📄 মনকে শাস্তি প্রদান
মুমিন যখন তার নফস বা মনের হিসাব নিবে তখন দেখতে পাবে, মন কোন না কোন পাপ করেছে, কিংবা ফযীলতমূলক কাজে শিথিলতা ও অলসতা দেখিয়েছে। ফলে যা ছুটে গেছে তার প্রতিকারের জন্য মনকে শাস্তি-সাজা ও আদব শিক্ষা দেওয়া তার কর্তব্য। যাতে ভবিষ্যতে এমনটা আর না ঘটে এবং মন শায়েস্তা ও কর্মতৎপর হয়।
মনকে মুজাহাদা বা কর্মতৎপর না রাখলে, হিসাব না নিলে এবং শাস্তি না দিলে মন সোজা থাকবে না। আশ্চর্য যে, মানুষ কখনো কখনো চারিত্রিক দোষ কিংবা অন্য কোন ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে নিজ পরিবারের সদস্য ও চাকর-বাকরদের শাস্তি দেয়, কিন্তু সে নিজে কোন মন্দ কাজ করলে নিজেকে শাস্তি দেয় না। অথচ নিজেকে শাস্তি দেওয়াই উত্তম ও সুবিবেচনাপ্রসূত কাজ। কখনো কখনো শাস্তির নামে উপেক্ষা ও ছাড় দিতে দেখা যায়। তবে নিজেকে শাস্তি দানের মূল লক্ষ্য নিজের মনকে আল্লাহ্র অনুগত রাখা এবং আগে করা হয়নি এমন সব ভালো কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা। মনকে শাস্তি দানের পূর্বসূরীদের পদ্ধতি এমনই ছিল। এখানে তার কিছু নমুনা তুলে ধরা হ'ল :
ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর একবার আছর ছালাতের জামা'আত ছুটে গিয়েছিল। সেজন্য নিজেকে শাস্তি স্বরূপ তিনি এক খণ্ড জমি দান করে দেন। যার মূল্য ছিল দুই লক্ষ দিরহাম!!
টিকাঃ
৪৮. 'উমদাতুল ক্বারী, ১২/১৭৩।
📄 মনকে শাস্তি প্রদানের সীমা
একজন মুসলিমের নিজ মনকে এমনভাবে পরিচালনা করা কর্তব্য, যাতে আখিরাতে সে নাজাত পেতে পারে। এজন্য সে মনের সঙ্গে সংগ্রাম (মুজাহাদা) করবে, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে ভাল কাজে লাগাবে। যখন সে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়বে তখন তার সাথে সদাচার (মুদারাত) করবে এবং কষ্ট দেওয়া বন্ধ রাখবে। এভাবে সংগ্রাম ও সদাচারের মধ্য দিয়ে না চললে মন ঠিক থাকবে না।
যখন দেখবে, মন বেশ নির্ভয় ও নিশ্চিন্ত হয়ে আছে তখন তাকে আল্লাহ্র কথা স্মরণ ও তাঁকে ভয় করতে বলবে। আবার যখন দেখবে, মন বিচলিত ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে তখন তার মাঝে আল্লাহ্র নিকটে ভাল ফল লাভের আশা জাগাবে। এভাবেই মনের পরিচালনা ও পরিচর্যা করতে হবে।
অনেক সময় মনোলোভা কিছু বিষয় মনের সামনে তুলে ধরবে। তাকে বুঝাবে যে, তুমি এটা করলে এ পুরস্কার পাবে। তখন তার জন্য অনেক সৎকাজ করা সহজ হয়ে যাবে। ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন, একবার আমার পাশ দিয়ে দু'জন কুলি একটা গাছের ভারী গুঁড়ি বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। ওরা গান গাচ্ছিল আর পথ চলছিল। দু'জনের একজন অন্যজন কী বলে তা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল, অতঃপর তার কথার পুনরাবৃত্তি করছিল অথবা তার মতো কিছু একটা বলছিল। প্রথমজনও আবার দ্বিতীয় জনের কথা খেয়াল করছিল। আমি ভেবে দেখলাম, তারা দু'জন যদি এভাবে গান না গাইত তাহ'লে তাদের কষ্ট বেড়ে যেত এবং গাছের গুঁড়ি বহন দুষ্কর হয়ে পড়ত। কিন্তু এখন যেই তারা গান গাইছে অমনি তাদের জন্য বোঝা বহন সোজা হয়ে আসছে। কেন তা সহজ হচ্ছে, আমি তার কারণও ভেবে দেখলাম। বুঝতে পারলাম, প্রত্যেকের মনোসংযোগ অন্যে কী বলছে তার প্রতি নিবদ্ধ হচ্ছে। আবার নিজেও অনুরূপ জবাব দানের চেষ্টা করছে। এভাবেই তাদের পথ কেটে যাচ্ছে; গুঁড়ি বহনের কথা মনেই আসছে না।
