📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব

📄 মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব


আঠোরো শতকের গোড়ার দিকে আরবে যে একজন শ্রেষ্ঠ ধর্ম সংস্কারক বা মুজাহিদ জন্মগ্রহণ করেন তাঁর নাম ছিল মুহাম্মদ। পিতার নাম আবদুল ওয়াহ্হাব। আরবের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী নামের সাথে পিতার নাম সংযুক্ত করা হয় বলে তাঁর পুরা নাম ছিল মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাব। ওয়াহ্হাব আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম যার অর্থ পরম দাতা। মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাব চেয়েছিলেন ইসলামে সবরকম পৌত্তলিক অনুপ্রবেশের মূলোৎপাটন করে খাঁটি তওহীদ বাণীর মহিমা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে এবং আরবের সবরকম রাষ্ট্রনৈতিক গোলযোগের অবসান ঘটিয়ে শুধু ইসলামী সাম্য ও মৈত্রীনীতির সূত্রে সমস্ত আরবভূমিকে একরাষ্ট্রে বেঁধে দিতে।
তিনি প্রথমজীবনে হজ্ব করতে গিয়ে মক্কা ও মদিনায় মুসলমানদের অনৈসলামিক আচার অনুষ্ঠান দেখে অত্যন্ত মর্মাহত হন। আরবের তখন এক বৃহৎ অংশ তুরস্ক সুলতানের শাসনাধীন ছিল। ইউরোপীয় সভ্যতার সংস্পর্শে এসে তুর্কীরা বিশেষ করে তুর্কী শাসক শ্রেণী বহু ইউরোপীয় আচার-অনুষ্ঠান গ্রহণ করেছিল। সেসব আরব দেশে এমনকি মক্কা-মদিনায় ছড়িয়ে পড়েছিল।
কবরকে কেন্দ্র করে বিরাট বিরাট সৌধ নির্মিত হয়েছিল এবং মুসলমানরা কবরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে ইহলৌকিক উন্নতি ও পারলৌকিক মংগল কামনা করতো। কবরে বাতি দেয়া, ফুলের মালায় শোভিত করা, নজর-নেয়াজ পেশ করা, মানৎ করা- প্রভৃতি ক্রিয়াকলাপ চলতো। এগুলি ছিল পৌত্তলিকতারই অনুকরণ। মওলানা মাসউদ আলম নদভী— তাঁর মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নজদী নামক জীবনী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, তৎকালে আরব দেশে এমন কিছু বৃক্ষ ছিল যেখানে মুসলমানরা পৌত্তলিকদের অনুকরণে একপ্রকার পূজা পার্বণ করতো। এমনকি হিন্দুদের শিবলিংগ পূজা অপেক্ষাও গর্হিত কাজ করতো। মোটকথা ইসলামের এক অতি বিকৃতরূপ দেখে মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাব এ সবের বিরুদ্ধে জোরদার আওয়াজ তোলেন। তিনি প্রথম তাঁর এ সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন দামেস্ক শহর থেকে। তুর্কী শাসকশ্রেণীর ইসলাম বিরোধী আচার অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন সোচ্চার। ফলে শাসকশ্রেণীর কোপানলে পড়তে হয় তাঁকে এবং তিনি দামেস্ক থেকে বিতাড়িত হন। অবশেষে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ফিরে আপন জন্মভূমি নজ্‌দ প্রদেশের দারিয়াহ বা দেরাইয়াহ্ নামক স্থানে আসেন। দারিয়ার সর্দার বা অধিপতি তাঁর সংস্কার আন্দোলন সমর্থন করেন এবং তাঁর কন্যাকে বিয়ে করেন। অতঃপর দারিয়াহ্ অধিপতি মুহাম্মদ বিন সউদের সহায়তায় একাধারে ইসলামী সংস্কার আন্দোলন এবং আরব লীগ গঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক আন্দোলন চলতে থাকে।
তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলনের বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এখানে নেই। তবে একথা সত্য যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যতীত ইসলামের পূর্ণ বাস্তবায়নও সম্ভব নয় কিছুতেই। মুহাম্মদ বিন সউদের সাহায্য সহযোগিতায় যে প্রচন্ড রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল তাতে যোগদান করেছিল লক্ষ লক্ষ বেদুঈন। তাঁর ফলশ্রুতিস্বরূপ বার বার বিপর্যয়ের ভেতর দিয়েও অবশেষে গোটা আরব দেশ তাদের করতলগত হয়। সউদ বংশের রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হ'য়েছিল সমগ্র আরবভূমিতে এবং তার জন্যেই এ দেশটির পরিচয় হিসাবে বলা হ'য়ে থাকে সউদী আরব। মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাবের ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের সার্থকতাই এই রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের প্রত্যক্ষ ফল।
