📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ > 📄 বর্ধিত পরিবার

📄 বর্ধিত পরিবার


বেশিরভাগ সীরাহ বইগুলোতে তাদের ভূমিকা নিয়ে সামান্যই কথা হয়। তবে আমরা যদি তার জীবনকে বুঝতে চাই তাহলে তাদেরকে জানাটা জরুরি।
কেউ কেউ ভাবেন বর্ধিত পরিবারের বিষয়টা অতিমাত্রায় জটিল। তারা বিষয়টার শাখা-শাখায় নিজেদের হারিয়ে ফেলেন। আধুনিক আরবিতে সুদীর্ঘ নাম ব্যবহারের প্রচলন নেই। তো বর্ধিত পরিবার নিয়ে আলাপ করতে যেয়ে এত বড় বড় নামের তালিকা দিয়ে কী করবেন, সেটা হয়ত বুঝতে পারেন না কেউ কেউ। সুদীর্ঘ নামের বৃত্তে আমি ঘুরপাক খাবো না। কিংবা এগুলোর খুঁটিনাটিতে পড়ে থাকব না; বরং রাসূল-এর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অংশগুলো নিয়ে কথা বলব। এগুলো আমাদের গড়ে ওঠায় সাহায্য করবে। রাসূল-এর পরিবারের সদস্যদের এমনভাবে তুলে ধরব, মনে হবে আপনি তাদের ব্যক্তিগতভাবে চেনেন।
পরিস্থিতি যা-ই হোক, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা নিয়ে আমরা প্রথম অধ্যায়ে কথা বলেছি। এখানে কথা বলব, আপনার বা আপনার সন্তানের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করতে বর্ধিত পরিবারের ভূমিকা নিয়ে। ঠিক যেমন প্রভাবময় ছিল রাসূল-এর বর্ধিত পরিবার।
দাদা-দাদি, নানা-নানী, ফুফু-খালা, মামা-চাচা এদের সবাই আপনার শিশুকে বেড়ে ওঠায় সহযোগিতা করতে পারে। রাসূল-এর বেলায় এই কাজটি করেছেন তাঁর দাদা ও চাচা। এতে বাবা-মা'র ওপর চাপ কমে। আর এতে অন্য লাভও আছে। একেকজনের জীবন-অভিজ্ঞতা ভিন্ন। যে কারণে শিশু একেকজনের কাছ থেকে একেক রকম অভিজ্ঞতার স্বাদ পায়। যদি বর্ধিত পরিবারে না-থাকেন, তাহলে ভালো বিকল্পের ব্যবস্থা করুন। যেমন- প্রতিবেশী বা শিক্ষক।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সন্তান লালন করার দায়িত্ব বাবা-মা একা পালন করবেন না। তাদেরকে বহু ধরনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মুখোমুখি করাবেন।
বর্ধিত পরিবারে বাবা-মা, সন্তান, দাদা-দাদি, চাচা, ফুফু এবং কাজিনরা কাছাকাছি থাকেন। এ ধরনের পরিবারের গুরুত্বের বিষয়টা আরবি ভাষা থেকেও বুঝা যায়। ইংরেজিতে চাচা, মামা, ফুফা, খালু সবকিছুর জন্য একটাই শব্দ: আঙ্কেল। আরবিতে আলাদা আলাদা চারটা শব্দ আছে। বাংলাতেও তা-ই। আবার কাজিনদের জন্যও আটটা ভিন্ন ভিন্ন আরবি শব্দ আছে।
পৃথিবীর ইতিহাসে বর্ধিত পরিবার সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে এর আবেদন হারিয়ে গেছে। ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর ধীরে ধীরে এর প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে যায়। কারণ এর আগে মানুষের জীবন কৃষি নির্ভর ছিল। ওখানে কাজেকর্মে একে অপরের সহযোগিতার দরকার ছিল। কিন্তু শিল্প বিপ্লবের পর সেটার আর প্রয়োজন ছিল না।
আমাদের সমাজেও এই পরিবর্তনের ঢেউ লাগে। বর্ধিত পরিবারের বন্ধনগুলো ঢিলে হয়ে যায়। তৈরি হয় একক পরিবার। সন্তান লালনপালনের পুরো দায়িত্ব তারা একাই পালন করেন। মা যদি কর্মজীবী বা অন্য কোনো কারণে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে কাজের লোক এই দায়িত্ব নেয়।
আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি আপনাদের বলছি না যে চলুন, সবাই মিলে আবার এক ছাদের নিচে থাকা শুরু করি। পুরোনো সেই রোমান্টিক পরিবেশে ফিরে যাই। আমার মূল পয়েন্টটা হচ্ছে, সন্তান লালনপালনে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা আবারও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে শুরু করুক।
ইউরোপের কিছু দেশ কিন্তু বর্ধিত পরিবারের সেই ধারা ফিরিয়ে এনেছে। দ্যা টেলিগ্রাফ পত্রিকা ২০০৮ সালে একটা প্রতিবেদন ছাপিয়েছিল। সেখানে তারা বলেছে যে, ব্রিটেনের সাড়ে আট লাখ পরিবারে বাড়তি সদস্য থাকেন। তাদের ধারণা ২০২৮ সালের মধ্যে সেটা শতকরা ৩০ ভাগে পৌছাবে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আলাদা থাকার কারণে সন্তান আর পিতামাতার দেখাশোনা করা অনেক স্বামী-স্ত্রীর জন্য কঠিন। সবাই মিলে যদি কাছাকাছি থাকেন, তাহলে এই কাজ সহজ হয়।

📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ > 📄 রাসূল ﷺ-এর পরিবার

📄 রাসূল ﷺ-এর পরিবার


রাসূলের-এর পুরো নাম মুহাম্মাদ ইব্‌ন্ আবদুল্লাহ ইব্‌ন্ আবদুল মুত্তালিব ইব্‌ন্ হাশিম ইবনে আবদু মানাফ ইব্‌ন্ কুসাই। প্রথাগতভাবে আরবে সন্তানের মূল নামের শেষে বাবা অথবা মা'র বাবা, দাদা, বড় দাদার নাম যোগ করা হয়। আধুনিক আরবে এর কিছু কিছু নামের চল নেই। সংক্ষেপে তাই এগুলোর কিছু পরিচয় দিচ্ছি।

📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ > 📄 কুসাই

📄 কুসাই


তার আসল নাম ছিল যাইদ। কিন্তু পরে কুসাই নামেই পরিচিতি হন। এ নামের অর্থ- 'অনেক দূরে'। অল্প বয়সে তিনি ঘর ছেড়ে গিয়েছিলেন বলে তাকে এই নামে ডাকা হতো।
তবে বড় হয়েছেন মক্কার বাইরে। দীর্ঘ সময় পর সেখানে ফিরে খুযা গোত্রের এক মেয়েকে বিয়ে করেন। তখন খুযা গোত্র কাবার দায়িত্বে ছিল। কুরাইশ গোত্র এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পাক এমন এক আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে জেগে ওঠে। এজন্য তিনি তার গোত্রকে একতাবদ্ধ করেন এবং একসময় খুষা গোত্রকে সরিয়ে মক্কার রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের হাতে চলে আসে।
তিনি তখন যেসব দায়িত্ব পালন করতেন-
১. মক্কায় ভ্রমণকারীদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা।
২. হাজিদের পানি, দই, মধু সরবরাহ।
৩. কাবার রক্ষণাবেক্ষণ।
৪. প্রয়োজনে যুদ্ধের সময় হাল ধরা।
তিনি একা একা মক্কা শাসন করতে চাননি। 'ফোরাম' নামে তিনি একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সেখানে মক্কার অন্যান্য গোত্ররাও আলোচনায় বসত। নগর শাসন নিয়ে তাদের মতামত দিত। পরামর্শ দিত।
এখন সবচেয়ে মজার দিক হলো- কুসাই যে অবস্থায় ছিলেন, তাতে করে এ ধরনের স্বপ্ন ছিল দুঃস্বপ্ন। তার গোত্র বিভক্ত। তিনি বড় হয়েছেন মক্কার বাইরে। মক্কাবাসীদের কাছে তিনি বহিরাগতের চেয়ে বেশি কিছু না। তার তেমন কোনো সমর্থকও ছিল না। কিন্তু তিনি ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী। প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে তিনি তার স্বপ্ন পূরণ করেছেন। মক্কাবাসীদের শ্রদ্ধা অর্জন করে নিয়েছেন। ইতিহাসবিদ ইব্‌ন হিশাম তাকে ধর্মের সাথে তুলনা করেছেন। মানুষ যাকে সারাজীবন অনুসরণ করতে পারে।
উনার এসব কৃতিত্বের কথা রাসূল অবশ্যই শুনে থাকবেন। পারিবারিক বিভিন্ন আলাপচারিতায় এসব প্রসঙ্গ উঠে আসা অস্বাভাবিক না। এ থেকে রাসূল যেটা শিখে থাকবেন সেটা হচ্ছে, কোনো কিছু পরিবর্তনের জন্য যে শক্তি দরকার সেটা নিজের থেকেই নিতে হবে। আশপাশ থেকে না। তা না হলে পরিবর্তন আনা সম্ভব না।

