📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 ফকীর আন্দোলন

📄 ফকীর আন্দোলন


ফকীর আন্দোলনের যতোটুকু ইতিহাস জানতে পারা যায়, তার থেকে প্রমাণিত হয় যে, পলাশী যুদ্ধের পর এবং বিশেষ করে ১৭৬৪ সালে মীর কাসেমের পরাজয়ের পর ইস্ট ইন্ডিয়া 'দেওয়ানী' লাভ ক'রে যখন তাদের অত্যাচারমূলক শাসন দন্ড চালাতে শুরু করে তার পর থেকে 'ফকীর বিদ্রোহ' শুরু হয় এবং এর পরিসমাপ্তি ঘটে ১৮৩৩ অথবা ১৮৩৪ সালে। ফকীর বিদ্রোহের পশ্চাতে কোন মহান উদ্দেশ্য ছিল কিনা, এবং বিদ্রোহ পরিচালনার জন্যে কোন সুসংগঠিত ও সুশৃংখল বাহিনী ছিল কিনা, তা বলা মুস্কিল। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন স্থানে যে ফকীর বিদ্রোহ হয়েছিল, তাদের মধ্যে কোন যোগসূত্র ছিল কিনা, তাও বলা কঠিন। তবে যে কারণে তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন তা হলো একাধারে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ও তাদের অনুগ্রহপুষ্ট নতুন হিন্দু জমিদার, মহাজনদের অমানুষিক অত্যাচার উৎপীড়ন。

তাদের অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সৃষ্ট ও আশ্রয়পুষ্ট শোষণকারী, জমিদারদের উচ্ছেদ করা ও তাদের অর্থাগার লুট করা। উত্তরবংগে এদের অভিযানের ফলে বহু জমিদার ইতিপূর্বেই (১৭৭৩) ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন স্থানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। (ময়মনসিংহ ফকীর অভিযান, খালেকদাদ চৌধুরী, ডঃ হাসান জামান সম্পাদিত 'শতাব্দী পরিক্রমা', পৃঃ ২৬)।

ফকীর আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মজনু শাহ, মাজু শাহ, টিপু পাগল ও গজনফর তুর্কশাহ। খালেকদাদ চৌধুরী তাঁর ময়মনসিংহে ফকীর অভিযান প্রবন্ধে মজনু শাহকে মাজু শাহের বড়ো ভাই বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সম্পর্কে এতটুকু জানা যায় যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনের বিরুদ্ধে তিনি একটি সশস্ত্র বাহিনী গঠন করেন। ১৭৬৪ সালে মীর কাসেম আলীর পরাজয়ে... এ দেশে ইংরেজ অধিকার বদ্ধমূল হয়। কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলের বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীতে ঐ একই সালে মজনুর (মজনু শাহ) অনুচরদের হাতে ব্রিটিশ শক্তিকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। ('বিপ্লব আন্দোলনে দক্ষিণবংগের অবদান'- আজিজুর রহমান, হাসান জামান সম্পাদিত 'শতাব্দী পরিক্রমা', পৃঃ ১৮০)।

১৭৮৪ সালে মাজুশাহ ময়মনসিংহ, আলাপসিং, জাফরশাহী এবং শেরপুর পরগণার জমিদারদের সমস্ত ধনদৌলত লুণ্ঠন করে। সেখানে সংবাদ রটে যে, মাজু শাহের ভাই মজনু শাহ দুইশ' দুর্ধর্ষ ফকীরসহ জাফরশাহী পরগণায় আসছেন। তাঁর এই অভিযানের ভয়ে জমিদার এবং প্রজারা অন্যত্র পালিয়ে যায়। কিন্তু ঢাকার চীফ্ মিঃ ডে-র রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, বেগমবাড়ীর সৈন্যবাহিনীই সেই অভিযান প্রতিরোধ করে। ফলে ফকীরেরা ফিরে যায়। মিঃ ডে-র রিপোর্টে আরও উল্লেখ আছে যে, জমিদারদের ধন সম্পদ লুণ্ঠনের ব্যাপারটি সত্য নয়। খাজনা ফাঁকি দেয়ার জন্যে সুচতুর ও অসাধু জমিদারেরা এরূপ মিথ্যা সংবাদ রেভেনিউ কমিটির কাছে পাঠিয়েছিল। (শতাব্দী পরিক্রমা, পৃঃ ২৭)।

পুনরায় ফকীর অভিযান শুরু হয় দু'বছর পর ১৭৮৬ সালে। ময়মনসিংহকে ফকীরদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্যে লেফ্টন্যান্ট ফিন্ডকে ঢাকা পাঠানো হয়। ময়মনসিংহের কলেক্টর রাউটনের সাহায্যের জন্যে আসাম গোয়ালপাড়া থেকে ক্যাপ্টেন ক্লেটনকে পাঠানো হয়। সুসজ্জিত ইংরেজ সৈন্যদের সাথে ফকীরদের যে প্রচন্ড সংঘর্ষ হয়, তাতে ফকীর বাহিনী পরাজিত হয়ে ছত্রভংগ হয়ে যায়। তারপর আর বহুদিন যাবত তাদের কোন তৎপরতার কথা জানা যায় না।

