📄 খেলাধুলার গুরুত্ব
শিশুরা যখন খুশিতে থাকে, আনন্দে থাকে, তখন তারা ভালো শেখে। মজাদার সময়গুলো শিশুদের বেড়ে ওঠার সেরা সময়। কারণ, তারা খেলতে পছন্দ করে। চমক পছন্দ করে। কোনো কোনো বাবা-মা মনে করেন শিশুদের খেলাধুলা মানে সময় নষ্ট। এমন ধারণা মোটেই ঠিক না।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ওরা যখন খেলার মধ্যে থাকে, তখনই ওরা সহজে শেখে। গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করে।
গৎবাঁধা স্কুলগুলোতে কচি শিশুদের আদেশ-নিষেধের বেড়াজালে বন্দি করে ফেলা হয়। খালি পড় আর পড়। অন্যদিকে উন্নতমানের স্কুলগুলোতে বিভিন্ন দক্ষতা আর আচরণ শেখানোর জন্য মজাদার কাজকারবার করা হয়।
ছোট বয়সে তাদের খেলার সময়সীমা কেটে দিবেন না। এমন ভাবার দরকার নেই যে, তারা বড় হয়ে গেছে, এখন আর বেশি খেলার দরকার নাই। আবার সে কোন ধরনের খেলা খেলবে, সেটাও চাপিয়ে দিতে যাবেন না। ওকে ওর মতো খেলতে দিন। মনের মতো।
শিশু মুহাম্মাদ যখন অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে খেলছিলেন, তখন বক্ষবিদারণের সেই বিখ্যাত অলৌকিক ঘটনা ঘটে। কাজেই খেলাধুলার সময়কে অবমূল্যায়ন করবেন না। শিশুদের বেড়ে ওঠা ও শেখার জন্য এটা পার্ফেক্ট অপরচুনিটি।
মরুভূমিতে থাকার সময়ে তিনি দায়িত্ব ও যোগাযোগ রক্ষার ব্যাপারগুলো শিখেছেন। ওখানকার আবহাওয়া অনেক গরম। জীবন ধারণও কঠিন। কিন্তু মক্কার ব্যস্ত গলির চেয়ে মরুরাস্তায় তিনি ছুটে বেড়াতে পেরেছেন। যাযাবরদের জীবন মানে প্রতিদিন নতুন গন্তব্য। তাঁবু গাড়া, গবাদিপশু দেখা, আশপাশ দিয়ে যাওয়া কাফেলাগুলোকে সাময়িক আশ্রয় দেওয়া আর নিরাপদ জায়গা খোঁজা।
নিঃসন্দেহে শিশু মুহাম্মাদ-এর জন্য এ ধরনের পরিবেশ ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। উত্তেজনাময়। এটা তার চরিত্র বিকাশের সুযোগ করে দিয়েছে। আমি আগেই বলেছি, আনন্দের মাঝে শিশুরা শেখে।
📄 ভাষা দক্ষতা
মরুভূমির পরিবেশ তাঁর ভাষা দক্ষতা বাড়াতেও সাহায্য করেছে। স্কুলে ভর্তির আগের সময়টাতে শিশুদের মধ্যে এই দক্ষতা গড়ে ওঠে। মরুভূমির পরিবেশ বিজাতীয় সংস্কৃতি আর ভাষা বিকৃতি থেকে মুক্ত ছিল। যে কারণে রাসূল হয়ে উঠেছিলেন বিশুদ্ধভাষী। অনেক শব্দ শিখেছেন সেখানে।
মক্কায় তাঁর পরিবারের চেয়ে এখানে সদস্য সংখ্যা পাঁচজন বেশি ছিল। তাছাড়া ওখানে কেবল হজ্জের মৌসুমে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন আসত। এখানে প্রায়ই বিভিন্ন কাফেলা যেত। তাদের সংস্পর্শে তিনি বিভিন্ন আঞ্চলিক আরবির সান্নিধ্যে আসেন।
মক্কার লোকেরা তাদের শিশুদের যেসব কারণে মরুভূমিতে পাঠাতো, তার মধ্যে একটি ছিল তাদের আরবির ভিত যাতে মজবুত হয়। কমবেশি চার বছর শিশু মুহাম্মাদ সেখানে কাটিয়েছেন। আমাদের সময়ে হিসেব করলে স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে যে সময়টা বাচ্চাকাচ্চারা বাবা-মা'র সাথে থেকে অনেক কিছু শেখার সাথে ভাষাটাও শেখে। তো ঐ বয়সে মরুভূমির অনুকূল পরিবেশ ভাষায় তাঁর শক্ত ভিত গড়ে দিয়েছিল।
