📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 বাংলার মুসলমান ও বোধনকৃত নতুন বাংলাভাষা

📄 বাংলার মুসলমান ও বোধনকৃত নতুন বাংলাভাষা


বাংলা ভাষার এবং বিশেষ করে বাংলা গদ্যের জন্ম ও ক্রমবিকাশের উপরে বাংলা ভাষার পন্ডিতগণ দীর্ঘ আলোচনা করেছেন এবং এর উপরে বিরাট বিরাট গ্রন্থও রচিত হয়েছে। সে আলোচনার অবকাশ এখানে নেই। তবে, বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস থেকে বাংলা ভাষার আলোচনা বাদ দিলে ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হবে। সেজন্যে সংক্ষেপে হলেও এ বিষয়ে মূলকথা কিছু বলে রাখা দরকার। বাংলাভাষার ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায় ১৭৭৮ সালের পূর্বে এর রূপ ও আকৃতি ছিল একরূপ এবং পরে এ ভাষা ধারণ করে আর এক রূপ।

এদেশে ইংরেজদের আগমনের পূর্বে বাংলাভাষার যে রূপ ছিল তার মধ্যে ছিল অজস্র আরবী-ফার্সী শব্দের মিশ্রণ। এ ছিল তৎকালীন সর্ববংগীয় মাতৃভাষা। এ সাহিত্যের বিকাশ ছিল প্রধানতঃ পদ্যে। গদ্য সাহিত্যের ততোটা প্রচলন ছিল না। থাকলেও তার উন্নতিকল্পে কোন প্রচেষ্টা চালানো হয়নি। এই যে আরবী-ফার্সী শব্দবহুল বাংলা ভাষা এ শুধু এ দেশের মুসলমানের ভাষা ছিল না। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষ সকলেরই ছিল এ ভাষা। চিঠিপত্র, দলিল দস্তাবেজ, সরকার সমীপে আবেদন নিবেদনে হিন্দু-মুসলমান উভয়েই এ ভাষা ব্যবহার করতো। প্রাচীন রেকর্ড থেকে গৃহীত জনৈক হিন্দু কর্তৃক একখানি পত্রের উদ্ধৃতি দৃষ্টান্তস্বরূপ পেশ করা হচ্ছে-

শ্রীরাম। গরীব নেওয়াজ সেলামত। আমার জমিদারী পরগণে কাকজোল তাহার দুইগ্রাম শিকিস্তি হইয়াছে সেই দুই গ্রাম পয়স্তি হইয়াছে-চাকালেএকবেলপুরের শ্রী হরে কৃষ্ট রায় চৌধুরী আজ জবরদস্তি দখল করিয়া ভোগ করিতেছে। আমি মালগুজারীর সরবরাহতে মারা পড়িতেছি-উমেদওয়ার যে সরকার হইতে আমিও এক চোপদার সরেজমিনেতে পঁহুচিয়া তোরফেনকে তলব দিয়া আদালত করিয়া হক দেলাইয়া দেন। ইতি ১১৮৫ তারিখ ১১ শ্রাবণ। ফিদবী জগতাধিব রায়। (চিঠিখানির ইংরেজী তারিখ হবে ১৭৭৮ সালের ২৬শে জুলাই)।

এ চিঠিখানির উল্লেখ করে সমকালীন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপর সজনীকান্ত এরূপ মন্তব্য করেন:
এক হিসেবে ১৭৭৮ খৃস্টাব্দে যে ভাষার প্রমাণিক আত্মপ্রকাশ দেখিতেছি তাহা দেশে মুসলমান প্রভাবের ফল। পরবর্তীকালে হেনরী-পিটার ফুস্টার ও উইলিয়াম কেরী বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত জননীর সন্তান ধরিয়া আরবী পারসীর অনধিকার প্রবেশের বিরুদ্ধে রীতিমত ওকালিত করিয়াছেন। (বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পৃঃ ৬২)।

