📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 শাহ ওয়ালিউল্লাহ (র)

📄 শাহ ওয়ালিউল্লাহ (র)


বাদশাহ আওরঙজেব আলমগীরের মৃত্যুর চার বৎসর পূর্বে ১৭০৩ খৃস্টাব্দে শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ দিল্লী নগরীতে এক অতি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শাহ্ 'মাবদুর রহীম ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। শাহ্ ওয়ালিউল্লাহর পূর্বপুরুষ ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুকের (রা) বংশধর।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণ করেন তাঁর পিতা শাহ্ আবদুর রহীমের নিকটে। পরে তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে বার বছর যাবত শিক্ষকতা করেন। অতঃপর তিনি আরবে গমন করেন এবং মক্কা মদীনায় সুদীর্ঘকাল কাটান। মক্কা মদীনা অবস্থানকালে শাহ্ সাহেব ইজতেহাদের উপযোগী গুণাবলী ও যোগ্যতা অর্জন করেন। শিবলী বলেন, ইবনে রুশদ ও ইমাম ইবনে তাইমিয়ার পর মুসলিম জগতের যে চরম অবনতি ঘটেছিল, তাকে পুনরায় উজ্জীবিত করেন শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ)। দীর্ঘকাল যাবত কোরআন-হাদীস ও ইসলামের বিভিন্ন বিষয় অধ্যয়ন, গবেষণা এবং বিশেষ করে মক্কা মদীনা সফরের ফলে লব্ধ প্রেরণাই তাঁকে বিপ্লবী আন্দোলন শুরু করার জন্যে সচেষ্ট করে তুলেছিল।
আওরঙজেবের মৃত্যুর পর যে অরাজকতা ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়েছিল যার ফলে ধীরে ধীরে মোগল সাম্রাজ্য তথা ভারতে মুসলিম সুলতানাত ধূলিসাৎ হ'য়ে গেল এবং ইংরেজ বণিক বেশে এ দেশে আগমন করে ক্রমশঃ এ দেশের মালিক-মোখতার হ'য়ে গেল, এসব কিছুর পট পরিবর্তন হলো শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ চোখের সামনে। এ দৃশ্য শাহ্ সাহেবকে অত্যন্ত ব্যথিত ও পীড়িত করেছিল। তিনি পরিপূর্ণরূপে উপলব্ধি করেন যে, মুসলমানদের এ অধঃপতনের প্রধান কারণ হলো তাদের নৈতিক ও ধর্মীয় অধঃপতন।
ইসলাম সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ ও চিন্তা গবেষণার ফলে তাঁর মনোজগতে ইসলামী রাষ্ট্রের এক রূপরেখা প্রতিভাত হয়েছিল। কিন্তু তিনি পরিপূর্ণরূপে উপলব্ধি করেন যে, প্রকৃত যোগ্যতা ও গুণাবলীর অধিকারী না হওয়া পর্যন্ত শুধু বাহুবলে কোন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আর যদি তা কখনো সম্ভবও হয়, তাকে টিকিয়ে রাখা কিছুতেই সম্ভব নয়। ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে সত্যিকার ইসলামী জ্ঞান ও চরিত্রের লোক তৈরী হলো পূর্বশর্ত। কিন্তু এ ধরনের গুণাবলী ও যোগ্যতা সম্পন্ন লোকের শুধু অভাবই ছিল না, বরঞ্চ মুসলমানরা নানাবিধ জাহেলী বা অনৈসলামী কুসংস্কার জালে ছিল আবদ্ধ। এ বেড়াজাল থেকে মুসলিম সমাজকে মুক্ত করার জন্যে তিনি সর্বপ্রথমে আত্মনিয়োগ করলেন ইসলামী সংস্কার আন্দোলনে। তাঁর আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী সংস্কার সাধন করে ইসলামকে তার প্রাথমিক পবিত্রতা ও জীবনীশক্তিতে ফিরিয়ে আনা এবং দেশের ক্রমবর্ধমান ইংরেজ শক্তিকে ধ্বংস করে পুনরায় ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করা। এ জন্যে শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ আরবের মুজাদ্দিদ ও মুজাহিদ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাবের ন্যায় মুসলমানদের অনৈসলামী রীতি-নীতি, কুসংস্কার ও অনাচারের মূলোচ্ছেদের চেষ্টা করেন।
শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ লক্ষ্য করেছিলেন, শরীয়তে-ইসলামের প্রতি তাসাওউত্পন্থী সূফীদের উদাসীনতা ও অবজ্ঞা ইসলাম ও মুসলিম সমাজের জন্যে ছিল ক্ষতিকর, তাদের আচরিত বহু অনাচারের ও প্রচারিত ইসলাম বিরুদ্ধ মতবাদের অনুপ্রবেশ মুসলিম ধর্ম জীবনকে করে রেখেছিল কলুষিত ও বিকৃত। ব্যবসায়ী সূফীদের প্রাদুর্ভাব ও পীরপূজা-কবরপূজার প্রথাও ক্রমাগত বেড়েই চলেছিল। ওয়ালিউল্লাহ্ অবশ্য তাসাওউফের উচ্ছেদ চাননি, তিনি চেয়েছিলেন তার পূর্ণ সংস্কার ও পরিশুদ্ধি। তিনি সূফীবাদকে সংস্কার করে তাকে করতে চেয়েছিলেন কল্যাণমুখী। পেশাদার পীর, ফকীর, কবরপূজা, কেরামতি প্রভৃতির বিরুদ্ধে তার ওসিয়তনামায় বহু অকাট্য যুক্তি ও নির্দেশ আছে।
শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ এক শান্তিপূর্ণ ও নিরুপদ্রব পরিবেশে লোকচরিত্র গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তাঁর সংস্কার আন্দোলন বা গঠনমূলক কাজ শুরু করেন। তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে একাধারে মুসলিম সমাজের ত্রুটিবিচ্যুতি ও কুসংস্কারগুলির প্রতি অংগুলি নির্দেশ করেন এবং অপর পক্ষে তাদের সঠিক কর্মপন্থাও সুস্পষ্ট করে তোলেন। তিনি বহু মূল্যবান গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তার মধ্যে ফল কবীর, 'হুজ্জাতুল্লাহেল্ বালেগা' প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি মৃত, ঘুমন্ত ও পথভ্রষ্ট জাতিকে লেখনীর বেত্রাঘাতে জীবন্ত ও জাগ্রত করে সঠিক পথে চালাবার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। ১৭৬২ খৃস্টাব্দে এ প্রতিভাবান মনীষী ইহলোক ত্যাগ করেন।

📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 শাহ আবদুল আযীয (র)

📄 শাহ আবদুল আযীয (র)


শাহ ওয়ালিউল্লাহর এন্তেকালের পর তাঁর সুযোগ্য জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহ্ আবদুল আযীয (১৭৪৬-১৮২৩ খৃঃ) তাঁর প্রদর্শিত পথ ধরে সম্মুখে অগ্রসর হন। ভারতীয় আলেম সমাজের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি এ দেশকে নির্ভয়ে 'দারুল হরব' বলে ফতোয়া জারী করেন। বিধর্মী ইংরেজ শাসিত দেশে মুসলমানদের সামাজিক ও দ্বীনি অবস্থা কী হবে- এ প্রশ্নটি মুসলমানদের মনমস্তিস্ককে আলোড়িত করে রেখেছিল। বীর মুজাহিদ শাহ্ আবদুল আযীয উদাত্ত কণ্ঠে ও অকুতোভয়ে ঘোষণা করলেন যে, অনৈসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাধীন ভারত হ'চ্ছে 'দারুল হরব'। এখানে নিশ্চিন্তে ও সন্তুষ্টচিত্তে মুসলমানদের বসবাস করা ঈমানের পরিপন্থী। হয় তাদেরকে জেহাদ করে এ দেশকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে, অন্যথায় হিজরত করে অন্যত্র গমন করতে হবে। তাঁর এ ঘোষণা মুসলমানদের মনেপ্রাণে জেহাদের এক দুর্দমনীয় প্রেরণার হিল্লোল প্রবাহিত করে।
স্বৈরাচারীর প্রভাব থেকে মুসলিম ভারতকে মুক্ত করার আকুল আগ্রহে শাহ্ আবদুল আযীয প্রবর্তন করেন 'তারগীবে মুহাম্মদীয়া' নামে সমাজ সংস্কারক আন্দোলন। এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল- যেসব ইসলাম বিরুদ্ধ রীতিনীতি, আচার অনুষ্ঠান ও কুসংস্কার মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে তার মূলোচ্ছেদ করে মুসলমানদেরকে প্রকৃত ইসলামী শিক্ষাদর্শে উদ্বুদ্ধ করে তোলা। এক সুপরিকল্পিত পদ্ধতিতে শাহ্ সাহেব, সারা ভারতে এ আন্দোলন পরিচালনা করেন এবং এ কাজে নিয়োগ করেন তাঁরই নিকটে শিক্ষাপ্রাপ্ত একদল নিঃস্বার্থ ও অক্লান্তকর্মা লোক। কালক্রমে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এ 'তারগীবে মুহাম্মদীয়া' আন্দোলন একটি জিহাদী আন্দোলনের রূপ গ্রহণ করে এবং অত্যাচারী শিখ ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে আযাদীর আন্দোলন শুরু করে। এ আন্দোলনকে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন সাইয়েদ আহমদ শহীদ বেরেলভী এবং তাঁর প্রধান সহকর্মী ছিলেন শাহ সাহেবের ভাইপো শাহ্ ইসমাইল শহীদ ও জামাতা মওলানা আবদুল হাই।

📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 শাহ ওয়ালিউল্লাহর বংশতালিকা

📄 শাহ ওয়ালিউল্লাহর বংশতালিকা


শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ (১৭০৩-৬২ খৃঃ)
শাহ্ আব্দুল আযীয
শাহ্ রফীউদ্দীন
শাহ্ আবদুল কাদের
শাহ্ আবদুল গনী
শাহ্ মাহফুজুল্লাহ্
শাহ্ ইসমাইল
মওলানা আব্দুল হাই (জামাতা)
মওলানা ইসহাক
মওলানা ইয়াকুব

📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 সাইয়েদ আহমদ শহীদ

📄 সাইয়েদ আহমদ শহীদ


উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে সমগ্র ভারতব্যাপী এক বিরাট সুসংগঠিত স্বাধীনতা আন্দোলন গড়ে উঠে। এ আন্দোলন পরিচালিত হ'য়েছিল একমাত্র ভারতীয় মুসলমানদের দ্বারাই। এ আন্দোলনের প্রাণশক্তি ছিলেন সাইয়েদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (রহ)। এ আন্দোলনকে ইতিহাসে 'ওহাবী আন্দোলন' বলে আখ্যায়িত করা হ'য়েছে অথচ এ ছিল একাধারে ইসলামী ও আযাদী আন্দোলন। এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল আসমুদ্রহিমাচলে একটি অখন্ড স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র-গড়ে তোলা। কিন্তু কতিপয় লোকের চরম বিশ্বাসঘাতকতার দরুন অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব হয়নি। তথাপি এ আন্দোলন আগাগোড়া যেরূপ গোপনে ও সুনিপুণ কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হয়, তা কল্পনাকেও বিস্মিত ও স্তম্ভিত করে দেয়।
সাইয়েদ আহমদ ৬ই সফর ১২০১ হিজরী (ইং ১৭৮৬) এলাহাবাদের রায় বেরেলীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জীবনী লেখকগণ তাঁর জন্ম সংক্রান্ত এক বিস্ময়কর ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তিনি যখন মাতৃগর্ভে তখন তাঁর পূণ্যময়ী জননী স্বপ্নে দেখেন যে, তাঁর রক্তে লেখা একখানি কাগজ পত পত করে উড়ে বেড়াচ্ছে। তাঁর জনৈক নিকটআত্মীয় স্বপ্নের কথা শুনে বল্লেন, চিন্তার কারণ নেই। আপনার গর্ভ থেকে যিনি জন্মগ্রহণ করবেন তিনি হবেন ইতিহাসের একজন অতি খ্যাতনামা ব্যক্তি। [১]
এ স্বপ্ন অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছে। সাইয়েদ আহমদ শহীদ ও তাঁর অনুসারীদের তাজা খুনে বাংলাদেশ থেকে বালাকোট পর্যন্ত ভারতভূমি রঞ্জিত হয়েছে। তাঁদের সে রক্তলেখা স্মৃতি পরবর্তী এক শতাব্দী কাল পর্যন্ত মুসলমানদেরকে অবিরাম জেহাদী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করেছে, যার পরিসমাপ্তি ঘটেছে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে— বিদেশী ও বিধর্মী শাসন-শোষণের নাগপাশ থেকে মুসলমানদেরকে মুক্ত করে।
সাইয়েদ আহমদের বয়স যখন চার বৎসর চার মাস চারদিন তখন সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের প্রথা অনুযায়ী তাঁকে মকতবে পাঠানো হয়। কিন্তু শিশু সাইয়েদ আহমদের শিক্ষার প্রতি কোন অনুরাগই ছিল না।
গোলাম রসূল মেহের বলেন, শৈশবে কেন যে তিনি শিক্ষার প্রতি অনীহা প্রকাশ করতেন তা বলা মুস্কিল। তবে পরবর্তীকালে দেখা গেছে যে, তিনি ফারসী ভালোমত রপ্ত করে ফেলেছিলেন এবং অনর্গল এ ভাষায় কথা বলতে পারতেন। আরবী ভাষাও এতটা শিখেছিলেন যে "মেশকাতুল মাসাবীহ্” নিজে নিজেই পড়তে পারতেন। 'হাফেজ', 'বেদেল' এবং অন্যান্য কবিদের কবিতা বলতে পারতেন। কিন্তু তথাপি পরিবারের ঐতিহ্য অনুযায়ী তাঁর বাল্যশিক্ষা সন্তোষজনক ছিল পণ্ডিত। তাঁর বড়ো ভাই সাইয়েদ ইব্রাহীম ও সাইয়েদ ইসহাক তাঁর পড়াশুনার জন্যে যথেষ্ট তাকীদ করতেন। কিন্তু পিতা নৈরাশ্য সহকারে বলতেন, "বিষয়টি তার উপরেই ছেড়ে দাও।”
পরবর্তীকালে তিনি দিল্লী গমন করলে, শাহ্ আবদুল আযীয আকবরাবাদী মসজিদে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করেন এবং তাঁর শিক্ষার জন্যে শাহ আবদুল কাদেরকে নিযুক্ত করেন। সাইয়েদ আহমদ তাঁর কাছে আরবী ও ফার্সী শিক্ষা করতেন। একথা ঠিক যে, শাহ ইসমাইল অথবা মওলানা আবদুল হাই এর মতো বিদ্যালয় থেকে শিক্ষাগত যোগ্যতা তিনি লাভ করতে পারেন নি, কিন্তু আরবী ও ফার্সী বলতেও পারতেন এবং সহজেই বুঝতে পারতেন।
মৌলভী সাইয়েদ জাফর আলী নক্সী বলেন, শাহ্ ইসমাইল প্রতিদিন ফজর নামাজের পর হাদীস ব্যাখ্যা করে শুনাতেন। সাইয়েদ সাহেবও কোন কোন হাদীসের গুরুত্ব বর্ণনা করতেন এবং শ্রোতাগণ এর থেকে বিশেষ উপকৃত হতেন। [২]
বাল্যকাল থেকেই সাইয়েদ আহমদ শরীর চর্চায় অভ্যস্থ ছিলেন এবং তিনি ছিলেন অসাধারণ দৈহিক শক্তির অধিকারী। শৈশবকাল থেকে তাঁর মধ্যে জেহাদের প্রেরণা জাগ্রত ছিল এবং তিনি প্রায় সমবয়সীদের সামনে বলতেন- 'আমি জেহাদ করব' 'আমি জেহাদ করব'। সকলেই এটাকে শিশুসুলভ প্রগল্ভ উক্তি মনে করতো। কিন্তু তাঁর মা শিশুর এ উক্তিকে সত্য বলে বিশ্বাস করতেন।
গোলাম রসুল মেহের 'তাওয়ারিখে আজমিয়ার' বরাত দিয়ে বলেন, বালক সাইয়েদ আহমদ বস্তীর বালকদের মধ্য থেকে একটি 'লশকরে ইসলাম' দল গঠন করতেন এবং উচ্চস্বরে জেহাদী শ্লোগানসহ একটি কল্পিত 'লশকরে কুফফার' এর উপর আক্রমণ চালাতেন এবং 'ইসলামী সেনাদল' জয়লাভ করলো এবং 'কাফের সেনাদল' হেরে গেল বলে চীৎকার করে আকাশ বাতাস মুখরিত করতেন। [৩]
এভাবে একদিকে 'ইসলামী সৈন্য' এবং অপরদিকে 'অমুসলিম সৈন্য' কল্পনা করে আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণ চালিয়ে বাল্যকাল থেকেই সাইয়েদ আহমদ জেহাদীমনা হয়ে গড়ে উঠেছিলেন যার প্রতিফল ঘটেছিল পরবর্তীকালে তাঁর বাস্তব জীবনে।
আঠারো বৎসর বয়সে সাইয়েদ আহমদ আটজনের একটি দলসহ লক্ষ্ণৌ গমন করেন। অন্যান্যদের উদ্দেশ্য ছিল জীবিকা অন্বেষণ করা। কিন্তু সাইয়েদ সাহেবের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্নতর। চার মাস লক্ষ্ণৌ অবস্থানের পর তিনি সাথীদেরকে চাকুরীর বাসনা পরিত্যাগ করে দিল্লীতে ইমামুল হিন্দ শাহ্ আবদুল আযীযের নিকটে আধ্যাত্মিক দীক্ষা গ্রহণের জন্যে উদ্বুদ্ধ করেন। অতঃপর পায়ে হেঁটে কয়েকদিনের মধ্যে শাহ্ সাহেবের দরবারে উপনীত হন এবং তাঁর হস্তে বয়আত গ্রহণ করে মুরীদ হন।
উপরে বর্ণিত হয়েছে, আকবরাবাদী মসজিদে অবস্থান করতঃ সাইয়েদ আহমদ একাধারে কোরআন হাদীস ফেকাহ প্রভৃতিতে জ্ঞান লাভ এবং শাহ্ আবদুল আযীযের নিকটে আধ্যাত্মিক দীক্ষা লাভ করতে থাকেন। এভাবে শিক্ষাদীক্ষা লাভ করে পাঁচ বৎসর পর সাইয়েদ আহমদ তাঁর জন্মস্থান রায় বেরেলী প্রত্যাবর্তন করেন। তখন তিনি তেইশ বছরে পদার্পণ করেছেন মাত্র। এ সময়ে তিনি সাইয়েদা যোরা নাম্নী এক সম্ভ্রান্ত বংশীয়া বালিকাকে বিবাহ করেন। পরের বছর তিনি একটি কন্যা সন্তান লাভ করেন। কিন্তু শৈশবকাল থেকেই যে জেহাদী প্রেরণা তিনি হৃদয়ে পোষণ করছিলেন, সে প্রেরণা তাঁকে ঘরের মায়া মোহ ও প্রেমে বেঁধে রাখতে পারলো না। তিনি গৃহ ত্যাগ করে নবাব আমীর খানের সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আমীর খানকে জেহাদে উদ্বুদ্ধ করে তাঁর সহায়তায় একটি মুজাহিদ বাহিনী গঠন করবেন। তিনি সাত বছর আমীর খানের সেনাবাহিনীতে থাকার পর নিরাশ হয়ে তাঁর সংগ পরিত্যাগ করেন। যাদের বিরুদ্ধে তাঁর জেহাদের পরিকল্পনা, সেই ইংরেজদের সাথে সন্ধিসূত্রে আমীর খান আবদ্ধ হলেন বলে তাঁর আশা-আকাংখা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। তিনি শাহ্ আবদুল আযীযের নিকটে যে পত্র দেন তা নিম্নে উদ্ধৃত হলো-
