📘 বারযাখী জীবন > 📄 আকাশ ও জমিনে খারাপ আত্মার ভ্রমণ

📄 আকাশ ও জমিনে খারাপ আত্মার ভ্রমণ


এখানে কাফির বা পাপিষ্ঠ আত্মার ভ্রমণ কাহিনী এমনভাবে বর্ণনা করব যেমনভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: কাফির বান্দা, অন্য বর্ণনায় পাপিষ্ঠ বান্দা যখন পৃথিবী ত্যাগ করে আখিরাতের দিকে অগ্রসর হয় তখন আকাশ থেকে কালো চেহারা বিশিষ্ট কঠিন হৃদয়ের ফিরিশতাগণ অবতীর্ণ হয়, যাদের সঙ্গে আগুনের পোশাক রয়েছে। অতঃপর চোখের শেষ দৃষ্টি দূরত্বে বসে থাকে, শুধু মৃত্যুর ফিরিশতা এগিয়ে এসে তার মাথার পাশে বসে বলে: হে খারাপ আত্মা! আল্লাহর অসন্তুষ্টি এবং গজবের দিকে বের হয়ে আস। তিনি বলেন: তখন সমস্ত শরীরে তা ছড়িয়ে পড়লে এমনভাবে টেনে বের করবে যেমনভাবে ভিজা তুলা হতে বহু কাটা বিশিষ্ট লাঠি টেনে বের করা হয়। এতে তার সকল শিরা উপশিরা ছিড়ে বের হয়ে আসবে। তারপর আকাশ ও জমিনসহ আকাশের সকল ফিরিশতাগণ তাকে অভিশম্পাত করে, সেই সাথে আকাশের সকল দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং প্রত্যেক দরজার অধিবাসিগণ আল্লাহর নিকট দো'আ করতে থাকে যে, তাদের নিকট দিয়ে যেন তা না নেওয়া হয়। তারপর মৃত্যুর ফিরিশতা রূহটি হাতে নিয়ে এক মুহূর্তও রাখতে পারে না; বরং অপেক্ষমান ফিরিশতাগণ আংটায় রেখে দেয় এবং তা থেকে মৃত জানোয়ারের দেহের দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। অতঃপর তা নিয়ে উপরে উঠতে থাকে, যখনই কোনো ফিরিশতার নিকট দিয়ে অতিবাহিত হয়, তখন তারা বলে: এ খারাপ আত্মাটি কার? তখন পৃথিবীতে সবচেয়ে খারাপ নামে ডাকা নাম ধরে তারা বলবে: এটি অমুকের ছেলে অমুক, যতক্ষণ না পৃথিবীর আকাশ পর্যন্ত যাবে। সেখানে পৌঁছে দরজা খোলে দেওয়ার জন্য বলা হবে কিন্তু খোলা হবে না।

لَا تُفَتَّحُ لَهُمْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَلَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى يَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمِّ الْخِيَاطِ ﴾ [الاعراف: ٤٠]
“তাদের জন্য আকাশের দরজা খোলা হবে না এবং ততক্ষণ পর্যন্ত তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না সূচের নাভী দিয়ে উট প্রবেশ করবে।” [সূরা আল-'আরাফ, আয়াত: ৪০]

তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন: তার জায়গা নিম্ন ভূমিতে উপস্থিত সিজ্জিনে লিখে দাও। কেননা আমি তাদেরকে অঙ্গিকার দিয়েছি যে, তাদেরকে যেখান থেকে সৃষ্টি করেছি সেখানে ফিরিয়ে নিব, পুনরায় সেখান থেকে বের করব। তারপর আকাশ থেকে তার রূহকে ছুড়ে মারা হলে তার শরীরে এসে প্রবেশ করবে। অতঃপর তিনি পড়লেন,
وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَاءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سَحِيقٍ ﴾ [الحج: ٣١]
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশিদার করবে সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়ল, অতঃপর মৃতভোজি পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোনো দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল।” [সূরা আল-হজ, আয়াত: ৩১]

তারপর শরীরে তার রূহ ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলেন: তখন সে তার নিকট থেকে ফিরে যাওয়া সাথীদের জুতার আওয়াজ শুনতে পাবে। অতঃপর তার নিকট গম্ভীর দু'জন ফিরিশতা এসে ধমকাবে এবং তাকে বসিয়ে বলবে:
তোমার রব কে?
সে বলবে: হায়! হায়! আমি জানি না।
তারা বলবে: তোমার দীন কি?
সে বলবে হায়! হায়! আমি জানি না।

তারা বলবে: সেই লোকটি কে? যাকে তোমাদের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল?
তখন সে তাঁর নাম স্মরণ করতে পারবে না,
বলা হবে (তাঁর নাম কি) মুহাম্মদ?
সে বলবে: হায়! হায়! আমি জানি না কিন্তু লোকজনকে এ নাম বলতে শুনেছি।