উপরে উক্ত হ'য়েছে দারিয়ার অধিপতি মুহাম্মদ বিন সউদ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাবের কন্যাকে বিবাহ করেন। অল্পদিনের মধ্যে মরু অঞ্চলে বিশেষ করে নজদে মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাবের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি তাঁর জামাতা মুহাম্মদ বিন সউদের হাতে সমস্ত শাসনক্ষমতা অর্পণ করে শুধু ধর্মীয় ব্যাপারে অর্থাৎ ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের সর্বময় কর্তা রয়ে যান। তারপর তুর্কী শাসকদের সাথে বার বার সংঘর্ষ হ'য়েছে। জয়-পরাজয় উভয়ের ভাগ্যেই ঘটেছে। সমগ্র নজদে তাঁদের শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অনেকের মতে, চতুর্থ খলীফার আমলের পর এই সর্বপ্রথম কোরআনকে ভিত্তি করে একটি দেশে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলে। অনেকের মতে, যেমন মদ-আলম নালী— মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাব ছিলেন একজন সার্থক মুজাদ্দিদ যিনি তাঁর মুজাদ্দিদিয়াতের বা সংস্কার কাজের পরিপূর্ণ সাফল্য জীবদ্দশায় দেখে গেছেন।
এখন তাঁর সংস্কার আন্দোলনের মূলনীতি সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যাক। আগেই বলা হ'য়েছে যে, তিনি ইসলামের বিপরীত কোন নতুন মতবাদ প্রচার করেননি, যার জন্য তাঁর মতবাদকে ওয়াহ্হাবী মতবাদরূপে আখ্যায়িত করা যায়। আরব দেশে ওয়াহ্হাবী নামাংকিত কোন মযহাব বা তরীকার অস্তিত্ব নেই। এ সংজ্ঞাটির প্রচলন আরব দেশের বাইরে এবং এই মতানুসারীদের বিদেশী দুশমন, বিশেষ করে তুর্কী ও ইউরোপীয়ানদের দ্বারা ওয়াহ্হাবী কথাটির সৃষ্টি এবং তাদের মধ্যেই প্রচলিত। কোন কোন ইউরোপীয় লেখক, যেমন নীবর (Neibuhr) মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাবকে পয়গম্বর বলেছেন। এসব উদ্ভট চিন্তারও কোন যুক্তি নেই। প্রকৃত পক্ষে মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাব কোন মযহাবও সৃষ্টি করেননি। চার ইমামের অন্যতম ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের মতানুসারী ছিলেন তিনি এবং তাঁর প্রযত্ন ছিল বিশ্বনবীর ও খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলে ইসলামের যে রূপ ছিল, সেই আদিম সহজ সরল ইসলামে প্রত্যাবর্তন করা। তাঁর আরও শিক্ষা ছিল, ধর্ম কোন শ্রেণী বিশেষের একাধিকার নয়। কোরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা দেয়াও কোন ব্যক্তি বিশেষ বা শ্রেণী বিশেষের নয়, কোন যুগ বিশেষের মধ্যেই সীমিত নয়, প্রত্যেক আলেম ব্যক্তির অধিকার আছে কোরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা দেয়ার। তাঁর শিক্ষা ও মতবাদ প্রধানতঃ ইবনে তাইমিয়া ও তাঁর শিষ্যদের পুঁথিতে বিধৃত মতবাদের দ্বারা প্রভাবিত। যদিও তিনি অনেক বিষয়ে তাদের সংগে একমত নন। [১]
মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাবের সংস্কার আন্দোলনের মূলনীতি সমূহ, যা তিনি তাঁর 'কিতাবুত্তাওহীদে' সন্নিবেশিত করেছেন, মোটামোটি নিম্নরূপঃ-
১। আল্লাহ্ ছাড়া এমন আর কোন সত্তা বা শক্তি নেই যার এবাদত বন্দেগী, দাসত্ব আনুগত্য, হুকুম শাসন পালন করা যেতে পারে।
২। অধিকাংশ মানুষই তাওহীদপন্থী নয়। তারা অলী দরবেশ প্রভৃতির নিকটে গিয়ে তাদের আশীষ প্রার্থনা করে। তাদের এসব আচার অনুষ্ঠান কোরআনে বর্ণিত মক্কার মুর্শিকদের অনুরূপ।