এখান থেকে আমি একটা আজব শিক্ষা পেলাম। আমি খেয়াল করলাম, মানুষকেও তো অনেক কঠিন কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হয়। তন্মধ্যে সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব, মন যা ভালবাসে তা থেকে তাকে বিরত রাখা এবং যা ভালবাসে না তা করতে তাকে অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে মনকে বাগে আনা এবং তাকে এ অবস্থায় ধৈর্য ধরানোর সাধনা। আমি বুঝতে পারলাম, ধৈর্যের সাধনায় মনকে পাকাপোক্ত করতে হ'লে তাকে সান্ত্বনা যোগানো ও তার সঙ্গে মজা করার মতো কিছু একটা করতে হবে।
টিকাঃ
৫৫. ইবনুল মুবারক, আয-যুদ, পৃ. ২৭৭; তারীখু দিমাশক ৪৭/১৫৯।
৫৬. ইবনুল মুবারক, আয-যুহৃদ, পৃ. ৯৫; তারীখু দিমাশক ৫৭/৪২৬।
৫৭. আহমাদ ইবনু হাম্বল, আয-যুহৃদ পৃ. ৩৪০; হিলয়াতুল আওলিয়া ২/১১৪।
৫৮. এ ছিল এক ধরনের বোল, যা কুলিরা সমস্বরে বলে, যাতে বোঝা বহনের কথা ভুলে থাকা ও পথ চলা সহজ হয় ।- অনুবাদক।
৫৯. ইবনুল জাওযী, ছায়দুল খাতির, পৃ. ৭১।
📄 শেষ কথা
ব্যক্তির উচিত, প্রত্যহ একটা সময় নির্ধারণ করতঃ সে সময়ে নিজের মনকে তলব করা এবং তার নিকট থেকে তার সকল নড়াচড়া, ওঠাবসা, কাজ-কর্ম ও কথাবার্তার হিসাব নেওয়া। যেমন করে দুনিয়ার ব্যবসায়ীরা অংশীদারী কারবারে তাদের পাওনার কিছুমাত্র যেন বাদ না যায় সেজন্য তন্নতন্ন করে হিসাব করে। আসলে ব্যক্তির গুনাহ অসংখ্য। তাই মানুষের জন্য সেদিন আসার আগেই প্রতিদিন নিজের হিসাব নেওয়া ভাল, যেদিন তার সারা জীবনের হিসাব একবারে নেওয়া হবে।
এক লোক নিয়মিত মুহাসাবা করত। একদিন সে তার জীবনে কত বছর, কত দিন গুজরে গেছে তা হিসাব করল। সে দেখল, বছরের হিসাবে তার জীবন থেকে ষাট বছর পেরিয়ে গেছে। তারপর দেখল, ষাট বছরে দিনের সংখ্যা দাঁড়ায় একুশ হাযার পাঁচশত দিন। তখন সে একটা চিৎকার দিয়ে বেহুঁশ হয়ে গেল। হুঁশ ফিরে এলে সে বলল, হায় আফসোস! আমি আমার মালিকের হুযুরে একুশ হাযার পাঁচশত গুনাহ নিয়ে হাযির হব! তাও তো প্রতিদিন একটা গুনাহ হ'লে!! আর গুনাহের সংখ্যা অসংখ্য, অগণিত হ'লে তখন অবস্থা কেমন দাঁড়াবে!! তারপর সে বলল, আহ! আমি আমার দুনিয়া আবাদ করেছি, আমার আখিরাত বিরান করেছি, আর আমার মাওলার নাফরমানী করেছি! এখন আমি আবাদী ভূমি দুনিয়া ছেড়ে বিরান ভূমি আখিরাতে যেতে ইচ্ছুক নই! আর কিভাবেই বা আমি বিনা আমলে ও বিনা ছওয়াবে হিসাব-কিতাব ও আযাব-গযবের জগতে পা রাখব? তারপর সে খুব জোরে একটা চিৎকার দিয়ে চুপ হয়ে গেল। লোকেরা তখন তার দেহ নাড়া দিয়ে দেখল তার প্রাণপাখি দেহপিঞ্জর ছেড়ে চলে গেছে।
আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার নিকট আমাদের এবং আপনাদের মনের পরিশুদ্ধির জন্য দো'আ করি। আর সেই সঙ্গে আল্লাহ ছালাত ও সালাম বর্ষণ করুন আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর- আমীন!
*******
টিকাঃ
৬৭. ইবনুল খারাত্ব, আল-'আকিবাতু ফী যিকরিল মওত, পৃ. ৩১।