📘 আত্মসমালোচনা > 📄 ৫. মুহাসাবা বিদ্বেষমুক্ত নিরহংকার জীবনের পথে পরিচালিত করে

📄 ৫. মুহাসাবা বিদ্বেষমুক্ত নিরহংকার জীবনের পথে পরিচালিত করে


মানুষ যদি নিয়মিত নিজের মনে নিজের আমলের হিসাব নেয় আর কুরআন, সুন্নাহ, রাসূল (ছাঃ)-এর জীবনী ও ছাহাবীদের আমলের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখে তবে নিজের আমলের স্বল্পতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখে তার মনে অহংকার ও বিদ্বেষ দানা বাঁধবে না ইনশাআল্লাহ। আবুদ্দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন, لَا يَفْقَهُ الرَّجُلُ كُلِّ الْفِقْهِ حَتَّى يَمْقُتَ النَّاسَ فِي جَنْبِ اللهِ ثُمَّ يَرْجِعَ إِلَى نَفْسِهِ فَيَكُونَ لَهَا أَشَدَّ مَقْتًا 'কোন লোক পরিপূর্ণ ফক্বীহ বা সমঝদার হ'তে পারবে না, যে পর্যন্ত না সে আল্লাহ্র ইবাদত-বন্দেগীর ক্ষেত্রে অন্য মানুষকে যতটুকু তুচ্ছ মনে করবে তার থেকেও নিজেকে বেশী তুচ্ছ মনে করবে'।
আমাদের অতীতের পূর্বসূরীগণ যখন নিজেদের নফস বা মনের হিসাব নিতেন তখন তারা মনের অবস্থা বুঝে আল্লাহ্র হুযূরে তাকে তুচ্ছ ও নগণ্য ঠাওরাতেন। আরাফার ময়দানে জনৈক পূর্বসূরী তাঁর চারপাশের জনগণের মাঝে এই বলে দো'আ করছিলেন যে, 'হে আল্লাহ, আমার কারণে তুমি এদের (দো'আ) ফিরিয়ে দিও না।
মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি' (রহঃ) বলতেন, لَوْ كَانَ لِلذُّنُوبِ رِيحٌ مَا قَدَرَ أَحَدٌ أَنْ يَجْلِسَ إِلَيَّ (হায়! আমি এতই পাপী যে,) পাপের যদি গন্ধ থাকত তাহলে তার দুর্গন্ধে আমার কাছে কেউ টিকতে পারত না। অথচ তিনি ছিলেন উম্মতের বড় একজন আবেদ।
ইউনুস বিন উবায়েদ (রহঃ) বলেন, إني لأجد مائة خصلة من خصال الخير ما أعلم أن في نفسي منها واحدة 'আমি অবশ্যই একশত সদ্ভাবের কথা জানি, যার একটাও আমার মধ্যে আছে বলে আমার মনে হয় না'।
হাম্মাদ বিন সালামা (রহঃ)-কে দেখুন, সুফিয়ান ছাওরী যখন মরণাপন্ন তখন তিনি তাকে দেখতে যান এবং বলেন, ওহে আবু আব্দুল্লাহ, আপনি যে জিনিসের (জাহান্নামের) ভয় করতেন তার থেকে কি নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছেন না? আর যিনি সবচেয়ে দয়ালু, যার দয়ার আশায় আপনি থাকতেন তার নিকট যেতে সাহস পাচ্ছেন না? উত্তরে তিনি বললেন, হে আবু সালামা, আমার মত মানুষের জাহান্নাম থেকে মুক্তির আশা তুমি কর কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহ্র কসম, আমি অবশ্যই তা করি।
একবার ভেবে দেখেছেন কি? হাদীছ, ফিক্বহ ও সংসারবিমুখ ইবাদতগুযারদের এই সমস্ত দিকপাল যদি জাহান্নাম থেকে মুক্তি না পান তাহ'লে আর কে মুক্তি পাবে?
জা'ফর বিন যায়েদ (রহঃ) বলেন, আমরা কাবুল অভিযানের সেনাদলে অংশ নিয়েছিলাম। ঐ সেনাদলে ছিলাহ বিন আশইয়াম নামে একজন আল্লাহওয়ালা লোক ছিলেন। রাতের বেলায় সৈনিকরা এক জায়গায় ডেরা ফেলে এশার ছালাত আদায় করে শুয়ে পড়ল। আমি মনে মনে স্থির করলাম যে, দীর্ঘ সময় ধরে আমি ছিলাহর আমল দেখব। তিনি লোকেদের অমনোযোগিতার সুযোগ খুঁজছিলেন। সুযোগ পাওয়া মাত্রই তিনি চুপিসারে বেরিয়ে পড়লেন এবং আমাদের কাছাকাছি কিছু ঘন গাছপালার বনে ঢুকে পড়লেন। আমিও তার পিছনে পিছনে গেলাম। তিনি ওযু করে ছালাতে দাঁড়ালেন। এমন সময় একটা সিংহ এল এবং একেবারে তাঁর কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। এ দৃশ্য দেখে আমি একটা গাছে উঠে পড়লাম। যখন তিনি সিজদায় গেলেন তখন আমি মনে মনে ভাবলাম, এই বুঝি সিংহটা তাঁকে ফেড়ে খাবে। কিন্তু তিনি ছালাত চালিয়ে গেলেন। তারপর বসে দো'আ-দরূদ শেষে সালাম ফিরালেন। এবার সিংহটাকে লক্ষ্য করে বললেন, أَيُّهَا السبعُ اطْلَبِ الرِّزْقَ مِنْ مَكَانٍ آخَرَ 'হে শ্বাপদ, তুমি অন্য কোথাও তোমার খাবার তালাশ কর'। তখন সিংহটা হুংকার ছাড়তে ছাড়তে ফিরে গেল। আর তিনি ভোর হওয়া পর্যন্ত একইভাবে ছালাত আদায় করতে থাকলেন। ভোর হ'লে তিনি বসে বসে বহুবিধ তাসবীহ-তাহলীল করলেন, যার অধিকাংশই আমি কখনো শুনিনি। তারপর এই বলে দো'আ করলেন যে, اللهمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ أَنْ تُجِيرْنِي مِنَ النَّارِ أَوَ مِثْلِي يَجْتَرِئُ أَنْ يَسْأَلَكَ الْجَنَّةَ 'হে আল্লাহ, আমার মত তুচ্ছ বান্দার জন্য তোমার কাছে জান্নাত কামনা করার দুঃসাহস নেই; তাই তোমার কাছে আমার নিবেদন যে, তুমি আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিও'। তারপর তিনি তাঁর তাঁবুতে ফিরে এলেন। সকালবেলায় মনে হচ্ছিল তিনি তাঁর তোশকে শুয়ে রাত কাটিয়েছেন। এদিকে কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে আমার ভোর হয়েছে একমাত্র আল্লাহই তা জানেন।

