📄 বিপ্লবী আহমদুল্লাহ
সাইয়েদ আহমদের জেহাদী আন্দোলনে বাংগালী অবাংগালী নির্বিশেষে যেমন সারা ভারতের মুসলমান সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল, তেমনি অংশগ্রহণ করেছিল সকল শ্রেণীর মুসলমান। চাষী, মজুর, দরজী, কশাই, মোল্লা, মওলতী, মওলানা এবং সরকারী দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মচারী জীবনের সকল প্রকার ঝুঁকি নিয়ে একমাত্র খোদার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে অংশগ্রহণ করেন জেহাদী আন্দোলনে। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আহমদুল্লাহ তাদের মধ্যে অন্যতম।
আহমদুল্লাহ্র পিতার নাম ছিল এলাহী বশ্। পাটনার অন্তর্গত ইতিহাস প্রসিদ্ধ সাদিকপুরে এক অতি সম্ভ্রান্ত পরিবারে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে জন্মগ্রহণ করেন আহমদুল্লাহ। আহমদুল্লাহ্ আরবী, ফার্সী ও উর্দু ভাষায় উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ইংরাজী ভাষায়ও তাঁর প্রচুর ব্যুৎপত্তি ছিল। তাঁর পিতা এলাহী বশ্ একজন প্রখ্যাত আলেম ও সুবক্তা ছিলেন। তিনি শুধু একাই সাইয়েদ আহমদ শহীদের মুরীদ হননি, তাঁর তিন পুত্র ইয়াহিয়া আলী, ফয়েজ আলী ও আহমাদুল্লাহকেও সাইয়েদ সাহেবের মুরীদ করেন। আহমদুল্লাহ প্রথম জীবনে ইংরেজ সরকারের শিক্ষা বিভাগে নিযুক্ত হন এবং ১৮৫৩ খৃস্টাব্দে পাটনায় জনশিক্ষা কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন। আহমদুল্লাহর পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল আহমদ বহ্। সাইয়েদ সাহেব তা পরিবর্তন করে নতুন নাম রাখেন আহমদুল্লাহ। তাঁর প্রথম নাম লোপ পায় এবং তিনি আহমদুল্লাহ নামেই পরিচিত হন।
সীমান্তে শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকালে সাইয়েদ সাহেবের সৈন্যসংখ্যা ছিল দু'লক্ষেরও অধিক। এ বিরাট বাহিনীর জন্যে লোক ও অর্থ সংগ্রহ হয়েছিল তৎকালীন ভারতের প্রায় প্রত্যেক প্রদেশ থেকেই বিশেষ করে বাংলা, বিহার উড়িষ্যা, যুক্তপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশ থেকে। এ কাজ চলতো একটা সুনিয়ন্ত্রিত গোপন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যা ১৮৫২ সালের পূর্ব পর্যন্ত বিশ-পঁচিশ বৎসর যাবত ইংরেজ সরকার ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি। এ গোপন প্রতিষ্ঠান ও তার সকল প্রকার কর্মতৎপরতার সাথে উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী আহমদুল্লাহ্ কতোখানি ওতোপ্রোত জড়িত ছিলেন তা জানা যায় একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে যা মিঃ র্যাভেন শ' (Raven Shaw) পেশ করেন ৯-৫-১৮৬৫ তারিখে বাংলা সরকারের নিকটে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-
১৮৫২ খৃস্টাব্দে পাঞ্জাবে কর্তৃপক্ষ একটি ষড়যন্ত্রমূলক চিঠি হস্তগত করে। হিন্দুস্থানী ধর্মান্ধরা (মুজাহিদগণ) শৈলশিখর থেকে ভারতীয় চতুর্থ রেজিমেন্টের (Regiment of Native Infantry) সংগে যে একটা গোলযোগ পাকাতে চেষ্টা করেছিল, তার প্রমাণ এ থেকে পাওয়া যায়। দেখা যায় যে, এ ষড়যন্ত্রের উৎপত্তি হয় পাটনায়, এবং যে চিঠি ধরা পড়ে তাতে জানা যায় যে, সাদিকপুর পরিবারের বহু মৌলভী এবং অস্ত্রসজ্জিত বহু কাফেলা তখন সীমান্তের দিকে রওয়ানা হয়েছে। পেশাওরের একখানা স্বাক্ষরহীন চিঠিতে জানা যায় যে মওলভী বেলায়েত আলী, এনায়েত আলী, ফয়েজ আলী ও ইয়াহইয়া আলী (আহমদুল্লাহর দুই ভাই) এবং দিনাজপুরের জনৈক দরজী মওলভী করম