📄 মা’র মৃত্যু
এ পর্বে আমরা কথা বলব রাসূল এর মা'র মৃত্যু নিয়ে। এরপর সেখান থেকে তাঁর দাদার বাড়িতে লালনপালন। সেখানে কিন্তু তিনি চমৎকার আদরযত্নে লালিত হয়েছেন। প্রতিটি শিশুর শৈশব এমনই হওয়া উচিত আসলে।
মক্কায় ফিরে শিশু মুহাম্মাদ দুবছর মায়ের সঙ্গে কাটান। মা আমিনা মারা যান ২৬ বছর বয়সে। তখন মুহাম্মাদ-এর বয়স মাত্র ছয়। এত অল্প বয়সে যাদের মা মারা গেছেন, কেবল তারাই হয়ত তাঁর কষ্টটা বুঝতে পারবেন।
রোমান অর্থডক্স যাজক এবং ঔপন্যাসিক কন্সট্যান্টিন ঘিরঘিউ (Constantin Gheorghiu) তার লা ভিয়ে ডে মাহোমেত (La Vie De Mahomet) বইতে সেই করুণ দৃশ্যের কল্পনা করেছেন এভাবে- 'শিশু তার মায়ের কবরের পাশে বসে আর্তনাদ করছে, 'মা, তুমি বাসায় আসো না কেন? এই জীবনে তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে'?
এই বর্ণনা ঐতিহাসিকভাবে নির্ভরযোগ্য না। তবে এমন করুণ অবস্থার মুখোমুখি যারা হননি, তারা হয়ত এ থেকে তাঁর কষ্টের কিছুটা আঁচ করতে পারবেন। বাবাকে তো তিনি কখনো দেখেনইনি। জন্মের আগেই তাঁর বাবা মারা গিয়েছিলেন। তিনি মা'র খুব আপন ছিলেন। তার সাথে জড়িয়ে আছে কত না-ভোলা স্মৃতি।
বাস্তবে বলুন তো কে চায় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে? কেউ না। তবে শিশুর কাছের কেউ, আপন কেউ যদি মারা যায়, বা তার সাথে বিচ্ছেদ হয়, সেক্ষেত্রে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার উপায় জানা জরুরি।
📄 কীভাবে মোকাবিলা করবেন?
• প্রথম দফাতেই তাকে মৃত্যুর খবরটা জানিয়ে দিন। কারণ ঘরের পরিবেশ দেখে এমনিতেই সে বিষয়টা আঁচ করবে। আর তাছাড়া তার জানার অধিকার তো আছেই।
• বলার সময় বাচ্চার বয়সটাও মাথায় রাখবেন। ২ থেকে ৫ বছরের শিশুরা মৃত্যুকে ঘুমের মতো মনে করে। তারা মনে করে মৃত মানুষ ঘুম থেকে আবার উঠবে। ৬ থেকে ৯ বছর বয়সী বাচ্চারা মৃত্যুর বিষয়টা বুঝবে। তবে আলাদা হয়ে যাওয়াটাকে তারা ভয় পায়।
• বাচ্চা যেন তার আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে সেজন্য তাকে উৎসাহ দিন। তার প্রশ্নগুলোর ঠিকঠাক উত্তর দিন।
• তার মধ্যে যেন ভালোবাসা হারানোর ভয় না-ঢোকে। আর যা হয়েছে তার জন্য যে, সে কোনোভাবেই দায়ী না- এ ব্যাপারে তাকে আশ্বস্ত করুন। কারণ, অনেক শিশুকে দেখা যায়, আপন কারও মৃত্যুতে সে নিজে নিজেকে দোষী ভাবতে শুরু করে। এমনও মনে করে যে, সে-ই এজন্য দায়ী।
📄 মা হারানোর পর
মা'র মৃত্যুর পর দাদা আবদুল মুত্তালিব তার নাতির দায়িত্ব নেন। আবদুল মুত্তালিব কেমন মানুষ ছিলেন সে নিয়ে পরে এক অধ্যায়ে কথা বলব। এখানে আমরা নজর দেব নবির শৈশবে তাঁর দাদুর পরিবারের ওপর।
