📄 ৪. হানযালা আল-উসায়দী (রাঃ)
হানযালা আল-উসায়দী (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর একজন অহী লেখক। তিনি বলেন, একবার আবুবকর (রাঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হ'লে তিনি বললেন, হানযালা, কেমন আছ? আমি বললাম, হানযালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে! তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! আরে তুমি বলছ কি? আমি বললাম, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট থাকি আর তিনি আমাদের সামনে জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করেন তখন তো মনে হয় আমরা সরাসরি তা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মজলিস থেকে চলে এসে স্ত্রী, সন্তান-সন্ততির সাথে মিশি এবং পেশাগত কাজে জড়িয়ে পড়ি, তখন অনেক কিছুই ভুলে যাই। আবুবকর (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমারও তো এমন অবস্থা হয়। তখন আবুবকর (রাঃ) ও আমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, কীভাবে? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা যখন আপনার নিকটে থাকি আর আপনি আমাদের সামনে জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করেন তখন তো মনে হয় আমরা সরাসরি তা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু যখন আপনার নিকট থেকে চলে এসে স্ত্রী, সন্তান-সন্ততির সাথে মিশি এবং পেশাগত কাজে জড়িয়ে পড়ি তখন অনেক কিছুই ভুলে যাই। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنْ لَوْ تَدُومُونَ عَلَى مَا تَكُونُونَ عِنْدِى وَفِي الذِّكْرِ لَصَافَحَتْكُمُ الْمَلائِكَةُ عَلَى فُرُشِكُمْ وَفِي طُرُقِكُمْ وَلَكِنْ يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وَسَاعَةً 'যার হাতে আমার জীবন তার কসম! তোমরা আমার নিকট যে অবস্থায় থাক সে অবস্থা যদি সদাসর্বদা বজায় রাখতে পারতে এবং যিকিরে মশগুল থাকতে পারতে তাহ'লে ফেরেশতারা ঘরে-বাইরে তোমাদের সাথে মুছাফাহা বা করমর্দন করত। কিন্তু হে হানযালা! সময় সময় অবস্থার হেরফের হয়'। একথা তিনি তিনবার বললেন'।
টিকাঃ
৬৩. মুসলিম হা/২৭৫০।
📄 ৫. আলী বিন হুসাইন (রাঃ)
ইমাম যুহরী (রহঃ) বলেন, আমি যায়নুল আবেদীন আলী বিন হুসাইন (রহঃ)-কে তার নিজের নফসের হিসাব নিতে এবং স্বীয় রবের নিকট মুনাজাত করতে শুনেছি। তিনি বলছিলেন, হে আমার মন! আর কত দিন তুমি দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ে থাকবে? কত কাল তোমার ঝোঁক দুনিয়া আবাদের দিকে থাকবে? তুমি কি তোমার বিগত পূর্বপুরুষদের থেকে; যমীনের কোলে আশ্রয় নেওয়া তোমার মহব্বতের লোকদের থেকে; অন্তরে ব্যথা জাগানিয়া ভাইদের থেকে এবং তোমার দুর্বলদেহী বন্ধুদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে না? কালের কুটিল চক্রের আবর্তে কত কিই না ধ্বংস হয়ে গেছে! কত ধরনের মানুষের সাথে তুমি ওঠাবসা করেছ এবং কতজনকে তুমি কবরের মাঝে বিদায় জানিয়েছ! যমীন তাদের সব কিছু পাল্টে দিয়েছে এবং মাটির তলে অদৃশ্য করে দিয়েছে!