আলী সুরাটের অন্তর্গত সিত্তানায় 'তাঁবু ফেলেছিলেন এবং বাদশাহ্ সাইয়েদ আকবরের সহযোগিতায় গভর্ণমেন্টের বিরুদ্ধে লড়াই করতে তৈরী হচ্ছিলেন। আমি পূর্বেই বলেছি যে, সাইয়েদ আকবর সোয়াতের একজন সরকার মনোনীত রাজা ছিলেন। চিঠিতে এ রকম বর্ণনা ছিল: মওলভী বেলায়েত আলীর ভাই মওলভী ফরহাত আলী আযীমাবাদে, মওলভী ফয়েজ আলীর ভাই আহমদুল্লাহ্ ও মওলভী ইয়াহ্ইয়া আলী আপন আপন বাটিতে নিজ নিজ মহল্লায় অর্থ সংগ্রহ করছিলেন এবং অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ পাঠাচ্ছিলেন। অন্যান্য চিঠি থেকে জানা যায় যে, সৈন্য ও রসদ পাটনা থেকে মীরাট ও রাওয়ালপিন্ডির মধ্য দিয়ে পাঠানো হতো। এ দু'জায়গায় আলাদা এজেন্ট নিযুক্ত থাকতো। এবং তারা সীমান্তের জেহাদের জন্যে রসদ সরবরাহের সব বন্দোবস্ত করতো।
"পাঞ্জাব সরকারের অনুরোধক্রমে পাটনার ম্যাজিস্ট্রেট হোসেন আলী খানের খানা তল্লাসী করে। সে ছিল আহমদুল্লাহর খানসামা এবং চিঠিপত্র তার নামেই চলাচল হতো। আসলে কিন্তু ম্যাজিস্ট্রট কর্তৃক খানা তল্লাসীর দুদিন আগেই পাঞ্জাব থেকে ফেরত একজন হাকিমের (Native Doctor) মারফৎ এ খবরটা জানাজানি হয়ে যায় ও তাদের বাড়ীর যাবতীয় চিঠিপত্র নষ্ট করে ফেলা হয়। যাহোক, "১৮৫২ সালের ১০ই আগস্ট তারিখের রিপোর্টে ম্যাজিস্ট্রেট গভর্ণমেন্টকে জানান যে, ওহাবীদের তখন বেশ সংখ্যাবৃদ্ধি হয়েছিল, এবং মওলভী বেলায়েত আলী, আহমদুল্লাহ্ ও তাঁর পিতা এলাহী বশের বাড়ীতে জেহাদের জন্যে সর্বপ্রকার গুপ্ত মন্ত্রণা হতো ও সেখান থেকে প্রচার কার্য চলতো। তিনি আরও জানান যে, ওহাবীদের স্থানীয় পুলিশের সংগে যোগাযোগ ছিল। তার দরুন তাঁদের কার্যকলাপের কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তাঁর নিকট যায়নি। তবে মওলভী আহমদুল্লাহর বাড়ীতে ছয়-সাত শ' সশস্ত্র লোক ম্যাজিস্ট্রেটের খানা তল্লাশীর বিরোধিতা করতে ও বিদ্রোহের নিশানা তুলতে প্রস্তুত ছিল।”
"১৮৫২ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর তারিখের কাউন্সিল বৈঠকে একটা বিষয় (minute) লিপিবদ্ধ করা হয়- সেটা করা হয় পাঞ্জাব গভর্ণমেন্টের লেখা অনুযায়ী এসব চিঠিপত্র সম্পর্কে, এবং সীমান্তের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার প্রয়োজনীয়তাও তাতে স্বীকৃত হয়। কারণ তারা বাঙালী ও হিন্দুস্তানী ওহাবীদের দ্বারা ক্রমাগত উত্তেজিত হচ্ছিল। চতুর্থ দেশীয় রেজিমেন্টের মুন্সী মুহাম্মদ ওয়ালীকে ফৌজদারীতে সুপর্দ করা হয় এবং রাওয়ালপিন্ডিতে ১৮৫৩ সালের ১২ই মে তারিখে তার বিচার ও শাস্তি হয়। তখনও মণ্ডলভী আহমদুল্লাহ্ এবং পাটনার অন্যান্য অধিবাসীদের নাম পুনরায় সাক্ষ্য প্রমাণে ওঠে এবং তাঁদের দ্বারা সীমান্তে রসদ পাঠানো বিষয়ও আলোচনা হয়।”
"অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, গভর্ণমেন্ট কোন সক্রিয় পন্থা অবলম্বন করেননি এবং পাটনার ষড়যন্ত্রও নষ্ট করে দেননি। রাজদ্রোহিতার দমন নিশ্চয়ই হতো, আম্বালা অভিযানে কোনো সৈন্যক্ষয় হতো না এবং সরকারী কর্মচারীরা বহু পরিশ্রম ও অহেতুক লাঞ্ছনা থেকে রেহাই পেতেন, কারণ ১৮৫২ সালের সশস্ত্র রাজদ্রোহী আহমদুল্লাহই হচ্ছে এক 'সামান্য কেতাবওয়ালা' ও ১৮৫৭ সালের 'ওহাবী ভদ্রলোক' [১]
