📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 দ্বিতীয় অধ্যায়: প্রদেশগুলোতে কংগ্রেস মন্ত্রীসভা

📄 দ্বিতীয় অধ্যায়: প্রদেশগুলোতে কংগ্রেস মন্ত্রীসভা


এখন স্বল্পকালীন কংগ্রেস শাসিত প্রদেশগুলোর হালহকিকত পর্যালোচনা করে দেখা যাক মুসলমানদের প্রতি তাদের পক্ষ থেকে কোন্ ধরনের আচরণ করা হয়।
ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি যে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে গভর্ণরগণকে আইন অনুযায়ী যে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল, তা প্রয়োগ না করার নিশ্চয়তা না দিলে কংগ্রেস সরকার গঠনে সম্মত হবে না। অর্থাৎ তাদের পরিষ্কার কথা এই যে, সংখ্যালঘু তথা মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণে তারা মোটেই রাজী নয়। ভারত শাসনে বৃটিশ পলিসির মর্মকথা এই যে, কংগ্রেস তথা 'ভারতীয় হিন্দু জাতিকে যে কোন মূল্যে সন্তুষ্ট রাখতে হবে। মুসলিম স্বার্থ পদদলিত করে হিন্দুদেরকে তুষ্ট করার দৃষ্টান্ত অতীতে বহু দেখা গেছে। এবারেও ভাইস্রয় লর্ড লিলিথগো কংগ্রেসকে সরকার গঠনে সম্মত করার জন্যে গোপনে এ নিশ্চয়তা দান করেন যে, গভর্ণরগণ তাঁদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন না যা ১৯৩৫ সালের আইনে তাঁদেরকে দেয়া হয়েছে। এ নিশ্চয়তা দানের পরই কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠনে রাজী হয়।
সাতটি প্রদেশে কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠন করে এবং সকল প্রাদেশিক দলীয় নীতি পুরোপুরি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
মাদ্রাজে কংগ্রেস ৭৪টি আসন লাভ করে এবং রাজা গোপালাচারিয়া মন্ত্রীসভা গঠন করেন। বোম্বাইয়ে কংগ্রেস মাত্র ৪৮টি আসন লাভে সমর্থ হয়। অন্যান্য ছোটখাটো কয়েকটি সমমনা দল নিয়ে বি. জে. খের [B.J. Kher] মন্ত্রীসভা গঠন করেন।
যুক্তপ্রদেশে শতকরা ৫৯ আসন কংগ্রেস লাভ করে এবং জিবি প্যান্ট প্রধানমন্ত্রী হন। বিহারে শতকরা ৬২ আসন লাভ ক'রে শ্রীকৃষ্ণ সিন্হা সরকার গঠন করেন। মধ্যপ্রদেশে শতকরা ৬৩ আসন লাভের পর ডাঃ খারে এবং পরবর্তীকালে শুকলা প্রধানমন্ত্রী হন।
উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে কংগ্রেস শতকরা মাত্র ৩৮ আসন পেলেও ডাঃ খান সরকার গঠন করেন।
উড়িষ্যায় কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটে। কংগ্রেস মন্ত্রীসভার পূর্বে পার্লাকিবেদীর মহারাজা চার মাসের জন্যে (এপ্রিল-জুলাই) স্বল্পকালীন সরকার গঠন করেন। বিশ্বনাথ দাস জুলাই ১৯৩৭ থেকে অক্টোবর ১৯৩৯ পর্যন্ত কংগ্রেস মন্ত্রীসভা পরিচালনা করেন। কংগ্রেস মন্ত্রীসভার পদত্যাগের পর গভর্ণর শাসনভার গ্রহণ করেন। ১৯৪১ এর শেষভাগে গোদাবরী মিশ্রর নেতৃত্বে কতিপয় সংসদ সদস্য কংগ্রেস হাই কমান্ডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং পার্লাকিবেদীর মহারাজাকে মন্ত্রীসভা গঠনে সহায়তা করেন। মহারাজা তিনজনকে নিয়ে—তিনি স্বয়ং, মিশ্র এবং একজন মুসলমান মন্ত্রীসভা গঠন করেন। কংগ্রেস হাই কমান্ডের চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও মন্ত্রীসভা কাজ চালিয়ে যায়।