শিশুদের বেড়ে ওঠায় পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। বাবা-মা'র ওপর থেকে চাপ কিছুটা কমাতে পারে। রাসূল এতিম ছিলেন। বর্ধিত পরিবারে বড় হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনদের কাছে বিভিন্ন ঘটনা শুনে তিনি দয়াশীলতা, নেতৃত্বগুণ, লেগে থাকার মতো বিষয়গুলো হাতেকলমে শিখেছেন। আজকাল স্কুল, বন্ধুবান্ধব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। আবার উল্টো ফলও এনে দিতে পারে। তবে যাই হোক, বাবা-মা'র বাইরেও শিশুদের অনুকরণীয় আদর্শ বা রোল মডেল প্রয়োজন। বর্ধিত পরিবারের কাজটা এখানেই। বর্ধিত পরিবারের সান্নিধ্য পাওয়া সম্ভব না হলে শিক্ষক, প্রতিবেশীরা এর বিকল্প ভূমিকা পালন করতে পারেন। এটা শিশুদের চিন্তাভাবনার পরিধি বাড়ায়। বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা দেয়।

📘 বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মদ > 📄 আবদু মানাফ

📄 আবদু মানাফ


আসল নাম আল মুগিরা। রাসূল -এর দাদার দাদার দাদা। তার নামের অর্থ 'মানাফের দাস'। আরব মূর্তিপূজারীরা ইসলামের আগে মানাফ নামে এক মূর্তির পূজা করত। সংগত কারণেই এ নামের আর কোনো অস্তিত্ব নেই এখন।
মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকে না। মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। কিন্তু আদর্শ চির অমলিন, চিরকালীন। অনুসারীরা যদি আদর্শের অনুসরণ না করে ব্যক্তিপূজা করে, তাহলে একসময় সেটা দ্বন্দ্বে রূপ নেবেই। নেবে। চেঙ্গিস খান, টেমারলেন, আলেক্সান্ডার দ্যা গ্রেটের সময়ের পর এমনটাই হয়েছে। কুসাইয়ের মৃত্যুর পর মক্কাতেও তাই হয়েছে। কাবার দখল কে নেবে- এ নিয়ে তার দুই ছেলে আবদুদ দার ও আবদু মানাফের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে যায়। এক পর্যায়ে তারা নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নেয়।
সমাবেশ আয়োজন, প্রতিরক্ষার জন্য সেনা প্রস্তুত ও কাবার চাবি রক্ষণের ভার নেন আবদুদ দার। আর হাজিদের খানাপিনার দায়িত্ব নেন আবদু মানাফ। পরে এটা তিনি তার ছেলে হাশিমকে দেন। হাশিম ছিলেন রাসূল -এর দাদার দাদা।

এই অধ্যায়ে আমরা কথা বলব রাসূল-এর বর্ধিত পরিবার নিয়ে। বর্ধিত পরিবার বলতে বাবা-মা ছাড়া পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকে বুঝাচ্ছি। এই অধ্যায়ে আমরা রাসূল-এর দাদা ও চাচা-চাচী সম্পর্কে জানব। রাসূল-এর বেড়ে ওঠায় তারা বেশ বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00