন্যায়পরায়নতা শিখেছেন। দাদার কাছ থেকে হার না-মানা মানসিকতার পাঠ নিয়েছেন। বড়দাদা হাশিমের কাছ থেকে দানশীলতা আর বড়দাদার দাদা কুসাইয়ের কাছ থেকে নেতৃত্বের গুণ শিখেছেন। তাঁর বর্ধিত পরিবার এভাবেই তাঁকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছে।
বর্ধিত পরিবার আজও আছে। কিন্তু ছেলেমেয়ে বড় করায় তাদের ভূমিকা আজ যেন হারিয়ে গেছে। সন্তান মানুষ করা আজ বাবা-মা'র একক দায়িত্ব হয়ে গেছে। এতে করে শিশুদের জগৎ ছোট হয়ে এসেছে। তাদের অভিজ্ঞতা সীমিত হয়ে পড়েছে।
মিশরীয় কবি আহমেদ শাওকি বলেন, 'মা শিক্ষক। তবে পরিবার আরও বড় শিক্ষক। পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের আছে নিজস্ব কিছু অভিজ্ঞতা। এগুলো ছেলেমেয়েদের বড় করতে সাহায্য করে। কিংবা শিশুর জীবন বদলে দিতে সাহায্য করে।'
ইতিহাস জুড়ে অনেকে বড় বড় মানুষ তাদের সাফল্যের পেছনে কোনো চাচা-মামা বা দাদা-নানার কথা বলেছেন। বাবা-মা'র কথা বলেননি। তাই বর্ধিত পরিবারের সুব্যবহার করুন। তাদের সবাইকে সক্রিয় শিক্ষক বানান। আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবনে এদের কার শিক্ষা কাজে লাগবে কে জানে!
রাসূল-এর পরিবারে নারীরাও সমানতালে অনুপ্রেরণা ছিলেন। আসুন এবার তাদের কয়েকজনের কথা জেনে নিই-
সালমা: হাশিমের স্ত্রী। বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। রাসূল- এর দাদা আবদুল মুত্তালিবকে তিনিই বড় করেছেন।
বারা আবদুল উয্যা: রাসূল-এর নানী। আমিনার মতো বিশ্বস্ত স্ত্রী ও মমতাময়ী মা গড়ার কৃতিত্ব তার।
ফাতিমা আমর: রাসূলের দাদি। ছয় বছর বয়সে দাদার বাড়িতে পালিত হওয়ার সময় তিনিই রাসূল-এর দেখাশোনা করেছেন।
পরিবারের এসব সদস্যরা কখনো গল্প শুনিয়ে, কখনো-বা নিজেদের জীবন কাহিনি শেয়ার করে শিশুদের বেড়ে তোলায় শিক্ষণীয় ভূমিকা পালন করতে পারেন।
📄 সন্তানকে বর্ধিত পরিবারের সাথে জুড়বেন কীভাবে?
অনেক পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা একসাথে থাকেন না। ভিন্ন শহরে বা ভিন্ন কোনো দেশে থাকেন। যে কারণে বাচ্চাকাচ্চারা তাদের প্রতি টান অনুভব করে না। সেক্ষেত্রে তাদের সাথে সন্তানদের ভালো সম্পর্ক করাটা একটা চ্যালেঞ্জ। এখানে আমরা কিছু বাস্তব আইডিয়া তুলে ধরছি-
• মোবাইলে ছবি দেখিয়ে তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। তার নাম, নামের অর্থ, তাদের ব্যাপারে অনুপ্রেরণামূলক কোনো ঘটনা শেয়ার করুন। যেভাবে রাসূল ﷺ-এর বর্ধিত পরিবারের সদস্যদের ঘটনা আমরা এ অধ্যায়ে বলেছি।
• সন্তানকে তার বংশগাছ দেখান। দেওয়ালে আঁকতে পারেন। কিংবা বড় আর্ট পেপারে। পরিবারের সদস্যদের কিমাত, কেন তাদের দরকার এগুলো তুলে ধরুন।
• অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আজকাল দূরের মানুষদের সাথে যোগাযোগ করা সহজ। স্কাইপে, মেসেঞ্জার, হোয়াটস অ্যাপের মতো অ্যাপগুলোর সঠিক ব্যবহার করুন।
এখন আমরা কথা বলব, রাসূল-এর মা-বাবা তার জীবনে কী ভূমিকা পালন করেছেন তা নিয়ে।
📄 বর্ধিত পরিবারের বিকল্প
অনেক সময় এমন হয় যে, বর্ধিত পরিবারের সদস্যরা কাছাকাছি থাকেন না। অথবা হতে পারে তারা সেই অর্থে সন্তানের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহায়ক নন। তাদের কাছে থাকলে সন্তান ভুল শিখবে। এক্ষেত্রে ভালো বিকল্প খুঁজতে হবে। ভালো বিকল্প হতে পারেন শিক্ষক, প্রতিবেশী। সন্তান বড় করার ভারটা যেন শুধু বাবা-মা'র একার ওপর না-পড়ে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এ অধ্যায়ে আমরা রাসূলের বর্ধিত পরিবারের ব্যাপারে কথা বলেছি। তাদের কারও কারও নাম, তারা কী করতেন সেসব জেনেছি। তাদের কোন কোন ঘটনা বা দিক রাসূল-এর জীবনে প্রভাব ফেলে থাকবে সেগুলোর উল্লেখ করেছি। নিচের টেবিলে আমরা দেখাবো কীভাবে আমরা রাসূল-এর জীবনের শিক্ষাগুলো বাস্তবে আমাদের সন্তান বড় করতে কাজে লাগাতে পারি। যাতে করে আমাদের পরিবারের বর্ধিত সদস্যরা আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়।
তিনি মদিনাতে জন্মেছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি চাইলে আবার সেখানে ফিরে যেতে পারতেন। কিন্তু একমাত্র পুত্র মুহাম্মাদের জন্য যাননি। মক্কাতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
রাসূল-এর বাবার মৃত্যুর সময় তার বয়স হবে বড়জোড় বিশের কোঠায়। চাইলে তিনি আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারতেন। সেটা না-করে তিনি বিশেষ গুণের পরিচয় দিয়েছিলেন। এটা অনেকের জন্যই অনেক বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে।
তার শাশুড়ি ফাতিমার সাথে তার আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর তা ছিঁড়ে যায়নি। যে কারণে মক্কাতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে তাকে বেগ পেতে হয়নি। বিধবা আমিনার সব খরচপাতির ব্যবস্থা করেছেন শ্বশুর আবদুল মুত্তালিব। এ থেকে বুঝা যায়, পুত্র আবদুল্লাহর মৃত্যুতেও তাদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক চমৎকার ছিল।
বউ-শাশুড়ির যুদ্ধ নতুন কিছু না। গ্রিক ট্র্যাজেডিগুলোতেও এর উপস্থিতি পাওয়া যায়। আজকাল তো এটা কৌতুকের পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। আমিনার সাথে শ্বশুরবাড়ির সুন্দর সম্পর্ক আমাদের বর্তমান সময়ের শ্বশুরশাশুড়ি ও বউদের অনুপ্রেরণা দেবে।