📄 কবরের 'আযাব থেকে মুক্তির উপায়
উল্লিখিত লোক এবং তাদের মতো সকলেই এ সকল অপরাধের কারণে কম বেশি ও ছোট-বড় অনুপাতে তাদের কবরে শাস্তি হবে যতক্ষণ না আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে তাদের অপরাধ এড়িয়ে যাবেন।
আর যদি অধিকাংশ লোকই এ রকম হয়, তবে অধিকাংশ কবরবাসীও সাজাপ্রাপ্ত হবে এবং সফলকাম খুব কমই হবে। কাজেই কবরের উপরি ভাগ মাটি আর ভিতরে হায় হোতাশ ও শাস্তি। এর উপরি ভাগ মাটি ও নকশী পাথর দ্বারা বাঁধানো আর ভিতরে বিপদ ও জ্বালা-যন্ত্রনার গোডাউন। রান্নার সময় পাত্রে কোনো জিনিস যেভাবে উতরে উঠে সেভাবে তারা আক্ষেপে উতরে উঠছে। তাদের জন্য ইহাই প্রযোজ্য; অথচ এগুলো কবর ও এর প্রবৃত্তি তাদের আশা আকাঙ্খার মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করেছে।
আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আমি উপদেশ দিয়েছি, অন্য কারো জন্য তা বাকী রাখি নি, সেই সাথে আহ্বান করি যে, হে পৃথিবী আবাদকারীগণ! আপনারা এমন পৃথিবীকে আবাদ করছেন, যা আপনাদেরকে নিয়ে অতি শিঘ্রই নিঃশেষ হয়ে যাবে অথচ আপনারা সেই ঘরকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন যার দিকে খুব দ্রুত ধাবমান হচ্ছেন। অন্যের উপকার এবং বসবাসের জন্য ঘর তৈরি করছেন, পক্ষান্তরে নিজের সেই ঘরকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন যা ব্যতীত আপনার কোনো ঘর থাকবে না। তা চিরস্থায়ী ঘর, আমলের গোডাউন এবং ক্ষেতের বীজ, তা যেমনভাবে উপদেশ গ্রহণের জায়গা, জান্নাতের বাগিচা তেমনিভাবে জাহান্নামের গুহাও বটে।
এ ব্যাপারে ইবন কাইয়্যুম রহ. বলেন, কবরের 'আযাব থেকে মুক্তিদানকারী কারণসমূহ দুই প্রকার। সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত।
সংক্ষিপ্ত কারণ: সেই সকল কারণ থেকে বিরত থাকতে হবে, যা কবরের শাস্তি বয়ে আনে। কবরের শাস্তি থেকে বাঁচার উপায় হলো, মানুষ ঘুমের পূর্বে এক ঘন্টা সময় আল্লাহর জন্য ব্যয় করবে, তাতে সে পুরো দিনের লাভ লোকসানের হিসাব সম্পর্কে নিজেকে জিজ্ঞাসা করবে। অতঃপর এর জন্য আল্লাহর নিকট তাওবা নাসূহা করে ঘুমাবে এবং দৃঢ় সংকল্প করবে যেন ঘুম থেকে জেগে পূনরায় অপরাধে লিপ্ত না হয়। এভাবে প্রত্যেক রাত্রিতে করবে, অতঃপর সে যদি ঐ রাত্রিতে মারা যায় তাহলে সে তাওবার ওপর মারা যাবে। আর যদি ঘুম থেকে জেগে যায়, তবে সময় বেশি পাওয়ায় আনন্দ চিত্তে কাজের জন্য ভবিষ্যত সুখী হয়ে জাগল যেন সে তার রবের দিকে অগ্রসর হয়ে হারানো জিনিস পেতে পারে। এ প্রকার ঘুম থেকে বান্দার জন্য আর কোনো জিনিস নেই। বিশেষকরে ঘুম না আসা পর্যন্ত সে যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের ওপর আমল করে এবং যিকির-আযকারর করে। আর এ কাজের তাওফীক আল্লাহ তাকেই দিয়ে থাকেন, তিনি যার মঙ্গল চান, নিশ্চয়ই তিনি সর্ব শক্তিমান।
বিস্তারিত বর্ণনা: কবরের 'আযাব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত কতগুলো হাদীস উল্লেখ করব।
ইমাম মুসলিম রহ. তার সহীহ মুসলিমে সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন, একদিন একরাত্রি সীমান্ত পাহারা দেওয়া একমাস সাওম পালন করা এবং কিয়াম করা থেকে উত্তম। আর যদি সে মারা যায়, তবে যে কাজের ওপর মারা গেছে সে কাজের ওপর ভিত্তি করে পূণ্য পেতে থাকবে (সেই কাজের সাওয়াব তার ওপর জারি থাকবে) তার রিযিক চলতে থাকবে এবং ফিতনা থেকে নিরাপদে থাকবে।²⁹
রিবাত: শব্দের অর্থ কাফিরদের হাত থেকে মুসলিমদেরকে রক্ষার জন্য সীমান্তে অবস্থান করা।
ছুগুর: বলা হয় প্রত্যেক এমন জায়গাকে, যার অধিবাসী শত্রু দ্বারা আতঙ্কিত এবং শত্রুরা তাদের দ্বারা আতঙ্কিত। রিবাতের ফযীলত অনেক বেশি এবং পূণ্যও অধিক। তন্মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট রিবাত হলো, যে সীমান্তে আতঙ্ক বেশি থাকে।³⁰
এতে কি নিরাপত্তা বাহিনী শামিল হবে? যারা মুসলিমদের মঙ্গলের জন্য সার্বিক দিক দিয়ে পাহারা দেয়? বাহ্যিকভাবে বলা যায়, হ্যাঁ, তারাও এতে শামিল হবে; কিন্তু পূণ্যের আশা-আকাঙ্খা রাখতে হবে। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বাণী উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেন,
عينان لا تمسهما النار: عين بكت من خشية الله وعين باتت تحرس في سبيل الله».
