📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 বাংলায় মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা

📄 বাংলায় মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা


মালিক ইতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার কর্তৃক বাংলা বিজয়ের ফলে এ দেশে মুসলমানদের সর্বপ্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা লাভ হয়। এ সময় থেকে ক্রমাগত অব্যাহত গতিতে ভারতের পশ্চিমাঞ্চল, আফগানিস্তান, ইরান, আরব ও তুরস্ক থেকে অসংখ্য মুসলমান বাংলায় আগমন করতে থাকেন। অধিকাংশ এসেছিলেন সৈনিক হিসাবে, অবশিষ্টাংশ ব্যবসা-বাণিজ্য, ইসলাম প্রচার ও আশ্রয় গ্রহণের উদ্দেশ্যে। এভাবে বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যা হয়ে পড়ছিল ক্রমবর্ধমান।
মুহাম্মদ বিন বখতিয়ারের বাংলা বিজয় ছিল এক অতি বিস্ময়কর ব্যাপার। বলতে গেলে এ মানুষটিই এক ঐতিহাসিক বিস্ময়। তিনি ছিলেন তুর্কিস্তানের খাল্‌জ বংশসম্ভূত। তাই তাঁর বংশ পরিচয়ের জন্যে তাঁর নামের শেষে খালজী বা খিলজী শব্দ যুক্ত করা হয়। তাঁর পূর্ব পুরুষদের আবাসভূমি ছিল সীস্তানের পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত গারামসীর অথবা দান্তে মার্গো। ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী জীবিকা অর্জনের উদ্দেশ্যে জন্মভূমি ত্যাগ করে গজনী এবং অতঃপর ভারতের বাদাউনে আগমন করেন। তাঁর দেহ ছিল খর্ব ও হস্তদ্বয় অস্বাভাবিক রকমের দীর্ঘ। সম্ভবতঃ এ কারণেই গজনী ও দিল্লীর সামরিক বাহিনীতে তাঁর চাকুরীর আবেদন গৃহীত হয়নি। কিন্তু তাঁর মধ্যে যে অসীম সাহসিকতা ও দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনার যোগ্যতা ছিল তা বুঝতে পেরে বাদাউনের সিপাহসালার তাঁকে সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত করেন। এখান থেকেই তাঁর ভাগ্যোন্নয়ন শুরু হয়। তিরৌরী বা তরাইনের যুদ্ধের পর বখতিয়ারের চাচা, মুহাম্মদ-ই-মাহমুদ নাগাওরীর শাসনকর্তা আলী নাগাওরীর নিকট থেকে কষমন্ডী বা কষ্টমন্ডীর অধিকার লাভ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর বখতিয়ার তার অধিকার লাভ করেন। কিছুকাল পর তিনি অযোধ্যার মালিক মুয়াজ্জম হিসামউদ্দীনের নিকট গমন করেন। এ সময়ে তিনি অশ্ব ও অস্ত্রশস্ত্রাদি সংগ্রহ করেছিলেন বলে মালিক হিসামউদ্দীন তাঁকে দু'টি গ্রাম উপঢৌকন স্বরূপ দান করেন। গ্রাম দুটি কারো মতে ভগবৎ ও ডোইলি, কারো মতে সহলন্ড ও সহিলী অথবা কম্পিলা ও পতিয়ালি ছিল। গোলাম হোসেন সলিমীর 'রিয়াযুস্ সালাতীনে' এ গ্রাম দুটির নাম বলা হয়েছে কম্বালা ও বেতালি।