প্রদেশগুলোতে কংগ্রেস শাসন
ভারতের এগারোটি প্রদেশের মধ্যে সীমান্ত প্রদেশসহ সাতটিতে কংগ্রেসের প্রায় আড়াই বছরের শাসন (জুলাই ১৯৩৭ থেকে অক্টোবর ১৯৩৯) হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের এক অতি বেদনাদায়ক ইতিহাস। এসব প্রদেশে সকল ক্ষমতার চাবিকাঠি ছিল কংগ্রেসের হাতে। এ ক্ষমতার ব্যবহার কংগ্রেস কিভাবে করেছিল এবং তা রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে কি অশুভ পরিণাম ডেকে এনেছিল তা-ই এখন আলোচনা করে দেখা যাক।

কোয়ালিশন সরকার গঠনে অস্বীকৃতি
সাইত্রিশ সালের নির্বাচনের পর পরই মুসলিম লীগ সভাপতি মিঃ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক বিবৃতিতে বলেন: সংবিধান এবং মুসলিম লীগ পলিসি আমাদেরকে অন্যান্য দলের স্বার্থে সহযোগিতা করতে বাধা দেয় না। আমরা যে কোন দলের সাথে সহযোগিতা করতে পারি আইনসভার ভেতরেও এবং বাইরেও।
কিছু সংখ্যক কংগ্রেসপন্থীসহ সকলেই এ আশা পোষণ করছিলেন যে, হিন্দু প্রধান প্রদেশগুলোতে কংগ্রেস-মুসলিম লীগ কোয়ালিশন সরকার গঠিত হবে। কিন্তু মুসলিম লীগের সাথে কোন প্রকার সহযোগিতা করতে কংগ্রেসের অস্বীকৃতি এ আশা ফলবতী হতে দেয়নি। দৃষ্টান্তস্বরূপ যুক্ত প্রদেশের অবস্থা এখানে বর্ণনা করা যেতে পারে। এখানে আইন সভায় মোট ২২৮ আসনের মধ্যে মুসলমানদের জন্যে ৬৪ আসন ছিল। তার মধ্যে কংগ্রেস লাভ করে একটি, মুসলিম লীগ ২৬, স্বতন্ত্র মুসলমান ২৮ এবং জাতীয় কৃষি দল ৯। এখানে কংগ্রেস-মুসলিম লীগ কোয়ালিশন গঠনের বিষয় নিয়ে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে দীর্ঘ আলাপ আলোচনা হয়। অবশেষে কংগ্রেস হাই কমান্ডের অন্যতম সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ মুসলিম লীগ নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামানকে জানিয়ে দেন কোন্ কোন্ শর্তে প্রাদেশিক সরকারগুলোতে মুসলিম লীগ যোগদান করতে পারে। শর্তগুলো নিম্নরূপঃ
১. ইউপি আইন পরিষদে মুসলিম লীগ কোন পৃথক দল হিসাবে কাজ করবে না।
২. ইউপি আইন পরিষদের বর্তমান মুসলিম লীগ দল কংগ্রেসের অংশ হিসাবে পরিগণিত হবে, কংগ্রেস পার্টির সদস্য হিসাবে তারা পার্টির অন্যান্য সদস্যদের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে। পার্টির আলোচনায় অংশগ্রহণের অধিকারও তাদের থাকবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। প্রত্যেক সদস্যের একটি মাত্র ভোট দানের অধিকার থাকবে।
৩. আইন পরিষদের সদস্যদের জন্যে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি যে নীতি নির্ধারণ করবে এবং যেসব নির্দেশ দিবে, তা কংগ্রেস সদস্যগণ এবং এসব সদস্য মেনে চলবেন।