সজনীকান্ত আরও বলেন: কিন্তু ইংরেজের আগমন না ঘটিলে আজিও আমাদিগকে 'গরীব নেওয়াজ সেলামত' বলিয়া শুরু করিয়া 'ফিদবী' বলিয়া শেষ করিতে হইতো। তাহা মংগলের হইত কি অমংগলের হইত, আজ সে বিচার করিয়া লাভ নাই।...১৭৭৮ খৃস্টাব্দে এই আরবী পারসী নিসূদন যজ্ঞের সূত্রপাত এবং ১৮৩৮ খৃস্টাব্দে আইনের সাহায্যে কোম্পানীর সময় সদর-মফস্বল আদালতসমূহে আরবী পারসীর পরিবর্তে বাংলা ও ইংরেজীর প্রবর্তনে এই যজ্ঞের পূর্ণাহুতি। বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মও এই বৎসরে। এই যজ্ঞের ইতিহাস অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। আরবী পারসীকে অশুদ্ধ ধরিয়া শুদ্ধ পদ প্রচারের জন্য সেকালে কয়েকটি অতিধান রচিত ও প্রকাশিত হইয়াছিল। সাহেবরা সুবিধা পাইলেই আরবী ও পারসীর বিরোধিতা করিয়া বাংলা ও সংস্কৃতকে প্রাধান্য দিতেন। ফলে দশ পনের বৎসরের মধ্যেই বাংলা গদ্যের আকৃতি ও প্রকৃতি সম্পূর্ণই পরিবর্তিত হইয়াছিল। (বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস-পৃঃ ৩২)।

উপরে বর্ণিত উইলিয়াম কেরী সায়েবদের আরবী-ফার্সীর বিরুদ্ধে ওকালতির কারণ ছিল। আবদুল মওদূদ যথার্থ বলেছেন- প্রাচ্য খন্ডে ইউরোপের বিজয়াভিযান হয়েছিল সুপরিকল্পিত তিনটি উপায়ে : পণ্যবাহী বণিকরূপে, তার পিছনে অস্ত্র নিয়ে পণ্য নিরাপত্তার অজুহাতে এবং তাদের পিছনে মিশনারী নিয়ে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির তালিম দেয়ার মহৎ উদ্দেশ্যে। (আবদুল মওদূদঃ মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ... পৃঃ ৩৬৩)।

পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির তালিম দেয়ার জন্যে তৃতীয় পর্যায়ে এসেছিল খৃস্টান মিশনারীগণ। কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন দেশগুলিতে খৃষ্টধর্ম প্রচারের জন্যে ইংলন্ডে কতকগুলি ধর্মীয় সংস্থা গঠিত হয়েছিল; তাদের মধ্যে উইলবারফোর্সের নেতৃত্বে ক্লাপহাম উপদলটি (Clapham Seer) বিশেষ উল্লেখযোগ্য। চার্লস্ গ্রান্ট ছিলেন এ উপদলটির সদস্য এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর একজন ডিরেক্টর। তিনি ভারত ভ্রমণের পর এ দেশের অধিবাসীদের ধর্মীয় ও নৈতিক অবস্থার এক নৈরাশ্যজনক চিত্র তুলে ধরে বলেন, “তারা যে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে তার একমাত্র সমাধান হচ্ছে- তাদের মধ্যে খৃস্টধর্মের আলোক প্রজ্জ্বলিত করা। হিন্দুরা অজ্ঞ বলে তারা ভুল করছে। তাদের ভ্রান্তি তাদের কাছে তুলে ধরা হয়নি। তারা যে উচ্ছৃংখলতা ও পাপাচারে লিপ্ত আছে, তা দূর করার সর্বোৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে তাদের মধ্যে আমাদের আলোক ও জ্ঞান বিতরণ করা।”
(Grant's Observations, published in the printed parliamentary paper relating to the affairs of India Several Vol. viii (734), Appendix I. Published 1832, pp. 3-60; M. Fazlur Rahman : The Bengali Muslims & English Education, pp. 30-32)