আর কতকাল তুমি দুনিয়ার পানে ছুটবে? কতকাল দুনিয়ার খাহেশে মজে থাকবে? একদিকে বার্ধক্য তোমাকে পেয়ে বসেছে। সতর্ককারী তোমার দ্বারে পৌঁছে গেছে। অন্যদিকে তুমি জীবনের লক্ষ্য ভুলে বসে আছ এবং ঘুমঘোরে অচেতন পড়ে আছ। অতীত জাতি ও বিলুপ্ত রাজ্যসমূহের কথা একবার চিন্তা করো। কালচক্র কিভাবে তাদের ধ্বংস করে দিয়েছে এবং মৃত্যু কিভাবে তাদের পাকড়াও করেছে? দুনিয়া থেকে তাদের সকল চিহ্ন মুছে গেছে। এখন তাদের বাড়িঘর ও স্মৃতিগুলো শুধুই ইতিহাস হয়ে আছে। কত শক্তিধর রাজা-বাদশাহ, সৈন্যসামন্ত ও পাত্রমিত্র এই দুনিয়াতে ছিল। দুনিয়াতে তারা কত ক্ষমতার মালিক হয়েছিল। তাদের জাগতিক ইচ্ছাগুলো তারা অকপটে পূরণ করেছিল। বহু প্রাসাদ ও মিলনায়তন তারা বানিয়েছিল এবং মূল্যবান জিনিসপত্র ও ধন-সম্পদ জমা করেছিল। একদিন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে অমোঘ হুকুম এসে সব তছনছ করে দিল। তার অপ্রতিরোধ্য ফায়ছালা (মৃত্যু) তাদের আঙিনায় হানা দিল। রাজাধিরাজ, প্রবল প্রতাপান্বিত, বড়াইকারী ও পরাক্রমশালী মহান আল্লাহ এই পৃথিবীতে বলদর্পী স্বৈরাচারীদের মূলোৎপাটনকারী এবং অহংকারীদের বিনাশকারী ।
সুতরাং দুনিয়া ও তার চক্রান্ত থেকে সাবধান!! দুনিয়া তোমার জন্য কত ফাঁদ পেতেছে! তোমাকে ভুলাতে কত সাজগোজ করেছে! তোমাকে ধরতে কত রূপ-রস যাহির করেছে! এসব থেকে সাবধান!! জলদী করো, জলদী করো, নিজেকে বাঁচাও। দুনিয়া নিশ্চিতই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তার স্থায়িত্বের কোনই আশা নেই জেনেও কি কোন বুদ্ধিমান মানুষ তার প্রতি লোভী হ'তে পারে? নাকি কোন অভিজ্ঞজন তাতে খুশী হ'তে পারে?
যে রাতে দস্যু-তস্করের আক্রমণের ভয় করে তার দু'চোখ কিভাবে নিদ্রা যায়? যে মৃত্যুর তোয়াক্কা করে তার মন কিভাবে আরামে থাকে? দুনিয়াতে কত চিত্তাকর্ষক জিনিসই না রয়েছে। তা পেতেও কত শ্রম ব্যয় করতে হয়। কত রোগ-শোক, ব্যথা-বেদনা ও দুঃখ-কষ্ট পোহাতে হয়। তারপরও যে দুনিয়াদার মানুষ তার মজা লাভ করতে পারবে বা তার চাকচিক্য উপভোগ করতে পারবে, তেমনটা আশা করা যায় না।
কত যে অটুট স্বাস্থ্যধারী বর্ষীয়ান মানুষ দুনিয়ার ধোঁকায় পতিত হয়েছে! তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়া কতজনকে যে সে তার কুস্তির প্যাঁচে কুপোকাত করেছে! দুনিয়ার ধোঁকা থেকে সে আর উদ্ধার পায়নি। কুপোকাত অবস্থা থেকেও দুনিয়া তাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দেয়নি। দুনিয়ার মোহকেন্দ্রিক তার ব্যথা-বেদনা ও রোগ-ব্যাধির সবই রয়ে গেছে। কোনটা থেকেই তার আরোগ্য ও নিষ্কৃতি মেলেনি।
সুতরাং হে মন! তুমি তোমার আখিরাত দিয়ে আর কত তোমার দুনিয়াকে তালি দিবে এবং তোমার খেয়াল-খুশীর রঙিন ঘোড়া দাবড়াবে? আমি দেখছি, তুমি একজন দুর্বল চিত্তের মানুষ। হে দ্বীনের ওপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দানকারী! তোমাকে কি এ আদেশ দিয়েছেন দয়াময় রহমান? নাকি এ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে আল-কুরআন?