এখান থেকে মুহাম্মদ বখতিয়ার বিহারের দিকে অগ্রসর হয়ে কয়েকস্থানের ভূস্বামী বা প্রধানদেরকে পরাজিত করে প্রচুর মালে গণীমত হস্তগত করেন। তার দ্বারা তিনি বহু অশ্ব ও অস্ত্রশস্ত্রাদি সংগ্রহ করতে থাকেন। তাঁর বীরত্বের খ্যাতিও চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ঘোর, গজনী, খোরাসান প্রভৃতি অঞ্চলে বার বার বিদ্রোহ, যুদ্ধবিগ্রহ ও রক্তপাত সংঘটিত হতে থাকায় তথাকার বহুসংখ্যক অধিবাসী দেশত্যাগ করে ভারতে আগমন করে ভাগ্যের অন্বেষণে ঘুরাফেরা করতে থাকে। বখতিয়ারের সুনাম সুখ্যাতি শ্রবণ করে তারা দলে দলে তাঁর সেনাবাহিনীতে যোগদান করে। এভাবে বখতিয়ার হয়ে ওঠেন প্রবল শক্তিশালী।
তৎকালীন দিল্লীর সুলতান কুত্বউদ্দীন আইবেক বখতিয়ারের অসীম বীরত্বের কথা জানতে পেরে তাঁর সম্মানের জন্যে 'খিলাত' প্রেরণ করেন এবং এতে করে বখতিয়ারের শক্তি ও সাহস বহুগুণে বেড়ে যায়। তারপর তিনি সমগ্র বিহার প্রদেশে তাঁর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হন। অতঃপর তাঁর অভিযান বাংলার দিকে পরিচালিত হয় এবং ১২০৩ খৃস্টাব্দে বাংলার রাঢ় ও বরিন্দ অঞ্চল অধিকার করেন।
বাংলা আক্রমণকালে এর শাসক ছিলেন রায় লক্ষ্মণ সেন। রাজধানী ছিল নদিয়া। রাজধানীসহ এ অঞ্চলটিকে লক্ষ্মণাবতী বলা হতো। 'তাবাকাতে নাসিরী'তে এ সম্পর্কে এক মজার কাহিনী বিবৃত হয়েছে।
রাজ দরবারের গণক ব্রাহ্মণের দল এক ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেন যে, এ দেশ অচিরেই তুর্কী মুসলমানদের হস্তগত হবে। দেশ আক্রান্ত হলে রাজাকে বশ্যতা স্বীকার করতে হবে। অন্যথায় দেশবাসীকে প্রচুর রক্তপাত ও লাঞ্ছনার সম্মুখীন হতে হবে।
রাজা ব্রাহ্মণ-পন্ডিতগণকে জিজ্ঞাসা করেন যে, প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে এহেন মুসলিম অভিযানকারীর কোন চিহ্ন বর্ণনা করা হয়েছে কিনা, যা দেখে তাকে যথাসময়ে চিনতে পারা যায়। তাঁরা বলেন যে, সে তুর্কী সেনা সোজা দন্ডায়মান হলে তাঁর হস্তদ্বয় হাঁটু পর্যন্ত লম্বিত হবে। রাজা রায় লক্ষ্মণ সেন এ ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাবার জন্যে একদল বিশ্বস্ত লোক নিযুক্ত করেন। তাঁরা অনুসন্ধানের পর রাজাকে বলেন যে, মুহাম্মদ বখতিয়ারের মধ্যে উপরোক্ত চিহ্ন বিদ্যমান। এদিকে মুহাম্মদ বখতিয়ারের দুঃসাহসিক অভিযান ও তাঁর জয়জয়কার কারো অজ্ঞাত ছিল না। ব্রাহ্মণ পন্ডিতগণ, সম্মানী ও জ্ঞানী-গুণী, ভূস্বামী ও প্রধান প্রধান ব্যক্তি দেশ-পরিত্যাগ করে জগন্নাথ, কামরূপ এবং অন্যান্য নিরাপদ স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। রাজা তখনো তাঁর রাজধানী পরিত্যাগ করা সমীচীন মনে করেননি। হঠাৎ এক সময় মুহাম্মদ বখতিয়ার নদিয়া আক্রমণ করে রাজধানীতে প্রবেশ করলে, রাজা রাজ-প্রাসাদের পশ্চাদ্বার দিয়ে পলায়ন করে বিক্রমপুরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এভাবে সমগ্র লক্ষ্মণাবতী বখতিয়ারের করতলগত হয়- বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, মাত্র সতেরো জন অশ্বারোহীসহ মুহাম্মদ বখতিয়ার নদিয়া আক্রমণ ও জয় করেন।