“দুই প্রকার চক্ষুকে আগুনে স্পর্শ করবে না: যে চক্ষু আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে এবং যে চক্ষু আল্লাহর রাস্তায় রাত্রি পাহারা দিয়েছে।"³¹
কবরের 'আযাব থেকে মুক্তির উপায় হলো: ইমাম নাসায়ী কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক সাহাবী থেকে বর্ণিত হাদীস দ্বারা যা সাব্যস্ত রয়েছে, তিনি বলেন: এক ব্যক্তি বলল, মুমিন ব্যক্তিদের কী হলো যে, শহীদ ব্যতীত সকলেই তাদের কবরে ফিতনার সম্মুখীন হয়? তিনি বললেন: শহীদদের মাথার উপর তলোয়ারের ঝলকানির পরীক্ষাই তার জন্য যথেষ্ঠ।³²
ইমাম নাসায়ী ও ইবন মাজাহসহ অন্যান্যরা বিশুদ্ধ সনদে মিকদাদ ইবন মা'দিকারিব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “শহীদদের জন্য আল্লাহর নিকট ছয়টি গুণ রয়েছে:
1- তার রক্ত প্রবাহিত হওয়ার সাথে সাথেই তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।
2- জান্নাতে তার স্থান দেখিয়ে দেওয়া হয়।
3- কবরের 'আযাব থেকে তাকে রক্ষা করা হয়।
4- মহা আতঙ্ক থেকে তাকে নিরাপদে রাখা হয়।
5- ঈমানের চাদর পরিধান করিয়ে দেওয়া হয়।
6- হুরদের সাথে তাকে বিবাহ দেওয়া হয় এবং
7- তার আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে সত্তরজনের ব্যাপারে সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।”³³
এ শব্দগুলো ইবন মাজাহ, তিরমিযীতে এসেছে যে, তার মাথায় ইয়াকুত পাথরের টুপি পরিয়ে দেওয়া হবে, যা পৃথিবী এবং এর সকল জিনিস থেকে উৎকৃষ্ট। বায়াত্তর জন হুরের সাথে বিবাহ দেওয়া হবে এবং তার আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে সত্তর জনের ব্যাপারে সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। এটা হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ এবং এতে শহীদ হওয়ার কতিপয় ফযীলত।
কবরের 'আযাব থেকে মুক্তির উপায় সম্পর্কে আরো এসেছে যা আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবন মাজাহ এবং নাসায়ীতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ত্রিশটি আয়াত বিশিষ্ট কুরআনে একটি সূরা রয়েছে, যা তার পাঠকের জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করা হয়।”³⁴
এ হাদীসসহ সাহাবীদের এ রকম যত আমল রয়েছে তা প্রমাণ করে যে, যে ব্যক্তি সূরা মূলক নিয়মিত পাঠ করবে এবং এর প্রতি আমল করবে, নিশ্চয়ই তাকে কবরের 'আযাব থেকে তা রক্ষা করবে।
কবরের 'আযাব থেকে মুক্তির আরো উপায় হলো: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যাকে তার পেটের কোনো রোগ হত্যা করে তাকে কখনো কবরে 'আযাব দেওয়া হবে না।”³⁵
এ হাদীস প্রমাণ করে যে, যে ব্যক্তির পেটের রোগ হবে তাকে হায় হুতাশ না করে ধৈর্য্য ধারণ করে আল্লাহর নিকট পূণ্যের আশা করতে হবে, আর যদি তার পরিবারও এ আশা করে তারাও সাওয়াব পাবে।
এ অধ্যায়ে আরো যা আনা ভালো মনে হয় তাহলো ইবন হিববান তার সহীহতে এবং অন্যান্যরা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে যা বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন মৃত ব্যক্তিকে তার কবরে রাখা হয়, তখন সে তার নিকট থেকে ফিরে যাওয়া সাথীদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়। অতঃপর সে যদি মুমিন হয় তবে সালাত তার মাথার দিকে, সাওম তার ডান দিকে, যাকাত তার বাঁ দিকে এবং সদকা, আত্মীয়তা বন্ধন, সৎকাজ ও মানুষকে অনুগ্রহ করা -এ সকল ভালো কাজ তার পায়ের দিকে থাকে। অতঃপর কবরের 'আযাব যখন তার মাথার দিক দিয়ে আসে তখন সালাত বলে, আমার দিক দিয়ে কোনো রাস্তা নেই। তারপর যখন তার ডান দিক দিয়ে আসে সাওম বলে: আমার নিকট দিয়ে প্রবেশ করার কোনো পথ নেই। তারপর যখন তার বাঁ দিক দিয়ে আসে যাকাত বলে, আমার দিক দিয়ে কোনো রাস্তা নেই। পায়ের দিক দিয়ে আসলে সদকা, আত্মীয়তা বন্ধন, সৎকর্ম এবং মানুষকে অনুগ্রহ করা -এ সকল ভালো কাজ বলতে থাকে, আমার নিকট দিয়ে প্রবেশ করার কোনো পথ নেই। তখন তাকে উঠতে বললে সে উঠে বসে। অতঃপর তার জন্য প্রায় অস্ত যাওয়া একটি সূর্য তুলে ধরে বলা হয় তোমাদের মধ্যে একজন ব্যক্তি ছিল তাকে তুমি চেন কি? তার ওপর তুমি কিসের সাক্ষ্য দাও? সে বলে প্রথমে আমাকে সালাত পড়তে দাও, তারা বলে নিশ্চয়ই তা করবে। আমরা যা জিজ্ঞাসা করেছি তার উত্তর দাও। তোমাদের মধ্যে একজন ব্যক্তি ছিল তাঁর সম্পর্কে তুমি কি জান? তাঁর ওপর কিসের সাক্ষ্য দাও? তিনি বলেন, তখন সে বলে তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য বাণী নিয়ে এসেছেন। তাকে বলা হবে -এর ওপর জীবন কাটিয়েছ, এর ওপর মারা গিয়েছ এবং এর ওপরই আবার উঠানো হবে ইনশাআল্লাহ। অতঃপর তার জন্য জান্নাতের একটি দরজা খুলে দিয়ে বলা হবে এটাই তোমার স্থান, এর মধ্যে সব কিছুই আল্লাহ তোমার জন্য তৈরি করেছেন। তখন তার আনন্দ ও গর্ব বেড়ে যাবে। অতঃপর তার জন্য দোযখের একটি দরজা খুলে দিয়ে বলা হবে, যদি তুমি আল্লাহর নাফরমানী করতে তাহলে তোমার স্থান হতো এটি এবং এতে যা কিছু রয়েছে সবই তোমার জন্য তৈরি ছিল, তাতে তার আনন্দ ও গর্ব আরো বেড়ে যাবে। তারপর তার কবরকে তার জন্য সত্তর গজ প্রশস্ত করে তা নূর দিয়ে আলোকিত করে দেওয়া হবে এবং পূর্বের ন্যায় তার শরীর ফিরিয়ে দিয়ে তার আত্মা ভালো আত্মাসমূহের অন্তর্ভুক্ত করে দিবেন। আর তা হলো জান্নাতের বৃক্ষে ঝুলানো একটি পাখী। তিনি বলেন: এটাই আল্লাহ তা'আলার বাণী:
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ ءَامَنُواْ بِالْقَوْلِ الثَّabid فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ﴾ [ابراهيم: ٢٧]
“আল্লাহ মুমিন বান্দাদেরকে পৃথিবী এবং আখিরাতে মজবুত বাক্য দ্বারা শক্তিশালী করেন।” [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ২৭]
