📄 গোলটেবিল বৈঠক
সাইমন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ১৯৩০ সালে লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠক আহুত হয়। কংগ্রেস এ বৈঠকে যোগদান করা থেকে বিরত থাকে। আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন মওলানা মুহাম্মদ আলী, মিঃ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মিঃ এ, কে, ফজলুল হক, স্যার মুহাম্মদ ইসমাইল, আগা খান, স্যার আবদুল কাইয়ূম, স্যার আবদুল হালিম গজনবী, স্যার আকবর হায়দারী, স্যার মুহাম্মদ শফি, স্যার শাহ নওয়াজ ভুট্টু প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। মুসলিম সদস্যগণ লন্ডনে পৌঁছে মহামান্য আগা খানকে তাঁদের নেতা নির্বাচিত করেন।
প্রায় দু'মাসকাল বৈঠক স্থায়ী হয়। মওলানা মুহাম্মদ আলী ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে বৈঠকে যোগদান করেন এবং অসুস্থ অবস্থায় আসনে উপবেশন করেই তাঁর নব্বই মিনিটব্যাপী দীর্ঘতম ভাষণ দান করেন। এই অগ্নিপুরুষের জ্বালাময়ী ভাষণ যেমন একদিক দিয়ে ছিল একটি উচ্চাংগের সাহিত্য, তেমনি অপর দিক দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম অবদান। তিনি সম্রাট পঞ্চম জর্জের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে যে ভাষায় ব্রিটিশ সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন, তা শুধুমাত্র তাঁর মতো একজন নির্ভীক মুজাহিদের পক্ষেই ছিল সম্ভব। ভারতের স্বাধীনতা তাঁর কাছে ছিল জীবনের সর্বাপেক্ষা প্রিয়তম বস্তু। তিনি তাঁর বক্তৃতার এক পর্যায়ে অতি আবেগময় কণ্ঠে বলেন, "আমি ভারতের স্বাধীনতার সারাংশ নিয়ে স্বদেশে ফিরে যেতে চাই। যদি তোমরা স্বাধীনতা না দাও, তাহলে তার পরিবর্তে এখানে আমার জন্যে রচনা করো সমাধি। কারণ একটি গোলামীর দেশে ফিরে যাওয়ার চেয়ে একটি স্বাধীন দেশে মৃত্যুবরণকে আমি শ্রেয়ঃ মনে করি।”
তাঁর এ আন্তরিকতাপূর্ণ উক্তি ছিল একটি ভবিষ্যদ্বাণী যা অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হতে মোটেই বিলম্ব হলো না। তাঁকে আর তাঁর প্রিয় জন্মভূমিতে ফিরে আসতে হয়নি। ভারতের স্বাধীনতা হয়নি, হয়েছে তাঁর জীবনের অবসান লন্ডনের বুকেই ক'দিন পরে।
মওলানা মুহাম্মদ আলী বারবার কারাবরণ করে এবং দীর্ঘদিন কারাগারে অতিবাহিত করে একেবারে ভগ্নস্বাস্থ্য হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর অকস্মাৎ মৃত্যু ভারতের কোটি কোটি নরনারীকে শোকসাগরে নিমজ্জিত করে। ১৯৩০ সালে ৪ঠা জানুয়ারী তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং এ নিদারুণ সংবাদ তড়িৎগতিতে সারা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীর সুধী সমাজ মর্মাহত হয়ে ভারতের এ সিংহপুরুষের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে তারবার্তা প্রেরণ করতে থাকেন।
মওলানা মুহাম্মদ আলীর অন্তিম ইচ্ছানুযায়ী তাঁর মৃতদেহকে পরাধীন ভারত ভূমিতে না এনে বায়তুল মাক্দেসে অবস্থিত খলিফা ওমরের মসজিদ প্রাংগণে সমাধিস্থ করা হয়।
দেশপ্রেমিক, কবি ও সাহিত্যক, সাংবাদিক ও বাগ্মী মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহরের মৃত্যুতে ভারতবর্ষের রাজনীতিক্ষেত্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা আর পূরণ হয়নি। তবে লন্ডন যাত্রাকালে তাঁকে যখন স্ট্রেচারের সাহায্যে বোম্বাই বন্দরে জাহাজে তোলা হয়, তখন অনেকেই অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন-"ভারতে আপনার স্থলাভিষিক্ত কে হবে।” তখন তিনি বলেছিলেন "তোমাদের জন্যে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ রইলো।” তাঁর এ অন্তিম ইচ্ছাও পূরণ হয়েছিল। পরবর্তীকালে মুসলমানদের আশা-আকাংখার বাস্তবায়ন হয়েছিল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর অক্লান্ত প্রচেষ্টায়।