খৃস্টান মিশনারীগণ তাদের ধর্ম প্রচারের জন্যে প্রধানতঃ এ দেশের হিন্দুকে বেছে নিয়েছিল। এ কাজের জন্যে তাদের অনিবার্যরূপে প্রয়োজন হয়েছিল বাংলাভাষা শিখবার ও শিখাবার। হুগলী শ্রীরামপুরে এ উদ্দেশ্যে তারা একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত করে। পূর্বে বলা হয়েছে- এযাবত বাংলায় যে বাংলা ভাষা রূপ লাভ করেছিল-তা ছিল মিশ্র বাংলা অর্থাৎ আরবী-ফার্সী শব্দ মিশ্রিত বাংলা। যদিও এ বাংলা হিন্দু মুসলমান উভয়ের কথ্যভাষা ছিল, তথাপি হিন্দু ব্রাহ্মণ পন্ডিতগণ এ ভাষাকে ঘৃণা করতেন। মুসলমান জাতি তাদের কাছে 'ম্লেচ্ছ', 'যবন' ও ঘৃণিত জীব। তাদের আরবী-ফার্সী ভাষাও তাদের কাছে ছিল ঘৃণিত। সম্ভবতঃ গোঁড়া হিন্দু পন্ডিতগণ আরবী-ফার্সী শব্দের মধ্যে 'গোমাংসের' গন্ধ অনুভব করতেন। এ ভাষাকে তাঁরা প্রাকৃত বা লৌকিক আখ্যা দিয়ে অভিশাপ করলেন। ইতিপূর্বে মুসলমান সুলতানদের আমলে এ ভাষায় অনেক হিন্দুধর্ম-গ্রন্থ অনূদিত হয়েছিল। একালের পন্ডিতগণ ফতোয়া দিলেন: অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানিশ্চ, ভাষায়াং মানবঃ শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ। -ভাষায় অর্থাৎ লৌকিক ভাষায় অষ্টাদশ পুরাণ রামচরিত ইত্যাদি যে মানব শুনবে, তার ব্যবস্থা রৌরব নরকে।
(আবদুল মওদূদ: মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ... পৃঃ ৩৪৪)।

এ কথা খৃস্টান মিশনারীগণও ভালোভাবে উপলব্ধি করেন যে, যে ভাষার প্রতি হিন্দু পন্ডিতগণ ঘৃণা পোষণ করেন, সে ভাষার শুদ্ধিকরণ ব্যতীত তার দ্বারা খৃস্টধর্মে আকৃষ্ট করা কষ্টকর হবে। তাই তাঁরা এক ঢিলে দুই পাখী মারার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হন। ভাষাকে আরবী-ফার্সীর ছোঁয়াচ্ থেকে রক্ষা করে হিন্দুর গ্রহণযোগ্য করা, এবং মুসলমানদের বাংলা মাতৃভাষার নিসূদন যজ্ঞ বা ধ্বংসযজ্ঞ সম্পাদন করা যার উল্লেখ সজনীকান্ত করেছেন। এ মহান (?) উদ্দেশ্যে নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড (Halhed) ১৭৭৮ সালে A Grammar of the Bengali Literature নামে বাংলা ব্যাকরণ প্রণয়ন করেন এবং শ্রীরামপুর প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। মুদ্রিত গ্রন্থ হিসাবে এইটিই ছিল প্রথম যাতে প্রথম বাংলা অক্ষর ব্যবহৃত হয়। এ ব্যাকরণের মাধ্যমে এতদিনের প্রচলিত বাংলা ভাষার পরিবর্তে এক নতুন বাংলা ভাষার সৃষ্টি হয়। যে ভাষা ছিল একেবারে আরবী- ফার্সী শব্দ বিবর্জিত এবং সংস্কৃত শব্দবহুল। ব্যাকরণটির ভূমিকায় হ্যালহেড বলেন, "এ যুগে তাঁরাই মার্জিত ভাষায় কথা বলেন, যাঁরা ভারতীয় ক্রিয়াপদের সংগে অজস্র আরবী ফার্সী বিশেষ্যের মিশ্রণ ঘটান।” অতএব একথা নিঃসন্দেহ যে, আঠারো শতকের মার্জিত বাংলা কথ্যভাষা এবং গদ্য ভাষার কাঠোমোতে ছিল অজস্র আরবী-ফার্সী শব্দের মিশ্রণ—যার দৃষ্টান্ত উপরে বর্ণিত জনৈক হিন্দু জগতাধিব রায়ের পত্রে আমরা লক্ষ্য করেছি।

