📄 আবদু মানাফ
আসল নাম আল মুগিরা। রাসূল -এর দাদার দাদার দাদা। তার নামের অর্থ 'মানাফের দাস'। আরব মূর্তিপূজারীরা ইসলামের আগে মানাফ নামে এক মূর্তির পূজা করত। সংগত কারণেই এ নামের আর কোনো অস্তিত্ব নেই এখন।
মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকে না। মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। কিন্তু আদর্শ চির অমলিন, চিরকালীন। অনুসারীরা যদি আদর্শের অনুসরণ না করে ব্যক্তিপূজা করে, তাহলে একসময় সেটা দ্বন্দ্বে রূপ নেবেই। নেবে। চেঙ্গিস খান, টেমারলেন, আলেক্সান্ডার দ্যা গ্রেটের সময়ের পর এমনটাই হয়েছে। কুসাইয়ের মৃত্যুর পর মক্কাতেও তাই হয়েছে। কাবার দখল কে নেবে- এ নিয়ে তার দুই ছেলে আবদুদ দার ও আবদু মানাফের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে যায়। এক পর্যায়ে তারা নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নেয়।
সমাবেশ আয়োজন, প্রতিরক্ষার জন্য সেনা প্রস্তুত ও কাবার চাবি রক্ষণের ভার নেন আবদুদ দার। আর হাজিদের খানাপিনার দায়িত্ব নেন আবদু মানাফ। পরে এটা তিনি তার ছেলে হাশিমকে দেন। হাশিম ছিলেন রাসূল -এর দাদার দাদা।
এই অধ্যায়ে আমরা কথা বলব রাসূল-এর বর্ধিত পরিবার নিয়ে। বর্ধিত পরিবার বলতে বাবা-মা ছাড়া পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকে বুঝাচ্ছি। এই অধ্যায়ে আমরা রাসূল-এর দাদা ও চাচা-চাচী সম্পর্কে জানব। রাসূল-এর বেড়ে ওঠায় তারা বেশ বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
📄 হাশিম
আসল নাম আমর। হাজিদের সাহায্য সহযোগিতার কারণে তিনি হাশিম নামে পরিচিত হোন। নামের অর্থ- রুটি বিতরণকারী।
গরিব আর হাজিদের খাওয়ানোর বিষয়টাকে তিনি বেশ সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন। তিনি তাদের সেরা উটের মাংস দিতেন। তার আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। তবে তারপরও তিনি নিজের পকেট থেকে খরচ করতেন। কুরাইশদের কাছ থেকে দান নিতেন।
এক কবি হাশিমের প্রশংসায় বলেছেন, 'মক্কার ভুখানাঙাদের জন্য আমর দুধে ভেজা খাবার তৈরি করেছে; শীত আর গ্রীষ্মের কাফেলা প্রতিষ্ঠা করেছে'।
ক্ষুধার্তদের খানাপিনার ব্যবস্থা করায় কবি হাশিমের প্রশংসা করেছেন। শীতে ইয়েমেনে আর গরমে সিরিয়াতে বাণিজ্য কাফেলা পাঠানোর ঐতিহ্য পুনরায় চালু করায় তাকে কৃতিত্ব দিয়েছেন।
দান করতে হলে আপনার কাছে অনেক টাকা থাকতে হবে ব্যাপারটা এমন না। হাশিমের কাছ থেকে আমরা তো তা-ই শিখি। টাকাপয়সা ছাড়াও আপনি আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারেন। অথবা সময় দিতে পারেন। এভাবেও মানুষের উপকার করা যায়। 'দান' করা যায়।
