📄 প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন
প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন হয় ১৯৩৭ এর ফেব্রুয়ারী ও মার্চে। ১৯৩৬ সালের শেষভাগে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টো ঘোষণা করে। উভয় মেনিফেস্টোর সামাজিক পলিসি ছিল একই রকমের। রাজনৈতিক ইস্যুতেও কেউ একে অপর থেকে বেশী দূরে অবস্থান করছিল না। কিন্তু দুটি বিষয়ে উভয়ের মধ্যে বিরাট মতপার্থক্য ছিল। একটি এই যে, মুসলিম লীগ ওয়াদাবদ্ধ ছিল উর্দু ভাষা ও বর্ণমালার সংরক্ষণ এবং সমৃদ্ধি সাধন করতে। পক্ষান্তরে কংগ্রেস বদ্ধপরিকর ছিল হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে। দ্বিতীয়তঃ মুসলিম লীগ অটল ছিল পৃথক নির্বাচনের উপর। কিন্তু কংগ্রেস ছিল তার চরম বিরোধী। ১৯১৬ সালে কংগ্রেস পৃথক নির্বাচন মেনে নিয়ে মুসলিম লীগের সাথে এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে যা লাখনো চুক্তি নামে খ্যাত ছিল। অনেক কংগ্রেস নেতা লাখনো চুক্তির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং এটাকে হিন্দু-মুসলিম মিলনের সেতুবন্ধন মনে করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে কংগ্রেস এ চুক্তি অমান্য করে পৃথক নির্বাচনের বিরোধিতা শুরু করে। অবশ্যি কংগ্রেসের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও ভারত বিভাগ পর্যন্ত পৃথক নির্বাচন বলবৎ থাকে।
হিন্দু-মুসলিম মিলনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী কোন কথা মুসলিম লীগ মেনিফেস্টোতে ছিলনা। বরঞ্চ তাতে ছিল সহযোগিতার সুস্পষ্ট আহবান। কংগ্রেস মুসলিম লীগের এ সহযোগিতার আহবান ঔদ্ধত্য সহকারে প্রত্যাখ্যান করে। কংগ্রেসের দাবী ছিল যে, সকল ভারতবাসী এক জাতি এবং ভারতবাসীর প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান একমাত্র কংগ্রেস। কিন্তু ১৯৩৭ সালের নির্বাচন তার এ দাবী মিথ্যা প্রমাণিত করে।
নির্বাচনের যে ফল প্রকাশিত হয়, তাতে দেখা যায় সর্বমোট ১৭৭১টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস লাভ করে মাত্র ৭০৬ টি যা অর্ধেকেরও কম। মুসলিম আসনের অধিকাংশ লাভ করে স্যার ফজলে হোসেনের পাঞ্জাব ইউনিয়নিস্ট পাটি। মুসলিম লীগ তখন পর্যন্ত অসংগঠিত ছিল বলে ৪৮২টি আসনের মধ্যে ১০২টি লাভ করে। কিন্তু কংগ্রেস হিন্দুমুসলিম উভয়ের প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসাবে কয়টি মুসলিম আসনে বিজয়ী হয়? ৫৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয় মাত্র ২৬টি আসনে। পাঞ্জাবে সর্বমোট ১৭৫ আসনের মধ্যে ১৮ এবং বাংলায় ২৫০ এর মধ্যে ৬০ আসন লাভ করে।
(The Struggle for Pakistan. I.H. Qureshi). Return showing the results on election in India-1937, Nov. 1937)
মোট সাড়ে তিন কোটি ভোটের মধ্যে কংগ্রেস প্রায় দেড় কোটি ভোট লাভ করে। অতএব ভারতের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হওয়ার দাবী মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
ইউপিতে কংগ্রেস টিকেটে মাত্র একজন মুসলমান নির্বাচিত হন। তিনি বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনী এলাকা থেকে যুক্ত নির্বাচনে নির্বাচিত হন। কংগ্রেসের প্রাদেশিক সভাপতি—একজন মুসলমান নির্বাচনে পরাজিত হন। (The Struggle for Pakistan I, H. Qureshi)
দেশের এগারোটি প্রদেশের মধ্যে ছয়টিতে কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করতে সমর্থ হয়। সে ছয়টি হলো- বোম্বাই, মাদ্রাজ, ইউ পি, সি পি, বিহার ও উড়িষ্যা। কিন্তু মুসলিম সংখ্যাগুরু প্রদেশগুলোতে বহু চেষ্টা করেও যথেষ্ট সংখ্যক মুসলমান প্রার্থী সংগ্রহ করতে পারেনি। উপরোক্ত ছয়টি প্রদেশের তিনটিতে বোম্বাই, সিপি (মধ্য প্রদেশ) ও উড়িষ্যা-কংগ্রেস মনোনীত কোন মুসলমান প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেননি。
নতুন প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রাদেশিক গভর্ণরগণ প্রাদেশিক আইনসভাগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতৃবৃন্দকে ডেকে পাঠান এবং মন্ত্রীসভা গঠনে সহায়তা করতে অনুরোধ জানান। পাঞ্জাব, বাংলা, সিন্ধু, উত্ত-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং আসাম এ পাঁচটি প্রদেশে মন্ত্রীসভা গঠিত হয় এবং পয়লা এপ্রিল থেকে স্বায়ত্তশাসিত ইউনিট হিসাবে কাজ শুরু করে। অবশিষ্ট ছয়টি প্রদেশে কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে—যতোক্ষণ না গভর্ণরগণ সংবিধান অনুযায়ী তাঁদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার নিশ্চয়তা দান করেন। এ ধরনের নিশ্চয়তা দানে গভর্ণরগণ অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। অতঃপর যেসব দল বা গ্রুপের প্রতিনিধিগণ মন্ত্রীসভা গঠনে ইচ্ছুক তাঁদেরকে নিয়ে অন্তর্বর্তী মন্ত্রীসভা গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মুসলমানদের নেতৃত্বে বোম্বাই, বিহার ও ইউপিতে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রীসভা গঠিত হয় এবং কতিপয় মুসলিম লীগ সদস্যকেও মন্ত্রীসভায় স্থান দেয়া হয়। কিন্তু এসবকে 'মুসলিম লীগ মন্ত্রীসভা' নাম দেয়া হয়নি।
