📘 আত্মসমালোচনা > 📄 ২. ওমর ফারুক (রাঃ)

📄 ২. ওমর ফারুক (রাঃ)


আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদিন আমি ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর সংগে বাইরে বের হ'লাম। চলতে চলতে তিনি একটা বাগানে ঢুকে গেলেন। তাঁর আর আমার মাঝে তখন একটা দেয়ালের ব্যবধান। তিনি বাগানের ভেতরে। আর আমি (বাইরে থেকে) তাঁকে বলতে শুনলাম, ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব! আমীরুল মুমিনীন! সাবাস!! সাবাস!! আল্লাহ্র কসম, হয় তুমি আল্লাহকে ভয় করবে, নয়তো আল্লাহ তোমাকে শাস্তি দিবেন।
তিনি 'আমীরুল মুমিনীন' নামে আখ্যায়িত করে নিজেকে বুঝিয়েছেন যে, এসব উপাধি আল্লাহ্র সামনে তাঁর কোনই উপকারে আসবে না।

টিকাঃ
৬১. মুওয়াত্ত্বা মালিক, হা/১৮০০।

📘 আত্মসমালোচনা > 📄 ৩. আমর ইবনুল আছ (রাঃ)

📄 ৩. আমর ইবনুল আছ (রাঃ)


ইবনু শিমাসা আল-মাহরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমর বিন আছ (রাঃ)-এর মৃত্যুকালে আমরা তাঁর কাছে হাযির ছিলাম। তিনি দীর্ঘক্ষণ ধরে কান্নাকাটি করলেন এবং দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে রাখলেন। তখন তাঁর ছেলে বলতে লাগলেন, আব্বা, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঙ্গ লাভের পরও কি এ চিন্তা! আব্বা, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঙ্গ লাভের পরও কি এ চিন্তা!!
তিনি তখন মুখ ফিরিয়ে বললেন, আমরা যা সবচেয়ে উত্তম গণ্য করি তা হ'ল, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল)-এর সাক্ষ্য দান। আমার জীবনের তিনটি পর্যায় আমি অতিবাহিত করেছি। একসময় ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে আমার থেকে অধিক ঘৃণাকারী দ্বিতীয় কেউ ছিল না। সেসময় তাঁকে বাগে পেলে হত্যা না করা পর্যন্ত আমার মনে স্বস্তি মিলত না। ঐ অবস্থায় মারা গেলে আমি হ'তাম জাহান্নামী।
তারপর যখন আল্লাহ তা'আলা আমার অন্তরে ইসলামের আকর্ষণ পয়দা করলেন তখন আমি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এসে বললাম, 'আপনার ডান হাত প্রসারিত করুন, আমি আপনার নিকট বায়'আত করব (আনুগত্যের শপথ করব)'। তিনি তাঁর ডান হাত প্রসারিত করে দিলেন, কিন্তু আমি আমার হাত টেনে নিলাম। তিনি বললেন, 'আমর, তোমার কী হ'ল'? আমি বললাম, 'আমি একটা শর্ত করতে চাই'। তিনি বললেন, 'কী শর্ত'? আমি বললাম, 'আমাকে যেন মাফ' করে দেওয়া হয়। তিনি বললেন, أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ الإِسْلَامَ يَهْدِمُ مَا كَانَ قَبْلَهُ وَأَنَّ الْهِجْرَةَ تَهْدِمُ مَا كَانَ قَبْلَهَا وَأَنَّ الْحَجَّ يَهْدِمُ مَا كَانَ قَبْلَهُ ‘তুমি কি জান না যে, ইসলাম তার পূর্বেকার সকল গুনাহ নিশ্চিহ্ন করে দেয় এবং হিজরত তার পূর্বেকার সকল গুনাহ নিশ্চিহ্ন করে দেয় এবং হজ্জ তার পূর্বেকার সকল গুনাহ নিশ্চিহ্ন করে দেয়?'।
এভাবে ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে (আমার অন্তরে) অধিক প্রিয় এবং আমার চোখে অধিক মর্যাদাশালী দ্বিতীয় আর কেউ ছিল না। তাঁর বড়ত্ব ও মহত্ত্ব আমার চোখে এতটাই ভরপুর হয়ে ধরা দিত যে, তাঁকে দু'চোখ ভরে দেখার সামর্থ্য আমার হ'ত না। আমাকে যদি তাঁর দৈহিক রূপ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তবে আমি তা বলতে পারব না। কারণ আমি তাঁকে দু'চোখ ভরে দেখতে পারিনি। ঐ অবস্থায় মারা গেলে আমার জান্নাতবাসী হওয়ার আশা ছিল। তারপর আমি অনেক রকমের দায়িত্বে জড়িয়ে পড়েছি। জানি না তাতে আমার অবস্থা কী দাঁড়াবে।
অবশ্য আমি যখন মারা যাব তখন যেন আমার সাথে কোন মাতমকারিণী না যায়, আর না কোন আগুন সাথে নেওয়া হয়। তারপর যখন তোমরা আমাকে দাফন করবে (মাটির নীচে রাখবে), তখন আমার উপর আস্তে আস্তে মাটি ফেলবে। পরিশেষে তোমরা একটা উট যবেহ করে তার গোশত বিতরণ পর্যন্ত যে সময় লাগে সেই পরিমাণ সময় আমার কবরের পাশে অবস্থান করবে। যাতে করে আমি তোমাদের বিচ্ছেদকে মানিয়ে নিতে পারি এবং আমার রবের দূতদের সঙ্গে আমি কী কথোপকথন করতে পারব তা ভাবতে পারি'।

