📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ > 📄 রাসূল ﷺ-এর পরিবারের নারী সদস্য

📄 রাসূল ﷺ-এর পরিবারের নারী সদস্য


রাসূল-এর পরিবারে নারীরাও সমানতালে অনুপ্রেরণা ছিলেন। আসুন এবার তাদের কয়েকজনের কথা জেনে নিই-
সালমা: হাশিমের স্ত্রী। বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। রাসূল- এর দাদা আবদুল মুত্তালিবকে তিনিই বড় করেছেন।
বারা আবদুল উয্যা: রাসূল-এর নানী। আমিনার মতো বিশ্বস্ত স্ত্রী ও মমতাময়ী মা গড়ার কৃতিত্ব তার।
ফাতিমা আমর: রাসূলের দাদি। ছয় বছর বয়সে দাদার বাড়িতে পালিত হওয়ার সময় তিনিই রাসূল-এর দেখাশোনা করেছেন।
পরিবারের এসব সদস্যরা কখনো গল্প শুনিয়ে, কখনো-বা নিজেদের জীবন কাহিনি শেয়ার করে শিশুদের বেড়ে তোলায় শিক্ষণীয় ভূমিকা পালন করতে পারেন।

তার আসল নাম শাইবা। মক্কার লোকেরা তাকে দেখে মুত্তালিব নামে এক ব্যক্তির দাস মনে করেছিল। সেজন্য তারা ঐ নামে ডেকেছিল। পরে ওই নামেই তিনি পরিচিত হন।

রাসূল তাঁর বংশের লোকদের ব্যাপারে জানতেন। তাদের অর্জনের ব্যাপারে জানতেন। মক্কার লোকদের একটা ঐতিহ্য ছিল। তারা গল্প-কবিতা দিয়ে তাদের পরিবারের কাহিনি গর্বের সাথে বলে যেত। বর্ধিত পরিবারের ভূমিকা কেবল জীবিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যারা মারা গিয়েছেন তারাও এর অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে তাদের যদি কোনো অনুপ্রেরণামূলক কীর্তি থাকে।

রাসূল-এর পূর্বপুরুষ আর তাদের যেসব অর্জন তাঁকে প্রভাবিত করেছিল, সে ব্যাপারে কিছু কথা বলে নেওয়া যাক। কুসাইকে দিয়ে শুরু করি।

কুসাই: মক্কায় কুরাইশ গোত্র একসময় দুর্বল ছিল। বিভক্ত ছিল। তিনি কুরাইশ গোত্রকে এক করেন। তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেন। তখন থেকেই মক্কার ইতিহাসে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ (Key Figure)। তার জন্ম মক্কাতে।

তবে বড় হয়েছেন মক্কার বাইরে। দীর্ঘ সময় পর সেখানে ফিরে খুযা গোত্রের এক মেয়েকে বিয়ে করেন। তখন খুযা গোত্র কাবার দায়িত্বে ছিল। কুরাইশ গোত্র এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পাক এমন এক আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে জেগে ওঠে। এজন্য তিনি তার গোত্রকে একতাবদ্ধ করেন এবং একসময় খুষা গোত্রকে সরিয়ে মক্কার রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের হাতে চলে আসে।

তিনি তখন যেসব দায়িত্ব পালন করতেন-
১. মক্কায় ভ্রমণকারীদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা।
২. হাজিদের পানি, দই, মধু সরবরাহ।
৩. কাবার রক্ষণাবেক্ষণ।
৪. প্রয়োজনে যুদ্ধের সময় হাল ধরা।

তিনি একা একা মক্কা শাসন করতে চাননি। 'ফোরাম' নামে তিনি একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সেখানে মক্কার অন্যান্য গোত্ররাও আলোচনায় বসত। নগর শাসন নিয়ে তাদের মতামত দিত। পরামর্শ দিত।

এখন সবচেয়ে মজার দিক হলো- কুসাই যে অবস্থায় ছিলেন, তাতে করে এ ধরনের স্বপ্ন ছিল দুঃস্বপ্ন। তার গোত্র বিভক্ত। তিনি বড় হয়েছেন মক্কার বাইরে। মক্কাবাসীদের কাছে তিনি বহিরাগতের চেয়ে বেশি কিছু না। তার তেমন কোনো সমর্থকও ছিল না। কিন্তু তিনি ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী। প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে তিনি তার স্বপ্ন পূরণ করেছেন। মক্কাবাসীদের শ্রদ্ধা অর্জন করে নিয়েছেন। ইতিহাসবিদ ইব্‌ন হিশাম তাকে ধর্মের সাথে তুলনা করেছেন। মানুষ যাকে সারাজীবন অনুসরণ করতে পারে।