প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন হয় ১৯৩৭ এর ফেব্রুয়ারী ও মার্চে। ১৯৩৬ সালের শেষভাগে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টো ঘোষণা করে। উভয় মেনিফেস্টোর সামাজিক পলিসি ছিল একই রকমের। রাজনৈতিক ইস্যুতেও কেউ একে অপর থেকে বেশী দূরে অবস্থান করছিল না। কিন্তু দুটি বিষয়ে উভয়ের মধ্যে বিরাট মতপার্থক্য ছিল। একটি এই যে, মুসলিম লীগ ওয়াদাবদ্ধ ছিল উর্দু ভাষা ও বর্ণমালার সংরক্ষণ এবং সমৃদ্ধি সাধন করতে। পক্ষান্তরে কংগ্রেস বদ্ধপরিকর ছিল হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে। দ্বিতীয়তঃ মুসলিম লীগ অটল ছিল পৃথক নির্বাচনের উপর। কিন্তু কংগ্রেস ছিল তার চরম বিরোধী। ১৯১৬ সালে কংগ্রেস পৃথক নির্বাচন মেনে নিয়ে মুসলিম লীগের সাথে এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে যা লাখনো চুক্তি নামে খ্যাত ছিল। অনেক কংগ্রেস নেতা লাখনো চুক্তির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং এটাকে হিন্দু-মুসলিম মিলনের সেতুবন্ধন মনে করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে কংগ্রেস এ চুক্তি অমান্য করে পৃথক নির্বাচনের বিরোধিতা শুরু করে। অবশ্যি কংগ্রেসের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও ভারত বিভাগ পর্যন্ত পৃথক নির্বাচন বলবৎ থাকে।
হিন্দু-মুসলিম মিলনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী কোন কথা মুসলিম লীগ মেনিফেস্টোতে ছিলনা। বরঞ্চ তাতে ছিল সহযোগিতার সুস্পষ্ট আহবান। কংগ্রেস মুসলিম লীগের এ সহযোগিতার আহবান ঔদ্ধত্য সহকারে প্রত্যাখ্যান করে। কংগ্রেসের দাবী ছিল যে, সকল ভারতবাসী এক জাতি এবং ভারতবাসীর প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান একমাত্র কংগ্রেস। কিন্তু ১৯৩৭ সালের নির্বাচন তার এ দাবী মিথ্যা প্রমাণিত করে।
নির্বাচনের যে ফল প্রকাশিত হয়, তাতে দেখা যায় সর্বমোট ১৭৭১টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস লাভ করে মাত্র ৭০৬ টি যা অর্ধেকেরও কম। মুসলিম আসনের অধিকাংশ লাভ করে স্যার ফজলে হোসেনের পাঞ্জাব ইউনিয়নিস্ট পাটি। মুসলিম লীগ তখন পর্যন্ত অসংগঠিত ছিল বলে ৪৮২টি আসনের মধ্যে ১০২টি লাভ করে। কিন্তু কংগ্রেস হিন্দুমুসলিম উভয়ের প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসাবে কয়টি মুসলিম আসনে বিজয়ী হয়? ৫৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয় মাত্র ২৬টি আসনে। পাঞ্জাবে সর্বমোট ১৭৫ আসনের মধ্যে ১৮ এবং বাংলায় ২৫০ এর মধ্যে ৬০ আসন লাভ করে।
(The Struggle for Pakistan. I.H. Qureshi). Return showing the results on election in India-1937, Nov. 1937)
মোট সাড়ে তিন কোটি ভোটের মধ্যে কংগ্রেস প্রায় দেড় কোটি ভোট লাভ করে। অতএব ভারতের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হওয়ার দাবী মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
ইউপিতে কংগ্রেস টিকেটে মাত্র একজন মুসলমান নির্বাচিত হন। তিনি বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনী এলাকা থেকে যুক্ত নির্বাচনে নির্বাচিত হন। কংগ্রেসের প্রাদেশিক সভাপতি—একজন মুসলমান নির্বাচনে পরাজিত হন। (The Struggle for Pakistan I, H. Qureshi)
দেশের এগারোটি প্রদেশের মধ্যে ছয়টিতে কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করতে সমর্থ হয়। সে ছয়টি হলো- বোম্বাই, মাদ্রাজ, ইউ পি, সি পি, বিহার ও উড়িষ্যা। কিন্তু মুসলিম সংখ্যাগুরু প্রদেশগুলোতে বহু চেষ্টা করেও যথেষ্ট সংখ্যক মুসলমান প্রার্থী সংগ্রহ করতে পারেনি। উপরোক্ত ছয়টি প্রদেশের তিনটিতে বোম্বাই, সিপি (মধ্য প্রদেশ) ও উড়িষ্যা-কংগ্রেস মনোনীত কোন মুসলমান প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেননি。
নতুন প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রাদেশিক গভর্ণরগণ প্রাদেশিক আইনসভাগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতৃবৃন্দকে ডেকে পাঠান এবং মন্ত্রীসভা গঠনে সহায়তা করতে অনুরোধ জানান। পাঞ্জাব, বাংলা, সিন্ধু, উত্ত-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং আসাম এ পাঁচটি প্রদেশে মন্ত্রীসভা গঠিত হয় এবং পয়লা এপ্রিল থেকে স্বায়ত্তশাসিত ইউনিট হিসাবে কাজ শুরু করে। অবশিষ্ট ছয়টি প্রদেশে কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে—যতোক্ষণ না গভর্ণরগণ সংবিধান অনুযায়ী তাঁদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার নিশ্চয়তা দান করেন। এ ধরনের নিশ্চয়তা দানে গভর্ণরগণ অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। অতঃপর যেসব দল বা গ্রুপের প্রতিনিধিগণ মন্ত্রীসভা গঠনে ইচ্ছুক তাঁদেরকে নিয়ে অন্তর্বর্তী মন্ত্রীসভা গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মুসলমানদের নেতৃত্বে বোম্বাই, বিহার ও ইউপিতে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রীসভা গঠিত হয় এবং কতিপয় মুসলিম লীগ সদস্যকেও মন্ত্রীসভায় স্থান দেয়া হয়। কিন্তু এসবকে 'মুসলিম লীগ মন্ত্রীসভা' নাম দেয়া হয়নি।
📄 রক্ষাকবচ প্রশ্নে অচলাবস্থা সৃষ্টি
ভারত শাসন আইন ১৯৩৫-এর অধীনে প্রদেশের গভর্ণরগণকে যে নির্দেশনামা প্রদান করা হয় তাতে তাঁদের প্রতি এক বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে আইনে যে রক্ষাকবচের (Safeguard) নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে তার প্রতি লক্ষ্য রাখাই গভর্ণরগণের বিশেষ দায়িত্ব। বলা হয়েছে:
The Instruments of Instructions issued to the Governors under the Government of India Act 1935, placed some special responsibilities on the provincial heads. These included the 'Safeguarding of all the legitimate interests of minorities as requiring him to secure, in general, that those racial or religious communities for the members of which special representation is accorded in the legislature and those classes of the people committed to his charge who, whether on account of the smallness of their number, or their lack of educational or material advantages or from any other cause, cannot as yet fully rely for their welfare upon joint political action in the legislature, shall not suffer, or have reasonable cause to fear neglect or oppression.
