📄 কুরআনে মনের বিবরণ
আল-কুরআনে আল্লাহ তিন প্রকার মনের কথা বলেছেন। যথা : প্রশান্ত আত্মা (النفس المطمئنة), ভর্ৎসনাকারী আত্মা (النفس اللوامة) ও মন্দপ্রবণ আত্মা (النفس الأمارة بالسوء)।
📄 প্রশান্ত আত্মা
মন যখন আল্লাহ্র জন্য আমলে আরাম বোধ করে, তার যিকিরে প্রশান্তি লাভ করে, তার দিকে নিবিষ্ট হয়, ক্বিয়ামত দিবসে তার সাক্ষাৎ লাভে আগ্রহী হয় এবং তার নৈকট্য প্রাপ্তির কাজে স্বস্তি পায় তখন তাকে 'নাফসে মুতমায়িন্নাহ' (نفس مطمئنة) বা প্রশান্ত আত্মা বলে। এই মনের অধিকারীর জান কবয কালে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে ডেকে বলা হয়, يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ، ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً، فَادْخُلِي فِي عِبَادِي، وَادْخُلِي جَنَّتِي 'হে প্রশান্ত আত্মা! ফিরে চলো তোমার প্রভুর পানে, সন্তুষ্ট চিত্তে ও সন্তোষভাজন অবস্থায়। অতঃপর প্রবেশ কর আমার বান্দাদের মধ্যে এবং প্রবেশ কর আমার জান্নাতে' (ফজর ৮৯/২৭-৩০)।
📄 প্রশান্তির মূল তাৎপর্য
আরবী الطمأنينة (তুমা'নীনাহ) অর্থ আরাম ও স্থিরতা। যেহেতু বান্দা আল্লাহ্র আনুগত্য করে, তার যিকির ও স্মরণে লিপ্ত থাকে এবং তারই আদেশ-নিষেধ মেনে চলে সেহেতু সে তার কাছেই আরাম পায়, তাকে ছেড়ে অন্য কারও কাছে সে আরাম বোধ করে না। সে শান্তি পায় আল্লাহকে ভালবেসে, তার ইবাদত করে, তার দেয়া খবরে ও তার দর্শন লাভের উপর ঈমান রেখে। শান্তি পায় আল্লাহ্র নাম ও গুণাবলীর তাৎপর্য বুঝে সেগুলোর উপর অন্তর থেকে বিশ্বাস স্থাপন করে। সে শান্তি পায় আল্লাহকে তার প্রভু, ইসলামকে তার দ্বীন বা ধর্ম এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে রাসূল হিসাবে মেনে নিয়ে তাতে রাযী-খুশী থাকতে। তার স্বস্তি মেলে আল্লাহ্র ফায়ছালা ও তাক্বদীরে, তাকেই যথেষ্ট ও পর্যাপ্ত মনে করাতে। সে খুবই আশ্বস্ত থাকে যে, আল্লাহ তাকে সকল প্রকার মন্দ থেকে দূরে রাখবেন; প্রত্যেক চক্রান্তকারীর চক্রান্ত হিংসুকের হিংসা ও শত্রুর শত্রুতা থেকে রক্ষা করবেন। সে এতে পরিতৃপ্তি পায় যে, এক আল্লাহই তার প্রতিপালক, তার ইলাহ, তার মা'বুদ, তার উপাস্য, তার মালিক, তার মুখতার। তার কাছেই তার ফিরে যাওয়ার জায়গা। এক পলকের জন্যও তাকে ছাড়া তার চলে না। এই মনই হল প্রশান্ত আত্মা।
📄 মন্দপ্রবণ আত্মা
প্রশান্ত আত্মার বিপরীত ও বিরোধী আত্মা হ'ল মন্দপ্রবণ মন। আরবীতে বলা হয় 'নাফসুল আম্মারা'। মন্দপ্রবণ আত্মা মানুষকে খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করতে হুকুম করে এবং ভুল ও বাতিল পথে চলতে উৎসাহিত করে। সে সকল মন্দের আশ্রয়কেন্দ্র। সবাইকে সে বিশ্রী ও ঘৃণ্য কাজের দিকে টানে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوْءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي 'নিশ্চয়ই মানুষের মন মন্দপ্রবণ। কেবল ঐ ব্যক্তি ছাড়া যার প্রতি আমার প্রভু দয়া করেন' (ইউসুফ ১২/৫৩)। আল্লাহ 'আম্মারাহ' বলেছেন, 'আমেরাহ' বলেননি। কেননা 'আম্মারাহ'-এর মধ্যে অতিশয়তার অর্থ রয়েছে। এজন্যই এ ধরনের মন মন্দের বেশী বেশী হুকুম দেয়।
নফস বা মন সহজাতভাবেই অত্যাচারী ও অজ্ঞ-মূর্খ (যালিম ও জাহিল)। ফলে মানুষের মন সদাই অন্যের ও নিজের উপর অত্যাচার করতে চায় এবং নিজের ভাল-মন্দ বিবেচনায় না নিয়ে মূর্খের মত কাজ করে। তবে আল্লাহ যাকে দয়া করে তার খপ্পর থেকে রক্ষা করেন তার কথা আলাদা। আল্লাহ বলেন, وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا 'আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে বের করে এনেছেন এমন অবস্থায় যে তোমরা কিছুই জানতে না' (নাহল ১৬/৭৮)। إِنَّ الْإِنْسَانَ لَظَلُومٌ كَفَّارٌ 'নিশ্চয় মানুষ অতিবড় যালেম ও অকৃতজ্ঞ' (ইবরাহীম ১৪/৩৪)।
হ্যাঁ, জন্মকালে তার মধ্যে হক বা সত্য গ্রহণ করার যোগ্যতা তৈরি করে দেওয়া হয়। তাই তার সামনে হক বা সত্য তুলে ধরা হলে বাইরের কোন খারাপ প্রভাবে প্রভাবিত না হ'লে সে তা গ্রহণ করে। আল্লাহ বলেন, فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا 'তুমি একনিষ্ঠভাবে ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখ। আল্লাহ্র ধর্ম, যার উপরে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন' (রুম ৩০/৩০)। কিন্তু নফস বা মনকে আল্লাহ্র দ্বীন শিক্ষা দেওয়া না হ'লে সে জাহিল-মূর্খই থেকে যায়, তার মধ্যে কুপ্রবৃত্তি গিজগিজ করে। ফলে শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রশিক্ষণ না পেলে মন মানুষকে অবাধ্যতার দিকে ডাকে এবং মন্দ কাজে ঠেলে দেয়। সুতরাং আদল-ইনছাফ ও বিদ্যা-বুদ্ধি মানুষের মনের অর্জিত বিষয়, এগুলো সহজাত নয়।