সারা ভারতে ১৮৫৭ সালে আযাদী আন্দোলন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলে আহমদুল্লাহ সহ পাটনার বহু মুসলমানকে গ্রেফতার ও বন্দী করেন তদানীন্তন কমিশনার মিঃ টেইলার। টেইলার সন্দেহ করেন যে, সাতান্ন সালের আন্দোলনে এসব মুসলমান জড়িত ছিলেন। টেইলার বন্দীকৃত মুসলমানদেরকে বিনা বিচারে অতি নিষ্ঠুর ও পৈশাচিকভাবে দৈনিক কিছু সংখ্যক করে তাঁর বাংলার ময়দানে ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ করতে থাকেন। কিন্তু এ নিষ্ঠুর ও অন্যায় অবিচার কর্তৃপক্ষের কানে পৌঁছা মাত্র অবশিষ্ট বন্দীদের মুক্তির আদেশ দেয়া হয় এবং টেইলারের কৈফিয়ৎ তলব করা হয়। এভাবে আহমদুল্লাহ্ টেইলারের মৃত্যুযজ্ঞ থেকে রক্ষা পান। এ পৈশাচিক হত্যাকান্ডের জন্যে টেইলারকে কমিশনারের পদ থেকে অপসারণ করা হয়।
সাতান্নর আযাদী আন্দোলন দমিত ও প্রশমিত হলে, ইংরেজরা মুসলমানদের মন জয় করার ভূমিকা গ্রহণ করে। ওদিকে স্যার সৈয়দ আহমদও ইংরেজদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। আহমদুল্লাহ্র প্রতিও সরকারের সহানুভূতি আকৃষ্ট হয়। ফলে ১৮৬০ সালের ২১শে সেপ্টেম্বরের এক ঘোষণার দ্বারা তিনি ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রূপে নিয়োজিত হন। কিন্তু তখনও পাটনার বড়ো খাক্বাহ্ বা প্রধান কেন্দ্রস্থল থেকে মূলকা ও সিত্তানায় রীতিমতো মুজাহিদ ও রসদ সরবরাহ অব্যাহত ছিল। সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী হয়েও আহমদুল্লাহ্ একমাত্র খোদার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মুজাহিদ বাহিনীর সাথে পূর্ণ সহযোগিতা করতেন। তাঁরই তত্ত্বাবধানে বাংলা বিহার থেকে মুজাহিদ ও রসদ সংগ্রহ পূর্ণ উদ্যমে চলতো। এ ব্যাপারে প্রধান ঘাঁটি ছিল তাঁর নিজবাড়ী। প্রত্যেক জুমার দিনে বাদমাগরিব তাঁর বাড়ীতে মিলাদের আয়োজন করা হতো এবং মীলাদের নামে সেখানে মুজাহিদগণ জমায়েত হতেন এবং দৈনন্দিন কর্মসূচী নির্ধারিত করতেন। তাঁরা তাঁদের কাজকর্মের জন্যে এমন এক সংকেত পদ্ধতি (CODE) ব্যবহার করতেন যা তাঁরা ব্যতীত আর কারো বোধগম্য ছিল না। প্রত্যেকে ভিন্ন নামে নিজেদের মধ্যে পরিচিত ছিলেন। যুদ্ধকে বলা হতো 'মোকদ্দমা', মোহরকে 'লালমোতি।' টাকা পয়সা প্রেরণ করা হতো কেতাবের মূল্য হিসাবে। আহমদুল্লাহ 'কেতাবওয়ালা' বলে পরিচিত ছিলেন।
বাংলা ও বিহারে আহমদুল্লাহর বিশ্বস্ত, কর্মঠ ও খোদার পথে উৎসর্গীকৃত এজেন্ট ছিল। বাংলার এজেন্ট ছিলেন ঢাকার প্রসিদ্ধ চামড়া ব্যবসায়ী হাজী বদরুদ্দীন। তিনি পূর্বাঞ্চলের সমুদয় অর্থ সংগ্রহ করে পাটনার ফাগুলাল নামধারী জনৈক ব্যবসায়ীর নামে হুন্ডী করে পাঠাতেন। কোলকাতার মুড়িগঞ্জ মহল্লায় আবদুল জাব্বার নামে এবং মুকসেদ আলী নামে অন্য একজন হাইকোর্টের মোক্তার এজেন্ট ছিলেন। মুকসেদ আলীর পাটনাতেও বাড়ী ছিল। তাছাড়া, চব্বিশ পরগণা, যশোর, ফরিদপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, রংপুর প্রভৃতি জেলাতেও এজেন্ট ছিল। বিহার, উড়িষ্যা, ইউপি ও মধ্য প্রদেশের বড়ো বড়ো শহরগুলিতেও এজেন্ট নিয়োজিত ছিল। আহমদুল্লাহ্ সাহেব সাংকেতিক ভাষায় চিঠিপত্রের আদান প্রদান করতেন তাদের সংগে। ১৮৬০ সাল থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত মওলবী আহমদুল্লাহই ছিলেন জেহাদী আন্দোলনের প্রধান কর্ণধার। সরকারী উচ্চপদের পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে তিনি নিরঙ্কুশভাবে এ আন্দোলন পরিচালনা করতেন এটাই ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কারণ যে কোন বিপ্লব সফল করতে হলে প্রতিষ্ঠিত সরকারের পুলিশ, সামরিক বাহিনী, প্রশাসন বিভাগ প্রভৃতির সাহায্য সহযোগিতা অপরিহার্য।