হজ্জের মৌসুমে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষদের সাথে তাকে চলতে হয়েছে। এত মানুষের সাথে চলতে যেয়ে তাকে নিঃসন্দেহে অনেক চাপ সামলাতে হয়েছে। কখনো কখনো মানুষের কটু ব্যবহার সহ্য করতে হয়েছে। অবশ্যই এগুলো তিনি ধৈর্যের সাথে করেছেন। মানুষ তাঁর উদারতা ও সহনশীলতার কথা তাঁর মারা যাওয়ার পরও মনে রেখেছে উপরের কবিতাটা তার প্রমাণ। সুতরাং রাসূল -ও যে এসব ঘটনা শুনে থাকবেন সেটা আশ্চর্যের না। হয়ত এসব ঘটনা থেকে তিনি অনুপ্রেরণাও নিয়ে থাকবেন।
বেশিরভাগ সীরাহ বইগুলোতে তাদের ভূমিকা নিয়ে সামান্যই কথা হয়। তবে আমরা যদি তার জীবনকে বুঝতে চাই তাহলে তাদেরকে জানাটা জরুরি।
কেউ কেউ ভাবেন বর্ধিত পরিবারের বিষয়টা অতিমাত্রায় জটিল। তারা বিষয়টার শাখা-প্রশাখায় নিজেদের হারিয়ে ফেলেন। আধুনিক আরবিতে সুদীর্ঘ নাম ব্যবহারের প্রচলন নেই। তো বর্ধিত পরিবার নিয়ে আলাপ করতে যেয়ে এত বড় বড় নামের তালিকা দিয়ে কী করবেন, সেটা হয়ত বুঝতে পারেন না কেউ কেউ। সুদীর্ঘ নামের বৃত্তে আমি ঘুরপাক খাবো না। কিংবা এগুলোর খুঁটিনাটিতে পড়ে থাকব না; বরং রাসূল-এর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অংশগুলো নিয়ে কথা বলব। এগুলো আমাদের গড়ে ওঠায় সাহায্য করবে। রাসূল-এর পরিবারের সদস্যদের এমনভাবে তুলে ধরব, মনে হবে আপনি তাদের ব্যক্তিগতভাবে চেনেন।
পরিস্থিতি যা-ই হোক, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা নিয়ে আমরা প্রথম অধ্যায়ে কথা বলেছি। এখানে কথা বলব, আপনার বা আপনার সন্তানের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করতে বর্ধিত পরিবারের ভূমিকা নিয়ে। ٹھیک যেমন প্রভাবময় ছিল রাসূল-এর বর্ধিত পরিবার।
দাদা-দাদি, নানা-নানী, ফুফু-খালা, মামা-চাচা এদের সবাই আপনার শিশুকে বেড়ে ওঠায় সহযোগিতা করতে পারে। রাসূল-এর বেলায় এই কাজটি করেছেন তাঁর দাদা ও চাচা। এতে বাবা-মা'র ওপর চাপ কমে। আর এতে অন্য লাভও আছে। একেকজনের জীবন-অভিজ্ঞতা ভিন্ন। যে কারণে শিশু একেকজনের কাছ থেকে একেক রকম অভিজ্ঞতার স্বাদ পায়। যদি বর্ধিত পরিবারে না-থাকেন, তাহলে ভালো বিকল্পের ব্যবস্থা করুন। যেমন- প্রতিবেশী বা শিক্ষক।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সন্তান লালন করার দায়িত্ব বাবা-মা একা পালন করবেন না। তাদেরকে বহু ধরনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মুখোমুখি করাবেন।
বর্ধিত পরিবারে বাবা-মা, সন্তান, দাদা-দাদি, চাচা, ফুফু এবং কাজিনরা কাছাকাছি থাকেন। এ ধরনের পরিবারের গুরুত্বের বিষয়টা আরবি ভাষা থেকেও বুঝা যায়। ইংরেজিতে চাচা, মামা, ফুফা, খালু সবকিছুর জন্য একটাই শব্দ: আঙ্কেল। আরবিতে আলাদা আলাদা চারটা শব্দ আছে। বাংলাতেও তা-ই। আবার কাজিনদের জন্যও আটটা ভিন্ন ভিন্ন আরবি শব্দ আছে।
পৃথিবীর ইতিহাসে বর্ধিত পরিবার সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে এর আবেদন হারিয়ে গেছে। ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর ধীরে ধীরে এর প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে যায়। কারণ এর আগে মানুষের জীবন কৃষি নির্ভর ছিল। ওখানে কাজেকর্মে একে অপরের সহযোগিতার দরকার ছিল। কিন্তু শিল্প বিপ্লবের পর সেটার আর প্রয়োজন ছিল না।