অতঃপর তাঁর অভিযান বিস্তার লাভ করে এবং নবদ্বীপ ও গৌড় তাঁর করতলগত হয়। 'তারিখে ফেরেশতা'য় বর্ণিত আছে যে, মুহাম্মদ বখতিয়ার বাংলাদেশে রংপুর নামে এক নতুন রাজধানী নির্মাণ করেন। এর থেকে বুঝতে পারা যায় যে, বাংলার শুধু পূর্বাঞ্চল ব্যতীত সমগ্র রাঢ় ও বরেন্দ্র অঞ্চল অর্থাৎ পশ্চিম ও উত্তর বংগ তাঁর শাসনাধীন হয়েছিল। রায় লক্ষ্মণ সেন বিক্রমপুরে আশ্রয় গ্রহণ করলেও তাঁর পশ্চাদানুসরণ বখতিয়ার করেননি। যার ফলে বাংলার পূর্বাঞ্চল ছিল তাঁর শাসনের বাইরে। এক শতাব্দীকাল পর ১৩৩০ খৃস্টাব্দে মুহাম্মদ তোগলোক শাহ পূর্বাঞ্চল জয় করেন এবং সাতগাঁও ও সোনারগাঁও-এ যথাক্রমে রাজধানী স্থাপন করেন।
যাহোক, মুহাম্মদ বখতিয়ারের বাংলা বিজয়ের ফলে বহিরাগত মুসলমান দলে দলে এ দেশে বসতিস্থাপন করেন। ব্যবসা বাণিজ্য, সেনাবাহিনীতে চাকুরী ও অন্যান্য নানাবিধ উপায়ে জীবিকার্জনের নিমিত্ত অসংখ্য মুসলমান এ দেশে আগমন করেন এবং এ আগমনের গতিধারা অব্যাহতভাবে চলতে থাকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত।
মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের পর থেকে ১৭৫৭ খৃস্টাব্দে পলাশী প্রান্তরে মুসলিম রাজ্যের পতন পর্যন্ত পাঁচ শত চুয়ান্ন বৎসরে একশত একজন বা ততোধিক শাসক বাংলায় শাসন পরিচালনা করেন।
বাংলার মুসলিম শাসনকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়:
বাংলা- খিলজীদের অধীনে- ১২০৩-১২২৭ খৃঃ
বাংলা- দিল্লীর অধীনে- ১২২৭-১৩৪১ খৃঃ
বাংলা- ইলিয়াস শাহী বংশের অধীনে (প্রথম ধারা)- ১৩৪২-১৪১৩ খৃঃ
বাংলা- গনেশ জালাল উদ্দীনের অধীনে- ১৪১৪-১৪৪১ খৃঃ
বাংলা- ইলিয়াস শাহী বংশের অধীনে (দ্বিতীয় ধারা)- ১৪৪২-১৪৮৭ খৃঃ
হাবশী শাসনাধীন বাংলা- ১৪৮৭-১৪৯৩ খৃঃ
হুসেনশাহী বংশের অধীনে বাংলা- ১৪৯৩-১৫৩৮ খৃঃ
পাঠানদের অধীনে (শের শাহ্ ও সূর বংশ) বাংলা- ১৫৩৮-১৫৬৪ খৃঃ
কররাণী বংশের অধীনে বাংলা- ১৫৬৫-১৫৭৬ খৃঃ
মোগল শাসনাধীন বাংলা- ১৫৭৬-১৭৫৭ খৃঃ
সাড়ে পাঁচশত বৎসরাধিক কাল যাঁরা বাংলার মসনদে সমাসীন ছিলেন, তাঁদের মধ্যে কিছুসংখ্যক এমন ছিলেন যাঁরা আপন বাহুবলে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করে দিল্লীর সম্রাটের অনুমোদন লাভ করেন। কিছুসংখ্যক শাসক ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাধীন। আর অবশিষ্টাংশ দিল্লীর দরবার থেকে নিয়োগপত্র লাভ করে গভর্ণর অথবা নাজিম হিসাবে বাংলা শাসন করেন।
মুসলমানগণ বিজয়ীর বেশে এ দেশে আগমন করার পর এ দেশকে তাঁরা মনেপ্রাণে ভালোবাসেন, এ দেশকে স্থায়ী আবাসভূমি হিসাবে গ্রহণ করেন এবং এ দেশের অমুসলিম অধিবাসীর সাথে মিলে মিশে বাস করতে চেয়েছেন। শাসক হিসাবে শাসিতের উপরে কোন অন্যায়-অবিচার তাঁরা করেননি। জনসাধারণও তাঁদের শাসন মেনে নিয়েছিল। মুহাম্মদ বখতিয়ার বাংলা বিজয়ের পর আভ্যন্তরীণ আইনশৃংখলা প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি মুসলমানদের জন্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ ও মাদ্রাসা স্থাপন করলেও অমুসলিমদের প্রতি উদার নীতি অবলম্বন করেন। তিনি ইচ্ছা করলে পলাতক লক্ষ্মণসেনের পশ্চাদানুসরণ করে তাকে পরাজিত করতে পারতেন। কিন্তু সে কথা তিনি মনে আদৌ স্থান দেননি। যদুনাথ সরকার তাঁর 'বাংলার ইতিহাসে' বলেন:
"...কিন্তু তিনি রক্তপিপাসু ছিলেন না। নরহত্যা ও প্রজাপীড়ন তিনি পছন্দ করতেন না। দেশে এক ধরনের জায়গীর প্রথা বা সামন্ততান্ত্রিক সরকার কায়েমের দ্বারা আভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও সামরিক প্রধানদের সন্তুষ্টি সাধন করতেন।"...
(History of Bengal Vol. II, Muslim period p. 9)
বাংলার শাসনকর্তাগণ দিল্লীর সমসাময়িক সম্রাট
১২০৩-৬খৃঃ মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী কৃতত্ব উদ্দীন আইবেক
১২০৬-৮ খৃঃ মালিক ইজ্জদ্দীন মুহাম্মদ শিরীন খিলজী ঐ
১২০৮-১০ খৃঃ হুসাম উদ্দীন ইওয়াজ ঐ
১২১০-১৩ খৃঃ আলী মর্দান (সুলতান আলাউদ্দীন খিলজী) ঐ
১২১৩-২৭খৃঃ সুলতান গিয়াস উদ্দীন-ইওয়াজ খিলজী আরাম শাহ (কুত্বউদ্দীন আইবেকের পুত্র)।

📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 বাংলার স্বাধীন সুলতানগণ

📄 বাংলার স্বাধীন সুলতানগণ


সমগ্র বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান ছিলেন শামসউদ্দীন ইলিয়াস শাহ্। অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে দিল্লী সম্রাট ফিরোজশাহ তোগলোক যুদ্ধযাত্রা করে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৩৫৮ খৃস্টাব্দে ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকান্দার শাহ বাংলার স্বাধীন সুলতান হিসাবে সিংহাসনে আরোহণ করে দিল্লীর সম্রাটের প্রীতি অর্জনের উদ্দেশ্যে পঞ্চাশটি হাতী উপঢৌকন স্বরূপ দিল্লী প্রেরণ করেন। এ সময় থেকে ১৪০৯ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত যাঁরা বাংলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন তাঁরা হলেন-
সিকান্দার শাহ (১ম) ১৩৫৮-১১ খৃঃ
গিয়াস উদ্দীন আজম শাহ ১৩৯১-৯৬ খৃঃ
সাইফুদ্দীন হামজা শাহ ১৩৯৬-১৪০৬ খৃঃ
শামসুদ্দীন ১৪০৬-১৪০৯ খৃঃ

📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 রাজা গণেশ

📄 রাজা গণেশ


পঞ্চদশ শতকের প্রারম্ভে বাংলায় হিন্দুজাতির পুনরুত্থান আন্দোলন শুরু হয়। মুহাম্মদ বখতিয়ারের বাংলা বিজয়ের পর হতে চতুর্দশ শতকের শেষ অবধি মুসলমান শাসকগণ কখনো দিল্লী সুলতানের নিযুক্ত গভর্ণর হিসাবে, কখনো স্বাধীন সুলতান হিসাবে এবং কখনো উপঢৌকনাদির মাধ্যমে দিল্লী দরবারকে প্রীত ও সন্তুষ্ট রেখে বাংলার শাসনকার্য পরিচালনা করেন। এ দুই শতকের ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায়-মুসলমানগণ নিশ্চিন্ত মনে শান্তিতে রাজত্ব করতে পারেননি। তাঁদের মধ্যে আত্মকলহ ও বলপূর্বক ক্ষমতা দখলের প্রবল আকাংখাই ছিল সে শান্তি বিনষ্টের কারণ। কিন্তু তাই বলে মুসলমান শাসকগণ কর্তৃক হিন্দুজাতি দলন ও প্রজাপীড়ন হয়নি