৩। এবাদতকালে নবী, অলী, ফেরেস্তাদের নাম নিয়ে প্রার্থনা করা শির্ক বা বহু দেবতার পূজা অর্চনার মতোই নিন্দনীয়।
৪। আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো মধ্যবর্তিতার আশ্রয় গ্রহণ করা শির্ক মাত্র।
৫। আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো নামে মানৎ করাও শির্ক।
৬। কোরআন হাদীস এবং যুক্তির সহজ ও অবশ্যম্ভাবী নির্দেশ ব্যতীত অন্য জ্ঞানের আশ্রয় গ্রহণ কুফর।
৭। কদর বা তাব্দীরে বিশ্বাসের প্রতি সন্দেহ পোষণ নাস্তিকতা।
উপরন্তু যেসব বিদআৎ (দ্বীন ইসলামে এমন সব নতুনত্ব যা কোরআন হাদীস সম্মত নয়, অথবা স্বয়ং নবী কর্তৃক প্রবর্তিত নয়), শির্ক ও কুফরের প্রশ্রয় দেয় তিনি সেসবের মূলোচ্ছেদকরণে বিশেষ জোর দেন। তাঁর মৌল শিক্ষাই ছিল লাশরীক আল্লাহ্র প্রতি একান্ত ও অকুন্ঠ নির্ভরশীলতা এবং স্রষ্টা ও মানুষের মধ্যে যাবতীয় মধ্যস্থতার অস্তিত্ব বা চিন্তার বিলোপ সাধন। যে মধ্যস্থতার নাম করে পীরবাদ বা মুসলমানী ব্রাহ্মণ্যবাদ কায়েম করে মুসলমানদেরকে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হ'য়েছিল। পীর ও অলীদের প্রতি ও তাদের কবরে মুসলমানের পূজা, এমনকি হযরত মুহাম্মদের (সা) আধাঐশ্বরিক রূপকল্পনার বিলোপ সাধন তিনি করতে চেয়েছিলেন। (এ মতবাদের অনুসরণও মুসলমানদের মধ্যে দেখা যায়। যেমন,
আহমদের ঐ মিমের পর্দা
রেখেছে তোমায় আড়াল করে।)
কবরে সৌধ নির্মাণ পৌত্তলিকতারই শেষ চিহ্ন মাত্র যে সম্পর্কে আল্লাহর নবী কঠোর ভাষায় সতর্কবাণী করে গেছেন। সেজন্যে সেসব ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়া হ'য়েছিল যাতে করে মুসলমানরা সেগুলিকে ভক্তিশ্রদ্ধা দেখাতে অথবা সেখানে গিয়ে নিজের মংগল কামনা করতে না পারে।
তাঁর এ আন্দোলনের স্বাভাবিক ফল এই ছিল যে, দুইশ্রেণীর মুসলমান অত্যন্ত খড়গহস্ত হ'য়ে পড়ে। এক—কবরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে যারা ইহলৌকিক উন্নতি ও পারলৌকিক মংগলকামনা করতো এবং কবরের হেফাজত তথা খেদমতের নামে দর্শনপ্রার্থীদের নিকট থেকে টাকা পয়সা আদায় করে জীবিকা অর্জন করতো। দুই— তুর্কী শাসকগণ। কারণ মক্কা ও মদীনার উপর থেকে তাদের কর্তৃত্ব বিলুপ্ত হ'য়েছিল। তুর্কীর সুলতান ছিলেন তখন মুসলিম বিশ্বের স্বমনোনীত খলীফা। ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ, বলতে গেলে দুটি মাত্র তীর্থস্থান মক্কা ও মদীনা তাদের হস্তচ্যুত হ'য়ে পড়ায় খেলাফতের দাবী অর্থহীন হ'য়ে পড়ে। বাহু বলে মক্কা মদীনা পুনরুদ্ধার করা সহজ ছিলনা বলে মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাব ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে নানাপ্রকারের অমূলক ও মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করে বিশ্বের মুসলমানদেরকে ক্ষিপ্ত করে তোলা হলো। তুর্কী শাসকদের চরিত্র যতোই ইসলাম বিরুদ্ধ হোক না কেন, মুসলমানদের খলীফার পক্ষ থেকে যখন মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাবের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারী হলো তখন মুসলমানরা তাই অকপটে বিশ্বাস করলো। এ অপপ্রচারের ফলে ১৮০৩ থেকে ১৮০৬ সাল পর্যন্ত বাইরের দেশগুলি থেকে মক্কায় হাজীদের সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য।
মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাবের মতো মুসলমানদের নানাবিধ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন বাংলা ভারতে সাইয়েদ আহমদ শহীদ, হাজী শরীয়তুল্লাহ্, তিতুমীর, প্রভৃতি মনীষীগণ। ব্রিটিশ সরকার এবার তাঁদের স্বার্থে এসব মনীষীকে ওয়াহ্হাবী বলে আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে মাতলেন। এর চেয়ে সত্যের অপলাপ ও নির্মম পরিহাস আর কি হতে পারে?
মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ বলেনঃ- একবার যদি মুসলমান জনসাধারণের মধ্যে বিধর্মী বিদ্বেষ জাগরিত হয় তাহা হইলে এশিয়া ও আফ্রিকায় তাহাদের সাম্রাজ্য তাসের ঘরের ন্যায় ভাঙিয়া পড়িবে আশংকা করিয়া সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ ইসলামের জন্য মায়াকান্না শুরু করিয়া দেন। তাই দেখা যায়, উনবিংশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে যখনই কোন মুসলমান দেশপ্রেমিক পরাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়াইবার চেষ্টা করিয়াছেন তখনই ইংরেজরা তাহাকে 'ওহাবী' আখ্যা দিয়া অজ্ঞ জনসাধারণকে তাঁহার বিরুদ্ধে লেলাইয়া দিয়াছেন, লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ প্রদান ও বিকল্পে নির্যাতনের ভয় প্রদর্শন করিয়া তাহাদের বশংবদ আলেমদের নিকট হইতে তাঁহার বিরুদ্ধে ফতোয়া সংগ্রহ করিয়া লইয়াছেন, তুর্কীদের বেতনভুক শেরিফের আজ্ঞাবহ কর্মচারীর নিকট হইতে নিজেদের জন্য সার্টিফিকেট আনাইয়াছেন। এমনকি, খাস আরব দেশ হইতেও প্রচারক আনিয়া তাঁহার বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নিজেদের রচিত অলীক কাহিনী তাহার মুখে প্রচার করিয়াছেন। ইহা ছাড়া জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীগণকে দিয়া তাহারা প্রতিক্রিয়াশীল মুসলমানদের সাহায্যে প্রতি জেলায় 'আনজুমনে ইসলামিয়া', 'হেজবুল্লাহ সমিতি' ও 'আনজুমনে এশায়াতে ইসলাম' প্রভৃতি কায়েম করাইয়া দেশপ্রেমিক মুসলমানদের বিরুদ্ধে উহাকে ব্যবহার করাইয়াছেন। ইহার বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা তাহাদিগকে জান্নাতে ফেরদৌস বখশিশ করেন কিনা বলা যায় না। তবে এ কথা সত্য যে, এই ইসলাম রক্ষা অভিযানে তাহারা শত শত মুসলমানকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলাইয়া অথবা সুদূর আন্দামানে নির্বাসনে পাঠাইয়া অন্ততঃপক্ষে তাহাদের পারলৌকিক মুক্তির পথ প্রশস্ত করিয়া দিতে পারিয়াছে। [২]
মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব ও তদীয় জামাতা মুহাম্মদ বিন সউদের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের উত্থানপতনের ঘটনাপঞ্জী
১৭০৩ খৃঃ- মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাবের জন্ম আরবের উয়াইনা অঞ্চলে তামিম গোত্রের শাখা বানু সিনান বংশে।
১৭৪৭ খৃঃ- রিয়াদের শেখের সাথে সংঘর্ষ
১৭৭৩ খৃঃ- রিয়াদের শাসক দাহ্হাম পরাজিত।
১৭৮৭ খৃঃ- মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাবের এন্তেকাল।
১৭৯১ খৃ- মক্কা আক্রমণ
১৭৯৭ খৃঃ- এশিয়ার সমগ্র তুর্কী অধিকার মুহাম্মদ বিন সউদের পৌত্র সউদের হাতে।
১৮০৩ খৃঃ- মক্কা দখল।
১৮০৪ খৃঃ- মদীনা দখল।
১৮০৬ খৃঃ- মক্কা পুনর্দখল।
১৮১১ খৃঃ- উত্তরে আলেপ্পো থেকে ভারত মহাসাগর এবং পারস্য উপসাগর ও ইরাক সীমান্তের পরবর্তী পূর্বে লোহিত সাগর পর্যন্ত সউদের হাতে।
১৮১১ খৃঃ- মিসরবাহিনী মদীনা দখল করে।
১৮১২ খৃঃ- মিসরবাহিনী মক্কা দখল করে।
১৮১৪ খৃঃ- সউদের মৃত্যু।
১৮১৮ খৃঃ- দারিয়াহ্ রাজধানী বিধ্বস্ত হয়।
১৯০৪ খৃঃ- পুনঃপ্রতিষ্ঠালাভ। সউদ পৌত্র আবদুল আযীয বিন আবদুর রহমান নদে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯২৪ খৃঃ- মক্কা দখল।
১৯২৫ খৃঃ- মদীনা ও জেদ্দা অধিকার করেন।