উনার এসব কৃতিত্বের কথা রাসূল অবশ্যই শুনে থাকবেন। পারিবারিক বিভিন্ন আলাপচারিতায় এসব প্রসঙ্গ উঠে আসা অস্বাভাবিক না। এ থেকে রাসূল যেটা শিখে থাকবেন সেটা হচ্ছে, কোনো কিছু পরিবর্তনের জন্য যে শক্তি দরকার সেটা নিজের থেকেই নিতে হবে। আশপাশ থেকে না। তা না হলে পরিবর্তন আনা সম্ভব না।

আবদু মানাফ: মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকে না। মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। কিন্তু আদর্শ চির অমলিন, চিরকালীন। অনুসারীরা যদি আদর্শের অনুসরণ না করে ব্যক্তিপূজা করে, তাহলে একসময় সেটা দ্বন্দ্বে রূপ নেবেই। নেবে। চেঙ্গিস খান, টেমারলেন, আলেক্সান্ডার দ্যা গ্রেটের সময়ের পর এমনটাই হয়েছে। কুসাইয়ের মৃত্যুর পর মক্কাতেও তাই হয়েছে। কাবার দখল কে নেবে- এ নিয়ে তার দুই ছেলে আবদুদ দার ও আবদু মানাফের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে যায়। এক পর্যায়ে তারা নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নেয়।

সমাবেশ আয়োজন, প্রতিরক্ষার জন্য সেনা প্রস্তুত ও কাবার চাবি রক্ষণের ভার নেন আবদুদ দার। আর হাজিদের খানাপিনার দায়িত্ব নেন আবদু মানাফ। পরে এটা তিনি তার ছেলে হাশিমকে দেন। হাশিম ছিলেন রাসূল -এর দাদার দাদা।

হাশিম: গরিব আর হাজিদের খাওয়ানোর বিষয়টাকে তিনি বেশ সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন। তিনি তাদের সেরা উটের মাংস দিতেন। তার আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। তবে তারপরও তিনি নিজের পকেট থেকে খরচ করতেন। কুরাইশদের কাছ থেকে দান নিতেন।

এক কবি হাশিমের প্রশংসায় বলেছেন, 'মক্কার ভুখানাঙাদের জন্য আমর দুধে ভেজা খাবার তৈরি করেছে; শীত আর গ্রীষ্মের কাফেলা প্রতিষ্ঠা করেছে'।

ক্ষুধার্তদের খানাপিনার ব্যবস্থা করায় কবি হাশিমের প্রশংসা করেছেন। শীতে ইয়েমেনে আর গরমে সিরিয়াতে বাণিজ্য কাফেলা পাঠানোর ঐতিহ্য পুনরায় চালু করায় তাকে কৃতিত্ব দিয়েছেন।

দান করতে হলে আপনার কাছে অনেক টাকা থাকতে হবে ব্যাপারটা এমন না। হাশিমের কাছ থেকে আমরা তো তা-ই শিখি। টাকাপয়সা ছাড়াও আপনি আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারেন। অথবা সময় দিতে পারেন। এভাবেও মানুষের উপকার করা যায়। 'দান' করা যায়।

হজ্জের মৌসুমে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষদের সাথে তাকে চলতে হয়েছে। এত মানুষের সাথে চলতে যেয়ে তাকে নিঃসন্দেহে অনেক চাপ সামলাতে হয়েছে। কখনো কখনো মানুষের কটু ব্যবহার সহ্য করতে হয়েছে। অবশ্যই এগুলো তিনি ধৈর্যের সাথে করেছেন। মানুষ তাঁর উদারতা ও সহনশীলতার কথা তাঁর মারা যাওয়ার পরও মনে রেখেছে উপরের কবিতাটা তার প্রমাণ। সুতরাং রাসূল -ও যে এসব ঘটনা শুনে থাকবেন সেটা আশ্চর্যের না। হয়ত এসব ঘটনা থেকে তিনি অনুপ্রেরণাও নিয়ে থাকবেন।