"এখানে সেনাবাহিনী গঠনের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। নবাব সাহেব ইংরেজদের সাথে মিলিত হয়েছেন। এখানে থাকার আর কোন উপায় নেই।” [৪]
নবাব আমীর খানের সেনাবাহিনী পরিত্যাগ করে সাইয়েদ সাহেব পুনরায় শাহ্ আবদুল আযীযের খেদমতে হাজীর হন। তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল মুসলমানদেরকে সত্যিকার মুসলমান হিসাবে গড়ে তোলা, প্রথম যুগের মুসলমানদের মধ্যে যে ধরনের জেহাদী প্রেরণা জাগ্রত ছিল তা পুনর্বার উজ্জীবিত করা এবং ভারতে একটি প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করা।
সাইয়েদ সাহেব আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে এতো উচ্চস্থান অর্জন করেছিলেন যে, মৌলভী মুহাম্মদ ইউসূফ, শাহ ইসমাইল ও মওলানা আবদুল হাই এর মতো শাহ ওয়ালিউল্লাহ্ খান্দানের উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিগণ তাঁর হস্তে বয়আত গ্রহণ করেন। এর পর থেকে দলে দলে লোক তাঁর মুরীদ হতে থাকেন। তিনি তাঁর অনুসারীদেরকে যে জেহাদের মন্ত্রে দীক্ষিত করেন তার লক্ষ্য হলো সত্যের পথে সংগ্রাম করে আল্লাহ প্রদর্শিত সরল ও সঠিক পথে চলা। এ পথেই তিনি তাঁর অনুগামীদেরকে আজীবন পরিচালনা করেন।
শাহ ইসমাইলের নিকটে লিখিত এক পত্রে জেহাদের উদ্দেশ্য বর্ণনা করে তিনি বলেন-
"জেহাদের উদ্দেশ্য ধন সম্পদ অর্জন অথবা খ্যাতি অর্জন করা নয়। বিভিন্ন অংশ জয় করা বা স্বীয় স্বার্থ পরিতৃপ্ত করা অথবা নিজের জন্য একটা রাজ্য স্থাপন করাও জেহাদের উদ্দেশ্য নয়। জেহাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা এবং মুসলিম সমাজে যেসব কুসংস্কার প্রচলিত আছে তাকে বিনষ্ট করা।” [৫]
সত্যিকার অর্থে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ব্যতীত না মুসলিম সমাজের কুসংস্কার ও অনৈসলামী আচার অনুষ্ঠান দূর করা সম্ভব, আর না খোদার সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব।
এমন মহান ও পবিত্র উদ্দেশ্য যাঁর, যাঁর চরিত্র ছিল নির্মল ও নিষ্কলুষ, যিনি ছিলেন ব্যক্তিস্বার্থের বহু উর্ধে এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন যাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য, তাঁর সম্পর্কে হান্টার বলেন- "এই বিস্ময়কর প্রভাবের উৎপত্তি কেবলমাত্র অশুভ ভিত্তির উপরেই ঘটেনি, সাইয়েদ আহমদ ধর্মীয় নেতা হিসাবে তাঁর জীবন আরম্ভ করেছিলেন দুটি মহান নীতির প্রবক্তা রূপে। নীতি দুটি হচ্ছে খোদার একত্ব এবং মানুষের সাম্য। সত্যিকার ধর্মপ্রচারকরা সকলেই এই দুই নীতি অনুসরণ করে থাকেন। দেশবাসীর অন্তরে যে ধর্মভাব দীর্ঘকাল যাবত সুপ্ত অবস্থায় ছিল এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবত হিন্দু ধর্মের সাহচর্যের দরুন সৃষ্ট কুসংস্কার অতিমাত্রায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে মুসলমানদের মনকে যেভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল, এবং ইসলাম ধর্মকে প্রায় শ্বাসরুদ্ধ করে রেখেছিল, সাইয়েদ আহমদ এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে নাড়া দিয়েছিলেন মুসলমানদের সেই ধর্মনিষ্ঠ মনের দুয়ারে। তিনি দেখতে পেয়েছিলেন যে, মানুষের ধর্মবিশ্বাস প্রতিমা পূজার আনুষ্ঠানিকতায় সমাহিত হয়েছে। সাইয়েদ আহমদ একজন দুর্বৃত্ত দস্যু (Bandit) ছিলেন। তিনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ শিষ্যবর্গ ভক্তের (Imposters) দলে পরিণত হয়েছিলেন একথা সত্য হওয়া সত্ত্বেও আমি একথা বিশ্বাস না করে পারি না যে, সাইয়েদ আহমদের জীবনে অন্তর্বর্তী এমন একটা সময় ছিল, যখন সর্বান্তঃকরণে বেদনাকুল হৃদয়ে তিনি তাঁর দেশবাসীর মুক্তি কামনা করেছিলেন এবং তাঁর অন্তর নিবদ্ধ হয়েছিল একমাত্র আল্লাহর প্রতি।” [৬]
হান্টার সাহেব তাঁর গ্রন্থে কিরূপ স্ববিরোধী উক্তি করেছেন তা যে কোন বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তি অনুধাবন করতে পারবেন। যে ব্যক্তির 'অন্তর নিবদ্ধ হয়েছিল আল্লাহ্ প্রতি' যিনি 'সর্বান্তঃকরণে বেদনাকুল হৃদয়ে তাঁর দেশবাসীর মুক্তি কামনা করেছিলেন, তাঁকে হান্টার বলেছেন দস্যু-দুর্বৃত্ত এবং ভন্ড।
হান্টার সাহেব আরও বলেন, "ধর্মীয় ধ্যানে তিনি এমন মগ্ন থাকতেন যে, সেটাকে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান অনুসারে মৃগীরোগ বলে অভিহিত করা যায়।” (ঐ, ঐ)
আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকাকে তাসাওউফের পরিভাষায় বলা হয় মুরাকাবা- মুশাহাদা। হান্টারের মতো খোদায় অবিশ্বাসী পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীরা তাকে বলেন মৃগীরোগ। ইসলাম বিদ্বেষব্যাধি মনমস্তিষ্ককে কতখানি আক্রান্ত করে রাখলে এ ধরনের অশালীন উক্তি করা যায়, তা সহজেই অনুমেয়। সাইয়েদ আহমদ যদি শুধুমাত্র 'ধর্মীয় ধ্যানে মগ্ন' থাকতেন, তাহলে সম্ভবতঃ পাশ্চাত্য লেখকগণ তাঁর কোন বিরূপ সমালোচনা করতেন না। কিন্তু যেহেতু তিনি বিধর্মী ও বিদেশী শাসন থেকে 'দেশবাসীর মুক্তি কামনা করেছিলেন', সেজন্যে তাঁদের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন 'মৃগী রোগাক্রান্ত', দুর্বৃত্ত ও ভন্ড। এ ছিল তাদের বিদ্বেষদুষ্ট ও বিকৃত মানসিকতারই পরিচায়ক।
শাহ আবদুল আযীয দেহলভীর ভাইপো প্রখ্যাত আলেম শাহ ইসমাইল এবং জামাতা মওলানা আবদুল হাই, সাইয়েদ সাহেবের মুরীদ হওয়ার ফল এই হলো যে, সাইয়েদ সাহেবের খ্যাতি বিদ্যুৎ গতিতে মধ্য ভারতে ছড়িয়ে পড়লো। চারদিক থেকে জনসাধারণ তাঁকে দাওয়াত করতে থাকলো এবং তিনি তাঁর মুর্শেদ শাহ আবদুল আযীযের অনুমতিক্রমে দোয়াব অঞ্চলের গাযিয়াবাদ, মীরাট, মজফফরপুর, সাহারানপুর, দেওবন্দ প্রভৃতি স্থানসমূহে ব্যাপক সফর করেন। প্রায় চল্লিশ হাজার লোক তাঁর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে এবং বহু অমুসলমানও তাঁর কাছে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। তাঁর এ সফরকালে তিনি শিখদের হাতে মুসলমানদের নির্যাতন কাহিনী প্রথম শুনতে পান এবং তাঁর অন্তর সমবেদনায় বিগলিত হয়। ১৮১৯ সালে তিনি শেষবারের মতো দিল্লী ফিরে যান এবং অল্পকাল পরেই রায়বেরেলী প্রত্যাবর্তন করেন।
রায়বেরেলীতে তিনি কিছুকাল অতিবাহিত করেন। সেখানে এই খোদাভক্তদের জীবনযাত্রা ছিল আদর্শস্থানীয় এবং দর্শকদের শিক্ষার যোগ্য। দুর্ভিক্ষ প্রপীড়িত অঞ্চলে প্রায় সত্তর আশীজন লোক সায় নদীর তীরবর্তী সাইয়েদ বংশের পুরাতন মসজিদের চারধারে নিজ হাতে কুটীর তৈরী করে বাস করতেন। সে বৎসর (১৮১৯ খৃঃ) গ্রীষ্মকালে জোর বৃষ্টি নামলো এবং নদীগুলোতে প্রবল প্লাবন এলো। খাবার হয়ে পড়লো দুর্মূল্য ও দুষ্প্রাপ্য। কিন্তু সাইয়েদ সাহেব নির্বিকার চিত্তে তাঁর আশিজন খোদাপ্রিয় ও খোদাভক্ত সংগী নিয়ে এবাদত বন্দেগীতে, লোকসেবা ও প্রচার কার্যে দিনরাত ব্যস্ত রইলেন। তাঁর তখনকার কর্মব্যস্ততায় হযরত ঈসার (আ) 'সারমন অব দি মাউন্টের' বিখ্যাত উপদেশাবলীর আক্ষরিক প্রতিপালনই লক্ষ্য করা যায়: তোমার নিজের জীবনে কি খাবে ও কি পান করবে সে বিষয়ে কোন চিন্তা করোনা- এমনকি দেহের চিন্তাও করোনা যে, কি পরবে। কিন্তু আল্লাহর প্রেমের রাজ্য প্রতিষ্ঠা কর, তাহলে তোমার এ সবই হবে। [৭]