টিকাঃ
৬২. মুসলিম হা/১২১।

📘 আত্মসমালোচনা > 📄 ৪. হানযালা আল-উসায়দী (রাঃ)

📄 ৪. হানযালা আল-উসায়দী (রাঃ)


হানযালা আল-উসায়দী (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর একজন অহী লেখক। তিনি বলেন, একবার আবুবকর (রাঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হ'লে তিনি বললেন, হানযালা, কেমন আছ? আমি বললাম, হানযালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে! তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! আরে তুমি বলছ কি? আমি বললাম, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট থাকি আর তিনি আমাদের সামনে জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করেন তখন তো মনে হয় আমরা সরাসরি তা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মজলিস থেকে চলে এসে স্ত্রী, সন্তান-সন্ততির সাথে মিশি এবং পেশাগত কাজে জড়িয়ে পড়ি, তখন অনেক কিছুই ভুলে যাই। আবুবকর (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমারও তো এমন অবস্থা হয়। তখন আবুবকর (রাঃ) ও আমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, কীভাবে? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা যখন আপনার নিকটে থাকি আর আপনি আমাদের সামনে জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করেন তখন তো মনে হয় আমরা সরাসরি তা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু যখন আপনার নিকট থেকে চলে এসে স্ত্রী, সন্তান-সন্ততির সাথে মিশি এবং পেশাগত কাজে জড়িয়ে পড়ি তখন অনেক কিছুই ভুলে যাই। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنْ لَوْ تَدُومُونَ عَلَى مَا تَكُونُونَ عِنْدِى وَفِي الذِّكْرِ لَصَافَحَتْكُمُ الْمَلائِكَةُ عَلَى فُرُشِكُمْ وَفِي طُرُقِكُمْ وَلَكِنْ يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وَسَاعَةً 'যার হাতে আমার জীবন তার কসম! তোমরা আমার নিকট যে অবস্থায় থাক সে অবস্থা যদি সদাসর্বদা বজায় রাখতে পারতে এবং যিকিরে মশগুল থাকতে পারতে তাহ'লে ফেরেশতারা ঘরে-বাইরে তোমাদের সাথে মুছাফাহা বা করমর্দন করত। কিন্তু হে হানযালা! সময় সময় অবস্থার হেরফের হয়'। একথা তিনি তিনবার বললেন'।

টিকাঃ
৬৩. মুসলিম হা/২৭৫০।

📘 আত্মসমালোচনা > 📄 ৫. আলী বিন হুসাইন (রাঃ)

📄 ৫. আলী বিন হুসাইন (রাঃ)