ফকীরদের অভিযান বন্ধ হওয়ার পর জমিদারগণ তাদের ক্ষয়ক্ষতি পূরণের নাম করে প্রজাদের নিকট থেকে বর্ধিত আকারে রাজস্ব আদায় করতে থাকে এবং নতুন কর ধার্য করতে থাকে। তাতে প্রজাদের দুর্দশা চরমে পৌঁছে।

প্রজাদের নির্যাতনের অবসানকল্পে ১৮২৬ সালে টিপু পাগল নামক জনৈক প্রভাবশালী ফকীর কৃষক প্রজাদের নিয়ে এক শক্তিশালী বাহিনী গঠন করেন। জমিদারেরা সকল ন্যায়নীতি ও ১৭৯৩ সালের রেগুলেশন নং-৮ অগ্রাহ্য করে প্রজাদের উপর নানাবিধ 'আবওয়াব' ধার্য করতে থাকে। এসব আবওয়াব ও নতুন নতুন উৎপীড়নমূলক কর জবরদস্তি করে আদায় করা হতো। তাছাড়া জমিদারেরা আবার প্রতিপত্তিশালী লোকদের কাছে তাদের জমিদারী অস্থায়ীভাবে উচ্চমূল্যে ইজারা দিত। ইজারাদারেরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপীড়নের মাধ্যমে প্রজাদের কাছ থেকে উচ্চহারে খাজনা আদায় করতো। এসব উৎপীড়ন বন্ধের জন্যে টিপু প্রজাদেরকে সংগঠিত করেন。

এসব অভিযানকারী ফকীরদেরকে ইতিহাসে অনেকে লুণ্ঠনকারী দস্যু বলে অভিহিত করেছেন। আসলে ব্যাপার তা নয়। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা ছিলেন জনগণের শ্রদ্ধেয় অলী-দরবেশ শ্রেণীর লোক।

সুসুজ পরগণার লেটীরকান্দা গ্রামের এক প্রভাবশালী ফকীরের মস্তান ছিলেন টিপু পাগল। তিনি একজন কামেল দরবেশ ছিলেন বলে সকলে বিশ্বাস করতো। বহু অলৌকিক কাহিনী তাঁর সম্বন্ধে আজো প্রচলিত আছে এবং তাঁর মাজারে ওরস উপলক্ষে আজো বহু লোকের সমাগম হয় (খালেকদাদ চৌধুরী, শতাব্দী পরিক্রমা, পৃঃ ২৮-২৯)।

মানুষকে ধর্মকর্ম শিক্ষাদান করা এসব ফকীরের কাজ ছিল। কিন্তু জনসাধারণের চরম দুর্দশা দেখে তাঁদের অন্তরাত্ম কেঁদে উঠেছিল। তার ফলে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে তাঁরা মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়েছেন।

এসব ফকীরের দল অসভ্য বর্বর ছিল-তাও নয়। তাঁরা ছিলেন শিক্ষিত ও রুচিবোধ সম্পন্ন। এমনকি টিপুর মাতার মধ্যেও ছিল অসাধারণ সাংগঠনিক যোগ্যতা। টিপু ও তাঁর বাহিনীকে প্রেরণা যোগাতেন টিপু জননী। ১৮২৫ সালে টিপুর নেতৃত্বে ফকীর দল জমিদারদের খাজনা বন্ধের আন্দোলন করে। জমিদারদের বরকন্দাজ বাহিনী ও ফকীরদের মধ্যে এক সংঘর্ষে বরকন্দাজ বাহিনী নির্মূল হয়ে যায়। জমিদারগণ কোম্পানীর শরণাপন্ন হয়। কোম্পানী টিপু ও তাঁর সহকারী গজনফর তুর্কশাহকে বন্দী করার জন্যে একটি সশস্ত্র সেনাবাহিনী পাঠায়। একটি সেনাদল পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায় কিন্তু অপর একটি দল টিপুকে বন্দী করে। তুর্কশাহ তার দল নিয়ে কোম্পানীর সেই সেনাদলকে আক্রমণ করে টিপুকে মুক্ত করেন।

এ ঘটনার পর ম্যাজিট্রেট ডেস্পিয়ার একটি শক্তিশালী ও সুশিক্ষিত সেনাবাহিনী নিয়ে শেরপুর আগমন করে। টিপু বাহিনীর সাথে প্রচন্ড যুদ্ধে টিপু তাঁর জননীসহ বন্দী হন।

