📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ 📄 আবদুল মুত্তালিব

📄 আবদুল মুত্তালিব


তার আসল নাম শাইবা। মক্কার লোকেরা তাকে দেখে মুত্তালিব নামে এক ব্যক্তির দাস মনে করেছিল। সেজন্য তারা ঐ নামে ডেকেছিল। পরে ওই নামেই তিনি পরিচিত হন।
রাসূল -এর পূর্বপুরুষদের মধ্যে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তার নানা ওয়াহাব আবদু মানাফ। তিনি মদিনার এক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি এবং গোত্র প্রধান ছিলেন। আমিনাকে তিনিই দৃঢ়চেতা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। যে কারণে আবদুল মুত্তালিব তার ছেলে আবদুল্লাহর সাথে তার বিয়ে দিতে রাজি হন।
আগেই বলেছি তার আসল নাম ছিল শায়বাহ। তিনি তার বাল্যকাল মদিনায় কাটিয়েছেন। মদিনার নাম তখন ইয়াসরিব। তার মায়ের নাম সালমা। তিনি তার উচ্চতা, সুদর্শন চেহারা আর স্বভাবজাত নেতৃত্বগুণের কারণে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। একসময় তিনি তার গোত্রের প্রধান হয়ে ওঠেন। মক্কার ইতিহাসে দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তার সাথে সম্পর্কিত। যথা-
১. যমযম কূপ পুনরায় খুঁজে পাওয়া
২. হস্তীবর্ষ

রাসূলের-এর পুরো নাম মুহাম্মাদ ইব্‌ন্ আবদুল্লাহ ইব্‌ন্ আবদুল মুত্তালিব ইব্‌ন্ হাশিম ইবনে আবদু মানাফ ইব্‌ন্ কুসাই। প্রথাগতভাবে আরবে সন্তানের মূল নামের শেষে বাবা অথবা মা'র বাবা, দাদা, বড় দাদার নাম যোগ করা হয়। আধুনিক আরবে এর কিছু কিছু নামের চল নেই। সংক্ষেপে তাই এগুলোর কিছু পরিচয় দিচ্ছি।

📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ 📄 যমযম আবিষ্কার

📄 যমযম আবিষ্কার


জুরহুম গোত্র যমযম কুয়াকে ঢেকে ফেলেছিল। তারা ছিল নবি ইবরাহীম (আ)-এর ছেলে নবি ইসমাঈল (আ)-এর মামার গোত্র। মক্কাবাসীদের অনেক দিনের বাসনা ছিল আবার যদি কোনোভাবে তারা এই কূপের খোঁজ পেতেন! কিন্তু কেউ জানত না যে, এটা কোথায় হারিয়ে গেছে। পানির উৎস খুঁড়তে যেয়ে রাসূল-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব এই কূপের মুখ খুঁজে পান। আনন্দে তার চোখমুখ ভরে গেল। মাটি থেকে তার দুহাতে পানি ছলকে উঠল। ঠিক যেমন উঠেছিল মা হাজেরার হাতে।
যমযম কূপ খুঁজে পাওয়ার পর মক্কার পানি সমস্যার একটা সুরাহা হলো বটে। কিন্তু কুরাইশ নেতাদের মধ্যে ঝামেলা লেগে গেল। আবদুল মুত্তালিবের হাতে এই কূপের নিয়ন্ত্রণে দেখে অনেকের ভালো লাগল না। তারা ঠিক করলেন সিরিয়ার এক যাজিকার মাধ্যমে এটার মীমাংসা হোক। পথে যেতে যেতে নতুন বিপত্তি হলো। তাদের সঙ্গে নেওয়া সব পানি ফুরিয়ে গেল। পানির অভাবে সবাই ধরেই নিয়েছিল যে মৃত্যু সুনিশ্চিত। এমনকি তারা তাদের কবর পর্যন্ত খুঁড়ে ফেলেছিল। কিন্তু আবদুল মুত্তালিব তা করলেন না। তিনি বললেন, 'মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করা ব্যর্থতা'। যেভাবে কোমর বেঁধে তিনি যমযমের কূপ খুঁজায় লেগে ছিলেন, সেভাবে সেই অবস্থাতেও তিনি পানি খুঁজতে লাগলেন। একসময় পেয়েও গেলেন। সেই পানি খেয়ে সবার প্রাণ বাঁচল। তাদের মনে হলো পুরো ঘটনাটা আবদুল মুত্তালিবের পক্ষে মহান আল্লাহর বিধান। যমযম নিয়ে তারা তাদের আপত্তি ওখানেই ছেড়ে দেন।
যমযম কূপের মুখ খুঁজে পাওয়ার ঘটনা নতুনভাবে বলা আমার উদ্দেশ্য না। এই ঘটনাটা শুনে বাল্যকালে রাসূল-এর মনে কী প্রভাব পড়েছিল সেটাই আমার উদ্দেশ্য। এই কাহিনিতে স্বপ্নপূরণে চোয়াল বাধা প্রতিজ্ঞার কথা বলা আছে। সমাজকে কিছু দেওয়ার কথা বলা আছে। পরিস্থিতি যা-ই হোক, আশেপাশের সব মানুষও যদি হাল ছেড়ে দেয়, তেমন পরিস্থিতিতেও হার না-মানা মানসিকতার কথা বলা আছে। কাহিনিটা আমাদে যেন বলছে, 'উঠে দাঁড়ান। চেষ্টা করুন। না পারলে আবার চেষ্টা করুন।'
রাসূল তাঁর জীবনে কতবার কত কঠিন কঠিন সব সময়ের মধ্যে দিয়ে গেছেন। এরকম সময়ে এমন কিছু দরকার যা মানুষকে উৎসাহ দেয়। মনকে শক্ত করে। দাদার সেই ঘটনা নিঃসন্দেহে রাসূল-এর কঠিন সময়ে উৎসাহ দিয়েছে।
জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করে অন্ধ্রাণিত করা পরিবারের বাড়তি সদস্যদের অন্যতম ভূমিকা। আপনার ও আপনার শিশু দুজনের জীবনেই তা প্রেরণা দিতে পারে। মানুষের পুরো জীবনই যে ঘটনাময়। কিন্তু দাদা- দাদি, নানা-নানিদের এ ধরনের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রভাব অনেক জোরালো।