৪. ইউপি এবং মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারী বোর্ড ভেঙ্গে দিতে হবে। ভবিষ্যতে কোন উপ-নির্বাচনে সে বোর্ড কোন প্রার্থী দিতে পারবে না। কোন আসন শূন্য হলে, কংগ্রেস যাকে নির্বাচনের জন্যে প্রার্থী মনোনীত করবে তাকেই সমর্থন করতে হবে।
৫. মন্ত্রীসভার সদস্যপদ এবং আইন সভার সদস্যপদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত যদি কংগ্রেস করে, তাহলে সে সিদ্ধান্ত মুসলিম লীগ থেকে আগত সদস্যগণ মেনে চলতে বাধ্য থাকবেন।
কংগ্রেস হাই কমান্ডের পক্ষ থেকে মুসলিম লীগকে প্রদত্ত উপরোক্ত শর্তগুলো ছিল হাস্যকর ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ফ্যাসিবাদী মানসিকতার পরিচায়ক। সামান্যতম আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন কোন ব্যক্তি বা দল উপরোক্ত শর্তগুলোর কোন একটিও গ্রহণ করতে পারতো না। কারণ তা হতো আত্মঘাতী।
কংগ্রেসের এ অবিবেচনাপ্রসূত ঔদ্ধত্যের কারণ নির্ণয় করা মোটেই কষ্টকর নয়। মিঃ গান্ধী এবং জওহরলাল নেহরু ভারতে একমাত্র কংগ্রেস ব্যতীত অন্য দলের অস্তিত্ব স্বীকার করতে রাজী ছিলেন না। এ দেশে কোন হিন্দু-মুসলিম সমস্যা আছে—একথাও তাঁরা স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন না। জওহরলাল নেহরু ১২ই মে, ১৯৩৭ সালে চৌধুরী খালিকুজ্জামানকে বলেন যে, তাঁর বিশ্বাস ভারতে হিন্দু-মুসলিম সমস্যাটি শুধুমাত্র অল্পসংখ্যক বুদ্ধিজীবী, জমিদার ও পুঁজিপতিদের মধ্যে সীমিত, যাঁরা এমন এক সমস্যা সৃষ্টি করছেন যা জনগণ স্বীকার করেনা। আইনসভার ভেতরে মুসলমানদের একটা আলাদা দল থাকবে এমন ধারণার প্রতি তিনি বিদ্রূপ বান নিক্ষেপ করেন।
কংগ্রেস ঘোষিত নীতি অনুযায়ী নেতৃস্থানীয় মুসলমানদের প্রতি আহবান জানানো হয় মন্ত্রীসভার সদস্য হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্যে নিজেদের দল ভেঙ্গে দিয়ে কংগ্রেসে যোগদান করতে। যুক্ত প্রদেশে হাফেজ মুহাম্মদ ইব্রাহীম এবং বোম্বাইয়ে এম, ওয়াই, নূরী কংগ্রেস শপথনামায় স্বাক্ষর করে কংগ্রেস মন্ত্রীসভায় যোগদান করেন। উড়িষ্যায় কোন মুসলমানকে মন্ত্রীসভায় নেয়া হয়নি। মধ্য প্রদেশে জনৈক শরীফকে নেয়া হলেও পরবর্তীকালে তাঁকে সরিয়ে একজন হিন্দু নেয়া হয়।
কংগ্রেস প্রধান প্রদেশগুলোতে কোয়ালিশন সরকারের তো কোন প্রশ্নই ছিল না। কিন্তু অকংগ্রেস প্রধান প্রদেশগুলোতে কংগ্রেসকে কোয়ালিশনে যোগদানের অনুমতি দেয়া হয়। এর ফলে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টির পথ করে দেয়া হয়। বাংলার প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক ১৯৩৮ সালে কোলকাতা মুসলিম লীগ সম্মেলনে তাঁর প্রদত্ত ভাষণে বলেন, কংগ্রেস বারবার এই বলে চাপ সৃষ্টি করছিল যে মুসলিম লীগকে বাদ দিয়ে কংগ্রেসের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করলে তা হবে অধিকতর স্থিতিশীল। সিন্ধুতে সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের (Communal Award) বদৌলতে হিন্দুরা যে কৌশলগত সুযোগ সুবিধা লাভ করেছিলেন, তার ফলে সিন্ধু আইন পরিষদে মুসলিম লীগ দল গঠনে তাঁরা বিরাট অন্তরায় সৃষ্টি করেন। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অকংগ্রেস মন্ত্রীসভা কংগ্রেসের খপ্পরে পড়ে অপসারিত হয়। কংগ্রেস চাচ্ছিল অন্যান্য সকল দল ভেঙ্গে দিয়ে দেশের একমাত্র দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে। কংগ্রেস 'একদেশ- একদল-এক নেতার' নীতিতে বিশ্বাসী ছিল। এ নেতৃত্ব ছিল মিঃ গান্ধীর হাতে।
সকল কংগ্রেস সরকার প্রতিটি নীতি নির্ধারণে গান্ধীর শরণাপন্ন হতো এবং তাঁর নির্দেশ বেদবাক্যের মতো মেনে নিত। কোন সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হোক, গভর্ণরের সাথে কোন দ্বন্দ্ব-কলহ হোক, অথবা সাধারণ কোন নীতি পলিসি গ্রহণের বিষয় হোক, কংগ্রেস শাসিত প্রদেশগুলোর প্রধানমন্ত্রীগণ তাঁর (গান্ধীজির) শরণাপন্ন হতেন নির্দেশ-উপদেশ লাভের উদ্দেশ্যে। মিঃ গান্ধী ভাইসরয়ের সাথে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আলাপ আলোচনা করতেন। কিন্তু নিজেকে দেখাতেন একজন নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পর্যক্ষেক হিসাবে। কংগ্রেসের উপর তাঁর একনায়কসুলভ কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রকাশিত থাকলেও কংগ্রেসের সদস্য তালিকায় তাঁর নাম ছিলনা। তাঁর জনৈক গুণগ্রাহী শেঠ গোবিন্দ দাস বলেন, কংগ্রেসীদের নিকটে গান্ধীর পদমর্যাদা ছিল ফ্যাসিস্টদের নিকটে মুসোলিনির, নাৎসীদের নিকটে হিটলারের এবং কমিউনিস্টদের নিকটে স্টালিনের পদমর্যাদার মতোই [১]
কংগ্রেসের মধ্যে সংসদীয় মানসিকতা অক্ষুণ্ণ থাকবে-কংগ্রেসের এ দাবী ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। কারণ কংগ্রেসী মন্ত্রীগণ না নির্বাচকমন্ডলীর কাছে, আর না আইনসভার কাছে দায়ী ছিলেন। তাঁরা ছিলেন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বশংবদ প্রজার ন্যায়। মধ্য প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী ডাঃ খারের এবং কোলকাতার সুভাস চন্দ্র বোসের সাথে কংগ্রেস হাই কমান্ডের আচরণ তার একনায়কত্বই প্রমাণ করে।
সুভাস চন্দ্র বোস ১৯৩৮ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তী বছরেও তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যথারীতি নির্বাচিত হন। কতিপয় কংগ্রেস নেতা তাঁর পদপ্রার্থিতার বিরোধিতা করেন এবং নির্বাচনে চরম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। অনেকের ধারণা মিঃ গান্ধীর নির্দেশেই এ প্রতিবন্ধকতা করা হয়। মিঃ বোসের বিজয়কে গান্ধীজির পরাজয় মনে করা হয়। কংগ্রেসের কার্যকরী সংসদের সদস্যগণ একযোগে পদত্যাগ করেন। অবশেষে গান্ধীকে খুশী রাখার জন্যে কংগ্রেসের নির্বাচিত সভাপতিকে অপসারিত করা হয়।

