📄 কোলকাতায় জমিদারদের ষড়যন্ত্র সভা
তিতুমীর ও তাঁর অনুসারীদের দমন করার উদ্দেশ্যে কোলকাতায় জনৈক লাটু বাবুর বাড়ীতে এ সভায় নিম্নলিখিত ব্যক্তিগত হাজির হলেন : লাটু বাবু (কোলকাতা), গোবরডাঙার জমিদার কালী প্রসন্ন মুখোপাধ্যায়, গোবরা-গোবিন্দপুরের দেবনাথ রায়, নূরনগরের জমিদারের ম্যানেজার, টাকীর জমিদারের সদর নায়েব, রানাঘাটের জমিদারের ম্যানেজার, পুঁড়ার কৃষ্ণদেব রায়, বশীরহাট থানার দারোগা রামরাম চক্রবর্তী, যদুর আটির দুর্গাচরণ চক্রবর্তী প্রভৃতি।
সভায় স্থিরীকৃত হলো যে, যেহেতু তিতুমীরকে দমন করতে না পারলে হিন্দুজাতির পতন অনিবার্য, সেজন্যে যে কোন প্রকারেই হোক তাকে শায়েস্তা করতে হবে এবং এ ব্যাপারে সকল জমিদারগণ সর্বতোভাবে সাহায্য সহযোগিতা করবেন। ইংরেজ নীলকরদেরও সাহায্য গ্রহণ করা হবে বলে স্থির হলো। তাদেরকে বুঝানো হবে যে, তিতুমীর ইংরেজদের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম শুরু করেছেন। হিন্দু জনসাধারণের মধ্যে এ কথা প্রচার করতে হবে যে তিতু গো-মাংস দ্বারা হিন্দুর দেবালয়াদি অপবিত্র করেছেন এবং হিন্দুর মুখে কাঁচা গো-মাংস গুঁজে দিয়ে জাতি নাশ করেছেন। বশীরহাটের দারোগা চক্রবর্তীকে এ ব্যাপারে সর্বপ্রকারে সাহায্য করার অনুরোধ জানানো হলো। কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় দারোগাকে বল্লেন, আপনি ব্রাহ্মণ, আমরাও ব্রাহ্মণ। তাছাড়া আপনি আমাদের অনেকেরই আত্মীয়। আমাদের এ বিপদে আপনাকে সব দিক দিয়ে সাহায্য করতে হবে। দারোগা বল্লো, আমি আমার প্রাণ দিয়েও সাহায্য করব এবং তিতুমীরকে রাজদ্রোহী প্রমাণ করব।
কোলকাতার ষড়যন্ত্র সভার পর সরফরাজপুরের লোকদের নিকট থেকে দাড়ি-গোঁফের খাজনা এবং আরবী নামকরণের খারিজানা ফিস্ আদায়ের জন্যে কৃষ্ণদেব রায় লোক পাঠালো। কিন্তু তারা খাজনা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জমিদারের কর্মচারী ফিরে এসে জমিদারকে এ বিষয়ে অবহিত করে। অতঃপর তিতুমীরকে ধরে আনার জন্যে বারোজন সশস্ত্র বরকন্দাজ পাঠানো হয়। কিন্তু তারা ধরে আনতে সাহস করেনি।
অতঃপর কৃষ্ণদেব নিম্নের ব্যক্তিগণকে পরামর্শের জন্যে বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করে: ১। অনুকূল চন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে গোবরডাঙায়, ২। খড়েশ্বর মুখোপাধ্যায়কে গোবরা-গোবিন্দপুরে, ৩। লাল বিহারী চট্টোপাধ্যায়কে সেরপুর নীলকুঠির মিঃ বেঞ্জামিনের কাছে, ৪। বনমালী মুখোপাধ্যায়কে হুগলী নীলকুঠিতে, ৫। লোকনাথ চক্রবর্তীকে বশীরহাট থানায়।
উল্লেখযোগ্য যে, লোকনাথ চক্রবর্তী বশীরহাটের দারোগা রামরাম চক্রবর্তীর ভগ্নিপতি।
অতঃপর বিভিন্ন স্থান থেকে কৃষ্ণদেবের সাহায্যার্থে সহস্রাধিক লাঠিয়াল, সড়কীওয়ালা ও ঢাল-তলোয়ারধারী বীর যোদ্ধা কৃষ্ণদেবের বাড়ি পুঁড়ায় পৌঁছে গেল। পরদিন শুক্রবার সরফরাজপুরে তিতুমীর ও তাঁর লোকজনদেরকে আক্রমণ করার আদেশ হলো।
পরদিন শুক্রবার সর্বাগ্রে অশ্বপৃষ্ঠে কৃষ্ণদেব রায় এবং তার পিছনে সশস্ত্র বাহিনী যখন সরফরাজপুর পৌঁছে, তখন জুমার খুৎবা শেষে মুসল্লীগণ নামাজে দাঁড়িয়েছে। কৃষ্ণদেবের সৈন্যেরা বিভিন্ন মুসলিম বিরোধী ধ্বনি সহকারে মসজিদ ঘিরে ফেলে আগুন লাগিয়ে দিল। অল্প বিস্তর অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় তিতুমীর এবং মুসল্লীগণ মসজিদের বাইরে এলে তাদেরকে আক্রমণ করা হলো। দু'জন সড়কীবিদ্ধ হয়ে শহীদ হলো এবং বহু আহত হলো।