উপরোক্ত দলে ছিলেন ইসলাম জগতের বহু জ্ঞান-জ্যোতিষ্ক যথা হুজ্জাতুল ইসলাম মওলানা শাহ মুহাম্মদ ইসমাইল, শায়খুল ইসলাম মওলানা আবদুল হাই, কোতব-ই-ওয়াক্ত মওলানা মুহাম্মদ ইউসূফ প্রভৃতি। শাহ ইসমাইল তাঁর অসীম জ্ঞানগরিমা ও পান্ডিত্যসহ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপন পীর ও মুর্শেদের সাথে ছায়ার মতো ছিলেন এবং তাঁর সংগেই শাহাদতের অমৃত পান করেন। প্রাতঃকালে প্রচারণা, ওয়াজ নসিহত, কোরআন হাদীসের ব্যাখ্যাদান, দিবাভাগে কঠোর দৈহিক পরিশ্রম এবং সারারাত তাহাজ্জুদ ও এবাদত বন্দেগীতেকাটানো- এ ছিল এসব খোদাপ্রেমিকদের দৈনন্দিন কর্মসূচী।
সাইয়েদ সাহেবের শিক্ষার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্ম থেকে ভন্ডামী ও জাঁকজমক দূর করা এবং জীবনের প্রত্যেক স্তরে বিশ্বনবীর সহজ সরল জীবনধারা অনুসরণ করা। ধর্ম বিশ্বাসে তিনি ছিলেন পুরাপুরি তাওহীদপন্থী, আল্লাহর সার্বভৌমত্বে অকুন্ঠ বিশ্বাসী, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সুন্নাহর একনিষ্ঠ পাবন্দ। সব রকম শির্ক থেকে দূরে থাকা, যেমন পীর আউলিয়ার কাছে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মংগল কামনা, গায়েবী মদদ প্রার্থনা করা, বিভিন্ন প্রকারের কবর পূজা করা, পৌত্তলিক ও অন্যান্য বিধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করা, প্রভৃতি।
তিনি ইসলামকে নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করার চেয়ে প্রকৃত সাধু জীবন যাপনের দিকেই বেশী জোর দিতেন- কারণ তার ফলেই মানুষ একটা মহৎ লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হতে পারে এবং সকল ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ্রই করুণার উপরে হয় নির্ভরশীল। একথা দিবালোকের ন্যায় সত্য যে, তিনি নিজের ইচ্ছা ও আশা-আকাংখাকে আল্লাহর ইচ্ছা ও মরযীর উপরে একান্তভাবে সুপর্দ করেছিলেন, যার জন্যে তিনি তাঁর জীবনের প্রতি মুহূর্তে আল্লাহরই ইচ্ছানুযায়ী চলতে প্রস্তুত থাকতেন。
সাইয়েদ সাহেব তাঁর অভীষ্ট পথে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে হজ্বে বায়তুল্লাহ্র ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁর সাথে পবিত্র হজ্বে শরীক হওয়ার জন্যে দলে দলে স্ত্রী-পুরুষ তাঁর পাশে জমায়েত হতে লাগলো। ১২৩৬ হিঃ ৩০শে শাওয়াল, ই. ১৮২১ এর জুলাই মাসে প্রায় চারশো নারী পুরুষের এক বিরাট কাফেলা তাঁর সাথে হজ্বের উদ্দেশ্যে গৃহত্যাগ করলো। এলাহাবাদ পৌঁছতে পৌঁছতে কাফেলা সাতশোতে দাঁড়ালো। দলে দলে মানুষ তাঁর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করতে লাগলো। তিনি মানুষকে সত্যিকার মুসলমানী জীবন যাপনের আহবান জানালেন এবং হজ্বের প্রয়োজনীয়তাও ব্যাখ্যা করেন।
হজ্বকাফেলা নৌকা যোগে এলাহাবাদ থেকে বেনারস, মীর্জাপুর, চুনারগড়, গাজীপুর, দানাপুর, ফুলওয়ারী শরীফ, প্রভৃতি স্থান অতিক্রম করে আযীমাবাদ পৌঁছে।
আযীমাবাদ অবস্থানকালে তিব্বতের একটি দল তাঁর সাথে দেখা করে। তিনি তাদেরকে তিব্বতে ইসলামী দাওয়াতের কাজ সুপর্দ করেন এবং বলেন যে, অসীম ধৈর্য সহকারে এ কাজ করে যেতে হবে। এভাবে তিব্বতেও সাইয়েদ সাহেবের দ্বীনের দাওয়াত প্রচার হতে থাকে।
আযীমাবাদ থেকে হজ্বকাফেলা হুগলী পৌঁছলে কোলকাতা নিবাসী জনৈক মুন্সী আমীনুদ্দীন গোটা কাফেলাকে তাঁর মেহমান হিসাবে কোলকাতায় নিয়ে আসেন। এখানে চারদিক থেকে খোদাপ্রেমে পাগল হাজার হাজার নারী পুরুষ তাঁর মুরীদ হন। বহুলোক হজ্বের জন্যে বহু হাদিয়া ও উপঢৌকন পেশ করেন। সাইয়েদ সাহেবও তাঁর সুললিত ও অমিয় ভাষণে তাঁদের আধ্যাত্মিক পিপাসা নিবারণ করেন। গোলাম রসুল মেহের তাঁর গ্রন্থে হজ্ব সফরের আগাগোড়া বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। কিন্তু কোলকাতা থেকে জাহাজ যোগে মক্কা রওয়ানার তারিখ লিপিবদ্ধ করেন নি।
সাইয়েদ সাহেবের কাফেলায় মোট সাত শ' তিপ্পান্ন জন হজ্বযাত্রী ছিলো। দশটি জাহাজে তাঁদেরকে বিভক্ত করে দেয়া হয়। সাইয়েদ সাহেব 'দরিয়া বাকা' নামক একটি পুরাতন জাহাজে দেড়শ' যাত্রীসহ যাত্রা করেন। ভালো ভালো জাহাজগুলি অন্যান্যদের জন্যে নির্দিষ্ট করে দেন।
রায় বেরেলী থেকে রওয়ানা হওয়ার দশ মাস পর ১২৩৭ হিঃ ২৮ শে শা'বান, ইং ১৮২২ সালের ২১শে মে কাফেলাসহ সাইয়েদ সাহেব পবিত্র মক্কা নগরীতে প্রবেশ করেন।
হজ্বের পর সাইয়েদ সাহেব কয়েক মাস মক্কায় অবস্থান করেন। গোটা রমযান মাস হারাম শরীফে কাটান। অতঃপর যিলকদ মাসের প্রারম্ভে গৃহের উদ্দেশ্যে জিদ্দা পরিত্যাগ করে ২০শে যিলহজ্ব বোম্বাই পৌঁছেন। বোম্বাই থেকে কোলকাতা এবং অতঃপর ইং ১৮২৪ সালের ২৯ শে এপ্রিল আপন জন্মস্থান রায়বেরেলী পৌঁছেন।
হজ্ব থেকে প্রত্যাবর্তনের পর যেখানেই তিনি যান, অসংখ্য লোক তাঁকে এক নজর দেখার জন্যে এবং তাঁর পবিত্র হস্তে বয়আত করার জন্যে ভীড় করতে থাকে। হাজার হাজার লোক তাঁর নিকটে দীক্ষা গ্রহণ করে তাঁর দলভুক্ত হয়ে যায়।
রায় বেরেলী পৌঁছার পর সাইয়েদ সাহেব সর্বাত্মক সংগ্রাম বা জেহাদের প্রস্তুতি করতে থাকেন। মুসলমানদেরকে অনৈসলামী কুসংস্কারমুক্ত করে খাঁটি তৌহীদপন্থী বানাবার জন্যে সংস্কার সংশোধনের কাজ শুরু করেন শাহ ইসমাইল। তাঁর প্রণীত "তাবিয়াতুল ঈমান" এ বিষয়ে একটি প্রামাণ্য ও মূল্যবান গ্রন্থ। অবশ্য পীরপূজা ও কবরপূজাকে ভিত্তি করে যারা তাদের ব্যবসা জমজমাট করে রেখেছিল, তাদের পক্ষ থেকে বিরোধিতাও করা হয়েছিল।
সাইয়েদ সাহেবের যখন জ্ঞানচক্ষু উন্মোচিত হয়েছিল তখন তিনি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন, এ দেশের বিরাট মোগল সাম্রাজ্য চূর্ণ বিচূর্ণ ও ধ্বংস হয়ে গেছে। তার ধ্বংসস্তূপের উপর যে দু'চারটি মুসলমান রাষ্ট্র মাথা তুলেছিল, তাও শেষ হয়ে গেছে। ইংরেজ গোটা ভারতের উপরে তার আধিপত্য বিস্তার করে থাকলেও একটি বিরাট অঞ্চলে শিখ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত। মুসলমানরা শুধু রাজ্য হারায় নাই, আপন দ্বীন ও 'সেরাতে মুস্তাকীম' থেকে বহু দূরে সরে পড়েছে। তাদের আকীদাহ বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা ও আচার অনুষ্ঠান অনৈসলামী চিন্তাধারা ও ধর্মকর্মের দ্বারা প্রভাবিত। মুসলমান আমীর-ওমরা যাঁরা অবশিষ্ট ছিলেন, তাঁরা ভোগবিলাসে লিপ্ত এবং তাদের জীবনের লক্ষ্য এ ছাড়া আর অন্য কিছু ছিল না যে- যেমন করেই হোক তাদের জীবনের সুখ সম্ভোগের উপায় উপাদানগুলি যেন অক্ষুণ্ণ থাকে। তার জাতীয় পরিণাম যা কিছুই হোক না কেন, এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করার অবকাশ তাদের ছিল না। জনগণের মধ্যে অধিকাংশের অবস্থা এই ছিল যেন তাদের উপরে বজ্রপাত হয়েছে এবং তারা জ্ঞান ও সম্বিতহারা হয়ে পড়েছে, অথবা প্রবল ভূকম্পন শুরু হয়েছে এবং তারা হয়ে পড়েছে দিশাহারা।
