📄 আত্মসমালোচনায় কড়াকড়ি
কৃপণ ও লোভী অংশীদার যেমন তার অন্য অংশীদারদের থেকে নিজের পাওনা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেয়, তেমনি করে মানুষ নিজের মনের নিকট থেকে নিজের কথা ও কাজের হিসাব বুঝে না নেওয়া পর্যন্ত সে মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত হ'তে পারবে না। মায়মুন বিন মিহরান (রহঃ) বলেছেন, لا يكون الرجل تقيا حتى يحاسب نفسه أشد من محاسبة الرجل شريكه، حتى ينظر من أين مطعمه ومشربه ومن أين مكسبه؟ 'কোন মানুষ তার কৃপণ ও লোভী শরীক থেকে নিজের পাওনা বুঝে নিতে মানুষ যত না কঠিন-প্রাণ হয়, নিজের মন থেকে নিজের কথা ও কাজের হিসাব বুঝে নিতে তার থেকেও বেশী কঠিন মনষ্ক না হওয়া অবধি সে মুত্তাকী হ'তে পারবে না। এমনকি কোত্থেকে তার খাদ্য-পানীয় ও আয়-রোযগার হচ্ছে তাও সে গভীরভাবে লক্ষ্য করবে'।” তিনি আরো বলেছেন, 'একজন মুত্তাকী তার মনের হিসাব গ্রহণে কৃপণ ও লোভী অংশীদার কর্তৃক হিসাব গ্রহণ থেকেও মহাকঠোর'।
সুতরাং মুহাসাবায় কড়াকড়ি করলে সেই মুহাসাবা থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু মুহাসাবায় গা ছাড়া যেন-তেন ভাব দেখালে তা কোন মুহাসাবাই হবে না। তা বরং মনের জন্য সবকিছু হালাল করার পাঁয়তারা। যার ফলে মনের বিভ্রান্তি আরও বেড়ে যাবে। অনেকেই মুহাসাবা করতে গিয়ে বলে, 'এটা তো ছোটখাট আমল'; 'এটি হারাম হওয়া নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে'; 'জোরালো মতানুসারে এ আমলটি মাকরূহ' ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবে নানা ছুতো তুলে সে ঐসব আমল করে। এভাবে একসময় মন লাগামহীন কাজে জড়িয়ে পড়ে।
টিকাঃ
১৩. আবু নু'আইম, হিলয়াতুল আওলিয়া ৪/২৮৯।
১৪. ইবনু আবীদ্দুনিয়া, মুহাসাবাতুন নাফস, পৃ. ৯।
📄 সবকিছুতেই আত্মসমালোচনা
আল্লাহ তা'আলার বাণী وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ 'এবং শপথ করছি ধিক্কার দানকারী অন্তরের (বিবেকের)' (ক্বিয়ামাহ ৭৫/২) সম্পর্কে সাঈদ বিন জুবায়ের (রহঃ) বলেন, সে (ভর্ৎসনাকারী মন) ভাল-মন্দ উভয়ের জন্য ভর্ৎসনা করে।” হাসান বছরী (রহঃ) বলেন, إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَا تَرَاهُ إِلَّا يَلُومُ نَفْسَهُ، يَقُولُ مَا أَرَدْتُ بِكَلِمَتِي ، يَقُولُ مَا أَرَدْتُ بِأَكْلَتِي، مَا أَرَدْتُ بِحَدِيثِ نَفْسِي، فَلَا تَرَاهُ إِلَّا يُعَاتِبُهَا وَإِنَّ الْفَاجِرَ يَمْضِي قُدُمًا فَلَا يُعَاتِبُ نَفْسَهُ- 'নিশ্চয়ই কোন মুমিনকে তুমি এমন পাবে না, যে তার মনকে ভর্ৎসনা করে না। কোন কথা বললে সে বলে, হে মন! আমার এ কথার দ্বারা আমি কী বুঝাতে চাচ্ছি? কোন কিছু খেলে বলে, আমার এ খাবার গ্রহণের উদ্দেশ্য কী? মনে মনে কথা বললে বলে, আমার মনে উদিত এ ভাবনা দ্বারা উদ্দেশ্য কি? এভাবে সব ক্ষেত্রেই দেখবে যে, সে মনকে নানা প্রশ্ন তুলে ভর্ৎসনা করছে। কিন্তু যে কাফের-ফাসেক সে কোন ভ্রূক্ষেপ না করে সামনে পা ফেলে। ফলে সে তার মনকে ভর্ৎসনা করে না'।
সুতরাং মুহাসাবা কেবল মন্দ ও পাপ কাজের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রত্যেকটা মানুষকে তার প্রতিটি কাজে মনের সাথে বুঝাপড়া করতে হবে, এমনকি তার মুবাহ বা বৈধ কাজেও।
টিকাঃ
১৫. তাফসীরে তাবারী ১২/৩২৭।
১৬. ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, আয-যুহদ, পৃ. ২৮১।
১৭. যে সকল কাজ করলে কিংবা না করলে পাপ-পুণ্য নেই সেগুলো মুবাহ।-অনুবাদক।
📄 আত্মসমালোচনা শেষে সৎকর্মে মনকে নিবদ্ধ রাখা
যে কাজ তার কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনে না, নিশ্চয়ই তা ত্রুটিযুক্ত ও অপূর্ণ। কাজটি যিনি করেছেন তাকে দ্বিতীয় বার তা পর্যবেক্ষণ করতে হয়। সুতরাং মুহাসাবা কোন ফল বয়ে না আনলে মুহাসাবাকারীর উপর আরেকবার মুহাসাবা করা আবশ্যক হবে। বরং তাকে এভাবে মুহাসাবার পর মুহাসাবা চালিয়ে যেতে হবে।
মালেক বিন দীনার (রহঃ) বলেছেন, আল্লাহ তাঁর সেই বান্দার উপর দয়া করুন, যে তার মনকে বলে, 'তুমি কি এটা করনি, তুমি কি ওটা করনি? তারপর তার নাক ছিদ্র করে তাতে লাগাম পরিয়ে দেয় এবং আল্লাহ্ কিতাব মেনে চলতে বাধ্য করে। এভাবে সে তার মনের চালকের আসনে বসে'।
ইবরাহীম আত-তায়মী (রহঃ) বলেছেন, একবার আমি মনে মনে কল্পনা করলাম যে, আমি জান্নাতে আছি। জান্নাতের ফল খাচ্ছি, জান্নাতের নহরের পানি পান করছি, জান্নাতের তরুণীদের সঙ্গে আলিঙ্গনাবদ্ধ হচ্ছি। আবার কল্পনা করলাম যে, আমি জাহান্নামে আছি। জাহান্নামের যাক্কুম খাচ্ছি, পুঁজ পান করছি এবং তার শিকল ও বেড়ির শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে আছি। এবার আমি আমার মনকে বললাম, মন আমার, তুই কোনটা চাস? মন বলল, আমি দুনিয়াতে ফিরে গিয়ে নেক কাজ করতে চাই। আমি বললাম, তুই তো তোর কাঙ্ক্ষিত স্থানেই আছিস। কাজেই এখনই নেক কাজ কর।
টিকাঃ
১৮. মুহাসাবাতুন নাফস, পৃ. ৮; তারীখু দিমাশক ৫৬/৪২০।
১৯. মুহাসাবাতুন নাফস, পৃ. ১০।