এভাবে প্রায় সমগ্র জাজিরাতুল আরব (কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমীরি অধিকার ব্যতীত) সউদী আরব নামাংকিত আরবী জাতীয় রাষ্ট্রে রূপায়িত হয় যা এখনো বিদ্যমান। [৩]
হান্টার সাহেব তাঁর গ্রন্থে মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাব সম্পর্কে যে মন্তব্য করেন তাও উদ্ধৃত করা হলো।
রক্তের অক্ষরে তাঁরা যে নীতিমালা লিপিবদ্ধ করেছিলেন তা ছিল মহান। সর্বপ্রথম তাঁরা যে বিষয়টির উপর গুরুত্ব আরোপ করতেন, তা হলো এই যে, তুর্কীরা তাদের ইন্দ্রিয় পরায়ণতার দ্বারা পবিত্র নগরীকে (মক্কা) কলুষিত করেছিল। বহুবিবাহেও তারা পরিতৃপ্ত হতে পারেনি। হজ্বে আগমন কালে তারা সংগে নিয়ে আসতো জঘন্যতম চরিত্রের স্ত্রীলোক এবং তারা এমন সব কুকর্মে লিপ্ত হতো যেগুলি কোরআনে নিষিদ্ধ ছিল সম্পূর্ণরূপে। পবিত্র নগরীর রাজপথে তারা প্রকাশ্যে মদ ও আফিম খেতো। তুর্কী তীর্থ যাত্রীদল মক্কার পথে ঘৃণ্যতম লাম্পট্যের আচরণ করতো। মুহাম্মদ বিন্ আবদুল ওয়াহ্হাব সর্বপ্রথম এসব জঘন্য কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের আওয়াজ তোলেন। ক্রমে ক্রমে তাঁর মতামতগুলি একটি ধর্মীয় মতবাদের রূপ ধারণ করে এবং ওয়াহ্হাবী মতবাদ নামে বিস্তার লাভ করে। [৪] ভারতীয় মুসলমানদের অধিকাংশই এখন এ মতাবলম্বী। এ মতবাদ অনুসারে মুহাম্মদের প্রবর্তিত ধর্মকে বিশুদ্ধ আস্তিকতায় পরিণত করা হ'য়েছিল এবং সাতটি নীতির উপরে তা ছিল স্থাপিত। এক— এক আল্লাহতে অবিচল আস্থা। দুই— স্রষ্টা ও মানুষের মাঝখানে কোন মধ্যস্থতাকারীর অস্তিত্ব অস্বীকার। অলী দরবেশদের নিকটে প্রার্থনা করা, এমনকি মুহাম্মদের আধা ঐশ্বরিক রূপকল্পনাও প্রত্যাখ্যানযোগ্য। তিন— মুসলমানী ধর্মগ্রন্থের ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার অধিকার এবং পবিত্র গ্রন্থের ধর্মযাজকসুলভ ব্যাখ্যা বর্জন। চার— মধ্য ও আধুনিক যুগের মুসলমান যেসব রসম রেওয়াজ ও বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠান পবিত্র তাওহীদ বিশ্বাসের উপর চাপিয়ে দিয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করা। পাঁচ— যে ইমামের নেতৃত্বে প্রকৃত ঈমানদারগণ কাফেরদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জয়যুক্ত হবে তাঁর প্রতীক্ষা। ছয়— সকল কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের সংগ্রাম করা যে অবশ্য কর্তব্য তা তত্ত্বগত ও বাস্তব ক্ষেত্রে সর্বদা স্বীকার করা। সাত— আধ্যাত্মিক পথ প্রদর্শকের প্রতি দৃঢ় আনুগত্য。
হান্টারের মতে মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাবের প্রচেষ্টায় মুহাম্মদের প্রবর্তিত ধর্মকে (অর্থাৎ ইসলামকে) বিশুদ্ধ আস্তিকতায় পরিণত করা হয়েছিল।
অর্থাৎ ইসলামের ভিতরে অধর্ম বিধর্ম ও পৌত্তলিকতার যে অনুপ্রবেশ ঘটেছিল তা থেকে ইসলামকে মুক্ত করে সত্যিকার ইসলামী রূপ ও অকৃতি ফিরে আনাই ত তাঁর কাজ ছিল। এতে তিনি প্রকৃত ইসলামের সেবাই করেছেন। এইত প্রকৃত মুসলমানের কাজ। ইসলামের বিকৃত রূপকে পরিবর্তন করে তার প্রকৃত রূপে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যেই ত যুগে যুগে সংস্কারক আগমন করার ভবিষ্যদ্বাণী ইসলামের নবী করে গেছেন যাকে ইসলামী পরিভাষায় 'মুজাদ্দিদ' বলা হ'য়েছে। কিন্তু তাঁর কার্যকলাপকে ইসলাম বিরোধী ও মতবাদকে ইসলাম