আঠারো শ' সাতান্ন সালে সমগ্র ভারতব্যাপী যে বিপ্লবী আন্দোলন চলেছিল তার প্রেরণা সঞ্চার করেছিল মুজাহিদ বাহিনী, তাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল মুজাহিদ বাহিনী। কিন্তু প্রতিকূল অবস্থার দরুন সে আন্দোলন ফলপ্রসূ না হলেও মুজাহিদগণ দমিত হননি, ভগ্নোৎসাহ হননি। তাদের কর্মপ্রেরণা হ্রাস পায়নি মোটেও। চূড়ান্ত বিজয় লাভ সম্ভব না হলেও সাতান্ন বিপর্যয়ের পরও একদশক কাল পর্যন্ত এ আন্দোলনকে তাঁরা এগিয়ে নিয়ে গেছেন প্রায় সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে।
সমগ্র বাংলা থেকে হাজার হাজার মুসলমান গাজী অথবা শহীদ হওয়ার আকাংখায় পাটনা সাদিকপুরে আহমদুল্লাহ সাহেবের বাড়ীতে জমায়েত হতো এবং সেখান থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে সিত্তানার জন্যে রওয়ানা হতো। এ রকম একটি দলের চারজন বাংলার মুসলমান আম্বালা যাওয়ার পথে গুজান খান নামক জনৈক পাঞ্জাবী সার্জেন্টের হাতে ধরা পড়ে। তাদেরকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়। তারা নিজদেরকে নির্দোষ ও নিরীহ পথচারী বলে জানালে ম্যাজিস্ট্রেট তাদেরকে মুক্তি দেন। গুজান খান মনে বড়ো দুঃখ পায় এবং তার এক পুত্রকে সিত্তানায় গুপ্তচরবৃত্তির জন্যে পাঠিয়ে দেয়। গুজান খানের পুত্র জানায় যে থানেশ্বর নিবাসী জনৈক জাফর আলী সিত্তানায় মুজাহিদ ও রসদ পাঠানোর কাজ করেন। কর্তৃপক্ষ সংবাদ পাওয়া মাত্র জাফর আলী থানেশ্বরীর বাড়ী তল্লাশী করে এবং বহু সন্দেহজনক কাগজপত্র হস্তগত করে। জাফর আলী পলাতক হন, কিন্তু বহু মুজাহিদসহ আলীগড়ে ধরা পড়েন। তাঁদের জবানবন্দীতে জানা যায় যে, তারা সাদিকপুরের এলাহী বশের গুপ্তচর। এলাহী বশের খানা তল্লাসীর পরও সেখান থেকে বহু আপত্তিকর কাগজপত্র পাওয়া যায়।
এসব কাগজপত্র থেকে কর্তৃপক্ষ একটা ভয়ানক ষড়যন্ত্রের সন্ধান পায় এবং পাটনার ম্যাজিস্ট্রেট র্যাভেন শ'কে তদন্তের ভার দেয়া হয়। তদন্তের সাথে সাথে আহমদুল্লাহ সাহেবকে গ্রেফতার করা হয় এবং এবং চাকুরী থেকে বরখাস্ত করা হয়। চার মাস তদন্তের পর আহমদুল্লাহর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহিতা প্রভৃতি আট দফা চার্জ গঠন করে কারাগারে সুপর্দ করা হয়। বিচারে দায়রা জজ তাঁর মৃত্যুদন্ড দেন। এ দন্ডাজ্ঞার বিরুদ্ধে কোলকাতা আপীল দায়ের করা হয়। বিচারপতি টিভর এবং ও লক (Trevor and O. Lock J.J) ১৮৬৫ সালের ১৩ই এপ্রিল রায় প্রদান করেন। রায়ে তারা বলেন, "প্রাণদন্ডের আদেশ অনুমোদন না করে এই আদেশ দিলাম যে তার যাবজ্জীবন দীপান্তর হোক ও তার যাবতীয় বিষয়সম্পত্তি রাজসরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করা হোক।”
ঐ বছর জুন মাসেই তাকে আন্দামান পাঠানো হয় এবং প্রায় ষোল বছর বন্দী জীবন যাপনের পর ১৮৮১ খৃস্টাব্দে এই বীর মুজাহিদ সহাস্যে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন।
তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা ইয়াহ্ইয়া আলীরও যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর কারাদন্ড হয়েছিল এবং তিনি ইতিপূর্বেই আন্দামানে এন্তেকাল করেন। আহমদুল্লাহর অন্তিম ইচ্ছা ছিল সহোদরের পাশেই সমাহিত হতে। কিন্তু ইংরেজ সরকার তাঁর এ নির্দোষ ও অহিতকর ইচ্ছাটুকুও পূরণ করেনি।
সাদিকপুর পরিবারের বাসগৃহটি ছিল পাটনার অতি সম্ভ্রান্ত ও বিখ্যাত বাসগৃহ। বাসগৃহটি ভূমিসাৎ করে সেখানে পাটনার মিউনিসিপ্যাল মার্কেট নির্মিত হয়। এ নির্মাণকার্যের ব্যয় বহন করা হয় এ পরিবারের অন্যান্য সম্পত্তির বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়েই।