যাদের কিছু জ্ঞান বুদ্ধি ছিল, তারা কোন সমাধান খুঁজে পাচ্ছিল না। অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে তারা ভাগ্যের লিখন মনে করে চুপচাপ হাত পা গুটিয়ে বসে ছিল এটা মনে করে যে, যা হবার তা হবেই। কিন্তু তরী যখন নদীবক্ষে ঘূর্ণাবর্তে পতিত হবে, তার পাল চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে, নংগর কোন কাজে আসবে না, এবং কর্ণধারেরও কোন সন্ধান পাওয়া যাবে না তখন আরোহীদের জীবন রক্ষার কোন্ আশা আর বলবৎ থাকবে? মুসলমানরা তখন এমনি এক নৈরাশ্যের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিল।
মুসলমানদের জাতীয় জীবনের এমনি এক নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতিতে সাইয়েদ সাহেব তাঁর জ্ঞানচক্ষু খোলেন। তিনি দেখলেন তাঁর সম্মুখে মাত্র তিনটি পথই উন্মুক্ত রয়েছে।
এক- হক্কে পরিত্যাগ করে বাতিলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা।
দুই- হক্কে পরিত্যাগ না করা। বরঞ্চ হকের সংগে জড়িত থাকতে গিয়ে যেসব বিপদ আপদ ও দুঃখ দারিদ্র্য আসবে, তা নীরবে সহ্য করা।
তিন- পুরুষোচিত সাহস ও শৌর্যবীর্য সহকারে বাতিলের মুকাবিলা করতঃ এমন এক অবস্থা সৃষ্টি করার আপ্রাণ চেষ্টা করা- যাতে করে হকের জন্যে বিজয় সাফল্য সূচিত হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
প্রথমটি হলো মৃত্যুর পথ, জীবনের পথ নয়। দ্বিতীয়টির পরিণাম ফল এই হতে পারে যে ক্রমশঃ ধুঁকে ধুঁকে এবং যন্ত্রণাদায়ক অবস্থার ভিতর দিয়ে জাতির জীবন প্রদীপ নিভে যাবে। তৃতীয় পথটিই হলো জাতীয় আত্মমর্যাদার পথ, বীরত্ব ও সৎ সাহসের পথ। নবজীবন লাভ করে আত্মমর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ। সাইয়েদ সাহেব এই তৃতীয় পথটিই অবলম্বন করেছিলেন। এ পথে চলার সকল যোগ্যতা ও গুণাবলী তাঁর মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল।
মক্কা শরীফ থেকে রায় বেরেলী প্রত্যাবর্তনের পর থেকে কয়েক বৎসর তিনি জেহাদের প্রস্তুতি ও প্রচারণা চালান। তিনি দেশের ধর্মীয় নেতাদের নিকট পত্র পাঠালেন ফরয হিসাবে জেহাদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে। তিনি স্বয়ং এ কথা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে, সমাজ সংস্কার ও সংগঠন করতে হলে শক্তি ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা একান্ত আবশ্যক। তিনি কতিপয় বিশিষ্ট মুসলমানের নিকটে সর্বতোভাবে জেহাদে অংশগ্রহণ করার ও সাহায্য করার আবেদন জানান। একখানি পত্রে তিনি নবাব সুলেমানজাকে লিখেছিলেন:
আমাদের বরাতের ফেরে হিন্দুস্থান কিছুকাল খৃস্টান ও হিন্দুদের শাসনে এসেছে এবং তারা মুসলমানদের উপর ব্যাপকভাবে জুলুম শুরু করে দিয়েছে। কুফরী ও বেদাতীতে দেশ ছেয়ে গেছে এবং ইসলামী চালচলন প্রায় উঠে গেছে। এসব দেখে শুনে আমার মন ব্যথায় ভরে গেছে। আমি হিজরত করতে অথবা জেহাদ করতে মনস্থির করেছি। [৮]
সাইয়েদ আহমদ জেহাদ বলতে বুঝিয়েছেন: "যদি কোন মুসলমান অধ্যুষিত দেশ অমুসলমানদের অধীনে আসে, তাহলে সে দেশের প্রতিটি মুসলমান নর-নারীর উপরে জেহাদ ফরযে আইন হয়ে দাঁড়ায় এবং অন্যান্য মুসলিম দেশের উপরে জেহাদ হয়ে পড়ে ফরযে কেফায়া।”
শাহ ইসমাইলকে লিখিত এক পত্রে তিনি বলেন: "জেহাদের উদ্দেশ্য ধন-সম্পদ অর্জন বা খ্যাতিলাভ করা নয়। বিভিন্ন অংশ জয় করা বা স্বীয় স্বার্থ পরিতৃপ্ত করা অথবা নিজের জন্যে একটা রাজ্য স্থাপন করাও জেহাদের উদ্দেশ্য নয়। জেহাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা এবং মুসলিম সমাজে যেসব কুসংস্কার প্রচলিত আছে তা বিনষ্ট করা।” [৯]
সাইয়েদ সাহেব আল্লাহর পথে জেহাদকে তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসাবে এবং পরকালে মুক্তির একমাত্র পথ হিসাবে গ্রহণ করেন। শুধু নিজের জন্যেই নয় জেহাদের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করে তিনি দেশে ও বিদেশে বহু মুসলিম শাসক ও আমীর ওমরাহ্ কাছে তাঁর জ্বালাময়ী ভাষায় বহু পত্র লিখেন। তাঁর বহু পত্রের মধ্যে কতিপয় পত্রের উল্লেখ করেছেন গোলাম রসুল মেহের তাঁর গ্রন্থে।
সাইয়েদ সাহেব নিম্নলিখিত শাসকদের কাছে পত্র প্রেরণ করেন:
১। আমীর দোস্ত মুহাম্মদ খান বারাকজাই- কাবুল।
২। ইয়ার মুহাম্মদ খান- পেশাওর।
৩। সুলতান মুহাম্মদ- কোহাট ও বান্নু।
৪। সাইয়েদ মুহাম্মদ খান- হাজার।
৫। শাহ্ মাহমুদ দুররানী- হিরাট।
৬। জামান শাহ্ দুররানী
৭। নসরুল্লাহ- বোখারা।
৮। সুলায়মান শাহ- চিত্রাল।
৯। আহমদ আলী- রামপুর।
১০। মুহম্মদ বাহাওয়াল খান আব্বাসী নসরৎ জং- বাহাওয়ালপুর。
উপরন্তু ভারতের অত্যন্ত প্রভাবশালী ত্রিশ-পঁয়ত্রিশজন আমীর ওমরাহর নিকটেও তিনি জেহাদে যোগদানের জন্যে এবং সর্বতোভাবে সাহায্য সহযোগিতার জন্যে পত্র দ্বারা আহবান জানান। তাঁদের মধ্যে গোয়ালিয়রের জনৈক হিন্দু রাজা হিন্দু রাওয়ের নিকটেও তিনি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রের মর্ম নিম্নরূপ:
"বিদেশী ব্যবসায়ীরা এ দেশের শাসক হয়ে বসেছে। তারা আমাদেরকে সকল দিক দিয়ে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাজ্যের কর্ণধার যারা তারা এখন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। এমনি অবস্থায় নিতান্ত কর্তব্যের খাতিরে বাধ্য হয়ে কতিপয় নিঃস্ব ও দরিদ্র লোক আল্লাহর উপর নির্ভর করে তাঁর দ্বীনের খেদমতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। এরা দুনিয়ার ধনসম্পদ ও পদ মর্যাদার প্রত্যাশী নয়। তাদের উদ্দেশ্য হলো যে, জয়লাভ করলে এ দেশের শাসনভার এ দেশেরই লোকদের হাতে তুলে দেয়া হবে।”
আন্দোলনের ব্যাপক প্রস্তুতিকল্পে সাইয়েদ সাহেব একটা সংগঠন কায়েম করেন এবং ভারতের প্রধান প্রধান শহরে তাঁর বিশ্বস্ত খলিফা বা প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন। নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য-
১। মওলানা সাইয়েদ মুহাম্মদ আলী রামপুরীকে তিনজন সহকর্মীসহ হায়দরাবাদ (দাক্ষিণাত্য) পাঠানো হয়。
২। সাইয়েদ মুহাম্মদ আলী অতঃপর মাদ্রাজ গমন করলে মওলানা বেলায়েত আলী আযীমাবাদীকে দাক্ষিণাত্যে পাঠানো হয়。
৩। মওলানা এনায়েত আলী আযীমাবাদীকে পাঠানো হয় বাংলায়。
৪। মওলানা সাইয়েদ আওলাদ হাসান কনৌজী এবং সাইয়েদ হাফীযুদ্দীনকে ইউপিতে দায়িত্ব দেয়া হয়。
৫। মিয়া দীন মুহাম্মদ, মিয়া পীর মুহাম্মদ এবং আরও অনেকের উপর এ দায়িত্ব অর্পিত হয় যে, তাঁরা ভারতের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করে জেহাদের আহবান পৌঁছাবেন এবং অর্থ সংগ্রহ করবেন。
জিহাদ কার্য পরিচালনার জন্যে পাটনাকে প্রধান কেন্দ্র হিসাবে নির্বাচিত করা হয়। ১৮২২ সালে সাইয়েদ আহমদ যখন পাটনা গমন করেন, তখন বেলায়েত আলী ও মুহাম্মদ হোসেন তাঁকে বিপুল সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করেন। পাটনাকে আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রস্থল স্থাপন করতঃ সাইয়েদ সাহেব চারজন প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন। তাঁরা হলেন, মওলানা বেলায়েত আলী, মুহাম্মদ হোসেন, এনায়েত আলী এবং ফরহাদ হোসেন।