উল্লেখ্য যে, কোম্পানীর ইংরেজ সিভিলিয়ানদেরকে বাংলা ভাষা শিক্ষা দেয়ার জন্যে ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগ খোলা হয়। উইলিয়াম কেরী হন এ বিভাগের অধ্যক্ষ। তাঁর অধীনে আটজন পন্ডিত নিযুক্ত হন। তাঁদের মধ্যে মৃত্যুঞ্জয় তর্কালংকার ও রামরাম বসুর নাম সমধিক প্রসিদ্ধ। তাঁদের সহায়তায় কেরী বাংলা গদ্য পুস্তক রচনা ও প্রকাশ করতে থাকেন। প্রথমে রচিত হয় 'কথোপকথন' ও পরে 'ইতিহাস মালা'। বলা বাহুল্য গ্রন্থ দুটির ভাষা ছিল সংস্কৃত স্টাইলের এবং বিষয়বস্তুও ছিল মুসলমানবর্জিত। প্রতাপ আদিত্য, রূপ সনাতন ও বীরবল ছিলেন ভারতীয় ইতিহাসের উপজীব্য চরিত্র। অতএব ভাষা ও বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে পন্ডিতদের সাধনায় ও হিন্দুত্বের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠায়—ইংরেজের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়েছিল ক্ষেত্র প্রশস্ত। একদিকে মিশনারীদের ছিল একটা অসভ্য জাতিকে অন্ধকার হতে আলোকে নিয়ে যাওয়ার দম্ভ। আর অন্যদিকে ছিল পন্ডিতদের সংস্কৃতের তনয়ারূপে বাংলাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে হিন্দুদের মাহাত্ম্য প্রকাশের অসীম উদ্যম ও আগ্রহ। এ দুটি উদ্দেশ্যের ধারা সম্যকভাবেই প্রতিফলিত দেখা যায়—এই কেরীর সৈনাপত্যে পন্ডিতদের রচিত ওই সময়ের গ্রন্থগুলির ভাষা ও বিষয়বস্তুর মূল্যায়নকালে।
(বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস, সজনীকান্ত দাস-পূঃ ১১২; আবদুল মওদূদ: মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ: সংস্কৃতির রূপান্তর, পৃঃ ৩৬৪)।

অতএব এসব তথ্য থেকে একথা আজ দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট যে, ইংরেজ ও হিন্দুর যোগসাজসে মুসলমানরা শুধুমাত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্র থেকেই বিতাড়িত হয়নি। বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে তাদের যে মাতৃভাষাটি গড়ে উঠেছিল তাকেও নস্যাৎ করা হলো। সমাজের উচ্চস্থান থেকে নীচে নিক্ষেপ করা হলো। মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে অন্যকে দেয়া হলো এবং শেষ সম্বল মুখের ভাষাটিও ধ্বংস করা হলো 'নিসূদন যজ্ঞের' মধ্যমে।

শ্রদ্ধেয় আবদুল মওদূদ বলেন-"এই মিশ্ররীতির বাংলাভাষায় সাহিত্য গড়ে উঠার মুখেই বণিকের তুলাদণ্ড হলো রাজদন্ডে রূপান্তরিত এবং বণিকের তল্পীবাহক মিশনারীরাও দিলেন সাহিত্যের ভাষার মোড় পরিবর্তন করে। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তকরা বাংলা ভাষার কাঠামোকেও নতুন ছাঁচে তৈরী করে দিলেন-বাবু সম্প্রদায়ের জন্যে। তার দরুন বাবু কাচারের আবাহন হলো যে ভাষায়, তা কেবল সংস্কৃত ঘেঁষা নয়, একেবারে সংস্কৃতসম। আর এটিও হয়েছে সুপরিকল্পিত সাধনায়-হিন্দু পন্ডিতরা উল্লসিত হলেন তার দরুন-সংস্কৃত ভাষা ও কৃষ্টির নব প্রবর্তনের সম্ভাবনায় এবং মিশনারীকুল তৎপর হয়েছিলেন মুসলমানদের মুখের ভাষা কেড়ে নিয়ে তাকে সাহিত্য ও কাঁচারের দিক দিয়েও নিঃস্ব করে দিতে।”
(আবদুল মওদূদ: মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশঃ পৃঃ ৩৫৮)।