অতঃপর মুসলমানগণ কলিঙ্গার পুলিশ ফাঁড়িতে কৃষ্ণদেব রায় ও তার সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে খুনজখম মারপিট প্রভৃতির মামলা দায়ের করলো। পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী ইজাহার গ্রহণ করলো বটে। কিন্তু ঘটনাস্থলে উপস্থিত না হয়েই লাশ দাফন করার নির্দেশ দিল।
J. R. Colvin-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, জমিদারের কর্মচারীগণ সরফরাজপুরে দাড়ি-গোঁফ ইত্যাদির খাজনা আদায় করতে গেলে তাদেরকে মারপিট করা হয় এবং একজনকে আটক করা হয়। তারপর কৃষ্ণদেব রায় সশস্ত্র বাহিনীসহ তাদেরকে আক্রমণ করে এবং মসজিদ জ্বালিয়ে দেয়। [১]
উক্ত ঘটনার আঠার দিন পর কৃষ্ণদেব রায় তিতুমীর ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে এই বলে মামলা দায়ের করে যে, তারা তার লোকজনকে মারপিট করেছে এবং তাকে ফাঁসাবার জন্যে তারা নিজেরাই মসজিদ জ্বালিয়ে দিয়েছে। [২]
কৃষ্ণদেব রায় তার ইজাহারে আরও অভিযোগ করে যে, 'নীলচাষদ্রোহী, জমিদারদ্রোহী ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীদ্রোহী তিতুমীর নামক ভীষণ প্রকৃতির এক ওহাবী মুসলমান এবং তার সহস্রাধিক শিষ্য পুঁড়ার জমিদার শ্রীযুক্ত কৃষ্ণদেব রায় মহাশয়ের দু'জন বরকন্দাজ ও একজন গোমস্তাকে অন্যায় ও বেআইনীভাবে কয়েদ করিয়া গুম্ করিয়াছে। বহু অনুসন্ধানেও আমরা তাহাদের পাইতেছিনা। আমাদের উক্ত পাইক ও গোমস্তা সরফরাজপুর মহলের প্রজাদের নিকট খাজনা আদায়ের জন্য মহলে গিয়াছিল। খাজনার টাকা লেনদেন ও ওয়াশীল সম্বন্ধে প্রজাদের সহিত বচসা হওয়ায় তিতুমীরের হুকুম মতে তাহার দলের লোকেরা আমাদের গোমস্তা পাইকদিগকে জবরদস্তি করিয়া কোথায় কয়েদ করিয়াছে তাহা জানা যাইতেছে না। তিতুমীর দম্ভভরে প্রচার করিতেছে যে, সে এদেশের রাজা। সুতরাং খাজনা আর জমিদারকে দিতে হইবেনা।' [৩]
কিভাবে মিথ্যা মামলা সাজাতে হয় তা রামরাম চক্রবর্তীর অন্ততঃপক্ষে ভালো করে জানা ছিল। কারণ সে তিতুমীরকে রাজদ্রোহী প্রমাণ করার জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যাহোক, ঘটনার আঠার দিন পর জমিদারের ইজাহার যে বিশ্বাসযোগ্য নয়, তা না বল্লেও চলে। এ শুধু গা বাঁচাবার জন্যে করা হয়েছিল। তবু উভয় মামলার তদন্ত শুরু হয়।
মামলার প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে কলিঙ্গা ফাঁড়ির জমাদার। তার রিপোর্টে বলা হয় যে, উভয় পক্ষের অভিযোগ অত্যন্ত সংগীন। সে আরও বলে, আমি মুসলমানদের অভিযোগের বহু আলামত দেখেছি। জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের নায়েব তিতুমীর ও তার দলের বিরুদ্ধে যে মোকদ্দমা দায়ের করেছে সে সম্পর্কে তদন্ত করে জানা গেল যে, যেসব কর্মচারীর অপহরণের অভিযোগ করা হয়েছে তারা সকলেই নায়েবের সঙ্গেই আছে। নায়েবের জবাব এই যে, সে মফঃস্বলে যাওয়ার পর তিতুর লোকেরা তাদেরকে ছেড়ে দিয়েছে। আমার মতে এ জটিল মামলা দুটির তদন্ত ও ফাইনাল রিপোর্টের ভার বশীরহাটের অভিজ্ঞ দারোগা রামরাম চক্রবর্তীর উপর অর্পণ করা হোক।
ওদিকে বারাসতের জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট কৃষ্ণদেব রায়কে কোর্টে তলব করে জামিন দেন এবং রামরাম চক্রবর্তীকে তদন্ত করে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেয়ার আদেশ দেন।