তারপর পুরো হাদীস উল্লেখ করেন।³⁶ এতে প্রমাণিত হয় যে, ঐ সকল আমল হলো সালাত, সাওম, যাকাত, সদকা, আত্মীয়তা বন্ধন, সৎকর্ম সম্পাদন এবং মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করা ইত্যাদি ভালো ভালো কাজ কবরের 'আযাব, দুঃখ-যাতনা এবং ফিতনা থেকে মুক্তির উপায়।
মোট কথা আল্লাহর দেওয়া কর্তব্য আদায় এবং হারাম থেকে বিরত থাকা, বেশি বেশি তাওবা করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং বেশি ফযীলত বিশিষ্ট আমল করা এবং কবরের 'আযাব হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনার মাধ্যমেই আল্লাহ তা'আলাকে প্রকৃত ভয় করা হয় বা পরহেজগারীতা বাস্তবায়িত হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ﴾ [الاحقاف: ١٣]
“নিশ্চয়ই যারা বলে আমাদের রব আল্লাহ, অতঃপর এর ওপর দৃঢ় থাকে তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।” [সূরা আল-আহকাফ, আয়াত: ১৩]
হে আল্লাহ আমাদের এবং আমাদের সকল মুসলিম ভাইদের কবরকে জান্নাতের বাগিচা বানিয়ে দাও। হে করুনাময়, তুমি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ফিতনা থেকে আমাদেরকে বাঁচাও।
টিকাঃ
²⁹ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯১৩
³⁰ মুগনী, ইবন কুদামা ১৩/১৮-২০
³¹ তিরমিযী, হাদীস নং ১৬৩৯, ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৭৯৯
³² নাসায়ী ৪/৯৯
³³ তিরমিযী, হাদীস নং ১৬৬৩, ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৭৯৯
³⁴ আবু দাউদ, হাদীস নং ১৪০০, তিরমিযী, হাদীস নং ২৮৯১, ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৭৮৬ ও নাসায়ী, হাদীস নং ৭১০
³⁵ তিরমিযী, হাদীস নং ১০৬৪ ও নাসায়ী ৪/৯৮
³⁶ ইবন হিব্বান পৃষ্ঠা নং ৭৮১, মুস্তাদরাক হাকেম ১/৩৮০-৩৮১, হায়ছামী/মাজমা'আ যাওয়ায়েদ ৩/৫২, ফতহুল বারী ৩/২৩৭-২৩৮
📄 বারযাখী জীবন সম্পর্কে কিছু মাসআলা
প্রথম মাসআলা: এ উম্মতের পূর্বলোেক (সালাফ) এবং ইমামদের মাযহাব হলো, যখন কোনো ব্যক্তি মারা যায় তখন সে তার ঈমান ও আমল অনুযায়ী শান্তি বা শান্তিতে থাকে। আর তা শরীর এবং রূহ উভয়েরই ঘটবে। রূহ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পর তা হয় শান্তিপ্রাপ্ত না হয় সাজাপ্রাপ্ত হবে। কখনো অল্প সময়ের জন্য সাজা দিয়ে তা শান্তিতে পরিণত করে দেওয়া হবে যদি সে পাপ হতে পবিত্র হয়ে যায়। কখনো রূহ শরীরের সাথে মিলিত হলে তখন শরীরের সাথে রূহেরও শান্তি বা শাস্তি ভোগ করতে হবে। সুতরাং কবর হয় জান্নাতের বাগিচা না হয় জাহান্নামের গুহা। যে কেউ মারা যাওয়ার পর যদি শাস্তি বা শান্তির হকদার হয়, তবে সে তার পুরোপুরি অংশ পাবে, তাকে কবর দেওয়া হোক বা না হোক।
আল্লাহ তা'আলাই শ্রষ্টা, উদ্ভাবক এবং প্রত্যেক জিনিসের ওপর ক্ষমতাবান।
অতঃপর যখন মহা প্রলয়ের দিন আসবে তখন রূহ শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হলে তারা তাদের কবর থেকে তাদের রবকে হিসাব দেওয়ার জন্য এবং প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য উঠে দাঁড়াবে। ³⁸
দ্বিতীয় মাসআলা: আল্লাহ আমাদের এবং আপনাদের সকলকে রহমত করুন, জেনে রাখুন! কবরের কঠোরতা ও বালা-মুসিবত হলো: কবরের চাপ দেওয়া, যা থেকে কেউ রেহাই পাবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয়ই কবরের একটি চাপ রয়েছে, যদি কেউ এ থেকে রক্ষা বা নিরাপদ পেয়ে থাকে তবে সা'দ ইবন মু'আয রাদিয়াল্লাহু 'আনহু রক্ষা পেয়েছেন। ”³⁹
ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “এ সেই ব্যক্তি যার জন্য 'আরশ কেঁপে উঠেছিল, আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়েছে এবং সত্তর হাজার ফিরিশতা তার জানাযায় অংশ গ্রহণ করেছে, তবুও তাকে একটি চাপ দেওয়ার পর তা সরিয়ে নেওয়া হয়। ⁴⁰
এ বিষয়ে হাফেজ যাহাবীর রহ. একটি সূক্ষ্ণ তা'লীক বা সংযুক্তি রয়েছে। তিনি সিয়ারে 'আলামীন নুবালাতে (১/২৯০-২৯১) যে ভাবে নিয়ে এসেছেন এখানে আমি হুবহু তুলে ধরেছি। তিনি বলেন, এ চাপ দেওয়াটা কবরের 'আযাব বলতে কিছু না বরং এটি একটি সাধারণ যন্ত্রনা যা মুমিন বান্দা পেয়ে থাকে, যেমন পৃথিবীতে কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ছেলে সন্তানের বিয়োগে পেয়ে থাকে, যা তার অসুখের যন্ত্রনা, আত্মা বের হয়ে যাওয়ার যন্ত্রনা, কবরে পরীক্ষা এবং প্রশ্নের যন্ত্রনা, তার জন্য তার পরিবার পরিজনদের ক্রন্দনের প্রতিক্রিয়ার যন্ত্রনা, তার কবর হতে উঠার যন্ত্রনা, হাশরের ময়দানে অবস্থান ও এর ভয়াবহতার যন্ত্রনা এবং জাহান্নামে গমণের যন্ত্রনা ইত্যাদি।
এ সকল ফিতনা সৃষ্টিকারী যন্ত্রনা বা মিথ্যা সংবাদ সব গুলোই মুমিন বান্দাকে পৌঁছাবে আর এগুলো কবরের 'আযাব নয় এবং জাহান্নামের 'আযাবও নয়; কিন্তু পরহেজগার বান্দার সাথে আল্লাহ সব কিছুর ব্যাপারে নম্রতা অবলম্বন করবে
আল্লাহর সাক্ষাৎ ব্যতীত মুমিন ব্যক্তির কোনো প্রশান্তি নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَأَنذِرْهُمْ يَوْمَ الْحَسْرَةِ ﴾ [مريم: ٣٩]
“এবং আফসোসের দিন তাদেরকে ভীতিপ্রদর্শন করুন।” [সূরা মারিয়ম, আয়াত: ৩৯]
তিনি আরো বলেন,
وَأَنذِرْهُمْ يَوْمَ الْآزِفَةِ إِذِ الْقُلُوبُ لَدَى الْحَنَاجِرِ كَاظِمِينَ ﴾ [غافر: ١٨]
“আপনি তাদেরকে আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দিন, যখন প্রাণ কন্ঠজত হবে।” [সূরা গাফির, আয়াত: ১৮]
সুতরাং আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা এবং অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি। এ সকল আন্দোলন সত্যেও আমরা যতটুকু জানি সা'দ ইবন মু'আয রাদিয়াল্লাহু 'আনহু জান্নাতবাসী এবং শহীদদের সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছেন।
মনে হয় আপনি এ ধারণা করে আছেন যে, যারা সফলকাম হবে তাদের হয়তো ইহকাল এবং পরকালে কোনো বিভীষিকা, আতঙ্ক, দুঃখ-যাতনা এবং ভয় পৌঁছাবে না। আল্লাহর নিকট সুস্থতা কামনা করুন এবং সা'দ-এর দলের সাথে আমাদিগকে হাশর করার জন্য প্রার্থনা করুন।
