📘 আত্মসমালোচনা > 📄 ১. সৎকাজ করার আগে মনের হিসাব

📄 ১. সৎকাজ করার আগে মনের হিসাব


ব্যক্তি কাজ শুরুর আগে নিজের মনের অবস্থা যাচাই করবে। তার চিন্তা-ভাবনা কোন দিকে, মনের ইচ্ছা, ঝোঁক ও সঙ্কল্পইবা কী তা লক্ষ্য করবে। কাজটা নির্ভেজালভাবে আল্লাহ্র জন্য করা হচ্ছে কি-না তা ভেবে দেখবে। যদি তার নিয়ত আল্লাহ্র জন্য হয় তাহ'লে কাজে নেমে পড়বে, তা না হ'লে তা পরিত্যাগ করবে।
হাসান বছরী (রহঃ) বলেন, رَحِمَ اللَّهُ عَبْدًا وَقَفَ عِنْدَ هَمِّهِ، فَإِنْ كَانَ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مَضَى، وَإِنْ كَانَ لِغَيْرِ اللَّهِ أَمْسَكَ 'আল্লাহ তাঁর সেই বান্দার উপর রহম করুন, যে সৎকাজের শুরুতে একটু থেমে নিজের নিয়ত যাচাই করে দেখে। যদি কাজটা আল্লাহকে রাযী-খুশী করার জন্য হয় তবে তা করে, আর যদি না হয় তবে তা বাদ দিয়ে দেয়'।
অবশ্য রিয়া বা লোক দেখানোর আশঙ্কা মনে জাগার কারণে কেউ যেন তার সকল আমল ছেড়ে না দেয়। এখানে ঐ সকল আমলের কথা বলা হচ্ছে যার শুরুতেই সে লৌকিকতার ভয় করছে। কিন্তু যে সকল সৎকাজ ফরয কিংবা নফল, যাতে সে অভ্যস্ত, তা লৌকিকতার ভয়ে ছেড়ে দেবে না। বরং নিয়তের সঙ্গে যুদ্ধ করে তা সংশোধনের চেষ্টা করবে।
আমল যাতে ইখলাছ অনুযায়ী হয় সেজন্য এই প্রকারের মুহাসাবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনা মুহাসাবায় আমল করলে তা লোক দেখানোর ধারায় হয়ে যাবে এবং আমলকারী নিজের ধ্বংস ডেকে আনবে। তখন তার অবস্থা দাঁড়াবে, যেমনটা আল্লাহ বলেছেন, عَامِلَةٌ نَاصِبَةٌ، تَصْلَى نَارًا حَامِيَةً، 'তারা হবে কর্মে ক্লান্ত। তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে' (গাশিয়া ৮৮/৩-৪)। সুতরাং সে তার আমল থেকে মোটেও উপকৃত হ'তে পারবে না, যদিও বাহ্যত তা সৎ আমল বলে মনে হবে।
নিয়ত খালেছ বা আল্লাহ্র জন্য নির্ভেজাল করার পর খেয়াল করবে এই আমল বাস্তবায়ন তার সামর্থ্যের ভিতরে, না বাইরে? যদি সামর্থ্যের বাইরে হয় তাহ'লে তা বাদ দেবে। যা করতে পারবে না তার পেছনে খামাখা সময় ব্যয় করবে না। আর যদি সামর্থ্যের ভিতরে হয় তাহ'লে আরেকবার থামবে এবং ভাববে কাজটা না করার চেয়ে করা উত্তম, নাকি করার চেয়ে না করা উত্তম? যদি না করার চেয়ে করা উত্তম হয় তাহ'লে তা করবে। আর যদি করার চেয়ে না করা উত্তম হয় তাহ'লে করবে না। এ মুহাসাবা মনকে বড় শিরক, ছোট শিরক ও গোপন শিরক তথা রিয়া থেকে বাঁচানোর জন্য খুবই যরূরী।