রামরাম চক্রবর্তী তদন্তের নাম করে সরফরাজপুর আগমন করে তিতুমীর ও গ্রামবাসীকে অকথ্যভাষায় গালাগালি ও মারপিট করে জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের বাড়ীতে কয়েকদিন জামাই আদরে কাটিয়ে যে রিপোর্ট দেয় তা নিম্নরূপ:- ১। জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের গোমস্তা ও পাইকদেরকে তিতু ও তার লোকেরা বেআইনীভাবে কয়েদ করে রেখেছিল। পরে তারা কৌশলে পলায়ন করে আত্মগোপন করেছিল। পুলিশের আগমনের পর তারা আত্মপ্রকাশ করে। সুতরাং এ মামলা অচল ও বরখাস্তের যোগ্য। ২। তিতুমীর ও তার লাঠিয়ালেরা জমিদার কৃষদেব রায় ও তার পাইক বরকন্দাজদের বিরুদ্ধে খুনজখম, লুট, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতির মিথ্যা অভিযোগ এনেছে। ৩। তিতু ও তার লোকেরা নিজেরাই নামাজঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। অতএব এ মামলা চলতে পারে না।
দারোগার রিপোর্ট সম্পূর্ণ মনগড়া এবং তার বিদ্বেষাত্মক মনের অভিব্যক্তি মাত্র। মুসলমানদের শত দোষ থাক কিন্তু মসজিদ ভস্মিভূত করার মতো পাপ কাজ করতে সাহস তাদের কখনোই হবে না।
পরম পরিতাপের বিষয় এই যে, অবৈধ খাজনা আদায়ের বিষয়টি হাকিমের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি যা ছিল দাংগার মূল কারণ। তার ফলে জমিদার শুধু মামলায় জয়লাভই করেনি, বরঞ্চ তার অবৈধ খাজনা আদায়ের কাজকে বৈধ করে দেয়া হলো। বিভাগীয় কমিশনার বলেন, জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট যে রায় দিলেন তার মধ্যে একদিকে জমিদারদের অবৈধ ও উৎপীড়নমূলক খাজনা বন্ধ করার উদ্দেশ্য ছিলনা, অপরদিকে প্রতিপক্ষের উত্তেজনাকর মনোভাব লাঘব করারও কিছু ছিল না। [৪]
ম্যাজিস্ট্রেটের এ অবিচারমূলক রায়ের ফলে জমিদার প্রতারণামূলক ও উৎপীড়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সাহসী হলো। ১৭৯৯ সালের ৭ নং রেগুলেশন অনুযায়ী বকেয়া খাজনার নাম করে প্রজাদেরকে ধরে এনে আটক করার ক্ষমতা লাভ করলো। এমনকি যারা জমিদারের প্রজা নয় অথচ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে তাদেরকে মিছিমিছি ৩৮ টাকা বকেয়া দেখিয়ে ধরে এনে আটক করা হলো এবং তাদেরকে নানাভাবে শারীরিক শাস্তি দেয়া হলো। অতঃপর বকেয়ার একাংশ আদায় করে বাকী অংশ দিবার প্রতিশ্রুতিতে তাদের কাছে মুচলেকা লিখে নেয়া হলো যাতে করে কোর্টের আশ্রয় নিতে না পারে। [৫]
১৮৩১ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর মামলার রায়ের নকলসহ মুসলমানরা কমিশনারের কোর্টে আপিল করার জন্যে কোলকাতা গেল। কিন্তু কমিশনারের অনুপস্থিতির দরুন তাদের আপিল দাখিল করা সম্ভব হলো না বলে ভগ্নহৃদয়ে প্রত্যাবর্তন করলো।
সরফরাজপুর গ্রামের মসজিদ ধ্বংস হলো, বহু লোক হতাহত হলো, হাবিবুল্লাহ, হাফিজুল্লাহ, গোলাম নবী, রমজান আলী ও রহমান বশের বাড়ীঘর ভগ্নস্তূপে পরিণত করা হলো, বহু ধনসম্পদ ভস্মিভূত ও লুণ্ঠিত হলো, কিন্তু ইংরেজ সরকার তার কোনই প্রতিকার করলো না। সরফরাজপুর গ্রামবাসীর এবং বিশেষ করে সাইয়েদ নিসার আলীর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছিল বলে সকলের পরামর্শে সাইয়েদ নিসার আলী ওরফে তিতুমীর উপরোক্ত পাঁচজন গৃহহারাসহ সরফরাজপুর থেকে ১৭ই অক্টোবরে নারকেলবাড়িয়া গ্রামে একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্থানান্তরিত হলেন। ২৯শে অক্টোবর (১৮৩১) কৃষ্ণদেব রায় সহস্রাধিক লাঠিয়াল ও বিভিন্ন অস্ত্রধারী গুন্ডাবাহিনীসহ নারিকেলবাড়িয়া গ্রাম আক্রমণ করে বহু নর- নারীকে মারমিট ও জখম করে। ৩০শে অক্টোবর পুলিশ ফাঁড়িতে ইজাহার হলো। কিন্তু কোনই ফল হলো না। কোন প্রকার তদন্তের জন্যেও পুলিশ এলো না।