হে আল্লাহ! আমরা তোমার নিকট ক্ষমা ও সুস্থতা প্রার্থনা করছি এবং তুমি আমাদেরকে মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিনি তোমার বান্দা ও রাসূল; তাঁর এবং তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহাবাদের দলে হাশর করুন।
তৃতীয় মাসআলা: রূহসমূহ বাকী অন্যান্য সকল সৃষ্টির মতোই সৃষ্টিজীব। তা আল্লাহর নির্দেশে তৈরিকৃত, লালিত এবং পরিচালিত। ⁴¹
আল্লাহর বাণী:
وَيَسْتَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي ﴾ [الاسراء: ٨٥]
এর তাফসীরে ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, আল্লাহর নির্দেশে রূহ সৃষ্টির ওপর প্রমাণ করে। অর্থাৎ তা একটি মহান কাজ এবং অনেক বড় বিষয়, তিনি সন্দেহ করে বিস্তারিত আলোচনা করেন নি যেন আত্মার অস্তিত্বের জ্ঞান থাকা সত্বেও মানুষ নিজের আত্মার হাকীকত সম্পর্কে অপারগতার কথা দৃঢ় ভাবে জানতে পারে। ⁴² আকীদা তাহাবীয়ার শরাহকারক রূহের মৃত্যু সম্পর্কে বলেন, সঠিক হলো আত্মার মৃত্যু বলা। আর তা হলো শরীর থেকে আত্মা বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক হয়ে যাওয়া। এর মৃত্যুতে উদ্দেশ্য যদি এই হয় তবে তাই হলো মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করা, আর যদি উদ্দেশ্য হয় একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, তবে এ অনুপাতে তা মারা যায় না; বরং তা শান্তি বা শাস্তিতে বাকী থেকে যায়, যেমন উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। ⁴³
চতুর্থ মাসআলা: একটি দল পরিষ্কারভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে, তারা ধারণা করে যে, রূহসমূহ স্থানান্তরিত হয়। অর্থাৎ রূহ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর অন্য শরীরে প্রবেশ করে তার আকৃতি ধারণ করে এবং তারা এ ধারণাও পোষণ করে যে, কোনো রূহ জীব জন্তু, কীট পতঙ্গ ও পশুপাখী ইত্যাদির মধ্যে যার সাথে সামঞ্জস্য ও আকৃতিতে মিলবে তার মধ্যে প্রবেশ করে। এ প্রকার কথা নিতান্তই বাতিল। যার ওপর পূর্বের এবং পরের নবী রাসূলগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন, তা এর পরিপন্থি। তা আল্লাহ এবং পরকালের ওপর কুফুরি করার শামিল। ⁴⁴
এ বাতিল মাযহাব বহু পূর্বেই প্রকাশ হয়েছে, তবে আমাদের মাঝে তা নতুন পোশাক পরিধান করে আবার আত্মপ্রকাশ করেছে, নাম দেওয়া হয়েছে (আর রূহিয়া আল হাদীসা) নতুন আত্মা বা (তাহযীবুর রূহ) রূহের উপস্থিতি।
এ বাতিল চিন্তাধারা পশ্চিমা কতগুলো দেশে প্রচলিত আছে এবং প্রায় ১৮৮২ খ্রিস্টাবে বৃটেন ও আমেরিকায় বিশেষ বিশেষ সংগঠন গঠন করা হয়েছে। এখনো তাদের এ পথভ্রষ্ঠতা এবং ভ্রান্ততা প্রত্যেক চক্ষুষ্মান জ্ঞানবানের জন্য দীপ্তমান। ⁴⁵
হাফেজ কুরতুবী রহ. এ ব্যাপারে তার কিতাব (আর মুফহীমে) বলেন: তানাসুখীদের কোনো কথার দিকে ভ্রুক্ষেপ করা যাবে না। যারা বলে যে, রূহসমূহ সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য লাভের জন্য অন্যান্য শরীরে স্থানান্তরিত হয় অথচ তা শরী'আত এবং উলামাগণের ঐক্যমতের পরিপন্থি। এ রকম বিশ্বাসী নিঃসন্দেহে কাফির হয়ে যাবে। কেননা পরকাল এবং এর বিস্তারিত অবস্থার ব্যাপারে আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা জানা যায় সত্যিকারে তা অস্বীকার করা অথচ তারা যা বলে তার কোনো ভিত্তি নেই। সুতরাং তানাসুখের দাবী বাতিল এবং জ্ঞানের দিকে দিয়ে অসম্ভব। ⁴⁶ এতে প্রতীয়মান হয় যে, রূহসমূহ এ পার্থিব জীবনে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তার পূনরূত্থান রয়েছে। অতএব, দ্বিতীয়বার শরীরের সাথে পুরোপুরি মহা সাক্ষাত করবে, যেন প্রত্যেক মুকাল্লাফ (প্রাপ্ত বয়স্ক) বান্দা পৃথিবীর কৃতকর্মের ফল লাভ করতে পারে।
পঞ্চম মাসআলা: মৃত্যুর পর রূহসমূহের নির্ধারিত স্থান কোথায় হবে? আল্লামা ইবন কাইয়ুম রহ. তার কিতাব আর রূহে এ মাসআলা সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন এবং কতগুলো মতামত উল্লেখ করে একটি সঠিক মত বলে দিয়েছেন। রূহসমূহ বারযাখে এদের নির্দিষ্ট স্থানে পরস্পর পরস্পরে বিরাট ব্যবধান রয়েছে বলে তিনি বলেন।
তন্মধ্যে ইল্লেয়িয়নের সর্বোচ্চে ফিরিশতাগণের সাথে কতগুলো রূহ রয়েছে, এগুলো হচ্ছে নবীদের রূহ। আল্লাহ তাদের সকলের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। তাঁদের মধ্যেও তাঁদের স্থান অনুযায়ী পরস্পরের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজের রাত্রিতে দেখেছেন।
এমনিভাবে কতগুলো রূহ রয়েছে সবুজ পাখীর পেটের মধ্যে, যে পাখী তার আপন মনে জান্নাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর তা হচ্ছে কতিপয় শহীদদের রূহ, তাও আবার সকল শহীদের রূহ নয়, কেননা তাদের মধ্যে কোনো রূহ কোনো কারণে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারছে না। যেমন, ঋণ, মাতা-পিতার অবাধ্যতা এবং গণীমতের মাল আত্মসাত করা ইত্যাদি। এ সকল কারণে কোনো কোনো শহীদ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে নি বা জান্নাতের দরজায় আটকিয়ে দেওয়া হয়েছে বা তাকে কবরেই আটকানো হয়েছে। শহীদদের মধ্যে কারো স্থান হয়েছে জান্নাতের দরজা আবার কাউকে দু'টি পাখা দেওয়া হয়েছে, যা দ্বারা সে জান্নাতের মধ্যে আপন মনে উড়ে বেড়াচ্ছে। যেমন, তা ছিল জা'ফর ইবন আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর। জিহাদে তার দু'টি হাত কাটা যাওয়ায় আল্লাহ তাকে এর বদৌলতে দু'টি পাখা দিয়েছেন, যা দ্বারা তিনি ফিরিশতাদের সাথে জান্নাতে স্বাধীন ভাবে উড়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের মধ্যে কতগুলো লোককে পৃথিবীতেই আটকিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের রূহ উপরে (সম্মানিত স্থানে) উঠানো হয় নি। কেননা তা ছিল নীচু পার্থিব রূহ। আর নীচু পার্থিব রূহ আকাশীয় রূহের সাথে একত্রিত হবে না, যেমনভাবে পৃথিবীয় তা একত্রিত হতো না।