ইমাম যুহরী (রহঃ) বলেন, আমি যায়নুল আবেদীন আলী বিন হুসাইন (রহঃ)-কে তার নিজের নফসের হিসাব নিতে এবং স্বীয় রবের নিকট মুনাজাত করতে শুনেছি। তিনি বলছিলেন, হে আমার মন! আর কত দিন তুমি দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ে থাকবে? কত কাল তোমার ঝোঁক দুনিয়া আবাদের দিকে থাকবে? তুমি কি তোমার বিগত পূর্বপুরুষদের থেকে; যমীনের কোলে আশ্রয় নেওয়া তোমার মহব্বতের লোকদের থেকে; অন্তরে ব্যথা জাগানিয়া ভাইদের থেকে এবং তোমার দুর্বলদেহী বন্ধুদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে না? কালের কুটিল চক্রের আবর্তে কত কিই না ধ্বংস হয়ে গেছে! কত ধরনের মানুষের সাথে তুমি ওঠাবসা করেছ এবং কতজনকে তুমি কবরের মাঝে বিদায় জানিয়েছ! যমীন তাদের সব কিছু পাল্টে দিয়েছে এবং মাটির তলে অদৃশ্য করে দিয়েছে!
আর কতকাল তুমি দুনিয়ার পানে ছুটবে? কতকাল দুনিয়ার খাহেশে মজে থাকবে? একদিকে বার্ধক্য তোমাকে পেয়ে বসেছে। সতর্ককারী তোমার দ্বারে পৌঁছে গেছে। অন্যদিকে তুমি জীবনের লক্ষ্য ভুলে বসে আছ এবং ঘুমঘোরে অচেতন পড়ে আছ। অতীত জাতি ও বিলুপ্ত রাজ্যসমূহের কথা একবার চিন্তা করো। কালচক্র কিভাবে তাদের ধ্বংস করে দিয়েছে এবং মৃত্যু কিভাবে তাদের পাকড়াও করেছে? দুনিয়া থেকে তাদের সকল চিহ্ন মুছে গেছে। এখন তাদের বাড়িঘর ও স্মৃতিগুলো শুধুই ইতিহাস হয়ে আছে। কত শক্তিধর রাজা-বাদশাহ, সৈন্যসামন্ত ও পাত্রমিত্র এই দুনিয়াতে ছিল। দুনিয়াতে তারা কত ক্ষমতার মালিক হয়েছিল। তাদের জাগতিক ইচ্ছাগুলো তারা অকপটে পূরণ করেছিল। বহু প্রাসাদ ও মিলনায়তন তারা বানিয়েছিল এবং মূল্যবান জিনিসপত্র ও ধন-সম্পদ জমা করেছিল। একদিন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে অমোঘ হুকুম এসে সব তছনছ করে দিল। তার অপ্রতিরোধ্য ফায়ছালা (মৃত্যু) তাদের আঙিনায় হানা দিল। রাজাধিরাজ, প্রবল প্রতাপান্বিত, বড়াইকারী ও পরাক্রমশালী মহান আল্লাহ এই পৃথিবীতে বলদর্পী স্বৈরাচারীদের মূলোৎপাটনকারী এবং অহংকারীদের বিনাশকারী ।
সুতরাং দুনিয়া ও তার চক্রান্ত থেকে সাবধান!! দুনিয়া তোমার জন্য কত ফাঁদ পেতেছে! তোমাকে ভুলাতে কত সাজগোজ করেছে! তোমাকে ধরতে কত রূপ-রস যাহির করেছে! এসব থেকে সাবধান!! জলদী করো, জলদী করো, নিজেকে বাঁচাও। দুনিয়া নিশ্চিতই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তার স্থায়িত্বের কোনই আশা নেই জেনেও কি কোন বুদ্ধিমান মানুষ তার প্রতি লোভী হ'তে পারে? নাকি কোন অভিজ্ঞজন তাতে খুশী হ'তে পারে?
যে রাতে দস্যু-তস্করের আক্রমণের ভয় করে তার দু'চোখ কিভাবে নিদ্রা যায়? যে মৃত্যুর তোয়াক্কা করে তার মন কিভাবে আরামে থাকে? দুনিয়াতে কত চিত্তাকর্ষক জিনিসই না রয়েছে। তা পেতেও কত শ্রম ব্যয় করতে হয়। কত রোগ-শোক, ব্যথা-বেদনা ও দুঃখ-কষ্ট পোহাতে হয়। তারপরও যে দুনিয়াদার মানুষ তার মজা লাভ করতে পারবে বা তার চাকচিক্য উপভোগ করতে পারবে, তেমনটা আশা করা যায় না।
কত যে অটুট স্বাস্থ্যধারী বর্ষীয়ান মানুষ দুনিয়ার ধোঁকায় পতিত হয়েছে! তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়া কতজনকে যে সে তার কুস্তির প্যাঁচে কুপোকাত করেছে! দুনিয়ার ধোঁকা থেকে সে আর উদ্ধার পায়নি। কুপোকাত অবস্থা থেকেও দুনিয়া তাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দেয়নি। দুনিয়ার মোহকেন্দ্রিক তার ব্যথা-বেদনা ও রোগ-ব্যাধির সবই রয়ে গেছে। কোনটা থেকেই তার আরোগ্য ও নিষ্কৃতি মেলেনি।
সুতরাং হে মন! তুমি তোমার আখিরাত দিয়ে আর কত তোমার দুনিয়াকে তালি দিবে এবং তোমার খেয়াল-খুশীর রঙিন ঘোড়া দাবড়াবে? আমি দেখছি, তুমি একজন দুর্বল চিত্তের মানুষ। হে দ্বীনের ওপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দানকারী! তোমাকে কি এ আদেশ দিয়েছেন দয়াময় রহমান? নাকি এ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে আল-কুরআন?

টিকাঃ
৬৪. তারীখু দিমাশক ৪১/৪০৪-৪০৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00