টিকাঃ
১. Muslim Separatism in India, Abdul Hamid p. 218

এখন স্বল্পকালীন কংগ্রেস শাসিত প্রদেশগুলোর হালহকিকত পর্যালোচনা করে দেখা যাক মুসলমানদের প্রতি তাদের পক্ষ থেকে কোন্ ধরনের আচরণ করা হয়।
ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি যে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে গভর্ণরগণকে আইন অনুযায়ী যে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল, তা প্রয়োগ না করার নিশ্চয়তা না দিলে কংগ্রেস সরকার গঠনে সম্মত হবে না। অর্থাৎ তাদের পরিষ্কার কথা এই যে, সংখ্যালঘু তথা মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণে তারা মোটেই রাজী নয়। ভারত শাসনে বৃটিশ পলিসির মর্মকথা এই যে, কংগ্রেস তথা 'ভারতীয় হিন্দু জাতিকে যে কোন মূল্যে সন্তুষ্ট রাখতে হবে। মুসলিম স্বার্থ পদদলিত করে হিন্দুদেরকে তুষ্ট করার দৃষ্টান্ত অতীতে বহু দেখা গেছে। এবারেও ভাইস্রয় লর্ড লিলিথগো কংগ্রেসকে সরকার গঠনে সম্মত করার জন্যে গোপনে এ নিশ্চয়তা দান করেন যে, গভর্ণরগণ তাঁদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন না যা ১৯৩৫ সালের আইনে তাঁদেরকে দেয়া হয়েছে। এ নিশ্চয়তা দানের পরই কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠনে রাজী হয়।
সাতটি প্রদেশে কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠন করে এবং সকল প্রাদেশিক দলীয় নীতি পুরোপুরি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
মাদ্রাজে কংগ্রেস ৭৪টি আসন লাভ করে এবং রাজা গোপালাচারিয়া মন্ত্রীসভা গঠন করেন। বোম্বাইয়ে কংগ্রেস মাত্র ৪৮টি আসন লাভে সমর্থ হয়। অন্যান্য ছোটখাটো কয়েকটি সমমনা দল নিয়ে বি. জে. খের [B.J. Kher] মন্ত্রীসভা গঠন করেন।
যুক্তপ্রদেশে শতকরা ৫৯ আসন কংগ্রেস লাভ করে এবং জিবি প্যান্ট প্রধানমন্ত্রী হন। বিহারে শতকরা ৬২ আসন লাভ ক'রে শ্রীকৃষ্ণ সিন্হা সরকার গঠন করেন। মধ্যপ্রদেশে শতকরা ৬৩ আসন লাভের পর ডাঃ খারে এবং পরবর্তীকালে শুকলা প্রধানমন্ত্রী হন।
উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে কংগ্রেস শতকরা মাত্র ৩৮ আসন পেলেও ডাঃ খান সরকার গঠন করেন।
উড়িষ্যায় কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটে। কংগ্রেস মন্ত্রীসভার পূর্বে পার্লাকিবেদীর মহারাজা চার মাসের জন্যে (এপ্রিল-জুলাই) স্বল্পকালীন সরকার গঠন করেন। বিশ্বনাথ দাস জুলাই ১৯৩৭ থেকে অক্টোবর ১৯৩৯ পর্যন্ত কংগ্রেস মন্ত্রীসভা পরিচালনা করেন। কংগ্রেস মন্ত্রীসভার পদত্যাগের পর গভর্ণর শাসনভার গ্রহণ করেন। ১৯৪১ এর শেষভাগে গোদাবরী মিশ্রর নেতৃত্বে কতিপয় সংসদ সদস্য কংগ্রেস হাই কমান্ডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং পার্লাকিবেদীর মহারাজাকে মন্ত্রীসভা গঠনে সহায়তা করেন। মহারাজা তিনজনকে নিয়ে—তিনি স্বয়ং, মিশ্র এবং একজন মুসলমান মন্ত্রীসভা গঠন করেন। কংগ্রেস হাই কমান্ডের চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও মন্ত্রীসভা কাজ চালিয়ে যায়।