অন্যান্য বিষয়ে পারদর্শিতার আগে বাচ্চাদের মধ্যে ভাষাপটুতা আগে তৈরি হয়। অনেক শিশু প্রথম বছরে বিভিন্ন শব্দ শেখে। দুই বছর থেকে চার বছরে শব্দভাণ্ডার সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে। চার বছরের মধ্যে গড়পড়তা একটি শিশু হাজার খানেক শব্দ শেখে। এসব শব্দ ব্যবহার করেই তারা তাদের চাহিদা তুলে ধরে। কথা বলে। আত্মবিশ্বাস পায়।
আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, যেসব শিশুরা ঠিকমতো কথা বলতে পারে না, তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করে। এতে করে তাদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু আচরণ চোখে পড়ে। যেমন- উগ্র মেজাজ, অযথা চিৎকার-চেঁচামেচি।
📄 শিশুর ভাষাদক্ষতা কীভাবে বাড়াবেন?
• পনের মিনিট করে ওকে গল্প পড়ে শোনান। বর্ণনামূলক গল্প শিশুর কল্পনাশক্তি ও শব্দভাণ্ডার বাড়ায়।
• ওর কথা মন দিয়ে শুনুন। এতে করে ওর কথা বলার নৈপুণ্য বাড়বে।
• ওর মধ্যেও মন দিয়ে কথা শোনার অভ্যাস গড়ে তুলুন। ভাষাদক্ষতা বাড়ানোর জন্য অন্যের কথা মন দিয়ে শোনা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বড়দের জন্যও এটা খুব কাজের।
📄 মা’র মৃত্যু
এ পর্বে আমরা কথা বলব রাসূল এর মা'র মৃত্যু নিয়ে। এরপর সেখান থেকে তাঁর দাদার বাড়িতে লালনপালন। সেখানে কিন্তু তিনি চমৎকার আদরযত্নে লালিত হয়েছেন। প্রতিটি শিশুর শৈশব এমনই হওয়া উচিত আসলে।
মক্কায় ফিরে শিশু মুহাম্মাদ দুবছর মায়ের সঙ্গে কাটান। মা আমিনা মারা যান ২৬ বছর বয়সে। তখন মুহাম্মাদ-এর বয়স মাত্র ছয়। এত অল্প বয়সে যাদের মা মারা গেছেন, কেবল তারাই হয়ত তাঁর কষ্টটা বুঝতে পারবেন।
রোমান অর্থডক্স যাজক এবং ঔপন্যাসিক কন্সট্যান্টিন ঘিরঘিউ (Constantin Gheorghiu) তার লা ভিয়ে ডে মাহোমেত (La Vie De Mahomet) বইতে সেই করুণ দৃশ্যের কল্পনা করেছেন এভাবে- 'শিশু তার মায়ের কবরের পাশে বসে আর্তনাদ করছে, 'মা, তুমি বাসায় আসো না কেন? এই জীবনে তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে'?
এই বর্ণনা ঐতিহাসিকভাবে নির্ভরযোগ্য না। তবে এমন করুণ অবস্থার মুখোমুখি যারা হননি, তারা হয়ত এ থেকে তাঁর কষ্টের কিছুটা আঁচ করতে পারবেন। বাবাকে তো তিনি কখনো দেখেনইনি। জন্মের আগেই তাঁর বাবা মারা গিয়েছিলেন। তিনি মা'র খুব আপন ছিলেন। তার সাথে জড়িয়ে আছে কত না-ভোলা স্মৃতি।
বাস্তবে বলুন তো কে চায় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে? কেউ না। তবে শিশুর কাছের কেউ, আপন কেউ যদি মারা যায়, বা তার সাথে বিচ্ছেদ হয়, সেক্ষেত্রে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার উপায় জানা জরুরি।