যে আত্মা পৃথিবীয় আল্লাহকে চিনে নি, ভালোবাসে নি, তাকে স্মরণ করে নি, তাঁর নৈকট্য লাভ করে নি; বরং পৃথিবী আত্মা ছিল, সে আত্মা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও এখানেই থাকবে। যেমনিভাবে উর্ধ্বগামী আত্মা পৃথিবীয় আল্লাহর ভালোবাসায় নিমগ্ন ছিল, তাকে স্মরণ করেছে, তাঁর নৈকট্য লাভ করেছে, সে আত্মা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তার উপযোগী ঊর্ধ্বগামী আত্মার সাথে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা বারযাখে এবং পূনরুত্থান দিবসে আত্মাসমূহকে জোড়ায় জোড়ায় মিলিয়ে দিবেন এবং মুমিন রূহকে পাক-পবিত্র রূহের সাথে রাখবেন, কেননা প্রত্যেক রূহ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তার আকৃতি বিশিষ্ট রূহ, ভগ্নি এবং তার মতো আমলকারীদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের সাথেই থাকবে।
কতগুলো রূহ ব্যভিচার নর-নারীদের চুলায় থাকবে, কিছু রূহ রক্তের নদীতে সাঁতার কাটবে আর পাথর গিলবে যা পূর্বে উল্লেখিত সামুরা ইবন জুন্দুব কর্তৃক স্বপ্নের হাদীসে এসেছে। এ থেকে জানা যায় যে, রূহসমূহ শরীর হতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তার সৌভাগ্য এবং দুর্ভাগ্য লাভ করার পর একই স্থানে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং কিছু ইল্লিয়িয়নের সর্বোচ্চে আবার কতগুলো নিম্ন ভূমিতে থাকে যা পৃথিবী হতে উপরে উঠতে পারে না।⁴⁷
ষষ্ট মাসআলা: আল্লাহ তা'আলা তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন: পৃথিবীর ক্ষনস্থায়ী স্তর, বারযাখের স্তর এবং পরকালীন স্থায়ী স্তর। প্রত্যেক স্তরের জন্য নির্দিষ্ট হুকুম ও বিধান তৈরি করেছেন। মানুষকে শরীর ও রূহের সমন্বয়ে গঠন করে এ তিন স্তরের প্রত্যেক স্তরে এদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র ও বিধান তৈরি করেছেন।
প্রথম স্তর পৃথিবীর জীবন
তা এমন একটি স্তর যাকে আত্মাসমূহ ভালোবেসে এর বুকে লালিত পালিত হয়েছে, এর ভালো-মন্দ এবং সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের কারণগুলো উপার্জন করেছে। পার্থিব জীবনের স্তরের হুকুম শরীরের জন্য প্রযোজ্য, রূহসমূহ এর অনুগত। আর এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা শর'ঈ হুকুম জিহ্বা ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বাহ্যিক কর্মের ওপর আরোপিত করেছেন যদিও আত্মাসমূহ এর বিপরীত করে। ইহকালে শরীরের সাথে রূহের সম্পর্ক একটি বিশেষ ও গভীর সম্পর্ক, আর এ সম্পর্ক শুধু মানুষের ঘুমের সময় এবং মাতৃগর্ভে ভ্রূণ অবস্থায় থাকে। কেননা এক দিক দিয়ে শরীরের সাথে রূহের সম্পর্ক অন্য দিক দিয়ে তা থেকে বিচ্ছিন্ন।
দ্বিতীয় স্তর বারযাখী জীবন
তা পৃথিবীর স্তরের চেয়ে অনেক বড় এবং বিস্তৃত। বরং তা পৃথিবী অপেক্ষা এতই বড় বা বিস্তৃত যেমন মাতৃগর্ভ অপেক্ষা পৃথিবী বড় বা বিস্তৃত।
বারযাখী জীবনের হুকুম বা বিধান রূহের ওপর প্রযোজ্য হয়, শরীর এর অনুগত। পৃথিবীতে রূহ যেমন শরীরের সাথে মিলিত হলে এর দুঃখে দুঃখিত হয় এবং এর বিশ্রামে প্রশান্তি অনুভব করে, শরীরই 'আযাব বা শান্তির কারণগুলো বয়ে আনে, তেমনিভাবে বারযাখে শরীরগুলো 'আযাবে এবং শান্তিতে রূহের অনুগত হয় এবং রূহসমূহ তখন শান্তি বা শাস্তি বয়ে আনে। কেননা রূহসমূহ বারযাখে যদিও শরীর হতে বিচ্ছিন্ন এবং পৃথক থাকে; কিন্তু কোনো অস্তিত্ব বাকী না রেখে একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না; বরং শরীরের সাথে এর একটি বিশেষ অবস্থায় সম্পর্ক বাকী থাকে। এর প্রমাণ হলো কোনো মুসলিম সালাম দেওয়ার সময় শরীরে রূহ ফিরিয়ে দেওয়া সম্বন্ধে যা এসেছে এবং তার থেকে তার সাথীদের ফিরে যাওয়ার সময় জুতার আওয়াজ শুনার হাদীস, এ ছাড়াও অন্যান্য প্রমাণাদি রয়েছে।
তৃতীয় স্তর পরকালিন স্থায়ী জীবন
আর তা হলো হয় জান্নাত না হয় জাহান্নাম। তারপরে আর কোনো স্তর নেই। আল্লাহ তা'আলা স্তরে স্তরে ও ধাপে ধাপে রূহগুলো স্থানান্তর করে সেই স্তরে পৌঁছে দেন, যা এর জন্য উপযোগী এবং তা-ই তার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আমল করার জন্য তৈরি করা হয়েছে, যা তাকে সে স্তরে পৌঁছে দেবে। এ স্তরে শরীরের সাথে রূহের সম্পর্কই পরিপূর্ণ সম্পর্ক। উল্লিখিত সম্পর্কগুলো এর তুলনা হয় না। সুতরাং তা এমন এক সম্পর্ক যেখানে শরীর মৃত্যু, ঘুম এবং অরাজকতা গ্রহণ করে না, কেননা ঘুম হলো মৃত্যুর ভাই।
যে ব্যক্তি তা পরিপূর্ণভাবে জানতে পারে তার নিকট থেকে রূহ এবং এর সম্পর্কর্তার ব্যাপারে বহু উদ্ভাবিত প্রশ্ন দূর হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা এর প্রস্তুতকারক ও সৃষ্টিকর্তা, মৃত্যু দানকারী এবং জীবন দাতা, এর সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য দানকারী, যিনি এর মাঝে সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য ভেদে বিভিন্ন স্তরে পার্থক্য রেখেছেন, যেমনভাবে পার্থক্য করেছেন এর উচ্চ স্তরে, আমলে, শক্তিতে এবং চরিত্রে। আর যে ব্যক্তি প্রয়োজন অনুপাতে তা জানল সে সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো যোগ্য উপাস্য নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো অংশিদার নেই, তাঁর জন্যই সকল রাজত্ব, সকল প্রশংসা, তাঁর হাতেই সকল মঙ্গল এবং প্রত্যেক কর্ম তার দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তার জন্য সকল সামর্থ এবং শক্তি, সম্মান এবং কলা কৌশল এবং সার্বিক দিক দিয়ে তার পূর্ণতা রয়েছে। সে নিজের সত্তাকে চেনার মাধ্যমে সকল নবী রাসূলের সত্যতা জানতে পারবে, তাঁরা যা নিয়ে এসেছেন তা সত্য। সুষ্ঠ জ্ঞান এবং সঠিক দীন এর সাক্ষ্য দেয়, আর যা এর বিপরীত তা বাতিল। ⁴⁸
সপ্তম মাসআলা: মৃত ব্যক্তিগণ জীবিত ব্যক্তিদের যিয়ারত এবং তাদেরকে সালাম দেওয়া সম্পর্কে জানতে পারে কি না?