তিনি বলেন: তাকে বলা হবে তুমি জান নি এবং যারা জেনেছে তাদের অনুসরণও কর নি। তখন আকাশ থেকে একজন আহ্বানকারী আহ্বান করে বলবেন: সে মিথ্যা বলেছে। সুতরাং তার জন্য জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং জাহান্নামের একটি দরজা খুলে দাও; যেন সেখান থেকে উত্তাপ ও প্রখর বাষ্প আসতে থাকে এবং তার কবরকে এমন সংকীর্ণ করে দেওয়া হবে যে, তার বুকের হাড়গুলো একদিক থেকে অন্য দিকে চলে যাবে। তারপর বিশ্রী মুখ বিশিষ্ট জীর্ণ কাপড় পরিহিত দুর্গন্ধযুক্ত এক ব্যক্তি তার নিকট আসবে- অন্য বর্ণনায় তার বেশ ধরে বলবে: তুমি এমন একটি সুসংবাদ গ্রহণ কর, যা তোমার অনিষ্ট করবে। আজ সেই দিন যে দিনের অঙ্গিকার তোমাকে দেওয়া হয়েছিল।

সে বলবে: তুমি কে? তোমাকে আল্লাহ এমন দুঃসংবাদ দিয়ে পাঠিয়েছেন? তোমার চেহারাতো সেই চেহারা যা অনিষ্ট বয়ে আনে।

সে বলবে: আমি তোমার মন্দ আমল। আল্লাহর কসম! তুমি তাঁর আনুগত্যের প্রতি ছিলে অত্যন্ত নিশ্চল এবং তাঁর নাফরমানির প্রতি ছিলে চতুর। সুতরাং আল্লাহ তোমার মন্দের যথাযথ প্রতিদান দিয়েছেন।

অতঃপর তার জন্য একজন অন্ধ, বধির এবং কুৎসিত ফিরিশতা নিযুক্ত করা হবে, যার হাতে থাকবে একটি হাতুড়ী। যদি এর দ্বারা কোনো পাহাড়ে আঘাত করা হয় তবে পাহাড় ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে। তা দ্বারা তাকে আঘাত করে ধুলিস্যাৎ করে দেবে। আবার আল্লাহ তাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিবেন, আবার তাকে মারলে এমন জোরে চিৎকার করবে যে, জিন্ন ও মানুষ ব্যতীত অন্যান্য সকল সৃষ্টিজীব তা শুনতে পাবে। অতঃপর তার জন্য জাহান্নামের একটি দরজা খোলে দিয়ে জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দেওয়া হবে। তখন সে বলবে: হে আল্লাহ! তুমি কিয়ামত সংঘটিত কর।

📘 বারযাখী জীবন > 📄 কবরের শাস্তি ও শান্তি

📄 কবরের শাস্তি ও শান্তি


প্রিয় ভাই সকল! আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমামগণ কবরের শাস্তি এবং শান্তির ব্যাপারে ঈমান আনা ওয়াজিব হওয়ার যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তা এখানে তুলে ধরলাম।
প্রত্যেক মানুষ (নিম্নের) তিনটি স্তর অতিক্রম করে থাকে।
1- ইহকালীন জীবন
2- বারযাখী জীবন
3- পরকালীন জীবন বা চিরস্থায়ী জীবন, যার কোনো শেষ নেই।
বারযাখী জীবন একটি বিশিষ্ট জীবন, যেখানে পরীক্ষা নিরীক্ষা রয়েছে, হয় শান্তি না হয় শাস্তি, যা কুরআনের আয়াত এবং হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত। আর এটাই সালাফ এবং ইমামদের তরীকা যে, যখন কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে তখন সে শান্তি না হয় শাস্তিতে থাকে।

রূহ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর শাস্তিতে অথবা শান্তিতে বাকী থেকে যাবে, কখনো শরীরের সাথে সম্পৃক্ত হলে তখন রূহের সাথে শরীরেরও শান্তি বা শাস্তি হবে। অতঃপর যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সে দিন রূহকে শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হলে তার রবের জন্য কবর থেকে উঠে দাঁড়াবে।²

কুরআনের যে সকল আয়াত দ্বারা কবরের শাস্তি প্রমাণিত হয় তা এই: আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَحَاقَ بِثَالِ فِرْعَوْنَ سُوءُ الْعَذَابِ النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيَّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا ءَالَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ ﴾ [غافر: ٤٥، ٤٦]
“ফির'আউন গোত্রকে শোচনীয় 'আযাব গ্রাস করল, সকাল সন্ধায় তাদেরকে আগুনের সম্মুখে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সে দিন আদেশ করা হবে, ফির'আউন গোত্রকে কঠিনতম "আযাবে পেশ করাও।” [সূরা গাফির, আয়াত: ৪৫-৪৬]