উপরোক্ত আইনে সব ধরনের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সকল বৈধ স্বার্থ সংরক্ষণের নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে। তাদের স্বার্থ যাতে সংরক্ষিত হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখার জন্যে প্রাদেশিক গভর্ণরগণকে বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়।
জাতিগত ও ধর্মীয় এমন কতিপয় সম্প্রদায় আছে যাদের সদস্যদের জন্যে আইনসভায় বিশেষ প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা হয়েছে, গভর্ণরের তত্ত্বাবধানে এমন কতিপয় শ্রেণী আছে যারা সংখ্যায় কম হওয়ার কারণে, অথবা শিক্ষাগত ও বৈষয়িক সুযোগ সুবিধা না থাকার কারণে অথবা অন্য কোন কারণে তাদের কল্যাণের জন্যে আইনসভায় গৃহীত যুক্ত রাজনৈতিক পদক্ষেপের উপর এখনো পুরোপুরি আস্থা পোষণ করতে পারেনা- এসব সম্প্রদায় ও শ্রেণী কোনরূপ দুর্গতি ভোগ করবে না অথবা অবহেলিত অথবা উৎপীড়িত হওয়ার কোন কারণ থাকবে না। এভাবে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের দায়িত্ব গভর্ণরদের উপরে অর্পিত হয়।
ভারতের সংখ্যালঘু বলতে প্রধানতঃ মুসলমানদেরকেই বলা হয় এবং তারা তাদের সকল প্রকার স্বার্থ সংরক্ষণ তথা রক্ষাকবচের জন্যে দীর্ঘকাল যাবত সংগ্রাম করে আসছে।
এ উপমহাদেশ কয়েকটি জাতির আবাসভূমি ছিল এবং তাদের মধ্যে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুও ছিল। এ বাস্তবতা কংগ্রেস স্বীকার করতোনা। কংগ্রেস দাবী করতো সকল ভারতবাসীর প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন মাত্র একটি এবং তা হলো কংগ্রেস। মিঃ গান্ধী News Chronicle এর প্রতিনিধির কাছে বলেন, এখানে একটি মাত্র দল আছে যে কল্যাণ করতে পারে এবং তা হলো কংগ্রেস। কংগ্রেস ব্যতীত অন্য কোন দল আমি মেনে নেব না।
তিনি আরও বলেন, তোমরা যে নামেই ডাক, ভারতে একটি মাত্র দলই হতে পারে এবং তা হচ্ছে কংগ্রেস- (Muslim Separatism in India, A. Hamid, p. 217)
জওহরলাল নেহরুর মনোভাবও ছিল অনুরূপ। তিনি বলেন, একটি অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যেও আবিষ্কার করা যাবে না যে ভারতে কোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব আছে। দেশে মাত্র দুটি দল আছে- কংগ্রেস এবং সরকার। আর যারা আছে তাদেরকে আমাদের কর্মপদ্ধতি মেনে নিয়ে আমাদের সাথে থাকতে হবে। যারা আমাদের সাথে নেই- তারা আমাদের বিরোধী। পন্ডিত নেহরুর উপরোক্ত উক্তি ফ্যাসিবাদী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।- (উক্ত গ্রন্থ)
সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে রক্ষাকবচের ব্যবস্থা ১৯৩৫ সালের আইনে রয়েছে এবং প্রাদেশিক গভর্ণরগণকে বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যাতে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়। কিন্তু পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর কথায় এ দেশে সংখ্যালঘু বলে কোন বস্তুর অস্তিত্বই যখন নেই, তখন কংগ্রেসের মতে গভর্ণরদের বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্যে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের প্রয়োজনও নেই। এর সুস্পষ্ট অর্থ হলো এই যে কংগ্রেস মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণে মোটেই রাজী নয়। এ কারণেই কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে অচলাবস্থার সৃষ্টি করে রাখে।
অবশেষে ভাইসরয় লর্ড লিলিথগোর সাথে কংগ্রেসের একটা আপস নিষ্পত্তি হয়ে যায় যার ভিত্তিতে ৭ই জুলাই কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি কংগ্রেসকে মন্ত্রীসভা গঠনের অনুমতি দান করার প্রস্তাব গ্রহণ করে।
ভাইসরয়ের পক্ষ থেকে গোপনে পূর্ণ নিশ্চয়তা লাভের পর কংগ্রেস সকল মান-অভিমান ত্যাগ করে ১৯৩৭ এর জুলাই মাসে সাতটি প্রদেশে মন্ত্রীসভা গঠন করে। ১৯৩৮ সালে আসামের প্রধানমন্ত্রী স্যার মুহম্মদ সা'দুল্লাহ এস্তেফা দান করায় আসামে গোপীনাথ বারদলৈ কর্তৃক কংগ্রেস কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। যে সকল প্রদেশে কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠিত হয়, সেসব প্রদেশে মুসলমানদের স্বার্থ পদদলিত হতে থাকে। এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা যাবে।
ভারত শাসন আইন ১৯৩৫-এর অধীনে প্রদেশের গভর্ণরগণকে যে নির্দেশনামা প্রদান করা হয় তাতে তাঁদের প্রতি এক বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে আইনে যে রক্ষাকবচের (Safeguard) নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে তার প্রতি লক্ষ্য রাখাই গভর্ণরগণের বিশেষ দায়িত্ব। বলা হয়েছে:
The Instruments of Instructions issued to the Governors under the Government of India Act 1935, placed some special responsibilities on the provincial heads. These included the 'Safeguarding of all the legitimate interests of minorities as requiring him to secure, in general, that those racial or religious communities for the members of which special representation is accorded in the legislature and those classes of the people committed to his charge who, whether on account of the smallness of their number, or their lack of educational or material advantages or from any other cause, cannot as yet fully rely for their welfare upon joint political action in the legislature, shall not suffer, or have reasonable cause to fear neglect or oppression.