থেকে পৃথক মতবাদরূপে গণ্য করে 'ওহাবী' মতবাদে আখ্যায়িত করা হলো কেন? ইউরোপীয়দের এবং ভ্রান্তির গহীন সাগরে নিমজ্জিত একশ্রেণীর মুসলমানদের কাছে এর কী জবাব আছে? ইউরোপীয় খৃস্টানগণ ইসলাম ও মুসলমানের প্রতি তাদের চিরকালের বিদ্বেষাত্মক মনোবৃত্তির দরুন এমন করতে পারেন। এটা তাঁদের স্বভাবসুলভ— এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু ইসলামকে বিকৃত করে তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পৌত্তলিক ও অনৈসলামী আচার অনুষ্ঠান ও কুসংস্কার আমদানী করে তাকে একটি বাহ্যিক অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্মে পরিণত করে যারা তাদের ব্যবসার বাজার জমজমাট করে রেখেছিল এবং এখনো রাখে, তাদের কাছে সত্যিই এর কোন জবাব নেই। চরিত্রহীন ও লম্পট তুর্কী শাসকরা এবং তাঁদের অনুগ্রহপুষ্ট ও উচ্ছিষ্টভোজী অনুচরবৃন্দ সর্বপ্রথম এই শ্রেষ্ঠ সাধক ও মুজাদ্দিদ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাবের বিরুদ্ধে জঘন্য অপপ্রচার শুরু করেন। অতঃপর ব্রিটিশ ভারতে যখন অনুরূপ সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন সাইয়েদ আহমদ বেরেল্লী, তখন স্বার্থান্বেষী ও সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ তাঁকে 'ওহাবী' নামে আখ্যায়িত করে ভাড়াটিয়া আলেম নামধারী লোকদের দ্বারা তাঁর উপরে ফতোয়ার মেশিনগান থেকে অবিরাম ধারায় গোলাগুলী বর্ষণ করতে থাকে। তবে সাইয়েদ আহমদের জিহাদী আন্দোলন চলাকালে এসব মেশিনগানের গুলীগোলা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হ'য়েছে। তাই হান্টার বলেছেন 'ভারতীয় মুসলমানদের অধিকাংশই এখন এ মতাবলম্বী'।

টিকাঃ
১. ওহাবী আন্দোলন, আবদুল মওদূদ, পৃঃ ১১৬
২. আমাদের মুক্তি সংগ্রাম, মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ, পৃঃ ৬০-৬১
৩. ওহাবী আন্দোলন, আবদুল মওদূদ পৃঃ ১১২-১৫ দ্রঃ
৪. 'ওয়াহ্হাবী' বা 'ওহাবী' পরিভাষাটি বহির্জগতের বিশেষ করে ইউরোপীয়দের কল্পনা রাজ্যের সৃষ্টি।

📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 শাহ ওয়ালিউল্লাহ (র)

📄 শাহ ওয়ালিউল্লাহ (র)


বাদশাহ আওরঙজেব আলমগীরের মৃত্যুর চার বৎসর পূর্বে ১৭০৩ খৃস্টাব্দে শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ দিল্লী নগরীতে এক অতি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শাহ্ 'মাবদুর রহীম ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। শাহ্ ওয়ালিউল্লাহর পূর্বপুরুষ ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুকের (রা) বংশধর।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণ করেন তাঁর পিতা শাহ্ আবদুর রহীমের নিকটে। পরে তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে বার বছর যাবত শিক্ষকতা করেন। অতঃপর তিনি আরবে গমন করেন এবং মক্কা মদীনায় সুদীর্ঘকাল কাটান। মক্কা মদীনা অবস্থানকালে শাহ্ সাহেব ইজতেহাদের উপযোগী গুণাবলী ও যোগ্যতা অর্জন করেন। শিবলী বলেন, ইবনে রুশদ ও ইমাম ইবনে তাইমিয়ার পর মুসলিম জগতের যে চরম অবনতি ঘটেছিল, তাকে পুনরায় উজ্জীবিত করেন শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ)। দীর্ঘকাল যাবত কোরআন-হাদীস ও ইসলামের বিভিন্ন বিষয় অধ্যয়ন, গবেষণা এবং বিশেষ করে মক্কা মদীনা সফরের ফলে লব্ধ প্রেরণাই তাঁকে বিপ্লবী আন্দোলন শুরু করার জন্যে সচেষ্ট করে তুলেছিল।