উপর্যুপরি জমিদার বাহিনীর আক্রমণে মুসলমানগণ দিশেহারা হয়ে পড়লো। তখন বাধ্য হয়ে তাদেরকে আত্মরক্ষার জন্যে প্রস্তুত হতে হলো। ৬ই নভেম্বর পুনরায় কৃষ্ণদেব রায় তার বাহিনীসহ মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লে প্রচন্ড সংঘর্ষ হয় এবং উভয়পক্ষে বহু লোক হতাহত হয়। এরপর কৃষ্ণদেব রায় চারদিকে হিন্দু সমাজে প্রচার করে দেয় যে, মুসলমানরা অকারণে হিন্দুদের উপরে নির্যাতন চালাচ্ছে। তার এ ধরনের প্রচারণায় হিন্দুদের মধ্যে দারুণ উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং গোবরডাঙ্গার নীলকর জমিদার কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় মোল্লাআটি নীলকুঠির ম্যানেজার মিঃ ডেভিসকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলে। ডেভিস প্রায় চার'শ হাবশী যোদ্ধা ও বিভিন্ন মারণাস্ত্রসহ নারিকেলবাড়িয়া আক্রমণ করে। এবারও উভয় পক্ষে বহু হতাহত হয়। ডেভিস্ পলায়ন করে। মুসলমানরা তার বজরা ধ্বংস করে দেয়। উক্ত ঘটনার কিছুদিন পরে গোবরা-গোবিন্দপুরের জমিদার দেবনাথ রায় এক বিরাট বাহিনীসহ নারিকেলবাড়িয়া আক্রমণ করে। প্রচন্ড যুদ্ধে দেবনাথ রায় সড়কীর আঘাতে নিহত হয়।
উপরোক্ত ঘটনার পর চতুনার জমিদার মনোহর রায় পুঁড়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের নিকট যে পত্র লিখেন তা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি লিখেন: নীলচাষের মোহ আপনাদেরকে পেয়ে বসেছে। তার ফলেই আজ আমরা দেবনাথ রায়ের ন্যায় একজন বীর পুরুষকে হারালাম। এখনো সময় আছে। আর বাড়াবাড়ি না করে তিতুমীরকে তার কাজ করতে দিন আর আপনারা আপনাদের কাজ করুন। তিতুমীর তার ধর্ম প্রচার করছে, তাতে আপনারা জোট পাকিয়ে বাধা দিচ্ছেন কেন? নীলচাষের মোহে আপনারা ইংরেজ নীলকরদের সাথে এবং পাদ্রীদের সাথে একতাবদ্ধ হয়ে দেশবাসী ও কৃষক সম্প্রদায়ের যে সর্বনাশ করছেন তা তারা তুলবে কি করে? আপনারা যদি এভাবে দেশবাসীর উপর গায়ে পড়ে অত্যাচার চালাতে থাকেন তাহলে বাধ্য হয়ে আমি তিতুমীরের সাহায্যের জন্যে অগ্রসর হবো। আমি পুনরায় বলছি নীলচাষের জন্যে আপনারা দেশবাসীর অভিশম্পাত কুড়াবেন না। -শ্রীমনোহর রায় ভূষণ [৬]
মনোহর রায়ের সদুপদেশ গ্রহণ করলে ইতিহাসের এতবড়ো একটা বিয়োগান্ত নাটকের অভিনয় হতো না। কিন্তু কৃষ্ণদেব রায়ের একদিকে সীমাহীন ধনলিপ্সা এবং অপরদিকে চরম বিদ্বেষ তাকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে ফেলেছিল। তাই সে-তার পৈশাচিক তৎপরতা থেকে ক্ষান্ত হতে পারেনি।