উপরোক্ত আইনে সব ধরনের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সকল বৈধ স্বার্থ সংরক্ষণের নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে। তাদের স্বার্থ যাতে সংরক্ষিত হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখার জন্যে প্রাদেশিক গভর্ণরগণকে বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়।
জাতিগত ও ধর্মীয় এমন কতিপয় সম্প্রদায় আছে যাদের সদস্যদের জন্যে আইনসভায় বিশেষ প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা হয়েছে, গভর্ণরের তত্ত্বাবধানে এমন কতিপয় শ্রেণী আছে যারা সংখ্যায় কম হওয়ার কারণে, অথবা শিক্ষাগত ও বৈষয়িক সুযোগ সুবিধা না থাকার কারণে অথবা অন্য কোন কারণে তাদের কল্যাণের জন্যে আইনসভায় গৃহীত যুক্ত রাজনৈতিক পদক্ষেপের উপর এখনো পুরোপুরি আস্থা পোষণ করতে পারেনা- এসব সম্প্রদায় ও শ্রেণী কোনরূপ দুর্গতি ভোগ করবে না অথবা অবহেলিত অথবা উৎপীড়িত হওয়ার কোন কারণ থাকবে না। এভাবে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের দায়িত্ব গভর্ণরদের উপরে অর্পিত হয়।
ভারতের সংখ্যালঘু বলতে প্রধানতঃ মুসলমানদেরকেই বলা হয় এবং তারা তাদের সকল প্রকার স্বার্থ সংরক্ষণ তথা রক্ষাকবচের জন্যে দীর্ঘকাল যাবত সংগ্রাম করে আসছে।
এ উপমহাদেশ কয়েকটি জাতির আবাসভূমি ছিল এবং তাদের মধ্যে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুও ছিল। এ বাস্তবতা কংগ্রেস স্বীকার করতোনা। কংগ্রেস দাবী করতো সকল ভারতবাসীর প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন মাত্র একটি এবং তা হলো কংগ্রেস। মিঃ গান্ধী News Chronicle এর প্রতিনিধির কাছে বলেন, এখানে একটি মাত্র দল আছে যে কল্যাণ করতে পারে এবং তা হলো কংগ্রেস। কংগ্রেস ব্যতীত অন্য কোন দল আমি মেনে নেব না।
তিনি আরও বলেন, তোমরা যে নামেই ডাক, ভারতে একটি মাত্র দলই হতে পারে এবং তা হচ্ছে কংগ্রেস- (Muslim Separatism in India, A. Hamid, p. 217)
জওহরলাল নেহরুর মনোভাবও ছিল অনুরূপ। তিনি বলেন, একটি অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যেও আবিষ্কার করা যাবে না যে ভারতে কোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব আছে। দেশে মাত্র দুটি দল আছে- কংগ্রেস এবং সরকার। আর যারা আছে তাদেরকে আমাদের কর্মপদ্ধতি মেনে নিয়ে আমাদের সাথে থাকতে হবে। যারা আমাদের সাথে নেই- তারা আমাদের বিরোধী। পন্ডিত নেহরুর উপরোক্ত উক্তি ফ্যাসিবাদী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।- (উক্ত গ্রন্থ)
সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে রক্ষাকবচের ব্যবস্থা ১৯৩৫ সালের আইনে রয়েছে এবং প্রাদেশিক গভর্ণরগণকে বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যাতে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়। কিন্তু পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর কথায় এ দেশে সংখ্যালঘু বলে কোন বস্তুর অস্তিত্বই যখন নেই, তখন কংগ্রেসের মতে গভর্ণরদের বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্যে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের প্রয়োজনও নেই। এর সুস্পষ্ট অর্থ হলো এই যে কংগ্রেস মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণে মোটেই রাজী নয়। এ কারণেই কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে অচলাবস্থার সৃষ্টি করে রাখে।
অবশেষে ভাইসরয় লর্ড লিলিথগোর সাথে কংগ্রেসের একটা আপস নিষ্পত্তি হয়ে যায় যার ভিত্তিতে ৭ই জুলাই কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি কংগ্রেসকে মন্ত্রীসভা গঠনের অনুমতি দান করার প্রস্তাব গ্রহণ করে।
ভাইসরয়ের পক্ষ থেকে গোপনে পূর্ণ নিশ্চয়তা লাভের পর কংগ্রেস সকল মান-অভিমান ত্যাগ করে ১৯৩৭ এর জুলাই মাসে সাতটি প্রদেশে মন্ত্রীসভা গঠন করে। ১৯৩৮ সালে আসামের প্রধানমন্ত্রী স্যার মুহম্মদ সা'দুল্লাহ এস্তেফা দান করায় আসামে গোপীনাথ বারদলৈ কর্তৃক কংগ্রেস কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। যে সকল প্রদেশে কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠিত হয়, সেসব প্রদেশে মুসলমানদের স্বার্থ পদদলিত হতে থাকে। এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা যাবে।
📄 নির্বাচনের ফলাফল
কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠিত হওয়ার পর মুসলিম ভারতে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পূর্বে সাইত্রিশ সালের শুরু থেকেই যেসব প্রদেশে সরকার গঠিত হয় তাদের অবস্থা কি ছিল, তা একবার আলোচনা করা যাক।
কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠিত হওয়ার পর মুসলিম ভারতে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পূর্বে সাইত্রিশ সালের শুরু থেকেই যেসব প্রদেশে সরকার গঠিত হয় তাদের অবস্থা কি ছিল, তা একবার আলোচনা করা যাক।
📄 বাংলা
নির্বাচনের পর বাংলার আইনসভার দলীয় অবস্থান ছিল নিম্নরূপ:
কংগ্রেস ৫৪
অকংগ্রেসী হিন্দু ৪২
স্বতন্ত্র মুসলমান ৪৩
মুসলিম লীগ ৪০
অন্যান্য মুসলমান ৩৮
ইউরোপিয়ান অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ৩১
নির্দলীয় মুসলমান ২
মোট= ২৫০
মুসলিম লীগ নন, এমন মুসলমানদের মধ্যে কৃষক প্রজা পার্টির সদস্য ছিল ৩৫। এ দলের নেতা ছিলেন মৌলভী এ কে ফজলুল হক (শেরে বাংলা)। এখানে কোয়ালিশন ব্যতীত মন্ত্রীসভা গঠনের অন্য কোন পথ ছিলনা। অতএব ১৯৩৭ সালের এপ্রিল মাসে, মুসলিম লীগ, কৃষক প্রজা পার্টি, তফসিলী সম্প্রদায় (Scheduled Castes) এবং স্বতন্ত্র অথবা অকংগ্রেসীয় বর্ণ হিন্দুদের নিয়ে কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠিত হয়, যার নেতা ছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক। তিনি দশ সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রীসভা গঠন করেন যার মধ্যে পাঁচজন মুসলমান এবং পাঁচজন হিন্দু ছিলেন।
উল্লেখ্য নির্বাচনের পর তেসরা ফেব্রুয়ারী মুন্সীগঞ্জে অনুষ্ঠিত জনসভায় জনাব ফজলুল হক তাঁর দলের কর্মসূচী ঘোষণা করেন। ১৫ই ফেব্রুয়ারী কৃষক প্রজা পার্টির কার্যনির্বাহী কমিটি উক্ত দলের নেতৃবৃন্দের সাথে মুসলিম লীগের নতুন সংবিধান কার্যকর করার উদ্দেশ্যে যে চুক্তি সম্পাদিত হয় তা অনুমোদন করে। ৬ই মার্চ জনাব ফজলুল হক মন্ত্রীসভা গঠনে সম্মত হন। কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর অনুরোধে হক সাহেব মুসলিম লীগে যোগদান করেন। অতঃপর তিনি সর্বসম্মতিক্রমে লীগ কোয়ালিশন দলের নেতা নির্বাচিত হন যার ফলে তিনি বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন。
ফজলুল হক কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা নির্বিবাদে কাজ করতে পারেনি। কারণ কংগ্রেস পদে পদে এ মন্ত্রীসভার চরম বিরোধিতা করে। কিন্তু তার সুফল এই হয় যে, যে পরিমাণে বিরোধিতা হয় সেই পরিমাণে সংসদের ভেতরে ও বাইরে মুসলিম ঐক্য সংহত ও সুদৃঢ় হয়।
কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠিত হওয়ার পর কৃষক প্রজা পার্টি এবং মুসলিম লীগের মধ্যে সম্পর্ক উন্নত হয়। ১৮৩৭ সালের সেপ্টেম্বরে লানোতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগ অধিবেশনে তিনি যোগদান করে ঘোষণা করেন যে, তাঁর দলের সদস্যগণ মুসলিম লীগে যোগদান করবেন। তাঁর মন্ত্রীসভায় খাজা নাজিমুদ্দীন ও হোসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দী স্থান পেয়েছিলেন।
ফজলুল হক সাহেবের সাড়ে চার বছরের প্রধানমন্ত্রীত্ব তাঁর জীবনে এবং অবিভক্ত বাংলার মুসলিম রাজনৈতিক শক্তিতে এক নব জোয়ার এনে দেয়। তাঁর মন্ত্রীসভা জনগণের মধ্যে বিরাট আশার সঞ্চার এবং মুসলমানদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। তাদের এতদিনের হীনমন্যতা দূরীভূত হয় এবং হিন্দুদেরকে তারা সমকক্ষ মনে করে। সংসদে ফজলুল হক-সুহরাওয়ার্দীর ভাষণ, প্রতিপক্ষের কথার দাঁতভাঙ্গা জবাব দান এবং তাঁদের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা নেতৃবৃন্দের তুলনায় অধিকতর উচ্চমানের ছিল। তাঁদের প্রাণশক্তি ও প্রজ্ঞা, জ্ঞানবুদ্ধির প্রখরতা, অনর্গল বাগ্মিতা ও সাংগঠনিক যোগ্যতা এবং কঠোর পরিশ্রম ও ধীশক্তির দ্বারা তাঁরা সংসদে হিন্দু সদস্যদের উপর তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন।
বাংলার মুসলমানদের মধ্যে যে নবজীবনের সঞ্চার হয় তা সংসদ ভবনের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমিত ছিলনা। মানবীয় কর্মশীলতার সকল ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংগঠন, সাহিত্য, শিল্প, সাংবাদিকতা, খেলাধূলা প্রভৃতিতে তা দৃষ্টিগোচর হলো। মুসলিম লীগ একটি শক্তিশালী জীবন্ত সংগঠনে পরিণত হচ্ছিল এবং মুসলমানদের মধ্যে এক নতুন জীবন ও আস্থার সঞ্চার করছিল।
প্রায় এক শতাব্দী যাবত যে বাংলা সাহিত্যের উপর হিন্দু কবি সাহিত্যিক তাঁদের প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছিলেন, সাহিত্য গগনে কাজী নজরুল ইসলামের উদয়ের ফলে তার অবসান ঘটে। তিনি শুধু একাকী নন, কবি জসিম উদ্দিন, গোলাম মোস্তফা, বেনজীর আহমদ প্রমুখের কাব্যজগতে অমর অবদানও অনস্বীকার্য। সংগীত সম্রাট আব্বাসউদ্দীনের মনমাতানো সুরে গাওয়া ইসলামী, মুর্শেদী, ভাটিয়ালী সংগীত মুসলমানদের মনে ইসলামী প্রেরণা সঞ্চার করে।