ইবন কাইয়ুম রহ. এ মাসআলা নিয়ে তার কিতাব আর রূহের প্রথম দিকে আলোচনা করে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, মৃত ব্যক্তি নিজে তার যিয়ারতকারীকে চিনে এবং সালামের উত্তর দেয়, তিনি এর প্রমাণও নিয়ে এসেছেন। ⁴⁹
প্রমাণপঞ্জি: ইবন আব্দুল বার এবং ইবন আবুদ পৃথিবী ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “কোনো মুসলিম পৃথিবীয় তার কোনো পরিচিত মৃত ব্যক্তির কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম কালে তার ওপর সালাম দিলে আল্লাহ তার রূহকে ফিরিয়ে দেন যেন সে সালামের উত্তর দিতে পারে। ”⁵⁰
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের জন্য বিধান করে তাদেরকে শিখিয়ে গিয়েছেন যে, তারা যখন কবর যিয়ারত করবে তখন বলবে:
سلام عليكم أهل الديار من المؤمنين والمؤمنات وإنا إن شاء الله بكم لاحقون، يرحم الله المستقدمين منا ومنكم والمستأخرين، نسأل الله لنا ولكم العافية».
“হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলিমগণ! তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, আর অতি সত্বর আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হব ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের মধ্যে অগ্রে ও পরে অগমনকারীদেরকে রহমত করুন, আল্লাহর নিকট আমাদের এবং তোমাদের সুস্থতা কামনা করছি।”⁵¹
এ সালাম, সম্বোধন এবং আহ্বান উপস্থিত ব্যক্তির জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে যে ব্যক্তি শুনতে পায়, যাকে সম্বোধন করা হয় সে তা বুঝে এর উত্তর দেয় যদিও সালামদাতা সালামের উত্তর শুনতে পায় না। অন্যথা এ সম্বোধন ও সালাম হতো কোনো শূন্য ও জড় পদার্থ্যের জন্য, আর তা অসম্ভব ব্যাপার। তাছাড়া যদি তারা তাদের ওপর সালামকারীদের অনুভব না করতে পারে তাহলে যিয়ারতকারী বলা ঠিক হবে না। কেননা যাকে যিয়ারত করা হয় সে যদি তার যিয়ারতকারীকে জানতে না পারে তবে এ কথা বলা ঠিক হবে না যে, সে তাকে যিয়ারত করেছে।
আল্লামা ইবন কাইয়্যুম রহ. বলেন, সালাফগণ এর ওপর ঐক্যমত এবং তাদের থেকে আছার বা বাণী এসেছে যে, মৃত ব্যক্তি জীবিত ব্যক্তির যিয়ারতকে জানতে পেরে খুশী হয়। মৃতদের না শুনার ব্যাপারে জ্বলন্ত নির্দশন- আল্লামা আল আলুসীর লেখা ও এর ভূমিকায় আল্লামা নাসিরুদ্দীন আল আলবানী।
একটি সতর্কতা: এ মাসআলার ভিত্তি হলো মৃতদের শুনার সঠিকতার ওপর, না শুনার ওপর নয়। অর্থাৎ মৃতরা কি তাদের ওপর সালামকারীর সালাম এবং কথা শুনতে পায়? উলামাদের মধ্যে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ⁵²
প্রমাণের মাধ্যমে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী মত হয়তো সেটাই যিনি বলেছেন যে, মৃতদের শ্রবণ শক্তি রয়েছে। আর তা সেই অবস্থাসমূহে যার ওপর কুরআন ও সহীh হাদীস প্রমাণ করে। যেমন, তার থেকে ফিরে যাওয়া আত্মীয় স্বজনদের জুতার আওয়াজ শুনা ও কোনো মুসলিমের সালাম দেওয়া ইত্যাদি। অনেক মুহাকিক উলামা ঐক্যমত পোষণ করেছেন। যেমন শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া, আল্লামা ইবন কাইয়্যুম, হাফেজ ইবন কাছীর ও হাফেজ কুরতুবীসহ অন্যান্য উলামাগণ। ⁵³ কিন্তু শুনার পদ্ধতি কেবলমাত্র আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন।
মোট কথা, যদি এমনও বলা হয় যে, মৃত ব্যক্তিগণ সাধারণত শুনে থাকে, তবুও তাদের কবরে তাদের রূহ এবং শরীরের আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা ইহকালীন জীবন থেকে ভিন্নতর। যেমন তাদের মৃত্যুতে তাদের নড়াচড়া বা পিছনে ফেলে আসা কাজ কর্মের ওপর কোনো প্রতিক্রিয়া করা, এগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
এ পরিপেক্ষিতে বলা যায় যে, একথা বিশ্বাস করা প্রত্যেক নর-নারীর ওপর একান্ত কর্তব্য যে, মৃতদের নিকট দো'আ চাওয়া, তাদের নিকট কোনো কিছু চাওয়া, তাদেরকে মাধ্যম মানা ও তাদের জন্য কোনো মান্নত করা শরী'আত পরিপন্থী এবং জ্ঞানের অজ্ঞতা প্রকাশ করার নামান্তর।
শরী'আত পরিপন্থী হলো এতে আল্লাহর সাথে অংশিদার করা হয়, যা ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে দেয় অথবা এর কারণ হয়ে দাড়ায়। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا ﴿ ﴾ [الجن: ١٨]
“এবং সকল মসজিদ আল্লাহর জন্যই। বিধায় তোমরা তাঁর সাথে অন্য কাউকে ডেকো না। [সূরা আল-জিন্ন, আয়াত: ১৮]
তিনি আরো বলেন,
وَمَن يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا ءَاخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِندَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ ﴾ [المؤمنون: ۱۱۷]
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকে, যার কোনো সনদ তার নিকট নেই, তার হিসাব-নিকাশ তার পালনকর্তার নিকট রয়েছে, নিশ্চয়ই কাফিরগণ সফলকাম হবে না।” [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ১১৭]
তিনি আরো বলেন,
ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِن قِطْمِيرٍ إِن تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُواْ مَا اسْتَجَابُواْ لَكُمْ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُونَ بِشِرْكِكُمْ وَلَا يُنَبِّئُكَ مِثْلُ خَبِيرٍ ﴾ [فاطر: ١٣، ١٤]