হাফেজ ইবন হাজার রহ. এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, ফির'আউন এবং তার অনুসারীদের রূহসমূহ কিয়ামত পর্যন্ত সকাল সন্ধায় আগুনের সম্মুখীন করা হবে, যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন তাদের রূহ এবং শরীর গুলো আগুনে একত্রিত করা হবে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَحَاقَ بِتَالِ فِرْعَوْنَ سُوءُ الْعَذَابِ النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيَّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا ءَالَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ ﴾ [غافر: ٤٥، ٤٦]
“ফির'আউন গোত্রকে শোচনীয় 'আযাব গ্রাস করল, সকাল সন্ধায় তাদেরকে আগুনের সম্মুখে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সে দিন আদেশ করা হবে, ফির'আউন গোত্রকে কঠিনতম “আযাবে পেশ করাও।” [সূরা গাফির, আয়াত: ৪৫-৪৬]
ব্যাখ্যা: যন্ত্রনার দিক দিয়ে কঠিন এবং অপমানের দিক দিয়ে বড়। এ আয়াতটি কবরে বারযাখের শাস্তির ওপর প্রমাণিত আহলে সুন্নাতের মূল দলীল। আর এটাই আল্লাহর বাণী:
النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيَّا﴾ [غافر: ٤٦]
“সকাল সন্ধায় তাদেরকে আগুনের সম্মুখীন করা হবে।” [সূরা গাফির, আয়াত: ৪৬]³
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَوْمَ لَا يُغْنِي عَنْهُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ * وَإِنَّ لِلَّذِينَ ظَلَمُوا عَذَابًا دُونَ ذَلِكَ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ ﴾ [الطور: ٤٦ ، ٤٧]
“অতঃপর তাদেরকে সেদিন পর্যন্ত অবকাশ দিন, যেদিন তাদের ওপর বজ্রাঘাত পতিত হবে। সেদিন তাদের চক্রান্ত কোনো কাজে আসবে না এবং তাদেরকে কোনো সাহায্য করা হবে না। আর যালিমদের জন্য এ ছাড়াও রয়েছে অন্য শাস্তি। কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না।” [সূরা আত-তূর, আয়াত: ৪৫-৪৭]
আল্লাহর এ বাণী:
وَإِنَّ لِلَّذِينَ ظَلَمُوا عَذَابًا دُونَ ذَلِكَ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ ﴾ [الطور: ٤٧]
“আর যালিমদের জন্য এ ছাড়াও রয়েছে অন্য শাস্তি; কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না” [সূরা আত-তূর, আয়াত: ৪৭] দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, বারযাখে শাস্তি হওয়া। যেমন ইবন কাইয়্যুম তার কিতাবে (আর-রূহে) ইঙ্গিত দিয়েছেন।⁴
তিনি বলেন, এ আয়াত দ্বারা একটি বড় জামা'আত কবরের “আযাবের ওপর দলীল সাব্যস্ত করেছে। তাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা একজন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যে সকল সহীহ হাদীস কবরের ‘আযাব সাব্যস্ত করে তা অনেক মুস্তাফিজ হাদীস (যার সনদে দু'জন করে সাহাবী রয়েছে) এবং কতিপয় উলামা তা মুতাওয়াতির বলেছেন।⁵ তার মধ্যে বারা ইবন 'আযিব রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর হাদীস, যা সুনান (আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী এবং ইবন মাজাহ) ও মুসনাদে এসেছে। আর আমি পূর্বে যা উল্লেখ করেছি তাই বর্ণনার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ।

কবরের 'আযাব সাব্যস্তকারী হাদীস গুলো নিম্নরূপ:
ইমাম বুখারী তার সহীহ বুখারীতে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহার হাদীস নিয়ে এসেছেন, তিনি বলেন, একদা এক ইহুদী মহিলা তার নিকট এসে কবরের 'আযাবের কথা উল্লেখ করলে তিনি বলেন, আল্লাহ তোমাকে কবরের 'আযাব হতে রক্ষা করুন। অতঃপর তিনি কবরের 'আযাব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, কবরের 'আযাব সত্য।⁶
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, এর পর যখনই তাঁকে সালাত পড়তে দেখেছি তখনই তিনি কবরের 'আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন।

আসমা বিনতে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবায় দাঁড়িয়ে কবরের ফিতনা উল্লেখ করেছেন, যেখানে মানুষ ফিতনার সম্মুখীন হবে। তা উল্লেখ করার সাথে সাথে সাহাবীগণ আর্তনাদ করতে শুরু করলেন। ইমাম নাসায়ী আসমা রাদিয়াল্লাহু 'আনহার কথাটি আরো সামান্য বৃদ্ধি করে বলেন যে, সাহাবীগণ চিৎকার করায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেষ কথাটি আমার বুঝতে অসুবিধা হলো। তাদের চিৎকার একটু থামলে আমার নিকটবর্তী একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, আল্লাহ তোমায় বরকত দিন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ কথায় কী বলেছেন? বললেন, তিনি বলেছেন, (আমার নিকট অহী এসেছে যে, নিশ্চয়ই তোমরা কবরে ফিতনার সম্মুখীন হবে, যা দাজ্জালের ফিতনার সমকক্ষ প্রায়।⁷

যায়েদ ইবন ছাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে বনী নাজ্জারের একটি বাগানে তাঁর খচ্চরের উপর ছিলেন। আমরাও তাঁর সাথে ছিলাম। হঠাৎ তাঁর খচ্চরটি এমনভাবে লাফাচ্ছিল যে, তাঁকে ফেলে দেওয়ার উপক্রম হলো। তখন তিনি সামনে ৪/৫টি বা ৬টি কবর দেখতে পেলেন। জিজ্ঞাসা করলেন,
এ কবরবাসীদেরকে কেউ চেন কি?
এক ব্যক্তি বলল আমি চিনি
তিনি বললেন: তারা কখন মৃত্যুবরণ করেছে?
বলল: মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে।
তিনি বললেন: নিশ্চয়ই এ উম্মত কবরের পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। যদি তোমরা তাদেরকে দাফন না করতে তাহলে কবরের শাস্তি আমি যা শুনি তোমাদেরকেও তা শুনানোর জন্য আল্লাহর নিকট দো'আ করতাম। অতঃপর তিনি আমাদের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা আল্লাহর নিকট কবরের 'আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর। তারা বলল, তখন আমরা আল্লাহর নিকট কবরের 'আযাব থেকে আশ্রয় পার্থনা করলাম। তিনি বললেন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ফিতনা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাও। তারা বলল, তখন আমরা আশ্রয় চাইলাম। তিনি দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাইতে বললে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইলাম।⁸