এ মুসলিম নবজাগরণে নতুন মুসলিম প্রেসের উথান বিরাট অবদান রেখেছে। সাংবাদিকতার জগতে কোলকাতা থেকে কতিপয় মাসিক ও সাপ্তাহিক প্রকাশিত হলেও নিয়মিত কোন দৈনিক পত্রিকা ছিলনা। ১৯৩৬ সালে মওলানা আকরাম খাঁ দৈনিক আজাদ প্রকাশিত করে মুসলমান জাতির বিরাট খেদমত আঞ্জাম দেন এবং ফজলুল হক কোয়ালিশন মন্ত্রীসভাকে সক্রিয় সমর্থন দান করেন। এ সময়ে আবদুল করিম গজনবী কর্তৃক প্রকাশিত দৈনিক স্টার অব ইন্ডিয়া এবং খাজা নূরুদ্দীন কর্তৃক প্রকাশিত দৈনিক মর্নিং নিউজ মুসলমানদের আশা আকাংখার প্রতিনিধিত্ব করে।
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের প্রথম মন্ত্রীসভা- (১৯৩৭ থেকে ১৯৪১) বাংলার সংসদীয় সরকারের ইতিহাসের এক স্বর্ণযুগ বলা যেতে পারে। এ সময়ে তিনি বিহার, উড়িষ্যা ও আসাম প্রদেশগুলোতে সফর করে মুসলিম লীগ সংগঠিত করেন এবং একে একটি শক্তিশালী সংগঠনে রূপান্তরিত করেন। তিনি ১৯৩৭ সালে লানোতে, ১৯৩৮ সালে করাচীতে এবং ১৯৩৯ সালে কটকে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ সম্মেলনগুলোতে ভাষণ দান করেন। ১৯৪০ সালে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে লাহোরে ২২, ২৩ ও ২৪শে মার্চ মুসলিম লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তার ২৩শে মার্চের অধিবেশনে তিনি ঐতিহাসিক পাকিস্তান প্রস্তাব পেশ করেন।
ফজলুল হক এ সত্য উপলব্ধি করেছিলেন যে, মুসলিম জাতির উন্নতি অগ্রগতির চাবিকাঠি হচ্ছে শিক্ষা। এ কারণেই তিনি তাঁর কোয়ালিশন মন্ত্রীসভায় নিজে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানদের উন্নতির জন্যে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কায়েম করেন। যথা লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ (মহিলা কলেজ), কোলকাতা; ইডেন গার্লস কলেজ, ঢাকা; কৃষি কলেজ (তেজগাঁ, ঢাকা); ফজলুল হক মুসলিম হল, ঢাকা; ফজলুল হক কলেজ, চাখার, বরিশাল।
কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ব-ঔদ্ধত্য তিনি কিছুটা খর্ব করতে চেয়েছিলেন। এ ছিল প্রকৃতপক্ষে হিন্দুদের এক সুরক্ষিত বিদ্যামন্দির। হিন্দু রেনেসাঁর এবং বাংলায় হিন্দুর বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। এ ছিল এক বিরাট দুর্দমনীয় প্রতিষ্ঠান যা প্রবেশিকা এবং মাধ্যমিক পরীক্ষাগুলোও নিয়ন্ত্রণ করতো। অতএব উচ্চশিক্ষার উপর তার প্রভাব ছিল শিক্ষামন্ত্রী ও তাঁর বিভাগ অপেক্ষা অনেক বেশী। এ প্রভাব থেকে পরীক্ষার্থীদের রক্ষা করার জন্যে তিনি সেকেন্ডারী এডুকেশন বোর্ড গঠনের উদ্দেশ্যে আইন পরিষদে একটি বিল উথাপনের চেষ্টা করেন। ফলে গোটা হিন্দু সম্প্রদায় ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং পারস্পরিক সকল বিভেদ ভুলে গিয়ে উক্ত প্রস্তাবিত বিলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। ১৯০৫ সালের বংগভংগের পর এমন প্রচন্ড বিক্ষোভ আর দেখা যায়নি। ১৯৪০ সালে কোলকাতায় স্যার প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো এক বিদ্বজ্জন ব্যক্তির সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সমগ্র প্রদেশ থেকে প্রায় দশ হাজার প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগদান করেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন বার্ধক্যজনিত পীড়ায় ভুগছিলেন। এতসত্ত্বেও তিনি উক্ত সম্মেলনে তাঁর নাম ও মর্যাদা ব্যবহারের সুযোগ গ্রহণ করেন। সম্মেলনে তিনি যে বাণী পাঠান তার শেষাংশে বলেন:
আমার বার্ধক্য এবং স্বাস্থ্য আমাকে সম্মেলনে যোগদানে বাধা দিচ্ছে। কিন্তু যে বিপদ আমাদের প্রদেশের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করেছে, তা আমাকে ভয়ানক বিচলিত করেছে। সে জন্যে আমি আমার রোগশয্যা থেকে সম্মেলনে একটি কথা না পাঠিয়ে পারলাম না।
হিন্দুদের চরম বিরোধিতার কারণে বাংলার প্রধানমন্ত্রী সেকেন্ডারী এডুকেশন বোর্ড গঠনের যে পরিকল্পনা করেছিলেন তা কার্যকর করা যায়নি।
তবে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শেরে বাংলা ফজলুল হক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা এই যে, প্রদেশের সকল সরকারী চাকুরীতে হিন্দু ও মুসলমান সমান সুযোগ লাভ করবে। অর্থাৎ চাকুরীর শতকরা পঞ্চাশ ভাগ হিন্দু ও পঞ্চাশ ভাগ মুসলমান লাভ করবে। সরকারী চাকুরী ক্ষেত্রে হিন্দুদের চিরাচরিত একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠার ফলে মুসলমানের প্রতি যে চরম অবিচার করা হচ্ছিল, উপরোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণে মুসলমান শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে জীবন ক্ষেত্রে বিরাট আশা ও আনন্দের সঞ্চার হয়। মুসলমান জাতির জন্যে এ ছিল এক বিরাট খেদমত।