রাসূল -এর পূর্বপুরুষদের মধ্যে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তার নানা ওয়াহাব আবদু মানাফ। তিনি মদিনার এক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি এবং গোত্র প্রধান ছিলেন। আমিনাকে তিনিই দৃঢ়চেতা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। যে কারণে আবদুল মুত্তালিব তার ছেলে আবদুল্লাহর সাথে তার বিয়ে দিতে রাজি হন।

আবদুল মুত্তালিব: আগেই বলেছি তার আসল নাম ছিল শায়বাহ। তিনি তার বাল্যকাল মদিনায় কাটিয়েছেন। মদিনার নাম তখন ইয়াসরিব। তার মায়ের নাম সালমা। তিনি তার উচ্চতা, সুদর্শন চেহারা আর স্বভাবজাত নেতৃত্বগুণের কারণে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। একসময় তিনি তার গোত্রের প্রধান হয়ে ওঠেন। মক্কার ইতিহাসে দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তার সাথে সম্পর্কিত। যথা-
১. যমযম কূপ পুনরায় খুঁজে পাওয়া
২. হস্তীবর্ষ

📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ > 📄 রাসূল ﷺ-এর মা-বাবা

📄 রাসূল ﷺ-এর মা-বাবা


এখন আমরা কথা বলব, রাসূল-এর মা-বাবা তার জীবনে কী ভূমিকা পালন করেছেন তা নিয়ে।

জুরহুম গোত্র যমযম কুয়াকে ঢেকে ফেলেছিল। তারা ছিল নবি ইবরাহীম (আ)-এর ছেলে নবি ইসমাঈল (আ)-এর মামার গোত্র। মক্কাবাসীদের অনেক দিনের বাসনা ছিল আবার যদি কোনোভাবে তারা এই কূপের খোঁজ পেতেন! কিন্তু কেউ জানত না যে, এটা কোথায় হারিয়ে গেছে। পানির উৎস খুঁড়তে যেয়ে রাসূল-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব এই কূপের মুখ খুঁজে পান। আনন্দে তার চোখমুখ ভরে গেল। মাটি থেকে তার দুহাতে পানি ছলকে উঠল। ঠিক যেমন উঠেছিল মা হাজেরার হাতে।

যমযম কূপ খুঁজে পাওয়ার পর মক্কার পানি সমস্যার একটা সুরাহা হলো বটে। কিন্তু কুরাইশ নেতাদের মধ্যে ঝামেলা লেগে গেল। আবদুল মুত্তালিবের হাতে এই কূপের নিয়ন্ত্রণে দেখে অনেকের ভালো লাগল না। তারা ঠিক করলেন সিরিয়ার এক যাজিকার মাধ্যমে এটার মীমাংসা হোক। পথে যেতে যেতে নতুন বিপত্তি হলো। তাদের সঙ্গে নেওয়া সব পানি ফুরিয়ে গেল। পানির অভাবে সবাই ধরেই নিয়েছিল যে মৃত্যু সুনিশ্চিত। এমনকি তারা তাদের কবর পর্যন্ত খুঁড়ে ফেলেছিল। কিন্তু আবদুল মুত্তালিব তা করলেন না। তিনি বললেন, 'মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করা ব্যর্থতা'। যেভাবে কোমর বেঁধে তিনি যমযমের কূপ খুঁজায় লেগে ছিলেন, সেভাবে সেই অবস্থাতেও তিনি পানি খুঁজতে লাগলেন। একসময় পেয়েও গেলেন। সেই পানি খেয়ে সবার প্রাণ বাঁচল। তাদের মনে হলো পুরো ঘটনাটা আবদুল মুত্তালিবের পক্ষে মহান আল্লাহর বিধান। যমযম নিয়ে তারা তাদের আপত্তি ওখানেই ছেড়ে দেন।

যমযম কূপের মুখ খুঁজে পাওয়ার ঘটনা নতুনভাবে বলা আমার উদ্দেশ্য না। এই ঘটনাটা শুনে বাল্যকালে রাসূল-এর মনে কী প্রভাব পড়েছিল সেটাই আমার উদ্দেশ্য। এই কাহিনিতে স্বপ্নপূরণে চোয়াল বাধা প্রতিজ্ঞার কথা বলা আছে। সমাজকে কিছু দেওয়ার কথা বলা আছে। পরিস্থিতি যা-ই হোক, আশেপাশের সব মানুষও যদি হাল ছেড়ে দেয়, তেমন পরিস্থিতিতেও হার না-মানা মানসিকতার কথা বলা আছে। কাহিনিটা আমাদে যেন বলছে, 'উঠে দাঁড়ান। চেষ্টা করুন। না পারলে আবার চেষ্টা করুন।'