সাদিকপুরের এ সম্ভ্রান্ত ও প্রসিদ্ধ পরিবারটি আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে যেভাবে সমূলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলো, এবং অনুপম ত্যাগ ও কুরবানীর যে স্বাক্ষর এ পরিবারটি রেখে গেল, ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত বিরল। নারী ও শিশু নির্বিশেষে পরিবারের প্রতিটি সদস্য সরকারের কোপানলে তিলে তিলে দগ্ধিভূত হয়েছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপার এই যে, মুসলমানদের পবিত্র ও আনন্দময় ঈদের দিনে ইংরেজ সরকার আহমদুল্লাহর পরিবারকে বাসগৃহ থেকে শুধুমাত্র একবস্ত্রে ও খালি হাতে উৎখাত করে চরম আত্মতৃপ্তি লাভ করে। এমন পৈশাচিক নিষ্ঠুরতা ও অপরের ধর্মীয় উৎসব দিবসের এমন অবমাননা কোন সভ্য জাতির ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না। নিষ্পাপ শিশু ও নারীদের নীরব আর্তনাদ ও হাহাকার সেদিন আকাশ বিদীর্ণ করেছিল। আহমদুল্লাহ্ হয়তো তাই এ দিনটিকে স্মরণ করে নিম্নোক্ত শোকগাথাটি রচনা করেছিলেন:
চুঁশব-ই-ঈদ্রা সেহর করদান্দ্
হামারা আয মাকান বদর করদান্দ্
মায়া ইযায় সাযে মাতম্ সওদ্
ঈদ-ই-মাগুররা-ই-মুহররম সওদ্।
-ঈদের রাতের শেষে যখন ঊষার আলোক প্রতিভাত হলো, তখন আমরা সব বিতাড়িত হলাম আপন গৃহ থেকে। আনন্দের সব উচ্ছ্বাস শোকের রূপ ধারণ করলো- আমাদের ঈদ মুহররমের কারবালায় পরিণত হলো।
পৈশাচিকতার এখানেই শেষ নয়। সাদিকপুর পরিবারের সুবৃহৎ পারিবারিক কবরস্থানটি চাষ দিয়ে উৎখাত করা হয় এবং হিন্দুদের মধ্যে বন্দোবস্ত করে দেয়া হয়।
টিকাঃ
১. ওহাবী আন্দোলন, আবদুল মওদূদ, পৃঃ ১৯৮-২০০
📄 মওলানা ইহাহ্ইয়া আলী
মওলানা ইয়াহ্ইয়া আলী ছিলেন বিপ্লবী আহমদুল্লাহ্র জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। সাইয়েদ আহমদ শহীদ বেরেলভীর অসম্পূর্ণ কাজকে পূর্ণ রূপ দেয়ার জন্যে ভারতের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত মুজাহিদগণের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে যেভাবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন জাগ্রত রেখেছিলেন তা এক অতি বিস্ময়কর ব্যাপার। এ কাজের জন্যে তিনি আপন জীবন ও ধন সম্পদ খোদার পথে বিসর্জন দিয়েছিলেন। বলতে গেলে সাইয়েদ সাহেবের শাহাদাতের পর মাওলানা ইয়াহইয়া আলীই মুজাহিদগণের আধ্যাত্মিক নেতা বা ইমাম ছিলেন। ১৮৬৪ সাল পর্যন্ত জেহাদী আন্দোলন পরিচালনা করার পর তিনি অন্যান্যের সাথে ব্রিটিশ বিরোধী ষড়যন্ত্র মামলার আসামী হন।
হান্টার তাঁর গ্রন্থে বলেন, "প্রধান ইমাম ইয়াহ্ইয়া আলীর উপর বহুবিধ কাজের দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল। ভারতে ওয়াহাবী সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক পরিচালক হিসাবে তাঁকে অধীনস্থ প্রচারকদের সাথে নিয়মিত পত্রালাপ করতে হতো। তাঁকে এক ধরনের গোপন ভাষায় চিঠি তৈরী করতে হতো এবং এ গোপন ভাষাটা তাঁরই আবিষ্কার। প্রচুর অর্থ সীমান্তের বিদ্রোহী শিবিরে নিয়মিত পাঠাবার ব্যবস্থাটাও তাঁকেই পরিচালনা করতে হতো। মসজিদে নামাজের ইমামতি করা, ধর্মান্ধ ব্যক্তিদের রাইফেলগুলি পরীক্ষা করে তাদের হাতে তুলে দেয়া, ছাত্রদের মাঝে ধর্মীয় বক্তৃতা করা এবং ব্যক্তিগত পড়াশুনার মাধ্যমে আরবী ধর্মগুরুদের প্রবর্তিত তত্ত্বজ্ঞান আরো গভীরভাবে রপ্ত করা এ সবই ছিল তাঁর কর্মসূচীর অন্তর্গত।”