সহীহ মুসলিমে এবং সুনানের কিতাবসমূহে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “যখন তোমাদের কেউ সালাতে শেষ তাশাহহুদ সমাপ্ত করবে তখন আল্লাহর নিকট চারটি জিনিস থেকে আশ্রয় চাইবে, (জাহান্নাম ও কবরের 'আযাব থেকে, জীবন মৃত্যুর ফিতনা থেকে এবং মাসীহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে)।”⁹

কবরের 'আযাবের হাকীকতের ওপর প্রমাণীত দলীলসমূহ যা ইমাম মুসলিম রহ. তার সহীহ মুসলিমে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নের দো'আটি তাদেরকে এমনভাবে শিক্ষা দিতেন, যেমনভাবে কুরআনের কোনো সূরা শিক্ষা দিতেন।¹⁰ দো'আটি হলো:
اللهُمَّ إني أعوذ بك من عذاب جهنم وأعوذ بك من عذاب القبر واعوذبك من فتنة المحيا والممات واعوذبك من فتنة المسيح الدجال».
“হে আল্লাহ আমি তোমার নিকট জাহান্নামের 'আযাব, কবরের 'আযাব, জীবন মৃত্যুর ফিতনা এবং মাসীহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।”

বুখারী ও মুসলিমে আবু আইয়ুব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা গোধুলীর সময় বের হলে একটি আওয়াজ শুনতে পেয়ে তিনি বললেন, ইহুদীদের কবরে শাস্তি হচ্ছে।¹¹
প্রিয় ভাই সকল, পূর্বের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কবরে মানুষের একটি অন্য রকম জীবন রয়েছে, যার বৈশিষ্ট আলাদা এবং এতে শরীরের সাথে রূহের যে সম্পর্ক তা একটি বিশেষ সম্পর্ক। মানুষের জীবনে শান্তি বা শাস্তি লাভ হবে পৃথিবী জীবনের প্রেরিত আমল অনুযায়ী।

বারযাখী জীবন একটি অদৃশ্য জীবন, কুরআন ও হাদীস দ্বারা যেভাবে প্রমাণিত হয় সেভাবেই ঈমান আনা আবশ্যক। আল্লাহ তা'আলার তাওফীকে অতি শিঘ্রই তা বিশ্লেষণাকারে বর্ণনা করব। সেই সাথে কবরের 'আযাব বা শাস্তিসহ এর সাথে সম্পৃক্ত কতগুলো মাসআলা বৃদ্ধি করে আলোচনা করব। আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি, যিনি দানবীর অনুগ্রহশীল, তিনি যেন আমাদের এবং আমাদের পিতা-মাতাসহ সকল মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দের কবরকে জান্নাতের বাগিচা বানিয়ে দেন।

টিকাঃ
² মাজমু'আ ফাতাওয়া ইবন তাইমিয়া ৮/২৪৮
³ তাফসীর ইবন কাছীর ৪/৮৫
⁴ ১/৩৩৮ দার ইবন তাইমিয়া প্রকাশনী
⁵ মাজমু'আ ফাতাওয়া ৪/২৮৫, আর-রূহ ১/২৮৪
⁶ সহীহ বুখারী হাদীস নং ১৩৭২
⁷ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৭৩
⁸ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮৬৭
⁹ সহীহ মুসলিম ৫৮৮, আবু দাউদ ৯৮৩, নাসয়ী ৩/৫৮ এবং ইবন মাজাহ ৯০৯
¹⁰ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৯০
¹¹ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৭৫। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮৬৯

📘 বারযাখী জীবন > 📄 কবরের শাস্তি ও শান্তি ---মতামত

📄 কবরের শাস্তি ও শান্তি ---মতামত


এ মাসআলা সাব্যস্ত করার ব্যাপারে কতিপয় উলামার কিছু মতামত পেশ করা হলো। আহলে সুন্নাতগণ ঐক্যমত পোষণ করেন যে, যখন কোনো ব্যক্তি মারা যায়, তখন সে শাস্তিতে না হয় শান্তিতে থাকে। আর তা আত্মা এবং শরীর উভয়ের উপর সংঘটিত হয়, তেমনিভাবে রূহ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তা ভোগ করে থাকে। কখনো শরীরের সাথে মিলিত হয় তখন উভয়েরই শান্তি এবং শাস্তি হয়। অতঃপর যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন রূহসমূহ শরীরে ফিরিয়ে দিলে তারা তাদের কবর হতে বিশ্ব প্রতিপালকের জন্য উঠে দাড়াবে। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া রহ. বলেন, হাদীস বিশারদগণ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের নিকট এ সকল বর্ণনা ঐক্যমত।¹²

ইবন কাইয়্যুম ইমাম আহমাদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, কবরের 'আযাব সত্য, কেবল পথভ্রষ্টরা বা পথভ্রষ্টকারীই তা অস্বীকার করে থাকে।

হাম্বল ইবন আব্দুল্লাহ রহ. বলেন, আমি আবু আব্দুল্লাহ (ইমাম আহমাদ) কে কবরের 'আযাব সম্বন্ধে বললাম, তিনি বললেন, এ সকল হাদীস সহীহ। আমরা এর প্রতি ঈমান রাখি এবং তা স্বীকার করি। যখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোনো বিশুদ্ধ সনদে হাদীস আসবে আমরা তা স্বীকার করব। তিনি যা নিয়ে এসেছেন আমরা যদি তা স্বীকার না করে ফিরিয়ে দেই তাহলে আমরা যেন আল্লাহর নির্দেশই তার উপর ফিরিয়ে দিলাম। অথচ আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَا عَاتَنكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ﴾ [الحشر: ٧]
“এবং রাসূল তোমাদের কাছে যা নিয়ে এসছেন তা গ্রহণ কর।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৭]