প্রদেশগুলোতে কংগ্রেস শাসন
ভারতের এগারোটি প্রদেশের মধ্যে সীমান্ত প্রদেশসহ সাতটিতে কংগ্রেসের প্রায় আড়াই বছরের শাসন (জুলাই ১৯৩৭ থেকে অক্টোবর ১৯৩৯) হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের এক অতি বেদনাদায়ক ইতিহাস। এসব প্রদেশে সকল ক্ষমতার চাবিকাঠি ছিল কংগ্রেসের হাতে। এ ক্ষমতার ব্যবহার কংগ্রেস কিভাবে করেছিল এবং তা রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে কি অশুভ পরিণাম ডেকে এনেছিল তা-ই এখন আলোচনা করে দেখা যাক।

কোয়ালিশন সরকার গঠনে অস্বীকৃতি
সাইত্রিশ সালের নির্বাচনের পর পরই মুসলিম লীগ সভাপতি মিঃ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক বিবৃতিতে বলেন: সংবিধান এবং মুসলিম লীগ পলিসি আমাদেরকে অন্যান্য দলের স্বার্থে সহযোগিতা করতে বাধা দেয় না। আমরা যে কোন দলের সাথে সহযোগিতা করতে পারি আইনসভার ভেতরেও এবং বাইরেও।
কিছু সংখ্যক কংগ্রেসপন্থীসহ সকলেই এ আশা পোষণ করছিলেন যে, হিন্দু প্রধান প্রদেশগুলোতে কংগ্রেস-মুসলিম লীগ কোয়ালিশন সরকার গঠিত হবে। কিন্তু মুসলিম লীগের সাথে কোন প্রকার সহযোগিতা করতে কংগ্রেসের অস্বীকৃতি এ আশা ফলবতী হতে দেয়নি। দৃষ্টান্তস্বরূপ যুক্ত প্রদেশের অবস্থা এখানে বর্ণনা করা যেতে পারে। এখানে আইন সভায় মোট ২২৮ আসনের মধ্যে মুসলমানদের জন্যে ৬৪ আসন ছিল। তার মধ্যে কংগ্রেস লাভ করে একটি, মুসলিম লীগ ২৬, স্বতন্ত্র মুসলমান ২৮ এবং জাতীয় কৃষি দল ৯। এখানে কংগ্রেস-মুসলিম লীগ কোয়ালিশন গঠনের বিষয় নিয়ে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে দীর্ঘ আলাপ আলোচনা হয়। অবশেষে কংগ্রেস হাই কমান্ডের অন্যতম সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ মুসলিম লীগ নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামানকে জানিয়ে দেন কোন্ কোন্ শর্তে প্রাদেশিক সরকারগুলোতে মুসলিম লীগ যোগদান করতে পারে। শর্তগুলো নিম্নরূপঃ
১. ইউপি আইন পরিষদে মুসলিম লীগ কোন পৃথক দল হিসাবে কাজ করবে না।
২. ইউপি আইন পরিষদের বর্তমান মুসলিম লীগ দল কংগ্রেসের অংশ হিসাবে পরিগণিত হবে, কংগ্রেস পার্টির সদস্য হিসাবে তারা পার্টির অন্যান্য সদস্যদের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে। পার্টির আলোচনায় অংশগ্রহণের অধিকারও তাদের থাকবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। প্রত্যেক সদস্যের একটি মাত্র ভোট দানের অধিকার থাকবে।
৩. আইন পরিষদের সদস্যদের জন্যে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি যে নীতি নির্ধারণ করবে এবং যেসব নির্দেশ দিবে, তা কংগ্রেস সদস্যগণ এবং এসব সদস্য মেনে চলবেন।