“তিনিই আল্লাহ, তোমাদের পালনকর্তা, তাঁর জন্য সাম্রাজ্য, তাঁর পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাক তারা সামান্য একটি খেজুর আঁটির অধিকারীও নয়। যদি তোমরা তাদেরকে ডাক তারা তোমাদের ডাক শুনবে না, শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না আর কিয়ামতের দিন তোমাদের শির্ককে অস্বীকার করবে। বস্তুতঃ আল্লাহর ন্যায় তোমাকে কেউ অবহিত করবে না।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ১৩-১৪]
আর অজ্ঞতা হলো যে ব্যক্তি কবরবাসী এবং তাদের মাজারে গিয়ে প্রার্থনা করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের নিকট সেই জিনিস চেয়ে বসে, যা তার সাধ্যের বাহিরে অথচ তারা (প্রশ্নকারী) জীবিত অথবা তাদের নিকট এমন জিনিস চায়. যা সে নিজেই করার ক্ষমতা রাখে। কেননা সে জীবিত উপস্থিত এবং তার পছন্দ রয়েছে। কিন্তু (তারা মৃত) পৃথিবী এবং তাদের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, পৃথিবীর কোনো ব্যাপারে এদিক সেদিক করার কোনো সুযোগ তাদের নেই।
মৃতদের শুনার মাসআলার পর তা একটি সতন্ত্র সতর্কতা বর্ণনা করার একান্ত আবশ্যকীয়তার চাহিদা রাখে, কেননা বহু লোক এতে ভুল করে থাকে। উপরন্তু শির্কের মধ্যে পতিত হওয়ার জন্য তা একটি তৈরিকৃত দরজা হওয়ার কারণ এ মাসআলা। বিস্তারিত বর্ণনার নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের তাওফীক দান করুন।
অষ্টম মাসআলা: মৃতদের রূহসমূহ পরস্পর পরস্পরে সাক্ষাৎ, যিয়ারত এবং একে অপরকে স্মরণ করে কি না? তা একটি গায়েবী বিষয়ক মাসআলা, যা অহীর মাধ্যম ব্যতীত জানা যায় না। কুরআন হাদীসের প্রমাণপঞ্জি তা স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছে। এর বিস্তারিত বর্ণনা হলো (শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা বলেন, পৃথিবীতে মৃত ব্যক্তির পরিবার পরিজন, সঙ্গী সাথীদের অবস্থা জানার সংবাদ ব্যপক ভাবে প্রচারিত হয়েছে, আর তা তার ওপর পেশ করা হয়। মূল উদ্দেশ্য এখানেই শেষ।) ⁵⁴
রূহসমূহ দুই প্রকার: সাজাপ্রাপ্ত রূহ এবং শান্তিপ্রাপ্ত রূহ।
সাজাপ্রাপ্ত রূহ হলো তার ওপর অর্পিত শাস্তিতে ব্যস্ত থাকার দরুন অন্যদের সাথে যিয়ারত এবং সাক্ষাৎ করতে পারে না। কিন্তু স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া শান্তিপ্রাপ্ত রূহসমূহ পৃথিবীয় যেভাবে সাক্ষাৎ, যিয়ারত এবং একে অপরকে স্মরণ করতো এবং পৃথিবী বাসীদের দ্বারা যা হয় সেখানেও তা করে। কাজেই প্রত্যেক রূহ তার বন্ধু ও সহপাঠিদের সাথে থাকবে যারা তার মতো আমল করেছে।
আর আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রূহ থাকবে সর্বোচ্চ স্থানে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُوْلَبِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّنَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُوْلَبِكَ رَفِيقًا ﴾ [النساء: ٦٩]
“আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, সে তাদের সঙ্গী হবে যাদেরকে আল্লাহ নি'আমত দান করেছেন, তারা হলেন নবী, সিদ্দিক, শহীদ এবং সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ আর তাদের সান্নিধ্যই উত্তম।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৯]
আল্লামা ইবন কাইয়ুম রহ. বলেন, এ সহচার্য্য পৃথিবী, বারযাখ এবং পরকালে হওয়া সাব্যস্ত রয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তি এ তিন স্তরে তার পছন্দনীয় ব্যক্তির সাথে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَتَأَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي ﴾ [الفجر: ٢٧، ٣٠]
“হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি সন্তুষ্ট ও সন্তুষভাজন হয়ে তোমার রবের নিকট ফিরে যাও। অতঃপর আবার আমার বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।” [সূরা আল-ফাজর, আয়াত: ২৭-৩০]
অর্থাৎ তাদের মধ্যে প্রবেশ করে তাদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাও। আর তা মৃত্যুর সময় রূহকে লক্ষ্য করে বলা হয়।
আল্লাহ তা'আলা শহীদদের সম্পর্কে এবং তাদের শহীদ হওয়ার পর যার সম্মুখীন হয় তা সম্বন্ধে সংবাদ দিয়ে বলেন,
وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُواْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ فَرِحِينَ بِمَا وَاتَهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ، وَيَسْتَبْشِرُونَ بِالَّذِينَ لَمْ يَلْحَقُوا بِهِم مِّنْ خَلْفِهِمْ أَلَّا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْzَنُونَ ﴾ [ال عمران: ١٦٩، ١٧٠]
“আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদেরকে তোমরা মৃত মনে করো না; বরং তারা তাদের রবের নিকট জীবিত এবং জীবিকা প্রাপ্ত। আল্লাহ নিজের অনুগ্রহ থেকে তাদেরকে যা দান করেছেন তাতে তারা আনন্দ উপভোগ করছে, আর তাদের পরে আসা এখনো যারা তাদের সাথে মিলিত হয় নি, তাদেরকে নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে, কারণ তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৯-১৭০]
এ আয়াতদ্বয় তাদের পরস্পর পরস্পরে সাক্ষাতের প্রমাণ করে তিন দিক দিয়ে।
প্রথম দিক: তারা তাদের রবের নিকট জীবিত এবং জীবিকা প্রাপ্ত, যেহেতু তারা জীবিত সেহেতু তারা পরস্পরে সাক্ষাত করে থাকে।
দ্বিতীয় দিক: তাদের নিকট আগমণকারী এবং তাদের সাথে সাক্ষাতকারী ব্যক্তিদের নিয়ে তারা আনন্দ প্রকাশ করে থাকে।