ভারতের সর্বত্র জেহাদের প্রচারণা ও প্রস্তুতি শেষ করে সাইয়েদ আহমদ ১৮২৬ সালে তাঁর জন্মভূমি রায়বেরেলী ত্যাগ করেন। তারপর আর সেখানে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ হয়নি। জীবনের বাকী বছর তিনি ক্রমাগত আল্লাহর পথে জেহাদে অতিবাহিত করে শাহাদতের অমৃত পানে জীবনকে ধন্য করেন।
যাহোক, যাত্রার পূর্বে ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে অর্থ, যুদ্ধের হাতিয়ার, সরঞ্জাম, ঘোড়া, রসদ প্রভৃতি আনা শুরু হলো। আল্লাহর পথে জান কুরবান করার জন্যে হাজার হাজার মুজাহিদ তার ঝান্ডার নীচে জমায়েত হতে লাগলো। এভাবে যাত্রাকালে তাঁর মুজাহিদ বাহিনীর সংখ্যা দাঁড়ালো বারো হাজার। সাইয়েদ সাহেবের ভক্ত-অনুরক্ত টংকের নবাব মুজাহিদ বাহিনীকে আমন্ত্রণ জানান এবং জেহাদের যাবতীয় সাজ-সরঞ্জাম নিজ তত্ত্বাবধানে সরবরাহ করে দিয়ে বিদায় করেন।
অতঃপর মুজাহিদ বাহিনী টংক থেকে সিন্ধু, হায়দরাবাদ, শিকারপুর প্রভৃতি স্থান অতিক্রম করে বোলান পাসের ভিতর দিয়ে আফগানিস্তানের কান্দাহারে প্রবেশ করে।
ইতিপূর্বে মুজাহিদ বাহিনী সিন্ধুর খয়েরপুর পৌঁছলে খয়েরপুরের মীর রুস্তম আলী সাইয়েদ সাহেবের মুরীদ হন এবং টংকের নবাবের মতো তাঁকে মোটা রকমের অর্থ সাহায্য করেন। আফগানিস্তান পৌঁছে সাইয়েদ সাহেব আফগান আমীরের সাহায্য প্রার্থনা করেন। আমীর তাঁকে কোনরূপ সাহায্য দানের প্রতিশ্রুতি দিতে অস্বীকৃতি জানান। যাহোক তথা হতে মুজাহিদ বাহিনী সীমান্তের নওশেরায় উপনীত হয়। এ সুদীর্ঘ পথে মুজাহিদ বাহিনীকে চরম অসুবিধা ও দুঃখকষ্ট ভোগ করতে হয়। তবে তাদের যাত্রাপথে চারদিক থেকে সরদারগণ, শাসকগণ স্থানীয় কর্মচারীগণ ও জনসাধারণ সাইয়েদ সাহেবকে আনুগত্য জানিয়েছিল। কেউ বা বিবিধ উপঢৌকনাদি দিয়ে, কেউ তাঁর হাতে বয়আত গ্রহণ করে এবং কেউ বা তাঁর বাহিনীতে যোগদান করে। তাঁর বাহিনীতে যোগদান করেছিল ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের লোক— এমনকি সুদূর বাংলাদেশের বহু সংখ্যক মুজাহিদ। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চট্টগ্রামের সূফী নূর মুহাম্মদ নিজামপুরী যিনি বালাকোটের বিপর্যয়ের পর গাজী হয়ে প্রত্যাবর্তন করেন আপন জন্মভূমিতে। তাঁর মুরীদ ও খলিফা ছিলেন সূফী ফতেহ আলী সাহেব যিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন কোলকাতার মানিকতলায়। বহু সংখ্যক বাংলাদেশী শাহাদত বরণ করেছেন এবং অনেকেই বালাকোট, সোয়াত প্রভৃতি স্থানে স্থায়ী বসবাস স্থাপন করেন। তাঁদের বংশধর এখনো বিদ্যমান আছে। বালাকোটে তাঁদের জনৈক বংশধরের সাথে গ্রন্থকারের সাক্ষাৎ লাভের সৌভাগ্য হয়েছিল ১৯৬৩ সালে।
সাইয়েদ সাহেব রায় বেরেলী থেকে দিল্লী গমন করে যখন শাহ আবদুল আযীযের নিকটে শিক্ষাদীক্ষা গ্রহণ করছিলেন তখনই তিনি জানতে পারেন পাঞ্জাবে শিখ রাজ্যের অধীনে মুসলমানদের চরম নির্যাতনের কথা। মজলুম মুসলমানদের সহানুভূতিতে তাঁর প্রাণ কেঁদে উঠে এবং তখনই তিনি সংকল্প গ্রহণ করেন তার প্রতিকারের। তিনি চেয়েছিলেন মুসলিম অধ্যুষিত সীমান্তে তিনি একটি ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করবেন এবং সেখান থেকে অভিযান চালাবেন অন্যত্র মুসলিম দুশম্মন শক্তি সমূহের বিরুদ্ধে। এ কারণেই তিনি সীমান্তকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁর সংগ্রামের প্রাথমিক কেন্দ্র হিসাবে। কিন্তু পরম পরিতাপের বিষয় এই যে, সীমান্তের যেসব মুসলমানের সাহায্য সহযোগিতার আশা হৃদয়ে পোষণ করে সাইয়েদ সাহেব তাঁর জেহাদের রূপরেখা রচনা করেছিলেন, তাদের চরম বিশ্বাসঘাতকতা তাঁর সংগ্রামকে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে। নওশেরায় পৌঁছার পর থেকে বালাকোটের যুদ্ধ পর্যন্ত ছোটো বড়ো এগারটি বা ততোধিক যুদ্ধে মুজাহিদ বাহিনী শত্রুর মুকাবিলা করে। এ সবের বিস্তারিত বিবরণের জন্যে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ প্রণয়নের প্রয়োজন। তার অবকাশ এখানে নেই।
নওশেরায় পৌঁছার পর সাইয়েদ সাহেব ইসলামের রীতিপদ্ধতি অনুযায়ী শিখদেরকে প্রকাশ্যে আহবান জানান ইসলাম গ্রহণ করতে, অথবা বশ্যতা স্বীকার করতে অথবা অস্ত্রের মুকাবিলা করতে। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধই হলো এবং এক নৈশ যুদ্ধে মাত্র নয়শত মুজাহিদ বৃহৎ শিখবাহিনীকে পরাজিত করে। তাদের বিজয় লাভে সীমান্তবাসী তাঁদের প্রশংসায় মুখর হয়ে দলে দলে মুজাহিদ বাহিনীতে যোগদান করলো। বহু স্থানীয় সরদার বিশেষ করে ইউসুফ জায়ীরা সাইয়েদ সাহেবের দলে যোগ দিলো।
কিছুকাল পর মনপুরী ও পঞ্জতরেও শিখরা পরাজয় বরণ করলো। মুজাহিদদের এ সাফল্যের ফলে গরহি ইমাজির দশহাজার যোদ্ধা সাইয়েদ সাহেবকে ইমাম হিসাবে স্বীকার করে নিল। পেশাওরবাসীগণ নওশেরায় ঘাঁটি করে শিখদের বিরুদ্ধে সামগ্রিকভাবে অভিযান শুরু করার জন্যে সাইয়েদ সাহেবকে অনুরোধ জানায়। এ সময় প্রায় লক্ষাধিক লোক মুজাহিদ বাহিনীতে যোগদান করে।
কিন্তু সীমান্তের সরদারগণ ছিল অত্যন্ত স্বার্থপর ও অর্থগৃধ্নু। শিখ সেনাপতি বুধ সিংহ অর্থের প্রলোভনে পেশাওরের সরদারকে হাত করে ফেলে। তারা এতটা নীচতায় নেমে যায় যে অর্থের জন্যে তারা সাইয়েদ সাহেবকে গোপনে বিষ প্রয়োগ করে। কিন্তু আল্লাহর অসীম কুদরতে তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। এ সময়ে শিখদের সাথে যে যুদ্ধ হয়, তাতে সরদারগণ শিখদের পক্ষ অবলম্বন করে এবং মুজাহিদ বাহিনী পরাজিত হয়।
সীমান্তের পাঠান সরদারদের ডিবাজি ও বিশ্বাসঘাতকতার দরুন মুজাহিদ বাহিনীকে বিশেষ বেগ পেতে হয়। টংকের নবাবের নিকটে সাইয়েদ সাহেবের লিখিত এক পত্রে জানা যায় যে, প্রায় তিন লক্ষ লোক বয়আত গ্রহণ করে তাঁর দলে যোগদান করে। কিন্তু এর প্রায় সকলেই ছিল স্থানীয় লোক। সম্ভবতঃ যুদ্ধের মালে গনিমত লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যেই তারা সাইয়েদ সাহেবের দলে যোগদান করে। তাদের ইসলামী চরিত্র বলে কিছু ছিল না। সাইয়েদ সাহেব তাঁর অতি সরলতার জন্যে তাদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছিলেন। তাঁর একমাত্র নির্ভরযোগ্য সহকর্মী ছিলেন তাঁরাই যাঁরা বাইর থেকে গিয়েছিলেন। তাঁরা বিপদে আপদে সাইয়েদ সাহেবের সংগে ছায়ার মতো থাকতেন এবং প্রয়োজনে অকাতরে জান দিয়েছেন। এঁদের সংখ্যা ছিল হাজার খানেকের মতো। তাঁদের মধ্যে যারা যুদ্ধে শাহাদত বরণ করতেন তাদের স্থান অধিকার করতেন নবাগতের দল। দূর দূর অঞ্চল হতে কাফেলা আসতো জেহাদে যোগদানেচ্ছু মানুষ নিয়ে, টাকাকড়ি, রসদ ও চিঠিপত্র নিয়ে। তাঁদেরকে রসদ যোগান হতো সারা ভারতব্যাপী "তারগিবে মুহাম্মদীয়া” প্রতিষ্ঠানের গোপন কর্মকুশলতায়। ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের চোখে ধুলো দিয়ে টাকাকড়ি আসতো বিহার ও বাংলা থেকে। তার সংগে আসতো খোদার পথে উৎসর্গীকৃত মুজাহিদের দল।
যুদ্ধের রসদ, খাদ্য দ্রব্যাদি, টাকাকড়ি প্রভৃতি যা আসতো তা বায়তুলমালে জমা করা হতো যার রক্ষক ছিলেন শাহ ওয়ালিউল্লাহর ভাইপো মুজাহিদ বাহিনীর কুতুব মওলানা মুহাম্মদ ইউসূফ। অতীব ন্যায়নিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা ও সুশৃংখলতার সাথে রসদ ও টাকাকড়ি বন্টন করা হতো মুজাহিদ বাহিনীর মধ্যে। স্বয়ং সাইয়েদ সাহেবও একজন সাধারণ মুজাহিদের চেয়ে অধিক পরিমাণে কিছু পেতেন না।
