📘 আত্মসমালোচনা > 📄 ২. হেদায়াত লাভে সমর্থ হওয়া এবং তার উপর অটল থাকা

📄 ২. হেদায়াত লাভে সমর্থ হওয়া এবং তার উপর অটল থাকা


আত্মসমালোচনার ফলে মানুষ যেমন আল্লাহ্র দেওয়া সরল পথ লাভ করতে পারে, তেমনি তার উপর অটল থাকতে পারে। কাযী বায়যাভী (রহঃ) বলেন, 'হেদায়াত লাভ এবং তাতে অটল থাকার মত যোগ্যতা তখনই লাভ করা সম্ভব হবে যখন এজন্য চিন্তাশক্তি ব্যয় করা হবে। যেসব দলীল-প্রমাণ এক্ষেত্রে রয়েছে সেগুলো নিয়ে সদাই চিন্তা-গবেষণা করা হবে এবং কী আমল করা হচ্ছে বা না হচ্ছে লাগাতারভাবে মন থেকে তার হিসাব নেওয়া হবে'।

টিকাঃ
২৫. তাফসীরুল বায়যাভী, পৃ. ১২৯।

📘 আত্মসমালোচনা > 📄 ৩. কলবের রোগের চিকিৎসা

📄 ৩. কলবের রোগের চিকিৎসা


মানুষের মনে নানা রোগ বাসা বাঁধে। যেমন, লোভ, হিংসা, অহংকার, আত্মতুষ্টি, অহমিকা, নিজেকে বড় দ্বীনদার ভাবা, কাপুরুষতা, কৃপণতা, কর্মবিমুখতা, অমিতব্যয়িতা ইত্যাদি। নিজের কথা ও কাজের হিসাব না নেওয়ার ফলে নিজের অজান্তে এসব রোগ হয়। তাই মন থেকে নিজ আমলের হিসাব নিলে এবং মনের ইচ্ছার বিরোধিতা করলে তখনই কেবল আত্মার রোগ প্রতিরোধ ও তার চিকিৎসা করা সম্ভব হবে। মনের হিসাব না নিয়ে বরং যদি মানুষ নিজের মনের ইচ্ছার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে তাহ'লে কলব ধ্বংস হয়ে যায়। সুতরাং যে মূর্খ কেবল সেই স্বীয় আত্মাকে কুপ্রবৃত্তির অনুসারী করে এবং আল্লাহ্র কাছে অলীক আশা পোষণ করে। তার মন যেদিকে ঝোঁকে সেও সেদিকে ঝোঁকে। মন যেদিকে চায় সে সেদিকেই যায়। এতে করে তার কলব নষ্ট হয়ে যায়। পক্ষান্তরে মনের ইচ্ছার বিরোধিতা করে কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে কিসে নিজের কল্যাণ ও অকল্যাণ হয় তা ভেবে কাজ করলে কলব সুস্থ থাকে এবং তার রোগ-ব্যাধিরও চিকিৎসা হয়।

📘 আত্মসমালোচনা > 📄 ৪. মনের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করা এবং নিজের আমল-আখলাকে ধোঁকার শিকার না হওয়া

📄 ৪. মনের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করা এবং নিজের আমল-আখলাকে ধোঁকার শিকার না হওয়া


নিজের কাজের ভালো-মন্দ যাচাই ও পরখ করে না দেখলে নিজের কাছে নিজেকে ভালো মনে হয়। আমল-আখলাকে কোন সমস্যা আছে বলেও মনে হয় না। নিজেকে বরং আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা ভাবতেই ইচ্ছা করে। কিন্তু মনের হিসাব-নিকাশ করলে তখন তার নানা দোষ বেরিয়ে আসবে। আর যখনই নিজের সামনে মনের দোষ প্রকাশ হয়ে পড়বে, তখন আর নিজের আমলকে এটিমুক্ত ও যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য ভেবে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলার ইচ্ছা জাগবে না। বরং মনে হবে, তার রব যেন এই টুটা-ফাটা কলুষিত আমল দয়া করে কবুল করে নেন। আব্দুল আযীয বিন আবী রাওয়াদ (রহঃ) তাঁর মৃত্যুর সময় বলেন, ما دخلت في شيء من أعمال البر فخرجت منه فحاسبت نفسي إلا وجدت نصيب الشيطان فيه أوفر من نصيب الله 'যখনই আমি কোন পুণ্য কাজ শুরু করে তা শেষ করেছি তখনই আমি আমার মন থেকে হিসাব করে দেখেছি যে, তাতে আল্লাহ তা'আলার ভাগের থেকে শয়তানের ভাগ বেশী'।