কখনো। ফলে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রজাগণ সুখ-শান্তি ও জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করেছিল। বখতিয়ার খিলজীর পূর্বে এদেশে বহু স্বাধীন হিন্দু রাজা বাস করতেন। মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তা তাঁরা মনে প্রাণে মেনে না নিলেও মুসলমানদের সাথে সংঘর্ষে আসা সমীচীন মনে করেননি। তার দুটি মাত্র কারণ হতে পারে। প্রথম কারণ এই যে, বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল মুসলমানদের হাতে এবং বখতিয়ারের পর থেকে ক্রমাগত বহির্দেশ থেকে অসংখ্য মুসলমান বাংলায় আসতে থাকে। মুসলিম ধর্ম প্রচারক অলী ও দরবেশগণ এদেশে আগমন করতঃ ইসলামের সুমহান বাণী, ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রচার করতে থাকেন। ফলে ব্রাহ্মণ্যবাদের দ্বারা নিষ্পেষিত হিন্দু জনসাধারণ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে। তথাপি এখানকার বর্ণহিন্দুরা মুসলমান শাসকদের আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও আত্মকলহের সুযোগে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পারতো। কিন্তু তা করেনি। তার কারণও আছে।
দ্বিতীয় কারণ এই যে, তারা এক দীর্ঘ পরিকল্পনার ভিত্তিতে কাজ করে যাচ্ছিল। তা হলো মুসলিম শাসকদের বিরাগভাজন না হয়ে বরঞ্চ শাসন কার্যের বিভিন্ন স্তরে এরা নিজেদের স্থান করে নিয়ে কোন এক মুহূর্তে আত্মপ্রকাশ করবে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে তারা তাদের এ পরিকল্পনায় পূর্ণ সাফল্য লাভ করেছিল। তবে সে সময়ে নিজেরা ক্ষমতালাভ না করে মুসলিম শাসন বিলুপ্ত করে ইংরেজদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে পরিতৃপ্তি লাভ করেছিল। পঞ্চদশ শতকের প্রারম্ভে তাদের সাফল্য স্থায়ী না হলেও এ ছিল তাদের দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার প্রথম প্রকাশ।
এ সময়ে বাংলার একজন হিন্দু জমিদার প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে উঠেন। ফার্সি ভাষায় লিখিত ইতিহাসে তার নাম 'কান্‌স্' বলা হয়েছে। কান্‌স্ প্রকৃতপক্ষে 'কংস' অথবা 'গণেশ' ছিল। তিনি গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের রাজত্বকালে রাজস্ব ও শাসন বিভাগের অধিকর্তা হয়েছিলেন। 'রিয়াযুস্ সালাতীনে'র বর্ণনা অনুসারে গণেশ শামসুদ্দীন ইলিয়াসের পৌত্র গিয়াসউদ্দীন আজম শাহকে হত্যা করেন। অতঃপর গিয়াসউদ্দিনের পৌত্র শামসুদ্দীনকেও তিনি হত্যা করে গৌড় ও বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন।

📘 বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস 📄 ইলিয়াস শাহী বংশ

📄 ইলিয়াস শাহী বংশ


শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৩৯-৫৮ খৃঃ)
সিকান্দার শাহ (১৩৫৮-৮৯ খৃঃ)
গিয়াস উদ্দীন আজম শাহ (১৩৮৯-৯৬ খৃঃ)
সাইফউদ্দীন হামজা শাহ (১৩৯৬-১৪০৬ খৃঃ)
শামসুদ্দীন (১৪০৬-১৪০৯ খৃঃ)