বলতে গেলে তিনি ছিলেন একাধারে মুজাহিদ বাহিনীর পরিচালক, তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দাতা, মসজিদের ইমাম, এলমে তাসাওউফের মুর্শেদ এবং যুদ্ধ পরিচালনার জন্যে সংকেত-পদ্ধতির আবিষ্কারক। আঠারো শ' চৌষট্টি সালের জুলাই মাসে আম্বালার সেশন জজ স্যার হার্বার্ট এডওয়ার্ডস্ যে রায় প্রদান করেন তার বরাত দিয়ে হান্টার বলেন, "ভারতে অর্ধচন্দ্রের (ইসলামী) শাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে পাটনার মসজিদে তিনি (ইয়াহ্ইয়া আলী) ধর্ম বিষয়ক প্রচারণায় নিয়োজিত ছিলেন। অর্থ সংগ্রহ এবং মুসলমানদের জিহাদ পরিচালনার জন্য তিনি বহু সংখ্যক অধঃস্তন এজেন্ট নিযুক্ত করেন।”
তিনি আরো বলেন, "মামলার বিচারকার্য থেকে তিনটি সর্বাধিক বিস্ময়কর ব্যাপার উদঘাটিত হয় তা হ'চ্ছে- ব্যাপক এলাকা জুড়ে সংগঠন গড়ে তোলার ব্যাপারে সংগঠকদের বিচক্ষণতা, কর্মতৎপরতা পরিচালনাকালে গোপনীয়তা রক্ষায় কর্মীদের দক্ষতা, এবং তাঁদের পরস্পরের প্রতি সার্বিক বিশ্বস্ততা। তাদের সাফল্যের মূলে অনেকাংশে ছিল ছদ্মনাম গ্রহণের ব্যবস্থা এবং সংবাদ আদান প্রদানের জন্যে এক ধরনের গুপ্ত ভাষার প্রবর্তন।
এ মামলার আসামী ছিলেন মোট এগারোজন। আন্দোলনের অগ্রনায়ক যারা ছিলেন তাদের বিচারে প্রাণদন্ড হয়। কিন্তু এই প্রাণদন্ডাদেশ তাঁরা এমন সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে যে তা ব্রিটিশ সরকারকে বিস্মিত করে। কারণ এসব মুজাহেদীনের জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে দৃষ্টিভংগী ছিল শাসকদের দৃষ্টিভংগী থেকে ভিন্নতর। আল্লাহর পথে শাহাদত বরণকে তাঁরা জীবনের বড়o সাফল্য বলে দৃঢ়প্রত্যয় রাখতেন। তাই প্রদেশের সর্বোচ্চ আদালত তাদের প্রাণদন্ড মওকুফ করে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে পরিবর্তিত করেন। হান্টার সাহেব উপরোক্ত সত্যটি স্বীকার করে বলেন, "ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে অগ্রনায়ক যাঁরা ছিলেন এমনকি তাঁদেরকে, শহীদ হবার সুযোগ না দিয়ে ব্রিটিশ সরকার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন।"
এ মামলার আসামী যাঁরা ছিলেন তাঁরা হচ্ছেন:
মওলানা ইয়াহ্ইয়া আলী, পাটনার, প্রচার কেন্দ্রের কোষাধ্যক্ষ আবদুল গাফ্ফার, জাফর থানেশ্বরী, ব্রিটিশ সেনানিবাসে মাংস সরবরাহকারী কন্ট্রাক্টর মুহাম্মদ শফি, আবদুর রহীম, এলাহী বশ্, মুহাম্মদ হুসাইন, কাজী মিঞাজান, আবদুল করিম, থানেশ্বরের হুসাইনী এবং আবদুল গাফ্ফার (২)।
পাঁচ নম্বর আসামী আবদুর রহীমের বাড়ীতে বাঙালী মুজাহিদগণ জমায়েত হ'য়ে অবস্থান করতেন। খাদেম তাঁদের টাকা পয়সা জমা রাখতো, খাওয়া দাওয়া করাতো, খাতির তাজিম করতো এবং বিদায়ের সময় টাকা পয়সা ফেরৎ দিত। ইয়াহইয়া আলী তাঁদেরকে জেহাদী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করতেন।
এলাহী বখ্শ্ সংগৃহীত তহবিল জা'ফর থানেশ্বরীর কাছে পাঠাতেন এবং তিনি তা মুল্কায় ও সিত্তানায় বিদ্রোহী শিবিরে পাঠাতেন।
পাটনার মুহাম্মদ হুসাইন ছিলেন এলাহী বশের খাদেম, তিনি স্বর্ণ মোহর আস্তিনের মধ্যে সিলাই করে পাটনা থেকে দিল্লী যান এবং নির্দেশ মুতাবেক জাফর থানেশ্বরীর কাছে হস্তান্তর করেন।
কাজী মিঞাজান মুজাহিদ সংগ্রহের কাজ করতেন, অর্থ সংগ্রহ করে পাঠানো এবং চিঠিপত্র আদান প্রদানের কাজও তিনি করতেন।
আবদুল করিম ছিলেন মাংস সরবরাহকারী মুহাম্মদ শফির গুপ্তচর। তিনিও পাটনা থেকে টাকা কড়ি বহন করে নিয়ে যেতেন। মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরী তাঁর 'তাওয়ারীখ-ই-আজীব' গ্রন্থে বলেছেন, মিঞাজান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী নিবাসী ছিলেন। তিনি জেলখানায় মৃত্যুবরণ করেন।