আওরঙজেবের মৃত্যুর পর যে অরাজকতা ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়েছিল যার ফলে ধীরে ধীরে মোগল সাম্রাজ্য তথা ভারতে মুসলিম সুলতানাত ধূলিসাৎ হ'য়ে গেল এবং ইংরেজ বণিক বেশে এ দেশে আগমন করে ক্রমশঃ এ দেশের মালিক-মোখতার হ'য়ে গেল, এসব কিছুর পট পরিবর্তন হলো শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ চোখের সামনে। এ দৃশ্য শাহ্ সাহেবকে অত্যন্ত ব্যথিত ও পীড়িত করেছিল। তিনি পরিপূর্ণরূপে উপলব্ধি করেন যে, মুসলমানদের এ অধঃপতনের প্রধান কারণ হলো তাদের নৈতিক ও ধর্মীয় অধঃপতন।
ইসলাম সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ ও চিন্তা গবেষণার ফলে তাঁর মনোজগতে ইসলামী রাষ্ট্রের এক রূপরেখা প্রতিভাত হয়েছিল। কিন্তু তিনি পরিপূর্ণরূপে উপলব্ধি করেন যে, প্রকৃত যোগ্যতা ও গুণাবলীর অধিকারী না হওয়া পর্যন্ত শুধু বাহুবলে কোন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আর যদি তা কখনো সম্ভবও হয়, তাকে টিকিয়ে রাখা কিছুতেই সম্ভব নয়। ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে সত্যিকার ইসলামী জ্ঞান ও চরিত্রের লোক তৈরী হলো পূর্বশর্ত। কিন্তু এ ধরনের গুণাবলী ও যোগ্যতা সম্পন্ন লোকের শুধু অভাবই ছিল না, বরঞ্চ মুসলমানরা নানাবিধ জাহেলী বা অনৈসলামী কুসংস্কার জালে ছিল আবদ্ধ। এ বেড়াজাল থেকে মুসলিম সমাজকে মুক্ত করার জন্যে তিনি সর্বপ্রথমে আত্মনিয়োগ করলেন ইসলামী সংস্কার আন্দোলনে। তাঁর আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী সংস্কার সাধন করে ইসলামকে তার প্রাথমিক পবিত্রতা ও জীবনীশক্তিতে ফিরিয়ে আনা এবং দেশের ক্রমবর্ধমান ইংরেজ শক্তিকে ধ্বংস করে পুনরায় ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করা। এ জন্যে শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ আরবের মুজাদ্দিদ ও মুজাহিদ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাবের ন্যায় মুসলমানদের অনৈসলামী রীতি-নীতি, কুসংস্কার ও অনাচারের মূলোচ্ছেদের চেষ্টা করেন।
শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ লক্ষ্য করেছিলেন, শরীয়তে-ইসলামের প্রতি তাসাওউত্পন্থী সূফীদের উদাসীনতা ও অবজ্ঞা ইসলাম ও মুসলিম সমাজের জন্যে ছিল ক্ষতিকর, তাদের আচরিত বহু অনাচারের ও প্রচারিত ইসলাম বিরুদ্ধ মতবাদের অনুপ্রবেশ মুসলিম ধর্ম জীবনকে করে রেখেছিল কলুষিত ও বিকৃত। ব্যবসায়ী সূফীদের প্রাদুর্ভাব ও পীরপূজা-কবরপূজার প্রথাও ক্রমাগত বেড়েই চলেছিল। ওয়ালিউল্লাহ্ অবশ্য তাসাওউফের উচ্ছেদ চাননি, তিনি চেয়েছিলেন তার পূর্ণ সংস্কার ও পরিশুদ্ধি। তিনি সূফীবাদকে সংস্কার করে তাকে করতে চেয়েছিলেন কল্যাণমুখী। পেশাদার পীর, ফকীর, কবরপূজা, কেরামতি প্রভৃতির বিরুদ্ধে তার ওসিয়তনামায় বহু অকাট্য যুক্তি ও নির্দেশ আছে।
শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ এক শান্তিপূর্ণ ও নিরুপদ্রব পরিবেশে লোকচরিত্র গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তাঁর সংস্কার আন্দোলন বা গঠনমূলক কাজ শুরু করেন। তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে একাধারে মুসলিম সমাজের ত্রুটিবিচ্যুতি ও কুসংস্কারগুলির প্রতি অংগুলি নির্দেশ করেন এবং অপর পক্ষে তাদের সঠিক কর্মপন্থাও সুস্পষ্ট করে তোলেন। তিনি বহু মূল্যবান গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তার মধ্যে ফল কবীর, 'হুজ্জাতুল্লাহেল্ বালেগা' প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি মৃত, ঘুমন্ত ও পথভ্রষ্ট জাতিকে লেখনীর বেত্রাঘাতে জীবন্ত ও জাগ্রত করে সঠিক পথে চালাবার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। ১৭৬২ খৃস্টাব্দে এ প্রতিভাবান মনীষী ইহলোক ত্যাগ করেন।

📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 শাহ আবদুল আযীয (র)

📄 শাহ আবদুল আযীয (র)


শাহ ওয়ালিউল্লাহর এন্তেকালের পর তাঁর সুযোগ্য জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহ্ আবদুল আযীয (১৭৪৬-১৮২৩ খৃঃ) তাঁর প্রদর্শিত পথ ধরে সম্মুখে অগ্রসর হন। ভারতীয় আলেম সমাজের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি এ দেশকে নির্ভয়ে 'দারুল হরব' বলে ফতোয়া জারী করেন। বিধর্মী ইংরেজ শাসিত দেশে মুসলমানদের সামাজিক ও দ্বীনি অবস্থা কী হবে- এ প্রশ্নটি মুসলমানদের মনমস্তিস্ককে আলোড়িত করে রেখেছিল। বীর মুজাহিদ শাহ্ আবদুল আযীয উদাত্ত কণ্ঠে ও অকুতোভয়ে ঘোষণা করলেন যে, অনৈসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাধীন ভারত হ'চ্ছে 'দারুল হরব'। এখানে নিশ্চিন্তে ও সন্তুষ্টচিত্তে মুসলমানদের বসবাস করা ঈমানের পরিপন্থী। হয় তাদেরকে জেহাদ করে এ দেশকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে, অন্যথায় হিজরত করে অন্যত্র গমন করতে হবে। তাঁর এ ঘোষণা মুসলমানদের মনেপ্রাণে জেহাদের এক দুর্দমনীয় প্রেরণার হিল্লোল প্রবাহিত করে।
স্বৈরাচারীর প্রভাব থেকে মুসলিম ভারতকে মুক্ত করার আকুল আগ্রহে শাহ্ আবদুল আযীয প্রবর্তন করেন 'তারগীবে মুহাম্মদীয়া' নামে সমাজ সংস্কারক আন্দোলন। এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল- যেসব ইসলাম বিরুদ্ধ রীতিনীতি, আচার অনুষ্ঠান ও কুসংস্কার মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে তার মূলোচ্ছেদ করে মুসলমানদেরকে প্রকৃত ইসলামী শিক্ষাদর্শে উদ্বুদ্ধ করে তোলা। এক সুপরিকল্পিত পদ্ধতিতে শাহ্ সাহেব, সারা ভারতে এ আন্দোলন পরিচালনা করেন এবং এ কাজে নিয়োগ করেন তাঁরই নিকটে শিক্ষাপ্রাপ্ত একদল নিঃস্বার্থ ও অক্লান্তকর্মা লোক। কালক্রমে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এ 'তারগীবে মুহাম্মদীয়া' আন্দোলন একটি জিহাদী আন্দোলনের রূপ গ্রহণ করে এবং অত্যাচারী শিখ ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে আযাদীর আন্দোলন শুরু করে। এ আন্দোলনকে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন সাইয়েদ আহমদ শহীদ বেরেলভী এবং তাঁর প্রধান সহকর্মী ছিলেন শাহ সাহেবের ভাইপো শাহ্ ইসমাইল শহীদ ও জামাতা মওলানা আবদুল হাই।

📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 শাহ ওয়ালিউল্লাহর বংশতালিকা

📄 শাহ ওয়ালিউল্লাহর বংশতালিকা


শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ (১৭০৩-৬২ খৃঃ)
শাহ্ আব্দুল আযীয
শাহ্ রফীউদ্দীন
শাহ্ আবদুল কাদের
শাহ্ আবদুল গনী
শাহ্ মাহফুজুল্লাহ্
শাহ্ ইসমাইল
মওলানা আব্দুল হাই (জামাতা)
মওলানা ইসহাক
মওলানা ইয়াকুব

ফন্ট সাইজ
15px
17px