আচ্ছা কেউ কি বলতে পারেন রাসূল-এর দাদির নাম কী? আমাদের সীরাহ বইগুলোতে দাদার ভূমিকা অনেক বেশি করে বলা থাকে। আসলে ঐ পরিবারের সব আয় উপার্জন তিনিই করতেন। তো সঙ্গত কারণেই তার কথা বেশি এসেছে। কিন্তু রাসূলের কিন্তু একজন দাদিও ছিল। তার নাম ফাতিমা আমর।
বালক মুহাম্মাদ-কে ঐটুকু বয়সে মমতা দিয়ে তিনিই আগলে রেখেছিলেন। কেন রাখবেন না? তিনি তো শুধু আবদুল মুত্তালিবের স্ত্রী ছিলেন না। তিনি ছিলেন মা আমিনার শাশুড়ি। রাসূল-এর বাবা আবদুল্লাহ তো তারই আদরের ছেলে ছিলেন।
ছয় বছর পর্যন্ত শিশু মুহাম্মাদ-এর ছায়া হয়ে ছিলেন তাঁর মা আমিনা। মায়ের মৃত্যুর পর সে অভাব পূরণ করেন দাদি ফাতিমা। রাসূলের ছোট মেয়ের নাম তো সবাই কমবেশি জানি: ফাতিমা। রাসূল কি তাঁর দাদির সম্মানে মেয়ের নাম ফাতিমা রেখেছিলেন? এটা হলফ করে বলা যায় না। তবে সেই সম্ভাবনা উড়িয়েও দেওয়া যায় না।
📄 অপূর্ব বালক
বালক হিসেবে রাসূল ছিলেন অসাধারণ। হাদীস থেকে দেখা যায়, তাঁর দাদা ছোটবেলাতেই এটা খেয়াল করেছিলেন। বলেছিলেন এই ছেলে বড় হয়ে বিশেষ কিছু হবে। প্রায় একই রকমের ভবিষ্যদ্বাণী আরও একজন করেছিলেন। ১২ বছর বয়সে কিশোর মুহাম্মাদ যখন সিরিয়া সফরে যান, তখন এক সন্ন্যাসী এরকমটা বলেছিলেন।
বালক মুহাম্মাদ যখন দাদার ঘরে লালিত হচ্ছেন, তখন দাদার বয়স আশির কোঠায়। খুব ভালোবাসতেন নাতিকে। তবে এই নাতি যে একসময় নবি হবেন এমন কথা তারা হয়ত কল্পনাতেও কোনোদিন ভাবেননি। তাঁর মাও কি কখনো এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন? বড় হয়ে বিশেষ কিছু হবেন এ পর্যন্তই হয়ত।
তাঁকে নিয়ে তাদের উচ্ছ্বাস তাঁর কানেও পৌঁছাত। বার বার পৌঁছাত। তাঁকে নিয়ে তাদের ভাবনা তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করতেন। যে বাচ্চা সবসময় বাবা-মা'র মুখে শোনে সে ভদ্র, স্মার্ট, বড় হয়ে ভালো কিছু হবে- সেই বাচ্চাকে দেখবেন; আর যে-বাচ্চা প্রতিনিয়ত বাবা-মা'র গালি আর বকা খায়, সে বাচ্চাকে দেখবেন। দুই বাচ্চার বেড়ে ওঠাতে বিস্তর পার্থক্য খুঁজে পাবেন।
বাবা-মা'র কাছ থেকেই কিন্তু শিশুরা নিজেদের ব্যাপারে জানতে শেখে। কারণ বাবা-মা তাকে সবচেয়ে ভালোভাবে চেনে। কাজেই তাদের কথা সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। সেখান থেকেই তার মধ্যে আত্মমর্যাদা গড়ে উঠে। তারা যা বলেন, সেগুলোর অনুরণন তার কানে বাজতে থাকে। কাজেই শিশুদের নিয়ে যা-ই বলবেন, ভেবেচিন্তে বলবেন!