টিকাঃ
২৭. মুহাসাবাতুন নাফস, পৃ.২৩।
২৮. ইমাম আহমাদ, আয-যুদ, পৃ. ২৪৪।
২৯. মুহাসাবাতুন নাফস, পৃ. ৩৭।
৩০. ঐ, পৃ. ৩৪।
৩১. ইবনুল কাইয়িম, ইগাছাতুল লাহফান ১/৮৫।
৩২. বায়হাক্বী, শু'আবুল ঈমান, হা/৩২১১।

📘 আত্মসমালোচনা > 📄 ৬. সময়কে সুন্দরভাবে কাজে লাগানো

📄 ৬. সময়কে সুন্দরভাবে কাজে লাগানো


মনের হিসাব নিলে মানুষ নিজের সময়কে সর্বোত্তম পন্থায় কাজে লাগাতে পারে। ইবনু আসাকির (রহঃ) বলেন, আবুল ফাতাহ নছর বিন ইবরাহীম আল-মাকুদিসী প্রতি শ্বাস-প্রশ্বাসে মনের হিসাব নিতেন। একটা মুহূর্তও যেন বেকার না যায় সেজন্য তিনি চেষ্টা করতেন। হয় কিছু লিখতেন, নয় পড়াতেন, কিংবা নিজে পড়তেন। সুতরাং যে মুহাসাবার এসব ফলাফল জানতে পেরেছে তার কর্তব্য হবে, নিজ মনের হিসাব গ্রহণ থেকে কখনও উদাসীন না থাকা। মনের অস্থিরতা, স্থিরতা, ভাবনা-চিন্তা, পা তোলা, পা ফেলা ইত্যাকার প্রতি পদক্ষেপে কড়াকড়ি আরোপ করা। আসলে মানব জীবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস মূল্যবান মণিমুক্তাবিশেষ। সুতরাং এই শ্বাস-প্রশ্বাসকে বেকার নষ্ট করা অথবা তার বিনিময়ে নিজের ধ্বংস ডেকে আনার মত কিছু করা মহাক্ষতি বৈ আর কিছু নয়। চরম অজ্ঞ, মূর্খ ও অবিবেচক ছাড়া আর কারও পক্ষে এমন ধরনের কাজ করা সমীচীন নয়। এ ক্ষতির স্বরূপ ক্বিয়ামতের দিন সে স্বচক্ষে দেখতে পাবে।

টিকাঃ
৩৩. ইবনু 'আসাকির, তাবয়ীনু কিযবিল মুফতারী, পৃ. ২৬৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00