আমাদের সমাজেও এই পরিবর্তনের ঢেউ লাগে। বর্ধিত পরিবারের বন্ধনগুলো ঢিলে হয়ে যায়। তৈরি হয় একক পরিবার। সন্তান লালনপালনের পুরো দায়িত্ব তারা একাই পালন করেন। মা যদি কর্মজীবী বা অন্য কোনো কারণে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে কাজের লোক এই দায়িত্ব নেয়।
আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি আপনাদের বলছি না যে চলুন, সবাই মিলে আবার এক ছাদের নিচে থাকা শুরু করি। পুরোনো সেই রোমান্টিক পরিবেশে ফিরে যাই। আমার মূল পয়েন্টটা হচ্ছে, সন্তান লালনপালনে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা আবারও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে শুরু করুক।
ইউরোপের কিছু দেশ কিন্তু বর্ধিত পরিবারের সেই ধারা ফিরিয়ে এনেছে। দ্যা টেলিগ্রাফ পত্রিকা ২০০৮ সালে একটা প্রতিবেদন ছাপিয়েছিল। সেখানে তারা বলেছে যে, ব্রিটেনের সাড়ে আট লাখ পরিবারে বাড়তি সদস্য থাকেন। তাদের ধারণা ২০২৮ সালের মধ্যে সেটা শতকরা ৩০ ভাগে পৌছাবে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আলাদা থাকার কারণে সন্তান আর পিতামাতার দেখাশোনা করা অনেক স্বামী-স্ত্রীর জন্য কঠিন। সবাই মিলে যদি কাছাকাছি থাকেন, তাহলে এই কাজ সহজ হয়।
📄 আবদুল মুত্তালিব
তার আসল নাম শাইবা। মক্কার লোকেরা তাকে দেখে মুত্তালিব নামে এক ব্যক্তির দাস মনে করেছিল। সেজন্য তারা ঐ নামে ডেকেছিল। পরে ওই নামেই তিনি পরিচিত হন।
রাসূল -এর পূর্বপুরুষদের মধ্যে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তার নানা ওয়াহাব আবদু মানাফ। তিনি মদিনার এক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি এবং গোত্র প্রধান ছিলেন। আমিনাকে তিনিই দৃঢ়চেতা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। যে কারণে আবদুল মুত্তালিব তার ছেলে আবদুল্লাহর সাথে তার বিয়ে দিতে রাজি হন।
আগেই বলেছি তার আসল নাম ছিল শায়বাহ। তিনি তার বাল্যকাল মদিনায় কাটিয়েছেন। মদিনার নাম তখন ইয়াসরিব। তার মায়ের নাম সালমা। তিনি তার উচ্চতা, সুদর্শন চেহারা আর স্বভাবজাত নেতৃত্বগুণের কারণে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। একসময় তিনি তার গোত্রের প্রধান হয়ে ওঠেন। মক্কার ইতিহাসে দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তার সাথে সম্পর্কিত। যথা-
১. যমযম কূপ পুনরায় খুঁজে পাওয়া
২. হস্তীবর্ষ
রাসূলের-এর পুরো নাম মুহাম্মাদ ইব্ন্ আবদুল্লাহ ইব্ন্ আবদুল মুত্তালিব ইব্ন্ হাশিম ইবনে আবদু মানাফ ইব্ন্ কুসাই। প্রথাগতভাবে আরবে সন্তানের মূল নামের শেষে বাবা অথবা মা'র বাবা, দাদা, বড় দাদার নাম যোগ করা হয়। আধুনিক আরবে এর কিছু কিছু নামের চল নেই। সংক্ষেপে তাই এগুলোর কিছু পরিচয় দিচ্ছি।