আমি তাকে বললাম, কবরের 'আযাব কি সত্য? তিনি বললেন: হ্যাঁ সত্য, কবরে শাস্তি দেওয়া হবে।¹³

শাইখুল ইসলাম তার লিখিত কিতাবের বহু জায়গায় তা উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে “আল আকীদা আল ওয়াসিতিয়ায়” উল্লেখ করে বলেন, পরকালের প্রতি ঈমান আনার মধ্যে মৃত্যুর পরের ঘটনাবলী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সকল সংবাদ দিয়েছেন তার প্রতি ঈমান আনা। কাজেই কবরের ফিতনা, কবরের শাস্তি ও শান্তির প্রতি তারা ঈমান আনবে। অতঃপর ফিতনা সম্পর্কে বলেন, মানুষ তাদের কবরে ফিতনার সম্মুখীন হবে, প্রত্যেককেই জিজ্ঞাসা করা হবে যে, তোমার রব কে? তোমার দীন কি? এবং তোমার নবী কে? আল্লাহ মুমিন বান্দাদেরকে পার্থিব ও পরকালীন জীবনে মজবুত বাক্য দ্বারা শক্তিশালী করেন। মুমিন ব্যক্তি বলবে, আমার রব আল্লাহ, আমার দীন ইসলাম এবং নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর সন্দেহকারী ব্যক্তি বলবে, হায়! হায়! আমি জানি না; কিন্তু লোক মুখে যা শুনেছি আমিও তা বলেছি। তখন তাকে লোহার হাতুড়ী দ্বারা মারা হলে সে এমন ভাবে চিৎকার করবে যে, মানুষ ব্যতীত সকল সৃষ্টি জীবই তা শুনবে। মানুষ যদি তা শুনতো তবে ছিটকে পড়ে যেত।¹⁴

আল্লামা তাহাবী আল হানাফী রহ. তার প্রসিদ্ধ সালাফী আকিদায় বলেন, আহলে সুন্নাত ও জামা'আতগণ কবরের 'আযাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সেই ব্যক্তির জন্য যে ব্যক্তি এর উপযোগী এবং কবরে রব, দীন এবং নবী সম্পর্কে মুনকার নাকীর ফিরিশতার প্রশ্ন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীদের থেকে প্রাপ্ত খবর অনুপাতে তা সাব্যস্ত করে। কবর হয় জান্নাতের বাগিচা হবে নয়তো জাহান্নামের গুহা হবে।¹⁵

আল্লামা ইবন কাইয়্যুম কবরের শাস্তি বা শান্তি সম্পর্কে বলেন, যা জানা উচিৎ তা হলো এই, নিশ্চয়ই কবরের 'আযাবই হচ্ছে বারযাখের 'আযাব। অতঃপর কেউ মৃত্যুবরণ করার পর যদি 'আযাবের উপযুক্ত হয়, তবে সে তার অংশ পাবে, চাই তাকে কবর দেওয়া হোক বা না হোক, যদিও তাকে কোনো হিংস্র পশু খেয়ে ফেলে বা আগুনে পুড়ে ছাই করে বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া হয় বা শুলে দেওয়া হয়। এমনকি সমূদ্রে ডুবে মারা গেলেও তার শরীর এবং আত্মায় সেই 'আযাবই পৌঁছাবে, যা কবরে পৌঁছে থাকে।¹⁶

পৃথিবী এবং আখিরাতের মধ্যবর্তী এ বারযাখে যার মধ্যে এর অধিবাসীগণ পৃথিবী ও আখিরাতের ওপর ভিত্তি করে অবস্থান করবে এবং প্রত্যেকেই তাদের আমল অনুযায়ী বারযাখের 'আযাব ভোগ করবে, যদিও তাদের শান্তি এবং শাস্তি ভিন্ন হয়। পূর্বে কিছু লোক ধারণা করতো যে, তাদের শরীর যদি আগুনে পুড়ে ছাই করে কিছু অংশ সমূদ্রে, কিছু অংশ প্রবল বাতাসের দিন স্থলে উড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে সে তা থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে। এ ধারণার ওপর এক লোক তার ছেলেদেরকে অসিয়ত করে বলল, “আমি মারা গেলে আমাকেও এ রকম করে দিবে। (তাকে এ রকম করা হলে) আল্লাহ সমূদ্র এবং মাটিকে নির্দেশ দিলেন তা জমা করার জন্য। তারপর আল্লাহ বললেন, দাঁড়াও! সাথে সাথে তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়ে গেলে আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কে তোমাকে এ রকম করতে বলেছে? সে বলল, হে আল্লাহ! তুমিতো জান, একমাত্র তোমার ভয়। তখন তিনি নিজ অনুগ্রহে করে তাকে ক্ষমা করে দিলেন।”¹⁷

সুতরাং বারযাখের শাস্তি ও শান্তি ঐ সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ থেকে বাদ পড়বে না যা ছাই হয়ে গিয়েছে। এমনকি যদি প্রবল বাতাসে বৃক্ষের চুড়ায় লাশকে টাঙ্গিয়ে রাখা হয় তবুও বারযাখের শাস্তি বা শান্তি রূহের সাথে শরীরেও পৌঁছাবে।