টিকাঃ
২৬. ইবনু আদী, আল-কামিল ৫/২৯১।

📘 আত্মসমালোচনা > 📄 ৫. মুহাসাবা বিদ্বেষমুক্ত নিরহংকার জীবনের পথে পরিচালিত করে

📄 ৫. মুহাসাবা বিদ্বেষমুক্ত নিরহংকার জীবনের পথে পরিচালিত করে


মানুষ যদি নিয়মিত নিজের মনে নিজের আমলের হিসাব নেয় আর কুরআন, সুন্নাহ, রাসূল (ছাঃ)-এর জীবনী ও ছাহাবীদের আমলের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখে তবে নিজের আমলের স্বল্পতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখে তার মনে অহংকার ও বিদ্বেষ দানা বাঁধবে না ইনশাআল্লাহ। আবুদ্দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন, لَا يَفْقَهُ الرَّجُلُ كُلِّ الْفِقْهِ حَتَّى يَمْقُتَ النَّاسَ فِي جَنْبِ اللهِ ثُمَّ يَرْجِعَ إِلَى نَفْسِهِ فَيَكُونَ لَهَا أَشَدَّ مَقْتًا 'কোন লোক পরিপূর্ণ ফক্বীহ বা সমঝদার হ'তে পারবে না, যে পর্যন্ত না সে আল্লাহ্র ইবাদত-বন্দেগীর ক্ষেত্রে অন্য মানুষকে যতটুকু তুচ্ছ মনে করবে তার থেকেও নিজেকে বেশী তুচ্ছ মনে করবে'।
আমাদের অতীতের পূর্বসূরীগণ যখন নিজেদের নফস বা মনের হিসাব নিতেন তখন তারা মনের অবস্থা বুঝে আল্লাহ্র হুযূরে তাকে তুচ্ছ ও নগণ্য ঠাওরাতেন। আরাফার ময়দানে জনৈক পূর্বসূরী তাঁর চারপাশের জনগণের মাঝে এই বলে দো'আ করছিলেন যে, 'হে আল্লাহ, আমার কারণে তুমি এদের (দো'আ) ফিরিয়ে দিও না।
মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি' (রহঃ) বলতেন, لَوْ كَانَ لِلذُّنُوبِ رِيحٌ مَا قَدَرَ أَحَدٌ أَنْ يَجْلِسَ إِلَيَّ (হায়! আমি এতই পাপী যে,) পাপের যদি গন্ধ থাকত তাহলে তার দুর্গন্ধে আমার কাছে কেউ টিকতে পারত না। অথচ তিনি ছিলেন উম্মতের বড় একজন আবেদ।
ইউনুস বিন উবায়েদ (রহঃ) বলেন, إني لأجد مائة خصلة من خصال الخير ما أعلم أن في نفسي منها واحدة 'আমি অবশ্যই একশত সদ্ভাবের কথা জানি, যার একটাও আমার মধ্যে আছে বলে আমার মনে হয় না'।
হাম্মাদ বিন সালামা (রহঃ)-কে দেখুন, সুফিয়ান ছাওরী যখন মরণাপন্ন তখন তিনি তাকে দেখতে যান এবং বলেন, ওহে আবু আব্দুল্লাহ, আপনি যে জিনিসের (জাহান্নামের) ভয় করতেন তার থেকে কি নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছেন না? আর যিনি সবচেয়ে দয়ালু, যার দয়ার আশায় আপনি থাকতেন তার নিকট যেতে সাহস পাচ্ছেন না? উত্তরে তিনি বললেন, হে আবু সালামা, আমার মত মানুষের জাহান্নাম থেকে মুক্তির আশা তুমি কর কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহ্র কসম, আমি অবশ্যই তা করি।