📄 দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক
প্রথম গোলটেবিল বৈঠক ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বর্জন করেছিল। উপরন্তু মিঃ গান্ধী লবণ আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করে ভারতে ব্রিটিশ সরকারকে বিব্রত করে তোলেন। সরকারও আন্দোলনকারীদেরকে কঠোর হস্তে দমন করার চেষ্টা করেন। এমতাবস্থায় সরকারের সাথে একটা আপোষ নিষ্পত্তিতে উপনীত হবার জন্যে স্যার তেজবাহাদুর সাপ্রু, ভূপালের নবাব হামীদুল্লাহ্ খান, শ্রীনিবাস শাস্ত্রী এবং শ্রী জয়াকর প্রমুখ নেতৃবৃন্দ মিঃ গান্ধীর সাথে আলোচনায় মিলিত হন। আলোচনায় একটি আপোষের ক্ষেত্র তৈরী হয়। বড়োলাটের সাথে গান্ধীজির সরাসরি আলাপ আলোচনার পর কংগ্রেস দ্বিতীয় গোলটিবিল বৈঠকে যোগদান করতে সম্মত হয়।
১৯৩১ সালের আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিতব্য গোলটেবিল বৈঠকে কংগ্রেসের একমাত্র প্রতিনিধি হিসাবে মিঃ গান্ধী লন্ডন যাত্রা করেন। লন্ডনে পৌঁছে তিনি জানতে পারেন যে সরকার মুসলমানদের ন্যায় তফশিলী সম্প্রদায়কেও একটা স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসাবে গণনা করতে বদ্ধপরিকর। গান্ধী তা মেনে নিতে রাজী ছিলেন না এবং তিনি তার প্রতিবাদে ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন। গান্ধী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকারীদের সাথে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন।
গান্ধীর গোলটেবিল বৈঠক ত্যাগের পর দু'মাসকাল যাবত বৈঠক চলে এবং বৈঠকে অনেকগুলি সাব কমিটি গঠিত হয়। এসব কমিটির রিপোর্ট বিবেচনার জন্যে পরবর্তী বৎসরের আগস্ট মাসে গোলটেবিল বৈঠকের তৃতীয় অধিবেশন আহূত হয়।
📄 তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠক
বিভিন্ন আইন সভায় মুসলমানদের আসন সংখ্যা ও নির্বাচন প্রথা নিয়ে হিন্দু সদস্যগণ তাদের চিরাচরিত বৈরী ভূমিকাই পালন করেন। ১৯২৮ সালে কোলকাতায় অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সম্মেলনে হিন্দুগণ যে আপোষহীন মনোভাব ব্যক্ত করে সম্মেলনকে ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন, গোলটেবিল বৈঠককে অনুরূপভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করার চেষ্টা তাঁরা করছিলেন। কিন্তু আগা খানের সুযোগ্য নেতৃত্বে মুসলমান নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে মিঃ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ এমন যোগ্যতা ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে তাঁদের ন্যায্য দাবীদাওয়াগুলি পেশ করেছিলেন যে তার অধিকাংশই ব্রিটিশ সরকার মেনে নিতে রাজী হন। আগা খান ও মিঃ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ব্যতীতও স্যার মুহাম্মদ শফি, স্যার আবদুল হালিম গজনভী, স্যার আকবর হায়দারী প্রমুখ নেতৃবৃন্দের ভূমিকাও ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য। যুক্তিতর্কে হার মেনে নিয়ে পন্ডিত মদনমোহন মালব্য, ডাঃ মুঞ্জে, শ্রীজয়াকর প্রমুখ নেতৃবৃন্দ অন্যান্য হিন্দু সদস্যগণের সাথে পরামর্শক্রমে উপরোক্ত প্রশ্নটির (আইনসভায় মুসলমানদের আসন বণ্টন ও নির্বাচন প্রথা) মীমাংসার ভার অর্পণ করেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামজে ম্যাকডোনান্ডের উপর।