যদি কোনো পূণ্যবান ব্যক্তিকে আগুনের নিম্ন স্তরেও দাফন করা হয়, তবে সে বারযাখের প্রশান্তির অংশ তার রূহ ও শরীরে পৌঁছাবেই। আল্লাহ তা'আলা আগুনকে তার জন্য শান্তিদায়ক শীতল করে দিবেন। কারণ বিশ্বের সকল উপকরণ তার রব এবং সৃষ্টিকর্তার জন্যে নিবেদিত, তিনি যেভাবে চান সে ভাবেই পরিচালনা করেন। তাঁর ইচ্ছার বাহিরে কোনো কিছু অমত প্রকাশ করে না; বরং তাঁর ইচ্ছার অনুগত, তাঁর শক্তির নিকট অনুপ্রাণিত। আর যে কেউ তা অস্বীকার করবে, সে যেন বিশ্বের প্রতিপালককেই অস্বীকার করল, তাঁর সাথে কুফুরি করল এবং তাঁর একত্ববাদকে অস্বীকার করল। তা কিতাব আর রূহ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

প্রকাশ থাকে যে, বারযাখের বিষয়টি একটি অদৃশ্য বিষয়, যা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর পক্ষে তা বিশ্বাস করা একান্ত আবশ্যক, যেখানে সংক্ষেপাকারে এসেছে সেখানে সংক্ষেপ আর যেখানে বিস্তারিত এসেছে সেখানে বিস্তারিত ভাবেই বিশ্বাস করতে হবে। যেমন কুরআন ও হাদীসে এসেছে সেভাবেই বিশ্বাস করতে হবে। কিন্তু কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলা তাঁর কতক বান্দার জন্য কবরের অবস্থা প্রকাশ করে দেখিয়ে থাকেন।

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া বলেন, বহু মানুষের জন্য কবরের অবস্থা প্রকাশিত হয়েছে, এমনকি তারা কবরবাসীদের কবরে শাস্তির আওয়াজও শুনতে পেয়েছেন। বহু নিদর্শনসহ স্বচক্ষে তাদের শাস্তি হতে দেখেছে। তবে সর্বদা যে শুধু শরীরেই শাস্তি হতে হবে তা আবশ্যক নয়; বরং তা কখনো শরীরে, কখনো রূহে আবার কখনো উভয়েরই পৌঁছাতে পারে।¹⁸

দলীল: সহীহ বুখারীতে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বা মাদীনার কোনো এক বাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন; এমতাবস্থায় দু'জন লোকের কবরে শাস্তি হতে শুনে বললেন, কবরে তাদের শাস্তি হচ্ছে; কিন্তু কোনো বড় ধরনের পাপের জন্য নয় (এমন পাপের জন্য যা থেকে বেঁচে থাকা কঠিন ছিল না বা তাদের নিকট তা বড় ছিল না¹⁹) অতঃপর বললেন, হ্যাঁ, বড়ই ছিল (আল্লাহর নিকট তা বড় বা সে পাপ সর্বদা করার কারণে বড় আকার ধারণ করেছে), একজন প্রস্রাব করে পবিত্রতা অর্জন করতো না, অপরজন মানুষের গীবত করে বেড়াতো।”
তারপর একটি খেজুরের ডাল আনতে বললেন, অতঃপর তা দ্বিখণ্ডিত করে প্রত্যেকের কবরে এক টুকরা করে গেড়ে দিলেন। এ রকম করার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, এ গুলো শুঁকানো পর্যন্ত হয়তো তাদের শাস্তি কিছুটা হালকা হবে।

ইমাম তাহাবী রহ. হাসান সনদে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “আল্লাহর কোনো এক বান্দাকে তার কবরে একশত দুররা মারার নির্দেশ দেওয়া হলে তিনি তার জন্য আল্লাহর নিকট আশ্রয় এবং দো'আ করতে থাকলেন যতক্ষণ না তা কমিয়ে একটি করা হল। অতঃপর তার কবরে মাত্র একটি দুররা মারা হলে তার কবর অগ্নিতে ভরপুর হয়ে গেল। যখন তার উপর থেকে আগুন দূর হয়ে গেল তখন সে বলল, কিসের জন্য আমাকে এভাবে মেরেছ? তারা বলল, তুমি একবার বিনা অযুতে সালাত পড়েছিলে এবং নির্যাতিত মানুষের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছিলে; কিন্তু তাকে সাহায্য কর নি।²⁰

এ অধ্যায়ে আরো লক্ষণীয় বিষয় হলো, যা ইবন আবুদ দুনিয়া (কিতাব আল কুনূর) এ উল্লেখ করেছেন, তার নিকট থেকে আল্লামা ইবন কাইয়্যুম (কিতাব আর রূহে পৃষ্ঠা নং ৩১৯) নকল করেছেন, একজন দৃঢ় মজবুত তাবেয়ী সু'আইহিদ ইবন জুহাইর থেকে, তিনি বলেন, আমরা আমাদের এবং বসরার মধ্যবর্তী কতগুলো ঝরনার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। এমন সময় একটি গাধার ডাক শুনতে পেলাম, বললাম এ শব্দটি কিসের? তারা বলল, এ শব্দটি এক ব্যক্তির, সে আমাদের সাথে ছিল, একদা তার মা কোনো ব্যাপারে তার সাথে কথা বললে সে বলল, তুমি গাধার মতো চেচাচ্ছ কেন? তারপর সে যখন মারা গেল তখন থেকে প্রতি রাত্রে তার কবর হতে এ আওয়াজ শুনা যায়।