বশীরহাটের দারোগা রামরাম চক্রবর্তী তিতুমীর ও তার দলের লোকদের বিরুদ্ধে যেসব কাল্পনিক, বিকৃত ও উদ্দেশ্যমূলক রিপোর্ট সরকারের নিকটে পেশ করেছিল এবং হিন্দু জমিদারগণও যেসব পত্র কালেক্টর ও জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তিতুমীরের বিরুদ্ধে লিখেছিল, তার উপরে ভিত্তি করেই ম্যাজিস্ট্রেট তিতুমীরকে দমন করার জন্যে গভর্ণরকে অনুরোধ জানায়। গভর্ণর আবার উপরোক্ত রিপোর্টসহ নদিয়ার কালেক্টর ও আলীপুরের জজকে নারকেলবাড়িয়া গ্রামে গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিকারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। এদিকে গভর্ণরের আদেশ পাওয়া মাত্র নদিয়ার কালেক্টর কৃষ্ণদেব রায়কে যথাশীঘ্র সম্ভব তাঁর সাথে দেখা করতে বলেন। আলীপুরের জজ সে সময় নদিয়াতেই অবস্থান করছিলেন। কৃষ্ণদেব রায় যথাসময়ে উপস্থিত হলে কালেক্টর ও জজ সাহেবের বজরার পথপ্রদর্শক হিসাবে নারিকেলবাড়িয়ার দিকে রওয়ানা হয়।
এদিকে স্বার্থান্বেষী মহল থেকে সংবাদ রটনা করা হলো যে শেরপুর নীলকুঠির ম্যানেজার মিঃ বেনজামিন বহু লাঠিয়াল ও সড়কিওয়ালাসহ নারিকেলবাড়িয়া আক্রমণের জন্যে যাত্রা করেছে। এ সংবাদ পাওয়ার পর তাদেরকে বাধাদানের উদ্দেশ্যে গোলাম মাসুম তিতুমীর দলের লোকজনসহ সম্মুখে অগ্রসর হলো এবং বারঘরিয়া গ্রামের জঙ্গল ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে রইলো। বজরা এসে বারঘরিয়ার ঘাটে ভিড়লে পরে তিতুমীরের লোকেরা দেখতে পেলো যে, বজরায় দু'জন ইংরেজ এবং তাদের সাথে তাদের পরমশত্রু কৃষ্ণদেব রয়েছে। ইংরেজ দুজনকে তারা ডেভিস এবং বেনজামিন বলে ধারণা করে আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত হলো। কৃষ্ণদেব বল্লো, হুজুর ঐ দেখুন। তিতুমীরের প্রধান সেনাপতি গোলাম মাসুম বজরা আক্রমণ করার জন্যে এতদূর পর্যন্ত এসেছে। সাহেব তখন গুলি চালাবার আদেশ দিলেন। অপরপক্ষও তীর সড়কি চালাতে শুরু করলো। উভয়পক্ষের কয়েকজন হতাহত হওয়ার পর কালেক্টর যুদ্ধ স্থগিত রেখে নদীর মাঝখানে গিয়ে আত্মরক্ষা করেন।
তিতুমীরের দলকে স্বার্থান্বেষী মহল মিথ্যা সংবাদ দিয়ে প্রতারিত করলো। তারা ডেভিস্ ও বেনজামিন মনে করে বজরা আক্রমণ করলো। স্বার্থান্বেষী মহল চেয়েছিল এভাবে তিতুমীরের দলের প্রতি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী সরকারকে ক্ষিপ্ত করে তুলতে। তাদের উদ্দেশ্য সফল হলো। প্রকৃত ঘটনা অবগত হলে তারা এভাবে বজরা আক্রমণ করতে আসতোনা। বিশেষ করে কৃষ্ণদেব রায়কে, বজরায় দেখে তারা তাদেরকে শত্রুই মনে করেছিল।
মজার ব্যাপার এই যে, বারঘরিয়ার ঘাট থেকে তাড়াতাড়ি বজরায় উঠে নদীর মাঝখানে আত্মরক্ষার সময় কৃষ্ণদেব উঠতে পারেনি। ফলে তার ভাগ্যে যা হবার তা হলো। তবে মুসলমানরা তাকে হত্যা করেনি। নদীতে ডুবে তার অপমৃত্যু ঘটলো।
ইস্ট ইন্ডিয়া সরকারের বিরুদ্ধে তিতুমীরের সংঘর্ষের কোন বাসনা ছিলনা। ঘটনাপ্রবাহ, কতকগুলি অমূলক গুজব এবং এক বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল তিতুমীর ও সরকারের মধ্যে সংঘর্ষ বাধিয়ে দেয়। কতিপয় পাদ্রী, দেশী বিদেশী নীলকর এবং হিন্দু জমিদারদের পক্ষ থেকে বারাসতের জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ আলেকজান্ডারের কাছে তিতুমীরের বিরুদ্ধে অনবরত উত্তেজনাকর রিপোর্ট ও চিঠিপত্র আসতে থাকে। তার সাথে আসে বারঘরিয়ার উক্ত সংঘর্ষের রিপোর্ট। এর ফলে তিতুমীর ও তার দল সম্পর্কে মিঃ আলেকজান্ডারের যে ধারণা জন্মে তাতে তিতুমীরকে দমনের জন্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। সম্ভবতঃ রামরাম চক্রবর্তী সংঘর্ষে নিহত হওয়ার পর বশীরহাট থানায় নতুন দারোগা নিযুক্ত হয়। তার প্রতি নির্দেশ দেয়া হয় যে, সে যেন কতিপয় সিপাই জমাদার নিয়ে নারিকেলবাড়িয়া গিয়ে তিতুমীরকে সাবধান করে দেয়। অতঃপর যা যা ঘটে তার রিপোর্ট যেন দেয়। দারোগা সম্ভবতঃ নারিকেলবাড়িয়া না গিয়ে থানায় বসেই রিপোর্ট দেয় যে, তিতুর লোকজনের আক্রমণে প্রাণ নিয়ে কোনমতে পালিয়ে এসেছে। ফলে আলেকজান্ডারকে কর্তৃপক্ষের কাছে তিতুমীর সম্পর্কে কড়া রিপোর্ট দিতে হয়।