রাসূল তাঁর জীবনে কতবার কত কঠিন কঠিন সব সময়ের মধ্যে দিয়ে গেছেন। এরকম সময়ে এমন কিছু দরকার যা মানুষকে উৎসাহ দেয়। মনকে শক্ত করে। দাদার সেই ঘটনা নিঃসন্দেহে রাসূল-এর কঠিন সময়ে উৎসাহ দিয়েছে।

জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করে অন্ধ্রাণিত করা পরিবারের বাড়তি সদস্যদের অন্যতম ভূমিকা। আপনার ও আপনার শিশু দুজনের জীবনেই তা প্রেরণা দিতে পারে। মানুষের পুরো জীবনই যে ঘটনাময়। কিন্তু দাদা- দাদি, নানা-naniদের এ ধরনের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রভাব অনেক জোরালো।

📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ > 📄 আমিনা

📄 আমিনা


তিনি মদিনাতে জন্মেছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি চাইলে আবার সেখানে ফিরে যেতে পারতেন। কিন্তু একমাত্র পুত্র মুহাম্মাদের জন্য যাননি। মক্কাতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
রাসূল-এর বাবার মৃত্যুর সময় তার বয়স হবে বড়জোড় বিশের কোঠায়। চাইলে তিনি আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারতেন। সেটা না-করে তিনি বিশেষ গুণের পরিচয় দিয়েছিলেন। এটা অনেকের জন্যই অনেক বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে।
তার শাশুড়ি ফাতিমার সাথে তার আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর তা ছিঁড়ে যায়নি। যে কারণে মক্কাতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে তাকে বেগ পেতে হয়নি। বিধবা আমিনার সব খরচপাতির ব্যবস্থা করেছেন শ্বশুর আবদুল মুত্তালিব। এ থেকে বুঝা যায়, পুত্র আবদুল্লাহর মৃত্যুতেও তাদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক চমৎকার ছিল।
বউ-শাশুড়ির যুদ্ধ নতুন কিছু না। গ্রিক ট্র্যাজেডিগুলোতেও এর উপস্থিতি পাওয়া যায়। আজকাল তো এটা কৌতুকের পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। আমিনার সাথে শ্বশুরবাড়ির সুন্দর সম্পর্ক আমাদের বর্তমান সময়ের শ্বশুরশাশুড়ি ও বউদের অনুপ্রেরণা দেবে।

কঠিন সময়গুলোতে মাথা ঠাণ্ডা রাখা, আতঙ্কিত না-হওয়া; বরং মহান আল্লাহর ওপর সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার বিষয়গুলো হস্তীবর্ষের শিক্ষা।

ইয়েমেনে আবরাহা নামক এক খ্রিষ্টান শাসক ছিলেন। ইথিয়োপিয়ান। তিনি সেখানে একটি গীর্জা নির্মাণ করেন। তার ইচ্ছে ছিল, আরব উপদ্বীপের সব তীর্থযাত্রীর পুণ্যজায়গা হবে ইয়েমেনে তার বানানো এই গীর্জা। তার এই খায়েশপূরণে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী কাবা। তাই তিনি ওটাকে মিটিয়ে দিতে চাইলেন। বিশাল সৈন্যবহর নিয়ে তিনি মক্কার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। রাসূল যে বছর জন্ম নেন এটা সে বছরেরই ঘটনা। আরবে হাতির দেখা পাওয়াটা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। আবরাহার বাহিনীতে ছিল বিশাল হাতি। যে কারণে আরবেরা এই ঘটনাকে 'হস্তীবর্ষ' নামে মনে রেখেছিল।

এই বিশাল বাহিনীর সামনে বিনা যুদ্ধে হাল ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আরবদের কোনো উপায় ছিল না। তবে আবদুল মুত্তালিবের মধ্যে এ নিয়ে কোনো আতঙ্কের ছাপ দেখা যায়নি। তিনি আবরাহার সাথে দেখা করতে চাইলেন। আবরাহার সৈন্যরা মক্কায় প্রবেশ মাত্রই লুটপাট শুরু করে দিয়েছিল। তারা আবদুল মুত্তালিবের উট ছিনতাই করেছিল। সেগুলো ফিরিয়ে নিতেই তিনি তার সাথে দেখা করেন।