এ ব্যাপারে বহু ঘটনা রয়েছে, জায়গা সংকীর্ণতার দরুন তা উল্লেখ করা হলো না। ঘটনা যাই হোক না কেন ঐ রকম কারণ যদিও দর্শকদের সামনে স্থির কিন্তু এর ভিতরে অন্য রকম। কারণ, এতে যেমন বহু লোক সাজাপ্রাপ্ত এবং বেহুশ হয়ে পড়ে আছে তেমনি বহু লোক হাসি খুশী ও শান্তিতে রয়েছে।

টিকাঃ
¹² মাজমূয়া ফাতাওয়া ৮/২৮৪
¹³ আর রূহ- ইবন কাইয়্যুম পৃষ্ঠা নং ১৬৬, দার ইবন কাছীর প্রকাশিত, টিকা টিপ্পনি/ ইউসুফ আলী বাদাবী
¹⁴ আল আকীদা আল ওয়াসিতিয়াহ রওজা নাদিয়ার শরাহ, পৃষ্ঠা নং ৩১১, আল ওয়াতান প্রকাশনী, লেখক আল্লামা যায়েদ ইবন আব্দুল আযীয আল ফাইয়ায।
¹⁵ শরহে আকীদা তাহাভিয়া পৃ: ৫৭২ আর রিসালা প্রকাশনী।
¹⁶ আর রূহ পৃষ্ঠা নং ১৬৮
¹⁷ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৮১
¹⁸ মাজমু'আ ফাতাওয়া ৪/২৯৬
¹⁹ ফতহুল বারী ১/৩১৮
²⁰ শরহে মুশকিলুল আছার ৮/২১২ও ৩১৮৫

📘 বারযাখী জীবন > 📄 কবরবাসীদের অবস্থার কিছু বিবরণ

📄 কবরবাসীদের অবস্থার কিছু বিবরণ


ইমাম বুখারী তার জামে সহীহতে কিতাবুত তা'বীরে নকল করেছেন, সামুরা ইবন জুন্দুব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে অধিকাংশ সময় যা বলতেন তা হলো, তোমাদের কেউ কি কোনো স্বপ্ন দেখেছ? অতঃপর তা বর্ণনা করে শুনাতেন। একদা ভোরে তিনি আমাদেরকে বললেন: গত রাত্রে দু'জন আগন্তুক আমার নিকট এসে আমাকে উপরে নিয়ে গেল (অর্থাৎ ঘুমের মধ্যে তাঁর নিকট দু'জন ফিরিশতা তাঁকে জাগালেন আর এটি এক প্রকার অহী, কেননা নবীদের স্বপ্ন হচ্ছে অহী যা সবারই জানা) অতঃপর সে দর্শনে যা দেখেছেন তা উল্লেখ করলেন।²¹ আমাদের এ বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত কিছু অংশ এখন উল্লেখ করব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতিপয় লোকদের কবরে শাস্তি হতে যা দেখেছেন এর মধ্যে তাঁর কথা এই,
কাঁত হয়ে শায়িত এক ব্যক্তির নিকট আমি আসলাম, অন্য একজন লোক তার পার্শ্বে পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, হঠাৎ দাড়ানো ব্যক্তি পাথর নিয়ে তার মাথার দিকে গিয়ে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছে এবং পাথরটি বহু দূরে গিয়ে পড়ছে, আবার সেটি নিয়ে আসতে আসতে তার মাথা ভালো হয়ে যাচ্ছে। ফিরে এসে প্রথম বারের ন্যায় মারতে থাকে। পুরো হাদীসে এ ব্যক্তির অবস্থার বর্ণনা এসেছে যে, সে কুরআন পড়তো, অতঃপর তা প্রত্যাখ্যান করতো এবং ফরজ সালাত না পড়ে শুয়ে যেত।

এ প্রকার পাপ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ ﴾ [الماعون: ٤، ٥]
"ধ্বংস ঐসব মুসল্লির জন্য, যারা তাদের সালাতের ব্যাপারে উদাসীন।” [সূরা আল-মা'উন, আয়াত: ৪-৫]

হাফেয ইবন কাছীর রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, (সা'হুন) হয় প্রথম ওয়াক্ত থেকে উদাসীন। তাই সে সর্বদা বা অধিকাংশ সময় শেষ ওয়াক্তে আদায় করতো অথবা সালাতের রোকন ও শর্তাবলী মেনে আদায় করে নি অথবা একাগ্রতাসহ এর অর্থ সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা থেকে উদাসীন। সুতরাং এ শব্দটি উল্লিখিত ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য; কিন্তু যদি কেউ এ আয়াতের গুণে গুণান্বিত হয় তবে সে তার প্রাপ্য পাবে, আবার যদি কেউ পুরো গুণে গুণান্বিত হয় সেও এর প্রাপ্য পাবে এবং তার মধ্যে নিফাকে আমলি পাওয়া যাবে।²²