শাহাবুদ্দীন বায়েজিদ শাহ (১৪০৯-১৪ খৃঃ)
ব্লকম্যান (Blockman) বলেন যে, গণেশ নিজে সিংহাসনে আরোহণ করেননি। তবে তিনি শামসুদ্দীনকে হত্যা করে তাঁর ভ্রাতা শাহাবুদ্দীন বায়েজিদ শাহকে ক্রীড়াপুত্তলিকা স্বরূপ রেখে স্বয়ং রাজদন্ড পরিচালনা করতেন। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাংলার ইতিহাস, দ্বিতীয় খন্ডে ১৪০৯-১৪১৪ খৃঃ পর্যন্ত বাংলার সিংহাসনে দু'জন শাসনকর্তার নাম উল্লেখ করেছেন। যথা, শাহাবুদ্দীন বায়েজিদ শাহ ও গণেশ।
রাজা গণেশ বাঙালী বরেন্দ্র বাহ্মণ ছিলেন। উত্তর বংগের (দিনাজপুর) ভাটুরিয়া পরগণার শক্তিশালী রাজা গণেশ তাঁর নিজস্ব একটি সেনাবাহিনী রাখতেন। দুর্ধর্ষ মংগল গোত্র থেকে তিনি তাঁর সৈন্য সংগ্রহ করতেন। তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে তাঁকে বাংলার সুলতানের অধীনে চাকুরীতে নিযুক্ত করা হয় এবং ক্রমশঃ তিনি রাজ্যের খাজাঞ্চিখানার একচ্ছত্র মালিক মোখতার (সাহেব-ই-ইখতিয়ার-ই-মুল্ক ও মাল) হয়ে পড়েন। এ পদমর্যাদার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এক গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তিনি প্রথমে গিয়াস উদ্দীন আজম শাহকে হত্যা করেন এবং কয়েক বৎসর পর শামসুদ্দীন শাহকে হত্যা করে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন।
গণেশের বাংলার সিংহাসনে আরোহণ দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও গভীর ষড়যন্ত্রের ফল। গণেশ ও তাঁর সমমনা হিন্দু সামন্তবর্গ বাংলায় মুসলমানদের শাসন মনে প্রাণে মেনে নিতে পারেননি। যদিও বিগত দুই শতকের ইতিহাসে মুসলিম শাসকগণ কর্তৃক অমুসলমানদের প্রতি কোনপ্রকার উৎপীড়নের নজির পাওয়া যায়না, তথাপি মুসলিম শাসনকে তারা হিন্দুজাতির জন্যে চরম অবমাননাকর মনে করতেন। তাই গণেশ সিংহাসনে আরোহণ করার পর মুসলিম দলনে আত্মনিয়োগ করেন। এভাবে মুসলমানদের প্রতি তাঁর বহুদিনের পুঞ্জিভূত আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
বুকানন হ্যামিল্টন কর্তৃক লিখিত দিনাজপুর বিবরণীতে আছে যে, জনৈক শায়খ বদরে ইসলাম এবং তদীয় পুত্র ফয়জে ইসলাম গণেশকে অবনত মস্তকে সালাম না করার কারণে তিনি উভয়কে হত্যা করেন। শুধু তাই নয়, বহু মুসলমান অলী দরবেশ, মনীষী, পন্ডিত ও শাস্ত্রবিদকে গণেশ নির্মমভাবে হত্যা করেন। একদা শায়খ মুঈনুদ্দীন আব্বাসের পিতা শায়খ বদরুল ইসলাম বিধর্মী রাজা গণেশকে সালাম না করার কারণে তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। অতঃপর একদিন তিনি উক্ত শায়খকে দরবারে তলব করেন। তাঁর কামরায় প্রবেশের দরজা এমন সংকীর্ণ ও খর্ব করে তৈরী করা হয় যে, প্রবেশকারীকে উপুড় হয়ে প্রবেশ করতে হয়। শায়খ রাজার অভিপ্রায় বুঝতে পেরে প্রথমে তাঁর দু'খানি পা কামরার ভিতরে রাখেন এবং মস্তক অবনত না করেই প্রবেশ করেন। কারণ, ইসলামের নির্দেশ অনুযায়ী কোন মুসলমানই আল্লাহ ব্যতীত আর কারো সামনে মস্তক অবনত করতে পারেন না। রাজা গণেশ তাঁকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করেন এবং অন্যান্য আলেমগণকে একটি নৌকায় করে নদী-গর্তে নিমজ্জিত করে মারেন।