ইংরেজ তথা মিশনারী-পূর্ব বাংলা ভাষাকে ভিত্তি করে মুসলমানদের যে এক নতুন বাংলাভাষা গড়ে উঠে, যার মধ্যে শক্তি ও প্রেরণা সঞ্চার করছিল আরবী ও ফার্সী তাকে বলা যেতে পারে মুসলমানী বাংলা। স্বভাবতঃই তা মোটেই গ্রহণযোগ্য ছিল না হিন্দুদের কাছে। ১৮৩৭ সালের পর হিন্দুবাংলা (আরবী- ফার্সী শব্দ বর্জিত সংস্কৃত শব্দবহুল বাংলা) প্রাদেশিক মাতৃভাষা হিসাবে সরকার কর্তৃক স্বীকৃতি লাভের পর মুসলমানী বাংলার অগ্রগতির পথ রুদ্ধ হয়। অফিস- আদালত থেকে এতদিনের প্রচলিত ফার্সী ভাষা তার আপন মর্যাদা হারিয়ে ফেলে এবং নতুন বোধনকৃত বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতে থাকে। নতুন বাংলা ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে থাকে এবং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পর এ ভাষা হিন্দু সংস্কৃতি ও জাতীয় আশা-আকাংখার বাহন হিসাবে মর্যাদা লাভ করে।

এ নতুন বাংলা ভাষাকে স্কুল কলেজে মাতৃভাষা হিসাবে বাধ্যতামূলক করা হয়। এমনকি যে কোলকাতা মাদ্রাসায় অনেক ছাত্র মুসলমানী বাংলাও জানতোনা, সেখানেও এই নতুন বাংলা পাঠ্য করা হয়। প্রফেসার উইলসন প্রমুখ ইউরোপীয় শিক্ষাবিদগণ সংস্কৃত ভাষার সপক্ষে এমন জোর ওকালতি শুরু করেন যে, সায়েবদের সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করাটা একটা চরম বাতিকে পরিণত হয়। উইলসন একটি সহজ সংস্কৃত ব্যাকরণ রচনা করে সায়েবদের সংস্কৃত শিক্ষার পথ সুগম করে দেন। ১৮২৮ সালে তিনি'বাংলাভাষায় ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান অনুবাদ সমিতির' প্রেসিডেন্ট হন এবং General Committee of Public Instruction বা জনশিক্ষা সাধারণ কমিটির পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন বাংলাভাষায় বহু পুস্তক রচনা করেন। এসব বইপুস্তক পাঠ্যপুস্তকে পরিণত হয়।

মুসলমানী বাংলা এবং নতুন বাংলার মধ্যে শুধু ভাষার দিক দিয়েই নয়- বিষয়বস্তু, সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাসের দিক দিয়ে এমনই আকাশ-পাতাল পার্থক্য ছিল যে, মুসলমানদের জন্যে নতুন ভাষা গ্রহণ অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে পড়ে।

দৃষ্টান্তস্বরূপ কয়েকটি গ্রন্থের নাম নিম্নে প্রদত্ত হলোঃ
করুণা নিধন বিলাস, পদাংক দূত, বিল্ব মংগল, গীতা গোবিন্দ-শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কিত,
চন্ডী, আনন্দ মংগল দূর্গা সম্পর্কিত, মহিমা স্তব, গংগা ভক্তি—শিব গংগা সম্পর্কিত
চৈতন্য চরিতামৃত, রস মঞ্জরী, আদিরস, পদাবলী, রতিকাল, রতি বিলাস- প্রেমোদ্দীপক।

স্কুলে পাঠ্যপুস্তক হিসাবে গৃহীত :
শিশু বোধক—বাংলার সর্বত্র এবং গ্রাম্য স্কুলগুলিতে ব্যাপকভাবে পড়ানো হয়। এর মধ্যে ছিল বহু সংস্কৃত শ্লোকের অনুবাদ যা প্রধানতঃ হিন্দু দেব-দেবী সম্পর্কে লিখিত। এর প্রথম পাঠগুলি- সরস্বতী, গংগা প্রভৃতি সমীপে প্রার্থনা দিয়ে শুরু করা হয়েছে।

তারপর আসে আনন্দ মংগলের কথা। এটাও আগাগোড়া হিন্দুধর্ম ও তাদের দেব-দেবীদের স্তবস্তুতিতে পরিপূর্ণ। এ ধরনের আরও বহু পাঠ্যপুস্তকের নাম পাওয়া যায়। (M. Fazlur Rahman The Bengali Muslims & Eng. Education, pp. 106-108)