ম্যাকডোনান্ড অতীতে হিন্দুপ্রীতির পরিচয় দিয়েছিলেন এবং কংগ্রেসের দৃঢ় সমর্থক ছিলেন বলে তার উপর হিন্দুদের গভীর আস্থা ছিল। কিন্তু তিনি যে সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ (Communal Award) ঘোষণা করেন তাতে বিভিন্ন আইনসভায় মুসলমান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্যে আসন সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। পৃথক নির্বাচন প্রথাকেও স্বীকৃতি দেয়া হয়। শুধু আসন সংখ্যায় কিছু রদবদল করে উভয়ের গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করা হয়।
ম্যাকডোনান্ডের ঘোষণায় হিন্দুগণ বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়েন। কারণ তারা কখনো এরূপ আশা করেননি। বিশেষ করে তফশিলী সম্প্রদায়ভুক্ত হিন্দুদের জন্যেও পৃথক নির্বাচনের প্রস্তাবে তাঁরা খুব মর্মাহত হয়ে পড়েন। মিঃ গান্ধী তখন জারবেদা জেলে কারাজীবন যাপন করছিলেন। তিনি পৃথক নির্বাচনের প্রতিবাদে আমরণ অনশন ধর্মঘটের কথা ঘোষণা করেন।
📄 পূনাচুক্তি
একদিকে হিন্দু নেতৃবৃন্দ পুনায় গমন করতঃ গান্ধীকে অনশন থেকে প্রতিনিবৃত্ত করার জন্যে বারবার আবেদন জানাতে থাকেন এবং অপরদিকে বর্ণ হিন্দুগণ তফশিলীদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন বাঁটোয়ারা সংশ্লিষ্ট অংশের রদবদল করতে। কবি রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তফশিলী সম্প্রদায়ের নেতা ডঃ আম্বেদকর বর্ণহিন্দুদের কাছে নতি স্বীকার করেন এবং স্থিরীকৃত হয় যে বিভিন্ন আইন সভায় তফশিলীদের জন্যে আসন সংরক্ষিত থাকবে বটে, তবে মিশ্র নির্বাচন প্রথার সাহায্যে তাদেরকে নির্বাচিত হতে হবে। এ চুক্তিটি ইতিহাসে পুনা চুক্তি নামে খ্যাতি লাভ করে।
উল্লেখ্য যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস তথা ভারতীয় বর্ণহিন্দুদের উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র তারতবাসীকে একজাতীয়তার যাঁতাকলে নিষ্পিষ্ট করে এমন এক জাতীয়তার উদ্ভব করা যার কর্তৃত্ব নেতৃত্ব থাকবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের হাতে। ফলে মুসলিম জাতিকে কৃত্রিম জাতীয়তার সাথে একাকার করে তাদের স্বাতন্ত্র্য বিলুপ্ত করে দেয়া হবে। কিন্তু মুসলমানদের জন্যে সরকার কর্তৃক পৃথক নির্বাচনের স্বীকৃতির মাধ্যমে তাদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্যও স্বীকার করে নেয়া হয়। এতে বর্ণহিন্দুদের বহুদিনের স্বপ্নসাধ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং তাদের সমস্ত আক্রোশটা গিয়ে পড়ে তাদের এককালীন পরম বন্ধু, হিতৈষী ও. অভিভাবক ব্রিটিশ সরকারের উপর। তার জন্যে সৃষ্টি হয় সন্ত্রাসবাদের। ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ, অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, রাজনৈতিক হত্যা প্রভৃতি নিত্যনতুন ঘটনা ঘটতে থাকে। এ সময়ের কয়েক বছরের উল্লেখ্যযোগ্য ঘটনা হলো হিন্দু সন্ত্রাসবাদী সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, গোয়েন্দা বিভাগের অন্যতম অফিসার খান বাহাদুর আহসান উল্লাহর হত্যা, ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ ও কয়েকজন নর-নারীর হত্যা, মেদিনীপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের হত্যা, ডিনামাইট ষড়যন্ত্র প্রভৃতি। লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠক চলাকালীন দু'তিন বছরের মধ্যেই এ সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী ঘটনাগুলি সংঘটিত হয়।