📄 যমযম আবিষ্কার
জুরহুম গোত্র যমযম কুয়াকে ঢেকে ফেলেছিল। তারা ছিল নবি ইবরাহীম (আ)-এর ছেলে নবি ইসমাঈল (আ)-এর মামার গোত্র। মক্কাবাসীদের অনেক দিনের বাসনা ছিল আবার যদি কোনোভাবে তারা এই কূপের খোঁজ পেতেন! কিন্তু কেউ জানত না যে, এটা কোথায় হারিয়ে গেছে। পানির উৎস খুঁড়তে যেয়ে রাসূল-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব এই কূপের মুখ খুঁজে পান। আনন্দে তার চোখমুখ ভরে গেল। মাটি থেকে তার দুহাতে পানি ছলকে উঠল। ঠিক যেমন উঠেছিল মা হাজেরার হাতে।
যমযম কূপ খুঁজে পাওয়ার পর মক্কার পানি সমস্যার একটা সুরাহা হলো বটে। কিন্তু কুরাইশ নেতাদের মধ্যে ঝামেলা লেগে গেল। আবদুল মুত্তালিবের হাতে এই কূপের নিয়ন্ত্রণে দেখে অনেকের ভালো লাগল না। তারা ঠিক করলেন সিরিয়ার এক যাজিকার মাধ্যমে এটার মীমাংসা হোক। পথে যেতে যেতে নতুন বিপত্তি হলো। তাদের সঙ্গে নেওয়া সব পানি ফুরিয়ে গেল। পানির অভাবে সবাই ধরেই নিয়েছিল যে মৃত্যু সুনিশ্চিত। এমনকি তারা তাদের কবর পর্যন্ত খুঁড়ে ফেলেছিল। কিন্তু আবদুল মুত্তালিব তা করলেন না। তিনি বললেন, 'মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করা ব্যর্থতা'। যেভাবে কোমর বেঁধে তিনি যমযমের কূপ খুঁজায় লেগে ছিলেন, সেভাবে সেই অবস্থাতেও তিনি পানি খুঁজতে লাগলেন। একসময় পেয়েও গেলেন। সেই পানি খেয়ে সবার প্রাণ বাঁচল। তাদের মনে হলো পুরো ঘটনাটা আবদুল মুত্তালিবের পক্ষে মহান আল্লাহর বিধান। যমযম নিয়ে তারা তাদের আপত্তি ওখানেই ছেড়ে দেন।
যমযম কূপের মুখ খুঁজে পাওয়ার ঘটনা নতুনভাবে বলা আমার উদ্দেশ্য না। এই ঘটনাটা শুনে বাল্যকালে রাসূল-এর মনে কী প্রভাব পড়েছিল সেটাই আমার উদ্দেশ্য। এই কাহিনিতে স্বপ্নপূরণে চোয়াল বাধা প্রতিজ্ঞার কথা বলা আছে। সমাজকে কিছু দেওয়ার কথা বলা আছে। পরিস্থিতি যা-ই হোক, আশেপাশের সব মানুষও যদি হাল ছেড়ে দেয়, তেমন পরিস্থিতিতেও হার না-মানা মানসিকতার কথা বলা আছে। কাহিনিটা আমাদে যেন বলছে, 'উঠে দাঁড়ান। চেষ্টা করুন। না পারলে আবার চেষ্টা করুন।'
রাসূল তাঁর জীবনে কতবার কত কঠিন কঠিন সব সময়ের মধ্যে দিয়ে গেছেন। এরকম সময়ে এমন কিছু দরকার যা মানুষকে উৎসাহ দেয়। মনকে শক্ত করে। দাদার সেই ঘটনা নিঃসন্দেহে রাসূল-এর কঠিন সময়ে উৎসাহ দিয়েছে।
জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করে অন্ধ্রাণিত করা পরিবারের বাড়তি সদস্যদের অন্যতম ভূমিকা। আপনার ও আপনার শিশু দুজনের জীবনেই তা প্রেরণা দিতে পারে। মানুষের পুরো জীবনই যে ঘটনাময়। কিন্তু দাদা- দাদি, নানা-নানিদের এ ধরনের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রভাব অনেক জোরালো।
তার আসল নাম ছিল যাইদ। কিন্তু পরে কুসাই নামেই পরিচিতি হন। এ নামের অর্থ- 'অনেক দূরে'। অল্প বয়সে তিনি ঘর ছেড়ে গিয়েছিলেন বলে তাকে এই নামে ডাকা হতো।