উল্লেখ্য যে, সংস্কৃতসম হিন্দুবাংলার পূর্বে যে বাংলা ভাষা কয়েক শতাব্দী যাবত লালিত-পালিত ও পরিপুষ্ট হচ্ছিল তা প্রধানতঃ ছিল পদ্যসাহিত্য বা পুঁথিসাহিত্য। এ সাহিত্যকে আধুনিককালে পুঁথিসাহিত্য হিসাবেই চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু এ সাহিত্যের যারা চর্চা করেছেন, তাঁদের দুজন 'মালে মুহাম্মদ' ও 'মুহাম্মদ দানিশ' এ সাহিত্যের রীতিকে বলেছেন 'চলতি বাংলা' এবং 'রেজাউল্লাহ' (১৮৬১) বলেছেন 'ইসলামী বাংলা'। ১৮৫৫ সালে পাদরী লং তাঁর গ্রন্থতালিকায় এ ভাষাকে বলেছেন 'মুসলমানী বাংলা' আর এ ভাষায় রচিত সাহিত্যের নামকরণ করেছেন 'মুসলমানী বাংলা সাহিত্য'।
(আবদুল মওদূদ: মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ... সংস্কৃতির রূপান্তর, পৃঃ ৩৫৫)।

এ সাহিত্যের প্রতি হান্টার সায়েবের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় এবং তিনি বলেনঃ আজ পর্যন্ত বদ্বীপ অঞ্চলের কৃষক সমাজ মুসলমান। নিম্নবংগে ইসলাম এতই বদ্ধমূল যে, এটি এক নিজস্ব ধর্মীয় সাহিত্য ও লৌকিক উপভাষার উদ্ভব ঘটিয়েছে। হিরাতের ফার্সী ভাষা থেকে উত্তর ভারতের উর্দু যতোখানি পৃথক, 'মুসলমানী বাংলা' নামে পরিচিত উপভাষাটি উর্দু হতে ততোখানি পৃথক।” (W. W. Hunter: The Indian Mussalmans, p. 146)।

এ সাহিত্যের যে নামই দেয়া হোক, তা ছিল না প্রাণহীন। কয়েক শতাব্দী যাবত তা লক্ষ লক্ষ মুসলমান নর-নারীর প্রাণে সাহিত্য তরংগ তুলেছে। তাদের চিন্তা-ভাবনা ও আশা-আকাংখাকে প্রভাবিত করেছে। শ্রী শ্রী কুমার বন্দোপাধ্যায় বলেন-
মুসলমান সাহিত্যের গল্পভান্ডারও নিতান্ত দরিদ্র ছিলনা। 'আরব্য উপন্যাস', 'হাতেম তাঈ', 'লায়লা মজনু', 'চাহার দরবেশ', 'গোলে বাকাওলী' প্রভৃতি আখ্যায়িকাগুলি নিশ্চয়ই বাঙালী পাঠকের সম্মুখে এক অচিন্তপূর্ব রহস্য ও সৌন্দর্যের জগত উন্মুক্ত করিয়াছিল। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে যখন ইংরেজী সাহিত্যের আদর্শে আমাদের উপন্যাস সাহিত্য ধীরে ধীরে গড়িয়া উঠিতেছিল তখন এই শ্রেণীর মুসলমানী গল্পের অনুবাদ আমাদের সাহিত্যিক প্রচেষ্টার একটা প্রধান অংগ হইয়াছিল। উহারা পাঠকের হৃদয় স্পর্শ ও রুচি আকর্ষণ করিতে না পারিলে আমাদের সাহিত্যিক উদ্যমের একটা মুখ্য অংশ কখনই উহাদের অনুবাদে নিয়োজিত হইতে পারিত না। অন্ততঃ এই সমস্ত গল্পের মধ্যে একটা চমকপ্রদ (Sensational), বর্ণবহুল (Romance), একটা নিয়ম-সংযমহীন সৌন্দর্য বিলাসের অপরিমিত প্রাচুর্য আছে, তাহাই আমাদের একশ্রেণীর ধর্মশাস্ত্রাস্বাদক্লিষ্ট, অবসাদগ্রস্ত রুচিকে অনিবার্য বেগে আকর্ষণ করিয়াছিল। (বংগসাহিত্যের উপন্যাসের ধারা, শ্রী শ্রী কুমার বন্দোপাধ্যায়-৪র্থ সং, পৃঃ ১৮-১৯)।

📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সাম্প্রদায়িকতা

📄 আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সাম্প্রদায়িকতা


আধুনিক বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি এবং সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে যাঁদের অবদান রয়েছে, তাঁদের মধ্যে রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার ও রাজা রামমোহনের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। প্রথমোক্ত দু'জন উইলিয়াম কেরী কর্তৃক নিযুক্ত পন্ডিতগণের অন্তর্ভুক্ত।

রামরাম বসুর 'প্রতাপাদিত্য' গ্রন্থ ১৮০১ সালে প্রকাশিত হয়। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার পাঁচখানি গ্রন্থ রচনা করেন, তার মধ্যে রাজাবলী (১৮০৮) বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তারপর আসে রামমোহনের নাম। তাঁর গদ্যসাহিত্য ছিল বলিষ্ঠ ও প্রাণবন্ত। কিন্তু এঁদের সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা বা মুসলিম বিদ্বেষ ছিল না। অবশ্যি মৃত্যুঞ্জয়ের 'রাজাবলী' ছিল চন্দ্র বংশের ক্ষেত্রজ সন্তান বিচিত্রাবলী থেকে বাংলাদেশের কোম্পানী শাসন প্রতিষ্ঠার একটা ধারাবাহিক ইতিহাস লেখার প্রথম প্রয়াস এবং মুসলমানী আমলটা অত্যন্ত অযত্নের সংগে বিদ্বেষদুষ্ট ভংগীতে লেখা।

পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের অংগনে দু'জন দিকপালের আবির্ভাব হয়। বাংলা পদ্যসাহিত্যে মাইকেল মধুসূদনের এবং গদ্য সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রের। বাংলা সাহিত্যে তাঁদের শ্রেষ্ঠ অবদান অনস্বীকার্য।

আবদুল মওদূদ বলেন- বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভার বিকাশক্ষেত্রে যখন মধ্যাহ্ন গগন বিরাজমান, তখন বাংলার রাজনৈতিক গগনেও মোড় ফিরে গেছে। তখন ইংরেজের সংগে হার্দিক সম্বন্ধে বিদারণ রেখা দেখা দিতে শুরু করেছে। ইংরেজের অনুগ্রহের ষোলআনা অংশটার এক পক্ষ প্রবল দাবী জানাচ্ছে আত্মসচেতন হয়ে। শিক্ষিত বর্ণহিন্দু সমাজে বেকার সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এবং তার দরুন তাদের মনে নৈরাশ্যভাব দেখা দেয়ায় তারা হিন্দুজাতীয়তা মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছে। বঙ্কিমচন্দ্র এই যুগমানসের সন্তান। তিনি রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ-মনের প্রতিভূ হিসেবে এবং হিন্দু জাতীয়তা মন্ত্রের উদ্যোক্তা ঋষি হিসেবে বাংলার সাহিত্যাকাশে আবির্ভূত হলেন। এবং এভাবে তীব্র সাম্প্রদায়িকতার যে বিষবহ্নি তিনি ছড়িয়ে দিলেন লেখনী মুখে, জগতের ইতিহাসে তার দ্বিতীয় নজীর নেই। প্রগাঢ় পান্ডিত্য, ক্ষুরধার বুদ্ধি ও গভীর বিশ্লেষণ শক্তির অধিকারী হয়েও সংকীর্ণ প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের আদর্শের-উদ্দেশ্যের ক্রীড়নক হয়ে তিনি মানবতার যে অকল্যাণ ও অসম্মান করে গেছেন, তারও পৃথিবীর ইতিহাসে তুলনা নেই। অস্ত্রের মুখে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, কালের প্রলেপে সে ক্ষতও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কিন্তু লেখনীর মুখে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তার নিঃশেষ নেই, নিরাময় নেই— যুগ থেকে যুগান্তরে সে ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে।
—আবদুল মওদূদ : মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ : সংস্কৃতির রূপান্তর, পৃঃ ৩৬৯-৭০)।