অদৃষ্টের পরিহাস এই যে, আল্লাহর পথে উৎসর্গীকৃত এসব আল্লাহর প্রিয় বান্দাহদের মুকাবিলা করতে হতো ত্রিপক্ষের। শিখ, বিশ্বাসঘাতক পাঠান সরদার এবং হুন্দের দুর্গমালিক খাদে খাঁ- এ ত্রিশক্তি ছিল মুজাহিদ বাহিনীর দুশমন। এক সাথে এই তিন শক্তির মুকাবিলা তাঁদেরকে করতে হয়েছিল।
শিখদের সাথে যুদ্ধ বিগ্রহ প্রায় লেগেই থাকতো। বাংলা, বিহার ও মধ্য প্রদেশের মুজাহিদগণ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতেন। শিখ ও বিশ্বাসঘাতক পাঠানরা তাঁদের হাতে মার খেতো। পেশাওরের দুররানী সরদারগণও প্রকাশ্যে শিখদের সাথে যোগদান করলো এবং খাদে খাঁ স্থানীয় পাঠানদেরকে মুজাহিদগণের বিরুদ্ধে সব সময়ে ক্ষিপ্ত করে তুলতো।
এবার সাইয়েদ সাহেব খাদে খাঁকে শায়েস্তা করার জন্যে শাহ্ ইসমাইলকে মাত্র দেড়শত মুজাহিদসহ হুন্দ দুর্গ অধিকারের জন্যে পাঠান। রাত্রির অন্ধকারে হঠাৎ তাঁরা হুন্দ আক্রমণ করে তা দখল করেন এবং খাদে খাঁ নিহত হয়। খাদে খাঁর ভাই ইয়ার মুহাম্মদের সংগে মিলিত হয়ে বিরাট বাহিনীসহ হুন্দ দুর্গ পুনরুদ্ধারের জন্যে অগ্রসর হয়। ফলে প্রচন্ড সংঘর্ষ হয় এবং ইয়ার মুহাম্মদ নিহত হয়। শত্রুপক্ষের বহু কামান হস্তগত করা হয় এবং প্রচুর যুদ্ধ সরঞ্জাম ও মালামাল মুজাহিদ বাহিনীর হস্তগত হয়। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাগণ তার অধিকাংশই লুন্ঠন করে নিয়ে যায়। মুজাহিদ বাহিনীর প্রধান বিশ্বাসঘাতক দুশমন খাদে খাঁ, ইয়ার মুহাম্মদ খাঁ ও আমীর খানের মৃত্যুর পর এখন শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী রইলো শিখ ও পেশাওরের সুলতান মুহাম্মদ খান। হুন্দের যুদ্ধের পর সাইয়েদ সাহেব পেশাওরে ঘাঁটি স্থাপন করার মনস্থ করলে আম্বের পায়েন্দা খান বাধা দেয়। এখানেও শিখ ও পাঠানদের মিলিত শক্তির মুকাবিলা মুজাহিদ বাহিনীকে করতে হয়। এখানেও তারা পরাজিত হয় এবং আম্ব থেকে মর্দান পর্যন্ত মুজাহিদ বাহিনীর অধিকার স্বীকৃত হয়। এখন পেশাওর পর্যন্ত অগ্রসর হতে তাঁদের আর কোন প্রতিবন্ধকতা রইলোনা।
সুচতুর সুলতান মুহাম্মদ অবস্থা বেগতিক দেখে সাইয়েদ সাহেবের হাতে বয়আত গ্রহণ করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে। সে ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করার অংগীকার করলে সাইয়েদ সাহেব তাকে ক্ষমা করেন এবং শাসন পরিচালনার দায়িত্ব তার উপরই অর্পিত হয়। মওলানা জাফর থানেশ্বরী তাঁর 'সীরাতে সাইয়েদ আহমদ শহীদ' গ্রন্থে মন্তব্য করেন যে সাইয়েদ সাহেব তাঁর সরলতার দরুন নিঃস্বার্থভাবে সুলতান মুহাম্মদকে দায়িত্বভার দিয়ে ভুল করেছিলেন। অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, কিন্তু সাইয়েদ সাহেবের কাজের প্রতিবাদ করার সাহস কারো হয়নি। শরিয়তের আইনে বিচারের জন্যে মওলানা শাহ মযহার আলীকে কাযী নিযুক্ত করা হয়।
সাইয়েদ সাহেব এবং তাঁর হাতে গড়া মুজাহিদগণের পদমর্যাদা লাভের কোন বাসনা ছিল না। আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠা এবং সমাজ জীবনে খোদার আইন জারী করাই তাঁদের জীবনের লক্ষ্য ছিল। সুলতান মুহাম্মদের উপরে দায়িত্ব অর্পণ করার পেছনে সাইয়েদ সাহেবের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল যার জন্যে বহিরাগত মুজাহিদগণের মধ্যে যোগ্য ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি স্থানীয় লোকের উপরই দায়িত্ব অর্পণ করেন। কারণ তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শরীয়তের বিধান জারী করা, স্বয়ং ক্ষমতা উপভোগ করা নয়।
যাহোক, আপাতঃদৃষ্টিতে এক বিরাট অঞ্চলের উপর ইসলামী হুকুমত কায়েম হলো। সাইয়েদ সাহেব ইসলামী সমাজ ও ইসলামী আইন কানুন প্রবর্তনে বিশেষ প্রচেষ্টা চালাতে লাগলেন। পেশাওর তথা সমগ্র সীমান্ত এলাকা জুড়ে প্রচারকদল নিয়োজিত হলো। তাঁরা গ্রামে গ্রামে ইসলামী জীবন বিধান ও শরিয়তের আইন কানুনের প্রচারে লিপ্ত হলেন।
কিন্তু দুঃখের বিষয় স্থানীয় অধিবাসীগণ ছিল দরিদ্র, অজ্ঞ, অর্থলোভী ও বহুদিনের জাহেলী কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ। প্রচারকগণ যখন তাদের এসব কুসংস্কার পরিহার করে ইসলামী জীবন যাপনের আহবান জানাতে লাগলেন, তখন তাদের পারিবারিক, পারিপার্শ্বিক, গোত্রীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থে চরম আঘাত লাগে। ফলে তারা শুরু করলো অসহযোগ। অজ্ঞতা ও কুসংস্কার সঞ্জাত ক্ষমতা ও অর্থলোভী মোল্লার দলও করলো তীব্র বিরোধিতা। তার ফলে স্থানীয় অধিবাসীগণ সাইয়েদ সাহেবের বিরুদ্ধে একটা অন্ধ আক্রোশে ফেটে পড়লো। বিশ্বাসঘাতক সুলতান মুহাম্মদও তাই চাইছিল এবং সে এর পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করলো। অতি গোপনে সমগ্র অঞ্চলে এক গভীর ষড়যন্ত্রজাল ছড়ানো হলো এবং একই দিনে একই সময়ে ফজরের নামাযের সময় নামাযে রত মুজাহিদ প্রচারকদলকে নির্মমভাবে নির্মূল করা হলো। একজন অলৌকিকভাবে আত্মরক্ষা করেন এবং পলায়নকরতঃ সাইয়েদ সাহেবের নিকটে ঘটনা বিবৃত করেন।
সাইয়েদ সাহেব অত্যন্ত মর্মাহত হন। একই আঘাতে তাঁর কয়েকশত আল্লাহর পথে উৎসর্গীকৃত কর্মী জীবন হারালেন। একটা আদর্শ ইসলামী সমাজ গঠনের আশাও তাঁর বিলীন হয়ে গেল। তিনি বিশ্বাসঘাতক ও নিমকহারামদের দেশ পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়ার মনস্থ করলেন।
জাফর থানেশ্বরী বলেন, সাইয়েদ সাহেব অতঃপর তাঁর কর্মীগণকে একত্র করে বলেন, "আমার আশা চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে। পাঠানরা চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ইসলামী সমাজ গঠনের কোন আশা আর এখানে নেই। এখন আমার জন্যে হিজরত করা ব্যতীত গত্যন্তর নেই। আমি বালাকোট গিলগিট পথে অন্য দেশে চলে যাব। আল্লাহ্ তৌফিক দিলে আবার এ কাজে হাত দিব। আমি যে পথে অগ্রসর হতে চাই সে পথ বড়োই দুর্গম, পদে পদে বিপদের আশংকা রয়েছে। এ পথে চলার জন্যে তোমাদেরকে আহবান জানাব না। তোমরা ইচ্ছা করলে যে যার গৃহে প্রত্যাবর্তন করতে পারো।”
তখন সকলেই এক বাক্যেই বলেছিলেন, 'জেহাদে পা বাড়িয়ে পশ্চাদপদ হওয়া ঈমানের খেলাপ। আমরা সর্বাবস্থায় হুজুরের অবিচ্ছেদ্য সংগী হয়ে থাকতে চাই।'
অতঃপর সাইয়েদ সাহেব তাঁর অবশিষ্ট মুজাহিদগণ সহ বালাকোটের দিকে যাত্রা করেন। এ সময়ে শের সিংহের সৈন্য বাহিনী মুজাহিদগণের মুখোমুখী ছিল। সাইয়েদ সাহেব বালাকোট থেকে নওয়াব উযীরউদ্দৌলাকে যে পত্র লিখেন তার মর্ম নিম্নরূপ-
"পেশাওরের লোকেরা এমনই হতভাগ্য যে, তারা জেহাদে আমাদের মুজাহিদ বাহিনীর সংগে যোগ দিল না। উপরন্তু তারা প্রলোভনে পড়ে গেল এবং সারা দেশময় নানা কাজে আমাদের যেসব মহৎ লোক ব্যস্ত ছিলেন, তাঁদের অনেককেই হত্যা করে ফেল্লো।... সেখানে আমাদের অবস্থানের আসল উদ্দেশ্য ছিল যে বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জেহাদে বহু সংখ্যক স্থানীয় মুসলিমের সাহায্য ও সহানুভূতি পাওয়া যাবে। বর্তমানে যখন আর কোনও আশা নাই, তখন আমরা স্থির করলাম যে, সেখান থেকে পাখলীর পাহাড়ী অঞ্চলেই স্থান বদল করব। এখন আমাদের ঘাঁটি এমন নিরাপদ স্থানে অবস্থিত যে, আল্লাহর মরযী দুশমনরা আমাদের সন্ধানও পাবে না। ইসলামের তরক্কীর জন্যে ও মুজাহিদ বাহিনীর সাফল্যের জন্যে আল্লাহর দরবারে দিনরাত মুনাজাত করতে থাকুন।” [১০]