আবদুল মুত্তালিবের কথা শুনে আবরাহার চোয়াল খুলে পড়ল। এই বৃদ্ধ বলে কী? আমরা তার শহর দখল করে নিয়েছি, তার দায়িত্বে থাকা কাবা ধ্বংস করতে এসেছি, কোথায় সে ওগুলোর মীমাংসার ব্যাপারে কথা বলবে; তা না, তিনি এসেছেন তার উটগুলো ফিরিয়ে নিতে! তিনি তাকে বললেন, 'আমি ভেবেছিলাম আপনি কাবার ব্যাপারে কথা বলতে এসেছিলেন। উট নিয়ে না'। আবদুল মুত্তালিব ঝটপট জবাব দিলেন, 'কাবার একজন প্রভু আছেন। তিনিই একে রক্ষা করবেন'।

আবরাহা কাবা ধ্বংস করার হুকুম দিলেন। কিন্তু তার হাতি এক চুলও নড়ল না। উপর থেকে পাখিরা নুড়িপাথর ফেলতে লাগল। সৈন্যদের দেহ গলে যেতে লাগল। বাকিরা পালিয়ে বাঁচল।

আরবদের চোখে এই ঘটনা ছিল অলৌকিক। পবিত্র শহর হিসেবে মক্কার মর্যাদা আরও বেড়ে গিয়েছিল।

কুরআনের ১০৫নং সূরায় این ঘটনা বলা আছে- 'হস্তীবাহিনীর সাথে তোমার প্রভু কি করেছিলেন দেখেছ? তিনি কি তাদের পরিকল্পনাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেননি? তিনি তাদের বিরুদ্ধে ঝাঁকেঝাঁকে পাখি পাঠিয়েছিলেন। পোড়া কাদামাটির নুড়ি বর্ষণ করেছেন। তাদের অবস্থা হয়েছিল ফসল তোলা খেতের মতো'।

আবদুল মুত্তালিব তার সন্তান আর নাতি-নাতনিদেরকে অসংখ্যবার এ ঘটনা বলে থাকবেন হয়ত। তিনি তাদের মধ্যে এই কথা গেঁথে দিয়েছিলেন যে, যেসব ঘটনা নিজের জীবনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে, সেসব ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ো না। মাথা ঠাণ্ডা রাখো, বিশ্বাস রাখো আল্লাহ তোমার সাথে আছেন। তিনি তোমাকে ভুলে যাবেন না। অত্যাচারীদের ওপর তিনি কখনো খুশি নন। তার ঘরের অমার্যাদা তিনি কখনো বরদাশত করবেন না।

হতাশার কাছে হার মানবেন না। নিজের ন্যায্য অধিকার ছাড়বেন না; বরং ভদ্রভাবে সেগুলোর দাবি করুন। মনে রাখবেন, খারাপ সময়ের পর ভালো সময় আসে। কখনো উদ্ভটভাবে। কখনো-বা অপ্রত্যাশিতভাবে।

📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ > 📄 আবদুল্লাহ

📄 আবদুল্লাহ


আমরা জানি তিনি ২৫ বছর বয়সে মারা যান। তবে তিনি কিন্তু এর আগেও মারা যেতে পারতেন! যমযম কূপের খোঁজ পাওয়ার পর আবদুল মুttalibের সাথে কুরাইশের অন্যান্য নেতাদের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। বিরোধের কারণ- যমযম কূপের দখল কে নেবে। সেই বিরোধের মীমাংসা হলে তিনি চাইলেন, এই কূপের উত্তরাধিকার দখল প্রজন্মের পর প্রজন্ম তার ছেলে-নাতিরা পাক। একবার মানত করলেন, আল্লাহ যদি তাকে দশটা ছেলে দেন, তাহলে তিনি তাদের মধ্যে একজনকে কুরবানী করে দেবেন।
আল্লাহ তাকে সত্যিই দশজন ছেলে দিলেন। একদিন তিনি তাদের সবাইকে খড়ের গাদা থেকে খড় টানতে বললেন। যে সবচেয়ে ছোট খড় টানবে তাকেই কুরবানী দেওয়া হবে। আবদুল্লাহ সবচেয়ে ছোট খড় টানলেন। তার বুক ধক করে উঠল। আবদুল্লাহকে কুরবানী দিতে হবে, এমনটা যে তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। তিনি ছিলেন তার সবচেয়ে কাছের আর আদরের ছেলে। হয়ত এ কারণেই নাতি মুহাম্মাদের প্রতিও তার টান বেশি ছিল।
তো তার কিছু বন্ধু তাকে বললেন, গণকের কাছে যেতে। সে হয়ত তাকে মানসম্মান বাঁচিয়ে কোনো বিকল্প বলে দেবে। তিনি গেলেন। গণক বলল ছেলের বদলে ১০০ উট কুরবানী দিতে। তিনি তা-ই করলেন।
এই ঘটনাও তিনি তার নাতিদের কাছে বলে থাকবেন। কিন্তু এই ঘটনা 'থেকে আমাদের কী ফায়দা?
• আপনাকে যারা সহযোগিতা করবে তাদের খোঁজ করুন (এক্ষেত্রে তার সন্তানেরা)।
• পরিবার দিয়ে অনুগৃহীত করায় মহান আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা জানান।
• অন্যের উপদেশ শুনতে একগুঁয়ে হবেন না (এই ঘটনায় তার বন্ধুরা)।
• নিজের আইডিয়াগুলো অন্যদের জানান। ভালো ভালো আইডিয়া নিয়ে চুপ করে বসে থাকবেন না। কে জানে, হয়ত এমন কোনো আইডিয়াই অন্যের জীবন বাঁচাতে পারে।
আবদুল্লাহর কথায় ফিরে আসি। তিনি বেশ সুদর্শন ছিলেন। সন্দেহ নেই, তিনি অনেকের নজর কেড়েছিলেন। তবে তার পারিবারিক মর্যাদা, কাবাঘরের দায়িত্ব আর পারিবারিক ব্যবসার কারণে সতর্ক থাকতে হয়েছে, যাতে তাকে দিয়ে এমন কোনো কাজ না-হয় যেটাতে বংশের মুখে চুনকালি পড়ে। যাহোক, তিনি আমিনাকে বিয়ে করলেন। কিন্তু সে বিয়ের সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। ফিলিস্তিন সফরের সময় তিনি অসুস্থ হয়ে মারা যান। রাসূল -এর জন্মের আগেই সন্তানের মুখ না দেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন।

যেসব অর্জন ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই দুএকজনের কলিজার জোরে। টাকাপয়সা বা জনবলের আধিক্যের কারণে না। বলুন তো, কজন মিলে কাবাঘর বানিয়েছিলেন? ইব্রাহীম ও তাঁর ছেলে ইসমাঈল (আলাইহিমাস-সালাম)। মাত্র দুজন। অথচ লাখ লাখ লোক এখন সেখানে হজ্জ করে। যে যমযম কূপ থেকে হাজিরা পানি খায়, সেই কূপ খুঁজে পেলেন আবদুল মুত্তালিব।

আমি চাই, এই ঘটনা আপনাকে অনুপ্রাণিত করুক। উপায়-উপকরণ যত কমই হোক না কেন, আপনার সামর্থ্য যত অল্পই হোক না কেন, জীবনের শেষ বিন্দু দিয়ে লড়াই করুন। দেখবেন, আল্লাহ তায়ালার সাহায্য পেয়ে গেছেন। লড়াকুর কোনো পরাজয় নাই।

তিনি ও তার সঙ্গীরা যে চরম বিপাকে পড়েছিলেন, তাতে করে তিনি সহজেই হাল ছেড়ে দিয়ে বাকিদের মতো নিজের কবর খুঁড়তে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি পানির উৎস খুঁজেছেন। পরে পেয়েছেনও। সেই পানি খেয়ে তিনিসহ বাকিদের প্রাণ বেঁচেছে। সুতরাং হাল ছাড়বেন না। সাফল্য আশেপাশে ছড়িয়ে আছে। আবদুল মুত্তালিব যে পানির উৎস পেলেন হয়ত তার নিরাশ সঙ্গীদের পায়ের তলাতেই তা লুকিয়ে ছিল।

'নিদারুণ বেদনার সময় মনকে শক্ত করুন। এমনকি মৃত্যুমুখে হলেও। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। আহত সিংহও জানে কীভাবে গর্জন করতে হয়'।

স্যামুয়েল হানাগিদ, দশম শতাব্দীর ইসলামিক স্পেনের হিব্রুভাষী কবি
'জীবনের কঠিন দুঃখ মোকাবিলার সাহস রাখুন। ছোটগুলোতে ধৈর্য ধরুন। প্রচণ্ড খেটেখুটে প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ অর্জনের পর শান্তিতে ঘুমোতে যান'। ভিক্টর হুগো

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00