সাহিত্যের মাধ্যমে বঙ্কিম মুসলিম সমাজ ও জাতির বিরুদ্ধে যে বিষবহ্নি প্রজ্জ্বলিত করে গেছেন, দৃষ্টান্তসহ তার কিছু আলোচনা আমরা পূর্ববর্তী এক অধ্যায়ে করেছি। বাংলা তথা ভারত উপমহাদেশে হিন্দু মুসলমান সম্পর্কের চরম অবনতির জন্যে তাঁর সাহিত্যই প্রধানতঃ দায়ী।

বঙ্কিম তাঁর 'রাজসিংহ' ও 'আনন্দমঠ' মুসলমান বিদ্বেষের যে বিষবহ্নি উদগীরণ করেছেন সে বিষজ্বালায় এ বিরাট উপমহাদেশের দু'টি বৃহৎ সম্প্রদায়ের মধ্যে যেটুকু সম্প্রীতির ফল্গুধারা ছিল, তা নিঃশেষে শুষ্ক ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এ উপমহাদেশে মুসলমানের অস্তিত্বও বঙ্কিমচন্দ্র অস্বীকার করে তাদের বিতাড়িত করে সদাশয় ব্রিটিশজাতির আবাহনে ও প্রতিষ্ঠায় তিনি বার বার মুখর হয়ে উঠেছেন। (ঐ... পৃঃ ৩৭০)।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পূর্বে মুসলমানদের যে সাহিত্য সাধনা ছিল, তার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার কোন লেশমাত্র বিদ্যমান ছিল না। একথা হিন্দু সাহিত্যসেবীগণও মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেন।

মুসলমানদের কাব্য কাহিনীতে সাম্প্রদায়িক হিন্দুধর্মের পরিবর্তে আছে সুফী মতবাদের প্রভাব ও ছদ্মবেশী রূপকাভিপ্রায়, ও ইহার ঘটনাবলীও প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিবিম্ব নহে। জীবনোদ্ভূত এক উচ্চতর আদর্শ কল্পনার সুকুমার ভাবরঞ্জিত ও অসাধারণত্বের স্পর্শদীপ্ত। -(বংগ সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা, শ্রী শ্রী কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, ৪র্থ সং, পৃঃ ১৮-১৯)।

একথা উল্লেখ্য যে, সাহিত্যের অংগনে সাম্প্রদায়িকতার বীজ প্রথম বপন করেন ভূদেব মুখোপাধ্যায় তাঁর 'অঙ্গুরী বিনিময়ে' (১৮৫৭)। সম্ভবত তাঁর থেকে প্রেরণা লাভ করে বঙ্কিম সে বীজকে সাম্প্রদায়িকতার বিরাট বিষবৃক্ষে পরিণত করেন। বঙ্কিমের মৃত্যুর পরে বাংলা সাহিত্য সাম্প্রদায়িকতার পংকিলতা থেকে মুক্তি লাভ করতে পারেনি। তাঁর পদাংক অনুসরণ করে পরবর্তীকালেও লেখনী চালনা করেছেন পন্ডিত-অপন্ডিত, সাহিত্যিক-অসাহিত্যিক বর্ণহিন্দু সম্প্রদায়।

বাংলা সাহিত্যকে যে দু'জন মনীষী-কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-সুষমামন্ডিত ও কিরীটশোভিত করেছেন, তাদের লেখনীও সে পঙ্কিলতার স্পর্শমুক্ত হতে পারেনি। শরৎচন্দ্রের সাম্প্রদায়িকতা বিষদুষ্ট লেখনীর উদ্ধৃতি আমরা উপরে দিয়েছি।

কিন্তু কবি রবীন্দ্রনাথকেও যখন এ আবর্তে অবগাহন করতে দেখি তখন ক্ষোভে ও লজ্জায় স্বতঃই বেদনার্তকণ্ঠে মুসলমান বলে উঠে জুলিয়াস সীজারের মতো : Et tu Brute। তোমাকে ত রবীন্দ্রনাথ, এসবের ঊর্ধ্বে ভেবেছিলাম। এ সম্বন্ধে ব্যক্তিগত অভিমত প্রকাশ না করে রবীন্দ্রনাথের 'দুরাশা' গল্পটি ও 'শিবাজী উৎসব' কবিতা পাঠ করে দেখতে পাঠক সমাজকে অনুরোধ করি।
(আবদুল মওদূদ: সংস্কৃতির রূপান্তর, পৃঃ ৩৭১)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px