পরবর্তীকালে ১৮৩৩ সালে টিপুর দু'জন শক্তিশালী সহকর্মীর নেতৃত্বে ফকীরদল পুনরায় সংঘবদ্ধ হয় এবং শেরপুর থানা আক্রমণ করে তা জ্বালিয়ে দেয়। তারপর ক্যাপ্টেন সীল ও লেফ্যান্ট ইয়ংহাজবেন্ডের অধীনে একটি সেনাবাহিনী প্রেরিত হয় ফকীর বাহিনী দমন করার জন্যে। এক প্রচন্ড সংঘর্ষ হয় এবং এই সংঘর্ষে ফকীর বাহিনী পরাজিত ও ছত্রভংগ হয়ে যায়।

উপরে ফকীর বিদ্রোহের কিছু বিবরণ দেয়া হলো। তবে ফকীরদের সম্পর্কে যে ভ্রান্ত ধারণা ইংরেজ লেখক ও ইতিহাসকারদের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে তা অনুমান করার যথেষ্ট কারণ আছে। ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁদেরকে বেদুইন বলেছেন, আর হান্টার সাহেব বলেছেন 'ডাকাত'। তাঁদের আক্রমণ অভিযানে কয়েক দশক পর্যন্ত নব প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশরাজ এখানে টলটলায়মান হয়ে পড়েছিল, সম্ভবত: সেই আক্রোশেই তাদের ইতিহাস বিকৃত করে রচনা করা হয়েছে।

উপরে মজনু শাহ ও মাজু শাহকে দুই ভাই বলা হয়েছে। এর সত্যাসত্য যাচাই করার কোন ঐতিহাসিক তথ্য বা উপাদান আমাদের কাছে নেই। তবে কেউ কেউ বলেছেন মজনু শাহ্ ভারতের গোয়ালিয়র রাজ্যের মেওয়াত এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। কানপুরের চল্লিশ মাইল দূরে অবস্থিত মাকানপুরে অবস্থিত শাহ্ মাদারের দরগায় মজনু শাহ্ বাস করতেন। সেখান থেকেই হাজার হাজার সশস্ত্র অনুচরসহ তিনি বাংলা বিহারের বিভিন্ন স্থানে ইংরেজ ও অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। তাঁর কার্যক্ষেত্র বিহারের পূর্ণিয়া অঞ্চল এবং বাংলার রংপুর, দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি, কুচবিহার, রাজশাহী, মালদহ, পাবনা, ময়মনসিংহ ছিল বলে বলা হয়েছে।

১৭৭২ সালের প্রথমদিকে মজনু শাহ বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র অনুচরসহ উত্তর বংগে আবির্ভূত হন। তাঁর এ আবির্ভাবের কথা জানতে পারা যায় রাজশাহীর সুপারভাইজার কর্তৃক ১৭৭২ সালের ২২শে জানুয়ারী তারিখে কোম্পানীর কাছে লিখিত এক পত্রে। তাতে বলা হয়, তিনশ' ফকীরের একটি দল আদায় করা খাজনার এক হাজার টাকা নিয়ে গেছে এবং আশংকা করা যাচ্ছে যে, তারা হয়তো পরগণা কাচারীই দখল করে বসবে। তলোয়ার, বর্শা, গাদাবন্দুক এবং হাউইবাজির হাতিয়ারে তারা সজ্জিত। কেউ কেউ বলে তাদের কাছে নাকি ঘূর্ণায়মান কামানও আছে। (স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, আবু জাফর, পৃঃ ৩৩)।

১৭৭৬ সালে মজনু শাহ বগুড়া জেলার মহাস্থান আগমন করে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। সে সময় বগুড়া জেলার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন মিঃ গ্লাডউইন। তিনি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে প্রাদেশিক কাউন্সিলের কাছে সৈন্য সাহায্য চেয়ে পাঠান। ১৭৮৬ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ফকীর সর্দারকে (মজনু শাহ) ইংরেজদের বিরুদ্ধে পর পর দু'টো সংঘর্ষের সম্মুখীন হতে হয়। উভয় ক্ষেত্রেই ফকীরদের পক্ষে যেমন কিছু লোক হতাহত হয়, ইংরেজদেরও অনুরূপভাবে কিছু ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে নিতে হয়।.. ঐতিহাসিক তথ্য থেকে অনুমিত হয় যে, এরপর গঙ্গা পাড়ি দিয়ে মজনু শাহ দেশে চলে যান। আর কোন দিন তাঁকে বাংলাদেশে দেখা যায়নি। আনুমানিক ১৭৮৭ সালে কানপুর জেলার মাখনপুর এলাকায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে সরকারী সূত্রে জানা যায়। তাঁর মৃতদেহ সেখান থেকে তাঁর জন্মভূমি মেওয়াতে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয় (স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, আবু জাফর, পৃঃ ৪০-৪১)।

মজনু শাহের মৃত্যুর পর তার পুত্র পরাগ আলী, পালিত পুত্র চেরাগ আলী, অন্তরঙ্গ ভক্ত মুসা শাহ, সোবহান শাহ, শমশের শাহ প্রমুখ শিষ্যগণ অষ্টাদশ শতকের শেষতক ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px