মুসলিম নিধনের এ লোমহর্ষক কাহিনী শ্রবণ করে শায়খ নূরে কুতুবে আলম মর্মাহত হন এবং জৌনপুরের গভর্ণর সুলতান ইব্রাহিম শার্কীকে বাংলায় আগমন করতঃ ইসলাম ধর্ম রক্ষার জন্যে আবেদন জানান। সুলতান ইব্রাহিম বিরাট বাহিনীসহ বাংলা অভিমুখে যাত্রা করে সরাই ফিরোজপুরে শিবির স্থাপন করেন।
রাজা গণেশ জানতে পেরে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে কুতুবে আলমের শরণাপন্ন হন। কুতুবে আলম বলেন, তিনি এ শর্তে সুলতান ইব্রাহিমকে প্রত্যাবর্তনের পরামর্শ দিতে পারেন, যদি গণেশ ইসলাম গ্রহণ করেন। গণেশ স্বীকৃত হলেও তার স্ত্রী তাঁকে বাধা দান করেন। অবশেষে তাঁর পুত্র যদুকে ইসলামে দীক্ষিত করে গণেশের স্থলে তাকে সিংহাসন ছেড়ে দেয়ার জন্যে বলা হয়। গণেশ এ কথায় স্বীকৃত হন। যদুর মুসলমানী নাম জালালউদ্দীন রেখে তাঁকে বাংলার সুলতান বলে ঘোষণা করা হয়।
সুলতান ইব্রাহিম অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ মনে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর প্রত্যাবর্তনের সংবাদ পাওয়া মাত্র গণেশ জালালউদ্দীনের নিকট থেকে সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন। সরলচেতা কুতুবে আলম গণেশের ধূর্তুমি বুঝতে পারেননি। তাই পুত্রকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করতে চাইলে পিতার নরহত্যার অপরাধ ক্ষমা করেন।
গণেশ সিংহাসন পুনরুদ্ধার করার পর সুবর্ণধেনু অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ধর্মচ্যুত যদুর শুদ্ধিকরণ ক্রিয়া সম্পাদন করেন। অর্থাৎ একটি নির্মিত সুবর্ণধেনুর মুখের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে তার মূল, ত্যাগের দ্বার দিয়ে হিন্দু শাস্ত্রের বিশেষ ধর্মীয় পদ্ধতিতে বহির্গত হওয়াই হলো শুদ্ধিকরণ পদ্ধতি।
এ শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠানের পর গণেশ দেশ থেকে মুসলমানদের মূলোৎপাটনের কাজ শুরু করেন। তিনি পূর্বের চেয়ে অধিকতর হিংস্রতার সাথে মুসলিম নিধনকার্য চালাতে থাকেন। তিনি কুতুবে আলমের পুত্র শায়খ আনওয়ার ও পৌত্র শায়খ জাহিদকে বন্দী অবস্থায় সোনারগাঁও পাঠিয়ে দেন। অতঃপর তাঁদের পিতা-পিতামহের ধনসম্পদের সন্ধান দেয়ার জন্যে তাঁদেরকে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার করা হয়। পরে শায়খ আনওয়ারকে হত্যা করা হয়। এমনিভাবে গণেশ সাত বৎসর যাবত বাংলায় এক বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম করেন এবং মুসলমানদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলেন। গণেশের মৃত্যুর পর পুনরায় জালালউদ্দীন (যদু) সিংহাসনে আরোহণ করেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px