নির্বাচনের পর বাংলার আইনসভার দলীয় অবস্থান ছিল নিম্নরূপ:
কংগ্রেস ৫৪
অকংগ্রেসী হিন্দু ৪২
স্বতন্ত্র মুসলমান ৪৩
মুসলিম লীগ ৪০
অন্যান্য মুসলমান ৩৮
ইউরোপিয়ান অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ৩১
নির্দলীয় মুসলমান ২
মোট= ২৫০
মুসলিম লীগ নন, এমন মুসলমানদের মধ্যে কৃষক প্রজা পার্টির সদস্য ছিল ৩৫। এ দলের নেতা ছিলেন মৌলভী এ কে ফজলুল হক (শেরে বাংলা)। এখানে কোয়ালিশন ব্যতীত মন্ত্রীসভা গঠনের অন্য কোন পথ ছিলনা। অতএব ১৯৩৭ সালের এপ্রিল মাসে, মুসলিম লীগ, কৃষক প্রজা পার্টি, তফসিলী সম্প্রদায় (Scheduled Castes) এবং স্বতন্ত্র অথবা অকংগ্রেসীয় বর্ণ হিন্দুদের নিয়ে কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠিত হয়, যার নেতা ছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক। তিনি দশ সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রীসভা গঠন করেন যার মধ্যে পাঁচজন মুসলমান এবং পাঁচজন হিন্দু ছিলেন।
উল্লেখ্য নির্বাচনের পর তেসরা ফেব্রুয়ারী মুন্সীগঞ্জে অনুষ্ঠিত জনসভায় জনাব ফজলুল হক তাঁর দলের কর্মসূচী ঘোষণা করেন। ১৫ই ফেব্রুয়ারী কৃষক প্রজা পার্টির কার্যনির্বাহী কমিটি উক্ত দলের নেতৃবৃন্দের সাথে মুসলিম লীগের নতুন সংবিধান কার্যকর করার উদ্দেশ্যে যে চুক্তি সম্পাদিত হয় তা অনুমোদন করে। ৬ই মার্চ জনাব ফজলুল হক মন্ত্রীসভা গঠনে সম্মত হন। কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর অনুরোধে হক সাহেব মুসলিম লীগে যোগদান করেন। অতঃপর তিনি সর্বসম্মতিক্রমে লীগ কোয়ালিশন দলের নেতা নির্বাচিত হন যার ফলে তিনি বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন。
ফজলুল হক কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা নির্বিবাদে কাজ করতে পারেনি। কারণ কংগ্রেস পদে পদে এ মন্ত্রীসভার চরম বিরোধিতা করে। কিন্তু তার সুফল এই হয় যে, যে পরিমাণে বিরোধিতা হয় সেই পরিমাণে সংসদের ভেতরে ও বাইরে মুসলিম ঐক্য সংহত ও সুদৃঢ় হয়।
কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠিত হওয়ার পর কৃষক প্রজা পার্টি এবং মুসলিম লীগের মধ্যে সম্পর্ক উন্নত হয়। ১৮৩৭ সালের সেপ্টেম্বরে লানোতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগ অধিবেশনে তিনি যোগদান করে ঘোষণা করেন যে, তাঁর দলের সদস্যগণ মুসলিম লীগে যোগদান করবেন। তাঁর মন্ত্রীসভায় খাজা নাজিমুদ্দীন ও হোসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দী স্থান পেয়েছিলেন।
ফজলুল হক সাহেবের সাড়ে চার বছরের প্রধানমন্ত্রীত্ব তাঁর জীবনে এবং অবিভক্ত বাংলার মুসলিম রাজনৈতিক শক্তিতে এক নব জোয়ার এনে দেয়। তাঁর মন্ত্রীসভা জনগণের মধ্যে বিরাট আশার সঞ্চার এবং মুসলমানদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। তাদের এতদিনের হীনমন্যতা দূরীভূত হয় এবং হিন্দুদেরকে তারা সমকক্ষ মনে করে। সংসদে ফজলুল হক-সুহরাওয়ার্দীর ভাষণ, প্রতিপক্ষের কথার দাঁতভাঙ্গা জবাব দান এবং তাঁদের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা নেতৃবৃন্দের তুলনায় অধিকতর উচ্চমানের ছিল। তাঁদের প্রাণশক্তি ও প্রজ্ঞা, জ্ঞানবুদ্ধির প্রখরতা, অনর্গল বাগ্মিতা ও সাংগঠনিক যোগ্যতা এবং কঠোর পরিশ্রম ও ধীশক্তির দ্বারা তাঁরা সংসদে হিন্দু সদস্যদের উপর তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন।
বাংলার মুসলমানদের মধ্যে যে নবজীবনের সঞ্চার হয় তা সংসদ ভবনের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমিত ছিলনা। মানবীয় কর্মশীলতার সকল ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংগঠন, সাহিত্য, শিল্প, সাংবাদিকতা, খেলাধূলা প্রভৃতিতে তা দৃষ্টিগোচর হলো। মুসলিম লীগ একটি শক্তিশালী জীবন্ত সংগঠনে পরিণত হচ্ছিল এবং মুসলমানদের মধ্যে এক নতুন জীবন ও আস্থার সঞ্চার করছিল।
প্রায় এক শতাব্দী যাবত যে বাংলা সাহিত্যের উপর হিন্দু কবি সাহিত্যিক তাঁদের প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছিলেন, সাহিত্য গগনে কাজী নজরুল ইসলামের উদয়ের ফলে তার অবসান ঘটে। তিনি শুধু একাকী নন, কবি জসিম উদ্দিন, গোলাম মোস্তফা, বেনজীর আহমদ প্রমুখের কাব্যজগতে অমর অবদানও অনস্বীকার্য। সংগীত সম্রাট আব্বাসউদ্দীনের মনমাতানো সুরে গাওয়া ইসলামী, মুর্শেদী, ভাটিয়ালী সংগীত মুসলমানদের মনে ইসলামী প্রেরণা সঞ্চার করে।