তার আসল নাম ছিল যাইদ। কিন্তু পরে কুসাই নামেই পরিচিতি হন। এ নামের অর্থ- 'অনেক দূরে'। অল্প বয়সে তিনি ঘর ছেড়ে গিয়েছিলেন বলে তাকে এই নামে ডাকা হতো।

📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ 📄 হস্তীবর্ষ

📄 হস্তীবর্ষ


কঠিন সময়গুলোতে মাথা ঠাণ্ডা রাখা, আতঙ্কিত না-হওয়া; বরং মহান আল্লাহর ওপর সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার বিষয়গুলো হস্তীবর্ষের শিক্ষা।
ইয়েমেনে আবরাহা নামক এক খ্রিষ্টান শাসক ছিলেন। ইথিয়োপিয়ান। তিনি সেখানে একটি গীর্জা নির্মাণ করেন। তার ইচ্ছে ছিল, আরব উপদ্বীপের সব তীর্থযাত্রীর পুণ্যজায়গা হবে ইয়েমেনে তার বানানো এই গীর্জা। তার এই খায়েশপূরণে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী কাবা। তাই তিনি ওটাকে মিটিয়ে দিতে চাইলেন। বিশাল সৈন্যবহর নিয়ে তিনি মক্কার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। রাসূল যে বছর জন্ম নেন এটা সে বছরেরই ঘটনা। আরবে হাতির দেখা পাওয়াটা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। আবরাহার বাহিনীতে ছিল বিশাল হাতি। যে কারণে আরবেরা এই ঘটনাকে 'হস্তীবর্ষ' নামে মনে রেখেছিল।
এই বিশাল বাহিনীর সামনে বিনা যুদ্ধে হাল ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আরবদের কোনো উপায় ছিল না। তবে আবদুল মুত্তালিবের মধ্যে এ নিয়ে কোনো আতঙ্কের ছাপ দেখা যায়নি। তিনি আবরাহার সাথে দেখা করতে চাইলেন। আবরাহার সৈন্যরা মক্কায় প্রবেশ মাত্রই লুটপাট শুরু করে দিয়েছিল। তারা আবদুল মুত্তালিবের উট ছিনতাই করেছিল। সেগুলো ফিরিয়ে নিতেই তিনি তার সাথে দেখা করেন।
আবদুল মুত্তালিবের কথা শুনে আবরাহার চোয়াল খুলে পড়ল। এই বৃদ্ধ বলে কী? আমরা তার শহর দখল করে নিয়েছি, তার দায়িত্বে থাকা কাবা ধ্বংস করতে এসেছি, কোথায় সে ওগুলোর মীমাংসার ব্যাপারে কথা বলবে; তা না, তিনি এসেছেন তার উটগুলো ফিরিয়ে নিতে! তিনি তাকে বললেন, 'আমি ভেবেছিলাম আপনি কাবার ব্যাপারে কথা বলতে এসেছিলেন। উট নিয়ে না'। আবদুল মুত্তালিব ঝটপট জবাব দিলেন, 'কাবার একজন প্রভু আছেন। তিনিই একে রক্ষা করবেন'।
আবরাহা কাবা ধ্বংস করার হুকুম দিলেন। কিন্তু তার হাতি এক চুলও নড়ল না। উপর থেকে পাখিরা নুড়িপাথর ফেলতে লাগল। সৈন্যদের দেহ গলে যেতে লাগল। বাকিরা পালিয়ে বাঁচল।
আরবদের চোখে এই ঘটনা ছিল অলৌকিক। পবিত্র শহর হিসেবে মক্কার মর্যাদা আরও বেড়ে গিয়েছিল।
কুরআনের ১০৫নং সূরায় এই ঘটনা বলা আছে- 'হস্তীবাহিনীর সাথে তোমার প্রভু কি করেছিলেন দেখেছ? তিনি কি তাদের পরিকল্পনাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেননি? তিনি তাদের বিরুদ্ধে ঝাঁকেঝাঁকে পাখি পাঠিয়েছিলেন। পোড়া কাদামাটির নুড়ি বর্ষণ করেছেন। তাদের অবস্থা হয়েছিল ফসল তোলা খেতের মতো'।
আবদুল মুত্তালিব তার সন্তান আর নাতি-নাতনিদেরকে অসংখ্যবার এ ঘটনা বলে থাকবেন হয়ত। তিনি তাদের মধ্যে এই কথা গেঁথে দিয়েছিলেন যে, যেসব ঘটনা নিজের জীবনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে, সেসব ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ো না। মাথা ঠাণ্ডা রাখো, বিশ্বাস রাখো আল্লাহ তোমার সাথে আছেন। তিনি তোমাকে ভুলে যাবেন না। অত্যাচারীদের ওপর তিনি কখনো খুশি নন। তার ঘরের অমার্যাদা তিনি কখনো বরদাশত করবেন না।
হতাশার কাছে হার মানবেন না। নিজের ন্যায্য অধিকার ছাড়বেন না; বরং ভদ্রভাবে সেগুলোর দাবি করুন। মনে রাখবেন, খারাপ সময়ের পর ভালো সময় আসে। কখনো উদ্ভটভাবে। কখনো-বা অপ্রত্যাশিতভাবে।