১৮৩১ সালের ১৪ই নভেম্বর মিঃ আলেকজান্ডার একজন হাবিলদার, একজন জমাদার এবং পঞ্চাশজন বন্দুক ও তরবারিধারী সিপাহী নিয়ে নারিকেলবাড়িয়ার তিনক্রোশ দূরে বাদুড়িয়া পৌঁছেন। বশিরহাটের দারোগা সিপাই-জমাদারসহ বাদুড়িয়ায় আলেকজান্ডারের সাথে মিলিত হয়। উভয়ের মোট সৈন্য সংখ্যা ছিল একশ' বিশজন। অতঃপর যে প্রচন্ড সংঘর্ষ হয় তাতে উভয়পক্ষের লোক হতাহত হয়, গোলাম মাসুমের নেতৃত্বে মুসলমানদের বীরত্ব দেখে আলেকজান্ডার বিস্মিত হন এবং দারোগা ও একজন জমাদার মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। বেগতিক দেখে আলেকজান্ডার প্রাণরক্ষার্থে পলায়ন করেন।
টিকাঃ
১. Board's Collection 54222, p. 405-6, Colvin's Report—para 9; Dr. A. R. Mallick : British Policy & the Muslims in Bengal, p. 79
২. Bengal Criminal Judicial Consultations, 3 April 1832, No. 6
৩. শহীদ তিতুমীর- আবদুল গফুর সিদ্দিকী, পৃঃ ৬০
৪. Bengal Criminal Judicial Consultations, 3 April 1832, No. 3; Commissioner to Deputy Secretary; 28 Nov. 1831. para 3
৫. Board's Collection, 54222, Enclosure No 4. the Colvin's Report; Also in Bengal Criminal Judicial Consultations, 3 April 1832 No. 6
৬. শহীদ তিতুমীর, আবদুল গফুর সিদ্দিকী পৃঃ ৭৯
📄 আলেকজান্ডার রিপোর্ট ও তার প্রতিক্রিয়া
জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ আলেকজান্ডার বারাসত প্রত্যাবর্তন করে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকটে তিতুমীরকে শায়েস্তা করার আবেদন জানিয়ে রিপোর্ট পেশ করেন। কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী সরকার কর্ণেল স্টুয়ার্টকে সেনাপতি পদে নিযুক্ত করে তার অধীনে একশত ঘোড়-সওয়ার গোরা সৈন্য, তিনশত পদাতিক দেশীয় সৈন্য, দু'টি কামানসহ নারিকেলবাড়িয়া অভিমুখে যাত্রা করার নির্দেশ দিলেন। ১৩ই নভেম্বর রাত্রে কোম্পানী সৈন্য নারিকেলবাড়িয়া পৌঁছে গ্রাম অবরোধ করে রাখলো।
শত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্যে তিতুমীর ও তাঁর লোকেরা তিতুমীরের হুজরাকে কেন্দ্র করে চারদিকে মোটা মোটা ও মজবুত বাঁশের খুঁটি দিয়ে ঘিরে ফেলেছিলেন যা ইতিহাসে "তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা” বলে অভিহিত আছে।
আবদুল গফুর সিদ্দিকী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বের কিছু ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, কর্ণেল স্টুয়ার্ট তিতুমীরের হজরা ঘরের সম্মুখস্থ প্রধান প্রবেশদ্বারের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে দেখলেন এক ব্যক্তি সাদা তহবন্দ, সাদা পিরহান ও সাদা পাগড়িতে অংগ শোভা বর্ধন করতঃ তসবিহ হাতে আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন। স্টুয়ার্ট মুগ্ধ ও বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পথপ্রদর্শক রামচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসা করলেন, এই ব্যক্তিই তিতুমীর? একে ত বিদ্রোহী বলে মনে হয় না?
