📄 ১. আল্লাহ তা'আলাকে জানা
মনের হিসাব গ্রহণের অন্যতম সহায়ক আল্লাহকে জানা। মনের মধ্যে যদি এ অনুভূতি জাগরুক থাকে যে, বান্দা আল্লাহ তা'আলার নিয়ন্ত্রণাধীন, তিনি তার লুকানো বা গোপনীয় সকল বিষয় জানেন, কোন কিছুই তার নিকট অবিদিত নয়, তাহ'লে হিসাব করে আমল করা সহজ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ বলেন, وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ 'নিশ্চয়ই আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং আমরা জানি তার অন্তর তাকে যেসব কুমন্ত্রণা দেয়। বস্তুতঃ আমরা গর্দানের রগের চাইতেও তার নিকটবর্তী' (ক্বাফ ৫০/১৬)। তিনি আরও বলেন, وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي أَنْفُسِكُمْ فَاحْذَرُوهُ 'আর তোমরা জেনে রেখ যে, আল্লাহ তোমাদের অন্তরের খবর রাখেন। অতএব তাঁকে ভয় কর' (বাক্বারাহ ২/২৩৫)।
এ আয়াতের তাফসীরে আল্লামা ছা'আলিবী (রহঃ) বলেন, বান্দার নিজের দোষ-ত্রুটির পরিমাণ কতটুকু, তার রবের মহত্ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও অমুখাপেক্ষিতার সীমা-পরিসীমাই বা কতদূর এবং তার রব কোন কিছুর জন্য জিজ্ঞাসিত নন, অথচ তাকে প্রতি পদে পদে জিজ্ঞাসিত হ'তে হবে, বান্দার মধ্যে এই অনুভূতি জাগ্রত থাকলে আল্লাহ্র প্রতি তার ভয় জোরালো হবে। ফলে সে তখন তার রবকে সবচেয়ে বেশী ভয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং নিজেকে ও নিজের রবকে সবচেয়ে বেশী জাননেওয়ালাদের শ্রেণীভুক্ত হবে।
অতঃপর যখন আল্লাহ্র মা'রেফাত (জ্ঞান) পূর্ণতা লাভ করবে তখন তা আল্লাহভীতি ও অন্তর্জালা সৃষ্টি করবে। তারপর সেই অন্তর্জালার প্রভাব সারা দেহে ছড়িয়ে পড়বে। ফলশ্রুতিতে মনের কামনা-বাসনা বিদূরীত হবে এবং আল্লাহ্র ভয়ে তা জ্বলে-পুড়ে যাবে। মনে দেখা দেবে ভয়-ভাবনা ও অপমানিত হওয়ার চিন্তা। আল্লাহ্র ভয়ে বান্দা তখন পুরো পেরেশান থাকবে এবং নিজের পরকালীন পরিণাম কী দাঁড়াবে তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে। তখন তার কাজ হবে শুধুই মুহাসাবা ও মুজাহাদা।
টিকাঃ
৩৮. তাফসীরুছ ছা'আলিবী ৪/৪১২।
📄 ২. ক্বিয়ামত দিবসে শান্তি লাভের অনুভূতি
ইবনুল কাইয়িম (রহঃ) বলেন, ব্যক্তি যখন এ অনুভূতি নিজের অন্তরে তাজা রাখবে যে, আজ এ দুনিয়াতে সে যত মেহনত করবে কাল ক্বিয়ামতে অন্যের হাতে হিসাব-কিতাব চলে যাওয়ার সময় সে বহু শান্তিতে থাকবে; কিন্তু আজ যদি সে তার জীবনের মূল্যবান সময় অযথা নষ্ট করে তাহ'লে আগামী দিন তার জন্য হিসাব দেওয়া বড়ই কঠিন হয়ে পড়বে, তখন এ অনুভূতি তার মনের হিসাব গ্রহণে এবং মনকে নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।
টিকাঃ
৩৯. ইগাছাতুল লাহফান ১/৮০।
📄 ৩. ক্বিয়ামত দিবসে তার সামনে উত্থাপিত প্রশ্ন সম্পর্কে চিন্তা
ক্বিয়ামতের দিন বান্দা কী কী প্রশ্নের মুখোমুখি হ'তে পারে তৎসম্পর্কিত চিন্তা তার মনের হিসাব গ্রহণে তাকে তৎপর করতে পারে। তাতে করে সে আল্লাহ্র প্রতি মনোনিবেশ করবে, সত্যের অনুসরণ করবে, বাজে কাজে সময় ব্যয় ও খেয়াল-খুশীর অনুসরণ ত্যাগ করবে এবং ফরয পালন, হারাম ত্যাগ, নফল-মুস্তাহাব বেশী বেশী আদায় আর মাকরূহ ও সন্দেহ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে বদ্ধপরিকর হবে। বান্দাকে তো ক্বিয়ামত দিবসে তার সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজের হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا 'নিশ্চয়ই কর্ণ, চক্ষু ও বিবেক প্রতিটিই জিজ্ঞাসিত হবে' (বনী ইসরাঈল ১৭/৩৬)।
বান্দাকে আল্লাহ যত নে'মত এ দুনিয়াতে দিয়েছেন তার শুকরিয়া সে যথাযথভাবে আদায় করেছে কি-না সে সম্পর্কে সে জিজ্ঞাসিত হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ 'অতঃপর তোমরা অবশ্যই সেদিন তোমাদেরকে দেওয়া নে'মতরাজি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে' (তাকাছুর ১০২/৮)।
📄 ৪. প্রতিফল বা পুরস্কার সম্পর্কে জ্ঞান থাকা
যেসব আমল করলে জাহান্নাম থেকে বাঁচা যাবে এবং জান্নাতে যাওয়া যাবে সেসব আমলকে সূরা ছফ-এ 'তিজারত' বা ব্যবসা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, 'মানুষ যখন জানবে যে, এই ব্যবসার লাভ জান্নাতুল ফিরদাউসে বসবাস ও রব্বুল আলামীনের দর্শন লাভ এবং এই লোকসান হল জাহান্নামে প্রবেশ ও রাব্বুল আলামীনের দর্শন লাভ থেকে বঞ্চিত হওয়া। সাথে সাথে উক্ত দৃঢ় বিশ্বাস তার অন্তরে বদ্ধমূল হবে, তখন তার জন্য আজকের জীবনের হিসাব রাখা সহজ হয়ে যাবে।
টিকাঃ
৪২. ইগাছাতুল লাহফান ১/৮০।