স্বপ্নের হাদীস যা সামুরা ইবন জুন্দুব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অতঃপর রক্তের ন্যায় লালচে একটি নদীর পাড়ে বসে দেখলাম একটি লোক তাতে সাঁতরাচ্ছে; অপর একজন লোক নদীর তীরে পাথর জমা করে পাশে রাখছে, যখনই সাঁতারু ব্যক্তি সাঁতরাতে সাঁতরাতে তার নিকট এসে মুখ হা করছে তখনই সে তার মুখে একটি পাথর ছুড়ে মারছে। অতঃপর সে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে, আবার ফিরে এসে হা করলে তার মুখে পাথর ছুড়ে মারছে। এভাবেই তার শাস্তি চলছে। পুরো হাদীসে এসেছে যে, রক্তের নদীতে সাঁতরানো ব্যক্তি একজন সূদখোর।

ইবন হুবাইরা রহ. বলেন, সূদখোরকে রক্তের নদীতে সাঁতার কাটিয়ে এবং পাথর খাওয়ানোর মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হবে। কেননা সূদের আসল স্বর্ণের উপর, আর স্বর্ণ হচ্ছে লাল। সুতরাং তাকে ফিরিশতাদের পাথর খাওয়ানো সেই দিকেই ইঙ্গিত করে যে, তার কোনো কিছুতে পেট ভরে নি। এমনিভাবে সূদ, কেননা সূদখোর মনে করে তার ধন সম্পদ বৃদ্ধি পাচ্ছে অথচ আল্লাহ তার পেছন থেকে তা কমিয়ে দিচ্ছেন।²³

আর যদি সূদখোরের এ শাস্তি বারযাখে হয়, তবে সে কবর থেকে পূনরুত্থিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত চলতে থাকবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَوُاْ لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِ﴾ [البقرة: ٢٧٥]
“যারা সূদ খায় তারা কিয়ামতে সেই ব্যক্তির ন্যায় দণ্ডায়মান হবে, যাকে শয়তান আছর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৫]
অর্থাৎ তারা তাদের কবর থেকে এভাবে উঠে দাঁড়াবে যেভাবে নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি এবং শয়তানের আছর লাগা ব্যক্তি দাঁড়ায়। তা বলার কারণ হলো, সে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় দাড়াবে।

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, “সূদখোর ব্যক্তিকে পাগলপ্রায় গলাটিপা অবস্থায় তোলা হবে।”²⁴ কেউ কেউ বলেছেন, তাদেরকে এমন অবস্থায় উঠানো হবে যে, তাদের পেটগুলো গর্ভবতীর পেটের ন্যায় উঠানো থাকবে। যখন সে দাঁড়াবে তখনই পড়ে যাবে, মানুষ তাদের উপর দিয়ে হেটে যাবে। ইহা শুধুমাত্র তাদের জন্য নিদর্শনস্বরূপ করা হয়েছে যেন এ নিদর্শনের মাধ্যমে কিয়ামতে তাদেরকে চেনা যায়। তারপর হবে তাদের শাস্তি।²⁵ কবরে সাজাপ্রাপ্ত লোকদের গুণাগুণের ব্যাপারে স্বপ্নের হাদীসে আরো যা এসেছে তা হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “অতঃপর আমরা চুলার ন্যায় একটি জিনিসের নিকট গেলাম, অন্য বর্ণনায় রয়েছে: যার উপরি ভাগ চিকন এবং নিম্ন ভাগ প্রশস্ত, নীচে অগ্নি দাউ দাউ করে জ্বলছে। তিনি বলেন, হঠাৎ এর মধ্যে কথোপকথনের আওয়াজ শুনে উকি দিলে সেখানে উলঙ্গ কিছু নর-নারী দেখতে পেলাম, তাদের নীচ থেকে অগ্নি স্ফুলিঙ্গ আসলে তারা আর্তনাদ করছে। অর্থাৎ যন্ত্রনায় উচ্চস্বরে চিৎকার করছে। পুরো হাদীসে তাদের বর্ণনা এভাবে এসেছে যে, তারা হচ্ছে ব্যভিচারী নর-নারী।

হাফেয ইবন হাজার রহ. বলেন, তারা অপমাণিত হওয়ার হকদার হিসেবে তাদের উলঙ্গ হওয়াটাই বাঞ্চনীয়। কেননা তাদের উচিৎ ছিলো নির্জনে পর্দা করা, কাজেই ছেড়া কাপড়ের দ্বারা তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আর তাদের নিচ থেকে 'আযাব আসার হিকমত হলো তাদের নিম্নাংশ দ্বারাই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।²⁶

প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর এ মহা অপরাধ, এর কারণসমূহ এবং যে সকল জিনিস এতে পতিত হওয়ায় সহযোগিতা করে যেমন: হারাম নির্জনতা এবং ফিতনার কারণ গুলো অবলম্বন করা তথা বেপর্দা ও নারীর লোভনীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রকাশ করা, এমনি ভাবে হারাম জিনিসের দিকে তাকানো, সেই সাথে যে সকল গান-বাজনা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য উদ্বোদ্ধ করে ইত্যাদি কারণ ও পদ্ধতিগুলো হতে বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করা ওয়াজিব।

টিকাঃ
²¹ সহীহ বুখারী, ফজরের সালাতের পর স্বপ্নের ব্যাখ্যা অধ্যায়, হাদীস নং ৭০৪৭
²² তাফসীর ইবন কাছীর ৪/৫৫৮
²³ ফতহুল বারী ১২/৪৪৫
²⁴ ইবন কাছীর ১/৩২৬
²⁵ তাফসীর কুরতুবী ৩/৩৫৪
²⁶ ফতহুল বারী ১২/৪৪৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00