রামচন্দ্র বল্লো, এই ব্যক্তিই বিদ্রোহী তিতুমীর। নিজেকে তিতু বাদশাহ বলে পরিচয় দেয়। আজ আপনাদের আগমনীতে ভংগী পরিবর্তন করে সাধু সেজেছে। অতঃপর স্টুয়ার্ট রামচন্দ্রকে বল্লেন, তিতুকে বলুন আমি বড়োলাট লর্ড বেন্টিংক-এর পক্ষ থেকে সেনাপতি হিসাবে এসেছি। তিতুমীর যেন আত্মসমর্পণ করে। অথবা তিনি যা বলেন হুবহু আমাকে বলবেন।
রামচন্দ্র তিতুমীরকে বল্লো, আপনি কোম্পানী সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এখন জপমালা ধারণ করেছেন, আসুন তরবারি ধারণ করে বাদশাহর যোগ্য পরিচয় দিন।
তিতুমীর বলেন, আমি কোম্পানী সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিনি। হিন্দুদের ন্যায় আমরাও কোম্পানী সরকারের প্রজা। জমিদার নীলকরদের অত্যাচার দমনের জন্যে এবং মুসলমান নামধারীদেরকে প্রকৃত মুসলমান বানাবার জন্যে সামান্য চেষ্টা করেছি মাত্র।
তিতুমীরের জবাব শুনার পর রামচন্দ্র স্টুয়ার্টকে দোভাষী হিসাবে বল্লো, বিদ্রোহী তিতুমীর বলছে আত্মসমর্পণ করবে না, যুদ্ধ করবে। সে বলে যে, সে তোপ ও গোলাগুলির তোয়াক্কা করেনা। সে বলে যে, সে তার ক্ষমতা বলে সবাইকে টপ টপ করে গিলে খাবে। সেই এ দেশের বাদশাহ, কোম্পানী আবার কে? [১]
রামচন্দ্র দোভাষীর কাজ করতে গিয়ে কোন্ আগুন জ্বালিয়ে দিল, তা পাঠকমাত্রের বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয়।
তারপর যে যুদ্ধ হলো, তার ফলাফল কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। সুশিক্ষিত ইংরেজ সৈন্য এবং তাদের ভারি কামানের গোলাগুলির সামনে লাঠি ও তীর সড়কি কতক্ষণ টিকে থাকতে পারে। তথাপি সাইয়েদ নিসার আলী ওরফে তিতুমীর, গোলাম মাসুম ও তাদের দলীয় লোকজন ভীতসন্ত্রস্ত না হয়ে অথবা প্রতিপক্ষের কাছে আনুগত্যের মস্তক অবনত না করে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ধীরস্থির হয়ে যেভাবে শত্রুর মুকাবিলা করে শাহাদতের অমৃত পান করেছেন তা একদিকে যেমন ইতিহাসের অক্ষয় কীর্তিরূপে চির বিরাজমান থাকবে, অপরদিকে অসত্য ও অন্যায় উৎপীড়নের বিরুদ্ধে প্রাণপণ সংগ্রামের প্রেরণা ও চেতনা জাগ্রত রাখবে ভবিষ্যতের মানবগোষ্ঠীর জন্যে।
উক্ত ঘটনার চল্লিশ বৎসর পরে Calcutta Review তে একটি বেনামী নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। তাতে তিতুমীরের সমসাময়িক কোম্পানী সরকারের এই বলে সমালোচনা করা হয় যে, তিতুমীরের রাজদ্রোহিতামূলক কর্মতৎপরতার প্রতি সরকার উদাসীন ছিলেন। এ নিবন্ধকারের মতে তিতুমীর রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের অভিলাষী ছিলেন। অতএব সরকারের পূর্বাহ্নে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করা উচিত ছিল। তিনি আরও বলেন যে, তিতুমীর এবং তাঁর মতাবলম্বীগণ কোম্পানী শাসনের অবসান দাবী করে এবং ইংরেজদের দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত মুসলমানদেরকে সার্বভৌম ক্ষমতার উত্তরাধিকারী বলে দাবী করে। হান্টারও এরূপ মন্তব্য করেন। [২]
হান্টার সাহেব হিন্দু জমিদার, নীলকর ও কতিপয় পাদ্রীর অমূলক ও উদ্দেশ্যমূলক অভিযোগগুলিই অন্ধভাবে বিশ্বাস করে তার গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছেন। সাইয়েদ আহমদ শহীদ সম্পর্কেও হান্টার অত্যন্ত জঘন্য ও অশালীন মন্তব্য করেছেন। যথাস্থানে তা আলোচনা করা হবে।