৪. ইউপি এবং মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারী বোর্ড ভেঙ্গে দিতে হবে। ভবিষ্যতে কোন উপ-নির্বাচনে সে বোর্ড কোন প্রার্থী দিতে পারবে না। কোন আসন শূন্য হলে, কংগ্রেস যাকে নির্বাচনের জন্যে প্রার্থী মনোনীত করবে তাকেই সমর্থন করতে হবে।
৫. মন্ত্রীসভার সদস্যপদ এবং আইন সভার সদস্যপদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত যদি কংগ্রেস করে, তাহলে সে সিদ্ধান্ত মুসলিম লীগ থেকে আগত সদস্যগণ মেনে চলতে বাধ্য থাকবেন।
কংগ্রেস হাই কমান্ডের পক্ষ থেকে মুসলিম লীগকে প্রদত্ত উপরোক্ত শর্তগুলো ছিল হাস্যকর ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ফ্যাসিবাদী মানসিকতার পরিচায়ক। সামান্যতম আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন কোন ব্যক্তি বা দল উপরোক্ত শর্তগুলোর কোন একটিও গ্রহণ করতে পারতো না। কারণ তা হতো আত্মঘাতী।
কংগ্রেসের এ অবিবেচনাপ্রসূত ঔদ্ধত্যের কারণ নির্ণয় করা মোটেই কষ্টকর নয়। মিঃ গান্ধী এবং জওহরলাল নেহরু ভারতে একমাত্র কংগ্রেস ব্যতীত অন্য দলের অস্তিত্ব স্বীকার করতে রাজী ছিলেন না। এ দেশে কোন হিন্দু-মুসলিম সমস্যা আছে—একথাও তাঁরা স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন না। জওহরলাল নেহরু ১২ই মে, ১৯৩৭ সালে চৌধুরী খালিকুজ্জামানকে বলেন যে, তাঁর বিশ্বাস ভারতে হিন্দু-মুসলিম সমস্যাটি শুধুমাত্র অল্পসংখ্যক বুদ্ধিজীবী, জমিদার ও পুঁজিপতিদের মধ্যে সীমিত, যাঁরা এমন এক সমস্যা সৃষ্টি করছেন যা জনগণ স্বীকার করেনা। আইনসভার ভেতরে মুসলমানদের একটা আলাদা দল থাকবে এমন ধারণার প্রতি তিনি বিদ্রূপ বান নিক্ষেপ করেন।
কংগ্রেস ঘোষিত নীতি অনুযায়ী নেতৃস্থানীয় মুসলমানদের প্রতি আহবান জানানো হয় মন্ত্রীসভার সদস্য হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্যে নিজেদের দল ভেঙ্গে দিয়ে কংগ্রেসে যোগদান করতে। যুক্ত প্রদেশে হাফেজ মুহাম্মদ ইব্রাহীম এবং বোম্বাইয়ে এম, ওয়াই, নূরী কংগ্রেস শপথনামায় স্বাক্ষর করে কংগ্রেস মন্ত্রীসভায় যোগদান করেন। উড়িষ্যায় কোন মুসলমানকে মন্ত্রীসভায় নেয়া হয়নি। মধ্য প্রদেশে জনৈক শরীফকে নেয়া হলেও পরবর্তীকালে তাঁকে সরিয়ে একজন হিন্দু নেয়া হয়।
কংগ্রেস প্রধান প্রদেশগুলোতে কোয়ালিশন সরকারের তো কোন প্রশ্নই ছিল না। কিন্তু অকংগ্রেস প্রধান প্রদেশগুলোতে কংগ্রেসকে কোয়ালিশনে যোগদানের অনুমতি দেয়া হয়। এর ফলে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টির পথ করে দেয়া হয়। বাংলার প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক ১৯৩৮ সালে কোলকাতা মুসলিম লীগ সম্মেলনে তাঁর প্রদত্ত ভাষণে বলেন, কংগ্রেস বারবার এই বলে চাপ সৃষ্টি করছিল যে মুসলিম লীগকে বাদ দিয়ে কংগ্রেসের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করলে তা হবে অধিকতর স্থিতিশীল। সিন্ধুতে সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের (Communal Award) বদৌলতে হিন্দুরা যে কৌশলগত সুযোগ সুবিধা লাভ করেছিলেন, তার ফলে সিন্ধু আইন পরিষদে মুসলিম লীগ দল গঠনে তাঁরা বিরাট অন্তরায় সৃষ্টি করেন। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অকংগ্রেস মন্ত্রীসভা কংগ্রেসের খপ্পরে পড়ে অপসারিত হয়। কংগ্রেস চাচ্ছিল অন্যান্য সকল দল ভেঙ্গে দিয়ে দেশের একমাত্র দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে। কংগ্রেস 'একদেশ- একদল-এক নেতার' নীতিতে বিশ্বাসী ছিল। এ নেতৃত্ব ছিল মিঃ গান্ধীর হাতে।
সকল কংগ্রেস সরকার প্রতিটি নীতি নির্ধারণে গান্ধীর শরণাপন্ন হতো এবং তাঁর নির্দেশ বেদবাক্যের মতো মেনে নিত। কোন সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হোক, গভর্ণরের সাথে কোন দ্বন্দ্ব-কলহ হোক, অথবা সাধারণ কোন নীতি পলিসি গ্রহণের বিষয় হোক, কংগ্রেস শাসিত প্রদেশগুলোর প্রধানমন্ত্রীগণ তাঁর (গান্ধীজির) শরণাপন্ন হতেন নির্দেশ-উপদেশ লাভের উদ্দেশ্যে। মিঃ গান্ধী ভাইসরয়ের সাথে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আলাপ আলোচনা করতেন। কিন্তু নিজেকে দেখাতেন একজন নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পর্যক্ষেক হিসাবে। কংগ্রেসের উপর তাঁর একনায়কসুলভ কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রকাশিত থাকলেও কংগ্রেসের সদস্য তালিকায় তাঁর নাম ছিলনা। তাঁর জনৈক গুণগ্রাহী শেঠ গোবিন্দ দাস বলেন, কংগ্রেসীদের নিকটে গান্ধীর পদমর্যাদা ছিল ফ্যাসিস্টদের নিকটে মুসোলিনির, নাৎসীদের নিকটে হিটলারের এবং কমিউনিস্টদের নিকটে স্টালিনের পদমর্যাদার মতোই [১]
কংগ্রেসের মধ্যে সংসদীয় মানসিকতা অক্ষুণ্ণ থাকবে-কংগ্রেসের এ দাবী ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। কারণ কংগ্রেসী মন্ত্রীগণ না নির্বাচকমন্ডলীর কাছে, আর না আইনসভার কাছে দায়ী ছিলেন। তাঁরা ছিলেন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বশংবদ প্রজার ন্যায়। মধ্য প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী ডাঃ খারের এবং কোলকাতার সুভাস চন্দ্র বোসের সাথে কংগ্রেস হাই কমান্ডের আচরণ তার একনায়কত্বই প্রমাণ করে।
সুভাস চন্দ্র বোস ১৯৩৮ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তী বছরেও তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যথারীতি নির্বাচিত হন। কতিপয় কংগ্রেস নেতা তাঁর পদপ্রার্থিতার বিরোধিতা করেন এবং নির্বাচনে চরম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। অনেকের ধারণা মিঃ গান্ধীর নির্দেশেই এ প্রতিবন্ধকতা করা হয়। মিঃ বোসের বিজয়কে গান্ধীজির পরাজয় মনে করা হয়। কংগ্রেসের কার্যকরী সংসদের সদস্যগণ একযোগে পদত্যাগ করেন। অবশেষে গান্ধীকে খুশী রাখার জন্যে কংগ্রেসের নির্বাচিত সভাপতিকে অপসারিত করা হয়।

টিকাঃ
১. Muslim Separatism in India, Abdul Hamid p. 218

ফন্ট সাইজ
15px
17px