এ মুসলিম নবজাগরণে নতুন মুসলিম প্রেসের উথান বিরাট অবদান রেখেছে। সাংবাদিকতার জগতে কোলকাতা থেকে কতিপয় মাসিক ও সাপ্তাহিক প্রকাশিত হলেও নিয়মিত কোন দৈনিক পত্রিকা ছিলনা। ১৯৩৬ সালে মওলানা আকরাম খাঁ দৈনিক আজাদ প্রকাশিত করে মুসলমান জাতির বিরাট খেদমত আঞ্জাম দেন এবং ফজলুল হক কোয়ালিশন মন্ত্রীসভাকে সক্রিয় সমর্থন দান করেন। এ সময়ে আবদুল করিম গজনবী কর্তৃক প্রকাশিত দৈনিক স্টার অব ইন্ডিয়া এবং খাজা নূরুদ্দীন কর্তৃক প্রকাশিত দৈনিক মর্নিং নিউজ মুসলমানদের আশা আকাংখার প্রতিনিধিত্ব করে।
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের প্রথম মন্ত্রীসভা- (১৯৩৭ থেকে ১৯৪১) বাংলার সংসদীয় সরকারের ইতিহাসের এক স্বর্ণযুগ বলা যেতে পারে। এ সময়ে তিনি বিহার, উড়িষ্যা ও আসাম প্রদেশগুলোতে সফর করে মুসলিম লীগ সংগঠিত করেন এবং একে একটি শক্তিশালী সংগঠনে রূপান্তরিত করেন। তিনি ১৯৩৭ সালে লানোতে, ১৯৩৮ সালে করাচীতে এবং ১৯৩৯ সালে কটকে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ সম্মেলনগুলোতে ভাষণ দান করেন। ১৯৪০ সালে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে লাহোরে ২২, ২৩ ও ২৪শে মার্চ মুসলিম লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তার ২৩শে মার্চের অধিবেশনে তিনি ঐতিহাসিক পাকিস্তান প্রস্তাব পেশ করেন।
ফজলুল হক এ সত্য উপলব্ধি করেছিলেন যে, মুসলিম জাতির উন্নতি অগ্রগতির চাবিকাঠি হচ্ছে শিক্ষা। এ কারণেই তিনি তাঁর কোয়ালিশন মন্ত্রীসভায় নিজে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানদের উন্নতির জন্যে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কায়েম করেন। যথা লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ (মহিলা কলেজ), কোলকাতা; ইডেন গার্লস কলেজ, ঢাকা; কৃষি কলেজ (তেজগাঁ, ঢাকা); ফজলুল হক মুসলিম হল, ঢাকা; ফজলুল হক কলেজ, চাখার, বরিশাল।
কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ব-ঔদ্ধত্য তিনি কিছুটা খর্ব করতে চেয়েছিলেন। এ ছিল প্রকৃতপক্ষে হিন্দুদের এক সুরক্ষিত বিদ্যামন্দির। হিন্দু রেনেসাঁর এবং বাংলায় হিন্দুর বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। এ ছিল এক বিরাট দুর্দমনীয় প্রতিষ্ঠান যা প্রবেশিকা এবং মাধ্যমিক পরীক্ষাগুলোও নিয়ন্ত্রণ করতো। অতএব উচ্চশিক্ষার উপর তার প্রভাব ছিল শিক্ষামন্ত্রী ও তাঁর বিভাগ অপেক্ষা অনেক বেশী। এ প্রভাব থেকে পরীক্ষার্থীদের রক্ষা করার জন্যে তিনি সেকেন্ডারী এডুকেশন বোর্ড গঠনের উদ্দেশ্যে আইন পরিষদে একটি বিল উথাপনের চেষ্টা করেন। ফলে গোটা হিন্দু সম্প্রদায় ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং পারস্পরিক সকল বিভেদ ভুলে গিয়ে উক্ত প্রস্তাবিত বিলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। ১৯০৫ সালের বংগভংগের পর এমন প্রচন্ড বিক্ষোভ আর দেখা যায়নি। ১৯৪০ সালে কোলকাতায় স্যার প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো এক বিদ্বজ্জন ব্যক্তির সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সমগ্র প্রদেশ থেকে প্রায় দশ হাজার প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগদান করেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন বার্ধক্যজনিত পীড়ায় ভুগছিলেন। এতসত্ত্বেও তিনি উক্ত সম্মেলনে তাঁর নাম ও মর্যাদা ব্যবহারের সুযোগ গ্রহণ করেন। সম্মেলনে তিনি যে বাণী পাঠান তার শেষাংশে বলেন:
আমার বার্ধক্য এবং স্বাস্থ্য আমাকে সম্মেলনে যোগদানে বাধা দিচ্ছে। কিন্তু যে বিপদ আমাদের প্রদেশের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করেছে, তা আমাকে ভয়ানক বিচলিত করেছে। সে জন্যে আমি আমার রোগশয্যা থেকে সম্মেলনে একটি কথা না পাঠিয়ে পারলাম না।
হিন্দুদের চরম বিরোধিতার কারণে বাংলার প্রধানমন্ত্রী সেকেন্ডারী এডুকেশন বোর্ড গঠনের যে পরিকল্পনা করেছিলেন তা কার্যকর করা যায়নি।
তবে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শেরে বাংলা ফজলুল হক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা এই যে, প্রদেশের সকল সরকারী চাকুরীতে হিন্দু ও মুসলমান সমান সুযোগ লাভ করবে। অর্থাৎ চাকুরীর শতকরা পঞ্চাশ ভাগ হিন্দু ও পঞ্চাশ ভাগ মুসলমান লাভ করবে। সরকারী চাকুরী ক্ষেত্রে হিন্দুদের চিরাচরিত একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠার ফলে মুসলমানের প্রতি যে চরম অবিচার করা হচ্ছিল, উপরোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণে মুসলমান শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে জীবন ক্ষেত্রে বিরাট আশা ও আনন্দের সঞ্চার হয়। মুসলমান জাতির জন্যে এ ছিল এক বিরাট খেদমত।