বারাসতের অধীন নারিকেলবাড়িয়ার হাংগামার কারণ ও প্রকৃতি নির্ণয়ের জন্যে J. R. Colvin কে নিযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি প্রামাণ্যসূত্রে গৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে যে রিপোর্ট পেশ করেন তা এখানে বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তিনি নিশ্চয়তার সাথে বলেন যে, হাংগামাটি ছিল একটি সম্পূর্ণ স্থানীয় ব্যাপার এবং যে সমস্ত অধিবাসী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সাথে জড়িত ছিল তারা কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক ছিলনা। দুই একজন ব্যতীত তারা সকলে ছিল বারাসতের উত্তরাঞ্চলের লোক। তারা ছিল সকলে প্রজা (রায়ত), তাঁতী ও সাধারণ শ্রেণীর মুসলমান। [৩]
কলভিনের উক্ত রিপোর্টের পরে সরকার বিষয়টির প্রতি তেমন কোন গুরুত্ব আরোপ করেননি।
ডক্টর এ আর মল্লিক Board's Collection এবং Bengal Criminal Judical Consultations-এর বরাত দিয়ে বলেন যে, কোম্পানীর সৈন্য পরিচালনা করেন মেজর স্কট্। তিতুমীরসহ প্রায় পঞ্চাশজন নিহত হন এবং ২৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। মৃতদেহগুলি জ্বালিয়ে ফেলা হয়। তিতুমীরের দলের লোকদের বাড়ীঘর লুণ্ঠন করা হয় এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদেরকেও গ্রেফতার করা হয়। [৪]
সর্বমোট ১৯৭ জনের বিচার হয়। তন্মধ্যে গোলাম মাসুমের প্রাণদন্ড, ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং ১২৮ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড হয়। বিচারকালে চারজনের মৃত্যু হয়। ৫৩ জন খালাস পায়।
তিতুমীরের জ্যেষ্ঠপুত্র সাইয়েদ গওহার আলীর দক্ষিণ বাহু গোলার আঘাতে উড়ে যায় বলে তাকে কারাদন্ড থেকে মুক্তি দেয়া হয়। অন্যপুত্র তোরাব আলী অল্পবয়স্ক ছিল বলে তার দু'বৎসর সশ্রম কারাদন্ড হয়। তৎকালীন সরকার পরে নিজেদের ভ্রম বুঝতে পেরে তিতুমীরের তিনপুত্রের জন্যে ভাতার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু হিন্দুলীগের চেষ্টায় পরে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। [৫]
উপরের আলোচনায় এ কথা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, প্রকৃত ঘটনা সরকারের জানা থাকলে হয়তো ব্যাপার এতদূর গড়াতোনা। জমিদারদের মুসলিম বিদ্বেষ, মিথ্যা প্রচারণা, দরিদ্র প্রজাবৃন্দের উপর তাদের অসীম প্রভাব এবং তদুপরি দারোগা রামরাম চক্রবর্তীর একতরফা এবং একদেশদর্শী মনগড়া রিপোর্ট কর্তৃপক্ষকে প্রকৃত ঘটনা থেকে দূরে রেখেছে। অপরদিকে জমিদার নীলকরদের সীমাহীন অমানুষিক অন্যায় অত্যাচার এবং সরকারের নিকটে বিচার প্রার্থনা করে ব্যর্থ মনোরথ হওয়ায় প্রতিপক্ষকে চরমপন্থা অবলম্বন করতে হয়েছিল। এছাড়া তাদের গত্যন্তর ছিলনা। কলভিনের রিপোর্টেও এ কথাই বলা হয়েছে। প্রজাবৃন্দের উপর যে কোন উপায়ে অত্যাচার, উৎপীড়ন করার সীমাহীন ক্ষমতা ছিল জমিদারদের। কলভিন এটাকেই হাংগামার মূল কারণ বলে বর্ণনা করেন। তিনি আরও বলেন যে এমতাবস্থায়, যেখানে দোষী ব্যক্তি প্রভূত সম্পদের মালিক, সেখানে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া ছিল অসম্ভব ব্যাপার। [৬]
টিকাঃ
১. শহীদ তিতুমীর : আবদুল গফুর সিদ্দিকী, পৃঃ ৯৫-৯৬
২. Calcutta Review No. Cl, p. 184 and 179; W. W. Hunter, Bangladesh First Edition 1975, p. 36
৩. Board's Collection, 54222, p. 400; Colvin to Barwell, 8 March 1832, para 4; A R Mallick : British Policy & the Muslims in Bengal, p. 87
৪. Dr. A. R. Mallick British Policy & the Muslms in Bengal, p. 86
৫. শহীদ তিতুমীর, আবদুল গফুর সিদ্দিকী, পৃঃ ১০০
৬. A. R. Mallick : British Policy & the Muslims in Bengal, p. 88; Board's Collection, 54222, Colvin's Report, para 36