তৃতীয় দিক: (ইয়াস্তাবশিরুন) শব্দটি আভিধানিক অর্থে একে অপরকে সুসংবাদ দানের উপকারীতা দেয়, যেমন (ইয়াতাবাশারুন) শব্দটি।
মৃত্যুর পর মুমিনদের রূহসমূহ পরস্পরে সাক্ষাতের আরো কিছু প্রমাণাদি হলো যা ইমাম নাসায়ী, ইবন হিববান ও হাকিমের নিকট সহীহ সনদে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে এসেছে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যখন মুমিন ব্যক্তির মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন তার নিকট রহমতের ফিরিশতা শুভ্র রেশমী কাপড় নিয়ে এসে বলে: হে রূহ! অতি আনন্দের সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও বিশ্রামের দিকে বের হয়ে আস, তোমার প্রতি আল্লাহ গোস্বা নন। তখন সে মিশকে আম্বরের ন্যায় সুগন্ধ নিয়ে বেরিয়ে আসে, তখন তাদের পরস্পরের সাথে সাক্ষাত লাভ হয়, এমনকি আকাশের দরজায় নিয়ে আসার পূর্ব পর্যন্ত। অতঃপর তারা বলে তোমাদের পৃথিবী হতে আসা সুগন্ধি কতইনা ভালো! তারপর তাকে মুমিনদের রূহের নিকট নিয়ে আসলে তারা অধিক আনন্দিত হয়, যেমন তোমাদের মধ্যে কোনো অনুপস্থিত ব্যক্তির আগমনে আনন্দিত হও। অতঃপর তারা তাকে জিজ্ঞাসা করে: অমুক কি করে? অমুক কি করে? তারা বলে: আরে ছাড় তার কথা! তাকে বিশ্রাম নিতে দাও, কারণ সে পৃথিবীয় অশান্তিতে ছিল। সে যখন বলবে: অমুক কি তোমাদের নিকট আসে নি? তারা বলবে: তাকে তার মায়ের নিকট হাবিয়াতে (জাহান্নামে) নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আর কাফেরের নিকট যখন মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন তার নিকট শাস্তির ফিরিশতা পশমের এক টুকরা কাপড় নিয়ে এসে বলে: হে রূহ! অসন্তুষ্টি নিয়ে আল্লাহর শাস্তির দিকে বের হয়ে আস, তখন মৃত দুর্গন্ধযুক্ত জানোয়ারের ন্যায় দুর্গন্ধ নিয়ে বেরিয়ে আসলে তারা তাকে নিয়ে পৃথিবীর দরজা পর্যন্ত আসবে, অতঃপর তারা বলতে থাকবে: এ বাতাস কতইনা দুর্গন্ধযুক্ত, যতক্ষণ না তারা একে নিয়ে কাফিরদের রূহের নিকট আসবে।”
বারযাখী জীবন সংক্রান্ত এবং এর সাথে সম্পৃক্ত আনুসাঙ্গিক ব্যাপারে উল্লিখিত আলোচনার মাধ্যমে আমাদের নিকট একটি জিনিস পরিস্কার হয় যে, আমরা যে দিকে ধাবিত হচ্ছি তা কত কঠিন এবং কত বড়। এর পরেও আমরা আনুগত্যে অনেক ধীরস্থির, নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকা থেকে শিথিলতা করছি অথচ দীর্ঘ আশা আকাঙ্খা, নির্দিষ্ট সময়ের দীর্ঘ জীবনই আমাদেরকে হক থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। নিশ্চয়ই তা একটি ধ্বংস, যার পরেও রয়েছে ধ্বংস এবং একটি ক্ষতি যার পরে কোনো লাভ এবং সংশোধন নেই। কিন্তু আল্লাহ যদি আমাদেরকে তাঁর রহমত এবং অনুগ্রহ দ্বারা বেষ্টন করে রাখেন।
হে আল্লাহ! তোমার শক্তি ব্যতীত আমাদের কোনো শক্তি নেই, হে আল্লাহ আমরা তোমার সন্তুষ্টি এবং জান্নাত চাই। হে আল্লাহ! তোমার অসন্তুষ্টি এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাই। হে আল্লাহ আমাদেরকে, আমাদের পিতা-মাতা এবং মুসলিম ভ্রতৃবৃন্দকে রহমত করুন।
وصلى الله وسلم علي عبدك ورسولك محمد وعلى آله وصحبه أجمعين
টিকাঃ
³⁷ এ ধরনের মাসায়েল অদৃশ্য বিষয়, কুরআন হাদীস ব্যতীত এতে পৌঁছার কোনো পথ নেই বিধায় এ দু'টুকে আঁকড়ে ধরা একান্ত কর্তব্য। তাছাড়া অন্য কোনো জিনিসের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া কারো জন্য উচিৎ নয়। আমরা এ মাসআলার ব্যাপারে সালাফ এবং ইমামদের বুঝের ওপর নির্ভর করেছি এবং আল্লাহর নিকট তাওফীক চাচ্ছি।
³⁸ মাজমু'আ ফাতওয়া ৪/২৮৪ ও আর রূহ পৃষ্ঠা নং ৩৩২-৩৩৩
³⁹ এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (মুসানাদ ৬/৫৫) এবং অন্যান্যরা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণনা করেছেন।
⁴⁰ নাসায়ী ৪/১০০, সিলসিলা সহীহায় হাদীসের তাখীরজ করা হয়েছে, পৃষ্ঠা নং ১৬৯৫, ৪/২৬৮ আলবানী।
⁴¹ আর রূহ পৃ: ৫৩১
⁴² জামে' আহকামুল কুরআন ১০/৩২৪
⁴³ আকীদা তাহাবীয়ার শরাহ ২/৫৭১
⁴⁴ আর রূহ পৃষ্ঠা নং ২৯২, ইবন কাছীর প্রকাশনী।
⁴⁵ কিতাব আর রূহের ভূমিকায় ১/১৫৭, মুহাক্কেকের লেখায় ড: বাস্সাম আল আয়ূস,
⁴⁶ আল মুফহীম ৪/৭১৯
⁴⁷ আর রূহ পৃষ্ঠা নং ১৮১, ২৯৫ ও২৯৬, শরহে আকীদা তাহাবিয়া ২/৫৭৮-৫৭৯
⁴⁸ আর রূহ পৃষ্ঠা নং ১৮১, ২৯৫-২৯৬, দার ইবন কাছীর প্রকাশনী, ও শরহে আকীদা তাহাবিয়া ২/৫৭৮-৫৭৯
⁴⁹ আর রূহ পৃষ্ঠা নং ৫৩
⁵⁰ হাফেজ ইরাকী ইহয়াউল উলূম ৪/৫২২ এ হাদীসের তাখরীজ করে উপকার করেছেন, ইবন আব্দুল বার তামহীদে ও আল ইস্তেদরাকে সহীহ সনদে নিয়ে এসেছেন ইবন আব্বাসের হাদীস এবং আরও যারা একে সহীহ বলেছেন তন্মধ্যে হাফেয আব্দুল হক আল আশবিলী। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া বলেছেন, ফাতাওয়া ২৪/৩৩১ ইবন মোবারক বলেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তা সাব্যস্ত রয়েছে।
⁵¹ মুসলিম হাদীস নং ৯৭৪
⁵² মাজমু'আ ফাতাওয়া ২৪/৩৬৩, আর রূহ পৃষ্ঠা নং ৫৩, তাফসীর ইবন কাছীর ৩/৪৮২-৪৮৪, সূরা রুমের তাফসীর, আয়াত নং ৫২
⁵³ দেখুন: পূর্বোল্লিখিত কিতাব ও আর রূহ পৃষ্ঠা নং ৭৮ (কিছু রদবদল করে) মাজমূ'আ ফাতাওয়া ২৪/৩৬৮-৩৬৯।
⁵⁴ দেখুন: আখবার ইলমিয়া মিনাল এখতেবার আল ফিকহিয়া/শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া। আল্লামা আলবানীর লেখা পৃষ্ঠা নং ১৩৫, টিকা টিপ্পনি- আহমাদ ইবন মুহাম্মদ আল খলীল। দারুল আসেমা রিয়াদ প্রকাশনী, এবং আল আজওয়ায়/শাইখ মানতেকী যা নিয়ে এসেছেন ৬/৪২১-৪৩৯