আসল নাম আল মুগিরা। রাসূল -এর দাদার দাদার দাদা। তার নামের অর্থ 'মানাফের দাস'। আরব মূর্তিপূজারীরা ইসলামের আগে মানাফ নামে এক মূর্তির পূজা করত। সংগত কারণেই এ নামের আর কোনো অস্তিত্ব নেই এখন।

📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ 📄 শেষ বিন্দু দিয়ে লড়াই করুন

📄 শেষ বিন্দু দিয়ে লড়াই করুন


যেসব অর্জন ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই দুএকজনের কলিজার জোরে। টাকাপয়সা বা জনবলের আধিক্যের কারণে না। বলুন তো, কজন মিলে কাবাঘর বানিয়েছিলেন? ইব্রাহীম ও তাঁর ছেলে ইসমাঈল (আলাইহিমাস-সালাম)। মাত্র দুজন। অথচ লাখ লাখ লোক এখন সেখানে হজ্জ করে। যে যমযম কূপ থেকে হাজিরা পানি খায়, সেই কূপ খুঁজে পেলেন আবদুল মুত্তালিব।
আমি চাই, এই ঘটনা আপনাকে অনুপ্রাণিত করুক। উপায়-উপকরণ যত কমই হোক না কেন, আপনার সামর্থ্য যত অল্পই হোক না কেন, জীবনের শেষ বিন্দু দিয়ে লড়াই করুন। দেখবেন, আল্লাহ তায়ালার সাহায্য পেয়ে গেছেন। লড়াকুর কোনো পরাজয় নাই।
তিনি ও তার সঙ্গীরা যে চরম বিপাকে পড়েছিলেন, তাতে করে তিনি সহজেই হাল ছেড়ে দিয়ে বাকিদের মতো নিজের কবর খুঁড়তে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি পানির উৎস খুঁজেছেন। পরে পেয়েছেনও। সেই পানি খেয়ে তিনিসহ বাকিদের প্রাণ বেঁচেছে। সুতরাং হাল ছাড়বেন না। সাফল্য আশেপাশে ছড়িয়ে আছে। আবদুল মুত্তালিব যে পানির উৎস পেলেন হয়ত তার নিরাশ সঙ্গীদের পায়ের তলাতেই তা লুকিয়ে ছিল।
'নিদারুণ বেদনার সময় মনকে শক্ত করুন। এমনকি মৃত্যুমুখে হলেও। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। আহত সিংহও জানে কীভাবে গর্জন করতে হয়'।
স্যামুয়েল হানাগিদ, দশম শতাব্দীর ইসলামিক স্পেনের হিব্রুভাষী কবি
'জীবনের কঠিন দুঃখ মোকাবিলার সাহস রাখুন। ছোটগুলোতে ধৈর্য ধরুন। প্রচণ্ড খেটেখুটে প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ অর্জনের পর শান্তিতে ঘুমোতে যান'। ভিক্টর হুগো

আসল নাম আমর। হাজিদের সাহায্য সহযোগিতার কারণে তিনি হাশিম নামে পরিচিত হোন। নামের অর্থ- রুটি বিতরণকারী।

ফন্ট সাইজ
15px
17px