থানেশ্বরের হুসাইনী- মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরী ও মুহাম্মদ শফির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। একদিন ২৯০টি স্বর্ণ মোহর মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরীর নিকট থেকে বহন করে নিয়ে মুহাম্মদ শফির নিকটে যাবার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন。
মওলানা ইয়াহ্ইয়া আলী আন্দামানে যাবজ্জীবন কারাদন্ড ভোগের সময় তথায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এভাবে ভারতে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম অগ্রনায়কের ইংরেজ শাসকদের নিপীড়নের মধ্যে জীবনাবসান হয়。
মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত তিনজনের মধ্যে (মওলানা ইয়াহ্ইয়া আলী, হাজী মুহাম্মদ শফি ও মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরী) জাফর থানেশ্বরী অন্যতম। তিনি থানেশ্বরের একজন অতি প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর মৃত্যুদন্ড মওকুফ করে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়। তিনি আঠারো বৎসর আন্দামানে কারাদন্ড ভোগ করার পর দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি তাওয়ারীখ-ই-আজীব নামক একখানা গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তাঁর দীর্ঘ আন্দামান জীবনের অভিজ্ঞতা, কয়েদীদের প্রতি অমানুষিক ব্যবহার, ১৮৫৭ সালের আযাদী আন্দোলনের এবং জেহাদী আন্দোলনের বহু মূল্যবান তথ্য এই গ্রন্থে তিনি সন্নিবেশিত করেছেন। তিনি তাঁর গ্রন্থে ১৮৬৩ সালের আম্বালা যুদ্ধের এক চমদপ্রদ বর্ণনা প্রদান করেন। তিনি বলেনঃ
"১৮৬৩ খৃস্টাব্দ। ভারতের পশ্চিম সীমান্তে ব্রিটিশ সরকারের একান্ত জবরদস্তির ফলে এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। জেনারেল চ্যাম্বারলেন ছিলেন ইংরেজ পক্ষের সেনাপতি। আম্বালার ঘাঁটিতে তাঁর বাহিনীকে যথেষ্ট দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ পররাজ্য আক্রমণ ও সীমালংঘনেরই শামিল। সেজন্যে সোয়াতের বিখ্যাত পীর সাহেবও বহু সংখ্যক শিষ্য নিয়ে মুসলিম মুজাহিদ বাহিনীর সাহায্যের উদ্দেশ্যে ইংরেজ সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। আফগানরা দেশ ও জাতির ইজ্জৎ রক্ষার উদ্দেশ্যে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ভীষণ যুদ্ধ চলতে থাকে। স্বয়ং জেনারেল চ্যাম্বারলেন গুরুতর জখম হন। প্রায় সাত হাজার ইংরেজ সৈন্য হতাহত হয়। মুজাহিদ বাহিনীকে সমূলে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই ব্রিটিশ সরকার পররাজ্যের অভ্যন্তরে হলেও এ অভিযান প্রেরণ করে। মুজাহিদগণের সংকল্প হচ্ছে, হয় বিজয় নয় শাহাদাৎ। তাঁরা বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনে লেগে যান। কাজেই যুদ্ধ প্রচন্ড আকার ধারণ করে।
এদিকে ভারতের ভাইস্রয় লর্ড এলগিন নিজের অযৌক্তিক কার্যকলাপ ও অন্যায় আক্রমণের পরিণাম ফলের মর্মজ্বালায় কুম্বনের পর্বতশিরে অকস্মাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হন। ভারত বর্ষ রাজপ্রতিনিধিহীন হ'য়ে পড়ে।