টিকাঃ
৩৫. শু'আবুল ঈমান, হা/৭২৭৯।

📘 আত্মসমালোচনা > 📄 ২. আমলের পর আত্মসমালোচনা

📄 ২. আমলের পর আত্মসমালোচনা


এটি আবার তিন প্রকার।
(ক) এমন সৎ কাজে আত্মসমালোচনা যা আল্লাহ্র হক বা অধিকারভুক্ত :
সৎ কাজ করার পর তা যাচাই করে দেখাই হল মুহাসাবা। কিভাবে সে ইবাদাতটা করল? যেভাবে কাজটা করা উচিত সেভাবে করেছে কি-না? তা কি সুন্নাত মাফিক হয়েছে, নাকি তাতে কোন ত্রুটি হয়েছে? যেমন ছালাতের মধ্যে খুশু-খুযু বা আল্লাহ্র প্রতি ধ্যান-খেয়াল টুটে যাওয়া, কোন প্রকার পাপ-প্রমাদ ঘটিয়ে ছিয়ামের মূল্য হ্রাস করা কিংবা হজ্জ পালনকালে নাফরমানিমূলক কাজ কিংবা ঝগড়াঝাটি করা।
সৎকাজে আল্লাহ তা'আলার হক ছয়টি। যথা :
১. আমলের মধ্যে ইখলাছ বজায় রাখা।
২. শিরক মুক্তভাবে খালেছ ঈমান সহকারে আমল সম্পন্ন হওয়া।
৩. আমলটি রাসূলুল্লাহ (ছঃ)-এর অনুসরণ করে করা।
৪. সুন্দর-সুচারুরূপে ও মযবুতভাবে আমলটি করা।
৫. আমলটি সম্পন্ন করার পিছনে তার প্রতি আল্লাহ্র যে অনুগ্রহ ও সাহায্য-সহযোগিতা রয়েছে অকুণ্ঠচিত্তে তার সাক্ষ্য দেওয়া।
৬. কাজ শেষে নিজের অপূর্ণতার স্বীকারোক্তি করা।
(খ) যে ধরনের আমল করার চেয়ে না করা উত্তম সেক্ষেত্রে আত্মসমালোচনা :
একজন মুসলিমের সামনে উত্তম আমল থাকা অবস্থায় তার থেকে অনুত্তম আমলে মশগুল হওয়া কখনই সমীচীন নয়। যেমন ক্বিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের ছালাতে মশগুল হওয়ার দরুন ফজর ছালাত কাযা হয়ে যাওয়া অথবা এমন কোন যিকিরে মশগুল হওয়া যেখানে তার থেকে উত্তম অনেক যিকির রয়েছে। এ বিষয়ে উম্মুল মুমিনীন জুওয়াইরিয়া (রাঃ) বর্ণিত নিম্নের হাদীছটি প্রণিধানযোগ্য-
عَنْ جُوَيْرِيَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم خَرَجَ مِنْ عِنْدِهَا بُكْرَةً حِينَ صَلَّى الصُّبْحَ وَهِيَ فِي مَسْجِدِهَا ثُمَّ رَجَعَ بَعْدَ أَنْ أَضْحَى وَهِيَ جَالِسَةٌ فَقَالَ مَا زِلْتِ عَلَى الْحَالِ الَّتِي فَارَقْتُكِ عَلَيْهَا . قَالَتْ نَعَمْ. قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لَقَدْ قُلْتُ بَعْدَكِ أَرْبَعَ كَلِمَاتٍ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ لَوْ وُزِنَتْ بِمَا قُلْتِ مُنْذُ الْيَوْمِ لَوَزَنَتْهُنَّ سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ عَدَدَ خَلْقِهِ وَرِضَا نَفْسِهِ وَزِنَةَ عَرْشِهِ وَمِدَادَ كَلِمَاتِهِ -
উম্মুল মুমিনীন জুওয়াইরিয়া (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, একদিন ফজর ছালাত শেষে ভোর বেলায় নবী করীম (ছাঃ) ঘর হ'তে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। তিনি তখন তাঁর জায়নামাযে বসা অবস্থায় ছিলেন। পূর্বাহ্ন হওয়ার পর নবী করীম (ছাঃ) যখন ফিরে আসলেন তখনও তিনি বসা অবস্থায় ছিলেন। এ দৃশ্য দেখে নবী করীম (ছাঃ) বললেন, আমি যে অবস্থায় তোমাকে ছেড়ে গেছি তুমি সে অবস্থায়ই আছ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তুমি যদি ফজর ছালাতের পরে চারটি বাক্য তিনবার বলতে তবে তা তোমার আজকের সারা দিনের বলা সকল কথার সমতুল্য হ'ত। সেই বাক্য চারটি হল : সুবহা-নাল্লা-হি ওয়া বিহামদিহী 'আদাদা খালকুিহী, ওয়া রিযা নাফসিহী, ওয়া যিনাতা আরশিহী, ওয়া মিদা-দা কালিমা-তিহী। অর্থাৎ 'মহাপবিত্র আল্লাহ এবং সকল প্রশংসা তাঁর জন্য। তাঁর সৃষ্টিকুলের সংখ্যার সমপরিমাণ, তাঁর সত্তার সন্তুষ্টির সমপরিমাণ এবং তাঁর আরশের ওযন ও মহিমাময় বাক্য সমূহের ব্যাপ্তি সমপরিমাণ'।
(গ) নিত্যকার অভ্যাসমূলক মুবাহ কাজকর্মে নিয়ত ছুটে যাওয়ার উপর মনের হিসাব নেওয়া :
মানুষ তার অভ্যাসমূলক মুবাহ কাজগুলোকে খুব কমই আমলে ছালেহ বা সৎ কাজে রূপান্তর করতে চেষ্টা করে। অথচ অভ্যস্ত মুবাহ কাজে সৎ নিয়ত করলে এবং আল্লাহ্র কাছে তার আমলের প্রতিদান লাভের সদিচ্ছা রাখলে ঐ মুবাহ কাজগুলোই তখন ছওয়াবের কাজে পরিণত হয়।
عَنْ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ إِنَّكَ لَنْ تُنْفِقَ نَفَقَةً تَبْتَغِي بِهَا وَجْهَ اللَّهِ إِلَّا أُجِرْتَ عَلَيْهَا، حَتَّى مَا تَجْعَلُ فِي فِي امْرَأَتِكَ
সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাছ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, '(হে সা'দ,) তুমি যা কিছুই ব্যয় কর না কেন, তাতে যদি তুমি আল্লাহ্র সন্তোষ অর্জনের চেষ্টা কর, তাহ'লে তুমি সেজন্য ছওয়াব পাবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যে খাদ্যগ্রাস তুলে দাও সেজন্যও'। সুতরাং মুসলমানের মুবাহ ও অভ্যাসমূলক কাজেও মনের হিসাব নেওয়া কর্তব্য। সে খেয়াল করবে তার ঐ ধরনের কাজে নেক নিয়ত আছে কি-না যেজন্য সে ছওয়াব পাবে? আর যদি নেক নিয়ত না করে থাকে তাহ'লে বিনা ছওয়াবেই কাজটা হয়ে গেল কি-না?

টিকাঃ
৩৬. মুসলিম হা/২৭২৬; মিশকাত হা/২০৩১।
৩৭. বুখারী হা/৫৬; ছহীহুল জামে হা/৩০৮২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00