একবার ভেবে দেখেছেন কি? হাদীছ, ফিক্বহ ও সংসারবিমুখ ইবাদতগুযারদের এই সমস্ত দিকপাল যদি জাহান্নাম থেকে মুক্তি না পান তাহ'লে আর কে মুক্তি পাবে?
জা'ফর বিন যায়েদ (রহঃ) বলেন, আমরা কাবুল অভিযানের সেনাদলে অংশ নিয়েছিলাম। ঐ সেনাদলে ছিলাহ বিন আশইয়াম নামে একজন আল্লাহওয়ালা লোক ছিলেন। রাতের বেলায় সৈনিকরা এক জায়গায় ডেরা ফেলে এশার ছালাত আদায় করে শুয়ে পড়ল। আমি মনে মনে স্থির করলাম যে, দীর্ঘ সময় ধরে আমি ছিলাহর আমল দেখব। তিনি লোকেদের অমনোযোগিতার সুযোগ খুঁজছিলেন। সুযোগ পাওয়া মাত্রই তিনি চুপিসারে বেরিয়ে পড়লেন এবং আমাদের কাছাকাছি কিছু ঘন গাছপালার বনে ঢুকে পড়লেন। আমিও তার পিছনে পিছনে গেলাম। তিনি ওযু করে ছালাতে দাঁড়ালেন। এমন সময় একটা সিংহ এল এবং একেবারে তাঁর কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। এ দৃশ্য দেখে আমি একটা গাছে উঠে পড়লাম। যখন তিনি সিজদায় গেলেন তখন আমি মনে মনে ভাবলাম, এই বুঝি সিংহটা তাঁকে ফেড়ে খাবে। কিন্তু তিনি ছালাত চালিয়ে গেলেন। তারপর বসে দো'আ-দরূদ শেষে সালাম ফিরালেন। এবার সিংহটাকে লক্ষ্য করে বললেন, أَيُّهَا السبعُ اطْلَبِ الرِّزْقَ مِنْ مَكَانٍ آخَرَ 'হে শ্বাপদ, তুমি অন্য কোথাও তোমার খাবার তালাশ কর'। তখন সিংহটা হুংকার ছাড়তে ছাড়তে ফিরে গেল। আর তিনি ভোর হওয়া পর্যন্ত একইভাবে ছালাত আদায় করতে থাকলেন। ভোর হ'লে তিনি বসে বসে বহুবিধ তাসবীহ-তাহলীল করলেন, যার অধিকাংশই আমি কখনো শুনিনি। তারপর এই বলে দো'আ করলেন যে, اللهمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ أَنْ تُجِيرْنِي مِنَ النَّارِ أَوَ مِثْلِي يَجْتَرِئُ أَنْ يَسْأَلَكَ الْجَنَّةَ 'হে আল্লাহ, আমার মত তুচ্ছ বান্দার জন্য তোমার কাছে জান্নাত কামনা করার দুঃসাহস নেই; তাই তোমার কাছে আমার নিবেদন যে, তুমি আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিও'। তারপর তিনি তাঁর তাঁবুতে ফিরে এলেন। সকালবেলায় মনে হচ্ছিল তিনি তাঁর তোশকে শুয়ে রাত কাটিয়েছেন। এদিকে কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে আমার ভোর হয়েছে একমাত্র আল্লাহই তা জানেন।

টিকাঃ
২৭. মুহাসাবাতুন নাফস, পৃ.২৩।
২৮. ইমাম আহমাদ, আয-যুদ, পৃ. ২৪৪।
২৯. মুহাসাবাতুন নাফস, পৃ. ৩৭।
৩০. ঐ, পৃ. ৩৪।
৩১. ইবনুল কাইয়িম, ইগাছাতুল লাহফান ১/৮৫।
৩২. বায়হাক্বী, শু'আবুল ঈমান, হা/৩২১১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00