টিকাঃ
৬৪. তারীখু দিমাশক ৪১/৪০৪-৪০৮।
📄 ৬. আল-হারিছ মুহাসিবী (রহঃ)
হারিছ মুহাসিবী (রহঃ) ছিলেন সংসারে অনাসক্ত একজন সাধক ও দরবেশ মানুষ। তিনি অতিমাত্রায় তার মনের হিসাব নিতেন বলে তার নাম হয়ে যায় 'মুহাসিবী' বা হিসাব গ্রহণকারী। আল্লামা সাম'আনী (রহঃ) বলেন, মুহাসিবীকে এ নামে আখ্যায়িত করার কারণ তিনি রীতিমতো তার মনের হিসাব রাখতেন।
টিকাঃ
৬৫. ইমাম নববী, আত-তিবয়ান ফী আদাবি হামালাতিল কুরআন, পৃ. ১১৭।
📄 ৭. ইবনুল জাওযী (রহঃ)
ইবনুল জাওযী (রহঃ) নিজের সম্পর্কে বলেন, একদিন আমি একজন অনুসন্ধানী গবেষকের ভঙ্গিতে আমার নফসকে নিয়ে চিন্তা করলাম। ফলে (আল্লাহ্র দরবারে) তার হিসাব হওয়ার আগে আমি নিজে তার হিসাব নিলাম এবং (আল্লাহ্র দরবারে) তার ওযন হওয়ার আগে আমি তাকে ওযন করলাম। আমি দেখলাম, সেই শৈশব থেকে আজ অবধি আল্লাহ্র অনুগ্রহ আমার উপর একের পর এক হয়ে চলেছে। আমার মন্দ কার্যাবলী তিনি গোপন রেখেছেন এবং যে ক্ষেত্রে (দুনিয়াতেই) শাস্তি দেওয়া আবশ্যক ছিল সেক্ষেত্রে আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। অথচ সেজন্য একটু মৌখিক শুকরিয়া ছাড়া আমি আর কিছুই করিনি।
আমি পাপগুলো নিয়ে ভেবে দেখলাম যে, তার কয়েকটার জন্যও যদি আমাকে শাস্তি দেওয়া হ'ত তবে দ্রুতই আমি ধ্বংস হয়ে যেতাম। যদি মানুষের সামনে তার কিছু প্রকাশ পেত তবে আমি লজ্জায় অধোবদন হয়ে যেতাম। এসব কবীরা গুনাহের কথা শুনে একজন বিশ্বাস পোষণকারী আমার বেলায়ও ঠিক তাই বিশ্বাস করত যা ফাসেক-ফাজেরদের বেলায় বিশ্বাস করা হয়। (অর্থাৎ আমাকেও একজন পাপাচারী ফাসেক ঠাওরানো হ'ত।) বরং আমার বেলায় তা আরও কদর্য বিবেচনা করা হ'ত, আর আমি (আত্মপক্ষ সমর্থনে) তার ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চেষ্টা করতাম। এরপর আমি এই বলে দো'আ করি যে, 'হে আল্লাহ! তোমার প্রশংসার খাতিরে এবং আমার গুনাহের উপর তোমার গোপনীয়তার আচ্ছাদনের বদৌলতে তুমি আমাকে মাফ করে দাও'। তারপর আমি আমার নফসকে আল্লাহ্র এত বড় ও বেশী অনুগ্রহের জন্য তার শুকরিয়া আদায় করতে আহ্বান জানালাম। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও যেমন শুকরিয়া আদায় করা উচিত ছিল তেমনটা হ'ল না। ফলে আমি আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি ও গুনাহ-খাতার জন্য মাতম করতে শুরু করি এবং বড়দের আসন লাভের প্রত্যাশা করতে থাকি। কিন্তু আমার আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেল, অথচ সে প্রত্যাশা পূরণ হ'ল না।
টিকাঃ
৬৬. ছায়দুল খাতির, পৃ. ৪৭১।