📄 পূনাচুক্তি
একদিকে হিন্দু নেতৃবৃন্দ পুনায় গমন করতঃ গান্ধীকে অনশন থেকে প্রতিনিবৃত্ত করার জন্যে বারবার আবেদন জানাতে থাকেন এবং অপরদিকে বর্ণ হিন্দুগণ তফশিলীদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন বাঁটোয়ারা সংশ্লিষ্ট অংশের রদবদল করতে। কবি রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তফশিলী সম্প্রদায়ের নেতা ডঃ আম্বেদকর বর্ণহিন্দুদের কাছে নতি স্বীকার করেন এবং স্থিরীকৃত হয় যে বিভিন্ন আইন সভায় তফশিলীদের জন্যে আসন সংরক্ষিত থাকবে বটে, তবে মিশ্র নির্বাচন প্রথার সাহায্যে তাদেরকে নির্বাচিত হতে হবে। এ চুক্তিটি ইতিহাসে পুনা চুক্তি নামে খ্যাতি লাভ করে।
উল্লেখ্য যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস তথা ভারতীয় বর্ণহিন্দুদের উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র তারতবাসীকে একজাতীয়তার যাঁতাকলে নিষ্পিষ্ট করে এমন এক জাতীয়তার উদ্ভব করা যার কর্তৃত্ব নেতৃত্ব থাকবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের হাতে। ফলে মুসলিম জাতিকে কৃত্রিম জাতীয়তার সাথে একাকার করে তাদের স্বাতন্ত্র্য বিলুপ্ত করে দেয়া হবে। কিন্তু মুসলমানদের জন্যে সরকার কর্তৃক পৃথক নির্বাচনের স্বীকৃতির মাধ্যমে তাদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্যও স্বীকার করে নেয়া হয়। এতে বর্ণহিন্দুদের বহুদিনের স্বপ্নসাধ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং তাদের সমস্ত আক্রোশটা গিয়ে পড়ে তাদের এককালীন পরম বন্ধু, হিতৈষী ও. অভিভাবক ব্রিটিশ সরকারের উপর। তার জন্যে সৃষ্টি হয় সন্ত্রাসবাদের। ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ, অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, রাজনৈতিক হত্যা প্রভৃতি নিত্যনতুন ঘটনা ঘটতে থাকে। এ সময়ের কয়েক বছরের উল্লেখ্যযোগ্য ঘটনা হলো হিন্দু সন্ত্রাসবাদী সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, গোয়েন্দা বিভাগের অন্যতম অফিসার খান বাহাদুর আহসান উল্লাহর হত্যা, ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ ও কয়েকজন নর-নারীর হত্যা, মেদিনীপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের হত্যা, ডিনামাইট ষড়যন্ত্র প্রভৃতি। লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠক চলাকালীন দু'তিন বছরের মধ্যেই এ সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী ঘটনাগুলি সংঘটিত হয়।
📄 ভারত শাসন আইন
পরের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন। প্রদেশে কিছুটা দায়িত্বশীল সরকার এবং কেন্দ্রে ফেডারেল সরকার প্রতিষ্ঠা ছিল-এ আইনের বিষয়বস্তু বা উদ্দেশ্য। মন্টফোর্ড শাসন সংস্কারে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের হাতে যে পরিমাণ ক্ষমতা দিয়েছিলেন, ভারত শাসন আইনে তার চেয়ে অধিক ক্ষমতা তাদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু প্রচুর রক্ষাকবচের মাধ্যমে আসল ক্ষমতা বড়োলাট ও প্রাদেশিক গভর্ণরদের হাতে রয়ে যায়। ১৯৩৭ সালের এপ্রিল মাস থেকে এ নতুন ভারত শাসন আইন চালু হবে বলেও ঘোষণা করা হয়।
কংগ্রেস কর্তৃপক্ষ এই সংকুচিত বা নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতায় (Controlled Power) মোটেই সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তবুও নানান টালবাহানার পর নতুন আইনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে কিভাবে ভারতের সাতটি প্রদেশে কংগ্রেস মন্ত্রীত্ব গঠন করে এবং তাদের আড়াই বছরের শাসনে কিভাবে মুসলমানদের উপর অন্যায় অবিচার ও নিষ্পেষণ চালায়, যার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ মুসলমানদের পাকিস্তান আন্দোলনের পথ উন্মুক্ত হয়, পরবর্তীতে তার বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ঘোষিত হলে মিঃ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সকলকে মুসলিম লীগের পতাকাতলে সমবেত হওয়ার উদাত্ত আহবান জানান। ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে কিছু সংখ্যক সদস্য মুসলিম লীগে নির্বাচিতও হয়েছিলেন। তখন পর্যন্তও মুসলিম লীগের আন্দোলন গণআন্দোলনের রূপ লাভ করেনি। নির্বাচনের পর মিঃ জিন্নাহ কংগ্রেসের সাথে সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করেন। কিন্তু কংগ্রেস তা প্রত্যাখ্যান করে। জিন্নাহর মতো একজন তেজস্বী ও খ্যাতনামা আইনবিদের পক্ষে কংগ্রেসের উপরোক্ত ঔদ্ধত্যের কাছে নতি স্বীকার করা সম্ভব হয়নি। বহু মানঅভিমানের পর বড়োলাট লিলিঙ্গোর আশ্বাসবাণীর পর কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠন করতে রাজী হলে, মিঃ জিন্নাহ লীগ সদস্যগণকে তার বিরোধিতা করার নির্দেশ দেন।
লীগ-কংগ্রেসের দ্বন্দ্বকলহের মধ্য দিয়েই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন চলতে থাকে। মুসলমানদের প্রতি হিন্দুদের বিমাতাসুলভ আচরণ, মুসলমানদের তাহজিব তামাদ্দুনের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করে কংগ্রেস শাসিত প্রদেশগুলিতে হিন্দু রামরাজ্য স্থাপনের প্রচেষ্টা এবং মুসলমানদের প্রতি হিন্দু কংগ্রেসের অন্যায় অবিচার মুসলমানদেরকে স্বতন্ত্র আবাসভূমি লাভের সংগ্রামে বাধ্য করে। সে সংগ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু'টি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের ভিতর দিয়ে।