যুগপৎ যুদ্ধ ও ভাইসরয়ের মৃত্যু নিঃসন্দেহে সংকট সৃষ্টি করে। এমনি সময়ে আঠারো শ' তেষট্টি সালের এগারোই ডিসেম্বর তারিখে কর্ণাল জেলার পানিপথ চৌকির ভারপ্রাপ্ত অশ্বারোহী পাঠান পুলিশ গুজান খান কোন সূত্রে মুজাহিদ বাহিনীর সাথে আমার যোগসূত্র জানতে পারে। সে স্বভাবতঃই একে পদোন্নতির এক সুবর্ণ সুযোগ মনে করে। তখন সে এক দীর্ঘ বিবৃতিতে কর্ণালের ডিপুটি কমিশনারকে তা জানিয়ে দেয়। সে জানায়, সীমান্তে মুজাহিদ বাহিনীর সাথে যে ভয়াবহ সংগ্রাম চলছে, তাতে থানেশ্বর শহরের নম্বরদার মুহাম্মদ জাফর টাকা ও লোক দিয়ে সাহায্য করে থাকে। ডিপুটি কমিশনার খবর পাওয়া মাত্র আম্বালা জেলার কর্তৃপক্ষকে, যার অধীনে থানেশ্বর শহর অবস্থিত, টেলিগ্রামযোগে এ সংবাদ জানিয়ে দেয়। সংবাদদাতা বেরিয়ে আসবার সংগে সংগেই আমার জনৈক পুলিশ বন্ধু ডিপুটি কমিশনারের বাংলোতে যান। তিনি তাঁর কাছে গোপন সংবাদটি জানতে পেরে আমাকে অবহিত করার জন্যে একজন পুলিশ অফিসারকে পাঠান, আমি তখন ঘুমিয়ে পড়েছি বলে তিনি পরদিন প্রাতে জানাবেন মনে করে চলে যান। দুর্ভাগ্যের বিষয় আমার পুলিশ বন্ধুটি আশার পূর্বেই আমার বাড়ী ঘেরাও করে ফেলে পুলিশ সুপার ক্যাপ্টেন পার্সন।” [১]
টিকাঃ
১. তাওয়ারীখ-ই-আজীব, বাংলা অনুবাদ 'আন্দামান' বন্দীর আত্মকাহিনী, পৃঃ ১-২
📄 মওলানা ইমামুদ্দীন
বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার সদর থানার অধীন হাজীপুর (সাদুল্লাপুর) গ্রামে মওলানা ইমামুদ্দীন জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাল্যকালে বিদ্যাশিক্ষার জন্যে কোলকাতা গমন করেন এবং সেখান থেকে শাহ আবদুল আযীয দেহলবীর নিকট শিক্ষাগ্রহণের জন্যে দিল্লী গমন করেন। দিল্লী অবস্থানকালে সাইয়েদ আহমদ শহীদের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ লাভ হয়। কিন্তু তখন তিনি তাঁর দীক্ষা গ্রহণ করেননি। পরবর্তীকালে লক্ষ্ণৌ শহরে পুনরায় তাঁর সাইয়েদ আহমদের সাথে সাক্ষাৎ হয়। এবার তিনি তাঁর হাতে 'বয়আত' গ্রহণ করে মুজাহিদ বাহিনীতে যোগদান করেন, কিছুকাল পরে সাইয়েদ সাহেব তাঁকে তাঁর খলিফা পদে বরণ করেন।
সাইয়েদ সাহেব যখন হজ্বের উদ্দেশ্যে হেজাজ গমন করেন তখন মওলানা ইমামুদ্দীন কোলকাতায় স্বীয় মুর্শেদের নিকটে বিদায় নিয়ে বৃদ্ধ পিতার সংগে সাক্ষাতের জন্যে নোয়াখালী যান। অতঃপর তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা আলীমুদ্দীন এবং ত্রিশ চল্লিশজন লোকসহ হেজাজ গমন করে সাইয়েদ সাহেবের কাফেলার সাথে মিলিত হন।
হজ্বের পর তিনি জেহাদ অভিযানে শরীক হন এবং বালাকোট প্রান্তরেও সাইয়েদ সাহেবের সাথী হন। যুদ্ধে তাঁর ভাই আলীমুদ্দীন শহীদ হন এবং তিনি গাজীরূপে প্রত্যাবর্তন করেন। বালাকোট বিপর্যয়ের পর টংকের নবাব ওয়াজিরুদ্দৌলার আমন্ত্রণে তিনি টংক রাজ্যে গমন করেন। নবাব সাহেব তাঁর নিকটে বহু বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন।
📄 সূফী নূর মুহাম্মদ নিযামপুরী
সূফী নূর মুহাম্মদ চট্টগ্রাম নিবাসী ছিলেন, তাঁর বিস্তারিত জীবনী জানা না গেলেও তিনি ছিলেন সাইয়েদ আহমদ শহীদের অন্যতম খলিফা। তিনি যথারীতি মুজাহিদ বাহিনীতে যোগদান করেন, সাইয়েদ সাহেবের কাফেলাভুক্ত হ'য়ে হজ্জব্রত পালন করেন এবং জেহাদ অভিযানে শেষ পর্যন্ত সাইয়েদ সাহেবের সাথে অংশগ্রহণ করেন। বালাকোটের যুদ্ধের পর তিনিও গাজী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।
পশ্চিমবংগের বিখ্যাত পীর শাহ সূফী ফতেহ আলী সাহেব সূফী নূর মুহাম্মদের নিকট এলমে তাসাওউফের দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। সূফী ফতেহ আলী সাহেবের মাজার কোলকাতার মানিকতলায় অবস্থিত। তাঁর খলিফা ও স্থলাভিষিক্ত ছিলেন হুগলী জেলার ফুরফুরা নিবাসী মওলানা শাহ সূফী আবু বকর সিদ্দিকী।