সাইয়েদ সাহেব তাঁর মুজাহিদ বাহিনীসহ বলাকোটের সৌন্দর্য মন্ডিত উপত্যকা বিশ্রামের জন্যে বেছে নিয়েছিলেন। পূর্ব দিক দিয়ে কুনহার বা কাগান পাহাড়ী নদী অবিরাম কুল কুল তানে বয়ে চলেছে। উত্তর পশ্চিম দিক থেকে সংকীর্ণ পাহাড়ী ঝর্ণা বার্না বড়ো বড়ো উপল খন্ডের ভেতর লুকোচুরি খেলতে খেলতে উদ্দাম উচ্ছল গতিতে বালাকোটে কুন্হার নদীগর্ভে প্রবেশ করেছে। বার্না ঝর্ণার উত্তর দিকে প্রশান্ত নূরী ময়দান। প্রকৃতির এ লীলা ক্ষেত্রে প্রবেশ করলে মনে হয় কে যেন জীবন নদীর পরপার থেকে হাতছানি দিচ্ছে। রণক্লান্ত মুজাহিদগণ বিশ্রামের জন্যে এখানে ছাউনী পাতলেও পরপারের হাতছানি হয়তো তাঁদের দৃষ্টির অগোচর হয়নি। তাই বিশ্রাম তাঁদের ভাগ্যে ঘটেনি।
ওদিকে শিখরা মুজাহিদ বাহিনীর সন্ধানে ছিল। তারা মনে করেছিল সাইয়েদ সাহেবের লক্ষাধিক মুজাহিদের কয়েক শ' মাত্র টিকে রয়েছে এবং তারা হয়ে পড়েছে হতোদ্যম। এ সুযোগেই তাদের আঘাত হানতে হবে।
সে সময়ে বালাকোটে যাওয়ার দুটি মাত্র পথ ছিল। একটি ছিল এমন পাহাড়ী বনজংগলে পরিপূর্ণ যে স্থানীয় লোক ব্যতীত সে পথে চলা অত্যন্ত বিপজ্জনক। অপর পথটি ছিল একটি সংকীর্ণ গিরিসংকটের মধ্য দিয়ে ও একটি সেতুর উপর দিয়ে। এ দুইটি পথে অবশ্যি পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েকজন বিশ্বাসঘাতক মোটা অর্থের লোভে অরণ্য সংকুল পথটিই শিখদের দেখিয়ে দেয়। ফলে তারা অতর্কিতে মুজাহিদ বাহিনীকে ঘিরে ফেলে। মুজাহিদ বাহিনী সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত থাকলেও বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেন। সাইয়েদ আহমদ, শাহ ইসমাইল ও সাইয়েদ সাহেবের অন্যান্য প্রধান সহকর্মীগণ জেহাদ করতে করতে শাহাদত বরণ করেন।
আবদুল মওদূদ বলেন, “তাঁর অনুসৃত বৃহৎ আন্দোলন স্তব্ধ হয় নাই। এই নিধন যজ্ঞের পরেও যাঁরা বেঁচে ছিলেন, তাঁদের অনেকেই টংকে অথবা বিহার শরীফের ছাতানায় সাইয়েদ সাহেবের বিশ্বস্ত খাদেমের নেতৃত্বে এই আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল স্থাপন করলেন। পরবর্তীকালে পাঞ্জাবের সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজরা যখন শিখদের ন্যায় অত্যাচার শুরু করে, তখন মুজাহিদদের সর্বরোষ তাদের উপর উদ্যত হয়। কিন্তু তার দরুন তাদের ভাগ্যে জোটে কারাবাস, উৎপীড়ন ও ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যুবরণের নির্মম শান্তি এবং তার চেয়েও হীনতম ছিল নিম্নশ্রেণীর মোল্লা ও তথাকথিত আলেমদের দ্বারা এসব সংগ্রামী অগ্রপথিকদের নামে অযথা কুৎসা রটনা ও মিথ্যা ভাষণ।”
তিনি আরও বলেন, “এখন সময় এসেছে এসব বীর মুজাহিদের গৌরবোজ্জ্বল অসমসাহসিক কার্যাবলীকে স্বীকৃতি দেয়া ও শ্রদ্ধা করা, কারণ তাঁরাই প্রকৃত পক্ষে এই উপমহাদেশে বহু পূর্বেই পাকিস্তানের বুনিয়াদ স্থাপনের মাধ্যমে সব রকম অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেহাদ করেছিলেন। যদিও সাইয়েদ সাহেবের প্রতিষ্ঠানের মারফৎ পাকিস্তান হাসিল হয় নাই, তবুও একথা অনস্বীকার্য যে, তার মধ্যেই ছিল বীজমন্ত্র; আর ওয়াকিফহাল ব্যক্তিমাত্রই হৃদয়ংগম করবেন যে রায় বেরেলীর সাইয়েদ আহমদ শহীদের দান ছিল এই চেতনা উজ্জীবনে অপরিসীম।” [১১]
উপরে বলা হ'য়েছে যে, সাইয়েদ আহমদ শহীদের জেহাদী আন্দোলনে বাংলাদেশ থেকে কয়েক সহস্র মুজাহিদ ও বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রেরিত হয়। রায় বেরেলী থেকে জেহাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবার সময়ে বাংলাদেশের অনেকে সাইয়েদ সাহেবের সাথী হয়েছিলেন এবং জিহাদ চলাকালেও যেমন বাংলাদেশ থেকে প্রচুর অর্থ সম্পদ সীমান্তে পৌঁছেছে তেমনি পৌঁছেছে হাজার হাজার মুজাহিদ।
গোলাম রসুল মেহের বলেন- বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পথে মুজাহিদগণ দলে দলে সাইয়েদ সাহেবের সংগে মিলিত হন। এমনি একটি দলে ছিলেন মৌলভী ফতেহ আলী আযীমাবাদী। তিনি তাঁর দলের যে তালিকা পেশ করেন, অবশ্য যাদের নাম তাঁর স্মরণ ছিল, তাদের মধ্যে ছ'জন বাংলাদেশের ছিলেন। তাঁদের নামঃ
১। মৌলভী ইমামুদ্দীন
২। জহুরুল্লাহ্
৩। লুৎফুল্লাহ্
৪। তালেবুল্লাহ্
৫। ফয়েজউদ্দীন
৬। কাজী মদনী
[১২]
শিখ ও পাঠানদের সংগে মুজাহিদগণের প্রায় এগার বারটি প্রচন্ড সংঘর্ষ হয়েছে। এসব যুদ্ধে অবশ্যই মুজাহিদগণের অনেকেই শহীদও হয়েছেন। তাঁদের নাম এবং একদিন ফজরের নামাযে তাদের যে কয়েকশতকে শহীদ করা হয়েছে, তাঁদেরও নামধাম জানা যায়নি। তবে বালাকোটে যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের একটি নামের তালিকা পেশ করেছেন- গোলাম রসুল মেহের। তাঁর প্রদত্ত তালিকা অনুযায়ী বালাকোটে সর্বমোট একশ পঁয়ত্রিশ জন মুজাহিদ শহীদ হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশের। তাঁদের নাম হলো, আলীমুদ্দীন, ফয়েজউদ্দীন, লুৎফুল্লাহ্, শরফুদ্দীন, সাইয়েদ মুজাফফর হোসেন। উক্ত তালিকায় কাদের বন্ধু, আবদুল কাদের, গাজীউদ্দীন ও বল্লাহ্‌- এ চারটি নাম স্থান পেয়েছে। কিন্তু তাঁরা কোথাকার অধিবাসী তা দেয়া হয়নি। শুধু বল্লাহ্‌র নামের শেষে বলা হয়েছে 'মেহের আলীর ভাই।' [১৩]
সীমান্তে যখন সারা ভারত থেকে আগত মুজাহিদগণ জেহাদে লিপ্ত ছিলেন, ঠিক সে সময়েই সাইয়েদ নিসার আলী ওরফে তিতুমীর হিন্দু জমিদার, নীলকর ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে জেহাদে লিপ্ত ছিলেন। তিতুমীর সাইয়েদ সাহেবের মুরীদ ছিলেন। কিন্তু স্বদেশেই তিনি এমনভাবে জড়িত হয়ে পড়েছিলেন যে, সাইয়েদ সাহেবের সান্নিধ্যে থেকে শাহাদৎ বরণ করার সৌভাগ্য তাঁর হয় নি। তবে যে পথে তাঁর মুর্শেদ খোদার সাথে মিলিত হন, সেই পথই অনুসরণ করেন শহীদ তিতুমীর। ১৮৩১ সালের ৬ই মে রোজ শুক্রবার প্রায় দুপুরের দিকে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠতম মুজাহিদ সাইয়েদ আহমদ বেরেলভী (রহ) শাহাদৎ বরণ করেন। ১৯৩১ সালের ১৯শে নভেম্বর ইংরেজ সৈন্যদের কামানের গোলায় শাহাদৎ বরণ করেন সাইয়েদ তিতুমীর।

টিকাঃ
১. সাইয়েদ আহমদ শহীদ, গোলাম রসুল মেহের, পৃঃ ৫৬
২. সাইয়েদ আহমদ শহীদ, গোলাম রসুল মেহের, পৃঃ ৫৬,৭১,৭৩
৩. সাইয়েদ আহমদ শহীদ, গোলাম রসুল মেহের, পৃঃ ৫৯
৪. সাইয়েদ আহমদ শহীদ, গোলাম রসুল মেহের, পৃঃ ১০৯
৫. স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, আবু জাফর, পৃঃ ৮৩
৬. W.W. Hunter, The Indian Mussalmans- অনুবাদ আনিসুজ্জামান (কিছু পরিবর্তনসহ) পৃঃ ৩৬
৭. ওহাবী আন্দেলন, আবদুল মওদূদ, পৃঃ ১৫৪-৫৫
৮. ওহাবী আন্দোলন, আবদুল মওদূদ, পৃঃ ১৫৭
৯. স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, আবু জাফর, পৃঃ ৮৩
১০. ওহাবী আন্দোলন, আবদুল মওদূদ, পৃঃ ১৬৪
১১. ওহাবী আন্দোলন, আবদুল মওদূদ, পৃঃ ১৬৫-১৬৬
১২. সাইয়েদ আহমদ শহীদ, গোলাম রসুল মেহের, পৃঃ ৪১২ পরিশিষ্ট
১৩. সাইয়েদ আহমদ শহীদ, গোলাম রসুল মেহের, পৃঃ ৪৩২-৩৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px